বেদনাময় একটি বছর

মাহমুদুর রহমান দিলওয়ার

জীবন মৃত্যুর মালিক আল্লাহ এবং মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয়, জমিনে নয়। এ সময়, এভাবে যদি আল্লাহ মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করে থাকেন; তাহলে কারো সাধ্য নেই মৃত্যুকে ঠেকানোর। আর তা যদি না হয়ে থাকে তাহলে এমন কোন শক্তি নেই মৃত্যু কার্যকর করার। আর শাহাদাতের মৃত্যুই শুধু পারে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিতে। আমি কি ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করবো যে, আমাকে জান্নাত থেকে বাঁচাও?

মৃত্যুকে জয় করলো এই সাহসী উচ্চারণ। এ হলো আল্লাহ তায়ালার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসার  উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ভীতি আর কাপুরুষতা পরাস্ত হলো এ অনন্য ঘোষণায়। বিজয়ী হলো হিম্মত, সাহস আর ঈমানী দৃঢ়তা। উপরোক্ত উক্তি উপমহাদেশের ইসলামী আন্দোলনের অগ্রসেনানী সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) এর। ফাঁসির হুকুম হওয়ার পর ক্ষমা চেয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছিলো। তখন তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে উপরোক্ত ঘোষণা দিয়েছিলেন।

২৯ জুন ২০১০। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার সাজানো মিথ্যা মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৩ শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠান শেষ করে ফেরার পথে আমীরে জামায়াত ও ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রাজধানীর শহীদবাগস্থ বাসা থেকে গ্রেফতার  করা হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন ও জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে নিজ বাড়ি ফরিদপুর যাওয়ার পথে সাভার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

যারা ধর্মের প্রচার  ও সংরক্ষণে সারাটি জীবন কাটিয়ে দিলেন, যারা অন্যায় ও অসুন্দর পথ থেকে ধর্মের পথে লক্ষ কোটি জনতাকে আহবান জানালেন, তারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মামলায় গ্রেফতার হলেন। যে মাওলানা নিজামী ও মুজাহিদ সাহেব ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে জীবনবাজি রেখে সংগ্রামরত, তাদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ কষ্টকর ও হাস্যকর। যে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তাফসির মাহফিলে দলমত নির্বিশেষে লক্ষ জনতার ঢল নামে, যার তাফসির শুনে হাজার হাজার লোক ধর্মের পথে তথা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ বিবেকবান কোন মানুষ মেনে নিতে পারে না।

গ্রেফতারের পর দিন তথা ৩০ জুন নেতৃবৃন্দ আদালতে হাজির হন। জামিনের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, উক্ত মামলায় জামিন পেলেও শুরু হয় ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ন্যক্কারজনক নগ্নপদক্ষেপ। একের পর এক মিথ্যা ও সাজানো মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়। যুদ্ধাপরাধ মামলাসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের নীল নকশা বাস্তবায়নের অপপ্রয়াস জোরদার হয়।

আমীরে জামায়াত মাওলানা নিজামীকে ১০টি হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার চার্জশিটে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে তাকে জড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় তাকে ২৪ দিন রিমান্ডে নেয়া হয়। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ১২টি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাকে ৩১ দিন রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। জনাব মুজাহিদকে এ পর্যন্ত ১০টি মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে। রিমান্ডে নেয়া হয়েছে ২৭ দিন।

১৩ জুলাই ২০১০। হাইকোর্ট থেকে ৫টি মামলায় জামিন নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি  জেনারেল সাংবাদিক মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লা। প্রশাসন তাদেরকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে ৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দু’জনকে ১৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ক্ষমতার দাপট আজ ক্ষমতাসীনদের অন্ধ করে ফেলেছে। নিরপরাধ, সত্য ও সুন্দরের পথযাত্রীদের বিরুদ্ধে আজ জুলুমের খড়গ। অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত রিপোর্ট ও দলিল উপস্থাপনের মহড়া চলছে। আল্লামা সাঈদীর মতো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার সহস্রাধিক পাতায় ফিরিস্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। ভিত্তিহীন ও মিথ্যা পদক্ষেপের ফলাফল শুভ হবে না।

শেষ করছি – গতবছরে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে আল্লামা সাঈদীর বক্তৃতায় উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি তার বক্তৃতা গল্প দিয়ে শেষ করেছিলেন। গল্পটি একটি সিংহ, নেকড়ে ও শিয়ালের। সিংহ, নেকড়ে ও শিয়াল মিলে শিকার করলো। তাদের শিকার হলো একটি গাভী, একটি হরিণ ও একটি খরগোশ। সিংহ নেকড়েকে বললো, ৩টা শিকার নিজেদের মধ্যে ভাগ করো, যদিও আমি সেটা পছন্দ করিনা। নেকড়ে  বললো, মহারাজ আপনি গাভী খাবেন। আমি খাবো হরিণ আর শিয়াল খাবে ঐ খরগোস। এ কথা শুনে সিংহের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। সে নেকড়ের ঘাড়ে জোরে থাপ্পড় মারলো। নেকড়ের মাথা উড়ে গিয়ে অনেক দূরে পড়লো। এবার সিংহ শিয়ালকে বললো, শিকার ৩টিকে ভাগ করতো। শিয়াল বললো, মহারাজ আমার মতামত হলো-আপনি খরগোস দিয়ে সকালের নাস্তা করবেন। দুপুরে খাবেন হরিণ আর রাতে খাবেন গাভী। সিংহ খুব খুশি হয়ে বললো, বুদ্ধিমান শিয়াল এত সুন্দর বণ্টননীতি কোথায় শিখলে? শিয়াল বললো, মহারাজ একটু আগে নেকড়ের যে অবস্থা দেখলাম, তার মাথা উড়ে যাওয়ার দৃশ্যই আমাকে এই সুন্দর নীতি শিক্ষা দিয়ে গেল।

পৃথিবীর বিভিন্ন ইতিহাস আমাদের অনেক শিক্ষা দেয়, পথনির্দেশনা দেয়। ইতিহাস থেকে যুগে যুগে মানুষ অনেক কল্যাণকর শিক্ষা গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে জালেম ও শোষকদের পরিণতি শুভ ছিল না। যুগে যুগে জালিমদের পরিণতির ইতিহাস  থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি অশান্তি আর অমঙ্গল ডেকে আনে। হিংসা-বিদ্বেষ আর বিধ্বংসী রাজনীতির দেয়াল ভেঙে দেশপ্রেম আর  ঐক্যে দেশে ভ্রাতৃত্ববোধ আর সুন্দর পরিবেশ  বিরাজ করুক। এই প্রত্যাশা আমাদের; এই প্রত্যাশা সচেতন দেশবাসীর।

লেখক : সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, সিলেট মহানগরী

SHARE

Leave a Reply