বিপথে তরুণ প্রজন্ম সরকারের পাহারাদারি(!) দায়ী

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশের প্রয়াত বিপ্লবী কবি সমুদ্র গুপ্ত (মোহাম্মদ আবদুল মান্নান) ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার এক কবিতার বইয়ের নাম ছিল, যদি ভুল না করে থাকি, ‘উজ্জ্বল উদ্ধার কেড়ে নেবো’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, কখনো কখনো তার মনে হয়, পৃথিবীটাকে টেনে ফেলে, কাচের বাসনের মতো আছড়ে ভেঙে ফেলি। সে রকমটি কি আর হয়? উজ্জ্বল উদ্ধার তো আমাদের চার পাশে আছেই। সে উদ্ধার পানিতে পড়া কাউকে ফেলে তোলা নয়। সমুদ্র গুপ্ত প্রচণ্ড আবেগে পৃথিবীর গহিন-গভীর সমুদ্র থেকে উজ্জ্বল উদ্ধার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। আসলে সে উদ্ধার ছিল আমাদেরই। আমাদেরই সমাজের। কখনো কখনো তার মনে হয়েছিল, সূর্যটাকে টেনে এনে কাচের বাসনের মতো তিনি আছড়ে ফেলবেন। সমুদ্র গুপ্ত ওরফে মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশত নসিব করুন।
হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। জরাজীর্ণ বিছানার বেডে তাকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। সামান্য বেড ছিল। হয়তো সস্তার জন্য ছিলেন। পাশে তার মেয়ে ছিল। সমুদ্র গুপ্ত মুসলমান হলেও তাকে আমি ‘সমুদ্র দা’ বলেই সংম্বোধন করতাম। তিনি জানতেন যে, আমি জানি তার নাম মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। নামটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু ছিল অকারণেই কবি সমুদ্র গুপ্ত কেন সূর্যটা বহু আগে কাচের বাসনের মতো আছড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন।
কোনো কিছ্ইু তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। নিয়ন্ত্রণ করা, বোধ করি যায়ই না। আমি কি আমার সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? আসলে পারি না। সমাজ ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। সমুদ্র গুপ্ত তার প্রারম্ভ সময়ে আমাদের সামনের সূর্যটাকে কাচের বাসনের মতো আছড়ে উপহার দিতে চেয়েছিলেন। কেন? সে কি তার সন্তানের জন্য? সে কি তার স্ত্রীর জন্য? সে কি তার আশপাশের প্রতিবেশীদের জন্য? কে বলতে পারে? জীবনের কোনো কোনো সন্ধিক্ষণে কেউ কেউ এভাবে তীব্র প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
কিন্তু মৃত্যু এমন কেন? আমরা অবিরাম বলি, আহা, এই লোকটা যদি বেঁচে থাকত, তাহলে পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর আরো কত কিছু যে করে যেতে পারত! এসব কথা আমরা অকারণেই বলি। মৃত্যু এমন এক নিয়ামক, যে তার নিজস্ব নিয়মে চলে। আমরা বলি, এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনে আসে। যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, তখন তাকে চলে যেতে হয়। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে আমার কখনো মনে হয়নি যে, সমুদ্র গুপ্ত ওরফে মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের চলে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু নিয়তি তো তার নিজস্ব নিয়মেই চলে। মহান আল্লাহ তায়ালা যার যার হায়াৎ বেঁধে দিয়েছেন। কোনো কোনো শিশুর মাতৃগর্ভেই মৃত্যু হয়। কোনো কোনো শিশু মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়ে, চিৎকার ধ্বনি দেয়ার পরেই মৃত্যুবরণ করে। কারো কারো মৃত্যু হয় ভরা যৌবনে। কেউ কেউ প্রৌঢ় জীবন পর্যন্ত যৌবন উপভোগ করে যায়, কোনো সমস্যা হয় না।
এসবই আল্লাহ তায়ালার বিচিত্র খেয়াল। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আমি কাউকে অধিক সম্পদ দিই, কিন্তু কোনো সন্তানই দিই না।” আবার তিনি এও বলেছেন, “কাউকে অধিক সন্তান দিই। কিন্তু কোনো সম্পদই দিই না।” সে কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন যে, ‘তোমরা জাহাদুল বালাহ’ কম সম্পদ অথচ বেশি সন্তান, এইরূপ অবস্থা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। অর্থাৎ তোমার যদি সম্পদ কম থাকে তাহলে তুমি অধিক সন্তান নিও না।
কিন্তু কেউ কি নিজ সন্তানকে কোথায়ও ফেলে দিতে পারে? যতই সে জাহাদুল বালাহ হোক; কিন্তু মাতৃগর্ভে যদি সন্তান আসে, সে সন্তান কি তার পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব? সেও নিয়তি। কেউ জাহাদুল বালাহ অর্থাৎ কম সম্পদ অথচ বেশি সন্তান, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সেটাও মহান আল্লাহ তায়ালারই খেয়াল।
পৃথিবী এক অদ্ভূত নিয়মের ভেতরে চলে। এই নিয়মের মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সে কথা তিনি তার পবিত্র গ্রন্থে অনেকবার বলেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি কাউকে অধিক সম্পদ দেন। অথচ কোনো সন্তানই দেন না। এইভাবে তিনি মানুষকে শিক্ষা দেন।
পুলিশ অফিসার মাহফুজুর রহমান ও তার গৃহিণী স্ত্রীর অতি আদরের সন্তান ছিল ঐশী রহমান। আহা, কী আশ্চর্য নাম তারা রেখেছিলেন! তার বাবা-মা যে তার নাম ঐশী রহমান রেখেছিলেন, তার ভেতরে ধর্ম বা ঈশ্বরের স্পর্শ ছিল। ধারণা করতে পারি যে, তারা চেয়েছিলেন ঈশ্বর প্রেমিক বা আল্লাহ-ভীতু এক সন্তান হবে তাদের। সেই পথে তারা সন্তানকে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু বাবা-মা যা চান, সব সময় তাই কি পারেন? পারেন না। আর পারেন না বলেই সমাজের ভেতরে এত সব দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ, খুন-খারাবির ঘটনা ঘটে। আমরা যারা প্রবীণ হয়ে গেছি, তারা হয়তো তা ঘটাই না; কিন্তু আমাদের তুলনায় যারা নবীন, যাদের রাষ্ট্র গড়ে তোলার কথা, যাদের নিজস্ব ভবিষ্যৎ নির্মাণ করার কথা, তারা এক ভিন্ন জগৎ নির্মাণ করতে যাচ্ছে।
এবং আশ্চর্য এই যে, আমরা অভিভাবকেরা তার কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। বিপদ সেখানে কম নয়। যে তরুণী ঐশী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তার বাবা-মাকে হত্যা করল, আমরা কি তার কারণ অনুসন্ধান করে কিনারা করতে পারব? পুলিশের বাহবা টাইপ অনুসন্ধান আছে। ঐশীর বয়স ১৭ না ১৮ এই নিয়ে পুলিশ একেবারে গলদঘর্ম। যদিও ঐশীর বাবা একজন পুলিশ কর্মকর্তাই ছিলেন। আমার কথাগুলো নিষ্ঠুরের মতো শোনালেও ঐশী যে তার বাবা-মাকে হত্যা করেছে এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মাত্র ১৭ কি ১৮ বছর বয়সে ঐশীর জীবনে অকল্পনীয় অধঃপাত। কেউ কেউ বলবেন, পিতা-মাতা তাহলে কী করল? শিশুকে কি তবে তারা স্কুলে পাঠাবে না? মা কি তবে সত্যি সত্যি তার সন্তানের শিক্ষাজীবন পর্যন্ত তাকে নিয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বসে থাকবে? সন্তানকে গাড়ি কিংবা রিকশায় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাবে। তারপর তেমনিভাবে আবার গৃহে ফিরিয়ে আনবে। তারপর তারাও যেখানে যাবে, সন্তানও সেখানে যাবে। তার বাইরে এক পা-ও দিতে পারবে না।
না-না-না। আমি এমন কথা বলতে চাইছি না। আমি অন্তত একটি দম্পতিকে জানি, যেখানে মা-বাবা দু’জনেই কর্মরত ছিলেন। মেয়েকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাবা-মা স্কুলে দিয়ে গেছেন। এবং চাকরির ফাঁকে আবার এসে নিয়েও গেছেন। তারপর গৃহবন্দী। ইন্টারমিডিয়েটের পর মেয়ের স্বভাব চরিত্র নষ্ট হয় কি না, সেটা তদারকির জন্য মা চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলেজে বসে থেকেছেন। শিক্ষকদের কাছে কোচিংয়ে নিয়ে গেছেন। এমনি আরো অনেক কিছু। মেয়েটি ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর ঢাকার একটি মোটামুটি খ্যাতিমান মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। ভর্তি সে তার যোগ্যতায়ই হয়েছে; কিন্তু ঐ যে আবার মা, তিনি ক্লাসরুমের বাইরে বসে থেকেছেন কিংবা হাঁটাচলা করেছেন। এই সন্তানকে মানুষ করার জন্য তারা দু’টি গাড়ি কিনেছিলেন।
তার ফাঁকেও সন্তানটি এমন এক ছেলের প্রেমে পড়ল যে, বাবা-মা সেখানে তাকে বিয়ে দিতে নারাজ হলেন। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, মেয়েটি এখন রীতিমতো ডাক্তার। কোনো একটি ক্লিনিকে বসছে। উচ্চতর পড়াশোনার জন্য পিজিতে ভর্তি হয়েছে। এখনো মা তার পেছনে আছে। মেয়েটিকে পাত্রস্থ করা যাচ্ছে না। সে তার পছন্দের ছেলেকেও বিয়ে করতে পারছে না। অন্য কাউকে বিয়ে করবে না বলে ধনু-ভাঙা পণ করেছে। একমাত্র মেয়ে। বাবা-মা কত কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছেন। যার তার কাছে তো আর বিয়ে দিতে পারেন না। মেয়ে নেশা ধরেনি। হাত-পা ছুড়ে তাকাবার অবকাশ পায়নি। কৈশোর-তারুণ্য যৌবনের উচ্ছ্বাস আনন্দ থেকে বঞ্চিতই থেকেছে। হাঁটছে, চলছে, ফিরছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে। কিন্তু একজন পরিণত বয়সের মেয়ে, যার ইতোমধ্যে মা হওয়ার কথা, তার বন্দিনী জীবন। এই বাবা-মারও কিছুই করার নেই। যেমন, ঐশীর বাবা-মায়েরও বোধ হয় তাকে ঘরের বাইরে যেতে না দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
আসলে সমস্যাটা সমাজের গভীরে। আমি বিদেশে দেখেছি, ছোট্ট শিশু। পেছনে বইয়ের ব্যাগ। হাতে পানির বোতল। মা কিংবা বাবা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো। বাস এলে ছোট শিশুটিকে বাসে তুলে দিয়ে ড্রাইভারকে হাত নাড়লেন- বাবাই। সিস্টেমটা হচ্ছে, ঠিক স্কুলের গেটে এই ড্রাইভারই স্বযতেœ শিশুটিকে নামিয়ে  দেবে। না, হাত ধরে নয়। বাসটি সম্পূর্ণ থামবে। শিশুটি ছোট্ট পা লম্বা কাইক দিয়ে ধীরে ধীরে নামবে। সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন স্কুলের স্টাফ। তিনি শিশুটির হাত ধরে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছেন। তারপর শিশুটি ভোঁ দৌড় তার ক্লাস রুমের দিকে। বিকেলে আবার একই ব্যবস্থা। হয় শিশুটির বাবা-মা স্কুলে এসেই তাকে নিয়ে যাবেন। অথবা আবারো বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকে শিশুটিকে রিসিভ করবেন। বাবা-মা না পারলে পাড়া-প্রতিবেশী কেউ। ড্রাইভার তাকে চেনেন। এভাবেই শিশুরা বড় হয়ে ওঠে।
এর মাধ্যমে আমি এমন দাবি করতে চাইছি না যে, সেখানে মাদক নেই; কিন্তু বাংলাদেশে মাদকের যে ছড়াছড়ি এমনটি বোধ করি পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। নেপালে যেখানে সেখানে গাঁজাগাছের ছড়াছড়ি। স্কুল-কলেজগামী শিশুরা সেই গাঁজায় এখন আর অত আসক্ত নেই। একটা জেনারেশন ছিল যেখানে পুরুষেরা কেবলই গাঁজা টানতো। আর নারীরা মাঠে-ঘরে কাজ করে মরতো। নেপালেও আজ আর সে দিন নেই; কিন্তু আমাদের সীমান্ত উন্মুক্ত। ভারতীয় শাসকেরা আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে মাদকে আকৃষ্ট করার জন্য সীমান্ত এমনভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং বাংলাদেশের সীমান্ত প্রতিরক্ষাহীন করেছে, টাইফুনের জোয়ারের মতো মাদক আর অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অস্ত্র অবশ্যই অতিরিক্ত শক্তি। এখন বাংলাদেশে এসবেই খেলা। ধ্বংস হোক তরুণ প্রজন্ম। দু’ভাবেই। মাদকে আর অস্ত্রে। সরকার এই ধ্বংসযজ্ঞে এখন কেবলই পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করি এমন অবস্থা থেকে তিনি যেন আমাদের মুক্তি দেন।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply