ভাইরাস ও অ্যান্টিভাইরাস -সালেহ মো. ফয়সাল

ভাইরাস হলো একটি প্রোগ্রাম যা ধ্বংসকারী প্রোগ্রাম হিসেবে নিজেকে অন্যান্য প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত করে এর সংক্রমণ ঘটায় এবং পর্যায়ক্রমে এর ধ্বংসকর কাজের বিস্তৃতি ঘটাতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পরবর্তীতে এ ক্ষতিগ্রস্ত প্রোগ্রামগুলো ভাইরাস হয়ে অন্যান্য অসংক্রমিত প্রোগ্রামগুলোতেও সংক্রমণ ঘটায়। এর ফলে কম্পিউটারের অন্যান্য ভালো প্রোগ্রামগুলোতে সংক্রমণ ঘটে। ইংরেজি ভাইরাস শব্দটির বাংলা অর্থ হলো “Vital Information Resources Under Siegeঅর্থাৎ, “গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে”। ভাইরাসের নামকরণ করেন গবেষক ‘ফ্রেড কোহেন’। এ ভাইরাস কম্পিউটার বা ডিভাইসের যা যা ক্ষতি করতে পারে-
১.        MS Word-এর গুরুত্বপূর্ণ কোন ডকুমেন্ট লিখছেন, হঠাৎ করে কম্পিউটারটি হ্যাং হয়ে গেল, কি প্রেস করলেও কাজ করছে না, এ ক্ষেত্রে রিসেট বাটন চেপে পুনরায় চালু করতে হবে। ফলে আনসেভ করা ফাইলটি হারিয়ে যাবে। অন্য যেকোনো কাজ করার সময়ও ভাইরাস কম্পিউটার বা ডিভাইসকে হ্যাং করে দিতে পারে।
২.    গুরুত্বপূর্ণ অনেক ডাটাবেজ বা অফিসিয়াল ফাইল উলট-পালট করে দিতে পারে। এতে করে অফিসিয়াল কাজে ব্যাঘাত ঘটার ব্যাপক আশঙ্কাও থাকে।
৩.    ভাইরাস সামান্য কয়েক বিট ডাটা পরিবর্তন করে কম্পিউটারে সংরক্ষিত ডাটা পরিবর্তন করে হিসাব-নিকাশের ব্যাপক হেরফের করে দিতে পারে। এতে করে অনেক ক্ষতি হয়।
৪.    কিছু ভাইরাস হার্ড ডিস্কের বুট সেক্টরে আক্রমণ করে, ফলে হার্ড ডিস্ক ফরম্যাট করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
৫.    এটা কম্পিউটার বা ডিভাইসের গতিকে মন্থর করে দিতে পারে।
৬.    পুরো হার্ডডিস্কের ড্রাইভগুলোতে আক্রমণ করে সমস্ত ডাটা মুছে দিতে পারে।

কিভাবে বুঝবেন কম্পিউটার/ডিভাইস ভাইরাস আক্রান্ত?
কম্পিউটার বা ডিভাইসের গতি মন্থর হয়ে যাবে, হঠাৎ হ্যাং হয়ে যাবে বা শাটডাউন হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া অনেক সময় ব্যবহৃত ফাইলগুলোর আয়তন বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত মেসেজ দেখা যায় বা প্রোগ্রাম চালু হতে অনেক সময় নিতে পারে ইত্যাদি।

ভাইরাস থেকে বাঁচতে কী কী করতে হবে
ডিভাইসে নতুন ভার্সনের শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রাম ইনস্টল করে নিয়মিত ভাইরাস ডেফিনেশন ফাইল আপডেট রাখা এবং নিয়মিত কম্পিউটারের সব ড্রাইভ স্ক্যান করা উচিত। যেকোনো প্রকারের রিমোভ্যাবল ডিস্ক ব্যবহারের পূর্বে অ্যান্টিভাইরাস সফ্টওয়ার দিয়ে ভাইরাস চেক করে ব্যবহার করা। ই-মেইল অ্যাটাচমেন্ট ফাইল জেনে শুনে খোলা, অপরিচিত জনদের ই- মেইল অ্যাটাচমেন্ট ফাইল ডাউনলোড না করা। নিয়মিত ফাইল ব্যাকআপ রাখা। অন্য কোনো হার্ডডিস্ক বা সিডিতে রাইট করে কিংবা অনলাইন মিডিয়া ফায়ার/ড্রপবক্স প্রভৃতি সাইটে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ব্যাকআপ রাখা যায়। মাত্রাতিরিক্ত ভাইরাসের আক্রমণ ঘটলে আপনার ঙঝ (উইন্ডস/লিনাক্স প্রভৃতি) নতুন করে সেটআপ করে ভালো সিডি/ডিভিডি থেকে অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে প্রথমেই স্ক্যান করে নিন। তারপর অন্যান্য সফটওয়্যার সেটআপ করে নিন।

সেরা পাঁচ ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়ার
আমাদের প্রায় সবাই কম্পিউটার/ল্যাপটপ ব্যবহার করেন ও এদের মাঝে Windows  ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাই এ Windows  ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা এ ভাইরাস-এর সাথে লড়ার কিছু কলাকৌশল নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। এই লড়াইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে তা হলো; নকল উইন্ডোজ ব্যবহার করা খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ নাও হতে পারে (পরামর্শ হচ্ছে অরিজিনাল ভার্সন ব্যবহার করার জন্য-এতে কিছুদিন পর পর নতুন নতুন সমস্যা থেকে বাঁচা যায়।) কিন্তু হাতের কাছে সহজে পাওয়া ৩০-২০০ টাকার অবৈধ অ্যান্টিভাইরাস সফট্ওয়ার ব্যবহার করার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই। যেমন ধরুন, কোনো ভাবে আপনি একটি বাড়ির মালিক হলেন- বৈধ অথবা অবৈধ উপায়ে। কিন্তু বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না, যদি পুলিশ অথবা র‌্যাব বা আইনের কেউ এসে না ধরে। কিন্তু আপনার বাড়ির দারোয়ান যদি হয় এমন কেউ, যার বিরুদ্ধে অনেক অপরাধের রেকর্ড আছে, তাহলে তো আর আপনি শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন না। ঠিক তেমনিভাবে, হতে পারে আপনার কম্পিউটারে দুনিয়ার সেরা অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রামটি চালু আছে (ম্যাক-আফি অথবা নরটন), কিন্তু তা যদি হয় ঐ অপরাধী দারোয়ানের মতো/ নকল করা কপি, তখন কিন্তু আপনার ঐ বাড়ির মতো কম্পিউটারটিও পুরোটাই অরক্ষিত।
আসুন আলোচনা করা যাক এমন কিছু অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রাম নিয়ে যা বিনামূল্যে বা প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া যায়। সম্প্রতি lifehacker-নামে একটি ওয়েব সাইট প্রকাশ করেছে ব্যবহারকারীদের ভোটে নির্বাচিত সেরা পাঁচটি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার-এর নাম। নিচে এদের নাম, ওয়েব ঠিকানা, আর কিছু তথ্য দেয়া হলো-
১.    [http://free.grisoft.com/] এভিজি অ্যান্টিভাইরাস (ফ্রিওয়ার এবং শেয়ার ওয়ার) (৩১% ভোট)
২.        [http://www.eset.com/] ইএসইটি নোড ৩২ (শেয়ার ওয়ার) (২২.৭% ভোট) ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য ৪০$/বছর (২৮০০ টাকা/বছর)
৩.    [http://www.avast.com/]এভাস্ট অ্যান্টিভাইরাস (ফ্রিওয়ার এবং শেয়ার ওয়ার) (১৬% ভোট)
৪.        [http://usa.kaspersky.com/]  কাস্পেরেস্কি অ্যান্টি ভাইরাস (শেয়ার ওয়ার) (১৫.৫% ভোট) ৬০$ (৪২০০ টাকা) প্রতি লাইসেন্সের জন্য।
৫.        [http://www.avira.com/en/pages /index.php] এভিরা অ্যান্টিভাইরাস (ফ্রিওয়ার এবং শেয়ার ওয়ার) (৭.৬% ভোট)

অ্যান্টিভাইরাস রিলেটেড কিছু জানার বিষয়:
১.    ফ্রি ওয়ার: পুরোটা বাণিজ্যিক ভার্সন নয়, তবে মূল সফটওয়ারটি ফ্রি এবং কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়। যত খুশি ব্যবহার করতে পারেন।
২.    শেয়ার ওয়ার: পুরোটা বাণিজ্যিক ভার্সন- তবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তারপর ব্যবহার করতে চাইলে কিনতে হবে।
৩.    এখনও কোন ভালো ফ্রি সফট্ওয়ার (ওপেন সোর্স) অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রাম নেই ওইন্ডোজের জন্য। লিনাক্স-এর জন্য বেশ কিছু ভালো অ্যান্টিভাইরাস প্রোগ্রাম রয়েছে। সত্যি বলতে, লিনাক্স-এর ভাইরাস নেই বললেই চলে। ইচ্ছা থাকলে [http://www.ubuntu.com/getubuntu/download]উবান্তু ব্যবহার করতে পারেন- যা খুব সহজে ব্যবহার করা যায়

দেখুন আপনার অ্যান্টিভাইরাস আসলে কাজ করে কি না?
আপনি জানেন কি আপনার antivirusটি কাজ করে কি না? যদি না জেনে থাকেন তাহলে এখনি জেনে নিন।
অ্যান্টিভাইরাস কম্পিউটারেsetup না থাকলে কম্পিউটারের কত ক্ষতি হতে পারে তা কম বেশি সবার জানা। যেমন-২০১৬ সাল শেষ, তাই অনেকেই ২০১৭ সালের জন্য অ্যান্টিভাইরাস খোঁজা শুরু করে দিয়েছেন। তাই বেশ কিছু অ্যান্টিভাইরাস নিয়ে কথা বলছি যেগুলো মোটামুটি ভালোই কার্যকর এবং সবগুলো অ্যান্টিভাইরাস ফুল ভার্সন, যা আপনার কম্পিউটারকে ৩৬৫ দিন ভাইরাসমুক্ত রাখবে। আপনার কেনা বা ফ্রি পাওয়া এই অ্যান্টিভাইরাস (ভাইরাস কোড) অটো কাজ করছে কিনা তা টেস্ট করার জন্য আপনার নোটপেড ওপেন করুন লিখুন/কপি করুন-
তার পর সেভ করুন। যদি অটো ডিলিট বা সেভ না হয়, তাহলে মনে করবেন অ্যান্টিভাইরাস ১০০% কাজ করছে। নিচে জনপ্রিয় কিছু অ্যান্টি ভাইরাসের ডাউনলোড লিংক দেয়া আছে, চাইলে ব্যবহার করে দেখতে পারেন-
ESET NOD32 Antivirus 5 2012
download
Panda Antivirus 2012
download
Avast antivirus 2012
download
Kaspersky Anti-Virus 2012
download
AVG – Antivirus and Internet Security| Virus Protection 2012
Bitdefender Antivirus Plus
download

বাংলাদেশেই তৈরি হয় নকল অ্যান্টিভাইরাস!
বিচিত্র এ দেশ। বিচিত্র আমাদের চারপাশের মানুষ। আরও বিচিত্র তাদের পেশা। পেশার মাঝে যেন প্রতারণাই সবচেয়ে প্রিয় আমাদের দেশের কিছু লোকের। এখানে কেউ একজন অন্যকে প্রতারিত করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার আগে নিজেই জড়িয়ে যায় অন্যের পেতে রাখা প্রতারণার জালে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার নরম পললে জেগে ওঠা বাংলাদেশের নরম মাটির মতো এদেশের সাধারণ মানুষের মনও নরম, যেমন খুশি তেমন ছাঁচে ঢেলে সাজানো যায় বলেই হয়তো কেউ তেমন একটা মাথাও ঘামান না সেসব নিয়ে।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকম প্রকাশিত নিউজ-‘দেশেই এখন তৈরি হচ্ছে ক্যাসপারস্কি অ্যান্টিভাইরাস, তবে তা নকল!’।
বিষয়টি বলার উদ্দেশ্য হলো শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশ বললেই শুধু হবে না, ডিজিটাল জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আর সেজন্য চাই আমাদের জন্য, আমাদের উপযোগী অ্যান্টিভাইরাস। তবে, আমরা চাচ্ছি যে নিজেদের মাথা খাটিয়ে কোন বাংলাদেশী কোম্পানি তা উদ্ভাবন করুক ও বাজারে আনুক, কিংবা সম্পূর্ণ সেটআপ নিয়ে দেশের মাটিতে আসুক নামিদামি কোম্পানিগুলো যাতে নকল করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
একাধিক জাতীয় পত্রিকার নিউজে এসেছে পুলিশের হাতে আটককৃতরা সফট ফাইল রাইট করে নকল বক্সে ভুলভাল অ্যাক্টিভিশন কোডসহ তা বিক্রিও করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না দেশে আদৌ ক্যাসপারস্কির গ্রাহকসেবা কেন্দ্র আছে কি না বা থাকলেও তা কোথায় এসব জানা না থাকায় অনেকেই প্রতারিত হলেও বলতে পারেননি কারো কাছে।
উপরে বলা ‘আমাদের উপযোগী’ মানে গ্রামে গ্রামে না হোক, সারা দেশ মিলিয়ে হলেও অন্তত কয়েকটি গ্রাহকসেবা কেন্দ্র থাকুক, যেখানে গিয়ে আমরা সরাসরি কোম্পানির লোকের কাছ থেকে পণ্যটি কিনতে পারবো। কিংবা কোথাও কোনো সমস্যা হলে যে নম্বরে কল করে জানাবো তা দেখেই যেন আঁতকে না উঠি ভেবে যে, ‘বিদেশী নম্বর? কল দিলেই তো কাটবে মিনিটে ২৫-৩০ টাকা!’
তাই, অ্যান্টিভাইরাস নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে অনুরোধ বিদেশী কোম্পানি ও সরকারের কাছে, দয়া করে মোবাইল কোম্পানিগুলোর মতো আপনাদের পণ্য ও সেবা পাওয়ার পদ্ধতি সহজ করুন, মানুষ যাতে বুঝতে পারে, কোনটা আসল- কোনটা নকল ও তা প্রচারের ব্যবস্থা করুন।
তবে যে যাই করুক না কেন, আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে সরকার বা বিদেশীদের কাছে সাধারণ জনগণ পৌঁছানো এত সহজ নয়। সে জন্য নিজের ওপরই নিজেকে ভরসা রেখে চলতে হবে। তার মানে নিজে সচেতন হোন আর নিজেই প্রতারণা থেকে বাঁচুন আর নিজের প্রিয় ও প্রয়োজনীয় কম্পিউটারটি ব্যবহার করুন নিরাপদে।

তথ্য সূত্র:
www.wikipedia.org/
www.somewhereinblog.net/
www.tectune.com
www.bhinno.com

লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE