বিবর্তনবাদ -মূল : হারুন ইয়াহিয়া অনুবাদ : অধ্যাপক খোন্দকার রোকনুজ্জামান

[গত সংখ্যার পর]

এক. বিবর্তনবাদের সমর্থকদের জন্য আদিকোষ এর প্রশ্ন হলো সবচেয়ে মারাত্মক উভয়সঙ্কট। এই বিষয়ের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ‘আকস্মিকতা’-এর ধারণা দিয়ে আদিকোষের উদ্ভব ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ফ্রেড হোয়েল বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : “এভাবে প্রাণের উদ্ভবকে তুলনা করা যেতে পারে পরিত্যক্ত যানবাহন-ক্ষেত্রের ওপর দিয়ে টর্নেডো বয়ে যাবার ফলে উপকরণগুলোর সমন্বয়ে বোয়িং ৭৪৭ তৈরি হওয়ার মতো আকস্মিক ঘটনার সাথে।” (Nature.Vol.294.1981.p-105)
আসুন একটি উদাহরণের সাহায্যে দেখি, বিবর্তনবাদীরা কত পরস্পর বিরোধিতায় জড়িত। উইলিয়াম প্যালের বিখ্যাত উদাহরণটির কথা স্মরণ করুন। একজন ব্যক্তি জীবনে কোনো দিন ঘড়ি দেখেনি। এক নির্জন দ্বীপে সে একদিন একটি ঘড়ি পেয়ে গেল। ১০০ মিটার দূর থেকে দেয়াল ঘড়িটা দেখে সে বুঝতে পারে না এটা কী। সে এটাকে অন্যান্য প্রাকৃতিক বস্তু থেকে আলাদা করতে পাওে না। তবু, যখন সেই ব্যক্তি আরো নিকটে যায়, তখন ওটা দেখেই বুঝতে পারে, এটি এক পরিকল্পনার ফসল। আরো নিকট থেকে দেখে এ-ব্যাপারে তার মোটেই কোনো সন্দেহ থাকে না। পরের ধাপ হতে পারে বস্তুটার বৈশিষ্ট্য এবং এতে যে শৈল্পিকতা ফুটে উঠেছে তা পরীক্ষা করে দেখা। যখন সে এটা খুলে ফেলে এবং এর খুঁটিনাটি দেখতে থাকে, তখন সে বুঝতে পারে যে, বাহ্যিক কাঠামোর তুলনায় এর মধ্যে অনেক কিছু জানার আছে এবং এটি বুদ্ধিমত্তার ফসল। পরবর্তী প্রত্যেক পরীক্ষা সেই বিশ্লেষণকে আরো বেশি নিশ্চিত করে দেয়।
বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কিত সত্য এই রকমই এক অবস্থা। বিজ্ঞানের অগ্রগতি জীবের অঙ্গ-তন্ত্র, কোষ-কলা এমনকি আণবিক পর্যায়ের নিখুঁত কাঠামো উদ্ঘাটন করেছে। আমাদের প্রাপ্ত প্রতিটি নতুন তথ্য এই পরিকল্পনার বিস্ময়কর মাত্রাকে আরো স্পষ্ট করে দিতে সাহায্য করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিবর্তনবাদীরা, যারা কোষকে মনে করতেন অতি ক্ষুদ্র কার্বনের টুকরা, তারা সেই ব্যক্তির মত ছিলেন, যে ১০০ মিটার দূর থেকে দেয়াল ঘড়িটা দেখেছে। যাহোক, আজকের দিনে এমন একজন বিজ্ঞানী পাওয়া অসম্ভব যিনি স্বীকার করেন না যে, কোষের প্রতিটি অংশ চমৎকার শিল্পকর্ম এবং স্বতন্ত্র পরিকল্পনা। এমনকি একটি ক্ষুদ্র কোষের পর্দাও, যাকে বাছাইকারী ফিল্টার বলে বর্ণনা করা হয়, তাতেও রয়েছে বিপুল বুদ্ধিমত্তা ও পরিকল্পনা। এটি চারিদিকে অণু-পরমাণু এবং প্রোটিনকে চিনতে পারে যেন এর নিজস্ব সচেতনতা রয়েছে। এরা কেবল সেসব জিনিসকেই কোষের মধ্যে প্রবেশ করতে দেয় যা প্রয়োজনীয় (আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন হারুন ইয়াহিয়ার Consciousness in the Cell গ্রন্থটি)। ঘড়ির সামান্য বুদ্ধিমান পরিকল্পনার তুলনায় জীবদেহগুলোর রয়েছে স্তম্ভিত করার মতো বুদ্ধিমত্তা ও পরিকল্পনার দক্ষতা। বিবর্তনবাদকে প্রমাণ করা দূরে থাক, জীবদেহের গঠন নিয়ে পরিচালিত সূক্ষ্ম গবেষণার ক্রমবর্ধমান ক্ষেত্র, যার অল্প কিছু এযাবৎ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো আমাদেরকে পরিকল্পিত সৃষ্টি বুঝতে আরো বেশি সাহায্য করে।

