বিপদ—মুসিবত উত্তরণে রাসূল সা.—এর নীতি ও কৌশল -ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মান্নান

উত্থান—পতন, বিপদ—মুসিবত মানব জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা। এ ক্ষেত্রে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.—এর দেখানো নীতি ও আদর্শই মুমিন জীবনের পথ ও পাথেয়। দিশেহারা, হতাশাগ্রস্ত বর্তমান মুসলিম উম্মাহর একমাত্র মুক্তির উপায় ও অবলম্বন। আল্লাহ বলেন—
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ — الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴾
“আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন—সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যর্শীলদেরকে। যারা তাদের উপর বিপদ এলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।” (সূরা বাকারা : ১৫৫—১৫৬)।
সাফল্য ও বিজয় তাদের জন্য যারা, যারা বিপদ—মুসিবতের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। সর্বকালের, সর্বযুগের সকল মানুষই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং হতে থাকবেন। এমনকি প্রথম মানব ও প্রথম নবী আদম (আ) থেকে শুরু করে সকল নবী—রাসূল এবং তাঁদের অনুসারীরাও পার্থিব জীবনে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। শেষ নবী মুহাম্মাদ সা.—এর জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। আর সূরা আনকাবুতে আল্লাহ এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—
﴿أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ — وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ﴾
“মানুষ কি মনে করেছে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেয়া হবে? আর আমি অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; এবং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী।”
কুরআন, হাদিস, সিরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে নবীজীবনের অসংখ্য বিপদ—মুসিবতের ঘটনা বিবৃত হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে এ সকল বিপদ—মুসিবত উত্তরণে রাসূল সা.—এর নীতি ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বিপদ—মুসিবত শব্দটির পরিচয়
বিপদ শব্দটি বিশেষ্য, বাংলা একাডেমির অভিধানে এর যে সকল অর্থ বলা হয়েছে, সেগুলো হলো:
১. আপদ; বিপত্তি
২. দুর্দশা; দুরবস্থা
৩. দুর্ঘটনা
৪. ঝঞ্ঝাট।
আর মুসিবত (مصيبة ) শব্দটি আরবী, এটি একবচন; বহুবচনে মাসায়িব (مصائب); যার অর্থ:
১. বিপদ, বিপর্যয়
২. আকস্মিক বিপদ, ব্যথা।
মানাভি বিপদ—মুসিবতের সংজ্ঞায় বলেছেন,
المصيبة اسم لكل ما يسوء الإنسان
“বিপদ—মুসিবত হলো, এমন সব বস্তু যা মানুষকে কষ্ট দেয়।”
কালবি বলেন,
المصيبة ৃ ما يصيب من الشر.
“বিপদ—মুসিবত হলো, যা মন্দ বা খারাপ থেকে আসে।”

আল—কুরআনের ও হাদিসের আলোকে বিপদ—মুসিবত
আল—কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তায়ালা বিপদ—মুসিবতের কথা বলেছেন। নিম্নে এ সম্পর্কিত কুরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হলো:
﴿أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هَذَا قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴾
“কী ব্যাপার! যখন তোমাদের উপর মুসিবত এলো (ওহুদের যুদ্ধে) তখন তোমরা বললে, ‘এটা কোত্থেকে এলো?’ অথচ তোমরা তো দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়েছিলে (বদরের যুদ্ধে)। বলুন, ‘এটা তোমাদের নিজেদের কাছ থেকে এসেছে’ নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।”
﴿مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ﴾
“আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন বিপদই আপতিত হয় না।”
এছাড়াও কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫—১৫৬ নম্বর আয়াতে, সূরা নিসার ৬২ ও ৭২—৭৩ নম্বর আয়াতে এবং সূরা নিসার ৫০ নম্বর আয়াত ছাড়াও এরূপ আরো অন্যান্য অনেক জায়গায় মুসিবত শব্দটি এসেছে।
বিপদ—মুসিবত সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ সা.—এর কিছু হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
্রمَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُগ্ধ
“আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যাণ চান তাকে বিপদে ফেলেন।”
্রمَا يَزَالُ البَلَاءُ بِالمُؤْمِنِ وَالمُؤْمِنَةِ فِي نَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَمَالِهِ حَتَّى يَلْقَى اللَّهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيئَةٌগ্ধ
“মুমিন নর—নারীর উপর, তার সন্তানের উপর ও তার সম্পদের উপর অনবরত বিপদাপদ লেগেই থাকে। অবশেষে সে আল্লাহর সাথে পাপমুক্ত অবস্থায় মিলিত হয়।”

বিপদ মুসিবত উত্তরণে রাসূল সা.—এর নীতি ও আদর্শ
রাসূল সা. প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত শুরু করার পর নবুওয়াতি জীবনে শুরু হয় বিপদ—মুসিবত, চরম অনিশ্চয়তা ও দুঃখ—দুর্দশা। হিজরতের আগে ও পরে তাঁর উপর আপতিত এরূপ অসংখ্য বিপদ—মুসবিতের কিছু নমুনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
ক্স রাসূল সা.—এর চলার পথে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দেয়া ছাড়াও কটূক্তি করা, মিথ্যা অপবাদ দেয়া হতো।
ক্স কাফের প্রতিবেশী নেতারা ও তাদের সঙ্গীরা রাসূল সা.—এর উপর নামাজরত অবস্থায় উটের নাড়ি—ভুঁড়ি ও মল—মূত্র নিক্ষেপ করত, রান্নাবান্না অবস্থায় পাতিলে আবর্জনাদি নিক্ষেপ করত।
ক্স মক্কার কাফেররা রাসূল সা.—এর উপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, বিরোধিতার সকল প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তাঁকে এবং বনু হাশিমের যারা তাঁকে সমর্থন করে সকলকে বহিষ্কার এবং বয়কটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে আবু তালিব এবং তার পরিবারবর্গ (মহানবী সা.সহ) শিয়াবে আবু তালিব নামে (আবু তালিবের উপত্যকায়) পরিচিত মক্কার নির্জন উপত্যকায় তিন বছর পর্যন্ত নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে বাধ্য হন। এ সময় ক্ষুধার তাড়নায় আদরের শিশু—সন্তান ও মহিলাগণের হৃদয়বিদারক কান্না এতটাই প্রকট ছিল তা গিরি পর্বতের বাইরে থেকে শোনা যেতো।
ক্স তায়েফের ময়দানে কাফের—মুশরিকরা দুষ্ট ছেলেদেরকে রাসূলের উপর লেলিয়ে দিলো। পথের দু’পাশে ভিড় করে তারা হাততালি দিলো, অশ্রাব্য—অশ্লীল কথাবার্তা বলে তাঁকে গাল মন্দ দিলো ও পাথর ছুড়ে আঘাত করার ফলে তার পায়ের গোড়ালিতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে এবং জুতার ভিতরে রক্ত জমে পা আটকে গেল।
ক্স মদিনায় হিজরতের পরেও রাসূলুল্লাহ সা.—এর উপর বিপদ—মুসিবত চলতেই থাকে। বদর, ওহুদ, আহযাব, হুদাইবিয়া, হুনাইন, খায়বর, তাবুক, বানু মুস্তালিক, মুতা, মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ ছাড়াও হামরাউল আসাদ, বানু কুরাইযা, বানু কাইনুকা, বানু নাযির অভিযান, রাযী, বীরে মাউনার ঘটনা ছাড়াও এরূপ অসংখ্য বিপদ মুসিবত উত্তরণে রাসূল সা. যে সকল নীতি বা আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন নিম্নে সংক্ষেপে সেটা তুলে ধরা হলো:

সবর বা ধৈর্য ধারণ করা
মানব চরিত্রের উত্তম গুণাবলির অন্যতম হলো সবর বা ধৈর্য। আল—কুরআনে আল্লাহ ধৈর্যকে সাফল্যের নিয়ামকরূপে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো, আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” বিপদে মুসিবতে রাসূল সা. সব সময় ছিলেন দৃঢ়চিত্ত ও ধৈর্যশীল। তিনি মক্কায় শিয়াবে আবু তালিবে বন্দী থেকেছেন, তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন, ওহুদে দাঁত হারিয়েছেন, মদিনায় বদর, ওহুদ, খন্দক ও হুদাইবিয়া ছাড়াও সমগ্র নবুওয়াতি জীবনের সকল বিপদ মুসিবতে দেখিয়েছেন ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা। আম্মার রা. ও তার পিতা ইয়াসির রা. এবং মাতা সুমাইয়্যা রা.—এর উপর ইসলাম গ্রহণের কারণে নেমে আসে বিপদ—মুসিবতের খড়গহস্ত। আবু জেহেল আম্মার রা.—কে উত্তপ্ত কঙ্কর ও বালুতে শুইয়ে দিয়ে শাস্তি দিত। রাসূল সা. একদিন আম্মার রা.—এর শাস্তি দেখে বলেন, صَبْرًا آلَ يَاسِرٍ، مَوْعِدُكُمْ الْجَنَّةُ “হে ইয়াসিরের পরিবার ধৈর্য ধারণ করো, তোমাদের স্থান জান্নাতে।”
বিপদে মুসিবতে শরিয়াতের সীমার মধ্যে থেকে অশ্রম্ন প্রবাহিত করা
বিপদ—মুসিবতে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে চোখে অশ্রম্ন প্রবাহিত হওয়া স্বাভাবিক। রাসূল সা.—এর চারজন কন্যা ও তিনজন পুত্র সন্তান ছিলেন। ফাতিমা রা. বাদে বাকি সব সন্তান রাসূল সা.—এর জীবদ্দশাতেই ইন্তেকাল করেন। পুত্র ইবরাহিম যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ সা. কান্নাকাটি করেন। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে চোখ কাঁদে আর হৃদয় হয় ব্যথিত। কিন্তু, আমরা কেবল তাই বলি যা আমাদের রব পছন্দ করেন। হে ইবরাহিম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে শোকাভিভূত।

বিপদে মুসিবতের অবস্থায় নামাজ আদায় করা
কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে বিপদে—মুসিবতে ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ বলেছেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ﴾
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও।”
প্রখ্যাত সাহাবা হুযাইফা রা. বলেন,
্রكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا حَزَبَهُ أَمْرٌ، صَلَّىগ্ধ
“নবী সা. যখন কোন জটিল বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, তখন নামাজ পড়তেন।” বদর যুদ্ধের পূর্বের দিন রাসূল সা. একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সকাল পর্যন্ত সারারাত নামাজ পড়েছেন আর কেঁদেছেন।

আল্লাহর কাছে দোয়া করা
“বিপদে বন্ধুর পরিচয়” এ প্রসিদ্ধ উক্তির প্রমাণ পাওয়া যায় সকল মানুষের বিপদের সময়। আল্লাহর হাবিব রাসূলুল্লাহ সা. বিপদে মুসিবতে তার বন্ধু আল্লাহর কাছে ধরনা দিয়েছেন; তার কাছে দোয়া করেছেন। তায়েফের বিপদ—মুসিবতের সময়ে রাসূল সা. দোয়া করলেন,
اللَّهمّ إلَيْكَ أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي، وَقِلَّةَ حِيلَتِي، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ، أَنْتَ رَبُّ الْمُسْتَضْعَفِينَ، وَأَنْتَ رَبِّي، إلَى مَنْ تَكِلُنِي؟ إلَى بَعِيدٍ يَتَجَهَّمُنِي ؟ أَمْ إلَى عَدُوٍّ مَلَّكْتَهُ أَمْرِي؟ إنْ لَمْ يَكُنْ بِكَ عَلَيَّ غَضَبٌ فَلَا أُبَالِيৃ
“হে প্রভু! আমি তোমার নিকট আমার দুর্বলতা, অপারগতা এবং মানুষের নিকট আমার কদর না হওয়ার অভিযোগ করছি। হে দয়াময়! তুমি দুর্বলদের প্রভু, আমারও প্রভু। তুমি আমাকে কার নিকট ন্যস্ত করছো? এমন কোন অনাত্মীয়ের নিকট যে রূঢ় আচরণ করে, কিংবা এমন শত্রুর নিকট যাকে তুমি আমার মালিক করে দিয়েছো? যদি তুমি আমার উপর রাগান্বিত না হও তবে কোনো পরওয়া নেই…।” আঙ্গুর বাগানে বসে রাসূল সা.—এর এই দোয়া ‘দুর্বলদের দোয়া’ হিসাবে প্রসিদ্ধ।

কুনুতে নাজেলা পাঠ
ব্যাপক বিপদ মুসিবতে কিংবা জুলুম—নির্যাতনের সময় রাসূলুল্লাহ সা. কুনুতে নাজেলা পাঠ করতেন। বীরে মাউনার ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ সা. এক মাস পর্যন্ত কুনুতে নাজেলা পড়েছেন। এছাড়া কুরাইশদের কাছে একদল মুসলমান বন্দি হলে তাদের মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কুনুতে নাজেলা পড়েছেন। কুনুতে নাজেলার নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। কুরআন হাদিস থেকে প্রাসঙ্গিক যেকোনো দোয়া পড়া যাবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সা. একেক পরিস্থিতিতে একেক রকম দোয়া পড়েছেন। নিম্নে ইমাম বায়হাকির আস—সুনানে বর্ণিত একটি দোয়া দেয়া হলো:
اللَّهُمَّ اهْدِنَا فِيمَنْ هَدَيْتَ ، وَعَافِنَا فِيمَنْ عَافَيْتَ ، وَتَوَلَّنَا فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ ، وَبَارِكْ لَنَا فِيمَا أَعْطَيْتَ ، وَقِنَا شَرَّ مَا قَضَيْتَ ، إِنَّكَ تَقْضِى وَلاَ يُقْضَى عَلَيْكَ ، إِنَّهُ لاَ يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ وَلَا يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَنَا ، وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ ، وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ ، وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِهِمْ ، وَانْصُرْهُمْ عَلَى عَدُوِّكَ وَعَدُوِّهِمْ ، اللَّهُمَّ الْعَنْ كَفَرَةَ أَهْلِ الْكِتَابِ الَّذِينَ يَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِكَ ، وَيُكَذِّبُونَ رُسُلَكَ ، وَيُقَاتِلُونَ أَوْلِيَاءَكَ اللَّهُمَّ خَالِفْ بَيْنَ كَلِمَتِهِمَ ، وَزَلْزِلْ أَقْدَامَهُمْ ، وَأَنْزِلْ بِهِمْ بَأْسَكَ الَّذِى لاَ تَرُدُّهُ عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُثْنِى عَلَيْكَ وَلاَ نَكْفُرُكَ ، وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ ، وَلَكَ نُصَلِّى وَنَسْجُدُ ، وَلَكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ ، نَخْشَى عَذَابَكَ الْجَدَّ ، وَنَرْجُو رَحْمَتَكَ ، إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكَافِرِينَ مُلْحَقٌ.

আল্লাহর উপর ভরসা করা
রাসূলুল্লাহ সা. বিপদে মুসিবতে সব সময় আল্লাহর উপরই ভরসা করেছেন। তার সমগ্র জীবনই এটার প্রমাণ বহন করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের পর পরই যখন কাফেররা ইসলাম ও মুসলমানদের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে‎ এবং দ্বিতীয়বার মদিনা আক্রমণ করার জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিরাট সেনাদল প্রস্তুত করে আর লোকজন এসে রাসূল সা.কে এ বিষয়ে খবর দিয়ে বলে, তাদেরকে ভয় করো। এ কথা শুনার পর তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করলেন এবং বললেন,
﴾ حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ﴿ “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি আমাদের জন্য উত্তম অভিভাবক।”
উল্লেখ্য যে, এ অভিযানটি হামরাউল আসাদ অভিযান নামে পরিচিত।

অন্তরকে স্থির রাখা ও বিচলিত না হওয়া
রাসূলুল্লাহ সা.কে কাফেররা অত্যাচার নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি; সর্বশেষ তারা রাসূলকে হত্যার পরিকল্পনা করলে আল্লাহ তাঁকে হিজরতের নির্দেশ দেন। এ সময় কাফেররা যখন সওর পর্বতে তাঁকে ও তাঁর সাথী আবু বকরকে ধরে ফেলার উপক্রম হয়, তখন তিনি স্থিরচিত্তে সঙ্গী আবু বকর রা.কে বলেন,
﴿ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا﴾
“চিন্তা করো না, (আমরা শুধু দুইজন নই) আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”

দুনিয়াবি উপায় উপকরণ দিয়ে সাধ্যানুযায়ী সকল প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা বা রাখা
আল্লাহ বলেন,
﴿وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ﴾
“আর তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত কর, আর তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এছাড়া অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন।”
রাসূল সা.—এর যুদ্ধ কৌশলগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তিনি সবসময় দুনিয়াবি সকল প্রস্তুতি নিয়েই আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন। মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রকে সমূলে উৎপাটিত করার জন্য আরবের বহুসংখ্যক গোত্রের সম্মিলিত আক্রমণের খবর পেয়ে রাসূল সা. নেতৃত্বস্থানীয় সাহাবাগণকে নিয়ে পরামর্শ সভা আহবান করেন। এ সভায় উপস্থিত সালমান ফারসি রা.—এর পরামর্শক্রমে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহতের জন্য পরিখা খননের প্রস্তাবও তিনি গ্রহণ করেন। এমনকি খন্দক বা আহযাব যুদ্ধের পরিখা খনন কাজে তিনি সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর পবিত্র পেটে মাটি লেগে ঢেকে গিয়েছিল। আর সে সময় তিনি বলছিলেন, আল্লাহর শপথ! তিনি আমাদেরকে হিদায়েত না করলে আমরা হিদায়েতপ্রাপ্ত হতাম না, আর দান—খয়রাতও করতাম না এবং নামাজও পড়তাম না। তাই হে আল্লাহ! আমাদের উপর শান্তি নাজিল করো। শত্রুর সাথে মুকাবিলার সময় দৃঢ়পদ রাখো। নিশ্চয় শত্রুরা বিনা কারণে আমাদের উপর চড়াও হয়েছে। যখন তারা ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টির সঙ্কল্প করেছে তখনই আমরা তা প্রত্যাখ্যান করে ব্যর্থ করে দিয়েছি।

হা—হুতাশ না করা
রাসূল সা. বিপদ—মুসিবতে কখনো হা হুতাশ করতেন না। তিনি বলেছেন, যদি তোমাকে কোনো বিপদ—মুসিবত পেয়ে বসে, তখন বলবে না, যদি আমি এটা করতাম তা হলে এমন হতো। বরং তুমি বলবে, যা হয়েছে আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ী হয়েছে। তিনি যা চেয়েছেন করেছেন। কেননা ‘যদি, শব্দটি শয়তানের কাজকে উন্মুক্ত করে দেয়।

সমাধানের জন্য তাড়াহুড়া না করা
মানুষের স্বভাব বা প্রকৃতি হলো তাড়াহুড়াপ্রবণ। আর বিপদ মুসিবতের সময় এটা আরো বৃদ্ধি পায়। রাসূল সা. নিজে কখনোই এরূপ করেননি, এমনকি তিনি তার অনুসারীদেরকেও এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। খাব্বাব ইবনুল আরত রা. বর্ণনা করেছেন— যে সময় মুশরিকদের কঠোর নির্যাতনে আমরা ভীষণ দুরবস্থার মধ্যে পড়েছিলাম। সে সময় একদিন আমি দেখলাম নবী সা. কাবাঘরের দেয়ালের ছায়ায় বসে রয়েছেন। আমরা সেখানে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদের জন্য দোয়া করেন না? একথা শুনে তাঁর চেহারা আবেগে— উত্তেজনায় রক্তিমবর্ণ ধারণ করলো এবং তিনি বললেন, “তোমাদের পূর্বে যে সকল মুমিন দল অতিক্রান্ত হয়েছে তারা এর চাইতেও বেশি নিঃগৃহীত হয়েছে। তাদের কাউকে মাটিতে গর্ত করে তার মধ্যে বসিয়ে দেয়া হতো এবং তারপর তার মাথার উপর করাত চালিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হতো। কারো অঙ্গ—প্রত্যঙ্গের সন্ধিস্থলে লোহার চিরুনি দিয়ে অঁাচড়ানো হতো, যাতে তারা ঈমান প্রত্যাহার করে। আল্লাহর কসম এ কাজ সম্পন্ন হবেই, এমনকি এক ব্যক্তি সান‘আ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত নিঃশঙ্ক চিত্তে সফর করবে এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয় তার মনে থাকবে না। কিন্তু তোমরা বড়ই তাড়াহুড়া করছো।”

বিপদ—মুসিবত থেকে শিক্ষা নেওয়া
“ঋধরষঁৎবং ধৎব ঃযব ঢ়রষষধৎং ড়ভ ংঁপপবংং” ব্যর্থতাই সফলতার চাবিকাঠি। সূরা হাশরে দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ ইয়াহুদি গোত্র বনু নাযিরের ঘটনা বর্ণনাপূর্বক বলেছেন,
﴿فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ﴾
“অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” রাসূল সা. বলেছেন,
্রلَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِগ্ধ
“মুমিন কখনো এক গর্ত থেকে দু’বার দংশিত হয় না।”
ওহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের পর মহান আল্লাহ সূরা আলে ইমরানের ১২১ থেকে ১৬৯ নম্বর আয়াতের মধ্যে এ যুদ্ধের শিক্ষা মুমিনদের জন্য বর্ণনা করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সকল বিপদে মুসিবতে ভেঙে না পড়ে বরং সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ধৈর্য ও ঈমানের সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরবর্তী জীবন পরিচালনা করেছেন।

বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ ও ক্ষমা চাওয়া
বিপদে মুসিবতে বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করা সকল নবী—রাসূলের সুন্নাত। আল্লাহ বলেছেন,
﴿وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ﴾
“আল্লাহ এমন নন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে; অথচ তিনি তাদের শাস্তি দিবেন।” রাসূল সা. বলেছেন,
্রمَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ، جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجاً، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجاً গ্ধ
“যে ব্যক্তি সবসময় ইস্তিগফার পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ, প্রতিটি সঙ্কট থেকে উদ্ধারের পথ বের করে দেবেন।” ওহুদ যুদ্ধে আহত হওয়ার পর রাসূল সা. দোয়া করলেন,
্রرَبِّ اغْفِرْ لِقَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَগ্ধ
“হে রব! আমার কওমকে ক্ষমা করুন, কেননা তারা বুঝে না।”

দোয়া দরুদ পাঠ ও কুরআন তেলাওয়াত করা
মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾
“জেনে রেখ আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়।”
রাসূলুল্লাহ সা.—এর হিজরতের সময় কাফেরদের ঘোষিত একশত উট পুরস্কার পাওয়ার আশায় সুরাকা ইবন মালেক যখন তাঁকে ধরার জন্য নিকটবর্তী হলো, তখনও রাসূলুল্লাহ সা. স্থির মনে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। এ সম্পর্কে সুরাকা নিজেই বলেন, “আমি ভাগ্য নিরূপণের তীরগুলোর ইঙ্গিত উপেক্ষা করে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করলাম। শেষ পর্যন্ত আমি রাসূলুল্লাহ সা.—এর এতটা নিকটবর্তী হলাম যে, আমি তার কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পেলাম। তিনি ফিরে তাকাচ্ছিলেন না; কিন্তু আবু বকর রা. বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন।” উম্মু সালামা রা. রাসূলুল্লাহ সা.—এর খিদমতে পেঁৗছে অত্যন্ত ব্যথাতুর হৃদয়ে স্বামীর মৃত্যু সংবাদ জানালে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর গৃহে উপস্থিত হলেন। শোকে বিহ্বল উম্মু সালামা রা.কে তিনি ধৈর্যধারণের উপদেশ দিলেন ও পড়তে বললেন, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ “নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য আর তারই নিকট আমরা ফিরে যাবো।” সেই সাথে তিনি তাঁকে নিম্নোক্ত দোয়াটিও পড়ার জন্য শিক্ষা দিলেন,
اللهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
“হে আল্লাহ! আমাকে আমার মুসিবতের সওয়াব দান করো এবং এর বিনিময়ে আমাকে এর চেয়েও উত্তম বস্তু দান কর।” ইবন আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. কঠিন বিপদ মুসিবতের সময় এ দোয়াটি পড়তেন,
্রلاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ العَظِيمُ الحَلِيمُ، لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ، وَرَبُّ العَرْشِ العَظِيمِগ্ধ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি অতি মহান, অতি সহনশীল। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি আসমান—জমিনের রব এবং মহান আরশের মালিক।”

হতাশ না হওয়া
আল্লাহ বলেছেন,
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ﴾
“তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং হতাশ হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।”
একবার আয়েশা রা. রাসূল সা.—কে জিজ্ঞেস করলেন, উহুদের চেয়ে আর কোনো কঠিন দিন আপনার জীবনে এসেছে কি—না? জবাবে তিনি তায়েফের কষ্টের কথা বললেন। অথচ পর্বতের ফেরেশতারা তায়েফবাসীকে দুই পাহাড় একত্রিত করে পিষে মারতে চাইলে রাসূল সা. অনুমতি দেননি। বরং তিনি বলেন, আমার আশা, মহান আল্লাহ এদের থেকে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন যারা একমাত্র তাঁর ইবাদত করবে। অন্য কাউকে তাঁর অংশীদার ভাববে না। তায়েফবাসীদের জন্য ফেরেশতাদের প্রস্তাব ফেরত দিয়ে রাসূল সা. ক্ষমা, মহত্ত্ব ও উদারতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রাসূল সা.কে বিষমিশ্রিত তরবারি দিয়ে হত্যার জন্য আগন্তুক উমায়ের মসজিদে নববীতে ধরা খাওয়ার পর তিনি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সাথে সাথে কুরআনও শিক্ষা দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে তাঁর আদর্শে মক্কার বহুসংখ্যক নারী—পুরুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসে।

আশাবাদী হওয়া
ইব ঢ়ড়ংরঃরাব ‘ইতিবাচক হও’ একথারই অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে রাসূলুল্লাহ সা.—এর জীবনে। বিপদে—মুসিবতেও তিনি ইতিবাচক ভাবনা ভাবতেন। যখন তিনি তায়েফবাসীকে দাওয়াত দেন, তাদের অধিকাংশ উত্তর দিল “তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও।” তায়েফবাসীর এরূপ প্রত্যাখ্যানে রাসূল সা. মক্কায় ফিরে তায়েফের দুঃখ—কষ্ট ভুলে ইসলামের তাবলিগ মজবুতভাবে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ফেরার পথে যায়েদ বিন হারিছা রা. রাসূল সা.—কে বললেন, যে মক্কাবাসীগণ আপনাকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছে সে মক্কায় আপনি কিভাবে ফিরে যাবেন? রাসূল সা. উত্তরে বললেন, হে যায়েদ, “আল্লাহ তাঁর মনোনীত নবীকে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে সাহায্য ও বিজয়ী করবেন।”

আদর্শের্র উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা
রাসূল সা.কে তাঁর মিশন থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য কুরাইশরা তাঁর চাচা আবু তালিবকে বললো, তিনি যেন ভাতিজাকে এই প্রচারকাজ থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু একথায় কোনো ফল না পেয়ে পুনরায় তারা আবু তালিবকে বললো, “হে আবু তালিব! আপনার ভাতিজাকে এই জাতীয় কাজ কর্ম থেকে বিরত রাখুন। নতুবা তাঁর উপর থেকে আপনার সমর্থন উঠিয়ে নিন।” আবু তালিব ভাতিজাকে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের ইচ্ছার কথা জানালেন, রাসূল সা. উত্তর দিলেন,
يَا عَمُّ، وَاَللَّهِ لَوْ وَضَعُوا الشَّمْسَ فِي يَمِينِي، وَالْقَمَرَ فِي يَسَارِي عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يُظْهِرَهُ اللَّهُ، أَوْ أَهْلِكَ فِيهِ، مَا تَرَكْتُهُ.
“হে আমার চাচা! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্রও এনে দেয় আর আমাকে এ কাজ পরিত্যাগ করতে বলে তাহলে আমি ততক্ষণ ক্ষান্ত হবো না যতক্ষণ না এ দ্বীন বিজয় লাভ করবে অথবা দ্বীনের বিজয়ের জন্য আমি ও আমার জীবন উৎসর্গ হবে।”

বিপদ—মুসিবতের উপকারিতা
আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত লাভের মাধ্যম। বিপদে—মুসিবতে যারা ধৈর্য ধারণ করে, তাদের সম্পর্কে আল—কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রবের কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই সৎপথে পরিচালিত।”
তদাপেক্ষা উত্তম বস্তু লাভ। রাসূল সা. বলেছেন, যে কেউ বিপদ মুসিবতে পড়ে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন’ বলবে এবং বলবে, “হে আল্লাহ আমাকে এ মুসিবত থেকে উদ্ধার করুন এবং এর থেকে উত্তম বস্তু ফিরিয়ে দিন” আল্লাহ অবশ্যই তাকে উত্তম কিছু ফিরিয়ে দিবেন।
এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আগুনে পোড়ালে যেমন সোনা খাঁটি হয়, ঠিক তেমনি মুমিন ব্যক্তির ঈমান বিপদ মুসিবতের মাধ্যমে আরো মজবুত হয়। দ্বীনের পথে আত্মিক ও মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়। গোনাহ মাফ হয় ও পরকালে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

“বিপদ—মুসিবত উত্তরণে রাসূল সা.—এর নীতি ও আদর্শ” প্রবন্ধটি ব্যাপক গবেষণার দাবি রাখে, কোনো অবস্থাতেই এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে এটাকে পূর্ণাঙ্গরূপে তুলে ধরা সম্ভব নয়। দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য অর্জনের জন্য আল্লাহর যত প্রতিশ্রম্নতি রয়েছে কোন ব্যক্তিই কেবল নিছক মৌখিক ঈমানের দাবির মাধ্যমে তার অধিকারী হতে পারে না। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের পথে বিপদে মুসিবতে রাসূলুল্লাহ সা. প্রদর্শিত নীতি ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply