বিপর্যস্ত গণতন্ত্র, বিপন্ন মানবাধিকার, সম্ভাব্য পরিণতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

শাহ মুহাম্মদ মাহফুজুল হক

rersentগণতন্ত্র ও মানবাধিকার আধুনিক সভ্যতার দু’টি মূল স্তম্ভ। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোন একটি দেশ কতটুকু সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল তা নির্ধারণের অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। এ বিষয় দু’টি আবার পরস্পর আন্তঃসম্পর্কিত এবং পরস্পরের পরিপূরক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, সেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’
সংবিধানে গণতন্ত্রের এ সকল সুন্দর সুন্দর ঘোষণা আর অনুচ্ছেদ থাকলে ও বর্তমানে বাংলাদেশের গণতন্ত্র সুদূর পরাহত। এ যেন প্রচলিত প্রবাদÑ ‘কাজীর গরু কাগজে আছে গোয়ালে নেই’ এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার ফখরুদ্দীন মইন উদ্দিনের সেনাসমর্থিত সরকারের সাথে আঁতাত করে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসীন হয়েই জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন) ও আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী সরকারের কূটকৌশলে শেখ হাসিনা তার বাবার স্বপ্নের বাকশাল কায়েম করার মাধ্যমে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। শুরু করে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার মিশন। জঅড-এর সুনিপুণ পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ২০০৯ সালে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হয় ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। বিডিয়ার বিদ্রোহের নামে খুন করা হয় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারকে। অন্য দিকে বিচারের নামে গ্রেফতার করে সাজা দেয়া হয় ও চাকরিচ্যুত করা হয় বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) এর হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বী জওয়ানকে। এর মধ্য দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারে সরকার। প্রথমত সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার মনের মধ্যে লুক্কায়িত একদলীয় বাকশাল কায়েমের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার মত সেনা অফিসারদের হত্যা করে সেনাবাহিনীকে অনুগত রাখা। দ্বিতীয়ত বিডিআর এ থাকা ভিন্নমতাবলম্বীদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের নিয়োগ দিয়ে নব্য রক্ষীবাহিনী তৈরি করা। আধিপত্যবাদী শক্তির সহযোগিতায় বাকশাল তথা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রধান বাধা হিসেবে শেখ হাসিনা চিহ্নিত করেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মত সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও জনপ্রিয়  নেতৃত্বের অধীনে সুসংগঠিত জামায়াত শিবিরের উদীয়মান যুবসমাজ। যাদের ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীরমুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক শাহাজাহান ওমর মন্তব্য করেছেনÑ ‘আমি মনে করি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে জামায়াত শিবিরের টিকে থাকা উচিত। কারণ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত টাকার বিনিময়ে অন্যান্য দলের রাজনৈতিক নেতা, সেনাবাহিনী, পুলিশ অফিসার, প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিদেরকে কিনতে পারলেও জামায়াত-শিবিরকে কিনতে পারেনি এবং পারবেও না।’ আর সেই কারণেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ মদদে মহাজোট সরকার জামায়াত শিবিরকে দমন করার মাধ্যমে এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাদের পথের বাধা দূর করার জন্য শুরু করে ৪৩ বছর পূর্বে নিষ্পন্ন তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার। গ্রেফতার করা হয় জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকল নেতৃবৃন্দকে। দেশ-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ পক্ষপাতদুষ্ট ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে একে একে ফাঁসি ও যাবৎ জীবন কারাদন্ড দেয়া হয় প্রায় সকলকেই।
জামায়াত-শিবির দমনে পরিচালনা করা হয় চিরুনি অভিযান, স্টিং অপারেশন, যৌথ অভিযান থেকে শুরু করে ইতিহাসের সকল ধরনের নির্মম নির্যাতন। খুন করা হয় প্রায় চার শতাধিক জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মী। গুম করা হয় ১৩ জন সম্ভাবনময়ী মেধাবী ছাত্রনেতাকে। আহত ও পঙ্গু করা হয় প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক। গ্রেফতার করা হয় অর্ধ লক্ষাধিক জনশক্তি। ২২ হাজারের অধিক মিথ্যা মামলা করা হয় যার আসামিসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।
গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল কায়েমের নীলনকশা বাসতবায়নে তৃতীয় পদক্ষেপ হিসেবে নেয়া হয় সংবিধানের ১৫তম  সংশোধনীর উদ্যোগ। এক্ষেত্রে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয় আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিতর্কিত রায়। বাতিল করে দেয়া হয় ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৭৩ দিন সহিংস হরতাল অবরোধের মাধমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমাদৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার জন্য সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয় ইতিহাসের সবচেয়ে নির্লজ্জ ও মেরুদন্ডহীন কাজী রকীব উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন।
একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্রের কফিনে সর্বশেষ  পেরেক মেরে দেয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ৫ম স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করার মাধ্যমে। ১৯৭৫ সারের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল কায়েম করার সময় শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষের চারটি পত্রিকা ব্যতীত সকল পত্রিকা বন্ধ করে দেয় একই কায়দায় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে একে একে চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টিভি ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। শুধু এতেই ক্ষান্ত হয়নি বরং সরকারের বিপক্ষে যায় এমন কোন সংবাদ প্রচার করতে না পারে  সেজন্য সম্প্রচার নীতিমালার নামে মিডিয়ার কণ্ঠরোধের সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে বর্তমান সরকার।
মেধাবীদেরকে ডিঙিয়ে পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসনের সকল স্তরে নিয়োগ দেয়া হয় ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ নেতাকর্মীদেরকে। যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মী হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে কাজ করছেন দলীয় কর্মী হিসেবে। যদিও তারা ভোগ করেন জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে পাওয়া বেতনসহ সকল সুযোগ সুবিধা। কিছু দিন আগে ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের দেয়া বক্তব্যেই বিষয়টি প্রকাশ্যে উঠে আসে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও ১১ নং অনুচ্ছেদে গণতন্ত্রকে তথা প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার কথা বলা হলেও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ছলচাতুরীর মাধ্যমে গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্রকেই দেশ পরিচালনার মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পরিপূর্ণভাবে বিকশিত না হলেও যতটুকু গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে সেগুলোকেও ধ্বংস করে দিয়েছে।
গণতন্ত্র বলতে একটি আদর্শিক শাসনব্যবস্থা হলেও মুসলিম বিশ্বে সেটিকে মূলত সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আর আমাদের মতো অনুন্নত দেশে যেখানে অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ও দরিদ্র তাদের নিকট গণতন্ত্র বলতে মূলত ভোটের মাধ্যমে সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনকে বুঝায়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি যে একদলীয় দশম সংসদ নির্বাচন করেছে, তাতে জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে নির্বাচনের পূর্বেই ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, ১১টি জেলার ৪১টির মতো  ভোটকেন্দ্রে কোন ভোট না পড়া, পোলিং ও প্রিজাডিং অফিসার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে ব্যাপক জাল ভোট প্রদান এবং নির্বাচনের দিন ভোটের গ্রহণের হার ঘোষণা না করে সরকারের নির্দেশনায় ২ দিন পর ৪০.৫৬% ভোট কাস্টিং হওয়ার ঘোষণা দেওয়া (যদি ও বিভিন্ন জরিপে এই হার ৫/৭/১০%) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী নিন্দিত ও প্রত্যাখ্যাত এ ধরনের একটি জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার এবং পরববর্তী নির্বাচনেও একইভাবে বর্তমান সরকারের অধীনে করার ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মূলত জনগণের ভোটাধিকার হরণের ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এমনকি গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা সিটি কর্পোরেশেনের নির্বাচিত মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে মেয়াদ উত্তীর্ণের অজুহাতে দেখিয়ে সরিয়ে দিয়ে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। কিন্তু ২ বছর পার হলেও নির্বাচন দিচ্ছে না পরাজিত হওয়ার ভয়ে। তাছাড়া সিলেট, বগুড়ার শেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলার আসামি করে বরখাস্ত করছে অবৈধ ও অনির্বাচিত সরকার। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে যেভাবে সকল দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল একই লক্ষ্যে বিভিন্ন অজুহাত তুলে বিরোধী দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করার কৌশল গ্রহণ করছে সরকার। ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বিএনপি জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর অধিকাংশ দলীয় কার্যালয়। সংবিধানের ৩৭ নং অনুচ্ছেদে জনগণকে সভা-সমাবেশ করার অধিকার প্রদান করা হলেও বিগত ছয় বছরে বর্তমান সরকার বিরোধী দলকে বিশেষ করে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে কোথাও শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ এমনকি মানববন্ধনের মত কর্মসূচিও পালন করতে দেয়া হয়নি। অধিকন্তু আভ্যন্তরীণ কুরআন তালিম বা কর্মী সভাগুলোকে গোপন বৈঠক নাম দিয়ে নির্বিচারে নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। এ থেকে সহজেই প্রমাণিত হয় বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন শুধু বিপন্নই নয় বরং সমাহিত।
মানবাধিকার পরিস্থিতি
বাংলাদেশের মানববাধিকার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক। একজন মানুষ, মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার কারণে যে অধিকার পেয়ে থাকে তাই মানবাধিকার। ১৯৪৮ সালে ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত বিশ্বজনীন মানবাধিকার সনদে যে ত্রিশটি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হচ্ছে জীবন ধারণ করার অধিকার। সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের তৃতীয় এবং বাংলাদেশ সংবিধান ৩২ নং অনুচ্ছেদে এই অধিকার সুরক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে এই জীবন ধারণ করার অধিকারটি সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ মানুষের (যারা মন্ত্রী এমপি হয়ে নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে আছেন তারা ছাড়া) জীবন আজ হুমকির সম্মুখীন। কেউ জানে না কখন কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার সম্মুখীন হবেন কিংবা দগ্ধ হবেন পেট্রলবোমার আঘাতে। ঘরে কিংবা ঘরের বাইরে সবাই আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অপমৃত্যুর ঘটনা দেখতে আর শুনতে শুনতে সবাই যেন আজ বেঁচে থাকার অধিকারের পরিবর্তে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারাান্টি চাইছে। গত ২৫ দিনের (৩০ জানুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত) সরকার বিরোধী আন্দোলনে মৃত্যুবরণ করেছে ৪২ জন। যাদের মধ্যে ২১ জন মারা গেছে পেট্রলবোমা বা আগুনে পুড়ে। ১০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন দ্বিপক্ষীয় সংঘর্ষে এবং ১১ জন মৃত্যুবরণ করেছে আইশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি ও নিষ্ঠুর নির্যাতনে। (সূত্র : প্রথম আলো : ৩১ জানুয়ারি ২০১৫)
রাষ্ট্রীয় সীমার মধ্যে চলাফেরা ও বসবাস করা প্রত্যেক নাগরিকেরই মৌলিক মানবাধিকার। টউঐজ ও বাংলাদেশ সংবিধানের যথাক্রমে ১৩(১) ও ৩৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে আমরা এই অধিকার লাভ করেছি। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে অধিকাংশ নাগরিক বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত। গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশে ও বিদেশে সকল সচেতন মানুষ দেখতে পেয়েছে, গত ৩রা জানুয়ারি রাত থেকে ২১ জানুয়ারি রাত পর্যন্ত বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক জোট ও ২০ দলীয় জোটের প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ১১টি বালুর ট্রাক, জলকামান ও শত শত পুলিশ র‌্যাব দিয়ে কিভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। সর্বশেষ ৩১ জানুয়ারি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় তার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, ডিশ, ক্যাবল নেটওয়ার্ক, এমনকি মোবাইল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। গণতন্ত্র তথা জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাস্তায় আন্দোলনরত জনতাকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যকে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা যেন সরকারের রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। আন্দোলন দমনের জন্য সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও  নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে গণগ্রেফতার, জনগণের ঘরবাড়ি ভাঙচুর, নারী-শিশুদের নির্যাতন ও লুটতরাজ করেছে সরকার। ফলে হাজার হাজার লোককে প্রাণ ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় যা একাত্তরের পাক হানাদারদের ভয়ে সাধারণ জনগণের ঘর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্যতম মূল ভিত্তি হচ্ছে আইনের শাসন। জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের ৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- কাউকে নিষ্ঠুর নির্যাতন অথবা অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না। আরো বলা হয়েছে- আইনের সামনে প্রত্যেকই সমান এবং ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলেই আইনের আশ্রয় সমানভাবে লাভ করবে। ৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে বিশেষ আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে আর ৯ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কাউকে খেয়াল খুশি মতো গ্রেফতার বা অন্তরীণ করে রাখা যাবে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৫ নং ধারা মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের উপরোক্ত ধারাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। এগুলোকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সকল নেতা-নেত্রী ও মন্ত্রী এমপিরা আইনের শাসন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমানে দেশে আইনের শাসন বলতে কিছুই নেই। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা সংসদের হাতে আনার মাধ্যমে মূলত প্রধানমন্ত্রীর একক নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে বিচার বিভাগকে। দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ ও পদোন্নতির কারণে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া নি¤œ আদালতে জামিন ও রিমান্ড শুনানির ক্ষেত্রে সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে আইনের বাধ্যবাধকতা মানছে না পুলিশ-প্রশাসন। সরকারের নির্দেশে সারাদেশে চলছে নির্বিচারে গণগ্রেফতার। প্রথম আলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫ জানুয়ারি ২০১৫ সালে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে প্রায় ১২ হাজার বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাস দমনের নামে এদের গ্রেফতার করা হয়। গত ১২ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জনসভা থেকে ৪ জনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হলেও সরকারদলীয় পরিচয়ের কারণে পরবর্তীতে শাহবাগ থানা থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন পত্রিকার ছবিতে দেখা যায় যে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হচ্ছে ছাত্রলীগ যুবলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডাররা। অথচ এ ব্যাপারে প্রশাসন নির্বিকার।
নিরপেক্ষ আদালতে বিচার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক মানবধিকার হলেও বর্তমানে আমরা দেখেত পাচ্ছি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসামি গ্রেফতার করে কোর্টে হাজির না করে তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানের কথা বলে ক্রসফায়ারের নামে ঠান্ডা মাথায় খুন করছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কির প্রখ্যাত উক্তি ‘রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন তা বুঝা যায় রাষ্ট্রের কর্মচারীরা কেমন তার ওপর’। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে এখন অগণতান্ত্রিক বর্বর দমন-পীড়ন, হত্যা, গুম, খুন ও যৌথ বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে তা বিগত কয়েক দিনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মকান্ড থেকে বুঝা যাচ্ছে।
গত ১৫ জানুয়ারি বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল মো: আবদুল আজীজ সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা করলেন যে, বিজিবি যদি দেখে কেউ তাদের ওপর আক্রমণ করছে অথবা অন্য কাউকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা আছে তবে তারা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করবে। যা প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তার এই প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিও হত্যা হতে পারেন বলে মানবাধিকার সংগঠগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে।
তার একদিন পর অর্থাৎ ১৬ জানুয়ারি মিঠাপুকুরে এক শান্তি সমাবেশে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল হক ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ একই ধরনের উস্কানিমূলক ও রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি উক্ত সমাবেশে র‌্যাবের প্রধান বেনজীর আহমেদ ঘোষণা করেন, ‘২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না’। আর পুলিশপ্রধান এ কে এম শহিদুল হক বলেন, ‘বিরোধী দলের এটি কোন আন্দোলন নয় বরং সন্ত্রাসী কর্মকান্ড’। সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী প্রকাশ্য সমাবেশে ঘোষণা করেন, ‘এখন আর আদালতের প্রয়োজন নেই। ধরে ধরে পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসী ও অবরোধবকারীদের শাস্তি দেয়া হবে, ংযড়ড়ঃ ধহফ ংরঃব করা হবে’।
এরই বাস্তবায়ন দেখা যায় পরবর্তী সময়ে ১১ জানুয়ারি নড়াইলের নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার জামায়াত নেতা ইমরুল কায়েসকে ডিবি পরিচয়ে ঢাকার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তুলে নিয়ে এজিবি কলোনিতে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। তার শরীরে ১৯টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। ১২ জানুয়ারি ২০১৫ খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জনিকে গুলি করে হত্যা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২৪ জানুয়ারি রামপুরায় ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয় আরো ২ জনকে। র‌্যাবের নৃশংস হত্যাকান্ডের সর্বশেষ শিকার হন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রশিবির কর্মী মো: আসাদুল্লাহ তুহিন। গত ২৬ জানুয়ারি সোমবার রাতে মা-বাবার সাথে খাবার খাওয়ার সময় র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং রাতেই তাকে হত্যা করে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতলে রেখে যায়। সকালে মেডিক্যাল থেকে ফোন করে তার বাবা-মাকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। এ থেকেই প্রমাণ হয় সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবৈধভাবে দলীয় সন্ত্রাসীদের মতো ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ, গুম ও নির্বিচারে গণগ্রেফতার চালিয়ে সংবিধান ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।

সম্ভাব্য পরিণতি
বাংলাদেশের বর্তমান চলমান সঙ্কটের মূলে রয়েছে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও ৫ জানুয়ারির তথাকথিত ভোটার ও প্রার্থীবিহীন নির্বাচন। একে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালে নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সহিংসতা এবং ৪ জানুয়ারি ২০১৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক লোক মৃত্যু বরণ করেছে। গুম অপহরণ ও বিনা বিচারে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে আরো অনেক মানুষ। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিনা বিচারে হত্যা ও গণগ্রেফতার, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন সহিংস পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাংলাদেশ এক সময় রুয়ান্ডা, হাইতি, কম্বোডিয়া ও সিয়েরালিওনের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। জড়িয়ে পড়তে পারে সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, লিবিয়া ও ইরাকের মতো ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে। হতে পারে সিকিম, ক্রিমিয়ার মত আধিপত্যবাদীদের আগ্রাসনের শিকার। গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র বা সামরিক শাসনের যাঁতাকল জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে পারে চিরতরে।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হতে পারে দল, মত ও ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে সকল রাজনৈতিক দল ও শ্রেণীপেশার মানুষকে নিয়ে একটি কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ করা। দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা করা সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের। পাশাপাশি দেশ জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সকল ভেদাভেদ ভুলে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় ঐক্য। আর কেবল তখনই অসংখ্য শহীদের রক্তের অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম ও অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে এবং ১৬ কোটি মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল লাভ করবে।
লেখক : কেন্দ্রীয় মানবাধিকার সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply