বেকারত্বের করাল গ্রাসে বাংলাদেশ । আবির রাইহান

আমাদের দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে হবে। বেকার ভাতা প্রদান, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, উদ্যোক্তা হওয়ার লোনসহ হস্ত ও কুটির শিল্পের প্রসার ও কর্মসংস্থান ঋণ দিয়ে তরুণ বেকার ছাত্রসমাজকে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে বেকারত্ব যতটা সুখকে হ্রাস করে , অন্য কোন ঘটনা ব্যক্তির ততটা ক্ষতি করে না।


 

বেকারত্বের করাল গ্রাসে বাংলাদেশ‘হে দারিদ্র্য; তুমি মোরে করেছ মহান’ এই লাইনটির লেখক আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু এদেশের তরুণ শিক্ষিত বেকারের কাছে এই কথাটির সার্থকতা খুব কমই মানানসই। কারণ ‘দারিদ্র্য’ যখন মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিষ্ঠ আকার ধারণ করে, তখন এদেশের শিক্ষিত বেকারের কাছে মহান হওয়ার কল্পনাটি একেবারেই বৃথা। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইনটি সমালোচনার বিষয় নয়। কারণ উনার মতো মহান ব্যক্তির সমালোচনা করার ন্যূনতম যোগ্যতা আমাদের নেই। এদেশের তরুণ শিক্ষিত বেকারের করুণ আর্তনাদ আমাদের সমাজকে কলঙ্কিত করে। এ যেন মারাত্মক ব্যাধি হয়ে দেশের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়ন প্রতিযোগিতাপূর্ণ-প্রযুক্তিভিত্তিক পৃথিবীর এই স্বাধীন বাংলাদেশে বেকারত্ব একটি অভিশাপ। বেকারত্ব হলো শ্রমশক্তির সেই অংশ যারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে কাজের সন্ধান করা সত্ত্বেও কোন কাজ পায় না। কাজের চাহিদার সাথে শিক্ষাব্যবস্থা সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। আজকে দেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সেই উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় তরুণসমাজের অংশগ্রহণ একেবারেই কম। প্রতি বছরে উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক থাকছে বেকার। বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট- Economist Intelligence Unit (EIU)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪৭% শতাংশ স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থীই বেকারের খাতায় নাম লিখিয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো এদেশের তরুণেরা যত বেশি পড়াশোনা করছে, তত বেশি তাদের বেকার থাকার ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নিষ্ক্রিয় তরুণের হার ২৭.৪% শতাংশ। বেকারত্ব নামক এই সামাজিক ব্যাধির করাল গ্রাসে এদেশের মানুষই শুধু জিম্মি নয় এদেশের প্রতিটি পরিবার ও সমাজও জিম্মি। বেকারত্বের কারণ ও হার নিয়ে সম্প্রতি অনেক প্রতিবেদন আমাদের চোখে পড়ে। বাংলাদেশ পরিসখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এদেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৭৭ হাজার, যা গত বছরের চেয়ে ৮৭ হাজার বেশি। বর্তমানে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৩৫ লাখ হলেও এদের একটি অংশ যে পুরোপুরি বেকার তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের তরুণদের বেকারত্বের হার কম না বেশি তা জানতে দেশী বা বিদেশী জরিপের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন BPSC-এ প্রতি বছর চাকরিপ্রার্থীর বর্ধিত সংখ্যা দেখে তা বোঝা যায়। ৪০তম বিসিএস-এ রের্কডতম প্রার্থী আবেদন করেছেন, যার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বেকারত্বের হার পর্যালোচনা করলে ILO-এর এক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে যার চিত্র ফুটে ওঠে; এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মাঝে বেকারত্বরের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২৭তম। সুতরাং বেকারত্ব যে মানবসমাজকে অপ্রতুলভাবে গ্রাস করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেকারত্ব বৃদ্ধির হার দেখলে বুঝা যায় একদিকে এদেশের শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছে অন্যদিকে উচ্চহারে বেতন দিয়ে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত ও দক্ষকর্মী আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদেশী কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। যার বার্ষিক বেতন দেশকে পরিশোধ করতে হয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এদিকে বেকারত্বের বোঝা ও হতাশার কালো ছায়া মাথায় নিয়ে সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আত্মহত্যা জাতিকে করছে লজ্জিত। অন্যদিকে আরেক বেকার গোষ্ঠীর ছিনতাই, রাহাজানি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসাসহ অনেক অসামাজিক অপকর্মে সুশীলসমাজ শঙ্কিত। বেকারত্ব বিষের জ্বালার মতো কলুষিত করে যুবসম্প্রদায়কে। একজন বেকার যুবকের জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রও কলুষিত হয়। এই সামাজিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে না পারলে সামাজিক ও মানসিক ব্যাধির করাল গ্রাস থেকে তরুণসমাজকে বের করে আনা সম্ভব নয়। ফলে এই সমাজের উন্নয়ন ও সম্মান নিম্ন থেকে নিম্নস্তরের দিকে ধাবিত হবে। এ জন্য দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা; দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান তৈরি। তা ছাড়া আমাদের শিক্ষিত সমাজকে সরকারি চাকরির জন্য বসে না থেকে বেসরকারি চাকরির দিকে ধাবিত হতে হবে। একজন ভালো মানের উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে তৈরির চিন্তা মাথায় নিতে হবে। সর্বোপরি আমাদের দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রকে মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে হবে। বেকার ভাতা প্রদান, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, উদ্যোক্তা হওয়ার লোনসহ হস্ত ও কুটির শিল্পের প্রসার ও কর্মসংস্থান ঋণ দিয়ে তরুণ বেকার ছাত্রসমাজকে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে হবে। ব্রিটেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে বেকারত্ব যতটা সুখকে হ্রাস করে, অন্য কোন ঘটনা ব্যক্তির ততটা ক্ষতি করেনা। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে বেকারত্ব বিবাহ বিচ্ছেদের চেয়ে বেদনাদায়ক। সুতরাং বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে এবং একবিংশ শতাব্দীর সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে মুক্তি ও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এতে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ হবে একটি সমৃদ্ধশালী উন্নয়নশীল দেশ।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

SHARE

Leave a Reply