বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও কিছু কথা -মুহাম্মদ আবদুল বাছেত

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্কের দীর্ঘসূত্রতা ও একজন শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে কিছু কথা না বললেই নয়। এটি সত্য যে, উচ্চতর শিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ দেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু এটি সত্য যে, উচ্চতর শিক্ষা বিস্তারে কতটুকু মান বজায় রাখতে পেরেছে, সেটিই বিবেচনার বিষয়।
হিন্দিতে একটি প্রবাদ আছে ‘বাপ কি বেটা হায়’- দেখবেন, আমরা যখন কোনো মনীষীর বা গুণীজনের জীবনী পড়ি, সেখানে এটি খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁর শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক অমুক বা তাঁর ছাত্র ছিলেন অমুক। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় এরকম নজির টানার গর্ব দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রথমত এদেশের শিক্ষকতা সম্মানজনক পেশা মনে করা হলেও একটু নিচু চোখে দেখতে সকলে অভ্যস্ত, হোক সেটি প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। যদিও এর রয়েছে নানাবিধ কারণ, কিন্তু কে ভাঙাবে কার ঘুম। সম্প্রতি ঢাকাস্থ একটি নতুন স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা বোর্ডে আমন্ত্রিত হওয়ার সুবাদে বেশ অভিজ্ঞতার সুযোগ হয়েছে; যে অভিজ্ঞতার নির্মমতা ঐ বোর্ডে আমাকে দীর্ঘায়িত করার ধৈর্য হয়নি। মালিকপক্ষ ভাইভা গ্রহণকারী আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষক নিয়োগপ্রার্থীদের মাসিক বেতনের প্রস্তাবনা রাখতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা মাত্র। যে বোর্ডে ছিলেন বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, গবেষকসহ আরো অনেকেই। কয়েকজনের ভাইভা শেষ হওয়ার পর বিবেকের তাড়নাকে আর ধরে রাখতে পারিনি। একপর্যায়ে অতিথিবৃন্দকে উদ্দেশ করে বললাম, আমাদের এখানকার অনেকেই ব্যাংকার, শিক্ষক বা অন্য পেশায় আছেন। একটু চিন্তা করে দেখুন প্রত্যেকে কত বেতন পান? কিভাবে আপনার-আমার পক্ষে সম্ভব অনার্স-মাস্টার্স পাসকারী একজন ব্যক্তিকে এই বেতনে প্রস্তাব করার? শিক্ষকদের যথাযথ বেতন প্রদানে অপারগ হলে আনাচে-কানাচে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই। দৃষ্টিগোচর হলো-বিষয়টি হৃদয়ে নাড়া দিলো উপস্থিত সকলেরই।
বড় আশ্চর্যের বিষয়- বিভিন্ন বিভাগে একাধিক শিক্ষক নিলেও আবেদন পড়েছে প্রত্যেক পদের পেছনে শতাধিক। আরো মজার বিষয়- এই বেতনেও সম্মত আছেন অধিকাংশ প্রার্থী। দুর্বলতার সেই দিকটিই গ্রহণ করেছেন মালিকপক্ষ। অথচ এই বিষয়টি সকলেই ওয়াকিফহাল স্বল্প বেতন দিয়ে ব্যাপক শিক্ষাবাণিজ্য করছেন উদ্যোক্তারা।
সম্প্রতি কাছের একজনকে একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি ব্যবস্থা করে দেয়ার সুবাদে জিজ্ঞাস করলাম, বেতন কত ধরেছে? বললো খন্ডকালীন হিসেবে নিয়োগ দিলো-দৈনিক দুইশত বিশ টাকা। রহস্যচ্ছলে ফোনে বলেই ফেললাম, ধং ষরশব ধং ফধু ষধনড়ঁৎ। মনে মনে অঙ্ক কষে দেখলাম ত্রিশ দিয়ে গুণ দিলে মাসিক বেতন পড়ে, ছয় হাজার ছয়শত টাকা। অথচ এ চাকরি পেতে তাকে দিতে হয়েছে অনেক দৌড়ঝাঁপ।
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে উচ্চতর শিক্ষা বিস্তার ও গবেষণামূলক কর্মে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোই নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং বিশে^র মেধাবী শিক্ষার্থীরা একটি আসনের জন্য বিশ^বিদ্যালয়গুলোর দিকে ‘হাঁ’ করে তাকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর তুলনায় সরকারি উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতায় বুদ্ধিজীবী শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা প্রয়োজন অনুভব করছেন উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধাঁচে এ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হোক।
দীর্ঘ দিনের আশা-আকাক্সক্ষার ফসল শুরুটা ভালো হলেও কিন্তু ক্রমেই মান হারাতে বসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়-শুধুমাত্র পড়ানোর জন্য নয়, বরং তাঁর অন্যতম কাজই হবে গবেষণা করা, যার নির্যাসই হবে দেশ ও সমাজের উন্নয়ন। হোক সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
উন্নত দেশগুলোর সাথে পরিসংখ্যান করে দেখা যায় শিক্ষকতা পেশায় আমাদের বেতন কাঠামোর অনুপাত অনেক কম। এ ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অন্যান্য চাকরির বেতন অনুপাত অনেক বেশি, ফলে অধিক মেধাবীরা আসছেন না শিক্ষকতায়। উচ্চতর শিক্ষার নামে বিদেশে পাড়ি দিয়ে হচ্ছে মেধাপাচার। যে ফাঁকিটি গ্রহণ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও।
আমাদের সমস্যাটি হলো- সত্য কথাটি বললে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে, যা অনেকের কাছেই অসহনীয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার শুরুটা যদিও ছিল শিক্ষাবিদদের হাতে, যা এখন চলে গেছে শিল্পপতিদের হাতে। একটি প্রবাদ আছে, ‘ঘরের মালিকই ভালো জানেন ঘরে কী আছে’। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর কলকব্জা নাড়াচাড়া করার কথা ছিল শিক্ষাবিদদেরই। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার উদ্দেশ্য এবং উচ্চশিক্ষা বিস্তারে এর গুরুত্ব তাঁরা একটু হলেও বেশি বুঝতে পারেন এবং সমসাময়িক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও সহজ হতো। বড়ই আফসোসের বিষয়, কিছু সংখ্যক বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় ব্যতীত অনেক বিশ^বিদ্যালয়ই এখন শিক্ষা থেকে ব্যবসাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকনিয়োগকে এখন একজন দক্ষ ব্যবসায়ীর স্বল্প মজুরিতে অধিক শ্রম আদায়ের পলিসির মতোই দেখা হচ্ছে। এমন অনেক বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় রয়েছে সদ্য পাস করা বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হিসেবে অহরহ নিয়োগ দিচ্ছে, স্বভাবত সদ্য পাস করা একজন শিক্ষার্থীর আর্থিক চাহিদা ততটা থাকে না। তবে হ্যাঁ, সরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকনিয়োগের অন্যতম প্রক্রিয়াই হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সর্বোচ্চ নাম্বারধারী বা মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া। কিন্তু সেটাও একটা পদ্ধতির মধ্যেই হয়ে থাকে এবং সবচেয়ে মেধাবীজনই সেখানে স্থান পায়।
বয়সের স্বল্পতা ও চাহিদার ব্যাপ্তি থাকার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকদেরই দেখা যায় বিভিন্ন সরকারি, ব্যাংক ও লোভনীয় অন্যান্য পদের জন্য দৌড়ঝাঁপ। তা যেমনি তাদের স্থিরতাকে নষ্ট করে দেয়, শিক্ষক নিয়োগের উদ্দেশ্যকে করে ব্যাহত; তেমনি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ঘটে বিঘ্নতা। যদি আবার এমন হয়ে পড়ে যে কোনো বিশ^বিদ্যালয় বা বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষকের বয়সসীমা একই গন্ডিতে সীমাবদ্ধ, ঐ বিভাগের শিক্ষার্থীরা গবেষণার হাতে খড়ি গ্রহণে কতটুকু অগ্রসর হবে। অথচ শিক্ষকতায় বয়সের অভিজ্ঞতা একটি বড় সম্পদ। আবার সেটি যদি হয় উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। শিক্ষকজাতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধির জন্যই এই অবতারণা।
এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের গ্র্যাজুয়েশনের চারটি বছর শেষ করেও গবেষণার পটভূমি সম্পর্কেও পূর্ণ ওয়াকিফহাল হন। অ্যাসাইনমেন্ট নামক একটি প্রোগ্রামের সাথে সম্পৃক্ততা থাকলেও অনেকটাই কাট, কপি, পেস্ট। কিন্তু পরিতাপের বিষয়-যা খতিয়ে দেখারও নেই কেউ ।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বয়সের পার্থক্য খুব বেশি না থাকায় ক্লাস ভালো হয়ে ওঠে অনেকটা আড্ডা ও বিনোদন মেলায়। সম্পর্ক গড়ে ওঠে বন্ধুত্বের। এর ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচকটিই প্রাধান্য।
শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যাঁরা স্বপ্ন দেখেন: বুলি ও লেখনীতেই শুধু সীমাবদ্ধ থেকে কল্পনার জগতে খুব বেশি বিচরণ না করে বাস্তবতায় রূপ দানের পথে চলে আসুন। বিশে^র স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে কোন পর্যায়ে দেখতে চাই এবং নির্দেশিকা ঠিক করা দরকার, দেশ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গবেষণালব্ধ কর্মসম্পাদনে কতটুকু অবদান রাখবে।
লেখক : কলামিস্ট

SHARE