বিশ্বসঙ্গীতে যেভাবে স্মরণীয় প্রিয় নবী সা. সাকী মাহবুব

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর মহান জীবনচরিত বিশ্ববাসীর জন্য প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও অসীম ভালোবাসার এক জীবন্ত উৎস। সর্বকালের এই সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে নিয়ে বিশ্বসাহিত্যের অনেক খ্যাত অখ্যাত এমন কেউ হয়তো নেই যাঁরা তাঁদের রচনায় রাসূল এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেননি, নতুন কিছু সৃষ্টি করেননি। বিশ্বসাহিত্যের অনেকগুলো শাখার মধ্যে সংগীত বা নাত অন্যতম একটি শাখা হিসেবে বিবেচিত। এই সংগীত সাহিত্যেও রাসূল সা.কে নিয়ে শত সহ¯্র গান-কবিতা নাত রচিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিরা মুখরিত হয়েছেন। আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইংরেজি, জার্মানি, ফরাসি, মালয়, উর্দু, হিন্দি, বাংলা, তামিল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষার সব কবি সাহিত্যিক আর গীতিকারদের অনুভূতিতে একই সুর হে আল্লাহর রাসূল, আমার সত্তা যেন তোমার প্রতি উৎসর্গিত হয়। মুহাম্মাদ সা.-এর নামের যাদুস্পর্শে অনেক ভাষার গতি পাল্টে গেছে। সমৃদ্ধ হয়েছে সেই ভাষার গাঁথুনি। পরিপুষ্টি পেয়েছে এর অন্তঃসত্ত্বা। বিকশিত হয়েছে ভাব। সমৃদ্ধ হয়েছে শব্দ ভাণ্ডার। সম্প্রসারিত হয়েছে আবেগ ও উদ্দীপনা, সম্মোহনী শক্তি ও উজ্জীবনী প্রভা। চলমান প্রবন্ধে আমরা বিশ্ব সংগীতে বিশ্বনবী সা.কে নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো।
রাসূলে কারীম সা.-এর জীবদ্দশায় যুগান্তকারী নাত রচনা করেন সাহাবী কবি কাব ইবনে যুবাইর। প্রথমে তিনি রাসূলে কারীম সা.-এর চরম শত্রু ছিলেন। কিন্তু রাসূল সা.-এর আদর্শ, মহানুভবতা, এবং অনুপম হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে নিজে এসে রাসূলের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সে আত্মসমর্পণও ছিল অতি চমৎকার। কাব তাঁর অমর কাহিনী কাব্য কাসিদায়ে ‘বানাত সুআদ’ খুব জোরে জোরে রাসূল সা.-এর সম্মুখে পাঠ করছিলেন এবং এক জায়গায় এসে থমকে বললেন-
“এ কথা নিশ্চিত জানি ক্ষিপ্ত আজ আল্লাহর রাসূল,
করবেন ক্ষমা তিনি আমার রয়েছে যতো ভুল।”
হৃদয়বান রাসূল সা. অবাক হয়ে বললেন, ক্ষমার মালিক আল্লাহ। তাঁর কাছেই ক্ষমা চাওয়া শ্রেয়। কাব আবার পড়া শুরু করলেন কাসিদায়ে ‘বানাত সুআদ’। এক জায়গায় এসে চিৎকার করে পুনরাবৃত্তি করে বলা শুরু করলেন :
‘তোমার আলোকে নেই পৃথিবীতে কোনো অন্ধকার,
তুমিতো আল্লাহর প্রিয় ঝলকানো
মুক্ত তরবার।’
এ পর্যন্ত এসেই কবি কাব আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। রাসূলে কারীম সা.ও অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকেন কাবের দিকে। অতঃপর তিনি আনন্দ চিত্তে কবিকে নিজের চাদর উপহার দেন। রাসূল সা. যে কত খুশি হয়েছিলেন তা এই চাদর উপহার দেওয়া থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়।
রাসূল সা.-এর প্রিয় সাহাবী কবি হাসসান বিন সাবিত লিখেছেন
“তোমার চোখের মতো ভালো চোখ পৃথিবীতে নেই
এবং কোনো মাতা এমন সুন্দর পুত্র আর প্রসব করেনি এই পৃথিবীর বুকে।
তামার সৃজন সেতো একেবার। দোষমুক্ত করে
এবং তুমিও তাই চেয়েছিলে আপন ইচ্ছায়।
তোমার সুকীর্তি এ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে কেবল
যেমন কস্তুরির ঘ্রাণ বেড়ে চলে বাতাসের আগে।

তোমার প্রশংসা লিখি সে ভাষা আমার জানা নেই,
আমিতো অধম কবি, ভাষার দারুণ দুর্বলতা
প্রশংসা পাবে না নবী নিছক আমার কবিতায়
তোমার পরশ পেয়ে এ কবিতা অমরতা পাবে,
এই আশা বুকে নিয়ে হাসসান থাকবে চিরদিন।”
রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের পর অনেকেই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং অনেক কবি মর্সিয়া বা শোকগীতি রচনা করেনন। এদের মধ্যে নবী নন্দিনী ফাতেমাতুজ জোহরা রা. অন্যতম। তিনি লিখেছেন-
“আমার হৃদয় আজ অন্ধকার, কনামাত্র তার
পড়তো এ বিশ্বে যদি আলো বলে কিছু থাকতো না আর।”
ফারসি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি শেখ মোসলেহ উদ্দীন সাদী। তিনি আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক নাত রচনা করে পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন। তিনি মূলত ফারসি ভাষার কবি কিন্তু তার নাতটি আরবি ভাষায় রচিত। তিনি লিখেছেন,
“বালাগাল উলা বিকামালিহি
কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।”
বর্ণিত আছে সাদী চার লাইনের এই কবিতার প্রথম তিন লাইন লিখে শেষ লাইন কিছুতেই মিলাতে পারছিলেন না। অবশেষে ব্যর্থ মনোরথ কবি ঘুমিয়ে পড়লেন রাতে। সেই রাতেই রাসূলুল্লাহ সা. কবিকে তাঁর পবিত্র দশর্ন দান করেন এবং বলেন, কি হে সাদী! বিষন্ন কেন? কবিতা মিলাতে পারছো না? সাদী উত্তর দিলেন, হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ! নবীজি বললেন লিখে নাও চতুর্থ লাইন–
“সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি”
এই হীরক খণ্ডতুল্য চরণ চারটির অনুবাদ হলো
“মোদের নবী সবার সেরা- নুরুন আলা নুর
নুরে তাঁর হাসল ধরা- আঁধার হলো দূর
কোমল হাসি মিষ্টি অতি মধুর স্বভাব তার
সেই নবী তার স্বজন পরে- দরুদ হাজার বার।”
মুহাম্মাদ শরফুদ্দীন ইবনে সায়ীদ আল বুসিরী আরবি সাহিত্যের কালজয়ী এক অমর প্রতিভার নাম। রাসূলের সা. শানে রচিত তার অমর কাব্য “কাসিদাতুল বুরদা” আজো অত্যন্ত আবেগ ও ভক্তিভরে সারা বিশ্বের মুসলমানগণ আবৃত্তি করেন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত এ কাসিদাটির কয়েকটি লাইন তুলে ধরছি–
“তুমি ছাড়া প্রিয় রাসূল নেই কেহ আর এ সংসারে
কঠোর কঠিন বিপদকালে শরণ নেব যাঁহার দ্বারে।।
শেষ বিচারে মোর সুপারিশ করলে তুমি মহামতি
তোমার উচ্চ শানের হবেনা তায় কোনোই ক্ষতি।।
কেননা যে দু’ জাহানই ফসল তোমার মহা দানের
লওহ কলম জ্ঞান পেলেতো অংশ তোমার জ্ঞানের।।
দয়াল ওগো! লেখক পাঠক শ্রোতা যারা এই কাসিদার
তাদের পরেও ঝরাও তোমার আশিস ধারা প্রেম করুণার।।”
ইরানের সুফি কবিদের মধ্যে হাকিম সানায়ী গজনবী বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি ছিলেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমীর অগ্রদূত। তাঁর রচনার বহু জায়গায় জুড়ে রয়েছে মহানবী সা.। তিনি লিখেছেন-
“তোমাকে আল্লাহ সৃষ্টি মাঝে করেছেন নির্বাচিত
তোমার উপর অহর্নিশি তাই দরুদ শত শত।
চন্দ্র সূর্য শুধু তোমারই অনুগত,
ঘুরে ফিরে রাত্রিদিন তোমাকে তাওয়াফ করে কত!
পূর্ণ তোমার তিলের জ্যোতি সুন্দর তুমি মর্যাদায়,
চেহারা তোমার আলো ঝলমল চিন্তা তোমার প্রতিষ্ঠা পায়।
তোমার ঘোড়ার খুরের ছাপ যে কিবলা ওলি দরবেশের,
তোমার দাসের পায়ের ধুলা সুরমা স্বর্গ হুরপরীদের।
অনন্ত জীবনের চেয়ে তোমার প্রেমে মৃত্যু ভালো,
তোমাকে স্মরি বিষপান, শীতল শরবতের চেয়ে ভালো।”
উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারের অগ্রদূত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি। তিনি ইরানের খোরাসানে জন্মগ্রহণ করেন। এ সুমহান মনীষীকে ফারসি গজল রচনায় ভারতের প্রথম ব্যক্তিত্ব বলা যায়। তাঁর গজলসমূহের মধ্যে রাসূল সা.কে নিবেদিত বেশ কিছু গজল রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
প্রাণের মাঝে যেন মন্জিল করেছে আমাদের প্রিয় মুহাম্মাদ
হৃদয়ের মাঝে শত দরজা খুলেছে আমাদের প্রিয় মুহাম্মাদ।
আহমদের বাগিচায় আমরা ক্রন্দনরত বুলবুল
আমাদের প্রিয় মুহাম্মদের সম্মানে আমরা লুল মারজান।
আমরা গুনায় ডুবে আছি, যতই ওজর খুঁজি আর ক্ষমা চাই
আমরা শুকিয়ে যাওয়া উদ্ভিদ আমাদের বৃষ্টি মুহাম্মাদ।
গুনার জখমের ব্যথায় আমাদের চিন্তা কিসের
মুহাম্মদের শাফায়াত আমাদের চিকিৎসা ও রোগের উপশম।”
শেখ ফরিদুদ্দীন আত্তার নিশাপুরী ফারসি সাহিত্যের মৃত্যুঞ্জয়ী কবি পুরুষ। রাসূলের শানে তার কিছু অসাধারণ নাত রয়েছে। যেমন-
“কী বলব আমি? তাঁর প্রশংসায় আল্লাহই পঞ্চমুখ, যে নামের সাথে মিশে আছে তাঁর নাম
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মুহাম্মাদ সেতো সত্যবাদী আল আমীন,
সম্গ্র জগতের জন্যে শাশ্বত রহমত
দু’ জাহানের শ্রেষ্ঠ মানব
দ্বীন ও দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম সংগঠক।
মুহাম্মাদ, এ বিশ্বের গৌরব তিনি
মানবতার অনন্য শিক্ষক।”
ওলিকুল শিরোমণি নিযামুদ্দীন আউলিার একটি সুপরিচিত নাত হলো-
“ওহে সুবিহ সাদিকের হাওয়া! মদিনার পানে যাও।
মিনতি আমার অধমের একটি সালাম পৌঁছাও।
আমার সালাম পৌঁছে দাও সেই পবিত্র আস্তানা
যেখানে বিরাজ করেন রাসূলগণের বাদশাহ–। রাতদিন আমি কেঁদে কাটাই সেই প্রেমাস্পদের তরে
রাতটা কাবার করি কুরআনের সূরা মুহাম্মাদ পড়ে পড়ে
হে প্রভাতের নির্মল বায়ু!
বাবে রহমত কিংবা বাবে জিব্রিলে আমার সালাম পৌঁছ দিও।”
মীর্জা মাজহার জানে জাঁনা সাধক কবি ও দিল্লির অধিবাসী ছিলেন। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। রাসূলের শানে তিনি লিখেছেন-
“তোমার কায়ায় ছিল নাকো ছায়া হে প্রিয় হযরত
রেখেছ মজুত হাশরের দিনে ছায়া পায় যেন উম্মত।
মুখাপেক্ষী নন আল্লাহ কোনো প্রশংসা প্রায় বান্দার
তেমনি প্রশান্তি চাহে নাকো নবী, হাবীব সে আল্লাহর।
আল্লাহ স্বয়ং যথেষ্ট তাঁর হাবীবের গুণগানে
তেমনি তৃপ্ত হামদ শুনে প্রিয় হাবীবের রহমানের
হে প্রিয় নবী, তোমার অসিলায় আল্লাহকে পেতে চাই
মাবুদের কাছে যাচি, এ নবীর ভালোবাসা যেন পাই।”
আধুনিক আরবি সাহিত্যের প্রধান কবি, মিশরের জাতীয় কবি, কবি স¤্রাট আহমদ শাওকী। আরবি কাব্য সাহিত্যে তার মতো রচনার ধার ও দাপট সমকালে আর নেই। তার রচিত নাত সারা আরব বিশ্বে বেশ শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের সাথে নেয়া হয়েছে। প্রতি নবী দিবসে জাতীয় গণমাধ্যমে রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র এবং সিরাত সংকলন সমূহে তার রচনা প্রচারিত হয় এবং হচ্ছে। প্রাচ্য সংগীতের সম্রাজ্ঞী খ্যাত মিশরীয় সংগীত শিল্পী উম্মে কুলসুমের কণ্ঠে শাওকীর রচিত নাত শুনে যে কেউ প্রেম ও ভাবের অতলে হারিয়ে যাবেন। আহমদ শাওকীর নাতের চুম্বক অংশ হলো–
“হে আল্লাহর রাসূল, আমার কাছে রয়েছে
আপনার নাত ও প্রশস্তির কতিপয় অনিন্দ সুন্দরী রমণী,
যারা নতুন বধূর সাজে সজ্জিত এবং আপনার প্রেমে ব্যাকুল।
সত্যিই তারা অনন্য সুন্দরী।
আপনি যদি অনুগ্রহপূর্বক তাদের কবুল করেন তাহলে তাদের মোহরানা ধার্য হবে
কাল হাশরের দিনে
আপনার উত্তম সুপারিশ।”
উর্দু সাহিত্যের প্রধান প্রধান সব কবিই তাঁদের শ্রম এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নাত রচনায়। ড. আল্লামা ইকবালও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনিও রাসূল সা.কে নিয়ে মনের আবেগ মিশিয়ে লিখেছেন-
“আত্মাতে নেই অনুভূতি, দিলের মাঝে নাই জ্বলন
মুহাম্মাদের বার্তা সবই করেছে হায় বিস্মরণ।”
বাংলা সাহিত্যে হযরত মুহাম্মাদ সা. সংক্রান্ত রচনায় কাজী নজরুল ইসলামের নাম একজন প্রকৃত পথিকৃতের মর্যাদাপ্রাপ্ত। গজল, কবিতা, নাত এবং জীবনী কাব্যে তিনি মহানবী সা.কে অনুপমভাবে তুলে ধরেছেন। এদিক দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে স¤্রাটের আসনে দেদীপ্যমান। তাঁর রচিত গানে নবী প্রেমের প্রবল স্পন্দন রয়েছে। সমালোচকদের ধারণা, ফারসি সাহিত্য ছাড়া অন্য কোনো সাহিত্যে হযরত মুহাম্মাদ সা. সম্পর্কিত এমন মনোরম গানের সন্ধান মেলে না। নজরুল ইসলাম নবী প্রশস্তিমূলক গান রচনার মাধ্যমে বাংলা কাব্যে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছেন। পরবর্তী কবিদের নবী প্রশস্তিমূলক রচনায় এ ধারার প্রভাব অপরিসীম। রাসূল সা.কে কেন্দ্র করে তার লেখা বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো
১. “আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ
এই পথে মোর চলে যেতেন
নূরনবী হযরত।”
২. “তোরা দেখ যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
যেন উষা কোলে রাঙা রবি দোলে।”
৩. “তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদারি কালাম।”
৪. “মোহাম্মদ নাম জপেছিলি
বুলবুলি তুই আগে
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরই গান
এমন মধুর লাগে।”
৫. “আল্লাহকে যে পাইতে চায়
হযরতকে ভালবেসে
আরশ কুরসি লওহ কালাম
না চাহিতে পেয়েছে সে।”
বস্তত তাঁর রচিত নাত, কবিতা ও গজলসমূহ আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা লাভের পর হতে আধুনিক বড় সংখ্যক কবিগণ এই পথ বেছে নিয়েছেন মহামানবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে। এ ধারায় কবি গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, আজিজুর রহমান প্রমুখ যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছেন।
গদ্যে ‘বিশ্বনবী’ লিখে অমর হলেও গোলাম মোস্তফা ছিলেন প্রধানত কবি। তাঁর রচিত কয়েকটি নাত অবিস্মরণীয় ও জনপ্রিয়তার অধিকারী। যেমন : দূর আরবের স্বপ্নদেখি বাংলাদেশের কুঠির হতে, নিখিলের চির সুন্দর আমার মোহাম্মদ রাসূল। গোলাম মোস্তফার এই কালজয়ী নাতগুলো আজও গীত হয়। তবে তার প্রাতঃস্মরণীয় নিম্নোক্ত লাইনগুলো নাত হিসেবে সর্বাধিক জনপ্রিয়। সমকালেও এর জনপ্রিয়তা স্পষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠ –
“তুমি যে নূরের নবী
নিখিলের ধ্যানের ছবি
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি।”
কবি গোলাম মোস্তফা রচিত এই নাতগুলো বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সবাই পড়ে সুমধুর সুরে। কবির হৃদয়ে নবীপ্রেম কত যে গভীর ও তরঙ্গময় ছিলো তা সহজেই অনুমেয়।
ইসলামী রেনেসাঁর অগ্নিপুরুষ কবি ফররুখ আহমদ তার একটি কবিতায় রাসূল সা.-এর প্রশস্তি করেছেন এভাবে-
“তুমি সুন্দর, সুন্দরতম
আদর্শ নিখিলের
হে রাসূলুল্লাহ, জুলমাতে পথ
দেখালে জান্নাতের।
মিথ্যার কাছে মানুষ যখন
সঁপেছিল তার সারা তনুমন
ভাঙ্গিলে তখন নিজ হাতে তুমি
মূর্তি অসত্যের।”
পল্লীকবি জসীম উদদীন রাসূল প্রেমের গভীর আবেগ নিয়ে রচনা করেছেন আমাদের অত্যন্ত সুপরিচিত একটি নাত।
“রাসূল নামে
কে এল মদিনায়
আকাশের চাঁদ কেড়ে
ওকে আনল দুনিয়ায়
গলেতে তসবির মালা
কে চলে ওই কমলিওয়ালারে
ও তাকে ডেকে নিয়ে আয়।”
খ্যাতিমান কবি আজিজুর রহমান নবীপ্রেমে বিভোর হয়ে অনেক অসাধারণ নাত লিখেছেন। রাসূলের প্রতি তার শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে নিম্নোক্ত লেখামালায়
“আকাশ হতে চাঁদ নেমেছে
মা আমিনার কোলে
আঁধার রাতে উঠলো যেন চাঁদের
চেরাগ জ্বলে।”
বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ কবি আল মাহমুদ রাসূল সা.কে তার কলমে তুলে এনেছেন এভাবে-
“এই নামে ফোটে হৃদয়ে গোলাপ কলি
যেন অদৃশ্য গন্ধে মাতাল মন,
যেন ঘনঘোর আঁধারে আলোর কলি
অকূল পাথারে আল্লাহর আয়োজন।”
বাংলা ভাষায় ইসলামী গানের আরেক রত্ন তোফাজ্জল হোসেন খানের রাসূল প্রেমের গানের কলি তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না। রাসূল সা.কে নিয়ে তিনি লিখেছেন-
“হে রাসূল বুঝি না আমি
রেখেছো বেঁধে মোরে কোন সুতোয়
জানি না গোপনে কেমন করে
হৃদয়ে গড়েছো প্রেমের বলয়।
তোমারি নামে আনন্দে দুলি
তোমারি নামে দুনিয়া ভুলি
কী যাদু রাখা এই নামেতে
খোদার পরশে যে নাম আরশে
নাম মোহাম্মদ শুধু মধুময়।”
বাংলা গানের খ্যাতিমান তারকা সিরাজুল ইসলামের বাংলা ভাষায় প্রসিদ্ধ একটি নাত হলো-
“নবী মোর পরশমণি
নবী মোর সোনার খনি
নবী নাম জপে যে জন সেইতো দুজাহানের ধনী

ঐ নামে সুর ধরিয়া
পাখি যায় গান গাহিয়া
ঐ নামে আকুল হইয়া ফুল ফোটে সোনার বরণী।”
সত্যি এমন হৃদয় স্পর্শী নাত বাংলা ভাষায় খুব কমই লেখা হয়েছে। এ নাত যখনই আমরা শুনি ভাবের জগতে তন্ময় হয়ে যাই হৃদয়ে নবী প্রেমের অপূর্ব তরঙ্গ জাগে।
নূরুল ইসলাম মানিক রাসূল সা.কে নিয়ে নাত লিখেছেন, যার সাহিত্যমূল্য অপরিসীম।
“চাঁদের উপমা আমি দিতে পারি না তাঁকে
দেখ ঐ তুচ্ছ চাঁদ কী রকম দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়
অঙ্গুলি নির্দেশে তার।”
জনপ্রিয় কবি সৈয়দ শামসুল হুদা লিখেছেন
“আমার প্রথম ঋণ
তোমার কাছেই প্রিয় নবী।
তোমার আলোয় গড়া আমি
আমার সবি।”
আবদুল হাই মাশরেকী লিখেছেন
“রাসূল নামের দিওয়ানা ভাই, দিল আমার মশগুল।
তাহার প্রেমের গজল গেয়ে, প্রাণ আমার বুলবুল।”
খ্যাতিমান কবি মতিউর রহমান মল্লিক কলমের তুলিতে রাসূল সা. এর ভালোবাসা এঁকেছেন এভাবে-
“রাসূল আমার ভালোবাসা
রাসূল আমার আলো আশা
রাসূল আমার প্রেম বিরহের মূল আলোচনা
রাসূল আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা।”
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি মোশাররফ হোসেন খান নবীর প্রেমে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন-
“সব মানুষের সেরা মানুষ, সব মানুষের সেরা
তারই প্রেমে ব্যাকুল ধরা, তারই প্রেমে ঘেরা।।
তার প্রেমে যে সুধা কত
গন্ধ বিলায় অবিরত
হীরার চেয়ে দামি সে যে, লক্ষ আঁধার চেরা।।”
বাউল সাধক লালন শাহ-র কলমে রাসূল সা. উঠে এসেছেন এভাবে-
“তোমার মত দয়াল বন্ধু আর পাবো না
দেখা দিয়ে দ্বীনের রাসূল ছেড়ে যেও ন্”া
কবি আসাদ বিন হাফিজ বিশ্বনবী সা.কে নিয়ে বেশ কিছু নাত লিখেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো
“আমার সময় কাটে দয়াল নবী তোমার গান গাইয়া
বুকজুড়ে সুখ উথাল পাথাল তোমার বাণী পাইয়া।
জীবন আমার কানায় কানায়
পূর্ণ তোমার বাণীর ছায়ায়।
দিন রজনী দ্বীনের তরী যাই যে আমি বাইয়া।”
তারিক মোহাম্মদ মনওয়ার হোসাইন রচিত একটি সুন্দর নাতে রাসূলের অংশ এরকম-
“তুমি আছো হৃদয়ের গভীরে, ভুলবো তোমায় বলো কি করে
দেখি নাই তোমারে কোন দিন
তবু আছো স্মরনে অমলিন
প্রেমের ভূবনে তোমারি বিরহ ব্যথায়
নিশিথের শেফালীরা ঝরে।”
নবীজীর প্রশংসায় বিশিষ্ট গীতিকার সালমান আযামীর অসামান্য চরণ হলো-
“রাসূল তুমি যে আমার হৃদয় বাগের বুলবুল
তোমার সুরের নিবিড় ছোঁয়ায় তাইতো হয়েছি ব্যাকুল।”
বাংলা ভাষায় ইসলামী গানের জনপ্রিয় মুখ আবু তাহের বেলাল বিশ্বনবী সা.কে নিয়ে লিখেছেন অপূর্ব অনেক নাত। যেমন তিনি লিখেছেন-
“রাসূল নামের ফুলের ঘ্রাণ সবাই মাতোয়ারা
হেসে ওঠে ফুল কলিরা জাগায় ঘুমের পাড়া।।
রাসূল নামের গান শুনে চন্দ্র তারা হাসে
প্রিয় নবী ধ্যানের ছবি মনের পাতায় ভাসে
তার সে নামের তসবি হাতে মন হয় যে দিশেহারা।।”
এভাবে দেশ বিদেশের বহু বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের দ্বারা রচিত নাতধর্মী অনেক চমৎকার লেখামালার বেশ উদ্ধৃতি দেয়া যায়। এই রচনাগুলোর দিকে নিরপেক্ষ ভঙ্গিতে দৃষ্টিপাত করলে সহজেই বোঝা যায়, এগুলো হচ্ছে সিরাতে নববী চর্চার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার এক সোনালি ফসল। বিশ্ব সংগীত বিশ্বনবীর জীবনের বর্ণিল রঙে জেগে উঠুক। সংগীত সাহিত্য ফুলে ফলে সুশোভিত হোক। মহানবী সা. এর অসীম জীবনের জয়গানে যদি মুখরিত হয় নানা দেশের, নানা ভাষার সাহিত্য, তাহলে তা হবে সেই ভাষারই গৌরব।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply