ব্যর্থতার বৃত্তাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে ছুঁতে হবে সাফল্যের বৃত্ত

কালের খাতা থেকে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। বিদায় ২০১২, স্বাগত ২০১৩। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গত বছরটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। তাই এ দেশকে নিয়েই আমাদের পর্যালোচনা অধিক।
ক্ষমতাসীন দল এখন পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সময়ে দুই দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে সরকার গঠনের  প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মনে করা হচ্ছে, সরকার এ প্রস্তাবের ভিত্তিতে আরো কিছুটা ছাড় দিয়ে বিরোধীদলকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে চেষ্টা চালাবে। তবে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সংস্থাপনের  মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো কার অধীনে থাকবে তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় আসা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এ ধরনের প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তৎকালীন বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তখন স্যার নিনিয়ান স্টিফেন একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে আওয়ামী লীগের দেয়া একই ধরনের প্রস্তাব বিএনপি তথা বিরোধী জোট গ্রহণ করবে তার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ কারণে বিরোধী জোটের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন নির্বাচনকালীন সরকারের সুরাহা শেষ পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের চেষ্টা করে যাবে। শুধু কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য জাতিসঙ্ঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে জাতিসঙ্ঘের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে কথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে নতুন এক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক(!) অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের সাথে বেলজিয়াম প্রবাসী এক আইন বিশেষজ্ঞের স্কাইপি সংলাপ বিলেতের ইকোনমিস্ট ও ঢাকার আমার দেশ পত্রিকা প্রকাশ করেছে, তাতে এই বিচার নিয়ে আগে ওঠা প্রশ্নগুলো অনেকটা বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। এই সংলাপ প্রকাশের পর বিচারকের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে তার পদত্যাগ এবং ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দেয়ার দাবি জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেন। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের সংলাপ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, মামলার আইনগত দিকের চেয়ে রাজনৈতিক দিকটি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রসিকিউশনের সাথে বিচারপতির যোগাযোগের দিকটি ফুটে উঠেছে।
দেশের ভেতর ও বাইরে সরকার এখন কার্যত বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে। ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলনরত বিরোধী দল মোকাবেলায় ক্ষমতাসীন দল বিশেষ করে ছাত্রলীগ-যুবলীগকে মাঠে নামানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ফলে বিরোধী দলসমূহ জোটবদ্ধভাবে বা এককভাবে কোনো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে চাইলেও পুলিশের সাথে এইসব গুণ্ডাবাহিনী তাদের উপর হামলা চালাচ্ছে। ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। পুলিশও গুলি করে হত্যা করেছে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের সাথে সরকার স্পষ্টত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও ব্লেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ চেয়েও পাননি। বিশ্বব্যাংকের সাথে বিরোধের কারণে জানিয়ে দেয়া হয়েছে দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া পদ্মা সেতুতে কোনো অর্থ দেবে না বিশ্বব্যাংক। অর্থাৎ পদ্মা সেতুর কাজ এ সরকারের আমলে হচ্ছে না। জামায়াত নেতাদের কথিত বিচারের নামে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বের সাথে অনেক আগেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এসব কিছু সত্ত্বেও নতুন বছরে বরাবরের মতো এবারও আমাদের প্রত্যাশা নতুন এক বাংলাদেশ। অনাবিল সুষ্ঠু এক বাংলাদেশ। ধনে-জনে-জ্ঞানে-মানে ঐতিহ্য-গৌরবে পরিপূর্ণ সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। তবে এ ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার পারদমাত্রা আগের উচ্চতায় নেই। বেশ নিচে নেমে এসেছে। তবুও আমাদের আত্মানুসন্ধানের মনোভাব নিয়ে সেই পুরনো প্রত্যাশা লালন করেই প্রয়াসী হতে হবে জাতীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করতে। এখানে নৈরাশ্যবাদী হওয়ার কোনো অবকাশও নেই। সে জন্য আমাদের অতীত সব ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে রচনা করতে হবে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ। ব্যর্থতার বৃত্তাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে ছুঁতে হবে সাফল্যের বৃত্ত। নিশ্চিত করতে হবে গর্বের ধন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সে জন্য প্রয়োজন ঐকান্তিক আত্মপোলব্ধি। অতীতের সব ব্যর্থতার জন্য মূল কারণ জাতীয় অনৈক্য আর বিভেদ। এ কারণে ঐক্যবদ্ধ জাতির সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য সরকারকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে।

SHARE

Leave a Reply