বিবর্তনবাদ -মূল : হারুন ইয়াহিয়া অনুবাদ : অধ্যাপক খোন্দকার রোকনুজ্জামান

[গত সংখ্যার পর]

বিবর্তনবাদীরা যদি দেখাতেই চান যে, এক প্রজাতি আরেকটিতে রূপান্তরিত হয়েছে, তাহলে ভূপৃষ্ঠে জীবের ধাপে ধাপে আগমন প্রদর্শন করায় কোনো লাভ নেই। তাদেরকে প্রমাণ হিসেবে মধ্যবর্তী পর্যায়ের প্রাণীর জীবাশ্ম নিয়ে আসতে হবে যারা ছিল এসব প্রজাতির মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী। অমেরুদন্ডী থেকে মাছ, মাছ থেকে সরীসৃপ, সরীসৃপ থেকে পাখি এবং স্তন্যপায়ীতে রূপান্তরের এই মতবাদকে প্রমাণের জন্য জীবাশ্ম খুঁজে পেতে হবে। ডারউইন মেনে নিয়েছিলেন এবং লিখে গিয়েছিলেন যে, এসবের অসংখ্য নমুনা খুঁজে পাওয়া প্রয়োজন। অথচ এযাবৎ এমন একটাও পাওয়া যায়নি। ডারউইনের পরে ১৫০ বছর অতিক্রান্ত হলো, কিন্তু কোনো মধ্যবর্তী পর্যায়ের প্রাণী আবিষ্কৃত হলো না। যেমনটি বিবর্তনবাদী জীবাশ্মবিজ্ঞানী ডেরেক ডব্লিউ এগার স্বীকার করেছেন, জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে, “ক্রমান্বয়ে ঘটা বিবর্তন নয়, বরং একদল প্রাণীর বিলুপ্তির পর আরেক দলের আকস্মিক আবির্ভাব।”
(Ager.1976.Vol.87.p-133)
পরিশেষে বলতে হয়, প্রাকৃতিক ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারছি, প্রাণের উদ্ভব আকস্মিকভাবে ঘটেনি, বরং তাদেরকে ধাপে ধাপে সৃষ্টি করা হয়েছে সুদীর্ঘ সময়কালব্যাপী। এটা কুরআনে বর্ণিত সৃষ্টি সম্পর্কিত তথ্যের সাথে একেবারেই মিলে যায়। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, তিনি মহাজগৎ এবং সমুদয় প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন ‘ছয় দিনে’।
“তিনিই আল্লাহ যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান, জমিন এবং এদের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো বন্ধু এবং সাহায্যকারী নেই। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” (৩২:৪) আয়াতে উল্লিখিত ‘দিন’ (আরবিতে ‘ইয়াউম’)-এর অর্থ সুদীর্ঘ সময়-কালও হয়। অন্য কথায় বলতে গেলে, কুরআন উল্লেখ করছে যে, সমগ্র প্রকৃতি সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন সময়কালে, একবারে নয়। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক আবিষ্কারসমূহ এমন এক চিত্র অঙ্কন করে, যা এই দাবিকে নিশ্চিত করে।

১৪.    বিবর্তনবাদ প্রত্যাখ্যান করাকে কেন উন্নয়ন ও প্রগতিকে প্রত্যাখ্যান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়?
সাম্প্রতিক কালে ‘বিবর্তন’ শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, শব্দটি সামাজিক দিকের সাথে যুক্ত করা হয়েছে এবং মানবীয় প্রগতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন  বোঝাচ্ছে। ‘বিবর্তন’ শব্দটি এই অর্থে ব্যবহৃত হওয়াতে কোনো সমস্যা নেই। কোনো সন্দেহ নেই, মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান ও শক্তিকে কাজে লাগাবে সময়ের সাথে সাথে উন্নতি করার জন্য। মানুষের জ্ঞানভান্ডার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বৃদ্ধি পাবে। তবে এটা বিবর্তনবাদের কোনো প্রমাণ নয়; বিবর্তনের দাবি তো আকস্মিকতার ফলস্বরূপ প্রাণের উদ্ভব।
সভ্যতার বিকাশ সৃষ্টি তত্ত্বের সাথে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়। তথাপি বিবর্তনবাদীরা এখানে সহজ এক শব্দ-খেলায় মেতেছেন এবং মিথ্যা ধারণার সাহায্যে সত্যকে বিভ্রান্ত করছেন। উদাহরণ স্বরূপ, এটা বললে সত্য বলা হবে যে, সুদীর্ঘকাল সামাজিক জীবন যাপনের কারণে মানুষের জ্ঞান, কৃষ্টি এবং প্রযুক্তি অবিরাম বিকাশ লাভ করছে (আমাদের এটা ভুললে চলবে না যে, অগ্রগতির মতো কখনো কখনো পশ্চাৎগতিও ঘটে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, কোনো কোনো কালে অগ্রগতি হয়, কখনো অপরিবর্তিত থাকে, আবার কখনো অধোগতি হয়)। যাহোক, “মানুষের যেভাবে উন্নয়ন এবং অগ্রগতি হয়েছে, সেভাবে প্রজাতিসমূহের অগ্রগতি ও পরিবর্তন ঘটেছে সময়ের পরিক্রমায়Ñ এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি। চিন্তাশীল প্রাণী হিসেবে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়েছে, পরবর্তী প্রজন্মসমূহে বাহিত হয়েছে এবং অবিরাম অগ্রগতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছেÑ এটা বলা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত এবং বিজ্ঞানসম্মত। তবে এটা চরম অর্থহীন দাবি যে, প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ আকস্মিক ও কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে অনিয়ন্ত্রিত এবং অসচেতন প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে।
বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সম্পৃক্ত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের সকলেই ছিলেন পরিকল্পিত সৃষ্টিবাদী বিবর্তনবাদীরা যতই নিজেদেরকে মননশীলতা ও প্রগতিশীলতার সাথে একাত্ম করতে চান, ইতিহাস তাদেরকে দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃত উদ্ভাবক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গ সবসময় বিশ্বাসী বিজ্ঞানী ছিলেন; তাঁরা ¯্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্টিতে বিশ্বাস করতেন।
বিজ্ঞানের অগ্রগতির প্রতিটি বাঁকে আমরা এরকম বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করি। জ্যোতির্বিজ্ঞানে নবযুগের সূচনাকারী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, কোপার্নিকাস, কেপলার এবং গ্যালিলিও, জীবাশ্ম-বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা কুভিয়ার, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসকারী লিনিয়াস, মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের আবিষ্কারক আইজ্যাক নিউটন, ছায়াপথের অস্তিত্ব ও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আবিষ্কারক এডউইন হাবলÑ তাঁরাসহ আরো অনেক বিজ্ঞানী আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা এটাও বিশ্বাস করতেন যে, জীবজগৎ ও মহাবিশ্ব তাঁরই সৃষ্টি।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেন : “সেই গভীর বিশ্বাসবর্জিত সত্যিকারের বিজ্ঞানীর কথা আমি কল্পনা করতে পারি না। অবস্থাটা বর্ণনা করা যেতে পারে একটা কথাচিত্রের সাহায্যে : ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান হলো খোঁড়া …।” Science, Philosophy and Religion. 1941)
জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক, যিনি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, তিনি বলেন: “যে কেউ যে কোন বৈজ্ঞানিক কাজ গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন, তিনি উপলব্ধি করেন, বিজ্ঞান-মন্দিরের তোরণ থেকে প্রবেশদ্বার পর্যন্ত এই কথাগুলো লিখিত আছে: ‘তোমাকে অবশ্যই বিশ্বাস পোষণ করতে হবে।’ এটি এমন এক গুণ, যা কোন বিজ্ঞানী পরিত্যাগ করতে পারেন না।” (Max Plank. 1933. p-214)
বিজ্ঞানের ইতিহাস প্রকাশ করছে যে, পরিবর্তন ও প্রগতি হলো সৃষ্টিবাদী বিজ্ঞানীদের অবদান। পক্ষান্তরে, অবশ্যই, বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি বিশেষভাবে আমাদেরকে পরিকল্পিত সৃষ্টির অসংখ্য প্রমাণের সম্মুখীন হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদেরকে এই বাস্তবতা আবিষ্কার করার সুযোগ দিয়েছে যে, মহাবিশ্ব শূন্য থেকে অস্তিত্ব লাভ করেছে, অন্য কথায় এটাকে ‘সৃষ্টি করা হয়েছে’। এটি এমন এক বাস্তবতা, যা সমগ্র বিজ্ঞানজগৎ স্বীকার করে নিয়েছে: একক বিন্দুর বিস্ফোরণে মহাবিশ্ব অস্তিত্ব লাভ করেছে এবং ক্রমোন্নতি পাচ্ছে। এভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রাচীন বৈজ্ঞানিক পরিবেশের বস্তুবাদীরা বিশ্বাস করত যে, অসীম বিশ্বের কোন শুরু বা শেষ নেই। তাদের এই বিশ্বাস নির্মূল হয়ে গেছে। এটি উপলব্ধিতে আসে যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা হয়েছিল, যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছে। এর শেষ সীমা রয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হচ্ছে। আল কুরআনে এই সত্যটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
“অবিশ্বাসীরা কি লক্ষ্য করে না যে, আসমান ও জমিন একত্র ছিল; আমি এদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি এবং পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত জিনিস সৃষ্টি করেছি? তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না? (কুরআন-২১:৩০)
“মহাবিশ্বকে আমি আপন ক্ষমতাবলে সৃষ্টি করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি একে সম্প্রসারিত করছি।” (কুরআন-৫১:৪৭)
বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আমাদেরকে প্রাণের পরিকল্পনা সম্পর্কে আরো বেশি প্রমাণ আবিষ্কার করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র প্রাণের ক্ষুদ্রতম একক কোষ ও এর গঠন-উপাদানের কাঠামো প্রকাশ করে দিয়েছে। ডিএনএ আবিষ্কার দেখিয়ে দিয়েছে, কোষের মধ্যে কী অসীম বুদ্ধিমত্তার ছাপ রয়েছে। জৈব-রাসায়নিক এবং শারীরতত্ত্বের অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে দেহের আণবিক পর্যায়ের ত্রুটিহীন কার্যকলাপ এবং এর অতুলনীয় নকশা; এটা সৃষ্টি ছাড়া অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এসব কিছুর বিপরীতে, ১৫০ বছরের আদিম বিজ্ঞান বিবর্তনবাদ নামক মতবাদ গড়ে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।
শেষ কথা হলো, যাঁরা সৃষ্টিতে বিশ্বাস করেন এবং অবিরাম এর স্বপক্ষে নিত্য-নতুন প্রমাণ পেশ করেন, তাঁদেরকে উন্নয়ন, প্রগতি ও বিজ্ঞানবিরোধী মনে করাটা অসম্ভব। বরং এঁরাই হলেন বিজ্ঞান ও প্রগতির বড় সমর্থক। তারাই প্রগতির প্রকৃত বিরোধী, যারা এসব বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বিবর্তনবাদ সমর্থন করে, যা অবাস্তব কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।

১৫.    এই ভাবনা কেন ভ্রান্ত যে, ¯্রষ্টা জীবের সৃষ্টি করে থাকতে পারেন বিবর্তনের মাধ্যমে?
এটা যখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, জীব ও জড় বস্তুতে চমৎকার নকশা প্রকৃতি ও আকস্মিকতার অন্ধশক্তি দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে না, তখন কিছু লোক স্রষ্টাকে মেনে নেয়। কিন্তু তারা মনে করে, তিনি প্রাণের সৃষ্টি করেছেন বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ায়। এটা স্পষ্ট যে, সর্বশক্তিমান ¯্রষ্টা সমগ্র মহাবিশ্ব এবং প্রাণ সৃষ্টি করেছেন। এটি তাঁর সিদ্ধান্ত, সৃষ্টি তাৎক্ষণিক হবে না কি ধাপে ধাপে হবে। এটি কিভাবে ঘটেছিল তা আমরা বুঝতে পারি কেবল তাঁর প্রদত্ত তথ্যের মাধ্যমে (অন্য কথায়, কুরআনের বাণী থেকে) এবং প্রকৃতিতে প্রকট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে। যখন আমরা এই দুই উৎসের দিকে লক্ষ্য করি, তখন আমরা ‘বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি’-এর কোনো নমুনা দেখতে পাই না।
আল্লাহর অবতীর্ণ কুরআনের অনেক আয়াতে মানুষ, প্রাণ এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এসব আয়াতের কোনোটিই বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি সম্পর্কে কিছু বলেনি। অন্য কথায়, একটি আয়াতেও উল্লেখ নেই যে, একটি জীবের বিবর্তনে আরেকটি অস্তিত্ব লাভ করেছে। পক্ষান্তরে, এসব আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাণ ও মহাবিশ্বের অস্তিত্ব লাভ হয়েছে আল্লাহর নির্দেশ ‘হও’ থেকে।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার থেকেও প্রকাশ পাচ্ছে যে, ‘বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি’ প্রশ্নাতীত। জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছে একটি থেকে আরেকটি বিবর্তিত হয়ে নয়, বরং স্বাধীনভাবে, আকস্মিকভাবে এবং তাদের সমস্ত স্বতন্ত্র কাঠামো সহকারে। অন্য কথায়, প্রত্যেক প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে পৃথক পৃথকভাবে। যদি ‘বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি’ জাতীয় কিছু থাকত, তাহলে আমরা আজ তার প্রমাণ দেখতে পেতাম। আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এক বিশেষ শৃঙ্খলায়, কার্যকারণ এবং নিয়মের কাঠামোর মধ্যে। উদাহরণস্বরূপ, সন্দেহাতীতভাবে আল্লাহ জাহাজকে পানিতে ভাসমান করেছেন। তবে আমরা যখন এর কারণ অনুসন্ধান করি, তখন দেখি, এর পেছনে রয়েছে পানির প্লবতা শক্তি। পাখির উড্ডয়ন আল্লাহর দেয়া শক্তি ছাড়া কিছু নয়। আসলে, যখন আমরা পরীক্ষা করি এটা কিভাবে ঘটে, তখন আমরা উড্ডয়ন-গতিবিদ্যার সূত্র খুঁজে পাই। এই কারণে, যদি প্রাণের সৃষ্টি ধাপে ধাপে হতো, তাহলে নিশ্চয় তার কোনো পদ্ধতি থাকত; সেটার ব্যাখ্যা বংশগতি বিদ্যার উন্নতিতে পাওয়া যেত। তা ছাড়া, পদার্থগত, রাসায়নিক ও জৈবিক সূত্রও জানা যেত। গবেষণাগারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে প্রমাণ হিসেবে দেখানো যেত যে, জীবের এক প্রজাতি অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হতে পারে। আবার কোনো প্রজাতির যে এনজাইম, হরমোন বা অনুরূপ অণু নেই, তার সুবিধার্থে তা প্রয়োগ করা সম্ভব হতো (এসব উপাদান উৎপাদনের গবেষণাকে ধন্যবাদ)। এ ছাড়া, নতুন অঙ্গ ও কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হতো যা আলোচ্য জীবদেহে আগে ছিল না।
বিজ্ঞানাগারে গবেষণা এমন প্রাণীর নজির পেশ করতে সক্ষম হতো, যারা এই প্রক্রিয়া দ্বারা রূপান্তরিত হয়েছে কিংবা সত্যিকারার্থে উপকৃত হয়েছে। আমরা এটাও দেখতে পেতাম যে, এসব রূপান্তর পরবর্তী প্রজন্মে বাহিত হয়েছে এবং সেই প্রজাতির স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। আবার মধ্যবর্তী পর্যায়ের লক্ষ লক্ষ জীবাশ্ম পাওয়া যেত যারা অতীতে জীবিত ছিল, আর আমাদের সময়-কালেও অনেক জীব দেখা যেত যারা এখনো তাদের রূপান্তরপ্রক্রিয়া শেষ করেনি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই প্রক্রিয়ার অসংখ্য নমুনা পাওয়া যেত।
যাহোক, এক প্রজাতি রূপান্তরিত হয়ে অন্য প্রজাতি আবির্ভাবের একটি প্রমাণও পাওয়া যায়নি। আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি, জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে, কোনো পূর্বপুরুষ ছাড়াই প্রজাতির উদ্ভব আকস্মিকভাবে ঘটেছে। এই বাস্তবতা যেভাবে বিবর্তনবাদকে ধ্বংস করে দিচ্ছে (যার দাবি হলো, প্রাণের উদ্ভব দুর্ঘটনাবশত হয়েছে), ঠিক তেমনিভাবে বৈজ্ঞানিক পন্থায় এই ধারণাকেও বাতিল কওে দিচ্ছে যে, আল্লাহ প্রাণের সৃষ্টি করেন, তারপর এটা ধাপে ধাপে বিবর্তিত হয়।
আল্লাহ জীব সৃষ্টি করেছেন অতিপ্রাকৃতিক উপায়ে, একটি মাত্র আদেশ ‘হও’ বলে। আধুনিক বিজ্ঞান এই ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, প্রাণের আবির্ভাব পৃথিবীতে হঠাৎ করে হয়েছে।
যারা এই ধারণা সমর্থন করেন যে, ‘আল্লাহ জীবের সৃষ্টি করেছেন বিবর্তন প্রক্রিয়ায়’, তারা আসলে সৃষ্টিবাদ ও বিবর্তনবাদের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে চান। যাহোক, তারা এক  মৌলিক ভুল করে বসেন। তারা ডারউইনবাদের মৌলিক যুক্তি এবং কোন্ ধরনের দর্শনের এটা আনুকূল্য করে, তা বুঝে উঠতে পারেন না। ডারউইনবাদ প্রজাতির রূপান্তরের ধারণা দেয় না। এটা আসলে শুধু বস্তুগত কারণের সাহায্যে প্রজাতির উৎপত্তিকে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, এই মতবাদ বিজ্ঞানের প্রলেপ দেয়ার মাধ্যমে এই দাবিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায় যে, জীব হলো প্রকৃতির সৃষ্টি। এই প্রকৃতি-দর্শন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের মধ্যে কোনো সাধারণ ক্ষেত্র থাকতে পারে না। এরকম সাধারণ ক্ষেত্র খুঁজতে যাওয়া এক বিরাট ভুল। এর অর্থ ডারউইনবাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়া এবং এই মিথ্যা দাবির সাথে একমত পোষণ করা যে, এটা এক বৈজ্ঞানিক মতবাদ। ১৫০ বছরের ইতিহাস যেমনটি দেখাচ্ছে, ডারউইনবাদ হলো বস্তুবাদী দর্শন ও নাস্তিকতার মেরুদন্ড। কোন সাধারণ ক্ষেত্রের সন্ধানই কখনো এই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে পারবে না।

১৬.    এটা চিন্তা করা কেন সঠিক নয় যে, ভবিষ্যতে বিবর্তনবাদের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যাবে?
কোণঠাসা হওয়ার পর বিবর্তনবাদের কিছু সমর্থক এই অজুহাত অবলম্বন করেন যে, আজ যদিও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বিবর্তনবাদকে নিশ্চিত করছে না, তবুও ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের অগ্রগতি এটা নিশ্চিত করবে। এখানে শুরুতেই যে মৌলিক বিষয়, সেটা হলো, বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বিবর্তনবাদীদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়া। অব্যক্ত অর্থ উপলব্ধি করে বিষয়টিকে আমরা এভাবে ভাষা দিতে পারি : “হ্যাঁ, আমরা বিবর্তনবাদের সমর্থকরা স্বীকার করছি যে, আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার আমাদেরকে সমর্থন করে না। এই কারণে আমরা বিষয়টিকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।” তবে বিজ্ঞান এরকম যুক্তি মেনে কাজ করে না। একজন বিজ্ঞানী শুরুতেই কোনো মতবাদের প্রতি এই আশা নিয়ে আত্মনিবেদন করেন না যে, কোন একদিন এই মতবাদের প্রমাণ পাওয়া যাবে। বিজ্ঞান প্রাপ্ত প্রমাণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে এবং এটা থেকে উপসংহার টানে। এই কারণে বিজ্ঞানীদের উচিত পরিকল্পনা বা সৃষ্টিবাদকে মেনে নেয়া যা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার দ্বারা প্রমাণিত। যাহোক, এটা সত্ত্বেও বিবর্তনবাদী উদ্ধৃতি ও প্রচারণা এখনো মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে তাদেরকে যারা এই মতবাদের ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকিফহাল নয়। এই কারণে, জবাবটা পূর্ণাঙ্গভাবে দিলে কাজে লাগবে: আমরা তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সাহায্যে বিবর্তনবাদের গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে পারি:
১.    কিভাবে প্রথম জীবন্ত কোষের উদ্ভব হলো?
২.    কিভাবে জীবের এক প্রজাতি অন্যটায় রূপান্তরিত হলো?
৩.    জীবের ক্ষেত্রে এ-ধরনের প্রক্রিয়া ঘটেছিল- এমন প্রমাণ জীবাশ্ম রেকর্ডে আছে কি?
এই তিনটি প্রশ্নের ওপর (যার উত্তর এই মতবাদকে দিতে হবে) বিংশ শতাব্দীতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় যা প্রকাশ পেয়েছে তা হলো, বিবর্তনবাদ প্রাণের উদ্ভবের কারণ দর্শাতে পারে না। আমরা যখন এই প্রশ্নগুলো একে একে মূল্যায়ন করব, তখন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
[চলবে]

SHARE