দুই. বিবর্তনবাদীরা বিশ্বাস করেন যে, এক প্রজাতি অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয় মিউটেশন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। এই বিষয়ের ওপর যত গবেষণা পরিচালিত হয়েছে তা থেকে দেখা যায় যে, দুই পদ্ধতির কোনটারই বিবর্তনমূলক প্রভাব নেই। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্টোরি জাদুঘরের প্রবীণ জীবাশ্মবিদ কলিন প্যাটারসন এই বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে বলেছেন :“কেউ কখনো প্রাকৃতিক নির্বাচনপদ্ধতির সাহায্যে কোন প্রজাতি তৈরি করতে পারেনি। কেউ কখনো এর কাছাকাছিও যেতে পারেনি। নব্য-ডারউইনবাদের অধিকাংশ আধুনিক যুক্তিতর্ক এই প্রশ্ন নিয়েই।” (Patterson.1982)
মিউটেশনের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, এর কোনো বিবর্তনমূলক বৈশিষ্ট্য নেই। আমেরিকান বংশগতি বিজ্ঞানী বি জি রাঙ্গানাথান বলেন: “প্রথমত, প্রকৃত মিউটেশন প্রকৃতিতে খুবই দুর্লভ। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ মিউটেশনই হলো ক্ষতিকর। কারণ, জিনের গঠন-কাঠামোতে এটা সুশৃঙ্খল পরিবর্তনের পরিবর্তে এলোপাতাড়ি পরিবর্তন ঘটায়। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় এলোপাতাড়ি পরিবর্তন ঘটলে তার ফল ভালো নয়, বরং মন্দ হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভূমিকম্প যদি অত্যন্ত সুন্দর কাঠামোর ভবনে ঝাঁকুনি দেয়, তাহলে ভবনটির কাঠামোতে এলোপাতাড়ি অবস্থা সৃষ্টি হবে। এতে ভবনটির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে না।” (Rangonathan.1988)
আমরা দেখলাম, প্রজাতির উদ্ভবের জন্য বিবর্তনবাদ যে পদ্ধতির ধারণা দেয়, তা সম্পূর্ণ অকার্যকর। আসলে এটা ক্ষতিকর। এটা বোঝা যাচ্ছে, যেসব পদ্ধতির উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর সম্ভাব্যতা উপলব্ধির জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ততটা অগ্রগতি তখনো হয়নি। এই দাফব অতিকল্পনা ছাড়া কিছু নয়। এর কোন উন্নয়নমূলক বা বিবর্তনমূলক প্রভাব নেই।

তিন. জীবাশ্ম থেকে এটাও দেখা যায় যে, প্রাণের উদ্ভব কোনো বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ার ফলে হয়নি। বরং এটা ঘটেছে সহসা নিখুঁত ‘পরিকল্পনার’ ফসল হিসেবে। যেসব জীবাশ্ম এযাবৎকাল আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো এটাই নিশ্চিত করে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত জীবাশ্মবিজ্ঞানী এবং আমেরিকার নেচারাল হিস্টোরি জাদুঘরের কিউরেটর নিলস অ্যালড্রেজ ব্যাখ্যা করেন যে, ভবিষ্যতে আবিষ্কৃত হবে এমন কোন জীবাশ্ম এই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারবেÑ তার কোনো সম্ভাবনা নেই। “(জীবাশ্ম) রেকর্ডগুলোর মধ্যে লাফিয়ে চলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এবং সকল প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রেকর্ডগুলোতে শূন্যতা রয়েছে। এটা জীবের ইতিহাসের বাস্তব ঘটনাসমূহ প্রতিফলিত করেÑ দুর্বল জীবাশ্ম রেকর্ডের কৃত্রিমতা নয়।” (Eldredge & Tattersall. 1982. p-59)
আরেকজন আমেরিকান পন্ডিত রবার্ট ওয়েসন তাঁর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত Beyond Natural Selection গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, “জীবাশ্ম রেকর্ডের মধ্যকার শূন্যতা বাস্তব এবং বিরাট।” তিনি এই দাবিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন :“যাহোক, (জীবাশ্ম) রেকডের্র মধ্যবর্তী শূন্যতা এক বাস্তব বিষয়। কোন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় রেকর্ডের অনুপস্থিতি একেবারেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। প্রজাতিসমূহ সচরাচর সুদীর্ঘকাল যাবৎ স্থিতিশীল কিংবা তার কাছাকাছি অবস্থায় থেকেছে। প্রজাতিসমূহ কদাচিৎ নতুন প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়, আর গণ কখনোই নতুন গণে বিবর্তিত হয় না। কিন্তু একটির দ্বারা আরেকটির প্রতিস্থাপন এবং পরিবর্তন কম বেশি আকস্মিক।” (Wesson. 1991.p-45)
উপসংহারে বলতে হয়, বিবর্তনবাদ প্রচারের ১৫০ বছর অতিক্রান্ত হলো, আর পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের সকল অগ্রগতি এই মতবাদেও বিপক্ষে গেছে। বিজ্ঞান প্রাণের ওপর যত বেশি বিস্তারিত গবেষণা করেছে, তত বেশি সৃষ্টির নির্ভুলতার প্রমাণ পাওয়া গেছে, আর তত বেশি উপলব্ধিতে এসেছে যে, প্রাণের উদ্ভব ও পরবর্তী বৈচিত্র্য দুর্ঘটনার ফলস্বরূপ ঘটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র গবেষণা জীবের মধ্যে পরিকল্পনার নতুন প্রমাণ প্রকাশ করছে এবং পরিকল্পিত সৃষ্টির বাস্তবতাকে আরো পরিষ্কার করে দিচ্ছে। ডারউইনের সময়কাল থেকে যত দশক অতিক্রান্ত হয়েছে, তত বেশি বিবর্তনবাদের অগ্রহণযোগ্যতা প্রকাশিত হয়েছে।
সার কথা হলো, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি বিবর্তনবাদের অনুকূল নয়। সেজন্য ভবিষ্যতে আরো অগ্রগতি ঘটলেও এই মতবাদ আনুকূল্য পাবে না, বরং এর অগ্রহণযোগ্যতা আরো বেশি প্রকট হবে। এখন এটা বলতে বাকি রইল যে, বিবর্তনের দাবিসমূহ এমন নয় যা বিজ্ঞান এখনো সমাধান করেনি বা ব্যাখ্যা করেনি- ভবিষ্যতে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হবে। বরং আধুনিক বিজ্ঞান বিবর্তনবাদের প্রতিটি দিককে ভুল প্রমাণিত করেছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে যে, সব দৃষ্টিকোণ থেকেই এরকম এক কাল্পনিক প্রক্রিয়া ঘটে থাকা অসম্ভব।
এরকম এক সমর্থনের অযোগ্য বিশ্বাস ভবিষ্যতে প্রমাণিত হবে- এই দাবি করাটা মার্কসবাদী ও বস্তুবাদী মহলের কল্পনাপ্রসূত এবং আজগুবি মনোভঙ্গির ফসল; তারা বিবর্তনবাদকে তাদের মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে দেখে থাকেন। তারা কেবল প্রচন্ড হতাশাজনক অবস্থার মধ্যে নিজেদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই কারণে, “বিজ্ঞান ভবিষ্যতে বিবর্তনবাদকে প্রমাণ করবে”- এই ধারণা এটা বিশ্বাস করা থেকে ভিন্ন নয় যে, পৃথিবী এক হাতির পিঠের ওপর অবস্থিত।

কেন আকারগত পরিবর্তন
বিবর্তনবাদের প্রমাণ নয়?
কিছু জীবের শারীরিক পরিবর্তন ঘটে টিকে থাকার জন্য এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য। এই প্রক্রিয়া রূপান্তর নামে পরিচিত। জীববিজ্ঞান ও বিবর্তনবাদের জ্ঞান যাদের অপর্যাপ্ত, তারা কখনো কখনো এই প্রক্রিয়াকে বিবর্তনবাদের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। প্রচারণার যেসব উৎস রূপান্তরকে ‘বিবর্তনের উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে, সেগুলো অগভীর, সঙ্কীর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রচারণা। এর উদ্দেশ্য হলো সেসব লোককে ভুল পথে চালনা করা, যারা বিষয়টিতে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না, যারা তরুণ বিবর্তনবাদী, কিংবা স্বল্পজ্ঞানের অধিকারী জীববিদ্যার শিক্ষক। যেসব বিজ্ঞানীকে বিবর্তনবাদের বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়, এবং যারা এই মতবাদের মধ্যকার উভয়সঙ্কট ও পরস্পরবিরোধিতা সম্পর্কে ভালো জানেন, তারা এই হাস্যকর দাবির উল্লেখ করতেও দ্বিধা করেন। এর কারণ হলো, তারা জানেন এটা কতটা অর্থহীন। প্রজাপতি, মাছি এবং মৌমাছি হলো সবচেয়ে সুপরিচিত কিছু প্রাণী যাদের রূপান্তর ঘটে। ব্যাঙ হলো আরেকটি উদাহরণ; এরা জীবন শুরু করে পানিতে এবং পরে বাস করে মাটিতে। বিবর্তনবাদের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, এই মতবাদ আকস্মিক মিউটেশনের সাহায্যে জীবের মধ্যে সৃষ্ট পার্থক্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করে। অথচ, রূপান্তরের সাথে এই দাবির কোনোই সাদৃশ্য নেই। কারণ, রূপান্তর হলো এক পূর্ব-পরিকল্পিত প্রক্রিয়া; এর সাথে মিউটেশন বা আকস্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো আকস্মিকতা রূপান্তর ঘটায় না, বরং এটা ঘটে সেই বংশগতির তথ্যের কারণে যা কোনো প্রাণীর জন্মের মুহূর্তে তার মধ্যে স্থাপিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাঙের মধ্যে বংশগতির এই তথ্য রয়েছে যা তাকে পানিতে বাস করার সময়েও ভূপৃষ্ঠে বাস করতে সাহায্য করে। এমনকি মশার লার্ভা অবস্থাতে তার পিউপা ও পূর্ণ বয়স্ক সময়কালের জিনগত তথ্য বিদ্যমান থাকে। এই একই কথা সেই সব প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাদের ক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটে।

রূপান্তর স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্টির প্রমাণ
রূপান্তর নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এটি এক জটিল প্রক্রিয়া যা বিভিন্ন জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাঙের রূপান্তরের ক্ষেত্রে কেবল লেজসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় এক ডজনের বেশি জিন দ্বারা। এর অর্থ হলো, এই প্রক্রিয়া ঘটে কয়েকটি অংশের একত্রে কাজ করার ফলে। এটি এক জৈবিক প্রক্রিয়া যা ‘অপরিবর্তনীয় জটিলতা’ এর বৈশিষ্ট্য বহন করে; এটা থেকে বুঝা যায়, রূপান্তর হলো বিশেষ সৃষ্টির প্রমাণ।
‘অপরিবর্তনীয় জটিলতা’ হলো একটি ধারণা যা বিজ্ঞানবিষয়ক সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এর পেছনে রয়েছেন প্রাণরসায়নের অধ্যাপক মাইকেল বেহে। তিনি বিবর্তনবাদের অগ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে গবেষণা পরিচালনার জন্য বিখ্যাত। এটার অর্থ হলো এই যে, জটিল অঙ্গ-তন্ত্রগুলো তাদের বিভিন্ন অংশ সহকারে একত্রে কাজ করে। যদি অতি ক্ষুদ্র কোনো অংশও কাজ না করে, তাহলে সমস্ত অঙ্গ বা দেহতন্ত্রও কাজ করবে না। এরকম জটিল কাঠামোর আকস্মিকভাবে উভূত হওয়া অসম্ভব; সময়ের আবর্তনে এতে অতি নগণ্য পরিবর্তন হয়, যেমনটি বিবর্তনবাদের দাবি। রূপান্তরের ক্ষেত্রে এটাই ঘটে। রূপান্তরের প্রক্রিয়া ঘটে হরমোনসমূহের অত্যন্ত সংবেদনশীল ভারসাম্য এবং সময় নিয়ন্ত্রণের দ্বারা; এসব হরমোন বিভিন্ন জিন দ্বারা প্রভাবিত হয়। সামান্য ভুল হলেও প্রাণীটিকে জীবন দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে হবে। এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব যে, এরকম জটিল প্রক্রিয়া আকস্মিকভাবে এবং ধাপে ধাপে ঘটতে পারে।
যখন অতি নগণ্য ভুলও প্রাণীটির প্রাণনাশের কারণ হতে পারে, তখন “ভুল ও সংশোধন” (trial and error) কিংবা প্রাকৃতিক নির্বাচনের পদ্ধতির কথা চিন্তা করাও অসম্ভব, যেমনটি বিবর্তনবাদীরা দাবি করেন। আকস্মিকভাবে আসবে এমন কোনো না-পাওয়া অঙ্গের জন্য কোন প্রাণী লক্ষ লক্ষ বছর অপেক্ষা করতে পারে না।
এই বাস্তবতাকে মনে রাখলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিষয়টি বিবর্তনের স্বপক্ষে মোটেই কোনো প্রমাণ দাঁড় করায় না। অথচ রূপান্তর সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণকারী কিছু ব্যক্তি এমনটি মনে করেন। পক্ষান্তরে, যখন এই প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং এটা নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গসমূহকে বিবেচনায় আনা হয়, তখন রূপান্তরের বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রাণীগুলিকে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

ডিএনএ কে ‘আকস্মিকতা’র ফসল
বলা অসম্ভব কেন?
আজকের দিনে আমরা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের যে স্তরে পৌঁছেছি, তা থেকে দেখা যাচ্ছে, জীবদেহের সুস্পষ্ট নকশা ও জটিল অঙ্গ-তন্ত্র তাদের আকস্মিকভাবে উদ্ভূত হওয়া অসম্ভব করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক ‘মানব জিনোম প্রকল্প’-কে ধন্যবাদ; মানব জিনের বিস্ময়কর নকশা ও সংরক্ষিত বিপুল তথ্য সকলের সামনে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রকল্পের পরিকাঠামোর মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা ১০ বছর ধরে কাজ করেছেন ডিএনএ-র ৩ বিলিয়ন রাসায়নিক সংকেতকে একে একে পাঠোদ্ধার করার জন্য। ফলে, মানব জিনের প্রায় সকল তথ্য তার সঠিক শৃঙ্খলায় প্রকাশ পেয়েছে। মানব জিনোম প্রকল্পের নেতৃত্ব দানকারী বিজ্ঞানী ড. ফ্রান্সিস কলিন্স বলেন, এটি খুবই উত্তেজনাকর ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে ডিএনএর তথ্য পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্রে কেবল প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তথ্যের পাঠোদ্ধারে শত শত বিজ্ঞানীর ১০ বছর সময় কেন লাগল তা বুঝার জন্য আমাদেরকে ডিএনএর তথ্যের বিপুলতা উপলব্ধি করতে হবে।
ডিএনএ অসীম জ্ঞানের উৎসকে প্রকাশ করছে একটি মানব কোষের ডিএনএ-তে এত বিপুল তথ্য থাকে যে, তা দিয়ে দশ লক্ষ পৃষ্ঠার বিশ্বকোষ রচিত হতে পারে। এটার সমস্তটা একজনের জীবন-কালে পাঠ করা অসম্ভব। কেউ যদি প্রতিদিন সম্পূর্ণ বিরামহীনভাবে প্রতি সেকেন্ডে এটি করে ডিএনএ কোড পড়তে থাকে, তাহলে তার ১০০ বছর সময় লাগবে। কারণ হলো, আলোচ্য বিশ্বকোষে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ভিন্ন ভিন্ন কোড বা সংকেত। যদি আমরা ডিএনএ-র সমুদয় তথ্য কাগজে লিপিবদ্ধ করতাম, তাহলে এটা বিছিয়ে দিলে উত্তর মেরু থেকে ইকুয়েটর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এটার অর্থ হলো প্রায় ১০০০টি বিশালাকার গ্রন্থ- যা এক বড় গ্রন্থাগার পূর্ণ করার চেয়েও বেশি। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই সকল তথ্য প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে থাকে। এর অর্থ হলো, একজন ব্যক্তির দেহে যেহেতু মোটামুটি ১০০ ট্রিলিয়ন কোষ থাকে, সেহেতু উল্লিখিত গ্রন্থাগারের মত ১০০ ট্রিলিয়ন গ্রন্থাগার থাকে একজন মাত্র ব্যক্তির মধ্যে। আমরা যদি এই তথ্যভান্ডারকে তুলনা করতে চাই এ যাবৎ মানুষের অর্জিত জ্ঞানের সাথে, এই রকম বিপুলতার কোনো দৃষ্টান্ত পেশ করা অসম্ভব। এটি থেকে এক অবিশ্বাস্য চিত্র আমাদের সামনে চলে আসছে: ১০০ ট্রিলিয়ন দ্ধ ১০০০ বই! এটি ভূপৃষ্ঠের বালিকণার চেয়েও বেশি। তা ছাড়া, আমরা যদি ঐ সংখ্যাকে ৬ বিলিয়ন দিয়ে গুণ করি, যা পৃথিবীতে জীবিত মানুষের সংখ্যা, এবং আরো অনেক বিলিয়ন মানুষ যারা আগে পৃথিবীতে ছিল, তাহলে যে সংখ্যাটি পাওয়া যাবে, তা আমাদের উপলব্ধি ক্ষমতার বাইরে এবং তথ্যেও পরিমাণ হয়ে পড়বে অসীম। আমরা কত প্রভাবিত করার মতো তথ্যের সাথে পাশাপাশি আছি এসব দৃষ্টান্ত হলো তার সূচক। আমাদের উচ্চ প্রযুক্তির কম্পিউটার আছে, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। অথচ আমরা যখন ডিএনএ-কে ওসব কম্পিউটারের সাথে তুলনা করি, তখন আমরা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করি যে, শত শত বছরের মানবীয় শ্রম ও জ্ঞান একত্র করে যে আধুনিক প্রযুক্তি আমরা পেয়েছি, তার তথ্য ধারণক্ষমতা একটি মাত্র কোষের সমানও নয়।
মানব জিনোম প্রকল্পের Celera Genomics–এর অন্যতম বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ জিন মায়ার্স। এই প্রকল্পের ফলাফল সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য থেকে ডিএনএ-তে রক্ষিত বিপুল জ্ঞান ও নলগা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়: ‘আমাকে সত্যিই যেটা বিস্মিত করে তা হলো, প্রাণের স্থাপত্যকৌশল … ব্যবস্থাপনাটি অত্যন্ত জটিল। এটি যেন পরিকল্পনা অনুযায়ী করা … এখানে বিপুল বুদ্ধিমত্তা রয়েছে।’ (San Fransisco Chronicle. Feb.2001)
আরেকটি মজার দিক হলো, এই গ্রহের সকল প্রাণ উৎপন্ন হয়েছে একই ভাষায় লিখিত সাংকেতিক বর্ণনা অনুসারে। কোনো ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ বা প্রাণী আপন ডিএনএ ছাড়া গঠিত হয় না। এটা খুবই স্পষ্ট যে, সকল প্রাণের উদ্ভব হয় একই ভাষায় বর্ণনার ফল স্বরূপ এবং একই জ্ঞানের উৎস থেকে। এটি আমাদেরকে এক সুস্পষ্ট উপসংহারের দিকে নিয়ে যায়: জগতের সকল জীব বেঁচে থাকে ও বংশবিস্তার করে যে তথ্যানুসারে, তা একক বুদ্ধিমত্তার দ্বারা সৃষ্ট। এটি বিবর্তনবাদকে সম্পূর্ণ অর্থহীন করে দিয়েছে। কারণ, বিবর্তনের ভিত্তি হলো ‘আকস্মিকতা’, অথচ আকস্মিকতা তথ্য সৃষ্টি করতে পারে না। যদি একদিন ক্যান্সার নিরাময়ের ক্ষমতাসম্পন্ন কোন ঔষধের ফর্মুলা এক টুকরা কাগজের ওপর লিখিত পাওয়া যায়, তাহলে মানবজাতির সবাই সেই বিজ্ঞানীকে খুঁজে বের করার কাজে যোগ দেবে যিনি এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত, এমনকি তাঁকে সম্মানও প্রদান করবে। কেউ এটা ভাববে না, ‘আমার মনে হয়, কাগজের ওপরে কিছু কালি ছলকে পড়ার ফলে ফর্মুলাটি লিখিত হয়েছে।’ যারা যুক্তি ও পরিষ্কার চিন্তার অধিকারী, তারা প্রত্যেকেই ভাববে যে, এই ফর্মুলা এমন কারো দ্বারা লিখিত, যিনি রসায়ন, মানবশারীরতত্ত্ব, কান্সার এবং ঔষধ-বিজ্ঞানের ওপর গভীরভাবে পড়াশোনা করেছেন। ডিএনএর তথ্য আকস্মিকভাবে ঘটেছে- বিবর্তনবাদীদের এই দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটা এই দাবির সাথে তুলনীয় যে, কাগজের উপরকার ফর্মুলা আকস্মিকভাবে ঘটেছে। ডিএনএ-তে রয়েছে ১০০,০০০ প্রকার প্রোটিন ও এনজাইমের বিস্তারিত আণবিক ফর্মুলা; সেই সাথে রয়েছে সূক্ষ্ম শৃঙ্খলা যা নিয়ন্ত্রণ করে কিভাবে এগুলি (প্রোটিন ও এনজাইম) উৎপাদনের সময় ব্যবহৃত হবে। এগুলির পাশাপাশি, বার্তাবাহক হরমোনের জন্য এতে রয়েছে উৎপাদন পরিকল্পনা এবং আন্তঃকোষীয় যোগাযোগ বিধি এবং অন্য সকল প্রকার জটিল ও বিশেষায়িত তথ্য। ডিএনএ এবং এর মধ্যস্থিত সমুদয় তথ্য আকস্মিকভাবে ও প্রাকৃতিক কারণে উদ্ভব ঘটেছে- এই দাবির পেছনে রয়েছে হয় বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা, নয়ত বস্তুবাদী মতাদর্শ। ডিএনএ-র মত অণু, যাতে রয়েছে অতি অনন্য তথ্য ও জটিল কাঠামো, তা আকস্মিকতার ফসল হতে পারে- এই দাবি এমনকি গুরুত্বের সাথে বিবেচনারও যোগ্য নয়। আমরা বিস্মিত হই না, যখন দেখি বিবর্তনবাদীরা অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো প্রাণের উৎস বিষয়টি ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করেন এবং এটাকে বর্ণনা করেন ‘সমাধান না হওয়া রহস্য’ বলে।
(চলবে)

SHARE