ভারতীয় আগ্রাসনের অন্তরলোক : হারিয়ে যাওয়া হায়দারাবাদ

hydrabadআবদুল হাই শিকদার

দ্বিতীয় পর্ব

হারিয়ে যাওয়া হায়দারাবাদের ‘দেশহীন মানুষ’ সৈয়দ কুতুবউদ্দিনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ১৯৯৫-এ। এরপর একে একে কেটে গেছে ১৭টি বছর। এই এতগুলো বছরেও আমি ভুলতে পারিনি সেই শোকজর্জর ব্যথিত স্বজনহারা বৃদ্ধের অশ্রæসিক্ত চোখ দু’টি। তার দু’টি চোখের মধ্যে যে সর্বস্বহারা হাহাকার, স্বাধীনতা হারানোর যে কষ্ট আমি দেখেছিলাম, আজ এতগুলো বছর পর সেই কষ্টের অনুরণন আমি দেখতে পাচ্ছি আমার ভেতরে। আমার স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে আর্তরক্তাক্ত একটি অ্যাম্বুলেন্স যেন গত কিছু দিন থেকে ছুটে বেড়াচ্ছে। যেন কোথাও কোনো সাইরেন আমার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে আতঙ্ক, ভীতি ও সন্ত্রাস। একটা অশনিসঙ্কেত। সে ভয় গত কয়েক দিনে আমাদের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং মশিউর রহমানদের কথায় আরও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশকে আমাদের শাসকরা কি হায়দারাবাদের মতো পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন? আমাদের লাখ লাখ শহীদের রক্তভেজা জাতীয় পতাকাকে আমরা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবো তো? বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা যে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, সে সম্পর্কে জনগণ সচেতন কতটুকু? নাকি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশী যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি চারদিকে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা ষড়যন্ত্রকারীরা তুলে দিচ্ছে বিদেশীদের হাতে, আর বাংলাদেশের মানুষ ব্যস্ত নিত্যনৈমিত্তিক কাজ নিয়ে। পলাশীর পাশের মাঠে কৃষক হাল দিচ্ছে জমিতে, বটতলায় বসে গুরু মহাশয় জ্ঞান দিচ্ছেন টোলের ছাত্রদের।
আমাদের দেশের লোকজন বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্ম সিকিমের কথা কিছু জানলেও, হায়দারাবাদের প্রসঙ্গ তাদের অজানাই। এই বিষয়ে জানানোর কোনো উদ্যোগও যেমন কেউ কোনোদিন নেয়নি, তেমনি জানার পথও খুব সঙ্কীর্ণ। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সিকিমের চেয়েও বেশি মিল হায়দারাবাদের। ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় আগ্রাসী হানাদার বাহিনীর হাতে পতনের আগে হায়দারাবাদের রাজনীতিবিদ, আমলা, সমরনায়ক, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবী স¤প্রদায় যা যা করেছিল, তার অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের মিল দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই।
সেজন্যই আমার সব সময় মনে হয়েছে হায়দারাবাদ হারিয়ে যাওয়া কোনো অতীত নয়, মুছে ফেলা কোনো দেয়ালের লিখন নয়। ফেলে দেয়া কোনো ক্যালেন্ডারের পাতা নয়। হায়দারাবাদ আমাদের জন্য জীবন্ত ইশতেহার, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, পথ চলার মাইলফলক, জাতীয় জীবনের শিক্ষণীয় ইতিহাস। হায়দারাবাদের করুণ পরিণতি আমাদের অনেক কিছু বলতে চায়, অনেক কিছুর ইঙ্গিত করে। তাই তো আজ এতদিন পর হায়দারাবাদের ইতিহাস আমাদের সামনে ফিরে ফিরে আসছে।
সেজন্যই বার বার বলা হয়, ইতিহাস কেবল অতীত নয়, এক কথায় একটি জাতির ভবিষ্যৎও। খননকাজ চালিয়ে বিলুপ্ত ইতিহাসকে উদ্ধার করে যতই স্বস্থানে স্থাপন করা যাবে, জাতির আত্মার রূপরেখা নির্মাণের কাজটি সহজতর হবে।
১৯৯৫ সালে ফিরে এসে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। কথা বলেছি। তাদের বেশির ভাগই বলেছেন, হায়দারাবাদের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে আমাদের কী লাভ? তা ছাড়া দু’দিন আগে হোক পরে হোক, ভারত হায়দারাবাদ গ্রাস করতোই।
আমার কথা ছিল পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর অতীত ও বর্তমান ভালোভাবে জানা থাকলে কেউ একজন কম ভুল করে। হায়দারাবাদ নিয়ে কথা বলার অর্থ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা নয়। কী কী ভুলে কোন কোন পথ দিয়ে বিপদ ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে, সে সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এখানে লক্ষ্য। জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সতর্ক করা হতে পারে। এটাই হায়দারাবাদ পর্যালোচনার অর্থ। আর দুদিন আগে-পরে ভারত হায়দারাবাদ গ্রাস করতোই বলে যদি নির্লিপ্ত থাকেন, তাহলে তো বলতেই হয়, বাংলাদেশের সামনে ঘোর বিপদ। এখানেও তো কেউ বলতেই পারে, দু’দিন আগে আর পরে ভারত বাংলাদেশকে গ্রাস করতোই। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন উদাসীন উক্তি প্রমাণ করে, আমাদের সাবধান হতেই হবে।
আজকের মতো ১৯৯৮ সালেও শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর দেয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। সে সময় আমার মনে হয়েছিল, এর বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। আমি হায়দারাবাদ পতনের কারণ ও আজকের বাংলাদেশ রক্ষার জন্য করণীয় সম্পর্কে এক সেমিনারের আয়োজন করি জাতীয় প্রেস ক্লাবে। তারিখটা ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। সে সময় হায়দারাবাদের ওপর একটি প্রবন্ধ লেখানোর জন্য যোগাযোগ করি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ইতিহাসের অধ্যাপকের সঙ্গে। তারা প্রত্যেকেই আমাকে নিরাশ করেন। কেউ বলেছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত হাতে নেই। কেউবা বলেছেন দেশের যে সঙ্গিন অবস্থা, এই সময়ে ভারতবিরোধী লেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কেউবা হাত-পা ঝেড়ে বলেছেন, এসব লিখে কী হবে?
শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন আমাদের সবারই প্রিয় মানুষ আরিফুল হক। অভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক আরিফুল হক। যদিও তিনি প্রচলিত অর্থে গবেষক বা ইতিহাস গবেষক ছিলেন না। তবুও সঙ্কটকালের আহŸান তিনি উপেক্ষা করেননি। আরিফুল হক ভাই এক সপ্তাহ খাটাখাটনি করে তৈরি করলেন একটা প্রবন্ধ। সেটা পাঠ করলেন সেমিনারে।
আরিফুল হক ভাই বললেন, ভারত পরিচালিত হয় তাদের রাষ্ট্রগুরু কৌটিল্যের বিধান ও উপদেশকে শিরোধার্য করে। সেই কোটিল্য যিনি চাণক্য নামেও পরিচিত, ভারতের রাজা ও শাসকদের বলে গেছেন, ক্ষমতা অর্জনের লোভ এবং অন্য দেশ বিজয়ের আকাক্সক্ষাকে কখনও মন থেকে মুছে যেতে দেবে না। সব সীমান্তবর্তী রাজাকে শত্রæ মনে করতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে বাদ দিয়ে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হবে। সারা পৃথিবী চাইলেও তুমি নিজে শান্তির কথা চিন্তা করতে পারবে না। তবে বাহ্যিকভাবে শান্তি এবং সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভান করে নিজের আসল উদ্দেশ্য আড়াল করার অভিপ্রায়ে একে ঢালস্বরূপ ব্যবহার করা যাবে।
এই দর্শনের বিষময় ফল ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো আজও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ভারত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে একে একে গ্রাস করে ফেলে জুনাগড়, মানভাদর ও হায়দারাবাদকে। পরে সিকিমকে। আর আজ ভারতের প্রতিবেশী প্রতিটি দেশ নানাভাবে ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার। অথবা ভারত কর্তৃক নানাভাবে নির্যাতিত। এই অশুভ আগ্রাসনের বিপদ সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে জানাতেই আমি লিখবো।
আরিফুল হকের তখন ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় ভারতীয় আগ্রাসনের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। তার কথা ঠিকই। রবীন্দ্রনাথ এই উপমহাদেশের শক, হুন, মুঘল, পাঠানকে এক দেহে লীন করতে চেয়েছিলেন। পণ্ডিত নেহরু স্বপ্ন দেখতেন, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সব এলাকা একদিন ভারতের একচ্ছত্র দখলে চলে আসবে। তখন স্বাধীনসত্তা নিয়ে ছোট ছোট দেশগুলো টিকে থাকতে পারবে না। গান্ধী উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে অভিন্ন বলে জানতেন। রবার্ট বায়রন তার ‘দি স্টেটসম্যান অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাল গঙ্গাধর তিলক বলেছেন, এই উপমহাদেশের মুসলমান অধিবাসীরা হলো বিদেশী দখলদার, কাজেই তাদের শারীরিকভাবে নির্মূল করতে হবে।’ কংগ্রেস সভাপতি আচার্য কৃপালনী বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস অথবা ভারতীয় জাতি কখনোই অখণ্ড ভারতের দাবি পরিত্যাগ করবে না।’ ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল­ভ ভাই প্যাটেল বলতেন, ‘আজ হোক কাল হোক আমরা আবার এক হবো এবং বৃহৎ ভারতের প্রতি আনুগত্য দেখাবো।’
মোট কথা, চরিত্রগতভাবেই ভারত তার আশপাশের কোনো জাতির অস্তিত্ব স্বীকার করে না। ১৯৪৭ সালের ৫ এপ্রিল হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে তারকেশ্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু সম্মেলনে সর্বভারতীয় হিন্দু নেতা সাভারকার এক বাণীতে বলেছিলেন, “প্রথমত পশ্চিমবঙ্গে একটা হিন্দু প্রদেশ গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যে কোনো মূল্যে আসাম থেকে মুসলিমদের বিতাড়ন করে এই দু’টি হিন্দু প্রদেশের মাঝে ফেলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’কে পিষে মারতে হবে।”
এই সা¤প্রদায়িক দর্শন থেকেই ১৯৪৭ সালে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে গঠন করা হয় হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৪৭ থেকে ’৮৫ সালের মধ্যে আসাম থেকে মুসলিম বিতাড়ন প্রক্রিয়াও শেষ করা হয়েছে। এখন পিষে ফেলতে বাকি আছে বাংলাদেশকে। তারই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এই সময় হায়দারাবাদের দৃষ্টান্ত আমাদের সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দেবে বলে বিশ্বাস করি।
সে সময় আরিফুল হকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আমরা বেশ ক’টি বড় বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র‌্যালির আয়োজন করি, যা ছিল বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসে অভূতপূর্ব। পরে ষড়যন্ত্রের জালে আটকে যায় সব আয়োজন। হতাশা ঘিরে ধরে আমাদের।
আরিফুল হক তখন থাকতেন তার শাহীনবাগের বাসায়। এখান থেকেই হঠাৎ একদিন তিনি দেশের রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের অজ্ঞতা, মূর্খতা, স্বার্থপরতা ও হানাহানি দেখে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকটা অভিমান করে চলে যান কানাডায়। তারপর বহুবার তাকে ফিরে আসার অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি ফিরে আসেননি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে তাকে ফিরিয়ে আনার এক জোর প্রচেষ্টা নেয়া হয়। সে সময় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি দিয়েও সম্মানিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু তার এক কথা আমি ফিরছি না। একটি পরাজিত যুদ্ধের দর্শক হওয়ার কোনো রকম ইচ্ছে আমার নেই। hydrabad.jpg-01
আমাদের অনুরোধ এবং পীড়াপীড়ির জবাবে তিনি বলতেন, ভাইরে, একদিন সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিজরত করে বাংলাদেশে এসেছিলাম। সেই বাংলাদেশ আজ নিজের লোকদের কারণেই ভেতর থেকে ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, সর্বত্র এখন চলছে নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্য ভারতের ইঙ্গিতে, ভারতের অর্থে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর অবিমৃশ্যকারী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, আমলা ও লেখক-শিল্পীর দ্বারা সূচিত হয়েছে। জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের বিপন্ন করার জন্য পুরো দেশের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিভেদ, হানাহানি ও ঘৃণা। পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। জাতীয় ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রদীপ নিভু নিভু করে জ্বলছে। যারা দেশপ্রেমিক তারা আজ উপেক্ষিত। যারা ভারতীয় আগ্রাসনকে ত্বরান্বিত করার জন্য কাজ করছে, তাদের ‘হিরো’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের বিরাট অংশ ভারতের দালালিতে লিপ্ত। গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে এমনভাবে সিন্ডিকেটেড প্রচার-প্রচারণা চলছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বিভ্রান্তি। তারা আজ অনুধাবন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কোনটি সঠিক, কোনটি বেঠিক। আমাদের রাজনীতিবিদদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতের পায়ের ওপর সেজদায় পড়ে আছে।
এরকম অবস্থায় আমার মতো একজন সাধারণ সংস্কৃতিকর্মী আর কী করতে পারে। আমি তো সব খ্যাতি-প্রতিপত্তি পাশ কাটিয়ে, মঞ্চের হাতছানিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে মাঠে নেমে এসেছিলাম। জনগণের মধ্যে কাজ করতে চেয়েছিলাম। লাভ কী হলো? যাদের নিয়ে কাজ করার জন্য সব ত্যাগ করে এসেছিলাম, তারা আমাকে ন্যূনতম সম্মানটুকুও দেয়নি। কদর করেনি। উল্টো বোঝাতে চেয়েছে, আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে এখানে এসেছি। সত্যি বলছি, শেষের দিকে নিজেকে বড় বেশি অবাঞ্ছিত মনে হতো। আমি চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়ি। অথচ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের টিকে থাকার পাটাতনগুলো এক এক করে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে ধ্বংস করা হচ্ছে। আর প্রতিদিন বাংলাদেশ ঢুকে পড়ছে ভারতীয় আগ্রাসনের আরও গভীরে, আরও গভীরে।
অসহায়ভাবে এই দৃশ্য দেখার জন্য আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, নিজেকে দর্শকের ভূমিকায় দেখতে হবেÑ এটা আমার সহ্য হয়নি। যে আবেগ ও আশা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলাম, তাই যখন থাকলো না, তখন আর বাংলাদেশে থেকে কী হবে? তাই তো আমি আবার যাযাবর হলাম। চলে এসেছি কানাডায়।
এখানে আমার কোনো কাজ নেই। আমি এদের কেউ নই। সেও ভালো। সে আমার সয়ে যাচ্ছে। এখানে কেউ নিজেদের কবর নিজেরা খোঁড়ে না। এখানে ভাড়া খাটা রাজনীতিবিদ নেই। ভাড়া খাটা বুদ্ধিজীবী নেই, কবি- লেখকও নেই। এখানে চারপাশে কোনো ভারত নেই বলে কোথাও কোনো অশান্তি নেই। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আছি বলে দেশের দুর্ভাগ্য আমাকে তাড়িত করে না। দৈনন্দিন দাহগুলো আমাকে পোড়াতে পারে না। বাংলাদেশ যদি কোনো নাটকের নাম হয়, তাহলে তার শেষ অঙ্ক দেখার জন্য আমাকে আর কষ্টে কঁকিয়ে উঠতে হবে না।
বিশ্বাস করুন যে নিদারুণ দুঃখ, কষ্ট ও যাতনা ভোগ করেছেন সৈয়দ কুতুবউদ্দিন, সেই কষ্ট আমার এই বয়সে আমি আর সহ্য করতে পারবো না। আমাকে দূরেই থাকতে দিন।
আরিফুল হকের মতো মহাপ্রাণ মানুষ বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছেন। তার একটা যাওয়ার জায়গা ছিল কানাডাতে। তিনি সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিতে পেরেছেন। কিন্তু আমার-আপনার মতো আমজনতা কোথায় যাবে? আমাদের তো পালিয়ে বাঁচারও জায়গা নেই। যেহেতু আমাদের পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই, অতএব আমাদের কাজ হবে মাতৃভূমির রাষ্ট্রিক ভিত্তি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। যে কাজের কে মূল্য দিলো, কে দিলো না, সে হিসাব-নিকাশ করে লাভ নেই। তাহলে হতাশা আসবে এবং আরও অরক্ষিত হয়ে যাবে দেশ। তা আমরা হতে দিতে পারি না। তাই যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে বাংলাদেশের সরাবো জঞ্জাল। তারপর ইতিহাসের হাতে সমর্পণ করবো নিজেদের। (চলবে)

a_hyesikder@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply