বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বিপর্যস্ত পরিবেশ -আশীষ মাহমুদ

পরিবেশ এবং জীবকুল একে অপরের সঙ্গে অতি নিবিড়ভাবে যুক্ত। পরিবেশই প্রাণের ধারক এবং জীবনের বাহক। সৃষ্টির শুরু থেকেই পরিবেশের সঙ্গে প্রাণীর মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতার ওপরেই তার অস্তিত্ব নির্ভর করে আসছে। পরিবেশ প্রতিকূল হলে জীবের ধ্বংস ও বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণী জীবনের বিকাশ ঘটে। তাই বলা চলে পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র।
মানুষের সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে পরিবেশ-প্রকৃতি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি সভ্যতার বিকাশ ও জীবনমান উন্নতির সাথে সাথে মানুষের দ্বারা পরিবেশ আজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত মানুষের নানামুখী কর্মের মধ্য দিয়ে ভয়াবহ মাত্রায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ভোগ বিলাসে মত্ত মানবজাতি তার আবাসস্থলকে ধ্বংসের মুখোমুখি করতে যেন এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে।
পৃথিবীর অধিকাংশ বিজ্ঞানীরা বর্তমান বিশে^র প্রধান হুমকি হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি। আর এই বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মানুষের নানামুখী অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও গৃহনির্মাণ, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বনভূমি উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার, কৃষি ক্ষেত্রে সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, যত্রতত্র শিল্প কল-কারখানা নির্মাণ ও তাদের পরিত্যক্ত বর্জ্য, যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া, গ্রিন হাউজ গ্যাস, মানুষের আরাম-আয়েশের জন্য ব্যবহারকৃত রেফ্রিজারেটর, এয়ারকুলার, অ্যারোসেল স্প্রে, প্লাস্টিক ফোম ও প্রসাধনী সামগ্রী থেকে নিঃসৃত ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের নিঃসরণের কারণে ওজোন স্তরের ক্ষয় ও জীবাশ্ম জ¦ালানির দহনের ফলে সৃষ্ট এসিড বৃষ্টি। এসব কারণে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিগত ৮০০০ বছর ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় স্থির ছিল। কিন্তু গত ১০০ বছরের হিসেবে প্রমাণিত যে এই তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত ১০০ বৎসরে পৃথিবীর তাপমাত্রা ০.৫ক্কঈ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১.৫ক্ক-২.০ক্ক ঈ পর্যন্ত এবং ২১০০ সালের মধ্যে ১.৮ক্কঈ থেকে ৬.৩ক্কঈ এর মতো বৃদ্ধি পেতে পারে। সারা পৃথিবীজুড়ে উষ্ণতার এই ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিকেই বিজ্ঞানীরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং (Global Warming) নামে অভিহিত করেছেন।

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণ

১. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি : কল-কারখানা, যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সবকিছুতেই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দিন দিন বাড়ার ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণও দিন দিন লাফিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২. ঈঋঈ-এর ব্যবহার : ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (CFC11, CFC12) বা ফ্রেয়ন একটি বিশেষ যৌগ, যা ওজোন স্তর বিনাশের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। এই ঈঋঈ প্রধানত রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ফোম শিল্প, রং শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, সুগন্ধি শিল্প, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রের সার্কিট পরিষ্কার প্রভৃতি ক্ষেত্র থেকে নির্গত হচ্ছে।
৩. নাইট্রাস অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফারের কণা উৎপাদন বৃদ্ধি : কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, কল-কারখানা ও যানবাহনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, ট্যানারি কারখানার বর্জ্য পদার্থ, জেটবিমান, রকেট উৎক্ষেপণ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র প্রভৃতি থেকে নাইট্রাস অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফারের কণা নির্গত হয়; যেগুলি বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী এক একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
৪. অরণ্যচ্ছেদন : পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়নের জন্য কল-কারখানা। মানুষের আবাসনের পাশাপাশি কল-কারখানা তৈরি করতে গিয়ে বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। নির্বিচারে গাছপালা উজাড় হওয়ার ফলে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নেয়ার ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।
৫. মিথেনের পরিমাণ বৃদ্ধি : গাছপালার পচন, কৃষিজ বর্জ্য এবং জীব-জন্তুদের বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলাফল

ক) পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি : গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে আগামী দিনে পৃথিবী বিগত ২০ লাখ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে যাবে। ১৮৮০ সাল থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ০.৬ক্কঈ বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর উষ্ণতা ২.৫ক্কঈ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ৩.৮ক্কঈ বেড়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য যে গত ২০০০ বছরের তুলনায় শেষ শতকে বিশ্বের উষ্ণতা বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর দুটি অধ্যায়ে (যথা ১৯২০-১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ এবং ১৯৭৬-২০০০ খ্রিষ্টাব্দ) উষ্ণতা সব থেকে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হিসাব করলে বিশ্বের উষ্ণতম দশক হচ্ছে ১৯৯০ এর দশক। নাসার গোদার্দ ইনস্টিটিউট ফর স্পেন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছর। ওয়ার্ল্ড মিটিয়েরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও ক্লাইমেট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, উষ্ণতম বছর হলো ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর হলো ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ।
খ) মেরু অঞ্চলের বরফ গলন : গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে বিষুবীয় ও মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। মনে করা হচ্ছে, আর ১০০ বছরের মধ্যে হিমশৈলসহ সুমেরু কুমেরুতে জমে থাকা সমস্ত বরফ পানিতে পরিণত হবে। শীতে অল্প বরফ থাকবে। উল্লেখ্য ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের পর উত্তর মহাসাগরের বরফের স্তর প্রায় ২৭% হ্রাস পেয়েছে।
গ) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নিম্নভূমিতে প্লাবন : এই ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার ফলে বিষুবীয় ও মেরু অঞ্চলের জমে থাকা বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০-৪০ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে। এর ফলে পৃথিবীর উপকূলবর্তী এলাকার (ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশসহ) একটি বিরাট অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিশেষত বাংলাদেশের এক লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির এ ধারা চলতে থাকলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এই শতাব্দীর শেষ দিকে ২০-৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং নদ-নদীর পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এই পানি সমুদ্রে পতিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করবে ও অপরদিকে ব্যাক ওয়ে ইফেক্ট যুক্ত হয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করবে। উল্লেখ্য পৃথিবীতে সঞ্চিত সমস্ত বরফ গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৫০ মিটার বেড়ে যাবে।
ঘ) রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি : ম্যালেরিয়া, গোদ, কলেরা ও ডেঙ্গু প্রভৃতি রোগের প্রকোপ বাড়বে। তার কারণ পানি বৃদ্ধি পেলে মশারও বিস্তার ঘটবে। আরো বিভিন্ন রোগ ফিরে আসবে। নতুন রোগ আসবে। কেনিয়ার উচ্চভূমিতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে অতীতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ প্রায় ছিল না বললেই চলে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৬৯০০ ফুট উচ্চতায় এই প্রথম ম্যালেরিয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে। কলম্বিয়ার আন্দিজ পর্বতমালায় ৭০০০ ফুট উচ্চতায় ডেঙ্গু ও পীতজ্বর সংক্রামক মশার সংখ্যা বাড়ছে।
ঙ) বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ ও জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস : বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হেতু জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার প্রভাবে বনাঞ্চলসমূহ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র এক মিটার বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনের ৭০ ভাগ তলিয়ে যাবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে গেলে তা আমাদের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিবে। ইতোমধ্যে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে স্কটল্যান্ডের জীববৈচিত্র্যের বিনাশ ঘটেছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রে ক্ষারের পরিমাণ কমবে, ফলে ক্ষারে বেঁচে থাকা জীবের অস্তিত্ব লোপ পেয়ে বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ ঘটবে। গত ৫০ বছরে মেরু প্রদেশে পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। এছাড়াও, গত ৫০ বছরে বিশ্বের ২৭% প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেছে। ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে হাজার হাজার পক্ষীকুলের বিনাশ ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৫০% ধ্বংস হয়ে যাবে।
চ) আবহাওয়ার প্রকৃতি পরিবর্তন : উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবার ফলে অধঃক্ষেপণের পরিমাণ ও ঝড়ঝঞ্ঝার প্রকোপ প্রভৃতি বৃদ্ধি পাবে। ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। বৃষ্টিবহুল এলাকা নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে ক্রমশ বাড়তে থাকবে। ফলে আবহাওয়ার প্রকৃতিরও পরিবর্তন হবে। এথেন্স, শিকাগো, দিল্লি, প্যারিসসহ পৃথিবীর অন্যান্য শহরে গ্রীষ্মকাল স্বাভাবিকের তুলনায় যেমন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, ঠিক তেমনইভাবে গ্রীষ্মকালে অসহনীয় গরমও পড়ছে। তিব্বত, আফগানিস্তান, ভারত, নেপালসহ বহু দেশে শীতকাল স্বল্পস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি শীতের মাত্রাও কমে গেছে। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে গ্লাসগো ও মন্টানায় তাপমাত্রা সারা বছরে একবারও ০ক্কঈ এর নিচে নামেনি, যা সেখানকার অদ্যাবধিকাল পর্যন্ত সর্বকালীন রেকর্ড। আবার ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ ছিল নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে উষ্ণতম ও শুষ্কতম বছর।
ছ) সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস : সাধারণত সামুদ্রিক ঝড় সৃষ্টি হয় উত্তপ্ত বায়ু ও ঘূর্ণিবায়ু থেকে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পেছনে অন্যান্য প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকলেও পানির উত্তাপ বৃদ্ধিই মূল কারণ। পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশের প্রতি বছর সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। এর ফলে মানুষের জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। সামুদ্রিক এই দুর্যোগের প্রধান কারণ হলো সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বাংলাদেশে প্রতি বছর মে-জুন মাসে যে সামুদ্রিক ঝড় হয় তাতে উপকূলীয় জেলাসমূহের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় ইয়াস, আমফান বাংলাদেশে সরাসরি আঘাত না হানলেও সুন্দরবন ও তার পাশর্^বর্তী জেলাসমূহ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা, বৈশি^ক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পাবে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলাসমূহ ব্যাপকভাবে দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে। সিডর, আইলা, আমফানের মতো দুর্যোগ কিছুদিন পরপর আঘাত হানবে।
জ) মরুভূমির বৈশিষ্ট্য : বৈশ্বিক উষ্ণতার বৃদ্ধির ফলে একদিকে যেমন পৃথিবীর নিচু এলাকাসমূহ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হবে ঠিক তেমনিভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন উঁচু অংশে মরুভূমির বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে। বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে ভূ-পৃষ্ঠে পানির পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পাবে। ফলে সমগ্র ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হবে।
জ) ফসলের ক্ষতি ও খাদ্যসঙ্কট : বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বিভিন্ন দুর্যোগ দেখা দিবে। এই সকল দুর্যোগ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করবে। উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। ফলে উৎপাদন কমে যাবে। উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ব্যাপকভাবে খাদ্যসঙ্কট তৈরি হবে। অন্যদিকে ফসলের মধ্যে ব্যাপক রোগ দেখা দিবে। এই সকল রোগের কারণে ফসল থেকে নিরাপদ খাদ্য উৎপন্ন সম্ভব হবে না।
ঝ) বনাঞ্চল ধ্বংস হবে : ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় এক ভয়াবহ দাবানলে প্রায় ২০ লক্ষ একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৯-২০ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানল সংঘটিত হয়। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার ৬.৩ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি এই দাবানলে পুড়ে গেছে। ২৫ জন মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস হয়েছে ১৩০০ এর অধিক বাড়ি-ঘরসহ ২৫০০ ভবন। প্রায় অর্ধ মিলিয়ন প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই দাবানলে।
ঞ) বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি : বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের ইফেক্ট হিসেবে বড় দুর্ভোগ দেখা দিবে বিশুদ্ধ পানি পাওয়াতে। মরুকরণের ফলে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে অনেক নিচু এলাকা তলিয়ে যাবে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘিœত হবে। এর ফলে প্রধান প্রধান নদীর প্রবাহ হ্রাস পাবে এবং নদীর ক্ষীণ প্রবাহের কারণে সামুদ্রিক লোনা পানি সহজে অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলোতে প্রবেশ করে নদ-নদীর পানির লবণাক্ততা বাড়িয়ে দিবে। সামুদ্রিক লোনা পানির উপস্থিতির কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হবে। বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি সাধিত হবে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও দূরবর্তী দ্বীপসমূহের প্রায় ১.৪ মিলিয়ন হেক্টর এলাকায় লোনা পানি ইতোমধ্যে প্রবেশ করেছে। ফলে এই সকল এলাকার জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে।
ট) মানুষের আবাসস্থলের সঙ্কট : বৈশি^ক উষ্ণতার কারণে নিত্যনতুন এলাকায় তলিয়ে যাবে। ফলে পৃথিবীব্যাপী মানুষের আবাসস্থল মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিবে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হবে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, খাদ্যদাঙ্গা শুরু হবে। সব মিলিয়ে পৃথিবী নতুন নতুন সমস্যায় জর্জরিত হবে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং উত্তরণের উপায়

ক) জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস : কল-কারখানা, যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সবকিছুতেই জীবাশ্ম জ্বালানি জ্বালানোর পরিমাণ ক্রমশ যতটা পারা যায় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ যথাসম্ভব কমাতে সম্ভব হয়।
খ) রাসায়নিক সারের ব্যবহার হ্রাস : কৃষিতে নাইট্রোজেন সার (যেমন ইউরিয়া) ব্যবহারের ফলে বাড়ছে নাইট্রোজেন অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ। অবিলম্বে কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহার যথাসম্ভব কমাতে হবে।
গ) মিথেন নির্গমনের পরিমাণ হ্রাস : গাছপালার পচন এবং জীবজন্তুদের বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিথেনের এই সকল উৎসগুলিকে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ঘ) অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি : অচিরাচরিত শক্তি বলতে সেইসব শক্তিকেই বোঝায় যাদের ব্যবহার এখন পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে সেই অর্থে প্রচলিত হয়নি। এইসকল শক্তির অধিকাংশেরই উৎস নবায়নযোগ্য করা যাবে অর্থাৎ ফুরিয়ে গেলে আবার তৈরি করে নেয়া সম্ভব। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউজ গ্যাসের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউজ গ্যাস (যেমন-কার্বন-ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন, ওজোন) এর পরিমাণ কমে আসবে। ফলে পরিবেশ দূষণ অনেকটাই কমে যাবে। সাম্প্রতিককালে এই অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এই অচিরাচরিত শক্তিগুলি হল সৌর শক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বায়োডিজেল, জোয়ার-ভাটা শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, আবর্জনা থেকে প্রাপ্ত শক্তি, নিউক্লিয়ার এনার্জি প্রভৃতি।
ঙ) ই-ওয়েস্ট বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য আমদানি বন্ধ : উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকে নানা ধরনের ই-ওয়েস্ট বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য আমদানি হচ্ছে আমাদের দেশে। প্রতি বছর প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ব্যবহৃত (সেকেন্ড হ্যান্ড) কম্পিউটার তৃতীয় বিশ্বে পাঠানো হচ্ছে। এসব কম্পিউটারের অন্যতম ক্রেতা হলো চীন, ভারত ও বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলি অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের এই সকল দেশগুলিকে ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে আঁস্তাকুড়ে পরিণত করা হচ্ছে। এসব ই-বর্জ্যরে মধ্যে হাজার হাজার টন সীসাসহ রয়েছে আরও বহু বিষাক্ত উপাদান, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসছে। এসব দূষিত বর্জ্য পদার্থ বিভিন্নভাবে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সরাসরি কৃষি সম্পদ, মৎস্যসম্পদ, বনজসম্পদ বিনষ্টেরও অন্যতম কারণ।
চ) পরিকল্পিত বনায়ন : বিশ্বজুড়ে যখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং আতঙ্ক বিরাজ করছে তখন এর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষেধক হলো পরিকল্পিত বনায়ন। একদিকে অরণ্যচ্ছেদন রোধ ও অন্যদিকে পরিকল্পিতভাবে বনায়নের মধ্য দিয়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ছ) শক্তিসাশ্রয়ী আবাসন : আমাদের জীবনযাপনের সবক্ষেত্রেই পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। বড় বড় অট্টালিকা, বাড়ি-ঘর বা বড় দালান নির্মাণে প্রয়োজনীয় খালি জায়গা রাখতে হবে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের প্রবেশ যেন সহজে হয় সে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যাতে কম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে হয়। লিফট, জেনারেটর, এয়ার কন্ডিশন এসবের ব্যবহার কমাতে গ্রিন বিল্ডিং টেকনোলজির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামের বাড়ি-ঘর নির্মাণেও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী সবুজায়ন প্রয়োজন।
জ) পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত চুক্তিগুলির দ্রুত বাস্তব রূপায়ণ : বিশ্বে ক্রমবর্ধমান গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে চুক্তিগুলির দ্রুত বাস্তব রূপায়ণ খুবই দরকার। কেবলমাত্র আলাপ-আলোচনা নয়, দরকার গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির দ্রুত বাস্তব রূপায়ণ।
ঝ) বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব দ্রব্য ব্যবহার : গ্রিন হাউজ প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদানগুলির বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব দ্রব্য ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে।
ঞ) নতুন প্রযুক্তি : বিশ্ব উষ্ণায়ন প্রতিরোধের চূড়ান্তÍ উত্তর হচ্ছে পরিবেশবান্ধব নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত উপাদান পরিবর্তন, যানবাহনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কার্বন-ডাই-অক্সাইড পৃথকীকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রভৃতিসহ বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করতে হবে।
ট) নাগরিক দায়িত্ব : পরিবেশ রক্ষা নাগরিকদের মৌলিক দায়িত্ব। তাই গ্লোবাল ওয়ার্মিং সৃষ্টিকারী উপাদানগুলো যাতে পরিবেশে কম পরিমাণে উৎপাদিত হয়, সে বিষয়ে সকলকেই দায়িত্বশীল হতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply