বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী (সা) । সাকী মাহবুব

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী (সা)এ বিশাল পৃথিবীটা তখন অশান্তির চরমতম দুঃসময় অতিক্রম করছিল। অধীর প্রতীক্ষায় চাতকের মতো চেয়েছিল একজন মুক্তিকামী মহামানবের দিকে যিনি পৃথিবীর অবিন্যস্ত অবয়ব পাল্টে দিয়ে নতুন করে ঢেলে সাজাবেন পৃথিবীকে, অফুরন্ত আলোর ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত করে দেবেন বিশ্বের প্রতিটি জনপদ। ইনসানিয়াতের সে ব্যাকুল প্রতীক্ষার অবসান ঘটল, মানবতার সামগ্রিক জীবনে শান্তির সৌরভ ছড়িয়ে দিতে, মুক্তির চিরন্তন সওগাত আর অফুরন্ত রহমাতের প্রদীপ প্রতিশ্রুতি নিয়ে ধরায় এলেন আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। তাঁর আগমনে মানবতার চূড়ান্ত বিপ্লব সংঘটিত হলো, ইনসানিয়াত আবার কোলাহল করে উঠল পৃথিবীর চৌদিকে। সৃষ্টি হলো এক কালোত্তীর্ণ ইতিহাস, মানবতা পেল শান্তি ও মুক্তির অনাঘ্রাত আস্বাদ। পৃথিবীতে প্রবাহিত হলো বেহেশতি শান্তির অনাবিল বারিধারা। জান্নাতি সৌরভের ছোঁয়ায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠল সারাটা পৃথিবী। আজ পুনরায় অশান্ত হয়ে উঠেছে পৃথিবী। বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ শক্তিবর্গ নিত্য নতুন শাণিত মারণাস্ত্র নির্মাণে অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে তাদের রক্ত পিপাসা মেটাবার হীন উদ্দেশ্য তাদের এ মানবতাবিরোধী প্রতিযোগিতার ফলে শান্তিকামী মানুষের হৃৎপিণ্ড থরথর করে কাঁপছে। ফলে শান্তির ছোঁয়া যেন ধীরে ধীরে মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং পরাশক্তিগুলোর সাম্রাজ্যবাদী চন্ডনীতির কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে যেন বিপন্ন পৃথিবী ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে। অপরদিকে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন অনিবার্য হয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যে অবিরাম চেষ্টা চলছে এবং বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী জনতা জেগে উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে এ কথা বললে বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলো বিশ্বব্যাপী একটা রক্তপাত ঘটানো ছাড়া সম্ভবত থামছে না। এর কারণও পরিষ্কার। কেননা বর্তমান পরাশক্তিগুলোর কাছে মারণাস্ত্র ছাড়া মানবিক আদর্শ কিছু নেই, যা তাদেরকে যুদ্ধংদেহি মনোভাব থেকে বিরত রাখবে। সত্য কথা হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্ব আদর্শ বিবর্জিত। পাশবিকতার দানবীয় নৃত্য চলছে সমগ্র বিশ্বের নাট্যমঞ্চে। তাই একথা বলার সময় এসেছে যে, একমাত্র বিশ্বমানবতার মুক্তির অগ্রনায়ক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)- এর জীবনাদর্শই পারে বর্তমান যুদ্ধ সংঘর্ষ সংক্ষুব্ধ অশান্ত বিশ্বকে শান্তির নির্ভুল নির্ভেজাল সন্ধান দিতে। আর বিশ্বশান্তির জন্য যে আদর্শের প্রয়োজন, তা কেবল রাসূল (সা)-এর মধ্যেই রয়েছে। তাই এ সঙ্গিন মুহূর্তে দ্রুত পরিবেশিত হওয়া প্রয়োজন শান্তি ও মুক্তির সে সু-মহান পয়গাম আলোচিত হওয়া প্রয়োজন শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান দিশারি হযরত মহানবী (সা)-এর শান্তি প্রতিষ্ঠার সে সুমহান ইতিবৃত্তের কথা, সে প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই চলমান আলোচনার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে আল্লাহ তায়ালা সমগ্র বিশ্বে শান্তির মহাদূত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাই যিনি ইহ-পারলৌকিক উভয় জগতের অখন্ড শান্তি বিধান দিয়ে গেছেন। মানুষ কিভাবে শান্তি লাভ করবে এবং মুক্তি পাবে, কিভাবে ধনী-নির্ধনের সাথে, শ্রমিক মালিকের সাথে, স্বামী স্ত্রীর সাথে, সবল দুর্বলের সাথে, রাজা প্রজার সাথে, রাজা রাজার সাথে, শান্তি রক্ষা করবে, সমগ্র কুরআন ও হাদিসে তার অসংখ্য দিকনির্দেশনা রয়েছে। এ জন্যই স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাকে রাহমাতুল্লিল আলামিন বলে ঘোষণা করেছেন। মহানবী (সা)-এর বয়স যখন পনেরো বছর তখন কুরাইশ ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে নিষিদ্ধ মাসে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উকাজ নামক স্থানে নিষিদ্ধ মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ায় একে হারবুল ফিজার বলা হয়। এ যুদ্ধ দীর্ঘ চার বছর স্থায়ী হয়। মহানবী (সা) তার চাচা আবু তালিবের সাথে অংশগ্রহণ করলেও তিনি কাউকে আঘাত করেননি কিংবা নিজেও আহত হননি। এ অহেতুক যুদ্ধে অসংখ্য লোক প্রাণ হারায় এবং তা তার কোমল হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে। অতঃপর চাচা যুবায়ের এবং দয়ার মূত প্রতীক মহানবী (সা) একান্ত প্রচেষ্টায় আব্দুল্লাহ ইবন জাদআনের ঘরে কুরাইশদের সকল শাখার লোক একত্র হয় এবং উপস্থিত সবাই একটি শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটি হিলফুল ফুজুল নামে পরিচিত যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল (১) মজলুম ও অসহায়দের সাহায্য করা (২) সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা (৩) বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী ও প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করা (৪) পথিক ও মুসাফিরের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (৫) কোনো জালেমকে মক্কায় প্রবেশ করতে না দেয়া এবং দুষ্কৃতকারীদের অন্যায় আগ্রাসন প্রতিরোধ করা। তখন থেকেই শুরু হলো সুন্দরের চেতনায় উজ্জীবিত মহানবী (সা)-এর শান্তি প্রতিষ্ঠার গৌরবদীপ্ত অভিসার। এরপর কার পেরিয়ে সামনে যেতে থাকেন তিনি। যতই সামনে অগ্রসর হন ততই বেড়ে যেতে থাকে তাঁর সচেতন দায়িত্ববোধ। মহানবী (সা)-এর বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বছর, তখন কাবা গৃহের সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং এ মহা কাজে প্রত্যেক গোত্রের লোক অংশগ্রহণ করে কিন্তু হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনের ব্যাপারে তাদের মধ্যকার মতানৈক্য যুদ্ধের রূপ নেয়। মহানবী (সা) সুকৌশলে বিষয়টির সমাধান দেন। ফলে তারা যুদ্ধের দাবানল থেকে মুক্তি লাভ করে। মহানবী (সা) নবুওয়তের দশম বছরের শাওয়াল মাসে তায়েফ গমন করেন। কিন্তু তায়েফবাসী কর্তৃক তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এতদসত্ত্বেও তিনি যে কাতর প্রার্থনা করেন, তা ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে থাকবে। তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন বরং আমি আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশে এমন সন্তান সৃষ্টি করবেন যারা এক অদ্বিতীয় মহান আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তার সাথে কোনো বস্তু শরিক করবে না। মহানবী (সা) নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে মদিনায় হিজরত করেন। তিনি সেখানকার মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘকাল থেকে চলে আসা কলহ বিবাদ সম্পর্কে অবহিত হয়ে একটি সার্বজনীন সনদ উপহার দেন। ইসলামের ইতিহাসে এটি ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। এটাকে পৃথিবীর প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র বলা হয়। এ চুক্তিপত্রে সবাই স্বাক্ষর করে মদিনার সনদ মদিনার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনে বিরাট পরিবর্তন সাধন করে মহানবী (সা)-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে অবসান ঘটে দীর্ঘ দিনের নৈরাজ্যের ও সংঘাতের, যে সম্প্রদায়গুলো পরস্পরে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত ছিল, তারা এখন শান্তিময় নিরাপদ জীবন যাপনের সুযোগ পেল। মদিনার শক্তিশালী যুদ্ধপ্রিয় গোত্রগুলোর মাঝে সংঘাতের পরিবর্তে গড়ে উঠল সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সাম্যমৈত্রীর প্রভাব। এভাবে মহানবী (সা) শান্তি প্রতিষ্ঠার মহানব্রত নিয়ে ক্রমেই এগিয়ে যান মহানবী (সা) এবং সাহাবায়ে কিরাম সুদীর্ঘ ছয় বছর মদিনায় অবস্থানের পর হৃদয়ে মাতৃভূমি মক্কার দর্শন এবং হজব্রত পালনের উদগ্র বাসনা তাদের ব্যাকুল করে তোলে। অতঃপর মহানবী (সা) প্রায় দেড় হাজার হাজার সাহাবা নিয়ে মক্কার উদ্দেশে মদিনা ত্যাগ করেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে কুরাইশ কাফিরদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন এবং অনিবার্য সংঘাত এড়িয়ে সন্ধি করতে রাজি হন। ইসলামের ইতিহাসে এটি ঐতিহাসিক “হুদায়বিয়া সন্ধি” নামে খ্যাত। মহানবী (সা) তাই বলেছিলেন, আল্লাহর শপথ। যাতে যুদ্ধ বিগ্রহ না ঘটে এবং কাবার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে, তৎসম্পর্কে শত্রুরা যেকোনো শর্ত দেবে, আমি তা মেনে নিতে প্রস্তুত আছি।
মহানবী (সা) বিভিন্ন সময়ে রাজা বাদশাহদের কাছে দ্বীনি দাওয়াত সংবলিত চিঠিপত্র প্রেরণ করেন। তার চিঠির প্রতিটি লাইনে শান্তির ললিত বাণী অনুরণিত হয়েছে। এভাবে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান দিশারি রাসূল (সা) প্রথমে আরব ভূখন্ডে মানবতার সামগ্রিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গোটা বিশ্বের সামনে ইসলামের একটা শান্তিময় মডেল পেশ করেন। মূলত এ ছিল গোটা বিশ্বের প্রতি সত্যের কার্যত আহবান। ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে সত্য ও শান্তি সে প্রদীপ্ত পয়গাম ছড়িয়ে দিতে তিনি তদানীন্তন বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়কদেরকেও সত্যের আহবান জানিয়ে দূত মারফত তাদের নিকট পত্র পাঠান। চীন, আবিসিনিয়া, রোম, পারস্য, মিশর প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রনায়কদের প্রতি তিনি পত্র দেন। তাদের অধিকাংশই ধীরে ধীরে সত্যের আহবানে সাড়া দিলেন এভাবে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দিকে শান্তির পয়গাম ছড়িয়ে দিলেন। মানবতার মুক্তির নবী। মহানবী (সা) সে আহবানে তিনটি মহাদেশেই এক আলোড়োন সৃষ্টি হলো। পৃথিবীর খ্যাতনামা সম্রাট ও বীরগণ রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে যা করতে সক্ষম হননি, আরবের উম্মি নবী (সা) শুধু তার বাণী দ্বারাই তা সম্পূর্ণ করলেন।
মহানবী (সা) দীর্ঘ আট বছর মদিনায় অবস্থানের পর দশ হাজার সাহাবা নিয়ে মক্কা বিজয় করলেন। মক্কাবাসী ভাবল আজ আর কারো রক্ষা নেই। যার প্রতি এতদিন আমরা সীমাহীন অনাচার করেছি আজ এ মহা বিজয়ের মহাক্ষণে তিনি আর আমাদের কিছুতেই রেহাই দেবেন না কিন্তু রাহমাতুল্লিল আলামিন শান্তির নবী যেদিন মক্কায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন নিরাপত্তা দিলেন সুদীর্ঘ একুশ বছর যাবৎ জ্বালাতনকারী মানুষগুলোকে, বিশ্ববিবেক এখানে স্তম্ভিত বিমূঢ়। এও কি কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব। মানুষের আত্মা কী করে এত বিশাল হয়!! মানুষ্য বিবেক যা কল্পনা করতে পারে না প্রিয় নবী (সা) তাই করলেন বিশ্ব ইতিহাসে যার কোনো নজির খোঁজে পাওয়া দুষ্কর; এ হলো শান্তিকামী মহানবী (সা)-এর শান্তি সংগ্রামের একটি খন্ডচিত্র।
মহানবী (সা) ঐতিহাসিক বিদায় হজে ৯ই জিলহজ আরাফাতে, ১০ই জিলহজ মিনায়, ১২ই জিলহজ পুনঃ মিনায় এবং গাদ্দিরে খুমে ভাষণ দেন। বিশ্ব ইতিহাসে এসব ভাষণ মানবাধিকার সনদ নামে খ্যাত।
এ সকল ভাষণে বিশ্ববাসীকে শান্তিতে বসবাস করার এবং অশান্তি দূরীকরণের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবন্ধের প্রান্তসীমায় এসে বলা যায় যে, বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নত একাবিংশ শতাব্দীতে মানবতার শান্তি ও কল্যাণের জন্য মানবরচিত অনেক মতবাদ অনেক সংগঠন ও সংস্থার আবির্ভাব হলেও প্রকৃতপক্ষে মানবতার সঠিক শান্তি থেকে বঞ্চিত বরং মানবতার প্রতি চরম নির্যাতন ও শোষণ চলছে। এর ফলে মানবজাতি আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ফিলিস্তিন, কসোভা, আরাকান, আফগানিস্তান, বসনিয়া, চেসনিয়া, কাশ্মির তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। তাই আজ বিশ্বব্যাপী শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য একান্ত প্রয়োজন মানবদরদি হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আদর্শের বাস্তবায়ন ও তার আদর্শের অনুসারী প্রকৃত সেবক মহানবী (সা)-এর পথ ধরেই সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসী শক্তির প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তাই আজ বিশ্বশান্তি ও মুক্তির স্বার্থে ও মানবতার মুক্তি ও কল্যাণের জন্য মহানবী (সা)-এর আদর্শ অনুসরণ ও বাস্তবায়নে মানবতাকে এগিয়ে আসতে হবে। এটি আজকের ইতিহাসের দাবি, সময়ের দাবি, মানবতার আকুতি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here