বিশ্বনবী সা.-এর সুমহান চার খলিফা – মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবনাদর্শ ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রকৃষ্ট উদাহরণমহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন বিশ্বের জন্য উসওয়ায়ে হাসানাহ্। তাঁর সান্নিধ্যে এসে মৃত্তিকাও খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেন, “আমার সাহাবীগণ এক একজন আকাশের নক্ষত্রতুল্য। তোমরা যাকে অনুসরণ করবে তার মাঝে সত্যপথের সন্ধান পাবে।” তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া সাহাবীগণ ছিলেন নবীজীর প্রতি আনুগত্যে অতুলনীয়। তন্মধ্যে ইসলামের চার খলিফার সাথে আর কারো তুলনা হয় না। তাঁদের ৩০ বছর শাসনকাল ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ। জাতীয় জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ কত সুন্দরভাবেই না রাসূল সা.-এর পরশ পাওয়া অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী সাহাবীদের কথা তুলে ধরেছেন মাত্র কয়টি পঙক্তিতে-
গলেছে পাহাড়, জ্বলেছে আকাশ, জেগেছে মানুষ তোমার সাথে,
তোমার পথের যাত্রীরা কভু থামেনি চরম ব্যর্থতাতে,
তাই সিদ্দিক পেয়েছে বক্ষে অমন সত্য সিন্ধু-দোল,
তাই উমরের পাতার ডেরায় নিখিল জনেরও কলরোল
তাই ওসমান খুলে গেল দ্বার অতুলন দিল মণিকোঠার,
তাইতো আলীর হাতে চমকায় বাঁকা বিদ্যুৎ জুলফিকার,
খালেদ, তারেক ঝাণ্ডা ওড়ায় মাশুকের বুকে প্রেমের টান,
মহাচীন মুখে ফেরায়ে কাফেলা জ্ঞান যাত্রীরা করে প্রয়াণ।
পাল তুলে দিয়ে কিশ্তি ছুটেছে জোয়ার ভাটার মাঝে অটল
নতুন তুফানে কোটি মরাগাঙ ধমনীতে পেল নতুন বল,
তারা খুঁজে ফেরে সিন্ধু ঠিকানা প্রবল তৃষার বারি অতল,
মৌসুমী ফুল জাগায়ে দু’ধারে বর্ষ শেষের তোলে ফসল।
– সিরাজাম মুনীরা
আমরা সংক্ষেপে জেনে নেবো আল্লাহ্‌র নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সুমহান চার খলিফার সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা)

আল্লাহ্র নবী সা.-এর ইন্তেকালের পর ১৩ রবিউল আউয়াল ১১ হিজরি ৬৩২ খ্রি: ইসলামের ইতিহাসে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিকভাবে হযরত আবু বকর (রা) প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার প্রথম ভাষণে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা) বলেন, “হে মুসলমানগণ! আপনারা আমাকে নেতা নির্বাচন করেছেন, যদিও আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। যদি আমি ভালো কাজ করি, আমাকে সাহায্য করবেন, যদি অন্যায় ও খারাপ কাজের দিকে যাই, আমাকে সঠিক পথে এনে দিবেন। শাসকদের নিকট সত্য প্রকাশ করাই উত্তম আনুগত্য। সত্য গোপন রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। যে জাতি আল্লাহ্র পথে জিহাদ করে না, তারা লাঞ্ছিত অভিশপ্ত হয়। যে জাতির মধ্যে খারাপ কাজ ব্যাপক হয়, তাদের উপর আল্লাহ্ বালা-মুসিবত ব্যাপক করে দেন।” তিনি ছিলেন মহানবী সা. এর চারিত্রিক গুণাবলীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। মহানবী সা.-এর সকল গুণে তিনি গুণান্বিত ছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে মহানবী সা.-এর পরেই তার স্থান। উম্মাতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন তিনি। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা) দৃঢ় ও কঠোর নেতৃত্বের ফলে মদীনার ইসলামী শিশুরাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা পায়। তাই তাকে ইসলামের ‘ত্রাণকর্তা’ বলা হয়।
সর্বপ্রথম যে চারজন নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন হযরত আবু বকর (রা) তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথেই ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য চেষ্টা করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় কুরাইশদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি চল্লিশ হাজার দিরহাম মহানবী সা.-এর খেদমতে ও ইসলাম প্রচারে ব্যয় করেন। তিনি নগদ অর্থে মুশরিকদের নিকট থেকে মুসলিম কৃতদাস-দাসীদের ক্রয় করে স্বাধীন করে দেন। তাবুক যুদ্ধে সর্বস্ব এনে মহানবী সা.-এর হাতে তুলে দেন। হযরত ওমর (রা) বলেন, “হযরত আবু বকরকে ইসলামের খেদমতের ব্যাপারে কেউ অতিক্রম করতে পারবে না।”
ইসলামের ত্রাণকর্তা হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। মহানবী সা.-এর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম ও অন্তহীন। রাসূল সা. তাঁকে সিদ্দিক বা সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত করেন। ইসলাম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্য পৌত্তলিকদের হস্তে তিনি প্রহৃত হন। হিজরতের সময়ে তিন রাসূল সা.-এর সঙ্গী হিসেবে মদীনায় হিজরত করেন। খলিফা হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন মহানবী সা.-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু সুখ-দুঃখের সাথী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান। যে কোন সমস্যা অনুধাবনে ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে ছিলেন অতুলনীয়। বক্তৃতা-ভাষণে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইসলামী জ্ঞানে তাঁর মর্যাদা ছিল সকলের ঊর্ধ্বে।
হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ এবং ইবাদত ও তাকওয়ার মূর্ত প্রতীক। তিনি কখনো কখনো নামাযে সারারাত কাটিয়ে দিতেন। অধিকাংশ সময় রোযা রাখতেন। একাগ্রচিত্তে নামায আদায় করতেন। তাঁকে নামাযরত অবস্থায় দেখলে প্রাণহীন কাষ্ঠদণ্ডের মতো মনে হতো। কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত। তিনি অস্ফুট স্বরে এমনভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন যে, আশপাশে মানুষ জড়ো হয়ে যেত। এ কারণে তাকে ‘আওয়াহুম মুনীব’ নামে আখ্যায়িত করা হতো।
ইসলামের ধারক এবং বাহক হিসেবে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা) ধর্মীয় অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। কোন প্রকার ভীতি, বিদ্বেষভাব ও বিরুদ্ধাচরণ তাঁকে কর্তব্যচ্যুত করতে পারেনি। তিনি ইসলামের পূর্ণ অনুসারী বিধায় মহানবী সা.-এর অন্তিমকালে তাঁকে ইমামতি করার আদেশ দেন। খলিফা নির্বাচিত হয়ে তিনি আরব ভূখণ্ড থেকে বিদ্রোহ ও ভণ্ড নবীদের কঠোর হস্তে দমন করেন। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর স্বহস্তে মদীনা রক্ষার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারী বেদুঈন গোত্রদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযান প্রেরণ করে তাদেরকে পরাজিত করেন। তারা ইসলামী বিধান অনুযায়ী কর দিতে বাধ্য হয়। ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে তিনি আরব ভূ-খণ্ড থেকে দুর্নীতি, প্রতারণা, ভণ্ডামি এবং অনৈসলামিক কার্যকলাপ ধ্বংস করে ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। মাওলানা মুহাম্মদ আলী বলেন, “প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে ইসলামের তরীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব একমাত্র তাঁরই প্রাপ্য।”
ইসলামের প্রচার-প্রসারে নায়েবে রাসূলের পদমর্যাদায় থাকায় হযরত আবু বকর (রা)-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল, ইসলামের প্রচার ও প্রসার। এই উত্তম কাজে তিনি ইসলামের সূচনাপর্ব থেকে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন। রোমান ও ইরানিদের মোকাবেলায় যে সমস্ত সৈন্য প্রেরণ করা হয়েছিল তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, সর্বপ্রথম ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। যেমন- হযরত মাছনার (রা) চেষ্টায় ইরাকের বনি ওয়ালের সমস্ত মূর্তিপূজক এবং খ্রিস্টান মুসলমান হয়েছিল। হযরত খালিদ (রা)-এর দাওয়াতে ইরাকি-আরবের অধিকাংশ গোত্র মুসলমান হয়েছিল।
নবী করীম সা.-এর আত্মীয় স্বজনদের সাথে সুন্দর ব্যবহার, রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর ঋণ পরিশোধ, ওয়াদা পূরণ করা খিলাফতের দায়িত্বের অন্তর্গত ছিল। মহান খলিফা আবু বকর (রা)-ই সর্বপ্রথম এই দায়িত্ব আদায় করেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ সা.-এর স্ত্রীগণের সুখ শান্তি ও সুবিধার প্রতি অধিক দৃষ্টি রাখতেন।
তিনি রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর আত্মীয়দের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। তিনি তাঁর শাসনামলে হযরত আলী (রা) কে বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই আমাদের আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করার চেয়ে রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর আত্মীয়দের সাথে উত্তম ব্যবহার করবো, এটি উত্তম।” (বুখারি)
হযরত আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর প্রিয় ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। সঠিক সিদ্ধান্ত ও সমস্যা অনুধাবনে তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি যে সমস্যায় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাই গৃহীত হয়েছে। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে ছিলেন অতুলনীয়। বক্তৃতা-ভাষণে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, বংশ তালিকার জ্ঞানে পণ্ডিত, স্বপ্ন ব্যাখ্যায় আল্লাহ্ প্রদত্ত ক্ষমতার অধিকারী। ইসলামী জ্ঞানে তাঁর মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চ। তিনি ছিলেন বিচক্ষণতায় ও গাম্ভীর্যে আকর্ষণীয় অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং একজন কুশলী রাষ্ট্রনায়ক।
পারিবারিক জীবনে তিনি স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের সাথে প্রীতি ও সদ্ভাব রাখতেন। তাঁর চাল-চলন ছিল সাদাসিধে, মোটা কাপড় ব্যবহার করতেন। বাহ্যিক কোন জাঁকজমক ছিল না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি খুবই সম্পদশালী ছিলেন, কিন্তু পরে সমস্ত সম্পদ ইসলামের খেদমতে বিলিয়ে দেন। এ জন্য কোনো সময় দরিদ্র্যতার কারণে দুই তিন দিনও তাঁকে অনাহারে থাকতে হতো। তাঁর এমনও সময় এসেছে যে, গায়ের জামা ও পরনের কাপড় ছিল না। একটি কম্বল, বোতাম ও ঘুন্টি ছাড়া কাঁটা দিয়ে আটকিয়ে পরতেন।
মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, নবীগণের পর সমস্ত বনি আদম এর মধ্যে হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন সর্বোত্তম। রাসূল সা. বলেছেন, আমি প্রত্যেকের উপকারের প্রতিদান দুনিয়াতেই পরিশোধ করে দিয়েছি, কিন্তু হযরত আবু বকর (রা)-এর উপকারসমূহ আমার ওপর রয়ে গিয়েছে, তাঁর প্রতিদান আল্লাহ্ তা’আলা পরকালে দিবেন। জগতের আদর্শ প্রশাসক, মহানবীর চিরসাথী খলিফা আবু বকর (রা) দুই বছর তিন মাস ৯ দিন ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা শেষে ২২শে জমাদিউস্সানী ১৩ হিজরি/৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা)

ইসলাম-সে ত পরশ-মাণিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি!
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।
আজ বুঝি-কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গাম্বর-
“মোর পরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।”
– ওমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম
হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানরা প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার শুরু করেন। তিনি নিজেও ইসলাম প্রচারে যোগ দেন এবং তাঁর প্রভাবে অনেক গোত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ সা. মদিনায় হিজরতের পূর্বে তিনি বিশজন হিজরতকারী একটি দল নিয়ে মদিনায় গমন করেন। তিনি সর্বপ্রথম আযান ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন এবং পরবর্তীকালে তা ঐশীবাণী দ্বারা অনুমোদিত হয়। তিনি মদিনায় হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সুখ-দুঃখ ও সমস্যাবলির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। বদর, ওহুদ, খন্দক, হুনাইন, খাইবার প্রভৃতি যুদ্ধগুলিতে যোগদান করে তিনি অসাধারণ বীরত্ব, যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। খন্দকের যুদ্ধে মক্কাবাসীদের আক্রমণের প্রতিরোধ তিনি যে অপূর্ব সমরকুশলতার পরিচয় দেন এর স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁর নামানুসারে তথায় একটি মসজিদ নির্মিত হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। ইসলামের স্বার্থের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন বলে তিনি এই চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। কেননা আপাতদৃষ্টিতে এ সন্ধি ন্যক্কারজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। কিন্তু মহানবী সা.-এর সন্ধির অন্তর্নিহিত সারবত্তার কথা বুঝালে তিনি এতে সম্মত হন। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি কুরাইশ নেতা আবু সুফয়ানকে বন্দী করেছিলেন। তাবুক অভিযানে তার শ্রমলব্ধ সম্পদের অর্ধাংশ যুদ্ধ তহবিলে দান করেন। এ ছাড়া তিনি তাঁর খাইবার অঞ্চলে বিস্তীর্ণ ভূ-সম্পত্তিও ইসলামের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহ্র রাসূলের প্রতি তাঁর সুগভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল। তাঁর মৃত্যুতে তিনি পাগলের ন্যায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। প্রথম খলিফা মনোনয়নের সময় যে বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তা দূরীকরণে হযরত ওমর (রা)-এর যথেষ্ট অবদান ছিল। তিনি প্রথম খলিফা হিসেবে হযরত আবু বকর (রা)-এর নাম প্রস্তাব করে তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছিলেন। হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে তিনি তাঁর প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে উদ্ভূত বিভিন্ন জটিল সমস্যা সমাধানে সাহায্য করেন। তিনি বিচারকের দায়িত্বও পালন করেন।
হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর খিলাফতকাল (৬৩৪-৬৪৪) ইসলামের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। বিশ্বের সর্বকালের শাসকদের নিকট তিনি ছিলেন আদর্শ স্থানীয়। শ্রেষ্ঠ বিজেতা ছাড়াও একজন সুযোগ্য ও দূরদর্শী প্রশাসক হিসেবে ইতিহাসে তিনি অমরত্ব লাভ করেন। তার রাজস্ব, সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ও জনকল্যাণমুখী। ইতিহাসবিদ ড. এস. এম. ইমাম উদ্দিন বলেন, “তার শাসনকাল ইসলামের কৃতিত্বপূর্ণ সামরিক ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করেছে।”
হযরত ওমর (রা) শুধু একজন বিখ্যাত বিজেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক এবং নিরঙ্কুশ সফলকাম জাতীয় নেতাদের অন্যতম। হযরত আবু বকর (রা)-এর শাসনামল থেকে শুরু করে হযরত আলী (রা)-এর খিলাফতকাল পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ বছরের ইসলামী প্রজাতন্ত্রে যে শাসননীতি অনুসৃত হয়েছিল, তা খলিফা হযরত ওমর (রা)-এর নিকট থেকে উদ্ভূত। তিনি মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও আল হাদিসের নির্দেশ অনুসারে শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে পরিপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট রূপ দান করেন। তাই নিঃসন্দেহে স্বীকার করা যায় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রকৃত স্থপতি হচ্ছেন খলিফা হযরত ওমর (রা)।
হযরত ওমর (রা) ছিলেন সচ্চরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ। এ অসাধারণ মানুষটির মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয়, অনাড়ম্বর জীবন নির্বাহ, ন্যায়পরায়ণতা, প্রজাবাৎসল্য, পাণ্ডিত্য, তীক্ষè বিচারবুদ্ধি প্রভৃতি মানবিক গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। সরলতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তার চরিত্র সম্বন্ধে ইংরেজ ঐতিহাসিক মুইর বলেন, “সামান্য কয়েকটি পঙ্ক্তিতে হযরত ওমর (রা)-এর চরিত্র অঙ্কন করা যায়। সরলতা ও কর্তব্যপরায়ণতা ছিল তাঁর জীবনাদর্শ এবং ন্যায়পরায়ণতা ও একাগ্রতা ছিল তাঁর শাসনের মূলনীতি।”
এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক হয়েও হযরত ওমর (রা) সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। তাঁর সাদাসিধা জীবনযাপন সম্বন্ধে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। তাঁর না ছিল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কোন দেহরক্ষিবাহিনী, না ছিল আড়ম্বরপূর্ণ শাহি বালাখানা। হযরত ওমর (রা) ছিলেন কোমলতা ও কঠোরতার অদ্ভুত সংমিশ্রণ। দরিদ্রদের প্রতি তিনি ছিলেন দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তাদের মঙ্গলের চিন্তায় তিনি বহু বিনিদ্র রজনী যাপন করেছেন। জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে অভাবগ্রস্তদেরকে অর্থ ও খাদ্য সাহায্য করার জন্য তিনি পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন। কখনও বা প্রসূতির প্রসবযাতনা নিবারণার্থে স্বীয় স্ত্রীকে নিঃসঙ্গ বেদুইন মহিলার গৃহে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসতেন। তিনি দুর্ভিক্ষের সময় নিজের কাঁধে করে খাদ্যের বোঝা বইতেন। বিচারকার্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। নিজের অপরাধী পুত্রকে তিনি ক্ষমা করেননি। মদ্যপানের অপরাধে স্বীয় পুত্র আবু শামাকে তিনি নিজ হাতে বেত্রাঘাত করেন। স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্ব তাকে স্পর্শ করেনি। উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র সবাই ছিল তার চোখে সমান। অপরাধী প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে পদচ্যুত করতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি।
হযরত ওমর (রা) জ্ঞান চর্চার অনুরাগী ছিলেন। বিদ্বান ও বাগ্মী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। কুরআন ও হাদিসে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল। সামরিক বিজ্ঞান ও কৌশলের দিক দিয়ে তিনি সমগ্র আরবের সুপরিচিত ছিলেন। বস্তুত হযরত ওমর (রা) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ইসলাম ও রাষ্ট্রের খেদমতে তিনি তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই ইসলামের ইতিহাসের হযরত ওরম (রা)-এর স্থান অতি উচ্চে।
হযরত ওমর (রা)-এর দশ বছরের শাসনকাল ইতিহাসে একটি সোনালি অধ্যায় সূচনা করে। বিজেতা, শাসক, সংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও সংগঠক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব ছিল অসাধারণ। তিনি সে সমস্ত অসাধারণ ব্যক্তিদের অন্যতম যারা কেবল জাতির ভবিষ্যৎই গড়ে তোলেননি, জাতির নিজস্ব আদর্শও সৃষ্টি করেছেন।
মহানবী সা. আরবে ইসলামী সাধারণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। হযরত আবু বকর (রা) একে স্বধর্মত্যাগীদের কবল হতে রক্ষা করেছিলেন এবং হযরত ওমর (রা) একে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। স্বীয় শাসনামলে তিনি প্রবল শক্তিধর পারসিক ও রোমান সাম্রাজ্যকে বিধ্বস্ত করেছিলেন। ফলে তার খিলাফতকালেই মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমা পারস্য, সিরিয়া ও মিসর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। পারসিক ও রোমানদের ওপর মুসলমানদের এই অভাবিত বিজয় হযরত ওমর (রা) এর উল্লেখযোগ্য কীর্তি।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা মুহাম্মদ আলী বলেন, “হযরত ওমর (রা)-এর গৌরবোজ্জ্বল কৃতিত্বের মধ্যে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ছিল ইসলামের মহাবিজয়গুলো।” অধ্যাপক পি. কে. হিট্টিও মন্তব্য করেছেন, আবু বকরের সময় বিশ্ব বিজয়ের উদ্দীপ্ত প্রেরণা ওমরের সময় পরিপূর্ণতা লাভ করে। শূন্য হতে শুরু করে আরবীয় মুসলিম খিলাফত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হয়। মাত্র দশ বছরের মধ্যে তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার গুণে এশিয়ার পারস্য ও সিরিয়া, ইউরোপের রোম বা বাইজান্টান, আফ্রিকার মিসর ইসলামের পতাকা তলে এসে পড়ে। এ জন্য বিজেতা হিসেবে তিনি কেবল ইসলামের ইতিহাসেই স্থান লাভ করেননি, পৃথিবীর ইতিহাসেও তিনি একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজেতা হিসেবে পরিচিত।
২৬শে জিলহজ্ব ২৩ হিজরি/৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে ১০ বছর ৬ মাস ৩ দিন ইসলামী রাষ্ট্রের খিলাফতের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পরিচালন অবস্থায় দুষ্কৃতকারীর হাতে শাহাদাত প্রাপ্ত হন।

তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান গনি (রা)

ইসলাম ও রাসূলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন হযরত উসমান (রা)। তাঁর অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কর্মাদর্শের কারণে ইসলামের ইতিহাসে তিনি এক বিশেষ আসন দখল করে আছেন। তিনি মধ্যমাকৃতির, শ্মশ্রুমণ্ডিত সুপুরুষ ছিলেন। হযরত উসমান (রা) মহানবী সা. এর সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সকল সঙ্কটে ও বিপদে তিনি রাসূলের পাশে ছিলেন। তিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী। ইসলাম প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার কাজে অকাতরে অর্থ-সম্পদ দান করেন। এক্ষেত্রে তিনি সর্বকালের বিত্তশালী লোকদের জন্য আদর্শ। ইসলাম গ্রহণ করায় স্বজাতির লোকেরা সীমাহীন নির্যাতন চালালে তিনি নির্যাতিত বহু সাহাবীকে নিয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তারপর মহানবী সা.-এর পূর্বে মদীনায়ও হিজরত করেন। হযরত উসমান (রা) ইসলামের দুর্দিনে বিভিন্ন যুদ্ধের সময় অকাতরে দান করতেন। তাবুক যুদ্ধে তিনি ১০০০ দিরহাম দান করেন। রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য এক হাজার উট দান করেন।
স্থান সংকুলান না হওয়ায় মহানবী সা. মসজিদে নববির সম্প্রসারণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি মসজিদ সংলগ্ন জমি ক্রয় করে এর সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করেন। তিনি দুস্থ মানবতার সেবায় অর্থ ব্যয় করতেন। দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য বিতরণ করতেন; মুসলিম দাসদেরকে অত্যাচারী মনিবদের কাছ থেকে ক্রয় করে আযাদ করে দিতেন। হযরত উসমান (রা) এর সবচেয়ে বড় অবদান পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ সঙ্কলন। ইসলামী সা¤্রাজ্যের বিস্তৃতির ফলে বহু অনারব ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়। সেসব জাতির লোকেরা আরবি শব্দের সঠিক উচ্চারণ করতে পারত না। তা ছাড়া আঞ্চলিক ভাষায় কুরআন পাঠের অনুমতি থাকায় বিশুদ্ধ কুরআনের বিশুদ্ধ সঙ্কলন করার ব্যবস্থা করেন এবং অধিকতর সাবধানতার জন্য আঞ্চলিক ভাষার কুরআনের পাঠগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেন। এ অমর অবদানের জন্য তাঁকে মুসলিম উম্মাহ্ ‘জমিউল কুরআন’ বা ‘কুরআন সঙ্কলনকারী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
হযরত উসমান (রা) ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তিনি আজীবন ইসলামের খেদমতে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। এমনকি খিলাফতের শেষের দিকে রাষ্ট্রের সংহতি ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখার জন্য নিজের জীবন দান করে গেছেন। জগতের ইতিহাসে এর তুলনা বিরল।
হযরত উসমান (রা) ছিলেন একজন ধর্মপরায়ণ, ন্যায়নিষ্ঠ ও মহৎপ্রাণ ব্যক্তি। তাঁর সততা, দানশীলতা, ধর্মভীরুতা এবং বিনয়ের জন্য তিনি ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। জন্মগতভাবেই তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী। নিরহংকারী, বিনয়ী, আমানতদার, দানশীল হিসেবে তিনি মহানবী সা. -এর প্রিয়পাত্র ছিলেন। মিথ্যা ও পাপাচার হতে তিনি ছিলেন পবিত্র এবং আল্লাহ্‌র ভয়ে সবসময় তাঁর চোখ সজল থাকত। অবসর সময়ে আল্লাহ্র ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
তিনি ছিলেন খুব সহজ-সরল দয়ালু মানুষ। তিনি অতিরিক্ত উদার, স্নেহপ্রবণ এবং অমায়িক ছিলেন। এজন্য গুরুতর অপরাধীকেও ক্ষমা করে দিতেন। প্রয়োজনের সময়ও তিনি কারো প্রতি কঠোর হতে পারেননি। তাঁর সরলতার সুযোগে অসৎ ও দুষ্টু লোকেরা তাদের স্বার্থসিদ্ধ করেছিল। আসলে তাঁর মতো জনদরদি, দীন-দুঃখীর বন্ধু, প্রজাবৎসল শাসক পৃথিবীতে বিরল। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক মহান খলিফা।
মহানবী সা.-এর একটি বাক্যে হযরত উসমানের চরিত্র চিত্রিত করা যায়। তিনি বলেন, “আমার সাহাবীদের মধ্যে উসমান (রা) সবচেয়ে নম্র ও লজ্জাশীল।” বস্তুত হযরত উসমান (রা)-এর চরিত্রে বিনয়, ধৈর্য, সততা, সারল্য, সহনশীলতা, ন্যায়নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা, বিশ্বাস প্রভৃতি গুণাবলির সমাবেশ ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ্ সা. তাঁর আচরণে ও ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে পরপর দু’বার নিজ দুই কন্যাকে তার সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এত প্রিয় ছিলেন যে, তাঁর দু’টি কন্যার ইন্তেকালের পরও অপর কোনো কন্যা থাকলে উসমানের সাথে বিয়ে দিতেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী হয়েও তিনি দীন-হীন ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। খলিফা হিসেবে বায়তুল মাল হতে এক কপর্দকও গ্রহণ করেননি। আল্লাহ্র পথে তাঁর যথাসর্বস্ব অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন।
নিজের জীবন নিশ্চিত বিপন্ন জেনেও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেননি। বলেন, আমি চাই না আমার হাত নবীজীর উম্মতের রক্তে রঞ্জিত হোক। শেষ পর্যন্ত শাহাদাতকেই তিনি হাসিমুখে বরণ করেন। ৮২ বছর বয়সে তিনি ১১ বছর ১১ মাস ৩ দিন খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। তাঁর শাহাদাত দিবস ১৭ জুন ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ।

চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা)

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা) ৬০০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ সা.-এর চাচা আবু তালিবের পুত্র। তাঁর মাতার নাম ফাতিমা বিনতে আসাদ। হযরত আলী (রা)-এর ডাক নাম ছিল আবু তোরাব ও আবুল হাসান। আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না বলে মহানবী সা. নিজেই আলী (রা)-এর প্রতিপালনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। হযরত আলী (রা)কে মহানবী সা. অত্যন্ত স্নেহ করতেন। এমনকি নিজের আদরের কন্যা হযরত ফাতেমা (রা)কে তিনি আলীর সাথে বিয়ে দেন। ঐতিহাসিক মাসুদীর বর্ণনা মতে, মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা) রক্তিম বর্ণবিশিষ্ট, দীর্ঘ শ্মশ্রু ও ঘন ভ্রুসহ প্রশস্ত নেত্রবিশিষ্ট মধ্যম আকৃতির দেহের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ্ ও আল্লাহ্র রাসূলের একনিষ্ঠ প্রেমিক, বিশ্বাসে দৃঢ়, রণক্ষেত্রে সাহসী, ব্যক্তিগত আচরণে ন্যায়পরায়ণ এবং আলোচনায় সুবিজ্ঞ হযরত আলী (রা) ইসলামী গুণাবলির মহান আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন সকল যুদ্ধে নবীর বিশ্বস্ত সঙ্গী, পূর্ববর্তী খলিফাদের সুহৃদ ও পরামর্শদাতা, রিক্তের বন্ধু, ধর্মের অনুসারী এবং ন্যায়পরায়ণতার ধ্বজাধারী। মহানবী সা. ও ইসলামের আদর্শসমূহের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ভালোবাসা হিসেবে হযরত আলী (রা) এর জীবন সরলতা ও সংযমে বিভূষিত ছিল। তিনি ছিলেন সরলতা ও আত্মত্যাগের মূর্ত প্রতীক। মুসলিম জাহানের খলিফা হয়েও তিনি এবং তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতেমা (রা) স্বহস্তে সংসারের কাজ করতেন। দরিদ্রতা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি থাকা-খাওয়া, বেশভূষা ইত্যাদিতে মহানবী সা. ও পূর্ববর্তী খলিফাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন। স্বচ্ছ, সরল অনাড়ম্বর ও নিষ্কলুষ জীবন যাপন করতে তিনি গর্ববোধ করতেন।
হযরত আলী (রা) মাত্র দশ বছর বয়সে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। বালকদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মহানবী সা. তাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে ‘আসাদুল্লাহ্” (আল্লাহ্র সিংহ) উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার কারণেই ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বহু নতুন পরিকল্পনা সংযোজিত হয়েছিল।
হযরত আলী (রা) অসাধারণ পাণ্ডিত্য, স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞান গরিমার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, কাব্যদর্শন ও আইনশাস্ত্রে প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। কুরআনের ব্যাখ্যাকারী হিসেবেও তিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। হাদিস বা সুন্নাহ সংরক্ষণেও তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। তাঁর লিখিত ‘দিওয়ানে আলী’ আরবি সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁরই তত্ত্বাবধানে আবুল আসওয়াদ সর্বপ্রথম আরবি ব্যাকরণ রচনা করেন। এ সমস্ত কারণে আল্লাহ্র রাসূল সা. বলেন, “আমি জ্ঞানের নগরী এবং আলী এর দ্বারস্বরূপ।”
হযরত আলী (রা) মহানুভব, দয়ালু, সহিষ্ণু ছিলেন। তাঁর চরিত্রের বহু গুণের সমাবেশ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সতর্কতা ও সময়োপযোগী তৎপরতার অভাব দেখা যায়। তাঁর সদাশয়তা ও উদারতার সুযোগ গ্রহণ করে স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর চরম সর্বনাশ করে। ঐতিহাসিক সৈয়দ আমীর আলী বলেন, “তাঁর চরিত্রে যদি ওমরের কঠোরতা থাকত তবে তিনি দুর্দান্ত আরবজাতিকে আরও কৃতকার্যতার সাথে শাসন করতে সমর্থ হতেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমাশীলতা ও উদারতাকে ভুল বোঝা হলো এবং তাঁর সদাশয়তা ও সত্যপ্রিয়তাকে শত্রুগণ নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করল।” ফলে তাঁকে খিলাফত ও নিজের জীবন বিসর্জন দিতে হয়।
আল্লাহ্‌র রাসূলের প্রতি শর্তহীন আনুগত্যের প্রতীক মহাবীর আলী হায়দর (রা) ৪ বছর ৮ মাস ২৩ দিন খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে ১৭ই রমজান ৪০ হিজরি/৬৬১ খ্রিস্টাব্দে কুফায় শাহাদাত বরণ করেন।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া ও শিশু-কিশোর দ্বীন দুনিয়া

SHARE

Leave a Reply