বিভেদের রাজনীতি টার্গেট কোন দিকে?

hasina - kalidaসোলায়মান আহসান

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশে-বিদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রা বেড়েই চলছে। বিশেষ করে বিরোধী মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর ক্রমবর্ধমান দমনপীড়ন, হত্যা, গুম ঘটনাসমূহে এ দেশটির প্রতি বিভিন্ন দেশের অনাস্থা বাড়ছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সূত্রগুলো আলগা হচ্ছে, সর্বোপরি অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব মি. বান কি মুন বাংলাদেশের সঙ্কট নিরসনে তাঁর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে বহুবার টেলিফোনে বিবৃতিতে তাঁর উদ্বেগের কথা জানিয়ে তা নিরসনে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানান। এমনকি তাঁর বিশেষ প্রতিনিধি সহকারী মহাসচিব (রাজনৈতিক) অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ২০১৩তে ছয় দিন দৌড়ঝাঁপ সেরে সমঝোতা ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ব্যর্থ হন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাই বিসওয়ালসহ অনেক বিদেশী প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সম্মানিত রাষ্ট্রদূতগণ।
বাংলাদেশের সঙ্ঘাত এবং অগণতান্ত্রিক পরিবেশ উপর্যুপরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ এবং তা থেকে বিরত হওয়ার আহবান জানিয়ে বিগত কয়েক বছর শতশত বিবৃতি প্রদান করেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, পত্রপত্রিকা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ।
দিনদিন সহিংস ঘটনার বিস্তার ঘটছে। শুধু বিরোধী দলের প্রতি সহিংসতা সীমাবদ্ধ থাকছে না, নিজ দলের নেতাকর্মীর মধ্যে মারাত্মক প্রতিহিংসা, সঙ্ঘাত এবং হত্যাকান্ডের ঘটনাসমূহ নিত্যদিন ঘটছে।
সহিংসতা রাজনৈতিক কারণে যেভাবে ঘটছে তেমনি দুর্বল অসাধু ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনের যোগাসাজশে ব্যক্তিগত হীনস্বার্থেও ঘটছে। সারাদেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চরম নৈরাজ্য। মানুষ ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। গ্রাম-গঞ্জ থেকে পালিয়ে শহরে, শহর থেকে পালিয়ে গ্রামে আত্মগোপনের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী ও সালাহউদ্দিনের গুম, শিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ ও মোকাদ্দাসের গুম, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যা। নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার প্রকাশ্যে চাপাতির আঘাতে বিশ্বজিৎ হত্যা, মেধাবী ছাত্র ত্বকী হত্যাসহ বহু ছাত্রনেতা শিবিরকর্মীর গুম ও গুলি করে হত্যার ঘটনাসমূহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতা প্রমাণ করে।
বহু মানুষ দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করে শান্তি ও স্বস্তির খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বিত্তশালী রাজনীতিকরা দ্বিতীয় দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। এঁরা অবশ্য ভাগ্যবানদের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সবচেয়ে বড় কথা দেশটি নানা দ্ব›েদ্ব নানা মতাদর্শে নানা পথ-পন্থায় দিন দিন অনৈক্য ও বিভেদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় এবং অল্পে তুষ্ট পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনে অভ্যস্ত সেসব মাদরাসা পড়–য়াদের ব্যাপারে নানা কুৎসা ও জঙ্গি হিসেবে চিত্রিত করার হীন প্রচেষ্টা, প্রকৃত উদ্দেশ্য ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের ঘায়েল করে ধর্মবিমুখ জাতিতে পরিণত করার এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে টুঁ শব্দটি নেই অথচ মুসলিম হলেই ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতর যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্থান আছে তাতে চিড় ধরানো মূলত একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ কি না তা ভাবিত করছে চিন্তাশীলদের।
বর্তমান সরকার বিগত নবম সংসদীয় নির্বাচনে আশাতীত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পরপর মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কথিত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারসহ ৭৫ জনের নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। ঐ ঘটনায় দেশের সচেতন নাগরিকদের মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল দেশের স্বাধীনতা তাহলে কতটুকু নিরাপদ? সেই আঘাতের ঘা আজো শুকায়নি। যেসব পরিবার হারিয়েছে তাদের সুযোগ্য অভিভাবক, চৌকস সেনাকর্মকর্তাদের হৃদয়ে যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তেমনি গোটা দেশবাসীর মনেও জ্বলছে বেদনার অনির্বাণ শিখা।
এরপর শুরু হয় বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন, নির্যাতনের স্বৈরপ্রক্রিয়া। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অর্ধশতক কাল বসবাস করা সরকার কর্তৃক অনুদানকৃত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ। তাঁর দুই পুত্র তারেক-আরাফাতের বিরুদ্ধে মামলার পুনরুজ্জীবন। খালেদার বিরুদ্ধে তত্ত¡াবধায়ক সরকার আমলের মামলা জোরদার করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দানের মামলায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের আটক, পরে যুদ্ধাপরাধীর মামলা রুজু। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্যক্রম পরিচালনা (যা স্কাইপ কেলেঙ্কারির ঘটনাও দেশ-বিদেশীদের দৃষ্টিতে বিতর্কিত), কেয়ারটেকার সংবলিত সংবিধানের বিধান রহিত করে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী পাস এবং তার আলোকে দশম সংসদের ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান গোটা দেশের প্রতিষ্ঠিত সকল কাঠামোকে বিতর্কিত, অস্থির এবং অস্থিতিশীল করে তোলা।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ জনমনে সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে কথিত যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে মাঠে ময়দানে হীন রাজনৈতিক মহড়া। আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দন্ডের বিরুদ্ধে রাতারাতি আইন করে উচ্চতর আদালতে সরকার পক্ষের আপিলের বিধান পাস এবং তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চের বিষোদগারও সরকারের চেয়ে ক্ষমতাবান দাবি করে মঞ্চ থেকে নির্দেশনা জারি করা দেশকে অজানা অন্ধকারে নিয়ে যায়।
ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে দেশ-বিদেশে নানা মহল থেকে স্বচ্ছতা, আইনি সংশোধন, বিচারিকপ্রক্রিয়া ইত্যাদি প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া সত্তে¡ও অভিযুক্তরা বিচারকার্যক্রমে সহযোগিতা করে আসছিলেন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে।
কিন্তু দিন যত গড়িয়ে যেতে থাকে ততই স্পষ্ট হতে থাকে সরকারের রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার প্রক্রিয়া। বিশেষ করে ট্রাইব্যুনাল-১ এর প্রধান বিচারক নিজামুল হকের স্কাইপ কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে পড়লে ইতঃপূর্বে দেশবাসীর সন্দেহ যথার্থ প্রমাণিত হয়। নিজামুল হক বিবেকের তাড়নায় স্কাইপ কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে স্বীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান। স্কাইপ কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে গোটা বিচারিকপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং নতুন বিচারকার্যক্রমের জন্য অভিযুক্তরা দাবি জানান।
উপরন্তু সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, আওয়ামী শীর্ষ নেতাদের মুখ থেকে বিচার নিয়ে নিরলস বক্তব্য, মন্তব্য, হুমকি-ধমকি চলতে থাকে। এর জন্য আওয়ামী দু’চারজন নেতা-নেত্রীকে আদালত কর্তৃক তলব করা হয় এবং তিরস্কৃত হন।
এ দিকে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে জ্বলন্ত অঙ্গারে পেট্রল ঢালার মতো ২৮ ফেব্রæয়ারি ২০১৩ ট্রাইব্যুনাল-১ জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় প্রদান করে। রায়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। পত্রিকায় খবর প্রকাশ পায়, রায় ঘোষণার পর মাওলানা সাঈদী বিচারকদের উদ্দেশে কিছু বলতে চাইলে উপস্থিত কতিপয় ঘাদানি নেতা সাঈদীকে অশালীন ভাষায় বক্তব্য দিয়ে থামিয়ে দেয়। সাঈদীভক্ত দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মানসিকভাবে চরম আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে রায় ঘোষণার পর সারাদেশ জনতার বিক্ষোভে ‘অগ্নিগর্ভ’ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ তৌহিদি প্রাণ মুসলমান জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী সমর্থকগণ। এর প্রতিবাদকারীদের ওপর বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব উন্মত্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সরাসরি পাখি শিকারির মতো গুলি করে প্রথম দিন ৬৬ জনকে হত্যা করে। আহত হয় অসংখ্য। পরবর্তী দু’তিন দিন সারাদেশের মানুষ প্রচন্ড প্রতিবাদমুখর ছিল। এসব প্রতিবাদী মানুষের ওপর ছোড়া গুলিতে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়। আহত হয় শত শত। পরবর্তীকালে সরকারের ক্রমাগত ইসলামবিরোধী কার্যকলাপে ইন্ধন জোগানোর ঘটনার পরম্পরায় ক্ষিপ্ত হয়ে কওমি মাদরাসার ধর্মীয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মাঠে নামে। সারাদেশের লক্ষ লক্ষ কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী ও তৌহিদি প্রাণ মুসলমান একত্রিত হয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিশেষ করে ৬ এপ্রিল ২০১৩ শাপলা চত্বরে বিশাল গণসমাবেশ করে তাদের দাবিসমূহ মেনে নিতে আলটিমেটাম দেয় সরকারকে। এ সমাবেশ ছিল দেশের স্মরণাতীতকালের সর্ববৃহৎ সুশৃঙ্খল এক গণসমাবেশ। যদিও সরকার এ সমাবেশকে কম উপস্থিতির সমাবেশ হিসেবে চিহ্নিত করতে বাস ধর্মঘট ডাকে। স্থানে স্থানে বাধা প্রদান করে। ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং হামলা চালায়। এরপর প্রদত্ত ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পুনরায় তারা পরবর্তী মাসে ৫ মে অবরোধ কর্মসূচি দেয় এবং শাপলা চত্বরে জমায়েত হয়। এখানে তারা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অবস্থান গ্রহণ করলে গভীর রাতে রাস্তার লাইট নিভিয়ে নির্মমভাবে এদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই আক্রমণে কত আলেম নিহত হন তা আজো রহস্যাবৃত রয়ে যায়। দাবি ওঠে বিচার বিভাগীয় তদন্তের। কিন্তু তা করা হয়নি আজো।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেন?
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৬ মাস পর ১৯৭২ সালের জুনে ভারতের সিমলায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকটি ছিল মূলত পরবর্তীতে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সিমলা চুক্তির গ্রাউন্ড ওয়ার্ক। এর প্রেক্ষাপটেই ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে পাকিস্তান স্বীকৃতি প্রদান করে। কিন্তু এর আগে ইঙ্গ-চীন-মার্কিন মুসলিম বিশ্বের কাছে পাকিস্তান ভাঙার অভিযোগে ভারত যে ভূ-অক্ষ শক্তির মধ্যে পড়ে এবং দুর্নাম অর্জন করে সেই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য ভারত জেনেভা কনভেনশনের আওতায় আত্মসমর্পণকৃত সকল পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে পাকিস্তানে ফেরত দেয়। বলা হয় ‘In the larges in interests of reconciliation, peace and stability in the sub continent’ এবং `In the largest interests of reconciliation, peace, stability and development of our sovereign country’’-এর লক্ষ্যে ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীসহ ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনাকে মুক্তি দেন। বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে শেখ মুজিব পাক-বাহিনীর ঊর্র্ধ্বতন সেনাসদস্যের একটি গ্রæপকে (১৯৫) যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের উদ্যোগ থেকে সরে আসেন। মূলত ভারত- পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে ফেরত দেয়া পাকিস্তানিদের এনে বিচার করার কোনো আন্তর্জাতিক রীতিনীতিই প্রযোজ্য ছিল না।
পরবর্তীতে শেখ মুজিব সরকার ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক ও সাজাপ্রাপ্তদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে দালাল আদেশ (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল)। বাতিল ঘোষণা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।
দালাল আদেশ বাতিল ও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ফলে ১৯৭৩ সালের ১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিজয় দিবস উদযাপনের আগের দিন পর্যন্ত দালাল আদেশে আটক সাজাপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত ৩০ হাজারেরও বেশি অপরাধীকে মুক্তি দেয়া হয়। যারা আত্মগোপন করেছিলেন তারাও এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ফলে সমাজজীবনে ফিরে এসে স্বাভাবিক কর্ম এবং জীবনযাত্রা শুরু করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরপরই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মালেক ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, খান এ সবুর, ড. কাজী দীন মুহম্মদ, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন, ড. হাসান জামান, ড. ফাতেমা সাদিক, মিসেস রাজিয়া ফয়েজ, খাজা খয়ের উদ্দিন, ড. মোহর আলী প্রমুখ মুক্তি লাভ করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এবং শর্ষিনার পীর সাহেবকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগেই জেল থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। সাধারণ ক্ষমাসংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রদত্ত এক প্রেসনোটে আরও বলা হয়েছিল যে, যাদের অনুপস্থিতিতে সাজা দেয়া হয়েছে অথবা যাদের নামে হুলিয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে তারা যখন উপযুক্ত আদালতে আত্মসমর্পণ করে ক্ষমা প্রার্থনা এবং বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করবে তখন তাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ ও বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত অপরাধী ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এক বাণীতে বলেছিলেন : দলমত নির্বিশেষে সকলেই যাতে আমাদের মহান জাতীয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরে ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশ গড়ার শপথ নিতে পারে সরকার সে জন্য দালাল আইনে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। বাংলাদেশের দালাল আদেশে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর অনতিবিলম্বে জেল থেকে মুক্তিলাভ করতে পারে সে জন্য তাদের মুক্তি ত্বরান্বিত করার উদ্দেশে শেখ মুজিবুর রহমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশও প্রদান করেছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের কথা বলতে গিয়ে বলেন : মুক্ত হয়ে গিয়ে দেশগঠনের পবিত্র ও মহান দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার তারা করবেন। অতীতের সকল তৎপরতা ও কার্যকলাপ ভুলে গিয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। (দ্রষ্টব্য : দৈনিক বাংলার ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত খবরের প্রতিলিপি যা ১১ মে ১৯৯২ তে পুনঃ প্রকাশিত)
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পরবর্তীতে শেখ মুজিবের পর জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ ও ’৯৬তে শেখ হাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেনি।
শেখ মুজিব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এবং উন্নয়ন প্রগতির পথে দেশকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে সরে এসে পাকিস্তান সরকারকে সহায়তা করার অপরাধে দালাল অভিধায় গ্রেফতারকৃত ৩০ হাজার বন্দীকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি দেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি সকল মহলকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করার মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুটি কবরস্থ হয়েছে ধারণা করা হয়।
তাহলে ৪২ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়কে টেনে আনলো কেন? এর পেছনে কারা রয়েছে? তাদের উদ্দেশ্য কী? দৃশ্যপটে যেমন কুশীলবকে পার্শ¦চরিত্রে রূপারোপ করতে দেখি এদের মদদদাতা কারা? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে হলে একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে।
১৯৯২ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা দিবসে জাহানারা ইমামের সভাপতিত্বে (তথাকথিত) গণ-আদালতে অধ্যাপক গোলাম আযমের ফাঁসির রায় ঘোষিত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই রায়কে কোনাভাবে গ্রহণ না করে বরং রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য গোপনে জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করে (দ্রষ্টব্য : মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর আমার ফাঁসি চাই)। আওয়ামী লীগ বরাবর চেয়েছে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার ফলে জামায়াতে ইসলামীকে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। অপর দিকে ’৭১-এর ইস্যুকে সামনে এনে জাহানারা ইমাম যাতে জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে দাঁড়াতে না পারেন সে জন্য ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে রশি টেনে ধরার নীতি অবলম্বন এবং সে কারণেই ১৯৯৪ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে জাহানারা ইমামের মৃত্যু সংবাদে শেখ হাসিনার মন্তব্য ছিল- আপদ গেছে, বাঁচা গেছে। (দ্রষ্টব্য : মতিউর রহমান বেন্টুর আমার ফাঁসি চাই ’ গ্রন্থ)।
প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুটি আওয়ামী লীগের নিজস্ব এজেন্ডা ছিল না। তাই বামপন্থী এবং পাশের দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত কতিপয় সাংস্কৃতিক কর্মী নেতা-নেত্রীদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের তোড়জোড়কে আওয়ামী লীগ ইতঃপূর্বে তেমন আমলে নেয়নি। বলা যায় এই ইস্যুটি স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর সাবেক সেনাপ্রধান অসাংবিধানিক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অন্যতম কুশীলব জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমদ তাজা করেন। ১৯৭১ সালে যে সেনাপ্রধান ১৪-১৫ বছরের কিশোর ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকার কোনোটাই তিনি ছিলেন না, তিনি নিজেকে মক্তিযুুদ্ধের পক্ষের একজন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এর পেছনে মইন ইউ আহমদের ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ মূলত প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তার উচ্চাভিলাষকে বাস্তব রূপ দিতে যাদের মদদ এবং সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন পড়তো তাদের ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ইস্যুটিকে গ্রহণ করা দরকার পড়ে ছিল তার।
এরপর ২০০৮ এর তত্বাধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বিষয়টি প্রথমবার দলীয় এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করে।
যা কিছুই ঘটছে বিশেষ করে গোটা দেশের মৌল কাঠামোর ভিতগুলো বিভেদের খেলায় নড়বড়ে করে দেয়া হচ্ছে এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে। আজ মানুুষ চরম আস্থার সঙ্কটে ভুগছে। সরকারের ওপর আস্থাহীনতা বিচারব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন, রাজনীতি, নির্বাচন, নির্বাচনী সংস্থার ওপর নেতিবাচক ধারণা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সংস্থার দেশপ্রেমিক সদস্যদের ব্যাপারে হতাশা সকল পর্যায়ের নির্ভরযোগ্যতা হারিয়ে মানুষ এখন প্রায় দিশেহারা। হতাশায় কেউ কেউ দেশ ছাড়তে পারলেই বাঁচে। এক শ্রেণীর উচ্চবিত্ত দেশ ছাড়ছে। এমন এক মহা ক্রান্তিকালে আমরা এসে পড়েছি।
সম্প্রতি তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর মানুষ প্রকাশ্যে বলছে, আর নির্বাচনে ভোট দিতে আমরা যাবো না। এদেশের ভোটাধিকারও ছিনতাই, গুম ঘটনার শিকার। এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেলো নুতন ভোট প্রতারণা। নির্বাচনী বুথ খোলার আগেই ভোট বাক্স ভর্তি। প্রথম ভোটাদাতাও দেখতে পান ব্যালট বাক্স প্রায় আধাআধি ভোটে পূর্ণ। কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। সবাই সরকারদলীয় লোকজন। পোলিং এজেন্ট সরকারি দলের সব। দিনে-দুপুরে রাজধানী ঢাকায় শত শত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যের উপস্থিতিতে মিডিয়ার সামনে যে ভোট জালিয়াতির ঘটনা সংঘটিত হলো তা তো নতুন ইতিহাস বৈকি!
তারপরও বিবেকের কাছে আমরা দায়ী যাতে না হই, আমরা যাতে যার যার অবস্থান থেকে নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই, সেই দায়িত্ববোধ থেকে বলছিÑ আমরা একটা কঠিন সময় অতিক্রম করছি। এ সময় বুঝে শুনে দেশের সচেতন শিক্ষিত নাগরিক সমাজ নড়েচড়ে দায়িত্ব পালন না করলে সামনে না জানি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে আমরা পড়বো। তাই আসুন ষড়যন্ত্রকারীদের চিনে তার জাল ছিন্ন করে গণতন্ত্রকে বাঁচাতে উদ্যোগী হই। বিভেদের ষড়যন্ত্র থেকে বের হতে হলে গণতন্ত্রকেই ফিরিয়ে আনতে হবে।

লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply