বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ একজন অভিভাবক হারালো

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

Golam-Azzamবিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষাসৈনিক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার, মজলুম মানবতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, জননেতা অধ্যাপক গোলাম আযম। আজ তিনি নিজেই একটি ইতিহাস, একটি আন্দোলন, একটি চেতনা আর বিশ্বাসের স্মৃতির মিনার হয়ে আমাদের মাঝে দণ্ডায়মান। অধ্যাপক গোলাম আযম একজন সৎ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, খ্যাতিমান অহিংস রাজনৈতিক নেতা, যিনি আন্তর্জাতিকভাবে শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি মুসলিম উম্মাহর একজন অভিভাবক। তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের নামে ৯০ বছর বয়স্ক এ প্রবীণ রাজনীতিবিদকে আমৃত্যু সাজা প্রদান করে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গোটা ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে দেশে-বিদেশে। সর্বশেষ তাঁর কারাগারে ইন্তেকাল, জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি দেশে-বিদেশে অসংখ্য গায়েবানা জানাজা তাঁর ভক্ত-অনুরক্তদের আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদÑ সব মিলে এক শক্তিশালী গোলাম আযম আবির্ভূত হয়েছেন। মনে হচ্ছে এটি তাঁর বিদায় নয়, পুনর্জন্মা এক গোলাম আযম। এই গোলাম আযম বেঁচে থাকবেন মানুষের মাঝে অনন্তকাল। পৃথিবী যতদিন থাকবে আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকেরা তাঁর জন্য দোয়া করতে থাকবে। তাহাজ্জুতে জায়নামাজ ভাসিয়ে আর বায়তুল্লাহর গিলাপ ধরে অনেকেই কাঁদছেন তাঁর জন্য। রাষ্ট্রীয় জাঁতাকলে পিষ্ট, দীর্ঘ কারাবরণের মধ্য দিয়ে দেশে-বিদেশে তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। হাজারো ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় তাঁর বয়োবৃদ্ধ সফল সহধর্মিণী এবং গোটা পরিবারের ধৈর্য, প্রজ্ঞা আর হৃদয় নিংড়ানো চৌকস উপস্থাপনা এবং আবেগধর্মী বিবৃতি, লেখনী, সাক্ষাৎকার, অধ্যাপক গোলাম আযমের আদর্শ পরিবার গঠনের দিকটিও চলে এসেছে জাতির সামনে। জানাজার পূর্বে তাঁর প্রিয় সন্তান (অবসরপ্রাপ্ত) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান-আল আযমীর হৃদয়স্পর্শী আবেগপূর্ণ বক্তব্য, দাফন-পরবর্তী মোনাজাত অধ্যাপক গোলাম আযমের অনুসারীদেরকে এই ব্যথাতুর সময়েও আশান্বিত করেছে। মনে হচ্ছে যোগ্য পিতার যোগ্য উত্তরসূরি ছায়া গোলাম আযম আলোর প্রদীপ ছড়াচ্ছেন। আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ, তিনি যেন সন্তানদেরকে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে কবুল করেন।
এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম। স্বমহিমায় উদ্ভাসিত একজন মানুষ। নিজ যোগ্যতাবলে তার ঐতিহাসিক স্বাক্ষর তিনি নিজেই। তিনিই তার উপমা। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ডাকসুর সাবেক জিএস ছিলেন তিনি। সময়ের সাড়াজাগানো ছাত্রনেতা গোলাম আযম। বর্তমান সময়ের আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্বব্যাপী সমাদৃত, কেয়ারটেকার সরকারের রূপকার, বিশ্বের অসংখ্য দেশে তাঁর ফর্মুলা সমাদৃত। তিনি একজন সফল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি একজন সংগঠক। তিনি নিজে অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী। এই মেধাবী চৌকস ও অভাবনীয় নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন, ক্ষণজন্মা মানুষ ১৯২২ সালে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট ঢাকা থেকে পাস করেন তিনি। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সম্পৃক্ত হন ছাত্র-আন্দোলনের সাথে। ১৯৪৭-৪৮ ও ৪৮-৪৯ সালে পরপর দু’বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জিএস (জেনারেল সেক্রেটারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক গোলাম আযমের ইন্তেকালের খবর প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। এসব খবরে তাকে জামায়াতে ইসলামীর আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এএফপি, এপি ও রয়টাসের্র মতো বার্তা সংস্থা, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও আলজাজিরার মতো টিভি চ্যানেল এবং বিশ্বখ্যাত সংবাদপত্র দি গার্ডিয়ান। গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, গত বছর তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী দাবি করে, তার বিচার ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আলজাজিরায় বলা হয়েছে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এর বিরোধিতা করেছে। আরব নিউজে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি ‘কিংমেকারের ভূমিকা’ পালন করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। তবুও তাঁর ইন্তেকালে বিএনপি একটি শোকবাণীও দেয়নি। বিবিসির খবরে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, তিনি সেগুলো অস্বীকার করেছিলেন। তার সমর্থকেরা মনে করেন, এসব অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিবিসি বাংলায় বলা হয়, ৯২ বছর বয়স্ক গোলাম আযমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে বুধবার বিকেল থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলেন তিনি। ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে খবর আসে। রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান বলে জানিয়েছে তার পরিবার। তবে ঘোষণা আসে রাত ১২টার দিকে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সমালোচকেরা বলে থাকেন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতকে লক্ষ্য করে এবং বিরোধী দলকে দুর্বল করতে ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। (নয়া দিগন্ত)
অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজা এখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্র্রি’, জাতীয় নেতাদের মধ্যে কার জানাজায় এযাবৎকালে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছে এবং কার জানাজায় সর্বনিম্ন মানুষের সমাগম হয়েছে এ নিয়ে। তবে সময় এবং তখনকার (১৯৮১ সালে) জনসংখ্যা বিবেচনায় নিলে সর্বোচ্চ সংখ্যাটি এখনো বোধ হয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার জন্যই সংরক্ষিত রয়েছে। তার পরের অবস্থানটিই প্রফেসর গোলাম আযমের জন্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে বলে অনুমিত হচ্ছে। অধ্যাপক গোলাম আযমের চতুর্থ ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী পিতার জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজার আগে উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এ সময় সেখানে আবেগঘন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন তখন। আমান আযমী বলেন, ‘পৃথিবীর ক্ষণজন্মা মানুষদের একজন অধ্যাপক গোলাম আযম। ছেলে হিসেবে তাঁর জানাজার দায়িত্ব পালনের সুযোগের জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাজার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ কষ্ট করে যারা এখানে হাজির হয়েছেন তাদের সবাইকে আমি, আমার মা এবং পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনাদের মতো আমিও আজ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এখানে হাজির হয়েছি। আমার পিতাকে মিথ্যা মামলায় এক হাজার ১৬ দিন তালাবন্দী করে রাখা হয়েছে। এর প্রতিটি দিন আমার পিতার জন্য, আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য ছিল বেদনার। আমার পিতা সারাজীবন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দিন প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। এটাই ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আপনারা অধ্যাপক গোলাম আযমকে ভালোবাসেন না, আপনারা ভালোবাসেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একনিষ্ঠভাবে নিবেদিত একজন কর্মী গোলাম আযমকে। তার বিদায় মানে ইসলামী আন্দোলনের বিদায় নয়। এ দেশে আরও লাখ লাখ গোলাম আযম তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ, যারা একদিন এ দেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় পতাকা ওড়াবে, ইসলামকে বিজয়ী করবে।’ তার বক্তব্যের এ পর্যায়ে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ উচ্চস্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমার পিতা কর্মজীবনে দেশের আনাচে কানাচে সফর করেছেন। অনেকের সাথে কথা বলেছেন, কাজ করেছেন। এসব কাজের সময় যদি তার নিজের অজান্তে কোনোদিন কেউ যদি কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে, দয়া করে তাকে মাফ করে দেবেন। আমার পিতাকে আল্লাহ শহীদের মর্যাদা দান করুন, জান্নাতবাসী করুন।’ সবাই এ সময় আমিন সুম্মা আমিন বলে ওঠেন উচ্চস্বরে। আমান আযমী বলেন, অধ্যাপক গোলাম আযমের সঠিক মূল্যায়ন সেদিন হবে যেদিন এদেশে দ্বীন বিজয়ী হবে। ইনশাআল্লাহ একদিন এ দেশে দ্বীন বিজয়ী হবে। জান্নাতে যেন আমার পিতার সাথে আমার দেখা হয় সেই দোয়া আপনারা করুন।’
জাতির জীবনে প্রফেসর গোলাম আযম এক জীবন্ত কিংবদন্তি। অধ্যাপক গোলাম আযম বিশ্বব্যাপী উচ্চারিত একটি আওয়াজ। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে সংগ্রাম শুরু হয়, তার সাথে তিনি প্রথম থেকেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে তাকে হাজতবাসসহ শত সহস্র নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এ দেশের ছাত্র-জনতা যখন বুঝতে পারে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে, বাংলা ভাষাকে নির্বাসনে পাঠানোর যে আয়োজন করছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কার্যত অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। এমন এক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিশেষ করে ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে এই সাহসী বীরপুরুষ প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে শরিক হন। এই দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালিত হয়। হরতাল সফল করতে অধ্যাপক গোলাম আযম ডাকসুর জিএস হিসেবে ছাত্রদের সংগঠিত করেন। ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম একটি আন্দোলন, একটি জাগরণ, একটি বলিষ্ঠ নেতৃত্বের নাম। একটি চেতনা ও বিশ্বাসের গগনজোয়ারি কণ্ঠস্বর। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত কেয়ারটেকার সরকার ফর্মুলার রূপকার। মেধা ও নৈতিকতার সমন্বয়ের একটি সম্ভাবনাময় দেশগড়ার চেতনার অগ্রপথিক।
২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এ বিশাল অর্জন একান্ত-ই আমাদের। কিন্তু যাদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের মুখের বাংলা ভাষা। আমরা একবারও কি ভেবে দেখেছি? ভাষাশহীদ আর সৈনিকদের আমরা যথাযোগ্য মর্যাদায় ভূষিত করতে? পেরেছি তাদের যথাযথ সম্মান করতে? এই লড়াইয়ে প্রথম কাতারের-ই একজন অধ্যাপক গোলাম আযম। জীবনের শেষ সময়গুলোতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর ওপর চালানো হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। এটি ছিল অমানবিক! মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশ্বের ইতিহাসে সম্ভবত ভাষার জন্য জীবন দেয়ার ইতিহাস আমরাই কায়েম করতে সক্ষম হয়েছি। আবার বিশ্বের ইতিহাসে সম্ভবত আমরাই প্রথম যারা একজন ভাষাসৈনিককে কারাগারে আবদ্ধ করে রেখেছি আমৃত্যু। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার অন্যায়ভাবে তার জন্মগত নাগরিকত্ব অধিকার হরণ করলেও পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত রায়ে নাগরিক অধিকার ফিরে পান এবং তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। পরে নতুন করে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে আবার সেই একই অভিযোগের অবতারণা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ত্রিশ বছর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে থেকে সর্বশেষ স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণকারী পদের ও ক্ষমতার প্রতি নির্লোভ একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম আযম। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক স্মরণীয় ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত এ প্রবীণ মজলুম জননেতা ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানবজীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে নিবেদিত প্রাণপুরুষ।
জীবনের শেষ সময়েও এ সংগ্রামী নেতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা মিথ্যার কালো পর্দার আড়ালে তার স্বর্ণোজ্জ্বল অনেক অবদানকে ঢেকে রাখার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে নিরন্তরভাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রফেসর গোলাম আযম সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব। গণতন্ত্র উত্তরণে ৯০ এ তার কেয়ারটেকার পদ্ধতি জাতিকে দিয়েছিল মুক্তির দিশা। ১১ জানুয়ারি ২০১২ কারাগারে যাওয়ার আগে জাতির উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘১৯৮০-এর দশকে এবং ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াত ও আওয়ামী লীগ যুগপৎ আন্দোলন করেছিল। সকল আন্দোলনকারী দলের লিয়াজোঁ কমিটি একত্রে বৈঠক করে কর্মসূচি ঠিক করতো। তখন তো কোন দিন আওয়ামী লীগ জামায়াত নেতৃবৃন্দকে যুদ্ধাপরাধী মনে করেনি। ফেব্রুয়ারি ১৯৯১-এর নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ জামায়াতের সহযোগিতা প্রার্থনা করে আমার নিকট ধরনা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতা আমির হোসেন আমু সাহেব জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ সাহেবের মাধ্যমে আমাকে মন্ত্রী বানাবার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তখনও তো আওয়ামী লীগের মনে হয়নি যে, জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী! পরবর্তীতে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াতের সমর্থন লাভের আবদার নিয়ে যখন আমার সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখনও তো তাদের দৃষ্টিতে জামায়াত নেতৃবৃন্দ ‘যুদ্ধাপরাধী’ ছিল না। এরপর এমন কী ঘটলো যে আওয়ামী লীগ ও কতক বাম দল জামায়াতকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে জামায়াতকে নির্মূল করার জন্য জেহাদে নামলেন? এরূপ দু’মুখো নীতি কোনো সুস্থ রাজনীতির পরিচয় বহন করে না। আমি জীবনে চারবার জেলে গিয়েছি। জেল বা মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকেই ভয় পাই না। শহীদ হওয়ার জযবা নিয়েই ইসলামী আন্দোলনে শরিক হয়েছি। মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দিলে শহীদ হওয়ার মর্যাদা পাবো ইনশাআল্লাহ।” বিশ্বনন্দিত মজলুম নেতার এই সাহসী ও দৃঢ় উচ্চারণ এখন বিশ্বমুুসলিম উম্মাহর পথের দিশা। আল্লাহ তায়ালা তাকে শাহাদাতের মর্যাদা নসিব করুন। হজরত সহল বিন হানিফ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি খালেস অন্তঃকরণে আল্লাহর কাছে শাহাদাতের বাসনা করে, সে ব্যক্তি বিছানায় মারা গেলেও আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দেবেন।’ অধ্যাপক গোলাম আযম সেই মর্যাদায় ভূষিত হবেন ইনশাআল্লাহ।
বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, অধ্যাপক গোলাম আযমের রাজনৈতিক সেক্রেটারি ছিলেন। দু’জনই আল্লাহর কাছে পাড়ি জমিয়েছেন। একে অন্যকে ভালবাসতেন প্রাণভরে। দু’জনের মৃত্যুই হয়েছে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টার পর। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা আল্লাহর দরবারে তাঁর মৃত্যু যেন বৃহস্পতিবারে হয় সে কামনা করতেন। আর তার নামাজে জানাজা যেন তাহাজ্জুতের সময় হয়। বলুন তো আবেদন শুনে আমার কাছে জটিলই মনে হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই প্রিয় বান্দার সেই ফরিয়াদও কবুল করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। এই সরকার তার ফাঁসি প্রথম দিন ১১ ডিসেম্বর কার্যকর করতে চেয়েছিল কিন্তু তা আদালতের নির্দেশের কারণেই হয়নি। কিন্তু তাঁর ফাঁসি ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবারই হয়েছে। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দার ফরিয়াদ অনুসারে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে  কবুল করে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করালেন। দ্বিতীয়ত জানাজার নামাজ প্রশাসন ফরিদপুরে ৫টার সময় ঠিক করেছে। কিন্তু শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার কফিন আগেই পৌঁছে যাওয়ায় তাঁর নামাজের জানাজা রাত ৪টার সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলার তার প্রিয় বান্দার ফরিয়াদ অনুসারে তাহাজ্জুতের সময়েই তাকে মাবুদের সান্নিধ্যে তুলে নিলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা সত্যিই শাহাদাতের জন্যই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। আল্লাহ তাঁদেরকে জান্নাতে এক সাথে থাকার তাওফিক দিন।
অধ্যাপক গোলাম আযম কখনও এমপি, মন্ত্রী কিছুই হননি সুযোগ থাকার পরও। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভিনব এবং নির্যাতিত ব্যক্তি অধ্যাপক গোলাম আযম। ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি, চাওয়া-পাওয়া বৃহত্তর স্বার্থে তার ত্যাগ এমন বহু বাস্তবতা এখন দৃশ্যের অন্তরালে। যিনি ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতাসীন সকলের অপবাদের দায়ভার কাঁধে পড়েছে। যিনি দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে সব সময় ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু তার বিনিময়ে সব সরকার থেকে উপহার পেয়েছেন কারাবরণ। বিশ্বজুড়ে তার অসম্ভব খ্যাতি, তাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌতূহলের শেষ নেই। সব সময়ই ঐতিহাসিক সত্য বর্তমান অবস্থায় উপনীত হওয়ার ক্ষেত্র। তার আত্মনির্মাণ এবং বিকাশের ক্ষেত্রে বেশকিছু চিন্তা হিসাব-নিকাশ ছিল সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে ভারতের আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের ক্ষেত্রে অধ্যাপক গোলাম আযমের ৪২ বছর আগের ভাবনা আজকের সবচেয়ে সত্য ও বাস্তবতা এখন আমাদের নতুন প্রজন্মকে ভাবিয়ে তুলছে। অধ্যাপক আযমের দেয়া কেয়ারটেকার ফর্মুলা দেশে-বিদেশে সমাদৃত ও প্রশংসিত। ছাত্রছাত্রীদেরও পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত। রাজনৈতিক চেতনায় সঙ্কীর্ণ শেখ হাসিনার পক্ষে এমন গোলাম আযমকে মানা খুবই অসম্ভব। তার উদ্ভাবন, চিন্তা, আবিষ্কার তাকে টিকিয়ে রাখবে শতাব্দী থেকে শতাব্দী। তিনি মুসলিম উম্মাহর একজন অভিভাবক ছিলেন। মুসলিম উম্মাহর সমস্যা সমাধানে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা স্বীকৃত।
ব্যক্তি গোলাম আযম নিজেকে এমনভাবে গঠন করেছেন, তাঁর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, কথাবার্তা, চলন, বলন প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন প্রিয় নবী রাসূলে করীম (সা)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী। বাইরে এবং ভেতরে মিলিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একটি প্রতিষ্ঠানরূপে। অধ্যয়ন, অধ্যবসায়, সময়জ্ঞান সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন সত্যিই ব্যতিক্রম। অধ্যাপক গোলাম আযমকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন যে কয়েকজন তাদেরই একজন তাঁর পার্সোনাল সেক্রেটারি নাজমুল ইসলাম। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, বাইরে এবং ভেতরে মিলিয়ে একজন মানুষ কতটুকু স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও সাদামাটা হতে পারেন তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অধ্যাপক গোলাম আযম নিজেই। যাকে জামায়াত অফিস থেকে যে খামে করে চিঠি দেয়া হতো, তিনি সেই ইনভেলাপ ফেরত দিয়ে বলতেন, এটি ফেরত দিও এটা জামায়াত অফিসের সম্পদ। গোলাম আযম সাহেব সামান্য অদূরে তাঁর কোন নিকটাত্মীয়ের বাসায় সংগঠনের গাড়ি নিয়ে গেলে এসে বলতেন যে, তেলের টাকা আমি দেবো কারণ এটা আমার ব্যক্তিগত কাজ। জনশক্তির জন্য তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, একজন শিক্ষক এবং একজন উত্তম দায়ী। ব্যক্তিগত রিপোর্ট পর্যালোচনায় তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করাকে। তিনি বলতেন, ফজরের নামাজ যে জামায়াতে আদায় করতে পারে না সে আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদ হবে কিভাবে?
অধ্যাপক গোলাম আযম নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সারা দেশব্যাপী সফরের অংশ হিসেবে লক্ষ্মীপুরের জনসভায় তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে বিরাট এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তাঁর আগমনের প্রতিরোধের ঘোষণাও আসে আওয়ামী বামদের পক্ষ থেকে। ঐ জনসভার স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সারারাত জাগ্রত থাকার পর ফজরের নামাজের জামায়াতে দেখি অধ্যাপক গোলাম আযম ফজরের জামায়াতে নিজেই উপস্থিত। মসজিদেই শৃঙ্খলা বিভাগের কর্মীদের উদ্দেশে তিনি কথা বলবেন বলে ঘোষণা দেয়া হলো। নামাজ শেষে তিনি এসে আসন গ্রহণ করলেন। আমার সেদিন মনে আছে তাঁকে প্রথম দেখায় তাঁর সুন্দর চাকচিক্যময় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো হাসিপূর্ণ সালামের জবাব মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের সকল ক্লান্তি-বেদনা দূরীভূত হয়ে গেল। একজন নেতার চাহনি, মুখের ভাষা, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা কর্মীদেরকে কিভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারে স্যারকে প্রথম দেখা সেই থেকে বুঝেছি। এ যেন মনে হচ্ছে এক জাদুর আকর্ষণ। বাইরে থেকে অনেকেই তাঁকে দেখতে পারছিলো না। অনেকেই উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে। তখন তিনি হেসে উঠে বললেন, আমার চেয়ারটি এমন জায়গায় রাখ যেন সবাই আমাকে দেখতে পায়। কারণ সকল শ্রোতাই বক্তাকে দেখতে চায়। এ জন্যই মানুষ রেডিওর ভেতরের ব্যক্তিকে দেখা যায় না জেনেও রেডিওর দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তরুণ বয়সের প্রথম দেখা অধ্যাপক গোলাম আযম। গোলাম আযমের চারিত্রিক জাদুর প্রভাবে সেদিন যে আকৃষ্ট হয়েছিলাম, সর্বশেষ তাঁর একান্ত খাস কামরায় স্টাডি সার্কেলের একজন নগণ্য ডেলিগেট হিসেবে আজ নিজেকে সবচেয়ে বেশি ধন্য মনে হয়।
২৮ অক্টোবরে শহীদ মুজাহিদুল ইসলামের নানা বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আহমদ জামায়াতে ইসলামীর প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। তিনি আমাদেরকে বলেছেন, ‘আমি কিন্তু গোলাম আযমের জালে আটকা পড়া জামায়াত কর্মী।’ পরবর্তীতে তিনি রুকন হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন। এ জন্যই গোলাম আযমের প্রতি ছিল আমার প্রচণ্ড ক্ষোভ। আমি একদিন শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করতে মগবাজার কাজী অফিস মসজিদে আসি। এরপর অধ্যাপক গোলাম যখন খুতবা দিতে দাঁড়ালেন, তখন আমি তাঁর নূরানী চেহারার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে বলে ফেললাম এই লোক আর যাই করুক মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে পারে না। তাঁর বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা কাল্পনিক, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অধ্যাপক গোলাম আযম যখন তাঁর লিখিত বক্তব্য দিতে লাগলেন তখন আমি হতবাক হয়ে শুনতে লাগলাম এবং ভাবলাম যে, একজন জেনারেল শিক্ষিত মানুষ কুরআন-হাদিসের উপরে কতটা দক্ষ হলে এভাবে নিজের তৈরি করা লিখিত খুতবা দিতে পারেন।’ অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন মানুষ তৈরির কারিগর। তিনি ছিলেন মাওলানা মওদূদীর সাহচর্যে গড়ে ওঠা ইসলামী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল প্রদীপ। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, মহিলা জামায়াত, ছাত্রীসংস্থার নেতৃত্ব তৈরির জন্য পরিচালনা করতেন স্টাডি সার্কেল। সে সার্কেলের একজন সদস্য হয়ে আজ নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করি। একান্ত নিভৃতে তাঁর সান্নিধ্যে সাহচর্য এবং ¯েœহ-ভালোবাসা আজ আমাদেরকে কাঁদায়। স্টাডি সার্কেলের সেই ছোট কামরায় তাঁর ইন্তেকালের পর প্রায় ৩২ ঘণ্টা কাটিয়েছি। চেয়ারগুলো আগের মতোই পড়ে আছে, লাইব্রেরিটি আগের মতোই সাজানো। কিন্তু সবকিছুই আছে আগের মতোই। শুধু নেই সকলের প্রিয় মানুষ অধ্যাপক গোলাম আযম।
অধ্যাপক গোলাম আযম সত্যিই নেতৃত্বের একটি উঁচু মিনার। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একবার ছাত্রশিবিরের কার্যকরী পরিষদের অধিবেশনে তিনি সাবেক আমীরে জামায়াত হিসেবে প্রধান অতিথি হয়ে এলেন। এসেই তিনি আমীরে জামায়াতের চেয়ারটিকে হাত দিয়ে পাশে রেখে অন্য আরেকটি চেয়ারে বসলেন। বসেই বললেন, জানো এই চেয়ারটিতে বসি নাই কেন? কারণ এটি আমীরে জামায়াতের। আনুগত্য হলো যিনি চেয়ারে থাকেন তাঁর। আমি নিজেও এখন তাঁর জনশক্তি। তিনি হেসে হেসে একথাগুলো বলেছেন আর আমরা বিস্ময়করভাবে আনুগত্যের সংজ্ঞা শিখেছি। আনুগত্য একেই বলে। এ জন্যই হয়ত তিনি আমীরে জামায়াত যেন তাঁর নামাজের জানাজা পড়ান সেই অসিয়ত তিনি করে গেছেন।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, সব মিলিয়ে আজ আমাদের মাঝে এমন এক গোলাম আযম উপস্থিত যার প্রজ্ঞা, লেখনী, চিন্তা, রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি, ক্ষমা, মহানুভবতা, নিয়মানুবর্তিতা, ধৈর্য এবং সহনশীলতার মতো যাবতীয় মহৎ গুণাবলির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মাঝে কালোত্তীর্ণ। নির্যাতিত-নিপীড়িত, নিষ্পেষিত জনতার অধিকার এবং মর্যাদাবোধ সম্পর্কে এক আবহ তৈরি করতে সাহায্য করেছে, যার উদাহরণ নিকট অতীতে বিরল, একবিংশ শতাব্দীর উষালগ্নে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ইসলাম, জাতিগত অধিকার এবং সচেতনতা, পারস্পরিক মর্যাদাবোধ নিয়ে বিশ্ব যখন চরম সঙ্কটের মোকাবিলা করছে, ঠিক তেমনি একটি মুহূর্তে নিজের কর্মমহানুভবতার মাধ্যমে স্বমহিমায় নিজেকে এমনই এক প্রতীকে রূপায়িত করেছেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম। তা নিকট অতীতে খুবই বিরল। বাংলার বুকে লক্ষ কোটি মানুষ এখন ইসলামের পতাকাতলে সমবেত। পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল তার পদচারণায় মুখরিত হয়ে দ্বীন কায়েমের চেতনায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যারা জীবন দিতে জানে কিন্তু মাথা নত করে না এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে। তারা চিরদিন গোলাম আযমকে মনে রাখবে, চিরদিন ভালবাসবে, সম্মান করতে থাকবে নিজের গরজে। তার লেখনী ইসলামের পথে উজ্জীবিত করবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। অনাগত যুবকদের জন্য তিনি হবেন নতুন পথের দিশা এবং ঘটবে নবোত্থান। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করেছে তাঁর আদর্শ। শুধু এ দেশে নয়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ছাত্র-আন্দোলনের গোড়াপত্তন তিনিই করেছেন। তাঁর সন্তানের বক্তব্যেই ছিল, এক গোলাম আযমের বিদায়ের মধ্যে এ দেশে হাজারো গোলাম আযমের জন্ম হয়েছে। সত্যিই তাই হবে ইনশাআল্লাহ। যাকে শ্রদ্ধা পেতে রাষ্ট্রের কোনো আইনের প্রয়োজন পড়বে না। অধ্যাপক আযমের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় তার সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়েছে। আর তার আবিষ্কৃত কেয়ারটেকার সরকার আদায়ের আন্দোলনে সময়ের ব্যবধানে সব রাজনৈতিক দল একই আওয়াজ তুলেছে। ভাষার জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করেও ভাষার মাসেও তিনি থেকেছেন বন্দী। এটি আমাদের ব্যর্থতা, জাতির জন্য লজ্জাজনক। এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। বৃদ্ধ বয়সে একাকী নিভৃতে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ ছিলেন। জীবনের শেষ সময়গুলো এ জাতি তাঁর শেষ অসিয়ত নসিয়ত থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাঁর পরিবার, তরুণ সমাজ এবং তাঁর ভক্তরা। অসংখ্যবার বাথরুমে পড়ে পায়ের চামড়া উঠে যাওয়া এবং তাঁর কষ্টের খবর কাঁদায় দেশে বিদেশে অনেক ভক্ত ও অনুরক্তকে। হে জাতীয় বীর, আপনাকে বিনম্র্র সালাম ও অভিনন্দন। এ জাতি আপনার সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতে পারেনি, এ জন্য আমাদের ক্ষমা করবেন।
১১ জানুয়ারি ২০১২ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে যাওয়ার পূর্বে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত একটি বক্তব্যের কয়েকটি লাইন দিয়ে লেখাটির ইতি টানছি। তিনি লিখেছেন, ‘আমার দীর্ঘ ৫০ বছরের কর্মজীবনে সারাদেশে ব্যাপক সফর করেছি। জনগণের মধ্যেই বিচরণ করেছি। উন্নত নৈতিক চরিত্রে ভূষিত হওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধের অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে তোলা হচ্ছে তা কখনো জনগণ বিশ্বাস করবে না। আমাকে ফাঁসি দিলেও জনগণ আমাকে আল্লাহর সৈনিক হিসেবেই গণ্য করবে ইনশাআল্লাহ। পরিশেষে বলতে চাই, দেশের মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য আমি নিজের সারাজীবন উৎসর্গ করেছি। আত্মপ্রচার বা আত্মপ্রতিষ্ঠা কখনোই চাইনি। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমিই একমাত্র কর্মক্ষম থাকা অবস্থায় দলীয় প্রধানের পদ থেকে অবসর নেয়ার মতো নজির সৃষ্টি করেছি। কোনো প্রতিদান বা স্বীকৃতি কারো কাছে কোনো দিন চাইনি; এখনো চাই না। আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট। তবে আফসোস, দেশ এবং জাতির জন্য যা চেয়েছি তা দেখে যেতে পারবো কিনা। দোয়া করি, আল্লাহ এই দেশকে এবং দেশের মানুষকে হেফাজত করুন, দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করুন। আল্লাহ তাআলা দেশের মানুষকে দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতের মুক্তি দান করুন। আমিন। আপনাদের নিকট দোয়া চাই। আল্লাহ তাআলা যেন আমার নেক আমলগুলো মেহেরবানি করে কবুল করেন, যাবতীয় গুনাহখাতা মাফ করেন এবং আখিরাতে সাফল্য দান করেন।’

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও
সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply