বিশ্বনবী সা.-এর খাদ্যাভ্যাস -শেখ মুহাম্মদ এনামুল কবির

পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহপাক সমস্ত প্রাণী সৃষ্টি করে তাদের ক্ষুধা দিয়েছেন। আর ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ ছাড়া সৃষ্টির অন্য সকল প্রাণী এমনকি উদ্ভিদও আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। তাদের জন্য কোন ধরনের বাছ বিচারের ব্যবস্থা রাখা নেই। প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দেখানো সীমারেখার মধ্যে থেকে তাদের খাবার গ্রহণ করে। প্রত্যেকের খাদ্যাভ্যাস আলাদা কারো সাথে কারো খাদ্যাভাসের কোনো মিল নেই। গরুর খাবার যেমন তৃণ জাতীয় খাবার আবার বাঘের খাবার জীবজন্তুর মাংস তথা মাংসাশী প্রাণী। দুটো প্রাণীই চতুষ্পদ কিন্তু তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্নতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই নির্ধারণ করে দিয়ে তার সৃষ্টি ব্যবস্থাপনার মাঝে একটি ভারসাম্য রক্ষা করেছেন।

প্রাণীদের খাদ্যতালিকা নিয়ে জীববিজ্ঞানে একটা অধ্যায়ই আছে জীবনচক্র নামে সেখানে জীববিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে সমস্ত সৃষ্টিজগৎ কিভাবে এক প্রাণী অন্য প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। এটাই মহান আল্লাহতায়ালার জীববৈচিত্র্য তৈরির আর এক রহস্য। রহস্য কেন বলছি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন চাইলেই সব প্রাণীকে তৃণভোজী বা মাংসাশী করে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে কাউকে তৃণভোজী আবার কাউকে মাংসাশী বানিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্যতা রক্ষা করেছেন। তা না হলে সবাই তৃণভোজী হলে আমরা যে সুন্দর সবুজ শ্যামল পৃথিবীর রূপ দেখে বিমোহিত হই সে রূপ হয়তো আমরা দেখতে পেতাম না কারণ সকল উদ্ভিদই তখন প্রাণীদের খাবারে পরিণত হতো এবং কোন উদ্ভিদের অস্তিত্ব থাকতো না। একইভাবে বিভিন্ন প্রজাতির নানা রং বর্ণের প্রাণী দেখেও আমাদের চক্ষু শীতল হয় এবং নির্ধারিত প্রাণীর মাংস খেয়ে ভিন্ন স্বাদ পাই তা কখনই পেতাম না। কারণ শক্তিশালী কোনো প্রাণী ছোট সকল প্রাণী খেয়ে ফেলত যার কারণে বড় প্রাণী ছাড়া কোন প্রাণী আর জীবিত থাকতো না। সবচেয়ে ভয়াবহ যে পরিণতি হতো তা হলো ঐ সমস্ত বড় প্রাণীরা যখন অন্য ছোট সকল প্রাণী খেয়ে শেষ করে ফেলতো তখন একটা সময় আসতো যে অন্যকোনো প্রাণীর অভাবে নিজেদের শাবকগুলো খাওয়া শুরু করতো এভাবে ধীরে ধীরে সমস্ত প্রাণীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যেত। সর্বশেষে পৃথিবী প্রাণী শূন্য হয়ে পড়তো। তাইতো মন থেকে আপনা থেকেই বের হয়ে আসে- সুবহান আল্লাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কি নিখুঁতভাবে তার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন এই পৃথিবী ব্যবস্থাপনার জন্য।

মানুষকে আল্লাহপাক অন্য সমস্ত প্রাণীর মতো করে যা ইচ্ছা তাই খাবারের অনুমতি দেননি। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন কোন জিনিস মানুষ খাবার হিসেবে গ্রহণ করবে আর কোনগুলো খাবে না। আর এখানেই যত গণ্ডগোল মানুষের মাঝে রুচি ও চিন্তার বৈচিত্র্য পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সকলের রুচি চাহিদা এক নয়। তবে মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত যে যে অঞ্চলে বেড়ে উঠেছে সে অঞ্চলে তাতের উপযোগী অনেক হালাল খাবারের ব্যবস্থা রেখেছেন। তারপরও সব মানুষ আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনা মেনে বৈধ খাবার গ্রহণ করে না। তবে যারা মেনে চলে তারা এ দুনিয়াতে যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন সুস্থতার সাথে বাঁচতে পারে এবং এরাই হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাছাই করা মানুষ কুরআনের ভাষায় যাদের অনুগত বলা হয়েছে।

মানুষকে মানুষ বলার অন্যতম কারণগুলোর একটি হলো ক্ষুধা। ক্ষুত পিপাসায় মানুষ যেভাবে কাতর হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে আবার যখন খাবার পায় শরীরে শক্তি ফিরে আসে তখন সে স্বাভাবিক থাকে। সুতরাং ক্ষুধার অনুভূতির মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। মানব সভ্যতা যতদিন থাকবে এই ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকবে। স্পষ্ট করে বলতে হয় যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এই পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করে তাদের মাঝে ক্ষুধার অনুভূতি তৈরি করে মানব সভ্যতার মাঝে এক ধরনের (পযবপশ ধহফ নধষধহপব) ভার সাম্য রক্ষা করেছেন। ঐ যে আগে বলেছি মানুষের মাঝে রুচি এবং স্বাদ গ্রহণের ভিন্নতার কারণে আল্লাহর নির্দেশিত খাবার বাদ দিয়ে নিষিদ্ধ খাবারের প্রতি মানুষের একটা জন্মগত ঝোঁক রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে আদি পিতা আদম (আ) ও আদি মাতা হাওয়া (আ) এর নিষিদ্ধ গন্ধব খাওয়ার পরিণতি নাকি এটি। যাই হোক মানুষের মধ্যে যে হানাহানি, মারমারি, হিংসা-বিদ্বেষ আমরা দেখতে পাই তার পিছনে রয়েছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস।

কারণ খাদ্যের ভিতর থাকা খাদ্যগুণ মানুষের কাজের উপর ভালো ভাবেই প্রভাব বিস্তার করে। আর আল্লাহপাক ভালো জানেন কোন খাবারের কোন বৈশিষ্ট্য এবং সে জন্যই তিনি তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের খাবারের তালিকায় কিছু বিধিনিষেধ রেখেছেন যাতে সকলে সঠিক খাবার গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত সাময়িক এবং সীমিত কাজের স্বাধীনতা পেয়ে আল্লাহর দেয়া বিধিনিষেধ ভুলে মন যা চায় তা খাওয়া শুরু করলো। যার ফলশ্রুতিতে যারা আল্লাহর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নিষিদ্ধ খাবার খাওয়া শুরু করলো তখন তাদের চরিত্রের মাঝে পশুত্ব ও বর্বরতা ফুটে উঠে থাকলো। আর এ কারণেই আল্লাহ প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করে মানুষকে পরিশুদ্ধ করিয়েছেন আল্লাহর গোলামি শিখিয়েছেন এবং উন্নত জীবনপদ্ধতির পথ বাতলে দেয়ার পাশাপাশি খাবারের সঠিক ব্যবহার বিধিও মানবজাতিকে শিখিয়েছেন।

প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন সবার থেকে খানিকটা ব্যতিক্রম। মানবতার বন্ধু এবং পথপ্রদর্শক আমাদের নবী জনাব হযরত মুহাম্মদ সা. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক একটি স্বতন্ত্র রূপরেখা বা দর্শন উপস্থাপন করেছেন। যেখানে প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকা নির্ভর করে নিয়মিত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের উপর সেখানে আল্লাহর প্রিয় হাবিব জনাব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর কোন বাস্তব দিকনির্দেশনা থাকবে না তা কি করে হয়? মানুষের বেঁচে থাকা এবং সুস্থতা নির্ভর করে একজন মানুষের শরীরের চাহিদামত সুষম খাদ্যের উপর। বর্তমান আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মানুষকে সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাবার গ্রহণ করার যে দিক নির্দেশনা দিয়েছে। প্রতিদিন একজন মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে কী পরিমাণ আমিষ, শর্করা, শে^তসার, খনিজলবণ, চর্বি জাতীয় খাবার লাগবে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা আছে। কিন্তু প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আমাদের প্রিয় নবীজী যে খাবারগুলো গ্রহণ করতেন তার ব্যবচ্ছেদ করলে আমরা এই আমিষ, শর্করা, শে^তসার, খনিজলবণ এবং চর্বি জাতীয় খাবারের প্রত্যেকটি খটুজে পাবো।

আমরা যদি তার খাদ্যতালিকা দেখি তাহলে এটি আমরা ভালো করেই বুঝতে পারবো তিনি কতটা স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন। শুধু স্বাস্থ্য সচেতনই নয় তার খাবার তালিকাগুলো দেখলে যে কোন পুষ্টি বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে একমত হবেন যে তার খাবার গ্রহণের পদ্ধতি এবং পরিমাণ যেকোন মানুষকে অটো ভালো রাখতে সাহায্য করবে। আমরা তার প্রতিটি খাদ্যের পুষ্টি গুণ নিয়ে আলাদা আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। তার খাদ্যাভ্যাসের তালিকা দেখে এখনকার স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান রীতিমত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তিনি প্রায় দেড় হাজার বছর আগে যে যে খাদ্যগ্রহণ করেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন তার খাদ্যগুণ ও পুষ্টিগুণ এত বেশি যে, এসব খাদ্য একজন মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুস্থ, সবল ও সতেজ রাখতে যথেষ্ট।

হাদীসের আলোকে নবীজীর খাদ্যতালিকা
আসুন এবার আমরা এক নজরে নবীজীর খাদ্যতালিকা দেখে নেই। মহানবী সা. যেসব খাবার পছন্দ করতেন নিম্নে সংক্ষেপে রাসূল সা. এর কিছু খাবারের আলোচনা বিধৃত হলো।

পনির : পনির খেতে পছন্দ করতেন নবীজী। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তাবুকের যুদ্ধে রাসূল সা.-এর কাছে কিছু পনির উপস্থাপন করা হয়। রাসূল সা. বিসমিল্লাহ পড়ে একটি চাকু দিয়ে সেগুলো কাটেন এবং কিছু আহার করেন। (আবু দাউদ-৩৮১৯)

মাখন : হজরত ইবনাই বিসর আল মুসলিমাইন রা. থেকে বর্ণিত, তাঁরা উভয়ে বলেন, ‘একবার আমাদের ঘরে রাসূল সা. আগমন করেন। আমরা তাঁর সম্মুখে মাখন ও খেজুর পরিবেশন করি। তিনি মাখন ও খেজুর পছন্দ করতেন।’ (তিরমিজি : ১৮৪৩)

মিষ্টি ও মধু : হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সা. মিষ্টান্ন ও মধু পছন্দ করতেন।’ (বুখারী-৫১১৫; মুসলিম-২৬৯৫) বুখারী শরিফের আরেকটি হাদীসে রাসূল সা. বলেছেন, ‘মধু হলো উত্তম ওষুধ।’ (৫৩৫৯)

রুটি খেতেন ঘি দিয়ে : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. একদিন বলেন, ‘যদি আমাদের কাছে বাদামি গমে তৈরি ও ঘিয়ে সিক্ত সাদা রুটি থাকত, তাহলে সেগুলো আহার করতাম।’ আনসারি এক সাহাবি এই কথা শুনে এ ধরনের রুটি নিয়ে আসেন। (ইবনে মাজাহ-৩৩৪০)
খরগোশের গোশত : হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, মাররুজ জাহরান নামক স্থানে আমাদের পাশ দিয়ে একটি খরগোশ লাফিয়ে পড়ে। দৃশ্য দেখে আমাদের সঙ্গীরা খরগোশটিকে ধাওয়া করে, কিন্তু তারা সেটিকে পাকড়াও করতে না পেরে ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। তবে আমি ধাওয়া করে এর নাগাল পাই এবং ধরে হজরত আবু তালহার কাছে নিয়ে আসি। তিনি মারওয়া নামক স্থানে সেটি জবাই করেন। এরপর খরগোশটির ঊরু ও নিতম্ব আমাকে দিয়ে রাসূল সা.-এর কাছে পাঠান। রাসূল সা. সেগুলো ভক্ষণ করেন।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূল কি তা খেয়েছিলেন? তিনি বলেন, গ্রহণ করেছিলেন। (বুখারী : ২৪৩৩)

খাসির পায়া : হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা ছোট খাসির পায়া রান্না করতাম। রাসূল সা. কুরবানির ১৫ দিন পরও সেগুলো খেতেন।’ (বুখারী : ৫১২২)

মোরগ : হজরত জাহদাম রা. থেকে বর্ণিত, একদিন আবু মুসা একটি মোরগ নিয়ে আসেন। ফলে উপস্থিত একজন গলার স্বর ভিন্ন করে আওয়াজ করল। হজরত আবু মুসা জিজ্ঞেস করলেন, কী হলো তোমার? লোকটি বলল, মোরগকে আমি বিভিন্ন খাবার খেতে দেখে আমার অপছন্দ হওয়ায় শপথ করেছি, কোনো দিন মোরগ খাবো না। হজরত আবু মুসা তাকে বললেন, ‘কাছে আসো। খাওয়ায় অংশ গ্রহণ করো। কারণ আমি রাসূল সা.-কে মোরগ খেতে দেখেছি। আর তুমি তোমার শপথ ভঙ্গের কাফফারা আদায় করে দেবে। (বুখারী-৫১৯৮, ৪৬৬২; মুসলিম-১৬৪৯)

লাউ : হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, একবার একজন দর্জি রাসূল সা.-কে খাবারের দাওয়াত করে। আমিও মহানবী সা.-এর সঙ্গে সেই খাবারে অংশগ্রহণ করি। রাসূল সা.-এর সামনে বার্লির রুটি এবং গোশতের টুকরা ও কদু মেশানো ঝোল পরিবেশন করে। আমি দেখেছি, রাসূল সা. প্লেট থেকে খুঁজে খুঁজে লাউ নিয়ে খাচ্ছেন। আর আমিও সেদিন থেকে কদুর প্রতি আসক্ত হয়ে উঠি। (মুসলিম-২০৬১; বুখারী-৫০৬৪)

দুধ : দুধ মহান আল্লাহর বড় একটি নেয়ামত। এ নেয়ামতের কথা পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর গবাদিপশুর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা। তার উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য থেকে পান করাই বিশুদ্ধ দুধ, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু।’ (সূরা নাহল : ৬৬)
হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘মিরাজের রাতে বায়তুল মাকদিসে আমি দুই রাকাত নামাজ পড়ে বের হলে জিবরাইল (আ) আমার সম্মুখে শরাব ও দুধের আলাদা দু’টি পাত্র রাখেন। আমি দুধের পাত্রটি নির্বাচন করি। জিবরাইল (আ) বললেন, ‘আপনি প্রকৃত ও স্বভাবজাত জিনিস নির্বাচন করেছেন।’ (বুখারী-৩১৬৪, তিরমিজি-২১৩)
দুধের উপকারিতা : দুধ ক্যালসিয়ামের সব চাইতে ভালো উৎস। ক্যালসিয়াম আমাদের দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুত করে। এছাড়াও ক্যালসিয়াম ভিটামিন ডি এর সাহায্যে আমাদের হাড় ও দাঁতে শোষিত হয়ে হাড় ও দাঁতের গড়ন দৃঢ় করে এবং দাঁতের ক্ষয়রোধ করে।

সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর ক্লান্তি দূর করতে এক গ্লাস গরম দুধ খুবই উপকারী। এ ছাড়া, দুধ খেলে শরীরে মেলটনিন ও ট্রাইপটোফ্যান হরমোন নিঃসৃত হয়, এই হরমোনগুলো ঘুম ভালো হতে সাহায্য করে।
দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন যা মাংসপেশির গঠনে অনেক বেশি সহায়তা করে।
দুধে রয়েছে পটাশিয়াম যা হৃদপিণ্ডের পেশির সুস্থতা বজায় রাখে। তা ছাড়া এর খনিজ উপাদান হৃদপিণ্ড সতেজ রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণও করতে পারে।

দুধে আছে প্রচুর ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা চুলের জন্য খুব উপকারী।
প্রতিদিন দুধ পান করলে ত্বকে এর বেশ ভালো প্রভাব পড়ে। ত্বক হয় নরম, কোমল ও মসৃণ। দুধের অন্য একটি বড় গুণ হচ্ছে এটি মানসিক চাপ দূর করতে সহায়তা করে। রোগ প্রতিরোধ বাড়ায় এবং বুকের জ¦ালাপোড়া কমে তবে হাইপার অ্যাসিডিটি যাদের আছে তাদের দুধ না পান করাই উত্তম। দুধ ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় এবং মলাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। দুধ পান দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সর্বোপরি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে দুধ অত্যন্ত সহায়ক।

খেজুর : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল সা.-কে বার্লির এক টুকরো রুটির ওপর একটি খেজুর রাখতে দেখেছি। তারপর বলেছেন, ‘এটিই সালন-মসলা।’ (আবু দাউদ-৩৮৩০) অন্য হাদীসে আছে, প্রিয় নবী সা. বলেছেন, ‘যে বাড়িতে খেজুর নেই, সে বাড়িতে কোনো খাবার নেই।’
খেজুর সুস্বাদু একটি ফল। যা রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায় এবং চিনির বিকল্প হিসেবে ধরা হয়। খেজুর শক্তির একটি ভালো উৎস এবং খেজুর খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের ক্লান্তিভাব দূর হয়। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি। যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।

মাত্র চারটি বা ৩০ গ্রাম পরিমাণ খেজুরে আছে ৯০ ক্যালোরি, এক গ্রাম প্রোাটিন, ১৩ মি.লি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ২ দশমিক ৮ গ্রাম ফাইবার এবং খেজুরের রয়েছে আরও অনেক পুষ্টি উপাদান। প্রাকৃতিক আঁশে পূর্ণ খেজুর ক্যান্সার প্রতিরোধ করে থাকে। দুর্বল হৃৎপিণ্ডের সবচেয়ে নিরাপদ ওষুধ খেজুরকে বলা হয়। খেজুর দৃষ্টিশক্তি বাড়িয়ে রাতকানা প্রতিরোধেও সহায়ক।
মুটিয়ে যাওয়া রোধ : মাত্র কয়েকটি খেজুর ক্ষুধার তীব্রতা কমিয়ে দেয় এবং পাকস্থলীকে কম খাবার গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। অল্পতেই শরীরের প্রয়োজনীয় শর্করার ঘাটতি পূরণ করে।
মায়ের বুকের দুধ : খেজুর বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য সমৃদ্ধ এক খাবার, যা মায়ের দুধের পুষ্টিগুণ আরো বাড়িয়ে দেয় এবং শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

খেজুর শিশুদের মাড়ি শক্ত করতে সাহায্য করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও প্রতিরোধ করে।
খেজুরে আছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম, যা হাড়কে মজবুত করে।
অন্ত্রের কৃমি ও ক্ষতিকারক পরজীবী প্রতিরোধ এবং অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে সহায়তা করে খেজুর।
খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে খেজুর এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
যকৃতের সংক্রমণে খেজুর উপকারী। এ ছাড়া গলাব্যথা এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বর, সর্দি ও ঠাণ্ডায় বেশ উপকারী।
এমনকি প্রিয় নবী সা. সন্তান প্রসবের পর প্রসূতি মাকেও খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

কিশমিশ : ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সা.-এর জন্য কিশমিশ ভিজিয়ে রাখা হতো এবং তিনি সেগুলো পান করতেন।’ (মুসলিম)
পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম কিশমিশে রয়েছে এনার্জি ৩০৪ কিলোক্যালরি, কার্বোহাইড্রেট ৭৪.৬ গ্রাম, ডায়েটরি ফাইবার ১.১ গ্রাম, ফ্যাট ০.৩ গ্রাম, প্রোটিন ১.৮ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮৭ মিলিগ্রাম, আয়রন ৭.৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৭৮ মিলিগ্রাম ও সোডিয়াম ২০.৪ মিলিগ্রাম। আর এগুলো শরীরের গঠন এবং বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। কিশমিশ রক্তে শর্করার মাত্রায় ঝামেলা তৈরি করে না। এটি খেলে শরীরের রক্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়, পিত্ত ও বায়ুর সমস্যা দূর হয়। এটি হৃদপিণ্ডের জন্যও অনেক উপকারি। এ ছাড়াও কিশমিশ দেহের শক্তি বৃদ্ধি করে, দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষা দেয়, হাড়ের ক্ষয় রোধ করে, ইনফেকশনের সম্ভাবনা দূর ও ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। কিশমিশ রক্তশূন্যতা, কোষ্ঠ কাঠিন্য, অনিদ্রা দূর করে। ওজন বাড়াতে, এসিডিটি কমাতে, মুখের রুচি বাড়াতে, মস্তিষ্কের বোরন উৎপাদনে সহায়তা করে যা ধ্যান ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

সারিদ : ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল সা.-এর কাছে রুটির সারিদ ও হায়সের সারিদ খুব প্রিয় ছিল।’ (আবু দাউদ-৩৭৮৩)। সারিদ হলো গোশতের ঝোলে ভেজানো টুকরো টুকরো রুটি দিয়ে তৈরি বিশেষ খাদ্য। আর হায়স হলো মাখন, ঘি ও খেজুর দিয়ে যৌথভাবে বানানো খাবার।

সিরকা : হজরত জাবের রা. বলেন, ‘রাসূল সা. তাঁর পরিবারের কাছে সালন কামনা করেন। তাঁরা বলেন, আমাদের কাছে তো সিরকা ছাড়া আর কিছু নেই। মহানবী সা.-এর কাছে সেগুলো নিয়ে আসা হলে তিনি তা থেকে খেতে শুরু করেন। তারপর বলেন, ‘সিরকা কতই না উত্তম সালন! সিরকা কতই না উত্তম সালন!’ হজরত জাবের রা. বলেন, ‘সেদিন থেকে আমি সিরকা পছন্দ করতে শুরু করি।’ (মুসলিম-২০৫১)

তরমুজ : হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. তরমুজের সঙ্গে ‘রাতাব’ বা (পাকা-তাজা) খেজুর খেতেন। (বুখারী-৫১৩৪, তিরমিজি-১৮৪৪)
সব ধরনের তরমুজ স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। যেসব গর্ভবতী মায়েরা তরমুজ আহার করেন তাদের সন্তান প্রসব সহজ হয়। তরমুজের পুষ্টি, খাদ্য ও ভেষজগুণ এখন সর্বজনবিদিত ও বৈজ্ঞানিক সত্য।
তার খাদ্য তালিকার অন্য সব উপাদান যেমন পনির, মাখন, রুটি, খাসির পায়া, মোরগ, খরগোশের গোশত প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা পুষ্টি গুণ রয়েছে এবং এগুলো সব বর্তমান স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদদের মত সুষম খাদ্যের বাইরে নয়। সুতরাং আল্লাহর রাসূল সা.-এর খাদ্যাভ্যাস নিঃসন্দেহে ছিল ভারসাম্যপূর্ণ এবং অধিকতর স্বাস্থ্যসম্মত।

শসা : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল সা.-কে শসার সঙ্গে ‘রাতাব’ খেতে দেখেছি। (মুসলিম-৩৮০৬)

জলপাই ও অলিভ অয়েল : রাসূল সা. বলেন, তোমরা জয়তুন খাও এবং জয়তুনের তেল বা অলিভ অয়েল গায়ে মাখো। কেননা এটি একটি মোবারক বৃক্ষ থেকে তৈরি। (সুনানে ইবনে মাজাহ-১০০৩, তিরমিজি-১৮৫১)
প্রিয় নবী সা.-এর পছন্দের ফলগুলোর একটি ছিল জয়তুন। এর তেলও শরীরের জন্য বেশ উপকারী। রাসূল সা. তা নিজে ব্যবহার করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও ব্যবহার করার তাগিদ দিতেন। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রা. বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা (জয়তুনের) তেল খাও এবং তা শরীরে মালিশ করো। কেননা এটি বরকত ও প্রাচুর্যময় গাছের তেল। (তিরমিজি-১৮৫১)।

খাবার পানি : নবীজী খাবার পানিকে সেরা পানীয় বলে অভিহিত করেছেন। পানি পান করার নবীজীর ৬টি আদব শিখিয়েছেন ১. পানি পানের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা (বুখারী-৫১৬৭ ইবনে মাজাহ-১৯১৩) ২. ফুঁ দিয়ে পানি পান না করা (ইবনে মাজাহ-৩৪২৮) ৩. সবসময় বসে পানি পান করা (মুসলিম) ৪. তিন নিশ^াসে পানি পান করা ৫. গ্লাসের পানিতে নিশ^াস না নেয়া ৬. পানি পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা।

ডুমুর : পবিত্র কোরআনের সূরা আততীন এ যাইতুন তথা ডুমুরের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর ভেষজগুণ বহুমাত্রিক। ডুমুর বা ত্বীন ফল নারী-পুরুষের শক্তি বৃদ্ধি করে। এ ফলে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম রয়েছে যা ব্লাডপ্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখে। ডুমুর বা ত্বীন ফল রক্তে ক্ষতিকর সুগারের পরিবর্তে ন্যাচারাল সুগার তৈরি করে ব্যালান্স রক্ষা করে ও মারণব্যাধি ক্যান্সার সারায়। ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়, শরীরের অপ্রয়োজনীয় মেদ বা চর্বি কমায়, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়, মারণব্যাধি ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে, শরীরের ক্যালসিয়ামের শূন্যতা পূরণ করে, গর্ভবতী মা ও শিশুর রক্তশূন্যতা রোধ করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, ডুমুর কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলস প্রতিরোধে সহায়তা করে, চর্মরোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, ব্রণ ও মেছতায় নিয়মিত লাগালে তা সেরে যায়।

আঙ্গুর : আঙ্গুরে রয়েছে ভিটামিন কে, সি, বি ১, বি ৬ এবং খনিজ উপাদান ম্যাংগানিজ ও পটাশিয়াম যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।
আঙ্গুর কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ও হৃদরোগের মতো রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া উচ্চরক্তচাপ, ডায়রিয়া, ত্বক ও মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করতেও আঙ্গুর সহায়তা করে, চোখের স্বাস্থ্য ভাল রাখে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে, আঙ্গুরের ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের সহায়ক ও ইনসুলিন বৃদ্ধি করে, ক্যান্সার রোধ করে, বার্ধক্য রোধ করে, কিডনি ভালো রাখে, মাথাব্যথা দূর করে, আঙ্গুরে থাকা ফাইটো কেমিক্যাল ও ফাইটো নিউট্রিয়েন্ট ত্বকের সুরক্ষায় কাজ করে, হজমে সহায়তা করে। তা ছাড়া আঙ্গুরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ম্যাংগানিজের মতো খনিজপদার্থ যা হাড়ের গঠন ও হাড় শক্ত করতে সাহায্য করে। এর ঔষধি গুণের কারণে এটি অ্যাজমার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে এবং ফুসফুসে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়ায়।

আনার : এক কাপ বা ১৭৪ গ্রাম বেদানায় থাকে প্রায় ৭ গ্রাম ফাইবার, ৩ গ্রাম প্রোটিন, ভিটামিন সি থাকে ৩০% আর ডি এ, ভিটামিন কে রয়েছে ৩৬% আর ডি এ, আছে ১৬% আর ডি এ ফোলেট। এ ছাড়াও ছোট ফলের এই দানায় ১২% আর ডি এ পটাশিয়াম রয়েছে। যা নানাভাবে শরীরের উপকারে লাগে। বেদানা এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ও পুনিসিক এ্যাসিডে ভরপুর যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধে খুবই প্রয়োজন।

মাশরুম : আমরা জানি বর্তমানে মানুষ তাদের শরীরের অতিরিক্ত মেদ ও চর্বি কমানোর জন্য এই মাশরুম খাবারে ব্যবহার করছে।

সামুদ্রিক মাছ : সামুদ্রিক মাছ আমাদের শরীরের খনিজ লবণের পাশাপাশি ক্যালশিয়ামের যোগান দেয়। হৃদরোগ থেকে বাঁচায়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, দেহের বৃদ্ধি ও হাড় মজবুত করে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় সামুদ্রিক মাছ।

মধু : মধুর নানা পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণ রয়েছে। মধু ও কালো জিরাকে বলা হয়েছে মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের মহা ঔষধ। হালকা গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে মধু পান ডায়রিয়ার জন্য ভালো এবং খুশখুশে কাশি ভালো হয়। খাবারে অরুচি, পাকস্থলীর সমস্যা, হেয়ার কন্ডিশনার ও মাউথ ওয়াশ হিসেবে উপকারী।

নবী করীম সা.-এর খাবার গ্রহণ পদ্ধতি
নবী করীম সা. কিভাবে খাবার খেতেন তা জানা আমাদের অতীব জরুরি। কেননা আমরা তার খাবারের তালিকা দেখেছি এখন তা খাওয়ার পদ্ধতি যদি না জানি তাকে যথাযথ অনুসরণ করতে পারবো না।
১. খাবারের শুরুতে উত্তম রূপে হাত ধৌত করা : নবী করীম সা. প্রতিবার খাবারের শুরুতে উত্তমভাবে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন যাতে কোন ধরনের ময়লা বা জীবাণু না থাকে। দেড় হাজার বছর আগের দেখানো পদ্ধতি আজকের বর্তমান দুনিয়া সুস্থ থাকার জন্য হুবহু পালন করার উপর জোর দিচ্ছে। আর বর্তমানে করোনা মহামারীতে বাঁচার জন্য সবাইকে বারবার হাত ধুতে বলা হচ্ছে।
২. বিসমিল্লাহ বলে খাবার শুরু করতেন : প্রিয় নবীজী বিসমিল্লাহি ওয়া বারকাতুল্লাহ বলে খাবার শুরু করতেন যাতে আল্লাহর তায়ালার নেয়ামত ভোগ করা যায় তাকে স্মরণ করে কারণ রিজিকের ব্যবস্থা করে দিলেন যিনি তাকে স্মরণ না করলে কি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় না? সাথে সাথে তার কাছে বরকত ও কামনা করে খাবার গ্রহণের উত্তম পদ্ধতি শিখিয়েছেন আমাদের।
৩. খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে কি করতেন: যদি কষনও তিনি খাবার খেতে ভুলে যেতেন তখন পড়তেন “বিসমিল্লাহি আওয়াল্লাহু ওয়াল আখিরা।” (আবু দাউদ -৩৭৬৭, তিরিমিজি-১৮৫৮)
৪. দস্তরখানা বিছিয়ে খাবার খেতেন : নবী করীম সা. পরিষ্কার দস্তরখানা বিছিয়ে খাবার গ্রহণ করতেন যাতে কোন খাবার পড়ে গেলে তা উঠিয়ে খাওয়া যায় এবং কোন ধরনের অহমিকা প্রকাশ না পায়। (বুখারী-৫৩৮৬)
৫. ডান হাত দিয়ে খাবার খাওয়া : নবী করীম সা. ডান হাত দিয়ে খাবার খেতেন। কোন সময় বাম দিয়ে খাবার খেতেন না।
৬. হাত চেটে খাওয়া : রাসূল সা. খাওয়ার সময় সর্বদা হাত চেটে খেতেন। না চাটা পর্যন্ত কখনো হাত মুছতেন না। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাত মুছবে (ধৌত করবেনা) না।’ (বুখারী-৫২৪৫) (বুখারী-৫৩৭৬; মুসলিম-২০২২)
৭. মুখ ভরে খাবার খেতেন না : নবী করীম কোন সময় সম্পূর্ণ মুখ ভর্তি করে কোন খাবার নিয়ে গিলে খেতেন না। ধীরে ধীরে খাবার চিবিয়ে খেতেন। তবে খাবার চিবানোর সময় কোন ধরনের শব্দ হতোনা।
৮. পাকস্থলীকে তিন ভাগে ভাগ করে খাবার খেতেন: খাবারের সময় তিনি তার পাকস্থলীকে তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগে খাদ্য একভাগে পানি এবং এক ভাগ খালি রাখতেন শ^াস প্রশ^াস ও দ্রুত হজমের জন্য।
৯. আঙুল চেটে খাওয়া : আঙুল চেটে খাওয়ার ফলে বরকত লাভের অধিক সম্ভাবনা থাকে। কারণ খাবারের বরকত কোথায় রয়েছে মানুষ তা জানে না। রাসূল সা. বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না।’ (ইবনে মাজাহ-১৯১৪)
১০. পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া : খাবার গ্রহণের সময় কখনো কখনো থালা-বাসন থেকে এক-দুইটি ভাত, রুটির টুকরো কিংবা অন্য কোনো খাবার পড়ে যায়। সম্ভব হলে এগুলো তুলে পরিচ্ছন্ন করে খাওয়া চাই। রাসূল সা.-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত, তাহলে তিনি তুলে খেতেন। জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না।’ (তিরমিজি-১৯১৫; ইবনে মাজাহ-৩৪০৩)
১১. হেলান দিয়ে না খাওয়া : কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে খাবার খেতে তিনি নিষেধ করেছেন। হেলান দিয়ে খাবার খেলে পেট বড় হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়। আবু হুজাইফা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সা.-এর দরবারে ছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, আমি টেক লাগানো অবস্থায় কোনো কিছু ভক্ষণ করি না। (বুখারী-৫১৯০, তিরমিজি-১৯৮৬)
১২. খাবারের দোষ-ত্রুটি না ধরা : শত চেষ্টা সত্ত্বেও খাবারে দোষ-ত্রুটি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করা একজন মুসলিমের উচিত নয়। রাসূল সা. কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না। (বুখারী-৫১৯৮; ইবনে মাজাহ-৩৩৮২)
১৩. খাবারে ফুঁ না দেয়া : খাবার ও পানীয়তে ফুঁ দেওয়ার কারণে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে। রাসূল সা. খাবারে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। কোনো কিছু পান করার সময়ও তিনি ফুঁ দিতেন না। (ইবনে মাজাহ-৩৪১৩)
১৪. খাবারের শেষে দোয়া পড়া : আল্লাহ তায়ালা খাবারের মাধ্যমে আমাদের প্রতি অনেক বড় দয়া ও অনুগ্রহ করেন। এ দয়ার কৃতজ্ঞতা আদায় করা সভ্যতা ও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। খাবার গ্রহণ শেষে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য।
খাবার শেষে রাসূল সা. আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতেন ও দোয়া পড়তেন। আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. খাবার শেষ করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা।’ তিনি কখনো এই দোয়া পড়তেন: ‘আলহামদুলিল্লাহি ল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’ (বুখারী-৫৪৫৮)

খাবার গ্রহণে নবী করীম সা. এর সতর্কতা
খাবার গ্রহণ কালে নবী করীম সা. সবসময় সচেতন থাকতেন। খাবার গ্রহণের পূর্বে খাবার নাকের কাছে নিতেন ঘ্রাণ শুকতেন দুর্গন্ধ যুক্ত কোন খাবার হলে তা গ্রহণ করতেন না। কোন বাসি তরকারি তিনি খেতেন না। তরকারিতে ঝোল বেশি দিতে বলতেন যাতে করে প্রতিবেশীকেও দেয়া যায়। এ ছাড়াও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবী করীম সা.-কে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে ছিলেন তিনি খাদ্যের গুণ বৈশিষ্ট্য এবং উপকারিতা জানতেন। যেমন কোন এক খাবার মজলিশে কোন সাহাবীর এক প্রশ্নের জবাবে রাসূল সা. বলেছিলেন তোমাদের কোন খাবারে কোন মাছি বসলে তাকে ধরে পুরো মাছিটিকে ঐ খাবারের মাঝে ডুবিয়ে দাও এবং এর পর খাবার গ্রহণ করো। কারণ মাছির এক ডানায় বিষ থাকে অন্য ডানায় তার প্রতিষেধক থাকে। দেড় হাজার বছর পরে মহানবীর এ কথা নিয়ে গবেষণা করেছেন আধুনিক যুগের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা এবং তারা ফলাফল দেখে রীতিমত চমকে উঠেছেন হুবহু নবী করীম সা. এর এ উক্তির যথার্থতা খটুজে পেয়ে।
খাবারের ক্ষেত্রে নবী করীম সা. এর একটি স্বাস্থ্যসম্মত শাশ্বত দর্শন হলো- মানুষের অসুস্থতার কারণ হলো ভূরিভোজ করা এবং ভুল উপায়ে খাদ্য গ্রহণ করা।

খাবার সময় রাসূল সা. কখনোই একা খেতে বসতেন না। বরং অনেক লোককে নিয়ে একত্রে খেতেন তিনি। এমন কোনো হাদীস পাওয়া যায় না, যেখানে জানা যায় তিনি একা একা খাবার খেয়েছেন। রাসূল সা. প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাবারই বেশি গ্রহণ করতেন। গাছ থেকে পাড়া খেজুর তিনি খেতেন এবং উটনী বা ছাগীর সদ্য দোহন করা দুধ তিনি পান করতেন।
তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ যিনি সবসময় আল্লাহর নেয়ামতকে উপভোগ করতেন।
নবী সা. প্রতিদিন কমবেশি পানাহার করতেন। তিনি কিভাবে খাওয়া-দাওয়া করতেন এ বিষয়ে বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ শামায়েলে তিরমিজিতে অনেক হাদীস এসেছে। হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম সা. কখনো টেবিলে আহার করেননি এবং ছোট পেয়ালাবিশিষ্ট খাঞ্চায়ও খানা খাননি। আর তার জন্য কখনো চাপাতি রুটিও (চিকন পাতলা রুটি) তৈরি করা হয়নি। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রা. থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা একত্রে খানা খাও, পৃথক পৃথক খেও না। কেননা জামাতের সঙ্গে খাওয়ার মধ্যে বরকত হয়ে থাকে। (ইবনে মাজাহ-২৪৪, মেশকাত-৩৭০)। মেহমানের যারা আপ্যায়ন করে তাদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল সা. বলেন, উটের চোটের দিকে ছুরি যত দ্রুত অগ্রসর হয় তার চেয়েও দ্রুত অগ্রসর হয় কল্যাণ (বরকত) ওই গৃহের দিকে যাতে (মেহমানদের অনর্গল) খানা খাওয়ানো হয়। অর্থাৎ বেশি মেহমানদারি করা হয়। (ইবনে মাজাহ-২৪৮-৪৯, মেশকাত-৩৭০)। প্রিয় নবী সা. কখনো রান্না করা মাংস ছুরি বা কাটা চামচ দিয়ে কেটে খেতেন না। তিনি বলেছেন, তোমরা ছুরি দ্বারা গোশত কেটো না। কেননা তা আজমীদের (অনারব) আচরণ-অভ্যাস। বরং তোমরা তা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খাও। কারণ এটা অতি সুস্বাদু এবং বেশি হজমদার। (আবু দাউদ-১৭৪)

পরিশেষে বলতে চাই এভাবে একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে রাসূল সা.-এর জীবনের কোনো একটি দিক লিখে বর্ণনা করে শেষ করার মতো কোন বিষয় নয়। রাসূলে আকরাম সা. এর জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ে এক একটি গ্রন্থ লিখলে হয়তো পরিপূর্ণভাবে সব বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। উপরে বর্ণিত প্রতিটি খাদ্য উপকরণ এবং খাওয়ার নিয়ম পদ্ধতি কতটা বিজ্ঞানসম্মত তা আমরা বর্তমানের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের ভাষ্য এবং প্রতিটি খাবারের পুষ্টিগুণ দেখলেই বুঝতে পারি। একজন মানুষ যদি পরিপূর্ণ ভাবে সুস্থ সবল ভাবে বাঁচতে চায়, জীবন যাপন করতে চায় তাহলে নবী করীম সা.-এর দেখানো খাবার গ্রহণ পদ্ধতির মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কল্যাণ। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তো পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন “নবীর জীবনেই রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।” তাই আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ করে নবীর করীম সা.-এর মতো পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলি এবং সুস্থ সুন্দর জীবন গড়ি। ঈমানের সব দাবি পূরণের জন্য সুস্থতা এক মহা নেয়ামত। কারণ সুস্থতা ছাড়া একামতে দ্বীনের মহান দায়িত্ব হক আদায় করে পালন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে রাসূলে আকরাম সা. এর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে সুস্থতার সাথে মহান মালিকের দেয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply