বিনয় নম্রতা ও সততা -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

উন্নত, সুন্দর এবং সাফল্যমন্ডিত জীবন একজন ব্যক্তির কাছে অনেক আকাক্সিক্ষত বিষয়। প্রতিটি ব্যক্তিই তার জীবনটাকে সুন্দর, উন্নত এবং সাফল্যমন্ডিত দেখতে চায়। কেউ এমন প্রত্যাশিত জীবন গঠন করে, কেউ গঠন করতে পারে না। এমন জীবন গঠনের জন্য ব্যক্তির জীবনে বিনয়, নম্রতা ও সততার উপস্থিতি প্রয়োজন। কারণ ব্যক্তি যত বিনয়ী ও নম্র হয় জীবন তার তত উন্নত হয়। আর সততা জীবনটাকে অনেক সুন্দর করে সাফল্যমন্ডিত করে। বিনয়, নম্রতা ও সততার উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির মর্যাদাও বাড়ে। এ প্রসঙ্গে অনুপম আদর্শের অধিকারী রাসূল সা: বলেছেন, যে আল্লাহর জন্য বিনয় দেখাল, তাকে তিনি অনেক উঁচুতে স্থান করে দেন (মুসলিম)। মুসনাদে আহমদের এক হাদিসে রাসূল সা: বলেছেন, আল্লাহপাকের জন্য যে যত বেশি নিচু হবে অর্থাৎ বিনয়ী হবে (এই বলে রাসূল সা: নিজের হাতকে মাটির দিকে নামিয়ে দেখালেন), আল্লাহপাক তাকে তত বেশি উঁচু করবেন (রাসূল সা: তার হাতের তালু ওপরের দিকে উঠিয়ে দেখালেন) অর্থাৎ মানুষের কাছে সম্মানিত করবেন।
বিনয়ের আসল অর্থ হচ্ছে সত্যকে দ্বিধাহীনচিত্তে মেনে নেয়া। এর আরেকটি অর্থ নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করা। প্রখ্যাত মনীষী হজরত হাসান বসরি রহ: বলেছেন, নিজের ঘর থেকে বের হওয়ার পর যে কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তাকে নিজের চেয়ে ভালো এবং নিজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করার নামই বিনয়। মানুষের জীবনে যত উত্তম গুণাবলি রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম উত্তম গুণ হলো বিনয় ও নম্রতা। বিনয় ও নম্রতা উত্তম চরিত্রের ভূষণ। এই বিনয় ও নম্রতা দ্বারা মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। পারে সাফল্য ছিনিয়ে আনতে। পরম শত্রুকেও বিনয় ও নম্রতা দ্বারা বশে আনা যায়। একদিন খোতবা পাঠের সময় মিম্বরে দাঁড়িয়ে হজরত ওমর রা: বলেন, হে মানুষ তোমরা নম্র হও, কেননা আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি যে, যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী ও নম্র হয় আল্লাহ তাকে সাফল্যমন্ডিত করেন।
অন্যকে জয় করার সহজ পথ হলো বিনয়, নম্রতা ও সততা। বিনয়, নম্রতা ও সততা দিয়ে সহজেই অন্যের হৃদয় জয় করা যায়, অন্যকে কাছে টানা যায়- যার মূর্ত প্রতীক হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা: ও তার সাহাবারা। বিনয় ও নম্রতা দ্বারাই তারা মানুষকে আপন করে নিয়েছেন। বিনয়ী ব্যক্তিকে আল্লাহ যেমন ভালোবাসেন, তেমনি মানুষও তাকে ভালোবাসেন। এ সম্পর্কে হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে- তিনি বলেন, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, আল্লাহ স্বয়ং নম্র, তাই তিনি নম্রতাকে ভালোবাসেন। তিনি কঠোরতার জন্য যা দান করেন না; তা নম্রতার জন্য দান করেন। নম্রতা ছাড়া অন্য কিছুতেই তা দান করেন না। (মুসলিম)। যে আল্লাহর উদ্দেশে বিনয়ী হয় আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, যারা তোমার অনুসরণ করে সেসব বিশ্বাসীর প্রতি বিনয়ী হও। (সূরা আশ্-শুআরা : ২১৫) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, মুহাম্মদ সা: আল্লাহর রাসূল এবং তার সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফিরদের প্রতি বজ্রকঠোর। আর নিজেরা নিজেদের প্রতি বড়ই করুণাশীল বা বিনয়ী। (সূরা আল ফাতহ : ২৯) আল্লাহতায়ালা সূরা আল মায়েদার ৫৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের দীন থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ আরও অনেক লোক তৈরি করবেন; যারা হবে আল্লাহর প্রিয় এবং আল্লাহ হবেন তাদের প্রিয়। যারা মুমিনদের প্রতি নম্র ও বিনয়ী হবে এবং কাফেরদের প্রতি হবে অত্যন্ত কঠোর। মহান আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেন, তারাই তো আল্লাহর প্রকৃত বান্দা যারা জমিনে নম্রতার সঙ্গে চলাফেরা করে। আর যখন মূর্খ লোকেরা তাদের সঙ্গে আল্লাহর বিষয়ে তর্ক করে তখন তারা বলে দেয় তোমাদের প্রতি সালাম। (সূরা আল ফুরকান : ৬৩)
বিনয় ও ন¤্রতার পাশাপাশি সততাকে ধারণ করা আবশ্যক। কারণ যে সততাকে ধারণ করে সে বিনয়ী ও নম্র হয় এবং সে জীবনে বড় হয়, সাফল্যের অধিকারী হয়। বিনয়, নম্রতা ও সততা এগুলো মহৎ গুণ। এ গুণে গুণান্বিতরা মহৎ হয় বলেই সমাজে তাদের আসন সুউচ্চে। বিনয় নম্রতাকে সাথে নিয়ে সত্যের লালন মানবজীবনের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে বিজয়ীরাই সাফল্যের সন্ধান পায়। এই চ্যালেঞ্জে উপনীত হওয়ার জন্যই জীবনের প্রতিটি দিনে প্রতিটি ক্ষণে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে সত্যকে লালন করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা। যিনি যত বেশি এই সার্থকতাকে অর্জন করতে পেরেছেন তিনি তত বেশি সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে নিজেকে রাঙিয়েছেন, জগৎ রাঙিয়েছেন। সততার ওপর জীবন পরিচালনা করা শুধুমাত্র সুসময়ের অনুসরণীয় কাজ নয় বরং প্রতিকূল অবস্থায়ও একে ধারণ করার মধ্যেই রয়েছে বিরাট সার্থকতা। প্রতিকূল মুহূর্তে সততাকে ধারণ করে দুঃসময়কেও প্রতিহত করা যায়।
বিনয়, নম্রতা এবং সততার লালন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের মানুষের জন্য নির্ধারিত নয়, বরং এটি প্রত্যেক ধর্মের, প্রত্যেক জাতির মানুষের নৈতিকতার সাথে জড়িত। সাফল্য অর্জিত মানুষ এই গুণগুলোকে যদি ধারণ করতে না পারেন তাহলে তিনি সাময়িক সফল হতে পারেন কিন্তু নৈতিকতাবোধসম্পন্ন সফল মানুষ হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। অসৎ পথে, অসৎ পদ্ধতিতে সাফল্য অর্জনের চেয়ে হেরে যাওয়া অনেক ভালো, সম্মানের সঙ্গে হেরে গেলে নিজের অভাব বা দুর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পরীক্ষায় নকল করে পাস করার চেয়ে ফেল করাই অনেক ভালো নয় কি? কারণ ফেল করার কারণ খুঁজে বের করে নিয়ে পরবর্তী প্রস্তুতি দিয়ে দুর্বল বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ হওয়াটাই মূল সফলতা। কিন্তু নকল করে সাফল্য অর্জিত হতে পারে, যখন কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগ শুরু হবে তখন ব্যর্থতার গ্লানি সেই পাস করা সাফল্যকে ধুয়ে মলিন করে দেবে। তখন আফসোস করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
কেউ কেউ ভাবতে পারেন বিনয়, নম্রতা, সততা ও নৈতিকতা- এগুলো পুরাতন কাসুন্দি। আধুনিক সমাজে এসব অচল। প্রকৃত পক্ষে ইতিহাসের সময় ও সভ্যতার এমন ঘটনা জানা নেই যখন এই মূল্যবোধগুলোকে অস্বীকার করে কেউ সফল হয়েছে। একজন সফল ব্যক্তি তাকেই বলা যায় যার মাঝে দয়া, সাহস, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতার পাশাপাশি বিনয়, নম্রতা, সততা ও নৈতিকতার গুণ থাকে। আমরা অনেক সময় সততাকে পদদলিত করে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করি। একটি মিথ্যাকে ঢাকার জন্য আরেকটি মিথ্যা কথা বলি। কারো কারো ক্ষেত্রে এটি একটি স্বাভাবিক অভ্যাসেও পরিণত হয়। তখন তার কাছে সততার পরিবর্তে মিথ্যাই মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মিথ্যার এই হাতিয়ার শুধুমাত্র ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না বরং সমাজ জীবনে বিপর্যয়ও ডেকে আনে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা মিথ্যার সঙ্গে সত্যের মিশ্রণ করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না। (সূরা বাকারা : ৪২) সততা ব্যক্তিকে উন্নত করে, মর্যাদাবান করে তোলে, শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করে, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কেউ হয়তো সাময়িক উন্নতি করে কিন্তু সত্যের আলো উদ্ভাসিত হলে সাফল্যের চূড়া থেকে তার মুহূর্তেই পতন ঘটে। তাই ছোটখাটো মিথ্যাও পরিত্যাগ করা উচিত, কেননা মিথ্যা আরো মিথ্যার জন্ম দেয়। সাফল্য অর্জনে সততা অবলম্বন করাই উত্তম ব্যবস্থা। নকল করে পরীক্ষায় হয়তো কৃতকার্য হওয়া যায়, ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়। কিন্তু জীবনের যে সাফল্য সেই সাফল্য অর্জন করা যায় না। তাইতো বলা হয়ে থাকে Honesty is the best policy|
আমাদের আচরণ ও ব্যবহার আমাদের চিন্তা, চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। আমি যে সাফল্য অর্জনের পেছনে ছুটে চলতে গিয়ে আমার ঘাম, শ্রম, পরিশ্রম ঢেলে দিচ্ছি, সেই পথ চলায় যদি আমি বিনয়, নম্রতা ও সততাকে ধারণ না করি তাহলে আমার অর্জিত সাফল্য হবে ঐ বৃক্ষের ন্যায় যেই বৃক্ষে তার ডাল-পালার চেয়ে আগাছাই শক্তিশালী। কার্যত আমার অর্জিত সাফল্য হবে তখন মিথ্যাশ্রিত, বিনয় নম্রতাহীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ইমাম শাফেয়ি রহ: বলেছেন, বিনয়, নম্রতা সত্যিকার মানুষের লক্ষণ আর অহঙ্কার, ধৃষ্টতা মন্দ লোকের আচরণ। হজরত আবু বকর রা: বলেন, বিনয়, নম্রতা গরিবের জন্য একটা উত্তম অভ্যাস, কিন্তু ধনীর বিনয় উচ্চস্তরের চরিত্রবিশেষ।
লেখক : সম্পাদক

SHARE