বিশ্বসভ্যতা বিনির্মাণে বিশ্বনবী সা. -ড. আহসান হাবীব ইমরোজ

‘ইকরা’ (পড়)! মহাবিশ্বের মহান ¯্রষ্টা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জিবরাইল আমিনের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বোত্তম মানুষ হযরত মুহাম্মদ সা.-এর কাছে সর্বপ্রথম এই শব্দের মাধ্যমেই মানবতার মুক্তির যুগান্তকারী গ্রন্থের শুভ উদ্বোধন করেন। ৬১০ খ্রিস্টাব্দের মাহে রমাদানের কোনো এক সুন্দর দিনে মরুময় আরবের জাবালে নূর বা আলোর পাহাড়ে প্রায় ৯ শত ফুট উচ্চতায় অন্ধকার পাথুরে হেরাগুহায় যখন এই শব্দটিসহ কুরআনের পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়, ঠিক তখনই শুরু হয়ে যায় মহানবীর সা. মহান শিক্ষা আন্দোলন। এরপর ৫১ কোটি বর্গকিলোমিটার বিস্তৃৃত এই পৃথিবীতে শুরু হয় মানবসভ্যতার এক প্রোজ্জ্বল পরিক্রমা। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইলের ভাষায়, “মুহাম্মদ সা.-এর আবির্ভাব জগতের অবস্থা ও চিন্তাস্রােতে এক অভিনব পরিবর্তন সংঘটিত করে। যেন একটি স্ফুলিঙ্গ তমসাচ্ছন্ন বালুকাস্তূপ নিপতিত হলো। কিন্তু এই বালুকারাশি বিস্ফোরক বারুদে পরিণত হয়ে দিল্লি হতে গ্রানাডা পর্যন্ত আকাশমণ্ডল প্রদীপ্ত করলো।”

সমসাময়িক শিক্ষার অবস্থা
মহানবীর আবির্ভাবের প্রায় এক হাজার বছর আগে এথেন্সে হেমলকপানে আত্মত্যাগ করেন সক্রেটিস। অতঃপর রোমান এবং পারস্য সভ্যতা থিতিয়ে আসে। এই সময়টাকে ইউরোপে অন্ধকারের যুগ বলা হয়। ভারতবর্ষে কিছুটা জ্ঞানচর্চা থাকলেও আরবে ছিল তখন আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগ। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর ভাষ্যমতে, সে সময়ে আরবে মাত্র হাতেগোনা আঠারোজন মানুষ লেখাপড়া জানতো।

রাসূল সা.-এর মহান শিক্ষা আন্দোলন
মুহাম্মদ সা. ছিলেন একজন উম্মি (অক্ষরের ধারণাহীন)। কিন্তু ‘ইকরা’ (পড়) শব্দধারণ করে নবী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরই শিক্ষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনিই হলেন জ্ঞানের শ্রেষ্ঠধারক।
মূলত কুরআনকেন্দ্রিক জ্ঞানের তিনি এতটাই চর্চা করতেন যে, তাঁর শিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বলেছেন, “তুমি এত সাধনা করে শেষাবধি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলো না।” তাঁর প্রেরণায় আবু বকর রা., ওমর রা., ওসমান রা., আলী রা., আব্দুর রহমান রা., তালহা রা., যোবায়ের রা. এরা হলেন এক একজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতাপস। আলী রা. তো সেই সময়কার একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। মহানবী জ্ঞানের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, “জ্ঞানার্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর এবং নারীর জন্য ফরজ।” এর সময়সীমা সম্পর্কে বলেছেন, “তোমরা দোলনা হতে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন কর।” এর বিস্তৃৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আরবি প্রবাদে বলা হয়েছে, “জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও।” রাসূল সা.-এর সাধনার চিত্রকে পূর্ণরূপে তুলে ধরে প্রখ্যাত প্রাচ্য ভাষাবিদ জার্মান পণ্ডিত ইমানুয়েল ডিউস বলেন, “কুরআনের সাহায্যে আরবরা মহান আলেকজান্ডারের জগতের চাইতেও বৃহত্তর জগৎ, রোম সা¤্রাজ্যের চাইতেও বৃহত্তর সা¤্রাজ্য জয় করে নিয়েছিলেন। কুরআনের সাহায্যে একমাত্র তারাই রাজাধিপতি হয়ে এসেছিলেন ইউরোপে, যেথায় ভিনিসীয়রা এসেছিল ব্যবসায়ীরূপে, ইহুদিরা এসেছিল পলাতক বা বন্দীরূপে।”

জ্ঞানের এক মহান জাগরণ
রাসূল সা.-এর এই মহান আন্দোলন সাহাবী থেকে তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ী পর্যন্ত প্লাবনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তী মহান পুরুষদের জীবনে আমরা সেই চিত্র দেখতে পাই। যেমন হাজারো উদাহরণের ভিতর একটি উপমা হিসেবে বলা যায়- ইমাম আবু হানিফা মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্স বা আইনবিজ্ঞানের জন্মদাতা। তার শিষ্যদের ভিতর মুহাম্মদ, আবু ইউসুফ ও জাফরের নাম আজ ইতিহাস-প্রসিদ্ধ। এই মশহুর শিষ্যত্রয়সহ চল্লিশজন শিষ্য নিয়ে আবু হানিফা একটি কমিটি গঠন করেন, মুসলিম আইনশাস্ত্র প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটি প্রায় দীর্ঘ ত্রিশ বছর সাধনা করে মুসলিম আইন মহাকোষ গঠন করেন। এই সাধনায় বিমুগ্ধ হয়ে মশহুর জার্মান পণ্ডিত ভনক্রেমার বলেছেন, ‘এটি ইসলামের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বুদ্ধির ধারণাতীত ফল।’

বিশ্বসভ্যতায় রাসূলের সা. অবদান
রাসূল সা.-কে আল্লাহ তায়ালা প্রজ্বলিত সূর্যের সাথে তুলনা করেছেন। তাই তার প্রভাব ও অবদান সকল কাল ও স্থানের গণ্ডি পেরিয়ে শাশ্বত ও অসীম। আমরা ক্ষুদ্র মানুষ সেটি উপলব্ধি করতে চাইলে একটি নির্দিষ্ট সময় এবং এলাকাকে বেছে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের এলাকাটিই বেছে নিতে পারি। যারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

ইসলামপূর্ব ইউরোপের করুণ অবস্থা
ইসলামের আবির্ভাবের সময় ইউরোপীয়রা অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। তাদের নিজস্ব কোনো সুসংগঠিত ভাষা ছিল না। কুঁড়েঘর ও মাটির ঘর ছাড়া ইংল্যান্ড-ফ্রান্সে দালানবাড়ির সংখ্যা ছিল নিতান্ত নগণ্য; লন্ডনের রাস্তাগুলো ছিল জলাভূমি- সেসব স্থানে বুনোহাঁস ও পাখি ইতস্তত বিচরণ করতো। উইলিয়াম ড্রেপারের ভাষায়, “ইউরোপীয়রা তখনও বর্বর বুনো অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি; তাদের শরীর অপরিষ্কার, মন কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। অধিবাসীরা ঝুপড়িতে বাস করতো; মেঝেতে নলখাগড়া বিছিয়ে দেয়ালে মাদুর টাঙিয়ে রাখতে পারলেই তা বিত্তবানের লক্ষণ বলে ধরা হতো। শিম, বরবটি গাছের মূল এমনকি গাছের ছাল খেয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করতো। (J.W. Draper- History of Intellectual Development of Europe- p.27-28)।
পোপেরা টাকার বিনিময়ে যে সার্টিফিকেট দিতো, তা স্বর্গের গেটের প্রবেশপত্র বলে ধরে নেয়া হতো। পোপদের মতে, যে কোনো ধনবান খ্রিস্টান স্বর্গে যেতে পারতো। অঢেল সম্পদের মালিক ছিল এই পোপেরা। এছাড়া এরা ছিল সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। ভ্যাটিকানের পোপ ছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তি। ইউরোপের সব দেশের রাজাদের ভাগ্য নির্ভর করতো এই পোপের সিদ্ধান্তের ওপরে। পোপের সিদ্ধান্তের প্রতি সংশয় প্রকাশ করায় জনৈক জার্মান স¤্রাটকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে তিন দিন গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। পোপের আদেশ অমান্য করলে সাধারণ লোককে পুড়িয়ে মারা হতো।
ফ্রান্সের রাজা ফিলিপকে পোপ যে অপমান করেছিল, তাতে ক্ষোভে দুঃখে তিনি বলেছিলেন, “হায় সালাদিন, তুমিই সুখী; তোমার ওপরে পোপ নেই- আমিও মুসলমান হয়ে যাবো।” প্রকৃত অর্থে, পোপদের অত্যাচারের কোনো সীমা ছিল না। কুমারী মেয়েদের টেনে নিয়ে যাওয়া হতো হেরেমে। কেউ পোপের আইন অমান্য করলে তাকে জীবন্ত দগ্ধ করা হতো।
সাবানের ব্যবহার অজানা থাকায় এবং অপরিষ্কার থাকা ধর্মপ্রীতির লক্ষণ বলে বিবেচিত হওয়ায় খ্রিস্টানরা সারা বছরেও একবার গোসল করতো না। একবার এক সন্ন্যাসী সুদীর্ঘ সত্তর বছর গোসল না করে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। খ্রিস্টানরা ধর্মগ্রন্থ পাঠের সময়ে শুধু আঙুলের অগ্রভাগে পানি স্পর্শ করে পবিত্র হতো।
শতসহ¯্র মানুষ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যেত। প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাবে সমগ্র ইউরোপ একবার জনমানবশূন্য হয়ে গিয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও প্যারিসের রাজপথে শূকরের পাল চরে বেড়াতো। বৃষ্টি হলে রাস্তায় একহাঁটু কাদা জমতো। লন্ডনের অবস্থাও ছিল এমনি।
সে সময়ে ধর্মীয় আদালত প্রায় দেড় লক্ষ ইহুদিকে মৃত্যুদণ্ডসহ বিবিধ কঠোর দণ্ড দেয়। প্রকৃত অর্থে ধর্ম বলতে ইউরোপে তেমন কিছু ছিল না।
ইউরোপে তখন শিক্ষা বলতে ধর্মীয় শিক্ষাকেই বোঝাতো। আর এই শিক্ষা শুধু সীমাবদ্ধ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু পাদ্রি ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে। এমনকি অনেক পাদ্রি পর্যন্ত কোনো কিছু লিখতে বা পড়তে পারতো না।
প্যারিসের বিশপ পিটারের বৃহৎ লাইব্রেরিতে মাত্র আঠারোখানা পুস্তক ছিল। রাণী ইসাবেলা দুই শ’ একখানা গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন তন্মধ্যে সাতষট্টিখানাই ধর্মপুস্তক। আর এটিই ছিল তৎকালীন খ্রিস্টান ইউরোপের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি। অথচ পরবর্তীতে মুসলিমদের লাইব্রেরিতে চার লাখ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত হয়েছিল।
যদি ইউরোপের বুকে মুসলিমদের আগমন না ঘটতো, তবে হয়তো আজও বিশ্বের বুকে ইউরোপীয়রা সবচেয়ে অনুন্নত, অজ্ঞ ও হীন জাতি হিসেবে বিবেচিত হতো।
মুহাম্মদ সা.-এর ওফাতের (৬৩২ খ্রি:) পূর্বেই বিভিন্ন দিকে আরব মুসলিমদের বিজয় অভিযান শুরু হয়েছিল। মুসলমানরা এবার ইউরোপ অভিযানের জন্য তৈরি হলেন।
কিউটা দুর্গের অধিপতি জুলিয়ান এবং স্পেনের রাজা রডারিকের মধ্যে এক বিবাদ শুরু হলো আর এই বিবাদের সুযোগ নিয়েই মুসলমানরা স্পেনে প্রবেশের সুযোগ গ্রহণ করলেন।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, স্পেনের অভিজাত শ্রেণির লোকেরা তাদের মেয়েদের পাঠাতেন রাজদরবারে। উদ্দেশ্য হলো যে, তাদের মেয়েরা রাজকীয় আইনকানুন শিক্ষা করবে সেখানে। দুর্গ অধিপতি জুলিয়ানও তার মেয়েকে রডারিকের দরবারে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সুন্দরী কন্যা ফ্লোরিন্ডার রূপে মোহিত হলেন রডারিক। কামনা চরিতার্থ করতে গিয়ে সতীত্ব হারালো ফ্লোরিন্ডা।
জুলিয়ান ছিলেন সিংহাসনচ্যুত রাজা উহটিজারের জামাতা। রডারিক উহটিজারকে সিংহাসনচ্যুত করেছিলেন বলে পূর্ব থেকেই রডারিকের প্রতি জুলিয়ানের ক্ষোভ ছিল।
জুলিয়ান রডারিককে উচিত শাস্তি দেয়ার জন্য উত্তর আফ্রিকার সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর-এর দরবারে হাজির হয়ে সজল চোখে তার মেয়ের দুর্দশার কাহিনী বর্ণনা করলেন এবং মুসার সাহায্য প্রার্থনা করলেন।
মুসা, তারিক বিন জিয়াদ নামক নবদীক্ষিত মুসলিম সেনাপতিকে পাঁচ হাজার আফ্রিকান ও বার্বার সৈন্য এবং দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীসহ চারটি যুদ্ধজাহাজ স্পেন অভিযানে পাঠালেন। তারিক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যে পাহাড়ে অবতরণ করেন, তা আজও জাবালুত তারিক বা জিব্রাল্টার নামে অভিহিত। তিনি তীরে ভিড়েই তার সব জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিলেন আর মুসলিম মুজাহিদদের উদ্দেশে বললেন, “আমাদের দুটি পথই খোলা রয়েছে- একটি হলো যুদ্ধে জয়লাভ করা আর অপরটি হলো মৃত্যুবরণ করা। পালাবার কোনো পথ নেই।”
তাদের ছিল সাকুল্যে ৭ হাজার সৈন্য। অন্যদিকে রডারিকের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। অর্থাৎ একজনের মোকাবিলায় প্রতিপক্ষের ভূমিতেই প্রায় ১৪ জন। পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসের ভয়ঙ্কর এক অসম যুদ্ধ!
৭১১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই উভয়পক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। রডারিকের সৈন্যসংখ্যা দেখে মুসলিম বাহিনী প্রথমে কিছুটা ভগ্নোদ্যম হয়ে পড়লো। তারিকের তেজস্বী নেতৃত্বে আর মুসলিম বাহিনীর প্রবল তেজের মুখে খ্রিস্টান বাহিনী পশ্চাৎপসরণ করলো। হাজার হাজার সৈন্য মারা গেল; রডারিক উপায়ান্তর না দেখে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলো।
সেনাপতি মুসা তাঁর নিজ সন্তান আবদুল আজিজকে স্পেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। সেভিল স্পেনের রাজধানী নির্বাচিত হলো।
প্রকৃতপক্ষে এই সময় হতে ইউরোপে রেনেসাঁর সূত্রপাত। শুধু স্পেনে নয় ফ্রান্স এবং ইউরোপের কেন্দ্রভূমিতে এই নবজাগরণের ঢেউ প্রবাহিত হয়।

সে সময় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নগরী : কর্ডোভা
তৃতীয় আবদুর রহমানের সময়ে কর্ডোভার লোকসংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যায়। নগরটি একই সঙ্গে ছিল ব্যুরোক্র্যাটিক, সংস্কৃতমনা, শিক্ষিত এবং বাণিজ্যসফল। কর্ডোভা নগরী ছিল দৈর্ঘ্যে ১০ মাইল, পরিধিতে সাড়ে ৭ মাইল। শহরতলিসহ কর্ডোভার আয়তন ছিল ৫১ মাইল। রাজপ্রাসাদ অবস্থিত ছিল দুইবর্গমাইল জায়গা জুড়ে।
৮টি শহর এবং তিন হাজারেরও বেশি ছোট ছোট শহর কর্ডোভার অধীনে ছিল। প্রতি বছর রাজস্ব পাওয়া যেত ১৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। শহরে ৩টি রাস্তার ধারে রাত্রে সরকারি বাতি জ্বলতো। অথচ এর ৭ শ’ বছর পরেও লন্ডনের রাজপথে কোনো বাতির চিহ্ন ছিল না।
কর্ডোভার সুরম্য অট্টালিকা, বিলাসবহুল বাগান, পণ্যে ভরা বাজার সবকিছুই আধুনিক সভ্যজগতের হিংসার বস্তু। আবদুর রহমানের স্থাপিত রাজধানী কর্ডোভা নগরী ইউরোপের মুকুটে পরিণত হয়। এর বিশালত্ব ও সৌন্দর্যের সুনাম, শত শত মার্বেল নির্মিত বাড়িঘর, তিনটি উপশহর, সূর্যের নিচে সুখী ও সমৃদ্ধশালী জনতার ভিড় সবকিছুই পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়েছিল। উমাইয়ারা কর্ডোভাকে বানিয়েছিল পাশ্চাত্যের সব বিজ্ঞান ও কলার কেন্দ্রস্থল।
শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি কর্ডোভাতে সাতাশটি অবৈতনিক উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়কে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। স্ট্যানলি লেনপুলের ভাষায়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং শিক্ষকরা একে ইউরোপীয় কৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন। ইউরোপের সকল অংশের ছাত্ররা ওই শিক্ষকদের অধীনে পড়তে আসতো।
অথচ ১৪৯২ সালে মুসলিমদের পরাজয়ের পর খ্রিস্টানরা কর্ডোভার মসজিদগুলোকে গির্জায় পরিণত করে; রাজপ্রাসাদগুলোকে ধুলার সাথে মিশিয়ে দেয়। মানমন্দিরগুলোকে গির্জার ঘণ্টাঘর হিসেবে ব্যবহার করে; লাইব্রেরির লাখ লাখ বইপুস্তকে আগুন ধরিয়ে দেয়। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষহেতু ওরা মুসলিম কীর্তির সবকিছুই ধ্বংস করে। পরিণামে আজ কর্ডোভা অজানা, অখ্যাত ও অনুন্নত একটি শহরমাত্র। সূত্র : Stanley Lanepool, The Moors in Spain
তিনি সারা জাহানের রহমত : একই সাথে নোবেল ও অস্কার বিজয়ী মানুষ পৃথিবীতে মাত্র দু’জন। একজন ববডিলান এবং অন্যজন মানবতাবাদী লেখক জর্জ বার্নার্ড শ। সেই প্রাজ্ঞপুরুষ বার্নার্ড শ দৃঢ়তার সাথে বলেন, If a man like him were to assume the dictatorship of the modern world he would succeed in solving its problems in a way that would bring in the much needed peace and happiness. অর্থাৎ “আমি প্রগাঢ় প্রত্যয় পোষণ করি যে, মুহাম্মদ সা.-এর মতো কোনো মানুষ যদি মানবমণ্ডলীকে পরিচালিত করার জন্য বিশ্বনেতৃত্বের আসনে সমাসীন হন, তাহলেই আজকের বিরাজিত জটিল বিশ্ব-সমস্যার সমাধান করে মানবমণ্ডলী যাতে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হতেন।”
আমরা প্রত্যয় পোষণ করি, যখন পৃথিবীতে আবারো রাসূলের আদর্শকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়া হবে, তখনই আসবে শান্তি ও সমৃদ্ধির শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা।
লেখক : গবেষক ও ক্যারিয়ার স্পেশালিস্ট

SHARE

Leave a Reply