বিজয়ের ৪৭ বছর : কী পেল বাংলাদেশ? । সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

বিজয়ের ৪৭ বছর : কী পেল বাংলাদেশবিশ্ব ইতিহাসে আমাদের মতো এতো অধিক মূল্য দিয়ে কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছে বলে খুব একটা জানা যায় না। ১৭৫৭ সালের পলাশী ট্র্যাজেডির মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। মীর জাফরসহ অতি ঘনিষ্ঠজনদের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও শাহাদাতের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা যখন আবার স্বাধীনতা ফিরে পেলাম তখন বেশ মূল্য দিতে হয়েছে আমাদেরকে। আমরা যদি সমসাময়িক স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিভিন্ন গৃহযুদ্ধের দিকে তাকাই তাহলে এ কথা অবশ্যই মানতে হবে যে, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমাদেরকে যে ত্যাগ ও কোরবানির প্রয়োজন হয়েছে, অন্যদের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় যেমন ছিল রক্তপিচ্ছিল, ঠিক তেমনিভাবে গৌরবেরও। যা বিশ্ব ইতিহাসে আমাদের স্বাধীনতা, মুক্তিসংগ্রাম সর্বোপরি বিজয়কে আলাদা স্বকীয়তা দিয়েছে।
মূলত ভিয়েতনামে মুক্তিসংগ্রাম ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে ৩০ এপ্রিল সায়গনের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। যুদ্ধে সকল পক্ষের সৈন্যসহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ১২৫২ এবং ৯৭৭ জন। আলজেরিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ ১৮৩০ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬২ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। ১৯৬২ সালের ২ জুলাই আলজেরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। আলজেরিয়ার যুদ্ধে শেষের ৭-৮ বছরে ১০ লাখ আলজেরীয় প্রাণ হারান। কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ২১ লাখ। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর পরাজয় পর্যন্ত ১৪ বছরের যুদ্ধে ২০ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। অবশ্য এখনো আফগানিস্তানে পুরোপুরি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলেছিল ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর হতে ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত। কিন্তু প্রাণহানির সংখ্যা ১০ লাখ অতিক্রম করেনি। এঙ্গোলায় ১৬ বছরের গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ৩ লাখ এঙ্গোলাবাসী। ১৯৮১ সাল থেকে শ্রীলংকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে তা চলে দু’যুগেরও অধিককাল ধরে। প্রাণহানির সংখ্যা ১ লাখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বসনিয়া-হারজেগোভেনিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধেও প্রাণহানির সংখ্যা দেড় লাখ অতিক্রম করেনি। কিন্তু আমাদের দেশে মাত্র ৯ মাসেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ত্রিশ লাখ। সম্ভ্রম হারিয়েছেন দু’লাখ মা-বোন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের সমসাময়িক কালের মুক্তিসংগ্রাম ও বিভিন্ন যুদ্ধে ইতিহাসে এতো চড়ামূল্য আর কোনো জাতিকে দিতে হয়নি। অন্তত এ কথাটা কেউই অস্বীকার করেন না।
ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে এক অনিবার্য কারণেই ভারত বিভাজিত হয়েছে। খুব সঙ্গত কারণেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এক ও অখণ্ড থাকতে পারেনি। সাম্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি ও সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে মুক্তি লাভের জন্যই এ দেশের আপামর জনসাধারণ ৯ মাসের মরণপণ মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা পি-ির গোলামির শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম সে প্রত্যাশা আমাদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। উদার গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলেও দেশে প্রচলিত নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই সে ফসলগুলো ঘরে তুলতে পারিনি বরং বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর উচ্চাভিলাষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বানানো হয়েছে। তাই স্বাধীনতার সুফলগুলো আজও আমাদের কাছে অনেকটাই অধরা।


মূলত পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া মহাজনি মূলধনের চরম জাতীয়তাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও সন্ত্রাসমূলক প্রকাশই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ চরম জাতীয়তাবাদী, অযৌক্তিক ধর্ম ও বর্ণবিদ্বেষ এবং উদ্দেশ্য সাধনে চরম বর্বরতার আদর্শ প্রচার করে। ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের চরম সঙ্কটের পরিচয়বাহক। সাম্রাজ্যবাদী যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের চরম যুগ। জাতীয় ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের বিকাশ যখন নিঃশেষিত, তখন পুঁজিবাদ নিজের শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র গ্রহণ করে।


অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে গণমানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবরূপ লাভ করেছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এই জনপদের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। স্বাধীনতার লক্ষ্যে তারা যুদ্ধ করেছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নেতৃত্ব প্রদানের জন্য আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকি শহীদ নবাব সিরাজউদ্দৌলা, শহীদ তিতুমীর, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ জিয়াউর রহমানসহ আরও অনেক মহান নেতাকে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ জিয়াউর রহমান। কিন্তু নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই আমরা আমাদের এই মহান জাতীয় নেতাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
আমরা জানি, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়েও কঠিন হলো স্বাধীনতা রক্ষা এবং স্বাধীনতার লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা। এ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জিত না হলে রাষ্ট্রও পরিণত হতে পারে ব্যর্থ রাষ্ট্রে। আমাদের দেশের নেতিবাচক রাজনীতি আমাদেরকে যে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে তাতে আমরা বোধ হয় একটা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকেই অগ্রসর হচ্ছি। তাই সময় থাকতে সচেতন না হলে আগামী দিনে আমাদের জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
একটি গণতান্ত্রিক, সুখী, সমৃদ্ধ, শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, অপরাজনীতি ও অহমিকার কারণে আমাদের স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বরং অর্জন যৎসমান্যই বলতে হবে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করা উচিত ছিল তখন ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত বা চিরস্থায়ী করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করেছে। পরিকল্পিতভাবে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বহুধাবিভক্ত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়েছে। বিশেষ মহলকে খুশি করার জন্য সংবিধানকে ভিনদেশী সংবিধানের ডুপ্লিকেট কপি বানালে তাও তাদের ক্ষমতাকে নিরাপদ করতে পারেনি। তাই তারা নিজেরাই সংবিধানে ৪ বার সংশোধনী এনেছে। যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলে দেশের মানুষকে মরণপণ যুদ্ধে ঠেলে দেয়া হয়েছিল সে গণতন্ত্রই তাদের কাছে আর নিরাপদ থাকেনি।
দেশ স্বাধীনের পর দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ন রাখেনি স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দাবিদার রাজনৈতিক দল। তারা সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করেছিল। The Newspaper (Announcement Of declaration) Act- ১৯৭৫ মাত্র ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকা রেখে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তদানীন্তন সরকার এই অ্যাক্ট পাসের আগেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে আসছিলো। ১৯৭৩ সালের ২৯ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে দৈনিক গণকণ্ঠ সম্পাদক আল মাহমুদ অভিযোগ করেছিলেন, ‘গণকণ্ঠ অত্যন্ত বেআইনিভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়ার ফলে তথাকার পৌনে তিন শ’ সাংবাদিক ও কর্মচারী বেকার হইয়া পড়িয়াছেন। সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মুহূর্ত মাত্র সময় না দিয়া অফিস হইতে কাজ অসমাপ্ত রাখা অবস্থায় বাহির করিয়া দেয়া হইয়াছে।’ (ইত্তেফাক-৩০ মার্চ, ১৯৭৩)
বিজয়ের ৪৭ বছর : কী পেল বাংলাদেশজনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতার কারণেই আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই শিশুরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে দেশের নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে একটি সমঝোতায় এলেও ক্ষমতাসীনদের অবৈধ ক্ষমতালিপ্সার কারণই সে অর্জন নস্যাৎ হয়ে গেছে। ফলে আমরা রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সহনশীলতার অভাবে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ব্যর্থতার কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, জীবনমান, সুশাসন ও নিরাপত্তা লাভে সমর্থ হইনি। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট আজ দেশ-বিদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালে একটি বিতর্কিত মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রক্ষাকবচ কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি বাতিল করে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে।
বিরোধী দলগুলোর কেয়ারটেকার সরকারের দাবির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব তারানকো। কিন্তু এতে তিনি সফল হননি। ফলে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা জাতির ঘাড়ে আবারও জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। একটি প্রশ্নবৃদ্ধ ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় এসে এখন তারা মেয়াদপূর্তির দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যাসন্ন। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অতিমাত্রায় ক্ষমতালিপ্সার কারণে সে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা নিয়ে রীতিমত প্রশ্নে সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের বিষয়ে সংলাপ নিয়ে যে আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল তাও রাজনৈতিক একগুঁয়েমির কারণেই সফল হতে পারেনি বরং নির্বাচন পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। যা দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য মোটেই শুভ লক্ষণ বহন করে না।
সঙ্গত কারণেই দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন খাদের কিনারে। আর এ জন্য দেশের মানুষ ক্ষমতাসীনদেরই দায়ী করছেন। পরমত সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল উপাদান। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের কতিপয় অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক ৩ ধরনের অধিকার ভোগ করবে : ১. সামাজিক অধিকার, ২. রাজনৈতিক অধিকার এবং ৩. অর্থনৈতিক অধিকার। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে নিম্নে নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো :
সামাজিক অধিকার: জীবন ধারণের অধিকার. ২. ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, ৩. মতপ্রকাশের অধিকার, ৪ সভা-সমিতি করার অধিকার, ৫. সম্পত্তি ভোগের অধিকার, ৬. ধর্মীয় অধিকার, ৭. আইনের অধিকার, ৮. চুক্তির অধিকার, ৯. ভাষার অধিকার, ১০. পরিবার গঠনের অধিকার ও ১১. শিক্ষা লাভের অধিকার।
রাজনৈতিক অধিকার: ভোটাধিকার, ২. প্রার্থী হওয়ার অধিকার, ৩. অভিযোগ পেশ করার অধিকার, ৪. সমালোচনার অধিকার, ৫. চাকরি লাভের অধিকার ও ৬. বসবাসের অধিকার।
অর্থনৈতিক অধিকার: কাজের অধিকার, ২ উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, ৩. অবকাশ যাপনের অধিকার, ৪. সংঘ গঠনের অধিকার ও ৫. রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিপালনের অধিকার ইত্যাদি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকের যেসব অধিকারের স্বীকৃত রাষ্ট্র তার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারেনি বরং নাগরিকরা তাদের অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ এসব অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই সাংবিধানিক দায়িত্ব। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র জনগণের শাসন, শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকার মোটেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণতান্ত্রিক সকল রীতিনীতি উপেক্ষা করছে যা আমাদের জন্য রীতিমতো অশনিসঙ্কেত। মূলত শাসনকার্যে জনগণের সম্পৃক্ততা উপেক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নেয়া মোটেই সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণ শুধু কাগজে-কলমেই রয়েছে। বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন নেই। ফলে জনগণ অনেকটাই রাজনীতিবিমুখ হতে শুরু করেছেন। আর রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন কোন জাতিকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ তো দূরের কথা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
মূলত পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া মহাজনি মূলধনের চরম জাতীয়তাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও সন্ত্রাসমূলক প্রকাশই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ চরম জাতীয়তাবাদী, অযৌক্তিক ধর্ম ও বর্ণবিদ্বেষ এবং উদ্দেশ্য সাধনে চরম বর্বরতার আদর্শ প্রচার করে। ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের চরম সঙ্কটের পরিচয়বাহক। সাম্রাজ্যবাদী যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের চরম যুগ। জাতীয় ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের বিকাশ যখন নিঃশেষিত, তখন পুঁজিবাদ নিজের শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র গ্রহণ করে। ফ্যাসিবাদের মূলনীতিগুলো নিম্নরূপ :
ক. প্রথমত, ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল নয়। মূলত ফ্যাসিবাদ ছোট, মধ্যম, বড় এবং সর্বোচ্চ নেতা যা আদেশ করবেন, তাই রাষ্ট্রের আদেশ বলে নির্বিবাদে মেনে নিতে হবে।
খ. ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রেও অবিশ্বাস করে।
গ. ফ্যাসিবাদে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বতন্ত্র স্বীকৃত হয় না। ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র হলো সবকিছুই রাষ্ট্রের আওতাভুক্ত, কোনো কিছুই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় বরং কোনো কিছুই রাষ্ট্রের বাইরে নয়।
ঘ. ফ্যাসিবাদ শান্তি কামনা করে না। ফ্যাসিবাদ নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়। মুসোলিনির মতে, মহিলাদের নিকট যেমন মাতৃত্ব, পুরুষদের নিকট তেমন যুদ্ধ-বিগ্রহ।
ঙ. ফ্যাসিবাদে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং দলীয় নেতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হন। একদল ও একনেতা সরকারের এবং সমাজের সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন।
চ. ফ্যাসিবাদে এলিট শ্রেণীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্বাস করা হয় যে, পৃথিবীতে কিছু ব্যক্তি শাসন করতে এবং শাসিত হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করে।
মূলত নেতিবাচক ও বিভেদের রাজনীতির কারণে আমরা অনেক পিছিয়েছি। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র যখন উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হচ্ছে, তখন আমরা নিজেরাই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছি। আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে পিণ্ডির গোলামি থেকে মুক্তি লাভের জন্য মরণপণ যুদ্ধ ও বিজয় অর্জন করেছিলাম প্রতিহিংসা ও অপরাজনীতির কারণে এর সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। দেশে আজও গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজ চলতে পারে না। যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার লাল সূর্যটা ছিনিয়ে এনেছিলাম, কিন্তু প্রাপ্তিটা এখনো অনেকটাই অধরা, যা আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply