ভারতে আফজাল গুরুর ফাঁসি বাংলাদেশে বামপন্থীদের প্রতিবাদ -নূর মোহাম্মদ

ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেস্টিং! আমি অনেকটা নিশ্চিত- বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকবৃন্দ আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ঘোষিত কান্ডারি ভারতের সাম্প্রতিক দারুণ এক ঘটনার ওপর খুব সম্ভবত চোখ রাখছেন না। অথবা বাংলাদেশের খুবই কম সংখ্যক মানুষ (বিশেষত বাম সংগঠনের লোকজন) ব্যাপারটি নিয়ে কনসার্ন এবং এই ঘটনাপ্রবাহকে নিজেদের অর্জন এবং সাংগঠনিক সফলতা বলে বিবেচনা করছে। অপর দিকে আমি আরো নিশ্চিত (ভুল হলে খুশি হবো) বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ভারতের আফজাল গুরুর ব্যাপারটা নিয়ে মোটেও কনসার্ন নয়। হিন্দুত্ববাদী ভারতের ঘটনাপ্রবাহে চোখ রেখে ইসলামিস্টদের কী লাভ- এই টাইপের ধারণা নিয়ে ঐ বিষয়ে হয়তো কোন আগ্রহ নেই। অথচ আজ যেভাবে বাংলাদেশের শীর্ষ ইসলামিস্ট নেতৃত্বকে মিডিয়া প্রোপাগান্ডা, বাম-রামদের অব্যাহত ষড়যন্ত্র আর দেশপ্রেমের আবেগ দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো, ঠিক সেভাবেই ভারতে আফজাল গুরুকে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। আমার আগ্রহের জায়গাটা ঠিক এখানেই! বাংলাদেশের বামরা শাহবাগে ফাঁসি ফাঁসি খেলে যা করলো, সে খেলারই ভারতীয় ভার্সনের বিরুদ্ধে ঐ বামরাই আজকে মানবাধিকার আর ব্যক্তি অধিকারের কথা বলে চিৎকার করছে। রাস্তায় বসে ফাঁসি আদায় করে মিষ্টি বিতরণকারী শাহবাগীরা ভারতের আফজাল গুরু নিয়ে হাপিত্যেশ করছে। এই পলিটিক্যাল হিপোক্র্যাসি নিয়ে ইসলামপন্থীরা কিছু জানছে না। আমি ভারতের সাম্প্রতিক আলোচিত ‘আফজাল গুরু ইস্যু এবং জেএনইউ আন্দোলন’ নিয়ে কথা বলছি। এই ঘটনা আলোকপাত করে আমি দু’টি অনুসিদ্ধান্তে পৌছেছি :
এক. বাংলাদেশের বামরা (ইসলামপন্থীদের তুলনায়) এখনো পড়াশোনা আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে অনেক বেশি কনসার্ন। একইসাথে বামরা খুব বেশি ‘পলিটিক্যাল হিপোক্র্যাট’ (রাজনৈতিক ভন্ড)।
দুই. বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতের ‘আফজাল গুরু ইস্যু এবং জেএনইউ আন্দোলন’ নিয়ে তেমন কোনো কনসার্ন অন্তত আমার চোখে পড়েনি।

‘আফজাল গুরু ইস্যু এবং জেএনইউ আন্দোলন’ আসলে কী?
২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতের সংসদ ভবনের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি। নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের চ্যালেঞ্জ করলে গাড়ি থেকে বের হয়ে তারা গুলিবর্ষণ করে ৮ জন নিরাপত্তাকর্মী ও ১ জন বাগানের মালিকে হত্যা করে। পরে নিরাপত্তারক্ষীদের বন্দুকযুদ্ধে হামলাকারী ৫ জনই নিহত হয়। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এনকাউন্টার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্য কুখ্যাত দিল্লি পুলিশ স্পেশাল সেল দাবি করে যে, তারা ঘটনার আসল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে পেয়েছে। এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি থেকে অধ্যাপক এসএআর গিলানি, কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে শওকত গুরু ও তার চাচাতো ভাই আফজাল গুরুকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর গ্রেফতার করা হয় শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকে। নিম্ন আদালত চারজনকেই ফাঁসির আদেশ দেয়। পরে হাইকোর্ট অধ্যাপক এসএআর গিলানি, শওকত গুরু এবং আফসান গুরুকে বেকসুর খালাস দিলেও ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট আফজাল গুরুর ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে। রায়ে বলা হয় : ‘আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ওই ঘটনায় বিপুল সংখ্যক হতাহত এবং গোটা জাতি আলোড়িত হয়েছে। সমাজের সম্মিলিত বিবেক সন্তুষ্ট হবে যদি অভিযুক্তকে ফাঁসি দেয়া হয়।’ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সালে সকাল ৮টার সময় আফজাল গুরুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এই ফাঁসি কার্যকরের সাথে সাথেই তুমুল বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। ভারতের ইসলামিস্টরা (বিশেষ করে জুম্মু ও কাশ্মিরের মুসলমানরা) বলতে শুরু করেন সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে আফজাল গুরুকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এমনকি ফাঁসি দেয়ার আগে আফজাল গুরুর ন্যূনতম মানবাধিকার রক্ষা করা হয়নি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ইসলামপন্থীদের বিপরীত আদর্শের ধারক-বাহক ভারতের বামপন্থীরাও এই মিথ্যা ফাঁসির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। প্রতি বছরই ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আফজাল গুরুর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। ভারতের নাগরিক সমাজই প্রকাশ্যে ভারতকে ফাঁসিবাদী রাষ্ট্র বলে সমালোচনা করছে। এ বছর (২০১৬) জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) একদল শিক্ষার্থীর আফজাল গুরুর ফাঁসি কার্যকরের বর্ষপূর্তি পালনকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা ভারত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীরা আফজাল গুরুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা আন্দোলনকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহী বলে ভারতীয় দন্ডবিধির ১২৪ এ (দেশদ্রোহিতা) ও ১২০ বি (ফৌজদারি চক্রান্ত) ধারামতে মামলা দায়ের করে। গ্রেফতার করা হয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি বামপন্থী ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারকে। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটা ব্যাপার। ইসলামিস্ট আফজাল গুরুর মিথ্যা ফাঁসির বিরুদ্ধে আন্দোলনে গ্রেফতার হয়ে গেল বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি। শুরু হয়ে যায় তুমুল আন্দোলন। ভারতের বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এই গ্রেফতারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন। কেবলমাত্র ভারত নয়, কলম্বিয়া, ইয়েল, হার্ভার্ড ও ক্যামব্রিজসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে চার শ’ শিক্ষাবিদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন জানালেন। চলছে শ্লোগান- ‘গো ব্যাক ইন্ডিয়া’, ‘কাশ্মির কি আজাদি তক, জঙ্গ রহেগি’। বাংলাদেশেও বামপন্থীরা ঐ আন্দোলন নিয়ে ক্যাম্পেইন করছে। ফেসবুক ওয়ালে জেএনইউ আন্দোলন নিয়ে প্রচারণা চলছে। আমার আগ্রহের জায়গাটা ঠিক এখানেই! বাংলাদেশী বামদের ভন্ডামির কথা আরেকটু পরে খোলাসা করি।

কে এই আফজাল গুরু?
৩০ জুন ১৯৬৯ কাশ্মিরের বারামুলা জেলার সোপোরে নামক এক ছোট্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেন আফজাল গুরু। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে সেখানকার একটি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু কাশ্মিরের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে তিনি মেডিক্যালের পাঠ সম্পন্ন করতে পারেননি। পরে তিনি ১৯৯৩-৯৪ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। উল্লেখ্য, আফজাল গুরু বিভিন্ন সময়ে কাশ্মিরের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পার্লামেন্ট ভবনে হামলার ঘটনার আগে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের কোনও অভিযোগ ছিল না।

কেন আফজালের ফাঁসি বিতর্কিত?
এক. ২০০২ সালের মে মাসে দ্রুত আদালতে বিচার শুরু হয়। তখন বিশ্ব ওয়ান-ইলেভেনের উন্মত্ততায় কাঁপছে। আফজাল গুরুকে এ সময় হাই সিকিউরিটি সেলে নিঃসঙ্গ অবস্থায় বন্দী করে রাখা হয়। তার কোনো আইনজীবী ছিল না। আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে একজন জুনিয়র আইনজীবী নিয়োগ দিলেও তিনি একটিবারের জন্য আফজাল গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। আফজালের সমর্থনে কোনো সাক্ষীকেও হাজির করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জেরা করেননি তিনি। ওই পরিস্থিতিতে কোনো কিছু করার সামর্থ্য নেই বলে মন্তব্য করেন বিচারক।
দুই. তারপরও কিছু তথ্য বের হয়ে আসে। কয়েকটি উদাহরণ হলো- গ্রেফতারের সময় জব্দ করা একটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। তবে আইন অনুযায়ী সেগুলো সিলগালা করা হয়নি। বিচারের সময় ফাঁস হয়ে যায়, ল্যাপটপের হার্ডডিস্কে গ্রেফতারের পরও হাত দেয়া হয়েছে। হার্ডডিস্কে দেখা যায়, সংসদ ভবনে প্রবেশের সময় ভুয়া অনুমতিপত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং আফজাল হামলার চিত্র এঁকে রেখেছেন। অর্থাৎ এত বড় হামলা করে আফজাল তার হার্ডডিস্কে রেকর্ড রেখেছেন!!
তিন. পুলিশ দাবি করেছে, মোবাইল নম্বর দিয়ে হামলাকারীদের সঙ্গে ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বর যোগাযোগ করেছেন আফজাল। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কল রেকর্ডে দেখা যায়, সিমটি ২০০১ সালের ৬ নভেম্বরের পর আর চালু ছিল না।
চার. আফজালকে গ্রেফতারের ব্যাপারে পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে, গিলানির সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে পুলিশি রেকর্ডে দেখা যায়, গিলানিকে গ্রেফতারের আগেই আফজালকে গ্রেফতার করা হয়। হাইকোর্ট একে স্ববিরোধী বললেও এ নিয়ে আর সামনে এগোয়নি।
অরুন্ধতি রায় বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় ‘The hanging of Afzal Guru is a stain on India’s democracyÕ’ নিবন্ধে মন্তব্য করেছেন, ‘এভাবে মিথ্যা আর সাজানো তথ্যের পাহাড়ের ওপর ভিত্তি করে প্রমাণ হাজির করা হয়। আদালত এসব বিষয় স্বীকার করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।’

আফজাল গুরুর মানবাধিকার লঙ্ঘন
আফজাল গুরু মহা-সন্ত্রাসী হোক বা না হোক, আইন ও নিয়মমাফিক তার যতটুকু অধিকার পাওয়ার কথা, কথিত গণতান্ত্রিক ভারত স্বৈরাচারীর মতো গুরুকে তা থেকে বঞ্চিত করেছে। আফজাল গুরুর ন্যূনতম মানবাধিকারের সুরক্ষা দেয়া হয়নি।
এক. আফজাল গুরু ১২ বছর পর্যন্ত তিহার জেলে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে পরিবার-পরিজনের কেউই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেনি।
দুই. বিচারপ্রক্রিয়া ছিলো সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ এবং সাজানো। রাষ্ট্র তার ইচ্ছামত বিচারকার্য চালিয়েছে।
তিন. পরিবারকে তার ফাঁসির সময় জানানো হয়নি। মৃত্যুপূর্ব সাক্ষাতের বিধান থাকলেও সরকার তা মানেনি। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী কুলদীপ নায়ারও এ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। লিখেছেন, ‘জেনারেল জিয়াউল হকের মতো একনায়ক পর্যন্ত জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসির একদিন আগে তাকে তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাহলে কেন সে অনুমতি গুরুর পরিবার পেল না? তার পরিবার-পরিজনকে দিল্লির তিহার জেলে এসে কবরে ফাতেহা পাঠের অনুমতি দিলে কোনো ক্ষতি হতো না।’
চার. মৃত্যুপূর্ব লেখা আফজালের চিঠি পরিবারের নিকট পৌঁছাতে সরকার গড়িমসি করেছে। এমনকি চিঠিটি মৃত্যুর তিনদিন পর বাড়ি পৌঁছেছে। স্বয়ং কুলদীপ নায়ার আফজাল গুরুর রায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘When the Supreme Court bases its judgment primarily on the circumstantial evidence, it becomes all the more necessary to commute the death conviction to life sentence.’ অর্থাৎ ‘সুপ্রিম কোর্ট তার রায়টি দিয়েছেন প্রথমত ‘পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ’-এর ওপর ভিত্তি করে। এ কারণে (আফজাল গুরুর) মৃত্যুদন্ডকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে পরিবর্তন করার খুবই প্রয়োজন ছিল।’ পরবর্তীতে এক বিচারক স্বীকার করেছেন আফজাল গুরুকে ফাঁসি দেয়া সঠিক রায় ছিল না। দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি এবং জাতীয় আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি অজিত প্রকাশ শাহ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আফজাল গুরুর ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনপত্র দীর্ঘ সময় ধরে মুলতবি রাখা হয়েছিল। পরে সরকার আচমকাই তার ফাঁসি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। সব কিছু খতিয়ে দেখলে তার ফাঁসি হওয়ার কথা নয়।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বহু বছর ধরে কারাগারে থাকলে তার ফাঁসি হওয়া দুষ্কর হয়। এমনকি কংগ্রেসের রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী শশী থারুর টুইট করে বলেন : I think the hanging was both wrong & badly handled. Family should have been warned, given a last meeting & body returned. ভারতে এখন সর্বত্র বলা হচ্ছে ভারত রাষ্ট্র হিসেব ফ্যাসিবাদী হয়ে যাচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করেই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রায় দেয়া হচ্ছে। তরুণরা বলছে- এভাবে কত ফাঁসি দিবা? আমরা সবাই ‘আফজাল গুরু’। নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লোগান দেয়া হয়েছে : ‘গো ব্যাক ইন্ডিয়া’, ‘কাশ্মির কি আজাদি তক, জঙ্গ রহেগি’। ‘আফজাল গুরুর আত্মত্যাগ এখন স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। স্বয়ং দিল্লিতে ভারত বিরোধী শ্লোগান উঠেছে। নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বলছে : ‘দেশপ্রেম মানে অন্ধ আনুগত্য নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় হচ্ছে দেশপ্রেম। ভারতে জন্ম বলে ভারতের সব অপকর্ম মুখ বুজে সহ্য করতে হবে কেন?’ শিল্পী কবির সুমন গান লিখেছেন :
‘যেখানেই থাকো তুমি শ্রীনগরে দেখা হবে
ইতিহাস তুমি বলো স্বাধীনতা দেবে কবে।
ঝিলমের স্রোতে ভাসে রাতের কবিতা একা
আঁধারের কবি জানে শ্রীনগরে হবে দেখা।
ইন্স্যাস থেকে গুলি আকাশে বুলেট ক্ষত
তারারা গুলির দাগ প্রদীপ জ্বলবে যত।
কার ঘরে নিভে গেছে প্রদীপের শিখা কবে
আফজল গুরু শোনো শ্রীনগরে দেখা হবে।
ফাঁসিতে বুলেটে বুটে ইতিহাস ফ্যালে পিষে
সেই ইতিহাসই বাঁচে একা দোয়েলের শিসে।
কাশ্মিরে স্বাধীনতা ডাকছে দোয়েল একা
গানের কসম জান শ্রীনগরে হবে দেখা॥’

আফজাল গুরু ইস্যু নিয়ে সবচেয়ে কঠিন রিঅ্যাক্ট করেছে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, বাংলাদেশের শাহবাগী সমর্থক আনন্দবাজার কি সাবলীল ভাষায় ভারত মাতাকে ধুয়ে দিয়েছে! ‘লেঠেল দিয়ে দেশপ্রেম হয় না’- শিরোনামের প্রবন্ধে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য নামের ভদ্রলোক লিখেছেন : ‘জেএনইউ-এর ছাত্ররা কী করেছেন? আফজাল গুরুর ফাঁসির প্রতিবাদ করেছেন, ভারতের বিরুদ্ধে ও পাকিস্তানের সমর্থনে স্লোগান দিয়েছেন। কাশ্মিরকে স্বাধীনতা দাও, এ স্লোগানও তোলা হয়েছে। তাতে ঝামেলাটা কোথায়? আমি যদি ভারতকে ভীষণ ভালোবাসি, তা হলেও তার যাচ্ছেতাই নিন্দে করতে পারি। …দেশকে না-ভালোবাসার অধিকারও আমার আলবাত আছে। ভারতে থেকে আমি ভারতকেও ভালোবাসতে পারি, ভারত এবং ব্রাজিলকে ভালোবাসতে পারি, আবার ভারতকে না ভালোবেসে শুধু বেলজিয়ামকে ভালোবাসতে পারি। আবার, কোনও দেশকে না ভালোবেসে, সব দেশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত থাকতেও পারি। আমি কাকে ভালোবাসব, আর কাকে ভালোবাসব না, তা ঠিক করে দেয়ার অধিকার কারও নেই। ‘এক্ষুনি ভালোবাস বলছি, নইলে পেটাব’ এ তো ধর্ষকের উচ্চারণ। ভারতে থেকে আমি যদি পাকিস্তানকে ভালোবেসে গলা ফাটাই, তা আমার অধিকার। নিজের মতো ভাবনার অধিকার। মতপ্রকাশের অধিকার, বাক্স্বাধীনতার অধিকার।’

ভারতের জেএনইউ আন্দোলন এবং বাংলাদেশের বামদের ভন্ডামি
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শাহবাগের অগ্নিকন্যা লাকী আক্তার তার ফেসবুকে বাংলা ট্রিবিউনের ‘ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাপ, উত্তাল যাদবপুর’ শিরোনামের খবর লিংক শেয়ার করে ভারতের আন্দোলনের ঢেউ বাংলাদেশেও ছড়িয়ে দেয়ার আহবান জানিয়েছেন। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও সেক্রেটারি বিবৃতি দিয়ে জেএনইউ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে। আনু মুহাম্মদ, হায়দার আকবর খান লেলিন, জুনায়েদ সাকীরা বিবৃতি দিয়ে ভারতের চলমান আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পরিচিত বামদের প্রায় সবাই ফেসবুকে জেএনইউ আন্দোলন নিয়ে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে। কী নিষ্ঠুর নিয়তি বামদের? আমাদের অগ্নিকন্যা লাকী আপু শাহবাগে গলা ফাটিয়ে জাতিকে ফাঁসি ফাঁসি খেলা শিখিয়েছিল। বাংলাদেশের শিশুরাও খেলার সময় বলতো- ‘স’ তে সাঈদী, ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই। এই বামরা আইনের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিকদের যেকোনো মূল্যে ফাঁসি চেয়েছেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মানুষকে আইন সংশোধন করে ফাঁসি দিয়েছে। রায়ের দিন ব্যস্ত শাহবাগ মোড়ে রাস্তা আটকিয়ে মিছিল করেছে। ফাঁসির দন্ড কার্যকর করার পর উল্লাসে ফেটে পড়েছে। মিষ্টি বিতরণ করেছে। এই বামরা বাংলাদেশকে দু’ভাগ করে দিয়েছে। এক ঘৃণার জাহাজে যাত্রী তুলেছে। গন্তব্যও ঘৃণার দেশে। যার বিচার করা হচ্ছে, সে সত্যিই অপরাধী কি না, নিরপরাধ কাউকে বিচারের নামে হত্যা করা হচ্ছে কি না, অপরাধী হলেও তাঁর মানবাধিকার রক্ষা করা হচ্ছে কি না- এসব বিষয় এই বামদের কাছে বিবেচনার কারণ হয়নি। ‘আগে ঝুলায়ে দে, তারপর কথা’-টাইপের আচরণ দিয়ে বামরা এ দেশে আফজাল গুরুদের হত্যার হোলিখেলায় মেতেছে। ভারতের আফজাল গুরুকে নিয়ে বাংলাদেশের বামদের ভন্ডামি মানবিকতাকে আপনি কি করে সাধুবাদ জানাবেন? নিজ দেশে আফজাল গুরুদের ফাঁসি ফাঁসি খেলার মাধ্যমে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার আয়োজন করে ভারতের একজন আফজাল গুরুকে নিয়ে কৃত্রিম মানবাধিকারের ছেলে ভুলানো খেলায় সত্যিই কি মানবিকতা স্থান পায়? না কি এই নষ্ট বামদের দেখে মানবতা নিজেই নিজের গলায় ফাঁসির দড়ি পরে? লজ্জা করে না? আফজাল গুরুর হত্যাকারীদের নিয়ে একটি কথাও বলার আগে আয়নায় নিজের মুখ দেখে নেয়া দরকার। তাহলেই নিজেদের বর্বর ও স্টুপিড চেহারা নিজের কাছেই ঘৃণার উপাদান হবে।

ভারতের আফজাল গুরু এবং বাংলাদেশের মুসলমানদের নির্লিপ্ততা
সত্যি বলতে কি এই ব্যাপারটি আমার কাছে অপ্রত্যাশিত। ভারতে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ বাংলাদেশের মুসলমানদের তা নিয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
রাষ্ট্রীয় জুলুমের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ইসলামপন্থী নেতাদের জোর করে গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে, ঠিক একই প্রক্রিয়ায় ভারতে আফজাল গুরুকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। একজন মুসলমান হিসেবে আমি শুধু আমার ব্যাপার নিয়েই পড়ে থাকতে পারি না। পাশের বাড়ির ভাইয়ের সাথে আমার মতই জুলুম করা হলে সর্বপ্রথম আমি প্রতিবাদ করবো। কারণ আমি জানি- এই জুলুমের আঘাত কেমন। আজ বাংলাদেশে বামরা ভন্ডের মতো স্ববিরোধী চরিত্রকে উন্মোচন করেছে। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বাংলাদেশে নিজেরা যে দোষে দুষ্ট, ভারতের সেই দোষের বিরুদ্ধে কথা বলছে।
বিচারপ্রক্রিয়া, ফাঁসির মঞ্চ এক। পার্থক্য শুধু দু’টি সীমানা। ভারত আর বাংলাদেশ। কী দারুণ মিল? বাংলাদেশে আফজাল গুরুদের ফাঁসির আয়োজনে যে দেশের প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, এবার একটা সুযোগ এসেছে তাদের আসল চরিত্রকেই বাংলাদেশী সাধারণ জনগণের কাছে তুলে ধরার।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply