বুকের ভেতর ঢেউ তোলে স্বপ্নেরা -সালাহউদ্দিন আইউবী

চলতি বিশ্বের অন্যতম একটি আলোচিত বিষয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের আন্দোলন। We want justice স্লোগানে তারা মুখর করে তোলে দেশের রাজপথ। টানা এক সপ্তাহের সড়ক অবরোধে কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশ। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল শ্রেণীর ছাত্রদের মধ্যে একটি সুশাসনসম্পন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরাসহ বিশ্বের সকল আলোচিত মিডিয়া শিশু-কিশোরদের এ আন্দোলনের সংবাদ প্রচারে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রচারে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। বর্তমান সরকারের তীব্র দমন- পীড়নের মাঝেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সময়ের ভাইরাল স্লোগান We want justice. হৃদয়ের গভীরে একটি ন্যায়নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার আকাক্সক্ষা ফুঁসে উঠেছে কোটি জনতার স্লোগানে। শুধু বলতে পারছে না যে স্বাধীনতার স্বাদ আমাকে অন্যায় শিখায়, দুর্নীতির সয়লাব জড়িয়ে দেয়, অত্যাচার-নির্যাতনকে একটি সামাজিক রূপ দান করে, আমরা এমন স্বাধীনতা আর চাই না। আমরা চাই এমন এক সমাজ যে সমাজে প্রতিটি মানুষের জন্য থাকবে ন্যায়বিচার সুশাসন আর ভ্রাতৃত্বের অকৃত্রিম বন্ধন।
কোটি কোটি ছাত্র-জনতার এই স্লোগানে একাত্মতা পোষণ করেছে বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষ। তারাও একটি সুশাসন সম্পন্ন সমাজব্যবস্থা চায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের দুঃশাসনে সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত এ সমাজে সুশাসন পাওয়া কি সত্যিই সম্ভব?
Justice means the quality of being fair, impartial or just. Conformity to truth, fact, or reason : correctness. The principle or ideal of just dealing or right action. অথবা সুশাসন বলতে বোঝায় সুবিচার করা, সমান করা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা সর্বক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করা।
আমরা যদি একটু দূরদৃষ্টি দিয়ে বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার ও অসত্যের সয়লাব। দিনের পর দিন রাস্তা বন্ধ করে যাদের কাছে ন্যায়বিচার চাওয়া হচ্ছে যাদের দিকে লক্ষ্য করে স্লোগান দেয়া হচ্ছে we want justice তারাই তো আজ বিচারহীনতার সংস্কৃতির পরিচালক, তারাই তো সকল অন্যায় অবিচার দুর্নীতির মূল কুশীলব। যে পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে আমাদের সমাজব্যবস্থা এই পদ্ধতির গোড়ায় গলদ। মানবরচিত এই পদ্ধতির শুরু থেকেই আশ্রয় নেয়া হয়েছে এক ধরনের কপটতার। আশ্রয় দেয়া হয়েছে অন্যায়, অবিচার, অসত্য আর দুর্নীতিকে। যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে রাস্তায় লাইসেন্স চেক করার জন্য দেখা যাচ্ছে তার নিজেরই লাইসেন্স নেই।
যে সংসদ সদস্য আর মন্ত্রিপরিষদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন করতে সে মন্ত্রী কিনা বেআইনিভাবে রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে আসার সময় তোপের মুখে পড়ে আবার ফেরত গিয়েছেন জনসম্মুখে। যে ঘর থেকে অন্যায় দূর করার জন্য নীতিমালা তৈরি হয সে ঘরের ইট বালি খোয়া অর্থাৎ প্রতিটি উপাদান অন্যায়ভাবে গেঁথে রাখা হয়েছে।
পৃথিবীর ইতিহাস বলে মানবরচিত কোন পন্থায়, কোন পদ্ধতিতে, কোন কৌশলে, কোন আইনকানুন নিয়মনীতিতে সুবিচার পাওয়া যায়নি। যুগে যুগে বিশ্বময় সুবিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এ মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার আনীত বিধান অনুসরণের মাধ্যমেই। আজও আমাদেরকে যদি সুবিচার পেতে হয় তাহলে এগোতে হবে সেই সুবিচারের পথে; যে পথের পরিচালক মহান সৃষ্টিকর্তা নিজেই। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে কিতাব নাজিল করেছি যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। (সূরা হাদিদ : ২৫)
মহান আল্লাহতালা সুবিচার নিশ্চিত করার জন্যই বিশ্ব পরিচালনার সনদ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে জাস্টিস শব্দটির আরবি সংস্করণ ‘আদল’ শব্দটিকে ১৪ বার এবং সমার্থক শব্দ ‘কিসত’ ব্যবহার করেছেন ১৫ বার।
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিয়ে বলেন- নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে কতই না সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া কত সুন্দর করে বলেছেন, আল্লাহ ন্যায়নীতিপূর্ণ রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন যদিও সেটি অমুসলিম রাষ্ট্র হয় আর মুসলিম রাষ্ট্র হলেও অত্যাচারী রাষ্ট্রকে তিনি সাহায্য করেন না। মূলত আল্লাহর বিধান মেনে ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এ জন্যই বলা হয় ‘No justice no peace’ নেই বিচার নেই তো শান্তি নেই।
ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয়ে যায় যখন আমরা আল্লাহর বিধানকে অমান্য করে বিভিন্ন কারণে পক্ষপাতিত্ব করি। কোনরূপ করুণার বশবর্তী হয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ন্যায়ের মানদণ্ডের সামান্য হেরফের করা যাবে না। ন্যায়বিচারের ব্যাপারে পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজন কিংবা ধনী-দরিদ্র রাজা-প্রজা ক্ষতিগ্রস্ত হোক না কেন ন্যায়ের মানদণ্ড অবশ্যই স্থির রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর ঘোষণা : হে ঈমানদারগণ! ঈমানের ওপরে প্রতিষ্ঠিত থাক আল্লাহর জন্য তোমরা ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান কর তাতে যদি তোমাদের নিজেদের কিংবা তোমাদের মাতা-পিতার অথবা আত্মীয় স্বজনের ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী বা দরিদ্র হয় তবে জেনে রেখো আল্লাহ তোমাদের চাইতে অধিকতর শুভাকাক্সক্ষী। অতএব তোমরা ন্যায়বিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা এড়িয়ে যাও তবে মনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সকল কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবহিত। (সূরা নিসা : ১৩৫)
দলকানা ভূমিকার কারণেও বাধাগ্রস্ত হয় ন্যায়বিচার। আমরা কোন না কোন দলের কর্মী অথবা সমর্থনকারী। তাই বলে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কোন কাজ নিজের দলের সুবিধার জন্য করবো এটি কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না। অথচ বর্তমান সমাজে দলীয় কর্মীদের এ ধরনের আচরণ সহসাই পাওয়া যায়। বিশেষ করে কোনো ইসলামী আদর্শবাদী দলের কর্মীদের কাছে কখনোই এটি প্রত্যাশা করা যেতে পারে না। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সত্য সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকো এবং কোন দলের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অবিচারে প্ররোচিত না করে। সুবিচার করবে এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী আর আল্লাহকে ভয় কর। তোমাদের কর্ম সম্পর্কে আল্লাহ জ্ঞাত। (সূরা মায়িদা : ৮)
ন্যায় ও পক্ষপাতহীন বিচারব্যবস্থার এক অনন্য নজির ছিল খেলাফতে রাশেদার রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মিসরের গভর্নর মালিক ইবনে হারিসকে লিখিত এক পত্রে বলেন, একজন শাসকের জন্য এটাই সবচাইতে বড় আনন্দ ও তৃপ্তি যে, তার দেশ ন্যায়নীতি, সুবিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং শাসকের প্রতি নাগরিকদের মনে আস্থা ও ভালোবাসার মনোভাব বিরাজ করছে। তিনি আরো বলেন, ‘যথাযোগ্য ন্যায়বিচার কর। যারা শাস্তির উপযুক্ত তাদের শাস্তি দাও। তারা তোমার আত্মীয় হোক বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হোক। তোমাকে অবশ্যই দৃঢ় ও সতর্ক থাকতে হবে, অন্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি তোমার আপন লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাতে ভ্রুক্ষেপও করো না। এ ধরনের কাজ তোমার জন্য বেদনাদায়ক হতে পারে। এ ধরনের দুঃখ বেদনা সহ্য কর এবং পরবর্তী জগতে যে কল্যাণ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তার প্রত্যাশা করতে থাকো।
মানুষ অত্যাচারিত হয়েই বিচারকের দ্বারস্থ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিচারকের দায়িত্ব অপরিসীম। আমরা যখনই যে যেকোনো বিচারকের আসনে আসীন হই না কেন- এ বিষয়ে সজাগ ভূমিকা রাখতে হবে যে আমি সত্যিকারার্থে ন্যায়বিচার করছি কি না? জাতি-ধর্ম-বর্ণ শ্রেণীর সম্প্রদায় উঁচু-নিচু নির্বিশেষে ন্যায়বিচার করা বিচারকের দায়িত্ব। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী থেকে আমরা এ ব্যাপারে নির্দেশ পাই। কেয়ামতের ভয়াবহ দিনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী আল্লাহর আরশের নিচে আশ্রয় পাবেন। মহানবী সা: বলেছেন, ‘হাশরের মাঠে সাত শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহপাক তার আরশের ছায়াতলে স্থান দিবেন।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতবাসী হবে। ১. ন্যায়বিচারক শাসক, যাকে সৎ কাজের যোগ্যতা দেয়া হয়েছে। ২. যে ব্যক্তি আত্মীয়স্বজন ও মুসলিম ভাইদের প্রতি দয়া ও বিগলিতপ্রাণ। ৩. যে ব্যক্তি সৎচরিত্রের অধিকারী এবং পারিবারিক দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন, আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ বিচারকের সাথে থাকেন যতক্ষণ সে অন্যায় অবিচার না করে আর যখন সে অবিচার করে তখন আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেন এবং শয়তান তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
অন্য বর্ণনায় এসেছে- অর্থাৎ যখন সে অবিচার করে তখন তার দিকে সেটিকে সোপর্দ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক দিন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সদাকা লিপিবদ্ধ করা হয়। তন্মধ্যে দু’জন ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়বিচার করাও সদাকা হিসেবে গণ্য করা হয়।
রাসূলুল্লাহ্ সা: বলেছেন, ‘যদি কোনো জাতির মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত না থাকে, তখন তাদের মধ্যে রক্তপাত ছড়িয়ে পড়ে।’ আদল বা ন্যায়বিচারের আবেদন সার্বজনীন এবং এর পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র আদল বা ন্যায়বিচারের কর্মপরিধি রয়েছে। শুধু আদালতের কাঠগড়ায় নয়; বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রেই আদল প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব রয়েছে। সন্তানদের মধ্যে, একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, লেখক হিসেবে লেখার ক্ষেত্রে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রসহ জীবনের সকল দিক ও বিভাগেই রয়েছে আদলের প্রয়োজনীয়তা। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা: আল্লাহর রাসূল ও ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখেননি। একদা তিনি মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, আমার কাছে কারো কোনো প্রাপ্য থাকলে সে যেন আমার নিকট থেকে তা চেয়ে নেয় এবং কারো ওপর কোনো অবিচার করে থাকলে সে যেন আমার কাছ থেকে তার প্রতিশোধ নেয়। এ কথা শুনে সাওদা ইবনে কায়স (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা: আপনি যখন তায়েফ থেকে ফিরছিলেন, তখন আপনি উটের পিঠে আরোহী ছিলেন। আপনার উট চালানোর চাবুকটি উপরে তোলার সময় আমার পেটে লেগেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সা: নিজের পৃষ্ঠদেশ উন্মুক্ত করে দিয়ে বললেন, আজ তুমি প্রতিশোধ গ্রহণ করো। তখন সাওদা ইবনে কায়েস রা: রাসূলুল্লাহ্ সা:-এর ওপর প্রতিশোধ নেয়ার বিপরীতে জাহান্নাম থেকে আল্লাহর নিকট মুক্তি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ্ সা: বললেন, হে সাওদা! তুমি কি প্রতিশোধ নিচ্ছ, নাকি ক্ষমা করে দিচ্ছ? সাওদা রা: বললেন, আমি বরং ক্ষমা করে দিচ্ছি।
রাসূলুল্লাহ্ সা: বলেন, ‘মনে রেখো তোমাদের পূর্বে যত জাতি অতিবাহিত হয়েছে তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, তাদের মধ্যকার কোনো অভিজাত বা ভদ্রলোক চুরি করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হতো। আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর আইনের দণ্ড কার্যকর হতো। আল্লাহর শপথ! আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করত অবশ্যই আমি তার হাত কেটে ফেলার আদেশ দিতাম। (বুখারী) তারিখুত তাবারিতে এসেছে আব্বাসীয় খলিফা মনসুর বলেছেন, চার প্রকার লোক হলো একটি রাষ্ট্রের খুঁটি : ১. বিচারক, যিনি সুবিচার করেন ২. পুলিশ অফিসার, যে দুর্বলকে শক্তিশালী থেকে রক্ষা করেন এবং নিজের দায়িত্ব ঈমানদারির সাথে পালন করে থাকেন ৩. কর আদায়কারী অফিসারগণ, যারা জনগণের প্রতি অন্যায় না করে নিজের দায়িত্ব পালন করেন ৪. সেই গোয়েন্দা অফিসার যিনি উল্লিখিত তিন প্রকার ব্যক্তিদের রিপোর্টের সত্যায়নের জন্য শেষ সিলমোহর লাগিয়ে থাকেন।
চলমান বিশ্বের অধিকাংশ আইন ত্রুটিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ। সময়ের সাথে সাথে প্রতিনিয়ত এই আইন পরিবর্তিত হয়েও সমাজের জন্য উপযোগী ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করতে পারছে না। অন্যায় প্রতিরোধে ডামাডোল পিটিয়ে নতুন কোনো আইন করার কিছুদিনের মধ্যেই নতুন আইনের ত্রুটি ধরা পড়ছে। বাংলাদেশের চলমান আইনকে নিয়ে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ মন্তব্য করে বলেছিলেন, ‘আইন মাকড়সার জালের মত গরিব কেউ পড়লে আটকে যায়, বড়লোকেরা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে।’
ন্যায়বিচার পেতে হলে প্রয়োজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। ন্যায়নীতি ও সৌধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজব্যবস্থা। যে সমাজব্যবস্থায় থাকবে না পারস্পরিক কোন রেষারেষি, লোভ, প্রতিহিংসা, অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার। কোমলমতি শিশুরা মনের অজান্তেই হৃদয়ের আহাজারি নিয়ে রাজপথে নামে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়।
তাদের সে স্লোগান দেখে আমার ভাবনার ঘোড়া ক্লান্ত হয়। আর তীব্র বেগে ছুটতে চায় না। বারবার নিজেকেই দাঁড় করাই বিবেকের কাঠগড়ায়। এই ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গগনস্পর্শী উচ্চারণে “উই ওয়ান্ট জাস্টিস স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করতে কী লাগে? শুধুই সাহস? এই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের রক্তের সঙ্গে আমার রক্ত মিশে গিয়ে পাপ-পঙ্কিলতা আর কলুষতায় ভরে যাওয়া বাংলাদেশের জমিনকে কি আরেক বার পবিত্র করতে পারে না? অভ্যুদয় ঘটাতে পারে না কি এক নতুন বাংলাদেশের? যেখানে মন্ত্রীর বীভৎস দাঁত কিংবা চুমুতত্ত্ব থাকবে না। যেখানে জিঘাংসা থাকবে না, গাড়ির চাপায় নিঃশ্বাস বায়ু বেরিয়ে যাওয়ার ভয়াবহতা কিংবা থেঁতলে নরম শরীরটা এবড়ো থেবড়ো হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাময় দৃশ্য দেখতে হবে না। যেখানে বিশ্বজিতের খুনিরা বিচারব্যবস্থার বিশাল ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে তার পরিবারের মানুষদের সামনে পৈশাচিক হাসির মহোৎসব করতে পারবে না। যেখানে আবার জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব রক্তে লাল হবে না। ক্লাস ছেড়ে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের দুই নম্বর গেট কিংবা বহদ্দারহাট উত্তাল করতে হবে না। যেখানে বাবার কান্না, মায়ের আহাজারি, ভাইয়ের হাহাকার আকাশ বাতাস ভারী করবে না।
এত কষ্ট, যন্ত্রণা, হাহাকার আর হৃদয়ের দগ্ধতার মাঝেও সুদিনের সোনালি ভোরের স্বপ্ন দেখতে বড্ড ইচ্ছে করে! অবাধ্য অবুঝ মন স্বপ্ন এঁকে যায়। বড় মধুর সে স্বপ্ন। যে স্বপ্ন বুকের সমুদ্রে ঢেউ তোলে। উত্তাল জলরাশি তীরে এসে আছড়ে পড়ে জানান দেয় মহান প্রভুর আনুগত্যের নজরানা। হৃদয়সমুদ্রের তীরে পত পত করে উড়তে থাকে বিজয়ের পতাকা। যে পতাকার নাম বাংলাদেশ, এক অন্য রকম বাংলাদেশ।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply