বিশ্বরাজনীতিতে পরিবর্তনের বৈরী হাওয়া

আবুল কালাম আজাদ

দিন বদলের পালায় বিশ্বরাজনীতির ধারা প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। জাতিগত সংঘাত, ক্ষমতার লিপ্সা, ধর্মীয় ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এখন বিশ্ব টালমাটাল। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মাত্র কয়েকদিন আগে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, সমগ্র বিশ্ব এক বিশাল পরিবর্তনের মুখোমুখি। তিনি অবশ্য আরব বিশ্বের ঘটনাবলির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপে সরকার পতনের হিড়িক পড়েছিল, তেমনি ঘটনার পুনরাবৃত্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে বর্তমান আরব বিশ্বে। সম্প্রতি মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, বাহরাইন, তেহরান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে যুগান্তকারী পরিবর্তনের স্লোগান সজোরে উচ্চারিত হচ্ছে যা অভূতপূর্ব। শুধুমাত্র এ কারণেই ইতিহাসে ২০১১ সাল পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পরিবর্তনের জন্য সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়েছে আইভরি কোস্টের মতো দেশে। আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট লৌহমানব লরেন্ট বাগবোকে ঘেরাও এবং অনেক নাটকীয়তার পর অবশেষে তাকে পাকড়াও করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ করা হয়েছে সেখানে। আবিদজানের বিমানবন্দর দখল করেছে ফরাসি সেনাবাহিনী।
বিশেষ করে আরব বিশ্বের সরকারবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা অনেকটা আপেক্ষিক। এ আন্দোলন প্রথম শুরু হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। একজন বেকার কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট মোহাম্মাদ বওকুজিজি পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদ করে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তার এ আত্মহত্যা তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের সূচনা করেছিল যা কি না আলীর ২৩ বছরের শাসনের পতন ঘটায়। এর পরের ঘটনা মিসরে। হোসনি মোবারক সেখানে ১৯৮১ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু কায়রোর তাহরির স্কোয়ারের গণবিক্ষোভ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মিসরের পর এখন লিবিয়া। গাদ্দাফির ৪১ বছরের শাসন এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। স্পষ্টতই গাদ্দাফির পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, আরব বিশ্বের ২২টি দেশের প্রায় প্রতিটি দেশেই গণবিক্ষোভ হচ্ছে। একনায়কতন্ত্রী শাসন, পারিবারিক শাসন তথা দুর্নীতি, গণতন্ত্রহীনতা, তথা সমাজের মাঝে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি কারণে প্রায় প্রতিটি দেশেই এখন এক ধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছে। আলজেরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকা ক্ষমতায় আছেন ১৯৯৯ সাল থেকে। সেখানে গণতন্ত্র নেই। বাহরাইন শাসন করছে সংখ্যালঘু সুন্নিরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়ারা সেখানে অবহেলিত। বাহরাইনের শাসক হাম্মাদ বিন ঈসা খলিফা ক্ষমতায় আছেন ১৯৯৯ সাল থেকে। আরও গণতন্ত্রের দাবিতে সেখানে আন্দোলন হচ্ছে। ইয়েমেনে আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতায় আছেন ১৯৭৮ সাল থেকে। গণতন্ত্রের দাবিতে সেখানেও আন্দোলন অব্যাহত আছে। গালফ সহযোগিতা সংস্থার একটি মধ্যস্থতা সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট সালেহ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে সেখানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সুদানে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আছেন ওমর আল বসির (১৯৮৯ সাল থেকে), সিরিয়ায় বাসার আল আসাদ (২০০০ সাল থেকে), মরক্কো বাদশাহ মুহাম্মাদ (১৯৯৯ সাল থেকে), জর্ডানে বাদ আবদুল্লাহ (১৯৯৯ সাল থেকে)। প্রতিটি দেশেই আরও গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। সিরিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি ছুড়েছে এবং তাতে ২৩ ব্যক্তি মারা গেছেন। সিরিয়ার রাজনীতির জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেখানে সরকারবিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী হচ্ছে। বাহরাইনে সৌদি সেনাবাহিনী প্রবেশ করে সেখানকার সরকারবিরোধী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলন সেখানে থেমে গেছে, এটা মনে করার কোন কারণ নেই। আলজেরিয়াতেও আন্দোলন হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে আরব বিশ্বে বিকল্প কী? মিসর ইসলামপন্থী সংগঠন ইসলামিক ব্রাদারহুডকে সেখানে বিকল্প ভাবা হচ্ছে। এমনিতেই সংগঠনটি এখন নিষিদ্ধ। কিন্তু তা ভিন্ন নামে ভিন্ন ব্যানারে সংগঠনের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তিউনিসিয়ায় ইসলামিক এম্মাহাদ্দা অত্যন্ত শক্তিশালী। এম্মাহাদ্দার নেতা রশিদ ঘানুচি সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে তিউনিসিয়ার সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নেবে এবং তারা ভালো করবে। তাদের টার্গেট হচ্ছে সংসদকে নিয়ন্ত্রণ করা, অনেকটা ইসলামিক ব্রাদারহুডের মতো। আলজেরিয়ায় ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ও নির্বাচনে বিজয়ের ইতিহাস সারা বিশ্বকে অবাক করেছিল। ১৯৯১ সালে ঐ নির্বাচনে বিজয়ী স্যালভেশন ফ্রন্টকে সেদিন ক্ষমতা দেয়া হয়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেখানে আবার নির্বাচন হলে ইসলামপন্থী দলগুলো যে ভালো করবে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি সময়ে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে সেখানে ইসলামপন্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। আর লিবিয়া থেকে একটি আশঙ্কাজনক খবর রয়েছে। সেখানে কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন আল জামায়া আল মুকাতিলাহ বি লিবিয়া (ইসলামিক ইসলামিক ফাইটিং গ্রুপ) গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্র যে ক’টি সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মাঝে এই সংগঠনটি অন্যতম। এমনকি ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যে ক’টি সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিল, তার মাঝে এই সংগঠনটির নামও ছিল। ফলে লিবিয়া নিয়ে একটা ভয় থেকেই গেল গাদ্দাফির। লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তার অস্ত্রভাণ্ডার খুলে দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র চলে গেছে আল কায়দার হাতে। এই অস্ত্র এখন সমগ্র মাগরেবভুক্ত অঞ্চলে একটি বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। বস্তুতপক্ষে লিবিয়া নিয়ে সমঝোতা ও আশার বাণী শোনা গেলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। বাস্তবতা হলো লিবিয়ার তেলসম্পদের ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রহ অনেক বেশি। আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তেলের রিজার্ভ রয়েছে লিবিয়ায়, যার রিজার্ভের পরিমাণ ৪৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল। যদিও সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় জানা গেছে, রিজার্ভের এই পরিমাপ ৬০ বিলিয়ন ব্যারেল। আর গ্যাসের রিজার্ভ রয়েছে ১৫ শ’ বিলিয়ন কিউবিক ফিট। এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ইতালি। ঠিক তেমনি লিবিয়ার তেলের ওপর নির্ভরশীল স্পেন ও গ্রিস।
যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগ রয়েছে লিবিয়ায়। এই তেল উৎপাদন বিঘিœত হয় কিংবা রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়, এটা বিদেশী তেল কোম্পানিগুলো চাইবে না।
এ দিকে আফগানিস্তানে জাতিসংঘের অফিস আক্রান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন জাতিসংঘ কর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ইসরাইলের বিমান হামলায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণ ত্যাগের কাফেলা দীর্ঘতর হচ্ছে। ইয়েমেনের রাস্তায় রাস্তায় লাখো মানুষ জড়ো হয়েছে। যেমনটি হয়েছিল ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ গণ-অভ্যুত্থানে। পাকিস্তানে প্রায় প্রতিদিন আত্মঘাতী বোমা হামলার কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিল মাসের ৩ তারিখে ৪১ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সেখানে গত ২ বছরে ৪১৫০ জন নিরীহ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানে এখন হিংসা হচ্ছে তাদের প্রতিবাদের পদ্ধতি; হত্যা হচ্ছে তাদের প্রতিশোধের ভাষা। সরকার ও বুদ্ধিজীবী সমাজের পক্ষ থেকে এ জাতীয় মানসিকতা থেকে উত্তরণের কোন প্রকার উদ্যোগও নেই।
বিশ্বব্যাপী বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গঠনের যে মহারণ বর্তমানে সূচনা হয়েছে তারই স্পর্শে এবং ভাবধারায় বিশ্বে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রকে বিদায় জানানোর চর্চা শুরু হয়েছে। এসব কারণেই রাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র যতই শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী হোক না কেন তা দীর্ঘদিন প্রলম্বিত হতে পারে না। তারা যে দ্রুত অগ্রগতির ঝিলিমিলি প্রদর্শন করে জনগণকে সাময়িকভাবে বিমোহিত করে, তা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় না। মহা পরিবর্তনের যে কথা বলা শুরু হয়েছে, বাস্তবে তা হচ্ছে শুধু রাজনীতি নয়, বা ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, এর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট হচ্ছে সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক। এ মহাপরিবর্তন শুধু আন্দোলনরত দেশসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে সমগ্র বিশ্বে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুর্বল দেশসমূহ। ১১ মার্চ ২০১১ জাপানে ৮ দশমিক ৯ মাত্রায় ভূমিকম্প এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট সুনামি সমগ্র বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এখন ফুকুশিমার পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় পানি মিশে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারে ফাটল শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রটির নিকটবর্তী সাগরের চার হাজার গুণ তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়। আর জাপান হচ্ছে বংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম সহযোগী দেশ। জাপানের যেকোন প্রকার বিপর্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন লিবিয়া যুদ্ধ বাংলাদেশী প্রবাসী কর্মীদের জীবনে বয়ে এনেছে বিপর্যয়। বর্তমান আরব দেশসমূহে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রবাসী কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে এবং উপার্জনের পথে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। এ ছাড়াও এ সকল তেলসমৃদ্ধ দেশসমূহে যুদ্ধ ও স ংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে, যার অর্থ হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। এমনি এক পরিস্থিতি হয়েছিল ১৯৭৪ সালে যখন তেলের দাম প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
আরব বিশ্বে এ জাতীয় যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা আছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি আরো জরুরি। এমনিতেই বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুতগতিতে। অনেক দেশ খাদ্যপণ্যসামগ্রী রফতানির ওপর কড়াকড়ি করছে। আবার একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এ ছাড়াও প্রযুক্তিতে নিত্যনতুন পন্থা উদ্ভাবন করে পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুন বাজার ও গ্রাহক সৃষ্টি করছে। সব দিক দিয়ে নানাবিধ ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হচ্ছে।
বিশ্বরাজনীতির বৈরী হাওয়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাজারে যথেষ্ট প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জাপানের সুনামির পর আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে বেশ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। একদিকে জাপানের সুনামি ও অন্য দিকে শাসন ক্ষমতার বৈরী সুনামি মানবজীবনে মারাত্মক অশান্তির প্রবাহ বয়ে যাবে সারা বিশ্বে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যাপারে বিশ্ববাজারে এক মারাত্মক সঙ্কোচন দেখা দেবে। যার প্রভাব বাংলাদেশে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।  যেমন বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে বাজার ব্যবস্থপনার দুর্বলতা বিশেষত সরবরাহজনিত কিছু সঙ্কট মুদ্রাস্ফীতিকে ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মুদ্রাস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর বার্ষিক গড় ভিত্তিতে এ হার ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার হয়েছে ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ, যা গত ৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আর পল্লী এলাকায় খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ। দেশের দ্রব্যমূল্যের লাগাম কোনভাবেই টেনে ধরতে পারছে না সরকার। ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে পড়ছে মূল্যস্ফীতির হার। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এ দিকে কমছে প্রবাসী আয়। ফিরে আসছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। চলতি অর্থবছরের মার্চ শেষে রেমিট্যান্স আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির হার ছিল শূন্যের কোঠায়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আগ থেকেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল। কয়েকটি দেশ থেকে কয়েক হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক ফেরৎ এসেছেন। বেশ কয়েকটি দেশ শ্রমিক নেয়া বন্ধ রেখেছে। নতুন শ্রমবাজার খুলতে পারেনি সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, তফসিলী ব্যাংকগুলোর তারল্যের পরিমাণ ফেব্রুয়ারি শেষে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকায়, যেখানে ২০১০ সালের জুন শেষে তা ছিল ৮৭ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। এ দিকে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংকগুলোর এক্সেল লিকুইডিটি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৮২ কোটি টাকায়। যেখানে ২০১০ সালের জুন শেষে তা ছিল ৩৪ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এ দিকে সারাবিশ্বের প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মূল্য হ্রাস পেলেও ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য ক্রমেই কমে আসছে। জানা গেছে, গত বছর জুলাইয়ের তুলনায় ডিসেম্বর শেষে এসে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে গিয়েছিল। আর ডিসেম্বর মাসের তুলনায় জানুয়ারি মাসের শেষে এসে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন হয়েছে প্রায় আড়াই শতাংশ। পরের মাসে আরো খারাপ হয়েছে।

সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে বিশ্বরাজনীতির প্রভাবে বাংলাদেশের অবস্থাও আশঙ্কা-জনক। প্রশাসনিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মন্দাভাব, নীরব জনতা। রাজনৈতিক গগনেও ভীষণ কালোমেঘের ঘনঘটা, সংঘাতময় সামাজিক অবস্থা, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সকল অপসংস্কৃতির ফাঁদ পাতা হয়েছে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকারে বিবেকবান ব্যক্তিরা যদি এগিয়ে আসেন, বাস্তব অবস্থার নিরিখে ব্যবস্থা নেন তাহলে দেশের দেশের আগামী দিনগুলো হয়তো জনগণের জন্য মঙ্গল হবে।

লেখক : অধ্যক্ষ ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply