ভারতীয় আগ্রাসনের অন্তরলোক হারিয়ে যাওয়া হায়দরাবাদ

আবদুল হাই শিকদার

চোখের পাপড়িগুলো পর্যন্ত বরফ-সাদা। আর অবিরল তুষারপাতের ভেতর দিয়ে টিউব রেলওয়ে হয়ে হেঁটে আমি এসেছি। পেঁজা তুলার মতো জমাট তুষার এখানে-ওখানে। গাছের পাতায়। ট্রাফিক সিগন্যালের মাথায়। ফুটপাথে। পুরো ওভারকোটে মোড়ানো আমার শরীর দেখে যে কারও মনে হতেই পারত, ‘এ মুভিং প্যাকেট অব গুডস।’ আমার সে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, স্তূপ স্তূপ বরফ আমার পায়ের নিচে বিছিয়ে রেখেছে রাজ্যের শুভ্রতা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দাঁতের চেয়েও সে শুভ্রতা উজ্জ্বল, তবে একই রকম শীতল। আমার জুতার তলা দিয়ে ঠাণ্ডা ঢুকতে থাকে। অনুভব করি কনকনে বাতাস বরফাচ্ছন্নতাকে আরও উসকে দিয়ে কাঁপন ধরাতে এগিয়ে আসছে আমার রক্তে। সঙ্গী নাইমুল হক সেই সময় কড়া নাড়ে আকাক্সিক্ষত দরজায়। ১৯৯৫ সালের শীতে বিকেলের লন্ডন, দরজা খুলেই হাত বাড়ায়, ‘আহলান সাহলান, খোশ আমদিদ।’
ভদ্রলোকের মাথার চুলগুলো লন্ডনের বরফের চাইতেও সাদা। মুখভর্তি তার চেয়েও সাদা সুবিন্যস্ত দাড়ি। পরনের পোশাকে এখনও লেগে আছে ওরিয়েন্টাল আভিজাত্যের ঘ্রাণ। দুধের সঙ্গে আলতা মেশানো গায়ের রঙ। হাত যখন বাড়ালেন আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। হাতের প্রতিটি পশম পর্যন্ত শ্বেত সৌন্দর্যের কারুকাজ। পুরুষ্ঠ হাতটি আমি হাতের মধ্যে নিলাম। তিনি আমাকে ভেজা ওভারকোট সহই জড়িয়ে নিলেন বুকে, ‘ভাই সাহেব, কতদিন পরে আমার তরুণ ভাই খোঁজ নিতে এসেছে এই বদনসিবের।’
বললাম, বদনসিব হবেন কেন? তাসাদ্দুক ভাই আপনার সম্পর্কে আমাকে যা বলে দিয়েছেন তা থেকে আমার ধারণা হয়েছে, আপনি এক অসাধারণ মানুষ। আর তাসাদ্দুক ভাইয়ের মতো লোক তো যে কারও সম্পর্কে যা খুশি তা বলতে পারেন না।
স্মিত হেসে আমাকে হাত ধরে ড্রয়িংরুমে নিয়ে তাজিমের সঙ্গে বসালেন। বাইরের ঠাণ্ডা রুমের উষ্ণতায় দ্রুত কেটে যাচ্ছে টের পাচ্ছি।
এর মধ্যে কফি চলে এলো। গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে তাসাদ্দুক ভাই, মানে সেই সময়কার লন্ডনে বাংলাদেশীদের সব অগতির গতি তাসাদ্দুক আহমদের কথা ভাবছিলাম। তিনি আমাকে এই মানুষটির কাছে পাঠিয়ে বললেন, সৈয়দ কুতুবউদ্দিন সাহেব লন্ডনে এসেছেন সেই ১৯৪৯ সালে। তুমি তো ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কর। তার কাছে উপমহাদেশের ইতিহাসের বেশকিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়ে গেছে। একটা স্বাধীন দেশকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল তার জীবন্ত সাক্ষী তিনি। জানাশোনা লোক। একসময় লেখালেখি করতেন, এখন করেন না। বলেন, ‘এ জীবনে তো আর মাতৃভূমির স্বাধীনতা উদ্ধার করতে পারলাম না। এখন তো জীবনে লেগেছে ভাটার টান। আর পেছনে ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করে না। এখন চিরতরে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তবুও তুমি তার কাছে যাও। স্বাধীন হায়দরাবাদ কিভাবে ৬ দিনের যুদ্ধে ভারত দখল করে নিয়েছিল তার বিস্তারিত কথা শুনতে পাবে তার কাছে।
তাসাদ্দুক ভাইয়ের নির্দেশ মানতে এবং আমার অন্তরের আগ্রহ পূরণ করতেই এই শীতের বরফ ঠেলে এখানে আসা।
কফির কাপ টেবিলে রাখতে রাখতে বললাম, আপনার কথা বলুন। আপনার দেশের কথা বলুন।
কুতুবউদ্দিন সাহেব গম্ভীর হয়ে গেছেন। বললেন, আমার নিজের কোনো কথা নেই। আর আমার কোনো দেশ নেই। আমি হলাম দেশহীন এক মানুষ। ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আমার দেশ দখল করে নিয়েছে ভারত।
বললাম, সেই হায়দরাবাদের কথাই বলুন।
সৈয়দ কুতুবউদ্দিন বিখ্যাত উর্দু কবি দাগের গজল শোনান আমাদের :
‘দিল্লি সে চলে দাগ, করো সায়র ডেকান কি,
গওহর কি হুয়ি কদর, সমুন্দর সে নিকাল কে।
হায়দরাবাদ রহে তা-বা, কেয়ামত কায়েম
এহি, অ্যায় দাগ, মুসলমান কি এক বসতি হ্যায়।’
(হে দাগ, দিল্লি ছাড়। দাক্ষিণাত্যের পথে ভ্রমণ কর। মুক্তার দাম তো তখনই হয় যখন সে সমুদ্রের বাইরে আসতে পারে। হায়দরাবাদ কেয়ামত পর্যন্ত উজ্জ্বল থাক, চিরঞ্জীব হোক, কারণ এই তো একমাত্র স্থান যেখানে মুসলমানরা বাস করতে পারে।)
কবি দাগের সেই শুভকামনা পূর্ণ হয়নি। পূর্ণ হতে দেয়া হয়নি। স্বাধীন হায়দরাবাদ বেঁচে থাকেনি। বেঁচে থাকতে পারেনি। বেঁচে থাকতে দেয়া হয়নি। মুসলমানদের আবাসস্থল হয়েও সে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনি। দাগের কবিতা লেখার ৫০ বছরের মধ্যে হায়দরাবাদ ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকারে পরিণত হয়ে রাষ্ট্র হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
বিশ্বমানচিত্র থেকে মুছে গেছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম-নিশানা। ভারতীয় বাহিনী হায়দরাবাদ দখলের পর প্রথমেই ভেঙে দিয়েছিল এর সেনাবাহিনী। সব দেশপ্রেমিককে করেছিল শৃঙ্খলিত। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে নিষিদ্ধ করে দিল উর্দুকে। নিষিদ্ধ হলো জাতীয় সঙ্গীত। রাষ্ট্র হিসেবে হায়দরাবাদের বিলুপ্তির ঘোষণা করে ভাষার ভিত্তিতে একে তিন টুকরো করা হলো। এক টুকরো দেয়া হলো অন্ধ্রকে, এক টুকরো মহারাষ্ট্রের সঙ্গে, অন্য টুকরো বিলীন করে দেয়া হলো মহিশুরের সঙ্গে। আমার দেশ হায়দরাবাদ রাষ্ট্রের শেষ ও একমাত্র চিহ্ন হিসেবে টিকে রইল শুধু শহর হায়দরাবাদ।
সৈয়দ কুতুবউদ্দিনের চোখ চলে যায় সুদূর অতীতে। তার ফেলে আসা যৌবনে। তার হায়দরাবাদে। তার শৈশব তার কৈশোরে। নিজের ফেলে আসা গৃহের আঙিনায়। হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নিমেষে তার হৃদয় লন্ডন থেকে চলে যায় হারিয়ে যাওয়া হায়দরাবাদে।
টানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার কথা বলতে শুরু করেন, আমি কি বেশি কথা বলছি?
বললাম, ঠিক আছে। আপনি বলুন।
তিনি বললেন, কী করব, আমি ছাড়া আজকের পৃথিবীতে বিলুপ্ত হায়দরাবাদের জন্য কথা বলার লোক, চোখের পানি ফেলার লোক তো হয়তো আর নেই।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করেন সৈয়দ কুতুবউদ্দিন, ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮, আমাদের স্বাধীনতা লাভের মাত্র এক বছর তিন মাসের মাথায়, যখন আমি মাত্র ৩১ বছরের যুবক। সদ্য বিয়ে করেছি মাতৃভূমির গৌরবে গৌরবান্বিত বুক নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে দেশের জন্য কাজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছি কর্মক্ষেত্রে। অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী হায়দরাবাদের মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। হায়দরাবাদে কেউ কখনও না খেয়ে মরেনি। শিক্ষার হার ছিল উপমহাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। সর্বত্র শান্তি আর সদ্য স্বাধীনতা লাভের আনন্দ। সেই সময় যখন আমরা কেবল ঘর গুছাচ্ছিলাম, দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছিলাম, যখন কেবল মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছি। আমার সদ্য বিয়ে করা বিদুষী স্ত্রী বলত, সারাক্ষণ দেশ দেশ করে বাইরে থাক। এবার ঘরের দিকে একটু মন দাও। বললাম, ঘরকে সুন্দর করার জন্যই দেশকে সুন্দর করার কাজে মন দিয়েছি। তোমাকে, তোমার ঘরকে ভালোবাসি বলেই তো দেশকে ভালোবাসি।
স্ত্রী প্রসঙ্গ আসাতে বিমর্ষ হয়ে গেলেন কুতুবউদ্দিন সাহেব। ৭৮ বছরের প্রবীণ চোখে কি পানি এলো? আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কায়দা করে চোখ মুছে নিলেন বৃদ্ধ।
বলে চললেন, সেই সময় ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো, পৃথিবীর সব নীতি-নিয়ম, জাতিসংঘের সনদ দু’পায়ে মাড়িয়ে হিংস্র হায়েনার মতো চার দিক থেকে হায়দরাবাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ভারতীয় সেনাবাহিনী। শত শত ট্যাঙ্ক, কামানের গর্জনে প্রকম্পিত হলো হায়দরাবাদের আকাশ-বাতাস-জমিন। ভারতের বোমারু বিমানগুলোর নির্বিচার বোমাবর্ষণে ক্ষত-বিক্ষত হলো ৫শ’ বছর ধরে গড়ে ওঠা সুন্দর দেশ হায়দরাবাদ।
উন্মত্তের মতো মুসলিম হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠল ভারতীয় সেনাবাহিনী। কারণ, তারাই ছিল হায়দরাবাদের স্বাধীনতা রক্ষার মূল চালিকাশক্তি। শহর, বন্দর, বাজার, গ্রাম, গঞ্জ ধ্বংস করে মাইলের পর মাইল বাড়িঘর, মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, কলেজ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে রাজধানীর দিকে এগুতে থাকল ভারতীয় বাহিনী। প্রথম দুই দিনেই ৭০ হাজারের মতো নিরীহ সাধারণ মানুষ নিহত হলো ভারতীয় সৈন্যদের হাতে। ধর্ষিত হলো ৩০ হাজারের মতো মা-বোন। মানবসভ্যতার এত বড় বিপর্যয়ের মুখেও সেদিন মুখে কুলুপ এঁটে নীরব নিঃশব্দ হয়ে বসে রইল বিশ্ববিবেক।
এমনকি মুসলিম দেশগুলো পর্যন্ত সেদিন সাহায্য তো দূরের কথা, এই ভয়াবহ আগ্রাসানের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। এই নীরবতা, এই নিঃসঙ্গতা, এই জঘন্য উদাসীনতার কারণ কী ছিল, জাতিসংঘই বা কেন সেদিন নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন ডাকতে বিলম্ব করল? তা আজও রহস্যাবৃতই হয়ে আছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম, মুসলিম দেশগুলো কেন হায়দরাবাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, তা আজও কারও বোধগম্য নয়।
কিন্তু আমরা, আমার মতো লাখ লাখ স্বাধীনতাপিপাসু মানুষ, সেদিন আমাদের যার কাছে যা ছিল তাই নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম ভারতীয় হানাদারদের বিরুদ্ধে। হায়দরাবাদের গণমানুষের প্রিয় নেতা কাশেম রিজভী বিপন্ন স্বাধীনতা রক্ষার জন্য গড়ে তুলেছিলেন প্রবল প্রতিরোধ। কিন্তু অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত লক্ষাধিক সৈন্যের একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র জনতা যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারে ক’দিন?
ভারতের তল্পিবহনকারী, দালাল, সুবিধাভোগী, দেশদ্রোহীচক্র যারা নানা ছদ্মাবরণে হায়দরাবাদের জাতীয় ঐক্য, সংহতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংসের জন্য কাজ করছিল, তারা এবার প্রকাশ্যে এসে হাত মেলালো ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে।
হায়দরাবাদের রাজনীতিবিদ, সমরনায়ক, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের বিরাট অংশ জাতীয় প্রতিরোধ সংগ্রামকে ভেতর থেকে ভয়ানক দুর্বল করে তুললেন। গোটা জাতিকে নানা কায়দায় পরিষ্কার দুটো ভাগে বিভক্ত করে তুলল। নানা কল্পকাহিনীর জন্ম দিল তারা। ভারতীয় পত্রপত্রিকা এক্ষেত্রে জোগালো ঢালাও সমর্থন।
ফলে আঘাত ও আগ্রাসন যখন প্রত্যক্ষভাবে এলো তখন দ্বিধাবিভক্ত জাতির পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল। এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আল ইদরুস করলেন চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ঠিক আপনাদের মীরজাফর যেভাবে সিরাজের সঙ্গে, মীর সাদেক যেভাবে টিপু সুলতানের সঙ্গে করেছিলেন।
তো আমাদের সব উদ্যোগ আয়োজন ব্যর্থ হয়ে গেল। ফলে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে ১৮ সেপ্টেম্বর পতন হলো হায়দরাবাদের। মুছে গেল হায়দরাবাদ। আহ!
বুকে চেপে রাখা একটা কষ্ট যেন গলা দিয়ে গোঙরানির মতো বেরিয়ে এলো কুতুবউদ্দিন সাহেবের। কথা বলা বন্ধ করে বাইরে তুষারপাত দেখার দিকে যেন মন দিলেন হঠাৎ। আমরা কেউ কোনো কথা বলি না। আবার শুরু করেন বৃদ্ধ, যুদ্ধের ময়দানে গুলিবিদ্ধ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিলাম। সেখান থেকে কিভাবে কোথায় গিয়েছি, বলতে পারব না। আমার জ্ঞান ফিরল পরাধীন হায়দরাবাদে ওসমানিয়া হাসপাতালে। হাসপাতাল থেকে আমাকে পাঠানো হলো জেলে। জেলের ঘানি টানলাম কয়েক মাস। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলো গোলযোগ সৃষ্টির। ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের অভিযোগ এলো। অভিযোগ এলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার। কয়েকজন ভারতীয় সৈনিক নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে আমার গুলিতে মরেছিল।
সেই মামলার হামলা পার হয়ে জামিন জুটল এরও ৬ মাস পর। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাইরে এসে দেখি সর্বত্র পতপত করে উড়ছে ভারতীয় পতাকা। ছারখার হয়ে গেছে হায়দরাবাদ। হায়দরাবাদ যেন ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। বেহুঁশের মতো ছুটলাম নিজ বাড়িতে।
আমাদের পুরো মহল্লাটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পড়ে আছে ছাইভস্ম আর পোড়ামাটি।
আমার বাবা-মা, দু’টি ভাই কারোই কোনো খোঁজ পেলাম না। হয়তো বন্ধ ঘরে আটকে তাদের আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় বাহিনী।
হঠাৎ আমার স্ত্রী, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, যে নাকি একজন ভালো আইনজীবী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাকে খুঁজলাম। আমার এক সদাশয় স্নেহময় হিন্দু প্রতিবেশী বৃদ্ধ বললেন, বাবা রে, সব তো শেষ হয়ে গেছে। ওরা এখানকার সহায়-সম্পদ সব লুণ্ঠন করেছে। মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। তবে মহল্লায় ঢুকে মেয়েদের, বিশেষ করে যুবতী মেয়েদের ওরা আগেই আলাদা করে ট্রাকে উঠিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে। এর বেশি আমি কিছু জানি না।
তার পরের কয়েক মাস আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে, জীবনের ভয়কে তুচ্ছ করে আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেরিয়েছি আমার বাবা-মা, ভাই ও জেবুন্নেসা আমার স্ত্রীকে। হাসপাতাল, মর্গ, জেলখানা, পতিতাপল্লী কোথাও বাদ দেইনি। আমার কয়েকজন হিন্দু বন্ধুর সহযোগিতায় ভারতীয় সৈন্যদের শিবিরেও খোঁজ নিয়েছি। কাউকেই পাইনি। আমি আর ওকেও খুঁজে পাইনি। ওর কী হয়েছিল, তাও কোনোদিন জানতে পারিনি। আমার মতো এরকম হাজার হাজার স্বামী তাদের স্ত্রীদের, বাবা তাদের ছেলেমেয়েদের খুঁজে পাননি। হয়তো হায়দরাবাদের কোনো চিহ্নহীন গণকবরে চাপা পড়ে গেছে আমার জেবুন্নেসা, আমার বাবা-মা-ভাই।
তারপর আর কী।
‘ওহ দিল নহি রহা হ্যায়, নহ ওহ আব দিমাগ হ্যায়,
জি এনমেঁ আপনে বুঝতাসা কোই চিরাগ হ্যায়’
(সেই হৃদয় নেই, সেই মাথাও এখন নেই। শরীরে প্রাণ আছে, কিন্তু সে যেন নিভু নিভু প্রদীপ।)
কথা বলতে বলতেই আমাদের দিকে চোখ ফেরালেন সৈয়দ কুতুবউদ্দিন। তার মুখের দিকে তাকাতে ভয় করছিল আমার। না জানি কী সেখানে দেখব। তবুও কথা শেষ হয় না তার, শিকদার সাহেব, আপনাদের বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনে অনেক বড় দেশ ছিল আমার হায়দরাবাদ। শুধু আয়তনের দিক থেকেই নয়, সম্পদ, সমৃদ্ধি, সামর্থ্যরে দিক থেকেও স্বাধীন রাষ্ট্র হায়দরাবাদের সম্মান ছিল অনেক উঁচুতে। হায়দরাবাদের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছিল। নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা ছিল। সেনাবাহিনী ছিল। আইন, আদালত, বিচারব্যবস্থা ছিল। হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, শুল্ক বিভাগ ছিল। নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয় ও ভাষা ছিল। নিজস্ব পতাকা ছিল। জাতীয় সঙ্গীত ছিল। পৃথিবীর দেশে দেশে নিজস্ব রাষ্ট্রদূত ছিল। জাতিসংঘে নিজস্ব প্রতিনিধি ছিল। সব ভারতের আগ্রাসী তাণ্ডবে মুহূর্তে মিথ্যা হয়ে গেল।
নিঃস্ব, রিক্ত, দুঃখী, পরাধীন হায়দরাবাদে আর থাকব না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তারপর কিছু বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে ভারত-অধিকৃত হায়দরাবাদ থেকে রাতের অন্ধকারে পালালাম। তার পর নানা ঘাটে দোল খেতে খেতে এলাম লন্ডনে। সেই যে এলাম।
সৈয়দ কুতুবউদ্দিন আবার থামেন। এরই মধ্যে রাতের খাবারের ডাক আসে। আমি ও নাইমুল একসঙ্গে সৈয়দ কুতুবউদ্দিনের দিকে তাকাই। বুকে হাত বুলাতে বুলাতে আবার কথা শুরু করেন, আমার এই বুকের ভেতরে অনেক জ্বালা, অনেক কষ্ট, অনেক স্বজন হারানোর কান্না। এগুলো আমার মধ্যে সারাক্ষণ দগদগে ঘায়ের মতো জ্বলতে থাকে। আমি ঘুমুতে পারি না বহুদিন। কাউকে যে বলে একটু হালকা হবো, সে উপায়ও নেই। দরদি মানুষ কোথায়? ৭৮ বছর বয়সে এসেও আমি আজও ভুলতে পারিনি জেবুন্নেসার সেই শেষ বিদায়ের মুখটা। আমাকে বলেছিল, ‘তোমাকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিলাম। বিজয়ী হয়ে ফিরে এসো।’ আমি বিজয়ী হতে পারিনি বলেই হয়তো ভারতীয় সৈনিকরা আমার জেবুন্নেসাকে শিয়াল-শকুনের মতো কামড়ে কামড়ে খেয়েছে।
লন্ডনের তুষারপাতের মধ্যে এবার নেমে আসে অঝোর শ্রাবণ। বৃদ্ধের দুই চোখ দিয়ে বহুদিন পরে যেন উপচিয়ে নেমে আসে অবিরল পানির ধারা। রুদ্ধ হয়ে আসে কণ্ঠস্বর। তবুও ভাঙা ভাঙা গলায় আবৃত্তি করতে থাকেন মীর তকী মীরের গজল :
‘হু শমাএ আখিরে শব, শুন সরগুজশত মেরী,
ফির শুবহ হোনে তকতো কিসসা হি মুখতসর হ্যায়।’
(শেষ রাতের প্রদীপ আমি, শুনে নাও আমার দুঃখের কাহিনী, ভোর হতে হতে তো সবই শেষ হয়ে যাবে।)

হারিয়ে যাওয়া হায়দরাবাদের ‘দেশহীন মানুষ’ সৈয়দ কুতুবউদ্দিনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল ১৯৯৫-এ। এরপর একে একে কেটে গেছে ১৭টি বছর। এই এতগুলো বছরেও আমি ভুলতে পারিনি সেই শোকজর্জর ব্যথিত স্বজনহারা বৃদ্ধের অশ্রুসিক্ত চোখ দু’টি। তার দু’টি চোখের মধ্যে যে সর্বস্বহারা হাহাকার, স্বাধীনতা হারানোর যে কষ্ট আমি দেখেছিলাম, আজ এতগুলো বছর পর সেই কষ্টের অনুরণন আমি দেখতে পাচ্ছি আমার ভেতরে। আমার স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে রক্তাক্ত একটি অ্যাম্বুলেন্স যেন গত কিছু দিন থেকে ছুটে বেড়াচ্ছে। যেন কোথাও কোনো সাইরেন আমার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে আতঙ্ক, ভীতি ও সন্ত্রাস। একটা অশনি সঙ্কেত। সে ভয় গত কয়েক দিনে আমাদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং মশিউর রহমানদের কথায় আরও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশকে আমাদের শাসকরা কি হায়দরাবাদের মতো পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন? আমাদের লাখ লাখ শহীদের রক্তভেজা জাতীয় পতাকাকে আমরা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবো তো? বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা যে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, সে সম্পর্কে জনগণ সচেতন কতটুকু? নাকি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশী যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি চারদিকে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা ষড়যন্ত্রকারীরা তুলে দিচ্ছে বিদেশীদের হাতে, আর বাংলাদেশের মানুষ ব্যস্ত নিত্য-নৈমিত্তিক কাজ নিয়ে। পলাশীর পাশের মাঠে কৃষক হাল দিচ্ছে জমিতে, বটতলায় বসে গুরু মহাশয় জ্ঞান দিচ্ছেন টোলের ছাত্রদের।
আমাদের দেশের লোকজন বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্ম সিকিমের কথা কিছু জানলেও, হায়দরাবাদের প্রসঙ্গ তাদের অজানাই। এই বিষয়ে জানানোর কোনো উদ্যোগও যেমন কেউ কোনোদিন নেয়নি, তেমনি জানার পথও খুব সঙ্কীর্ণ। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে সিকিমের চেয়েও বেশি মিল হায়দরাবাদের। ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় আগ্রাসী হানাদার বাহিনীর হাতে পতনের আগে হায়দরাবাদের রাজনীতিবিদ, আমলা, সমরনায়ক, ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় যা যা করেছিল, তার অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের মিল দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই।
সে জন্যই আমার সব সময় মনে হয়েছে হায়দরাবাদ হারিয়ে যাওয়া কোনো অতীত নয়, মুছে ফেলা কোনো দেয়ালের লিখন নয়। ফেলে দেয়া কোনো ক্যালেন্ডারের পাতা নয়। হায়দরাবাদ আমাদের জন্য জীবন্ত ইশতেহার, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, পথ চলার মাইলফলক, জাতীয় জীবনের শিক্ষণীয় ইতিহাস। হায়দরাবাদের করুণ পরিণতি আমাদের অনেক কিছু বলতে চায়, অনেক কিছুর ইঙ্গিত করে। তাই তো আজ এতদিন পর হায়দরাবাদের ইতিহাস আমাদের সামনে ফিরে ফিরে আসছে।
সে জন্যই বারবার বলা হয়, ইতিহাস কেবল অতীত নয়, এক কথায় একটি জাতির ভবিষ্যৎ। খননকাজ চালিয়ে বিলুপ্ত ইতিহাসকে উদ্ধার করে যতই স্বস্থানে স্থাপন করা যাবে, জাতির আত্মার রূপরেখা নির্মাণের কাজটি সহজতর হবে।
১৯৯৫ সালে ফিরে এসে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। কথা বলেছি। তাদের বেশির ভাগই বলেছেন, হায়দরাবাদের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে আমাদের কী লাভ? তাছাড়া দু’দিন আগে হোক পরে হোক, ভারত হায়দরাবাদ গ্রাস করতোই।
আমার কথা ছিল পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর অতীত ও বর্তমান ভালোভাবে জানা থাকলে কেউ একজন কম ভুল করে। হায়দরাবাদ নিয়ে কথা বলার অর্থ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা নয়। কী কী ভুলে কোন কোন পথ দিয়ে বিপদ ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে, সে সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এখানে লক্ষ্য। জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সতর্ক করা হতে পারে। এটাই হায়দরাবাদ পর্যালোচনার অর্থ। আর দুদিন আগে-পরে ভারত হায়দরাবাদ গ্রাস করতোই বলে যদি নির্লিপ্ত থাকেন, তাহলে তো বলতেই হয়, বাংলাদেশের সামনে ঘোর বিপদ। এখানেও তো কেউ বলতেই পারে, দু’দিন আগে আর পরে ভারত বাংলাদেশকে গ্রাস করতোই। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন উদাসীন উক্তি প্রমাণ করে, আমাদের সাবধান হতেই হবে।
আজকের মতো ১৯৯৮ সালেও শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর দেয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। সে সময় আমার মনে হয়েছিল, এর বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। আমি হায়দরাবাদ পতনের কারণ ও আজকের বাংলাদেশ রক্ষার জন্য করণীয় সম্পর্কে এক সেমিনারের আয়োজন করি জাতীয় প্রেস ক্লাবে। তারিখটা ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। সে সময় হায়দরাবাদের ওপর একটি প্রবন্ধ লেখানোর জন্য যোগাযোগ করি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ইতিহাসের অধ্যাপকের সঙ্গে। তারা প্রত্যেকেই আমাকে নিরাশ করেন। কেউ বলেছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত হাতে নেই। কেউবা বলেছেন দেশের যে সঙ্গিন অবস্থা, এই সময়ে ভারতবিরোধী লেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কেউবা হাত-পা ঝেড়ে বলেছেন, এসব লিখে কী হবে?
শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন আমাদের সবারই প্রিয় মানুষ আরিফুল হক। অভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক আরিফুল হক। যদিও তিনি প্রচলিত অর্থে গবেষক বা ইতিহাস গবেষক ছিলেন না। তবুও সঙ্কটকালের আহ্বান তিনি উপেক্ষা করেননি। আরিফুল হক ভাই এক সপ্তাহ খাটাখাটনি করে তৈরি করলেন একটা প্রবন্ধ। সেটা পাঠ করলেন সেমিনারে।
আরিফুল হক ভাই বললেন, ভারত পরিচালিত হয় তাদের রাষ্ট্রগুরু কৌটিল্যের বিধান ও উপদেশকে শিরোধার্য করে। সেই কৌটিল্য যিনি চাণক্য নামেও পরিচিত, ভারতের রাজা ও শাসকদের বলে গেছেন, ক্ষমতা অর্জনের লোভ এবং অন্য দেশ বিজয়ের আকাক্সক্ষাকে কখনও মন থেকে মুছে যেতে দেবে না। সব সীমান্তবর্তী রাজাকে শত্রু মনে করতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে বাদ দিয়ে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হবে। সারা পৃথিবী চাইলেও তুমি নিজে শান্তির কথা চিন্তা করতে পারবে না। তবে বাহ্যিকভাবে শান্তি এবং সৎপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভান করে নিজের আসল উদ্দেশ্য আড়াল করার অভিপ্রায়ে একে ঢালস্বরূপ ব্যবহার করা যাবে।
এই দর্শনের বিষময় ফল ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো আজও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ভারত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে একে একে গ্রাস করে ফেলে জুনাগড়, মানভাদর ও হায়দরাবাদকে। পরে সিকিমকে। আর আজ ভারতের প্রতিবেশী প্রতিটি দেশ নানাভাবে ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার। অথবা ভারত কর্তৃক নানাভাবে নির্যাতিত। এই অশুভ আগ্রাসনের বিপদ সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মকে জানাতেই আমি লিখবো।
আরিফুল হকের তখন ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় ভারতীয় আগ্রাসনের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। তার কথা ঠিকই। রবীন্দ্রনাথ এই উপমহাদেশের শক, হুন, মুঘল, পাঠানকে এক দেহে লীন করতে চেয়েছিলেন। পণ্ডিত নেহরু স্বপ্ন দেখতেন, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সব এলাকা একদিন ভারতের একচ্ছত্র দখলে চলে আসবে। তখন স্বাধীন সত্তা নিয়ে ছোট ছোট দেশগুলো টিকে থাকতে পারবে না। গান্ধী উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে অভিন্ন বলে জানতেন। রবার্ট বায়রন তার ‘দি স্টেটসম্যান অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাল গঙ্গাধর তিলক বলেছেন, এই উপমহাদেশের মুসলমান অধিবাসীরা হলো বিদেশী দখলদার, কাজেই তাদের শারীরিকভাবে নির্মূল করতে হবে।’ কংগ্রেস সভাপতি আচার্য কৃপালনী বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস অথবা ভারতীয় জাতি কখনোই অখণ্ড ভারতের দাবি পরিত্যাগ করবে না।’ ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলতেন, ‘আজ হোক কাল হোক আমরা আবার এক হবো এবং বৃহৎ ভারতের প্রতি আনুগত্য দেখাবো।’
মোট কথা, চরিত্রগতভাবেই ভারত তার আশপাশের কোনো জাতির অস্তিত্ব স্বীকার করে না। ১৯৪৭ সালের ৫ এপ্রিল হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে তারকেশ্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু সম্মেলনে সর্বভারতীয় হিন্দু নেতা সাভারকার এক বাণীতে বলেছিলেন, ‘প্রথমত পশ্চিমবঙ্গে একটা হিন্দু প্রদেশ গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যে কোনো মূল্যে আসাম থেকে মুসলিমদের বিতাড়ন করে এই দু’টি হিন্দু প্রদেশের মাঝে ফেলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’কে পিষে মারতে হবে।’
এই সাম্প্রদায়িক দর্শন থেকেই ১৯৪৭ সালে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে গঠন করা হয় হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৪৭ থেকে ’৮৫ সালের মধ্যে আসাম থেকে মুসলিম বিতাড়ন প্রক্রিয়াও শেষ করা হয়েছে। এখন পিষে ফেলতে বাকি আছে বাংলাদেশকে। তারই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এই সময় হায়দরাবাদের দৃষ্টান্ত আমাদের সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দেবে বলে বিশ্বাস করি।
সে সময় আরিফুল হকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আমরা বেশ ক’টি বড় বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনার আয়োজন করি, যা ছিল বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসে অভূতপূর্ব। পরে ষড়যন্ত্রের জালে আটকে যায় সব আয়োজন। হতাশা ঘিরে ধরে আমাদের।
আরিফুল হক তখন থাকতেন তার শাহীনবাগের বাসায়। এখান থেকেই হঠাৎ একদিন তিনি দেশের রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের অজ্ঞতা, মূর্খতা, স্বার্থপরতা ও হানাহানি দেখে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকটা অভিমান করে চলে যান কানাডায়। তারপর বহুবার তাকে ফিরে আসার অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি ফিরে আসেননি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে তাকে ফিরিয়ে আনার এক জোর প্রচেষ্টা নেয়া হয়। সে সময় তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি দিয়েও সম্মানিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু তার এক কথা আমি ফিরছি না। একটি পরাজিত যুদ্ধের দর্শক হওয়ার কোনো রকম ইচ্ছে আমার নেই।
আমাদের অনুরোধ এবং পীড়াপীড়ির জবাবে তিনি বলতেন, ভাইরে, একদিন সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিজরত করে বাংলাদেশে এসেছিলাম। সেই বাংলাদেশ আজ নিজের লোকদের কারণেই ভেতর থেকে ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, প্রশাসন সর্বত্র এখন চলছে নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্য ভারতের ইঙ্গিতে, ভারতের অর্থে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর অবিমৃশ্যকারী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, আমলা ও লেখক-শিল্পীর দ্বারা সূচিত হয়েছে। জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের বিপন্ন করার জন্য পুরো দেশের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিভেদ, হানাহানি ও ঘৃণা। পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশ আজ দু’ভাগে বিভক্ত। জাতীয় ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রদীপ নিভু নিভু করে জ্বলছে। যারা দেশপ্রেমিক তারা আজ উপেক্ষিত। যারা ভারতীয় আগ্রাসনকে ত্বরান্বিত করার জন্য কাজ করছে, তাদের ‘হিরো’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের বিরাট অংশ ভারতের দালালিতে লিপ্ত। গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে এমনভাবে সিন্ডিকেটেড প্রচার-প্রচারণা চলছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বিভ্রান্তি। তারা আজ অনুধাবন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে কোনটি সঠিক, কোনটি বেঠিক। আমাদের রাজনীতিবিদদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতের পায়ের ওপর সেজদায় পড়ে আছে।
এরকম অবস্থায় আমার মতো একজন সাধারণ সংস্কৃতিকর্মী আর কী করতে পারে। আমি তো সব খ্যাতি-প্রতিপত্তি পাশ কাটিয়ে, মঞ্চের হাতছানিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে মাঠে নেমে এসেছিলাম। জনগণের মধ্যে কাজ করতে চেয়েছিলাম। লাভ কী হলো? যাদের নিয়ে কাজ করার জন্য সব ত্যাগ করে এসেছিলাম, তারা আমাকে ন্যূনতম সম্মানটুকুও দেয়নি। কদর করেনি। উল্টো বোঝাতে চেয়েছে, আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে এখানে এসেছি। সত্যি বলছি, শেষের দিকে নিজেকে বড় বেশি অবাঞ্ছিত মনে হতো। আমি চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়ি। অথচ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের টিকে থাকার পাটাতনগুলো এক এক করে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে ধ্বংস করা হচ্ছে। আর প্রতিদিন বাংলাদেশ ঢুকে পড়ছে ভারতীয় আগ্রাসনের আরও গভীরে, আরও গভীরে।
অসহায়ভাবে এই দৃশ্য দেখার জন্য আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, নিজেকে দর্শকের ভূমিকায় দেখতে হবে এটা আমার সহ্য হয়নি। যে আবেগ ও আশা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেম, তাই যখন থাকলো না, তখন আর বাংলাদেশে থেকে কী হবে? তাই তো আমি আবার যাযাবর হলাম। চলে এসেছি কানাডায়।
এখানে আমার কোনো কাজ নেই। আমি এদের কেউ নই। সেও ভালো। সে আমার সয়ে যাচ্ছে। এখানে কেউ নিজেদের কবর নিজেরা খোঁড়ে না। এখানে ভাড়া খাটা রাজনীতিবিদ নেই। ভাড়া খাটা বুদ্ধিজীবী নেই, কবি-লেখকও নেই। এখানে চারপাশে কোনো ভারত নেই বলে কোথাও কোনো অশান্তি নেই। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে আছি বলে দেশের দুর্ভাগ্য আমাকে তাড়িত করে না। দৈনন্দিন দাহগুলো আমাকে পোড়াতে পারে না। বাংলাদেশ যদি কোনো নাটকের নাম হয়, তাহলে তার শেষ অঙ্ক দেখার জন্য আমাকে আর কষ্টে কঁকিয়ে উঠতে হবে না।
বিশ্বাস করুন যে নিদারুণ দুঃখ, কষ্ট ও যাতনা ভোগ করেছেন সৈয়দ কুতুবউদ্দিন, সেই কষ্ট আমার এই বয়সে আমি আর সহ্য করতে পারবো না। আমাকে দূরেই থাকতে দিন।
আরিফুল হকের মতো মহাপ্রাণ মানুষ বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছেন। তার একটা যাওয়ার জায়গা ছিল কানাডাতে। তিনি সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিতে পেরেছেন। কিন্তু আমার-আপনার মতো আমজনতা কোথায় যাবে? আমাদের তো পালিয়ে বাঁচারও জায়গা নেই। যেহেতু আমাদের পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই, অতএব আমাদের কাজ হবে মাতৃভূমির রাষ্ট্রিক ভিত্তি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। যে কাজের কে মূল্য দিল, কে দিল না, সে হিসাব-নিকাশ করে লাভ নেই। তাহলে হতাশা আসবে এবং আরও অরক্ষিত হয়ে যাবে দেশ। তা আমরা হতে দিতে পারি না। তাই যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে বাংলাদেশের সরাবো জঞ্জাল। তারপর ইতিহাসের হাতে সমর্পণ করবো নিজেদের।

হায়দরাবাদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আবারও মনে পড়ল গালিবের কবিতা,
‘নাহ গুলে নগমহ হু, না পরদহ সাজ,
মৈ, হু আপনি শিকস্ত-কী আওয়াজ।’
(কবিতার ফুল নই, সেতারের পরদাহ নই, আমি কেবল একটি আওয়াজ, পরাজয়ে ভেঙে পড়ার আওয়াজ।)
শুধু যে পরাজয়ে ভেঙে পড়ার আওয়াজ তাই নয়। মৌনতার বাইরে ঢাকা একটি গোরস্থানের নিভে যাওয়া প্রদীপ হলো হায়দরাবাদ।
যে ‘কোহিনূর’ হীরক খণ্ড নিয়ে পৃথিবীজুড়ে তুলকালাম। ১৮৫৭ সালে দিল্লি লুণ্ঠনের সময় যে পৃথিবীর জ্যোতিকে লুট করে নিয়ে গেছে সাদা চামড়ার ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা, সেই কোহিনূরের জন্মভূমি হায়দরাবাদ। গোদাবরী, কৃষ্ণা, তুঙ্গভদ্রা, পূর্ণা, ভীমা, পেনগঙ্গা, ওয়ার্ধা, মুসী, প্রাণহিতার মতো নদী যে হায়দরাবাদকে করেছে সুজলা-সুফলা, সেই হায়দরাবাদেই আছে ইতিহাসখ্যাত অজন্তা ইলোরা গুহা। আওরঙ্গাবাদ, ওসমানাবাদ, গোলকুন্ডা, গুলবার্গা, রাইচুর, পারেন্দা, সুদগল প্রভৃতি দুর্গ হায়দরাবাদকে দিয়েছিল ঐশ্বর্য। আবার হীরক, স্বর্ণ, লৌহ, কয়লা ও অভ্রের খনি হায়দরাবাদকে করেছিল সমৃদ্ধ। পাশাপাশি মক্কা মসজিদ, চার মিনার যে রাষ্ট্রকে দিয়েছিল আভিজাত্য, সেই হায়দরাবাদ এখন এক নিঝুম গোরস্তান, এক নিভে যাওয়া প্রদীপ। আজকের নব্য ভারতীয়দের প্রচণ্ড কোলাহলের নিচে চাপা পড়ে গেছে হায়দরাবাদের প্রাণ। সব কিছুই এখন স্মৃতি, ধূসর স্মৃতি।
হায়দরাবাদের আয়তন ছিল ৮২ হাজার ৬৯৮ বর্গমাইল। হায়দরাবাদের উত্তরে ছিল ভারতের মধ্য প্রদেশ, উত্তর-পশ্চিমে মহারাষ্ট্র। দক্ষিণে কৃষ্ণা, তুঙ্গভদ্রা নদী, পশ্চিমে আহমদনগর, বিজাপুর। পূর্বে ছিল তামিলনাড়–।
এই সীমানা ও আয়তন ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদের পতনের সময়কার। অতীতের হায়দরাবাদ ছিল অনেক বড় একটি দেশ। দাক্ষিণাত্যের এই দেশটির ইতিহাসও অনেক প্রাচীন।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের দ্রাবিড় সভ্যতা এই রাষ্ট্রেরই পূর্বাঞ্চলসহ সমগ্র দক্ষিণ ভারতে ব্যাপ্ত ছিল। আজকের তেলেগুভাষীরা সেই দ্রাবিড়দেরই উত্তর-পুরুষ।
রাশিয়ায় যেমন জার, রোমে যেমন শাসককে বলা হতো সিজার, সেই রকম হায়দরাবাদের শাসকদের উপাধি ছিল ‘নিজাম’। হায়দরাবাদ এবং নিজামশাহী আমল একই ইতিহাসের এপিঠ-ওপিঠ। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কৃতী সেনাপতি ছিলেন মীর কমরউদ্দিন খান আসফজাহ। ১৭১৩ সালে আওরঙ্গজেব তাকে নিজাম-উল-মুলক উপাধি দিয়ে দাক্ষিণাত্যের সুবেদার নিযুক্ত করে পাঠান। তারপর আওরঙ্গজেবের পর নানা উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে ১৭২৪ সালে এই দাক্ষিণাত্যেই স্বাধীন-সার্বভৌম হায়দরাবাদ রাষ্ট্রের পত্তন করেন আসফজাহ। শুরু হয় আসফজাহ বংশের নিজামদের শাসন।
প্রথম নিজাম মীর কমরউদ্দিন খান আসফজাহের মৃত্যুর পর তার দ্বিতীয় ছেলে মীর আহমদ খান নাসিরজঙ্গ এবং কন্যা খায়রুন্নিসার ছেলে মুজফফর জঙ্গের মধ্যে শুরু হয় উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব।
হায়দরাবাদের সিংহাসন নিয়ে এই দ্বদ্বে জড়িয়ে পড়ে বহিরাগত ইউরোপীয় বণিকরা। ইংরেজ বণিকরা নাসির জঙ্গের পক্ষে এবং ফরাসিরা মুজফফর জঙ্গের পক্ষ নেয়। শেষ পর্যন্ত মুজফফর জঙ্গ পরাজিত ও বন্দী হন। দু’বছর পর নাসির জঙ্গ আততায়ীর হাতে নিহত হলে মুজফফর জঙ্গ নিজেকে হায়দরাবাদের নিজাম হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবেই স্বাধীন হায়দরাবাদের ওপর বিদেশী হস্তক্ষেপের পথ সুগম হয়।
সেই সময়কার উপমহাদেশের দিকে তাকানো যেতে পারে। বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য অস্তাচলগামী। দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে সমগ্র উপমহাদেশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শুরু হয়েছে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি। মন্ত্রী, সমরনায়কদের বিশ্বাসঘাতকতা। অন্য দিকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে হিন্দু মারাঠা শক্তি। বাংলায় ততদিনে ঘটে গেছে ভয়ঙ্কর পালাবদল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে সিরাজউদদৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মীরজাফরের ঘাড়ে চেপে বাংলা বিহার উড়িষ্যার ক্ষমতা দখল করে বসেছে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা উপমহাদেশের মূল কেন্দ্রবিন্দুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। দেশীয় রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের ভেতরকার ক্ষমতার দ্বদ্বে এবং এক দেশের বিরুদ্ধে অপরের বিদ্বেষ ও ঘৃণাকে পুঁজি করে ইংরেজ ও ফরাসি বণিকেরা বাড়িয়ে নিচ্ছিল নিজেদের প্রভাব। নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োগ করছিল নানামাত্রিক কূটকৌশল, বিস্তার করছিল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল। এই জালে একে একে জড়িয়ে পড়তে থাকে দেশীয় স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো। এভাবেই হায়দরাবাদের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকারী হিসাবে আবির্ভূত হয় ঔপনিবেশিক ইংরেজ বণিকেরা। কর্নাটকের যুদ্ধে ক্লাইভের সাফল্যের পর ইংরেজরা হায়দরাবাদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করার জন্য আসফজাহর তৃতীয় ছেলে সালাবত জঙ্গকে (১৭৫১-১৭৬২) ক্ষমতায় বসায়। কিছুদিন পর তাকে সিংহাসনচ্যুত করে চতুর্থ ছেলে নিজাম আলী খানকে হায়দরাবাদের ‘নিজাম’ করে (১৭৬২-১৮০৩)।
ইংরেজ বণিকদের এই বশংবদই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষাবলম্বন করে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে। তাকে পরাজিত ও নিহত করার পেছনে হায়দরাবাদের নিজাম আলী খানের যে ঘৃণ্য ভূমিকা, তা ভারতের জাতীয় ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।
এর পেছনে আরও কারণ বিদ্যমান। ইংরেজরা তখন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ছাড়িয়ে একে একে কবজা করে নিচ্ছিল ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্যগুলো। দাক্ষিণাত্য চলে যায় ইংরেজদের দখলে। হিন্দু মারাঠা শক্তি ইংরেজদের সাহায্যে সর্বশক্তি নিয়ে এগিয়ে আসে। এরকম পরিস্থিতিতে ১৭৬৮ সালে ইংরেজদের সঙ্গে এক অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে নিজাম আলী খান। চুক্তির শর্তানুযায়ী হায়দরাবাদের ৪টি অঞ্চল চলে যায় ইংরেজদের দখলে। ইংরেজরা নিজস্ব সৈন্যবাহিনী রাখার অধিকার পায়। আর উভয় পক্ষের কোন এক পক্ষ অন্য কারও সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সর্বাত্মক সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে মর্মে একটা চুক্তি হয়। এরকম চুক্তির কারণেই ৪র্থ মহীশূর যুদ্ধে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাহায্য করেছিল নিজাম।
হায়দরাবাদের আয়তন ছিল সে সময় আজকের ফ্রান্সের সমান। কিন্তু ইংরেজরা নানা ছলচাতুরী করে প্রতিবছরই একটু একটু করে গ্রাস করতে থাকে দেশটি। এভাবে হায়দরাবাদের হাত ছাড়া হয়ে যায় বেরার প্রদেশ, কুড্ডাপপা, কুনুল, বেলারি, অনন্তপুর জেলা। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো, যার মাধ্যমে হায়দরাবাদ সংযুক্ত ছিল সমুদ্রের সঙ্গে সেগুলো একে একে হাতছাড়া হয়ে যায়। সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে হায়দরাবাদ চারদিক থেকেই স্থলবন্দী হয়ে পড়ে, যা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
গবেষক আরিফুল হক বলেছেন, সেদিন হায়দরাবাদের নিজামরা যেমন ভুল করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের সমুদ্রবন্দর বিদেশীদের হাতে তুলে দিয়ে নিজেরা গৃহবন্দী হয়ে পড়েছিলেন, তেমনি আজকের বাংলাদেশও পার্বত্য শান্তিচুক্তির নামে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ সম্পূর্ণ কক্সবাজার উপকূল ভারতের প্রভাব বলয়ে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা গৃহবন্দী হতে চলেছে। এ যেন একই নীলনকশার পুনরাবৃত্তি। অথচ আমরা এই নীলনকশা পড়তে বা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। প্রত্যেক জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, জাতির জীবনে যখন অধঃগতির চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ এগিয়ে আসে, তখন সে এভাবেই অসচেতন হয়ে আপন ভুলের আবর্তে আপনিই তলিয়ে যায়, যেমন হায়দরাবাদ গিয়েছিল।
এরকম টানাপড়েনের ভেতর দিয়েই এগিয়ে আসে ১৯৪৭ সাল। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, ভারতকে হিন্দু ও মুসলমান প্রধান দু’টি এলাকায় ভাগ করে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে। তারপর তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে ভারত ছেড়ে যাবে ব্রিটিশরা।
গবেষকরা বলছেন, এ সময় আর একটি সমস্যা সামনে চলে আসে। তা হলো দেশীয় রাজ্য সমস্যা। সে সময় ভারতে কয়েক শ’ দেশীয় রাজ্য ছিল। যেগুলো ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে বিশেষ চুক্তির আওতায় পরিচালিত হতো। ভারত দু’ভাগে বিভক্ত হলে এই স্বাধীন করদরাজ্যগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? সে সময় ব্রিটিশ সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ ভারতে নিযুক্ত শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে বাকিংহাম প্যালেসে ডেকে নিয়ে তার উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে বলেন, ‘দেশীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের সরাসরি সন্ধি রয়েছে। ভারত স্বাধীন হয়ে গেলে এই সন্ধির ইতি ঘটবে। সে ক্ষেত্রে দেশীয় রাজ্যগুলোর বেলায় বিরাট শূন্যতা দেখা দেবে। তখন ওই রাজ্যের রাজারা গভীর সংকটে পতিত হবে। সুতরাং ওরা যাতে স্বাধীন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে সে বিষয়টি যেন বিশেষভাবে দেখা হয়।’
১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনে ভারতীয় প্রদেশগুলো ও দেশীয় মিত্র করদরাজ্যগুলোকে নিয়ে সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেছিল ব্রিটিশরা। সে প্রস্তাবে গভর্নমেন্ট ইন্ডিয়া অ্যাক্টে হায়দরাবাদকে স্বাধীন মর্যাদা দান করে বলা হয়েছিল, দেশীয় রাজ্যগুলোর পদমর্যাদা এবং স্বাভাবিক কার্যাবলি স্বাধীন ভারতের কাছে, রাজ্যগুলোর অনুমতি ব্যতিরেকে হস্তান্তর করা যাবে না।
১৯৪৭ সালে প্রণীত ভারত স্বাধীনতা আইনে বলা হলো, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর দেশীয় রাজ্যগুলোর ওপর থেকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ অবসানের পর রাজ্যগুলো ইচ্ছামতো ভারত অথবা পাকিস্তান ডোমিনিয়নে যোগ দিতে পারবে অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে।
১৯৪৭ সালের ১৬ জুলাই লন্ডনে ভারতবিষয়ক সচিব লর্ড লিস্টোয়েল লর্ড সভায় বলেছিলেন, ‘এখন থেকে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলো থেকে ব্রিটিশ রাজপ্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং তাদের দাফতরিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো। দেশীয় রাজ্যগুলো ভারত, পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনটিতে যোগ দেবে অথবা একক স্বাধীনসত্তা বজায় রাখবে, তা সম্পূর্ণ তাদের স্বাধীন ইচ্ছাধীন। ব্রিটিশ সরকার এ বিষয়ে কোনরকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে না।’
১৯৪৭ সালের ৯ জুলাই অর্থাৎ ভারত সচিবের বক্তব্য দেয়ার আগেই নিজাম অবশ্য শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে জানিয়ে দেন, ব্রিটিশ রাজ ও হায়দরাবাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক হায়দরাবাদ তার স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায়। এভাবেই ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা আইন পাসের সঙ্গে সঙ্গে হায়দরাবাদের ওপর ব্রিটিশ খবরদারির অবসান ঘটে। যেহেতু হায়দরাবাদ ও ব্রিটিশের মধ্যে পূর্বের চুক্তিগুলো ব্রিটিশরাই বাতিল ঘোষণা করেছিল, সেহেতু কোনো ধরনের চুক্তি দ্বারাই হায়দরাবাদ আর আবদ্ধ থাকল না।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়া হলো। ১৫ আগস্ট গোলামির চিহ্ন মাথায় নিয়ে অর্থাৎ লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকেই ভারতের গভর্নর জেনারেল করে স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠিত হলো। ওই দিন হায়দরাবাদও তার স্বাধীনতা ঘোষণা করল। অর্থাৎ ওই দিন থেকেই হায়দরাবাদ ভারত ও পাকিস্তানের মতোই একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভ করল।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ২৪ বছর আগে, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট হায়দরাবাদ যখন স্বাধীন হয়, তারও বহু আগে থেকে শুরু হয় নেহরু-প্যাটেল-মাউন্ট ব্যাটেনের ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই মাউন্ট ব্যাটেনের প্রভাব কাজে লাগানোর জন্য ভারতীয় কংগ্রেস নেতারা স্বাধীনতার পরও ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ হওয়া সত্ত্বেও তাকেই ভাইসরয় হিসেবে চাকরিতে রেখে দেয়।
মাউন্ট ব্যাটেন তার নিমকহালালি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পালন করে র‌্যাডক্লিফকে দিয়ে অদ্ভুত এবং কিম্ভুতকিমাকারভাবে সীমানা চিহ্নিত করলেন। তার সব কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয় কংগ্রেসের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর মতো। ১৯৪৭ সালে ‘ভারত স্বাধীনতা আইনে’ বলা হয়েছিল দেশীয় তথা করদমিত্র রাজ্যগুলো ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর নিজ নিজ ইচ্ছেমত ভারত অথবা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে। অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে। কিন্তু কংগ্রেস ও মাউন্ট ব্যাটেনের চক্রান্তের ফলে এই আইন কার্যকর হতে পারেনি। কংগ্রেস নেতারা দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারতের মধ্যে ঢোকানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। তারা দেশীয় রাজ্য আত্তীকরণের জন্য একটি বিশেষ বিভাগ চালু করেন। যার প্রধান হন সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মতো সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি আর সেক্রেটারি করা হয় ভিপি মেননের মতো ধুরন্ধর কূটনীতিককে।
প্যাটেল বুঝে গিয়েছিলেন, ব্রিটিশ শাসনের অবসান হওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলো আপনা আপনি স্বাধীন হয়ে যাবে। তখন তাদের ভারতভুক্তি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সে জন্য ব্রিটিশ শাসনের অবসানের আগেই এই রাজ্যগুলোর গলাটিপে ধরতে হবে। বাধ্য করতে হবে ভারতভুক্তির। এই কাজে মাউন্ট ব্যাটেন হয়ে ওঠেন কংগ্রেসের তুরুপের তাস।
নেহরু-প্যাটেলের পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ২৫ জুলাই মাউন্ট ব্যাটেন ব্রিটিশ ভাইসরয় হিসেবে দিল্লিতে দেশীয় রাজাদের এক বৈঠক ডাকলেন। সেখানে ব্রিটেনের ঘোষিত ভারত স্বাধীন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, মাউন্ট ব্যাটেন কংগ্রেসের নির্লজ্জ দালালের মতো দেশীয় রাজাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন ভারতে বিলীন হওয়ার জন্য। এ ব্যাপারে মীর লায়েক আলীকে উদ্ধৃত করে আরিফুল হক লেখেন, ‘মাউন্ট ব্যাটেন দেশীয় রাজাদের বলেন, ভারতে যোগ দিলে কংগ্রেসের পরিকল্পনায় ভারতভুক্তির দলিলে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা আছে। কী সেই সুবিধা, সে কথা উহ্য রেখেই তিনি তাদের পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে বললেন, ১৫ আগস্টের পর তাদের হয়ে তার কোনো কিছু করার ক্ষমতা আর থাকবে না এবং যেসব দেশীয় রাজ্য স্বাধীন থাকার জন্য অস্ত্রসজ্জিত হওয়ার চিন্তা করছে তাদের চিন্তা কোনো কাজে লাগবে না। তিনি আরও বললেন, দেশীয় রাজারা যদি ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন তবে ভবিষ্যতে তাদের পদবি, সম্মান যাতে অক্ষুণœ থাকে সে জন্য তিনি কংগ্রেসকে রাজি করাবেন। ভাইসরয়ের সেদিনের আশ্বাস যে কত বড় মিথ্যা ছিল, পরবর্তী সময়ে ভারতের পেটে দেশীয় রাজ্যগুলোর অবলুপ্তিই তার সাক্ষ্য বহন করে।
কংগ্রেস ও মাউন্ট ব্যাটেনের এই কূটকৌশল, ‘ভয়ঙ্কর অনুরোধ এবং ভয়াবহতম চাপ’ সেদিন অভূতপূর্ব সাফল্য এনে দিয়েছিল। দেশীয় রাজ্যগুলোর অধিকাংশই ১৫ আগস্টের আগে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হয়েছিল। যারা ভারতের দাসত্বের খোঁয়াড়ে ঢুকতে চাননি, তাদের জন্য এই চক্র গ্রহণ করে ভিন্ন পথ। তাদের রাজ্যে কংগ্রেসের নানা গোপন সংস্থাকে গোলযোগ সৃষ্টির কাজে লেলিয়ে দেয়া হলো। যেমন ত্রিবাংকুরের মহারাজা ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করলেন। তিনি মাউন্ট ব্যাটেনকে জানালেন সে কথা। ব্যস, আর যায় কোথায়। মহারাজা দিল্লি থেকে কোচিনে পৌঁছার আগেই তার রাজ্যের কংগ্রেসের গোপন সন্ত্রাসী সংস্থাগুলো সদম্ভে নেমে এলো রাস্তায়। তারা পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হলো। লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, হত্যাকাণ্ড, গুলি-বোমা ইত্যাদির মাধ্যমে কোচিনে সৃষ্টি করা হলো এক শ্বাসরুদ্ধকর নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ত্রিবাংকুরের মহারাজা মাউন্ট ব্যাটেনের সাহায্য চাইলেন। কংগ্রেসের বশংবদ ব্যাটেন তাকে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দিলে অনেকটা অসহায় হয়েই মহারাজা ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করে স্বাধীনতা হারালেন।
কংগ্রেসের পরবর্তী শিকার হয় যোধপুর। যোধপুর ছিল ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী রাজ্য। এর মহারাজা ছিলেন কংগ্রেসের প্রতি ভয়ানক বীতশ্রদ্ধ। তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানে যোগদান করতে। তার ইচ্ছা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিপি মেনন তাকে প্রতারণার মাধ্যমে মিথ্যা কথা বলে নিয়ে যান মাউন্ট ব্যাটেনের সামনে। মাউন্ট ব্যাটেন তাকে এমনভাবে ভীতি প্রদর্শন করেন যে ভীতসন্ত্রস্ত হতবিহ্বল মহারাজা বাধ্য হয়ে ভারতের কাছে ধরা দেন।
দেশীয় রাজ্য ভুপালের ভারতভুক্তিও নেহরু-ব্যাটেনের ষড়যন্ত্রের ফল। এখানেও ত্রিবাংকুরের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কংগ্রেস। কংগ্রেসের সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবকরা রাজ্যজুড়ে সৃষ্টি করে নৈরাজ্য। লিপ্ত হয় ধ্বংসাত্মক কাজে। পাশাপাশি নেহরু, প্যাটেল ও মাউন্ট ব্যাটেন ভুপালের নবাবের ওপর সৃষ্টি করেন প্রচণ্ড চাপ। দেয়া হতে থাকে হুমকি। ফলে ভুপালের নবাবও তার রাজ্যের স্বাধীনতা তুলে দেন ভারতের হাতে।
এভাবে দেখা যায় ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে হায়দরাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর ছাড়া সব রাজ্যই ভারতের পদতলে তাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছিল। মাউন্ট ব্যাটেনের এই অপকর্ম ব্রিটিশ সরকার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। প্রতিকারের জন্য এগিয়ে আসেনি।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পর হায়দরাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর এই তিনটি বেয়াড়া রাজ্য কিভাবে উদরস্থ করা যায় তার জন্য নতুনভাবে কোমর বেঁধে নামে ভারত। মাউন্ট ব্যাটেনের নেতৃত্বে আঁটতে থাকে নানা ফন্দিফিকির। বিছাতে থাকে চক্রান্তের জাল।
এই জালে তারা প্রথম জড়িয়ে ফেলে জুনাগড়কে। জুনাগড়ের অবস্থান ছিল বাংলাদেশের মতো। তিন দিক ছিল ভারতবেষ্টিত। একদিকে ছিল আরব সাগর। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগদানের কথা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যজুড়ে কংগ্রেস শুরু করে ধুন্ধুমার কাণ্ড। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটানো হয়। নবাব ও সরকার যখন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ সামলাতে ব্যস্ত সেই সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ভারতীয় সৈন্যরা ঘেরাও করে ফেলে জুনাগড়। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে নবাবের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে তারা প্রবেশ করে জুনাগড়ে। দখল করে নেয় দেশটি।
জুনাগড় দখলের সময় নেহরু-প্যাটেল-ব্যাটেন চক্র অজুহাত দেখিয়েছিল জুনাগড়ের বেশির ভাগ জনগণ হিন্দু, তারা পাকিস্তানে নয় ভারতে যোগদানের পক্ষে। সে জন্যই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
কাশ্মীরের বেলায় ভারত প্রদর্শন করে উল্টো যুক্তি। বলে কাশ্মীরের জনগণ মুসলমান হতে পারে, তাতে কিছু যায় আসে না। কাশ্মীরের মহারাজা হিন্দু। তিনি ভারতভুক্তি চান।
সবশেষে ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার হয় স্বাধীন সার্বভৌম হায়দরাবাদ। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারত ছোটখাটো শয়তানির মাধ্যমে হায়দরাবাদকে অস্থিতিশীল করার জন্য চেষ্টা করে হাজারো। কিন্তু দক্ষ হাতে সেগুলো মোকাবেলা করে নিজাম সরকার। ফলে নানা টালবাহানার পর একই বছর নভেম্বর মাসে হায়দরাবাদের সঙ্গে একটা নিষ্ক্রিয়তামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। একটু যেন নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় পায় হায়দরাবাদ। তবে সে ছিল খুবই ক্ষণিকের। কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত যেমন নিজেকে অপমানিত মনে করে, তেমনই এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। সব আন্তর্জাতিক নীতিরীতি, আইন-কানুনকে পদদলিত করে হায়দরাবাদকে গায়ের জোরে দখল করে নেয়ার জন্য নতুনভাবে শুরু করে ষড়যন্ত্র। এসব ষড়যন্ত্রের কোনোটা ছিল প্রকাশ্য। বেশির ভাগই ছিল অপ্রকাশ্য।
১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে নেহরু, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, চুক্তি ও যুক্তিকে থোরাই কেয়ার করে অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে ঘোষণা করেন, ‘যখন প্রয়োজন মনে করব, হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করব।’
নেহরুর এই দাম্ভিক, আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী উক্তি সম্পর্কে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুলাই ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল হাউস অব কমন্সে বলেন, ‘নেহরুর ভীতি প্রদর্শনের ভাষা অনেকটা হিটলারের ভাষার অনুরূপ। যা তিনি অস্ট্রিয়া ধ্বংস করার সময় ব্যবহার করেছিলেন।’ .
তিনি ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিমত দেন, ‘তাদের পবিত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য হচ্ছে, যেসব রাজ্যকে সার্বভৌম মর্যাদা দান করা হয়েছে, সেগুলোকে গ্রাস করা, শ্বাসরুদ্ধ করা বা অনাহারে রেখে শক্তিহীন করে গ্রাস করার অপচেষ্টাকে ব্রিটিশ সরকার যেন অনুমোদন না দেয়।’
চার্চিলের এই আহ্বানে সেদিন গা লাগায়নি ব্রিটিশ সরকার। কারণ তাদের কাছে হায়দরাবাদের চাইতে বৃহৎ ভারতের গুরুত্ব ছিল বেশি। ব্রিটিশ সরকারের সে সময়কার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না দেখার ভান করে থাকা। ভারতকে যা খুশি তা করার জন্য মওকা দেয়া। এই মওকা ভারত যথার্থ অর্থেই কাজে লাগায়।
ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকার পাশাপাশি বাদবাকি বিশ্বও ছিল হায়দরাবাদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। মুসলিম দেশগুলো তো বটেই, এমনকি পাকিস্তান পর্যন্ত ভারতের হায়দরাবাদ দখল চক্রান্ত দেখেও আশানুরূপ সাড়া দেয়নি। হায়দরাবাদের মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। এই নিষ্ক্রিয় ভূমিকাই ভারতের জন্য সোনায় সোহাগা হয়ে দাঁড়ায়। আর হায়দরাবাদের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতবেষ্টিত হায়দরাবাদের অস্তিত্ব নেহরু, প্যাটেল ও ব্যাটেনের জন্য গাত্রদাহের কারণ ছিল আগে থেকেই। এবার সেই জ্বালা নির্বাপণের জন্য তারা সামগ্রিকভাবে সবদিক থেকে হায়দরাবাদের ওপর আগ্রাসন চালানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। প্রণয়ন করেন পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হায়দরাবাদের রাজনীতিকে কলুষিত করার কাজ শুরু হয়। সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে দালাল তৈরির কাজে হাত দেয়া হয়। শিক্ষাঙ্গন, সাংস্কৃতিক জগৎ, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সৃষ্টি করা হতে থাকে অনুগত লোকজন। সক্রিয় করা হয় কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকদের। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠনকে উসকে দেয়া হয় নৈরাজ্যকর ও ধ্বংসাত্মক কাজে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply