বিশ্ব চলচ্চিত্র টার্গেট ইসলাম

জাফর ফিরোজ

বর্তমান সময়ে আমাদের জীবনে চলচ্চিত্রের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রয়োজন মেটায়। তথ্য, শিক্ষা আর আনন্দ বিতরণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র তার সামাজিক দায়দায়িত্ব পালন করে। সেই জন্যই  যাঁরা সমাজের কর্ণধার, সামাজিক বিবর্তনকে যাঁরা একটি নির্ধারিত পথে পরিচালিত করতে চান তাঁরা চলচ্চিত্র শিল্পকে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। নিজেদের ইচ্ছা আকাঙ্খাকে সুকৌশলে চলচ্চিত্রের ফ্রেমে ধারণ করে বিশ্বের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই সাথে তাঁরা এও ছড়িয়েছেন যে, চলচ্চিত্র সমাজ পরিবর্তণ করেনা এটি শুধুই বিনোদন। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকে মনে করেন আধুনিক জগতে এই শিল্পের কোন গঠনমূলক ভূমিকা নেই। ইউনেস্কো এই বিশেষ দৃষ্টি ভঙ্গিতে উদ্বিগ্ন হয়ে শিল্প ও মানুষ  নামে একটি বই প্রকাশ করেন। ১১ টি ভাষায় ১৯৬ পৃষ্ঠার বইটিতে দেখানো হয়েছে নানা উপায়ে শিল্প মানুষের আত্মাকে মূর্ত এবং মানবিক উদ্দেশ্য গুলি সিদ্দির চেষ্টা করেন।
যখন একটি চলচ্চিত্র তৈরী হয় তখন সে চলচ্চিত্রটি বিশেষ কোন ভাষা বা জাতির সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে যায়। জীবন, মৃত্যু, প্রেম, আনন্দ আর বেদনা বিশ্বজনীনতায় তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠে। কারণ তার আবেদন দেশ আর কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনা। এই ভাবে একটি চলচ্চিত্রের কাহিনীর অভিজ্ঞতা কোটি মানুষের অভিজ্ঞতায় পরিনত হয়। চলচ্চিত্রের ভাষা বিশ্বব্যাপি। যদি পৃথিবীর উত্তর মেরুতে কোন একটি চলচ্চিত্র তৈরী হয় তখন দক্ষিণ মেরুর দর্শকদের সেই চলচ্চিত্রটি বুঝতে সমস্যায় পড়তে হয়না। চাই তাতে সাবটাইটেল থাকুক আর না থাকুক। দক্ষিণ মেরুর দর্শকরা উত্তর মেরুর অভিনেতাদের মাঝে নিজেদেও আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেন। তাদেও কাহিনীকে নিজের কাহিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। এই হলো চলচ্চিত্রের ভাষা।
শিল্প কর্মের মাধ্যমে শিল্পী তার আনন্দকে অন্য মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। জীবনের আনন্দকে উপলব্দি করার, আর তার নিমন্ত্রনের ডাকে সাড়া দেওয়ার শক্তি মানুষের মাঝে জিইয়ে রাখে শিল্প। শিল্পী কাজের মধ্য দিয়ে অন্যদের আমন্ত্রণ জানান তার কর্মযজ্ঞের আঙ্গিনায়। তাই আজ চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্প মাধ্যম যার আসন বিশ্ব মাঝে অনেক উঁচুতে। আজ আমেরিকা বিনা কারণে দেশের পর দেশ ধ্বংস করে দুঃখ্য প্রকাশ না করলেও চলচ্চিত্র দুনিয়ার একজন অভিনেতাকে ইমিগ্রেশনে অল্প সময়ের জন্য আটকে রাখার কারণে দুঃখ্য প্রকাশ করতে হয়। কত পাওয়ার আজ এই চলচ্চিত্র দুনিয়ার। এই পাওয়ারফুল অভিনেতাকে কেন ইমিগ্রেশনে আটকে রাখা হয়? কারণ তার পাসপোর্টে যে নামটি লিখা সেটি একজন মুসলমানের নাম। অভিনেতা একজন মুসলিম।
চলচ্চিত্রকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করতে দেখা যায় ‘নো ইয়োর এনিমি’র ব্যবহারের মাধ্যমে। ১৮ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ‘নো ইয়োর এনিমি; ছবিটি একটি তথ্যচিত্র। এই তথ্য চিত্রটি ভিয়েতকঙেরা তাদের নিজেদের প্রশিক্ষণের জন্য তুলেছিল। আমেরিকান সৈণ্যদের আতর্কিত আক্রমণ এবং হত্যাকরার কিছু বাস্তব আর সাজানো দৃশ্য এই ছবিতে দেখানো হয়েছে। পরবর্তিতে এই ছবিটি আমিরিকান সৈণ্যরা লুট করে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজেদের লোকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। ভিয়েতনামের যুদ্ধের পর আমেরিকার যুবকদের মনে এমন একটা বিতৃঞ্চা দেখা দিয়েছিল যে ১৯৭০ সালে একদিন নো ইয়োর এনিমি চিত্র দেখার সময় কয়েকজন আমেরিকান ছাত্র আমেরিকান সৈন্যদের হত্যা করা হচ্ছিল দেখে হাততালি দিয়েছিল।
সব চলচ্চিত্রের মধ্যেই একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে অন্তত তাৎপর্যের দিক থেকে, তবু এমন কিছু চলচ্চিত্র রয়েছে যেগুলি রাজনিতী নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেছে। দ্য ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন, দ্যা ব্যাটল অফ অ্যালজিয়াস, বার্থ অফ এ নেশন, ডেজ অফ রথ, ফোর হানড্রেড ব্লোজ, ওপেন সিটি, ওয়ার এন্ড পিস, লা দোলচে ভিতা, ইয়োরোপ ৫১, সিটিজেন ক্যান, ভিভা জাপাটা, ইনটলারেন্স, আইভান দ্যা টেরিবল ইত্যাদি। চার্লি চ্যাপলিনকে চিনেনা এমন দর্শক হয়তো খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সেই চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন রাজনৈতীক ভাব ধারায় উদ্বুদ্ধ। তাঁর গোফের স্টাইল দেখে বুঝতে কষ্ট হয়না যে চার্লি চ্যাপলিন কাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে যাচ্ছিলেন।
বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র গুলোতে রাজনীতিকে এমন ভাবে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে যেভাবে তরকারীর সাথে লবন মেশানো হয়। এই ধরণের চলচ্চিত্রের  জন্য আজ পৃথিবীতে ক্রমশ জাতিগত বিভেদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। আজ হলিউড, বলিউড আর ডেনিস ফিল্ম ইন্ড্রাস্টি গুলো শুধুমাত্র কোন ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি নয়। এগুলো এককেটা মিশনারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। আজ পর্যন্ত সৌদি আরবে চলচ্চিত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা চলছে । সেখানে নেই কোন সিনেমা হল। তার মানে সৌদি আরবের লোকেরা সিনেমা দেখেন না? আজ সেখানে ঘরে ঘরে হলিউড বলিউডের সিনেমায় হার্ডডিস্ক ভর্তি হয়ে আছে। কলকাতা থেকে মোম্বাই আসার পথে আমার পাশের ছিটে বসা এক যুবকের সাথে পরিচয় হয়। তিনি সাত বছর সৌদি আরবে মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর দোকানে কাজ করতেন। যখন তিনি আমার পরিচয় জানলেন যে আমি ফিল্ম নিয়ে কাজ করছি তখন তিনি আমাকে জানালেন, সৌদি আরবে মোবাইল সার্ভিসিং এর জন্য যত যুবক আসতো তাদের অধিকাংশের মোবাইলে হিন্দী সিনেমা থাকতো। হিন্দী সিনেমা ম্যামোরী কার্ডে লোড করার কারণে এই যুবক জেল ও খেটেছেন কয়েক মাস। আজ সৌদি সরকারের নিষেধ উপেক্ষা করে সৌদি রাজ পরিবারের ধণাঢ্য রাজপুত্র প্রিন্স আল ওয়াহিদ বিন তালাল  ‘কাইফ আল-হাল’ নামে একটি সিনেমা তৈরী করেছেন। বিন তালাল চাইছেন আরব সিনেমার ধারাকে শক্তশিালী করে সমাজের আনাচে কানাচে সিনেমার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলী ছুড়ে দিয়ে রক্ষণশীল সৌদি সরকারকে খেপিয়ে তুলতে। একটি গাছকে বাড়তে দেয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয় ডাল-পালা কেটে সুন্দও ভাবে রাখলে এই গাছটি অবশ্যই মানুষের উপকারে আসবে।
ইসলামকে টার্গেট করে আজ চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে। ঐসব চলচ্চিত্র দেখে মনে হচ্ছে সব অকল্যাণের সাথে যারা জড়িত তারা সবাই মুসলিম! আর কোরআন সন্ত্রাসের মদদ দাতা(আল্লাহ মাফ করুন)। আমাদের স্কৃীপ্ট রাইটিং ক্লাসে প্রায় সিনেমা দেখানো হয় আলোচনার জন্য। একদিন একটি সিনেমা দেখানো হলো; নাম ‘উসামা’। আমরা সবাই বসে সিনেমাটি দেখছি। যখনই স্কৃীনে ভয়ানক কোন দৃশ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে তখন সবাই আমার দিকে তাকায়। আমি প্রথম ভাবলাম রিলাক্স হওয়ার জন্যই সবাই এমনটি করছে। পরে বুঝলাম এখানে একমাত্র আমিই মুসলিম! আর সিনেমাটা আফগানিস্তানের তালেবানদের অত্যাচারের উপর তৈরী। তাই ওরা সবাই আমাকে ফিল্মের সাথে মিলানোর চেষ্টা করছে। ফিল্ম দেখার পর সবাই আমাকে প্রশ্ন করতে থাকে, ইসলামের নিয়ম গুলো এতো নিষ্ঠুর কেন? কেন ইসলাম মহিলাদেরকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হয়? কেন ৮ বছরের বালিকার সাথে ৮০ বছরের বৃদ্ধের বিয়ে হয়? ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ এই সিনেমাটাতে ইসলামকে বিকৃত করে এতই নিষ্ঠুর ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা কল্পনাতীত। এভাবেই একটি চলচ্চিত্র পাল্টে দিতে পারে মানুষের চিন্তার জগৎ।
ডাচ রাজনীতিবিদ পার্লামেন্ট ম্যম্বার এববৎঃ ডরষফবৎং ১৫ মিনিটের একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন যার নাম ঋরঃহধ. এই ছবিটি কুরআন এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তৈরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে সে ঘোষণা করেছে, ঋরঃহধ রং ঃযব ষধংঃ ধিৎহরহম ভড়ৎ ঃযব ডবংঃ. ঞযব ভরমযঃ ভড়ৎ ভৎববফড়স যধং ড়হষু লঁংঃ নবমঁহ. অর্থাৎ ফিতনা হলো পশ্চিমাদের জন্য শেষ সতর্কবার্তা। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ কেবলমাত্র শুরু হয়েছে।
ডববশষু ইষরঃু-এর সম্পাদক সালাহউদ্দিন সোয়াইব চৌধুরী বাংলাদেশের নাগরীক। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করার জন্য সে খ্যাতি অর্জন করেছে। মোসাদের অর্থায়নে এই সোয়েব চৌধুরী ব্লাক নামে ইসলাম বিরোধী সিরিজ চলচ্চিত্র তৈরি করতে যাচ্ছেন। চলচ্চিত্র গুলিতে কোরআনের অপব্যাখ্যা করে শরিয়াহ আইন, জিহাদ, হিজাব, দোররা মারা, বিবাহ ইত্যাদি বিষয় সমুহকে হাইলাইটস করে বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরোদ্ধে জনমত সৃষ্টির পায়তারা করবেন। এর মধ্যেই তার প্রথম পর্বের কাজ প্রায় শেষ।
২০০৯ সালে অস্কার প্রাপ্ত চলচ্চিত্র স্লামডগ মিলেনিয়ার ভারতের প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি । লেখক বিকাশ সরুপ একজন ভারতীয় কূটনৈতিক। তার লেখায় সুকৌশলে তুলে ধরেছেন ভারতীয় মোসলমানদের স্লাম চরিত্র আর আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশন। জামালের ভাই সেলিম আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন। সেলিম নামাজ শেষ করে পিস্তল নিয়ে বের হয় এবং খুন করে।
বলিউডের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘সরকার’। অমিতাভ বচ্চন, অভিষেক বচ্চন অভিনিত রাম গোপাল ভার্মা পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয় অমিতাভ বচ্চনের কাছে রশিদ নামে একজন লোক অবৈধ একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। অমিতাভ বচ্চন রশিদের প্রস্তাবে রাজি হয়না। এরপর শুরু হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা। শেষে দেখা যায় সব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে রশিদ। আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন রশিদ চলচ্চিত্রটির শেষে আরবদেশে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়; কারণ আরব দেশই সন্ত্রাসিদেও জন্য নিরাপদ স্থান। কিন্তু অভিষেক বচ্চনের হাতে তাকে মারা পড়তে হয়।
এবার আসি আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে। সরকারী অর্থায়নে পরিচালিত গেরিলা চলচ্চিত্রিিটর টার্গেট পয়েন্ট কী? এই চলচ্চিত্রে মসজিদেও ইমামকে দিয়ে মানুষকে জবাই করানো হয়। নামাজি দাঁড়ি টুপিওয়ালা লোক গুলি সকল অপরাধের সাথে জড়িত। জয়া আহসানের শরীর থেকে ঘৃণার সাথে বোরকা খুলে ফেলার মাধ্যমে বুঝা যায় এই চলচ্চিত্রের টার্গেট পয়েন্ট কী। হলিউড বলিউডের চলচ্চিত্রে যদিও ইসলামকে আঘাতের ক্ষেত্রে একটু একটু কওে আগাতে দেখি; কিন্তু আমাদেও পয়সায় (সরকারি অনুদান) নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রথম থেকে শেষ টাইটেল উঠার আগ পর্যন্ত এমন পানি ঢালা হয় যাতে এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই ইসলামকে ধুয়ে মুছে শেষ কওে দেয়া যায়। যখন গেরিলা কলকাতায় প্রদর্শনী হলো তখন এক সাংবাদিক পরিচালককে প্রশ্ন করেছিলেন, স্যার আপনার চলচ্চিত্রে তো ইতিহাসকে হত্যা করা হয়েছে। গেরিলা পরিচালক এই প্রশ্নের কোন উত্তরই দিলেন না।
আবু সাঈদ বানিয়েছেন ‘অপেক্ষা’। ছবিটি যখন সেন্সরবোর্ডে জমা দিলেন তখন আমিও সেখানে উপস্থিত। সেন্সরবোর্ডের কর্তাদের বললেন ভাই তারাতারি করেন ছবিটি বিদেশে একটা ফেস্টিভালে দেখানো হবে। তার মানে কী? এই চলচ্চিত্র আমাদেও দেশের জন্য নয়। বিদেশীদেও খুশি করার জন্যই নির্মাণ হচ্ছে এই ধরনের চলচ্চিত্র। কী আছে এই চলচ্চিত্রে? ইসলাম এমন একটি ধর্ম যে ধর্মেও ছোঁয়ায় এলে আধুনিক মনষ্ক তরুনরাও পাইকারী হারে মানুষ হত্যাকে সওয়াবের বিষয় হিসেবে মনে করেন। এই হলো অপেক্ষা!!
তারেক মাসুদের সর্বশেষ ছবি ‘রানওয়ে’। কী নেই এই ছবিতে? রানওয়ে ছবির ভাবনা প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলেন, ‘শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক আর্থসামাজিক আবহ একটি সহজ-সরল ছেলেকে কীভাবে উগ্র ও জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে সাহায্য করে এবং তা তার নিজের জীবনে, পরিবারে ও সমাজের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে এমনি কিছু ভাবনা থেকে ছবিটি। মাদ্রাসায় পড়–য়া এক ছেলে কীভাবে জঙ্গিবাদেও সাথে সমপৃক্ত হয়, কীভাবে আফগানিস্তান-ফেরত মুজাহিদ দলনেতার জঙ্গি শিবিরে শরিক হয় , কীভাবে সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তা দেখানো হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। তারেক মাসুদ সব সময় একটি আদর্শকে লালন করতেন। সে কখনো তার আদর্শেও বাইওে গিয়ে কোন চলচ্চিত্র তৈরী করেননি। তার সব গুলো ছবিতে তার আদর্শেও ছাপ লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে আদর্শ প্রচারের জন্য যদি কোন পরিচালক কাজ করে থাকেন তিনি তারেক মাসুদ। তার মাটির ময়নাতেও দেখি ইসলামের শাস্বত বিধান কোরবানীকে নিয়ে তামাশা করতে। অন্তর্যাত্রায় আজানকে কাকের কর্কশ ধ্বনির সাথে তুলনা করেছেন। আর তার দীর্ঘ সাধনার যে চলচ্চিত্রটির লোকেশন খুঁজতে গিয়ে মারা যান সেটিরও টার্গেট পয়েন্ট তার ঠিক করা ছিল। আজ বাংলাদেশকে জঙ্গীবাদেও স্বর্গরাজ্য হিসেবে যারা বলছেন, যারা বলছেন আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয়পার্টি জঙ্গীবাদেও মদদ দাতা; তাদেও এই কথা বলার পিছনে এইসব চলচ্চিত্রই প্রধানত দায়ী। চলচ্চিত্র যদি সমাজের আয়না হয় তাহলে গেরিলা, রানওয়ে, অপেক্ষা এই চলচ্চিত্র গুলি কোন সমাজের আয়না? এই রকম আর ৫/৭ টা চলচ্চিত্র তৈরি হলে হয়তো আমেরিকার জঙ্গী বিমান বাংলাদেশকে দ্বিতীয় আফগানিস্থানের মর্যাদায় নিয়ে নিবে।
আজ আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যখন সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের মাঝ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। মানুষ একজন আরেকজনকে করছে অবিশ্বাস। বাড়ছে পারিবারিক কলহ , ঘটছে দাম্পত্য জীবনের অবসান। সন্তান মনে করে পিতা মাতা আজ তার কাজের প্রধান অন্তরায়। রাজনীতিবীদদের কল্যাণে ধর্মীয় মূল্যবোধ উল্টো দিকে হাটতে শুরু করেছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ইসলামের সাথে সকল অকল্যাণকে জুড়ে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ) এর সাথে হযরত হাওয়া (আ) এর বন্ধন সৃষ্টি করে দেয়ার মাধ্যমে শুরু হয় পারিবারিক কাঠামো। একসময় মানুষ ছিল যাযাবর। মানুষ ভাল মন্দ বুঝতে শিখল। অসভ্য জীবন থেকে মানুষ সভ্য জীবনে প্রবেশ করে পরিবারপ্রথা গড়ে তুলল। মানুষ বিচিত্র কারণেই সমষ্টিগত তথা পরিবারকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ দিককার কিছু কিছু ঘটনা পরিবার প্রথা বা কাঠামোয় বেশ কিছু পরিবর্তনের সূচনা ঘটিয়েছে যা বিভিন্ন দিক থেকেই এই পরিবার কাঠামোর জন্যে হুমকিস্বরূপ। পরিবার প্রথা বিলোপের জন্য চলচ্চিত্র আজ মোড়লের ভূমিকায় অবতির্ন। পাশ্চাত্যে লাগামহীন স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারণা পরিবার প্রথার মূলে মারাত্মক আঘাত হেনেছে এবং পশ্চিমা পরিবারগুলোর জন্যে ডেকে এনেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ। এখন সেখানে দুই জনের পরিবার ব্যবস্থাও খুব একটা নেই। বাড়ছে নিঃস্বঙ্গতা। যার ফলে প্রতিদিন গড়ে আমেরিকাতে ১৯০০ জন নারী এবং পুরুষ ধর্ষনের শিকার হচ্ছে। পশ্চিমা সেই অন্ধকারকে আলো ভেবে আজ আমাদের ১,৪৭,৫৭০ (প্রশ্নবিদ্ধ) বর্গ কিলোমিটারের দেশ আনন্দে খাবি খাচ্ছে। রেডিও টেলিভিশন সিনেমায় সেই আলোর (অন্ধকার) বান সেকেন্ডে ১,৪৭,৫৭০(প্রশ্নবিদ্ধ) বর্গ কিলোমিটার বেগে প্লাবিত হতে দেখা যায়। যার সুবাধে অনেক সচেতন মানুষও অচেতন মনে সেই বানে গোসল সেরে নিচ্ছেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করে মনে হচ্ছে আমরা আবার গুহার জগতে ফিরে যাচ্ছি। মনুষ্যত্ব বিষর্যন দিয়ে আমরা বন্য হয়ে যাচ্ছি। আমাদের মুখের ভাষায় কোন আভিযাত্য নেই। আমাদের শরীরে কোন বস্ত্র নেই। আমাদের নিজস্ব কোন সংস্কৃতি নেই। আমাদের একটা জিনিসই আছে তা হলো অবাধ স্বাধীনতা। আমরা ইচ্ছে করলে যে কারো বৃক্ষ হতে ফল ছিড়ে খেতে পারি। আমরা ইচ্ছে করলে যে কারো শান্তিতে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারি। আজ মনে হচ্ছে আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। কেউ কারো কথা শুনার প্রয়োজন নেই। কেউ কাউকে মানারও প্রয়োজন নেই। সবাই নেশার ঘোরে টালমাটাল। বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে আমার দেশের হিমসাগর বাদ দিয়ে পশ্চিমা মরা পঁচা ইদুরকে চুষে চুষে খেতে আজ আমাদের রুচিতে বাঁধেনা।
আজ রুচিশীল দেশীয় সংস্কৃতি বাদ দিয়ে শিলা শিলাকি জাওয়ানীতে আমরা উন্মাতাল। আধুনিক হচ্ছিনা! আমাদেরকে পিছিয়ে থাকলে হবে? আমি আধুনিকতায় প্রতিবন্ধক নই। আপনি আলোর গতিতে মনুষত্ব নিয়ে আধুনিক হোন; সমাজ আপনার থেকে সত্যিকারের আলোয় আলোকিত হবে। তবে আধুনিকতার নামে আজ দেশে যা ছড়াচ্ছে তার নাম আধুনিকতা নয় আদিমতা।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে আমরা যাকে আদিমতা বলে জানি তা-ই আজ নতুন নামে নতুন ডিজাইনে আধুনিকতার নামে আমাদের সামনে রাজার আসনে সমাসিন। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটু দৃষ্টিপাত করুন; যেখানে শিক্ষার আলো এখনো পৌঁছায়নি। কী দেখবেন? দেখবেন তারা ভালো মন্দ উপলব্দি করতে পারেনা। পুরুষ ও মহিলারা গাছের পাতা অথবা ছাল দিয়ে লজ্জাস্থান ঠেকে রেখেছে। তাদের গায়ের রং কালো, চুলে শ্যাম্পু করা জানেনা, বিউটি পার্লাও তারা চিনেনা, রাখেনা সভ্য সমাজে চলার অধিকার। আর অন্যদিকে আমরা যারা নিজেদেরেকে আধুনিক মনে করি তাদের গায়ের রং সাদা, চুলে নািমদামী ব্রান্ডের কোন শ্যাম্পু অথবা হেয়ারজেল, ড্রেস মেয়েদেরটা গুহাবাসিদের যা আছে তাই। এই হচ্ছে আমাদের আধুনিকতা! অথচ এই আধুনিক বিষয়টা ছিল কত পবিত্র কত মর্যাদার। সাংস্কৃতিক দেউলিয়ার কারনে আজ আমরা সব হারাতে বসেছি।
আজ চলচ্চিত্রে দেখানো হচ্ছে বোরখা-হিজাব হচ্ছে পশ্চাৎপদতা ও নির্যাতন-নিপীড়ন এর হাতিয়ার! আধুনিকতা বা সভ্যতা’র অর্থ যদি অর্ধ-উলঙ্গ বুঝায় তাহলে তো আদিম যুগের মানুষ পুরোপুরি আধুনিক ও সভ্য ছিল। কারণ তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াত। অথচ তাদেরকে অসভ্য বলা হয়। রাস্তা-ঘাটের উলঙ্গ পাগলা-পাগলিকেও তো তাহলে পুরোপুরি আধুনিক ও সভ্য বলতে হয়। কিন্তু সেটা তো কেউই মেনে নেবেন না।
আজ পণ্যের বিজ্ঞাপন থেকে ছড়াচ্ছে নানা ধরনের রোগ জীবানু। পারফিউমের বিজ্ঞাপনের নামে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে উগ্র যৌনতা। বাচ্চাদের নর্দমায় নামিয়ে দিয়ে ওয়াশিং পাউডারের বিক্রি বাড়াচ্ছে কোম্পানিগুলো। একা একা খেতে চাও দড়জা বন্ধ করে খাও; এর মাধ্যমে শিশু বয়স থেকেই সার্থপর জাতি হিসেবে তৈরী করছে আমাদের। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় দেখেছি মুনাজাতের মত ধর্মীয় আচারকে তারুণ্যের মাঝে পরিবর্তন করে দিতে। অনেক মোবাইল অপারেটর ছেলেমেয়েদের লম্বা সময় ধরে কথা বলায় উৎসাহী করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে হট জোন। ক্লাস বাদ দিয়ে দিনরাত কথা বলে সময় পার করে ছিনতাইকারী চাঁদাবাজ বানাছে আমাদের। কিভাবে মানুষের টাকা মারতে হয় এবং পাওনাদার দেখলে পালাতে হয় তাও আজ আমাদের চলচ্চিত্রের কল্যাণে আমরা আত্থস্থ করতে পেরেছি।
আজ সামাজিক মূল্যবোধ বলতে কিছুই বাকী নেই। বড় পরিবারের সেই জৌলুশ আজ আর খুঁজে পাওয়া যায়না। হিন্দী সিরিয়াল গুলো যেভাবে যৌথ পরিবারে অবিশ্বাস ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাতে আমাদের দেশ থেকে যৌথ পরিবারের প্রথাটা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন স্বামী-স্ত্রী’র ছোট্ট পরিবার। সেখানেও হানা দিচ্ছে গণমাধ্যম। স্বামী এবং স্ত্রীকে আলাদা আলাদা বাসায় রাখার জন্য জোড় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ১৯৫০ এর পর শীতল যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পথে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। গণমাধ্যম এবং প্রচারণার ঐ যুদ্ধের পাশাপাশি পরিবারের নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরে হলিউড ছবি নির্মাণ করতে থাকে। সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি রোধে পরিবার ব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে এই পরিবারব্যবস্থা এবং এর সদস্যরা গণমাধ্যমের প্রভাবশালী প্রচারণা কৌশলের শিকার। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মন-মানসিকতার ওপর, সন্তানের সাথে তাদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলার জন্যে গণমাধ্যমগুলো এখন খুবই শক্তিশালী হাতিয়ার। এই গণমাধ্যমগুলো পরিবার, প্রেম এবং নৈতিকতার মতো বিষয়গুলোর অর্থ ও তাৎপর্যকে উপহাস্য করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পরিবার ব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়েই গণমাধ্যমগুলো তাদের টার্গেটে পৌঁছতে চায়। গণমাধ্যমের প্রভাবের কারণে এরিমধ্যে সারা বিশ্ব জুড়েই পরিবার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা হ্রাস তথা সন্তানাদি কম নেওয়ার জোড় প্রচেষ্টা আজ বিশ্বব্যাপী। ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যতেষ্ঠ, এই প্রচারণা আজ আমাদের দেশে শিশু বয়স থেকে শেখানো হয়। এর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে পারিবারিক বন্ধনকে বিলুপ্ত করে মানুষকে একা নিঃসঙ্গ মানুষে পরিনত করার স্বপ্ন দেখে ষড়যন্ত্রকারীরা।
আজ আমরা হলিউড অথবা বলিউডের চলচ্চিত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। তাদের কাছ থেকে পরিবার বিধ্বংসী কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। তাদের দেশ থেকে সার্টিফাই পদক নিয়ে আমাদের কোমলমতি শান্তশিষ্ঠ পরিবারের মাঝে মহাসমারোহে প্রদর্শন করি। আর আমাদের দেশের মানুষরাও কোন চিন্তা ভাবনা না করে যেহেতু বিদেশ থেকে সার্টিফিকেট অর্জন করেছে সেহেতু দেখা দরকার বলে মনের অজান্তে গিলছে আর রক্ত বমি করছে। তারা এতই শক্তিশালী যে আবার এই সমস্ত ছবির বিজ্ঞাপনে আমার দেশের মন্ত্রি পরিষদ এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারছে। ছবি গুলোতে কী হচ্ছে? অবাধ, স্বাধীন ও নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে, ধর্মকে সকল সাফল্যের প্রতিবন্ধক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ধন-সম্পদ আর খ্যাতি অর্জনের জন্যে পরিবার থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রতি অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে।
পৃথিবীব্যাপী ফিল্ম নির্মাণের স্টুডিওর সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠাতা মার্কিন বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। তাঁর জীবনের শেষ দিকে এসে বলেছিলেন ‘সিনেমার বিচিত্র প্রয়োগের ব্যাপারে আমার খুব উজ্জ্বল স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন ছিল দেখার; সিনেমার সাহায্যে মানুষ কীভাবে অজানা এবং যার যার প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে শিখছে,সরাসরি এবং সুন্দরভাবে। কিন্তু যখনি সিনেমা বিনোদন আর প্রচারের মাধ্যমে পরিণত হলো আমি তখনি হাল ছেড়ে দিয়েছি, কেননা এর মাধ্যমে আর আমার স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হবে না,সেটা আমি বুঝে ফেলেছি’।
আমি স্বপ্নবাজ মানুষ। নিজে প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখি এবং মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পছন্দ করি। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন সিনেমা নিয়ে তাঁর হাল ছেড়ে দিলেও আমি সে হাল ধরতে পছন্দ করি। আমার বিশ্বাস এর মাধ্যমেই আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই ইসলামকে মানবতার ধর্ম হিসেবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন একদল স্বপ্নবাজ তরুণের। যারা পৃথীবির এই কঠিন দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নিয়ে সমগ্র মানব জাতিকে মুক্তি দিবে। সমগ্র সৃষ্টিকুলের ¯্রষ্টা মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ সোবহানাহু তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে সুরা আল ইমরানের ১৩৯ নাম্বার আয়াতে ঘোষণা করেন, “আর তোমরা নিরাশ হয়োনা, দুঃখ করো না; যদি তোমরা মুমিন হও তবে তোমরাই জয়ী হবে।”

লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে অধ্যয়নরত
E-mai : [email protected]

SHARE

Leave a Reply