ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ ও বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা -ড. ফজলুল হক তুহিন

ভারতীয় উপমহাদেশে ১৭৫৭ সাল একটি যুগ-সন্ধিক্ষণ। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাবের পতনের পর ক্রমান্বয়ে সমগ্র ভারত পরাধীন হতে থাকে। মুঘল-পাঠান, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ইত্যাদি শক্তিকে পরাজিত করে ব্রিটিশ শক্তি বাংলায় ও ভারতে শাসন ও শোষণের পথ ও পাথেয় তৈরি করে। ফলে জনজীবনে ও ভাবজীবনে বিপর্যয় সূচিত হয়। কৃষক ও কৃষিব্যবস্থার ধ্বংস, ভূ-স্বামীর উচ্ছেদ, তন্তুবায়দের বৃত্তিনাশ, লোকশিল্পের ধ্বংস বাংলার আর্থ-সামাজিক জীবন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়ে অতিরঞ্জিত বাড়াবাড়ি ও পীড়নে কৃষি ও কৃষিনির্ভর লোকশিল্পী ও তন্তুশিল্পীরা ঋণগ্রস্ত দাস হয়ে যায়। দেশীয় বণিকরা বহির্বাণিজ্য ও অন্তর্বাণিজ্য করতে না পেরে কোম্পানির দালালি নিতে বাধ্য হয়। যে বস্ত্রশিল্প ভারতের প্রধান শিল্প ছিল, ইংল্যান্ডে যন্ত্র আবিষ্কার ও সেখানে বিপুল বস্ত্র উৎপাদিত হবার কারণে বিলাতি বস্ত্রের বাজারে পরিণত হয় ভারত। ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের মতো বড় বড় শহর রুগ্ন হতে থাকে। তবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে মুসলমান সমাজে- আর্থ-সামাজিক-শৈক্ষিক-রাজনৈতিক তথা সবদিক থেকে। একদিকে সর্বশ্রেণীর মানুষের আর্থ-সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, অন্যদিকে শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতাও বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৩০-৩২ কালপর্বে কতগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলন, তিনটি গোলটেবিল বৈঠক, গান্ধী-আরউন চুক্তি, সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা প্রভৃতি। অতঃপর কালক্রমে ১৯৩৪-এ সোস্যালিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা ও কমিউনিটস্ট পার্টির বেআইনি ঘোষণা, ১৯৩৫-এ ভারত সরকার আইন (এড়াGovernment of Indian Act), ১৯৩৭-এ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠনে কংগ্রেসের অংশগ্রহণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ঘটতে থাকে।
এদিকে খিলাফত-আন্দোলন বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৩০-এ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আইন-অমান্য আন্দোলনে যোগদান করতে অসম্মত হন। তিনি কংগ্রেসের আন্দোলনকে ‘হিন্দু আন্দোলন’ বলে অভিহিত করেন এবং গোলটেবিল বৈঠকে সদস্যদের বলেন, ভারতীয় মুসলমান সর্ব-ইসলামী (Pan-Islamism) আদর্শে উদ্বুদ্ধ, শুধু ভারতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত নয়। তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য ‘চৌদ্দ-দফা’ (Fourteen Points) উপস্থাপন করেন। এ-সময় (১৯৩০) বিশ^কবি-দার্শনিক মুহম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮) উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করেন। ইকবালের বাণী মুসলমান সমাজে নতুন উদ্দীপনা ও উৎসাহের সৃষ্টি করে। ১৯৩৫-এ ভারত সরকার আইন পাস হলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ এই আইনের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিধানগুলি সমর্থন করেন। ১৯৩৭-এর সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস বেশিরভাগ প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং বাংলায় ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজাদল’ মুসলিম লীগের সাথে যুক্তভাবে সরকার গঠন করে।র এর আগে থেকেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ নিজস্ব মত প্রকাশ করেন যে, ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়, একটি স্বতন্ত্র জাতি (Individual Nation)। তিনি ভারতে দ্বি-জাতিতত্ত্বের (Two-Nation Theory) অবতারণা করেন। অতঃপর ১৯৪০-এ মুসলিম লীগের লাহোর-অধিবেশনে জিন্নাহ্ ‘পাকিস্তান’ নামে একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি পেশ করেন। এভাবেই ‘দ্বি-জাতিতত্ত্ব’ ও একটি আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রগঠনের দাবি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
ইতিহাসের চাকা দ্রুত এগিয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে। যুদ্ধের আগে ভারতীয় রাজনীতিতে কয়েকটি প্রবণতা দেখা দেয়- কংগ্রেসের ভিতরে ও বাইরে সমাজবাদী আদর্শ ও স্বাধীনতা-আন্দোলনের ক্রমবিকাশ এবং কৃষক-আন্দোলনের ব্যাপকতা।
ব্রিটিশ কলোনি হিসেবে ভারতবর্ষে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া বিচিত্র। ১৯৩৯-এর ৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারত সরকার ভারতকে ‘যুদ্ধরত দেশ’ বলে ঘোষণা করে। জাতীয় কংগ্রেস অবিলম্বে ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা ও সংবিধান-সভা গঠনের প্রতিশ্রুতি দাবি করে; কিন্তু ভারত সরকার তাতে অসম্মত হলে কংগ্রেসের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।

২.
এদিকে ভারতের রঙ্গমঞ্চে পরবর্তী ঘটনাবলি দ্রুত ঘটতে থাকে। ১৯৪০-এ লিনলিথগোর ‘আগস্ট ঘোষণা’ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রত্যাখ্যান, সুভাষচন্দ্র বসুর (১৮৯৭-১৯৪৫) ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দল গঠন, আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮) ও রাজা গোপাল চারসীসহ (১৮৭৮-১৯৭২) প্রায় পঁচিশ হাজার কংগ্রেসির কারাবরণ ও ক্রিপসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪২-এ সারা ভারতের জনগণ ‘ভারত ছাড়’ বা আগস্ট আন্দোলনে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সরকারি দমননীতি শুরু ও গান্ধীজিকে গ্রেফতার করা হয়; কিন্তু দেশব্যাপী বিক্ষোভও চরম আকার ধারণ করে। এই অবস্থায় ১৯৪৩-এ গান্ধীজি একুশ দিনের অনশন শুরু করেন। দেশবাসীর দাবির মুখে এবং তাঁর জীবন বিপন্ন হলে ১৯৪৪-এর মে মাসে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আবার ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত সমগ্র বাংলায় বন্যা, মড়ক ও সর্বোপরি ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ জনগণকে বিপন্ন করে তোলে। এর ফলে বাংলার কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে সারা ভারত স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। ‘আজাদ-হিন্দ’ ফৌজের অন্যতম নেতা রশিদ আলীর হত্যার বিচারের বিরুদ্ধে ১৯৪৬-এর ফেব্রুয়ারিতে পালিত হয় ‘রশিদ আলী দিবস’। অতঃপর এই বছরই ‘দিল্লি চলো’ অভিযান, বোম্বাইয়ে নৌ-বিদ্রোহ এবং ডাক ও তার কর্মীদের ধর্মঘটের সমর্থনে কলকাতা তোলপাড় হয়ে পড়ে। এদিকে ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্ট মুসলমানদের জন্য আলাদা-স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবিতে মুসলিম লীগ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ বা ‘Direct Action Day’-র ডাক দেয়। দুঃখের বিষয় হলো, এই দিনই কলকাতায় মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে এবং তা ছড়িয়ে পড়ে নোয়াখালীসহ অন্যান্য স্থানে।রর এই উত্তাল গণআন্দোলন ও ভ্রাতৃঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিস্তারের সময়ে ঘটে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন। এই আন্দোলন ১৯৪৬-৪৭ কালপর্বে অবিভক্ত বাংলায় প্রায় ঊনিশটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজে রেনেসাঁ বা নবজাগৃৃতি ভাবাদর্শ, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার (১৭৩৩-৫৭) পতনের মধ্য দিয়ে ইংরেজ রাজত্বের সূচনা হয়। অতঃপর ১৭৯৩-এ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ১৮০০-তে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৮১৭-তে হিন্দু কলেজ স্থাপন, ১৮২০-এ লাখেরাজ সম্পত্তির বাজেয়াপ্ত, ১৮৩৫-এ রাজভাষা হিসেবে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজির প্রবর্তন, বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটায়। বিশেষভাবে মুসলমান সমাজ-সংস্কৃতি-অর্থনীতি একদম ভেঙে পড়ে। শিক্ষাঙ্গন ও সামরিক পেশা থেকে তারা ছিটকে পড়ে। একদিকে দেশের শিল্প বাণিজ্য ধ্বংস এবং ভূমিব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, ইংরেজ রাজশক্তির মুখাপেক্ষী ও স্থিতিশীল নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি, শিক্ষিত অশিক্ষিতের মধ্যে নতুন শ্রেণীভেদের গোড়াপত্তন; বাঙালির সাহস, উদ্যম এবং সৃজনশক্তির হানি ও বাংলার পল্লীসভ্যতার বিনাশ, মুসলমান সামন্তব্যবস্থা ধ্বংস ও হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সম্প্রসারণ, শিক্ষিত বাঙালি মানসের নির্বিচারে ইউরোপের আদর্শ গ্রহণ, প্রাচ্যদেশের সমস্ত পুরনো ঐতিহ্য-সাধনা-সিদ্ধিকে ইউরোপের মাপকাঠিতে বিচার প্রভৃতি রূপান্তর ইতিহাসে সম্পন্ন হয়।

৩.
অপরদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের জাগরণ যখন অর্ধ-শতক অতিক্রম করে বিশ শতকের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন বাঙালি মুসলমানের মাঝে এক ‘সার্বত্রিক জীবন-পিপাসা’ জেগে ওঠে। চিন্তা, ভাবুকতা, মনস্বিতা, জিজ্ঞাসা, সন্ধিৎসা ইত্যাদির মতো জাগরণী উৎসমুখ বাঙালি মুসলমানের মানস-চেতনায় খুলে যায়। এই জাগরণের ধারা ‘কোহিনূর’, ‘নবনূর’, ‘মোহাম্মদী’, ‘বাসনা’, ‘বঙ্গীয়-মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা’, ‘সওগাত’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’, ‘শিখা’, ‘নওরোজ’, ‘জয়তী’, ‘বুলবুল’ প্রভৃতি পত্রিকার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। শুধু সাহিত্যিক নয়; সমাজ-সংস্কারক, ইতিহাসসন্ধানী, পণ্ডিত, সংগঠক-সম্পাদক, নারী জাগরণকামী, ভাবুক, ঐতিহ্যসন্ধানী- সকলে মিলে বাঙালি-মুসলমানের জাগরণের ক্ষেত্র তৈরি করেন। আর ‘মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ (১৮৬৩, কলকাতা), ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ (১৯১১, কলকাতা), ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (ঢাকা: ১৯২৬)- এই তিনটি সংস্থা এই রেনেসাঁর সহায়ক শক্তিরূপে কাজ করেছে।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে নবজাগরণের স্রােতধারা প্রবাহিত হয়, তা চূড়ান্ত ও এককেন্দ্রিক স্পষ্টতা পায় বিশ শতকের বিশের দশকে। কাজী নজরুল ইসলাম এই জাগরণের শ্রেষ্ঠ সন্তানররর তিরিশ দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১) এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের সমন্বয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে। তারা ইউরোপের রেনেসাঁসের প্রভাবে ও মানবতাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা ও ‘শিখা’ পত্রিকা প্রকাশ করেন- বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উদ্দেশে।রা এই তিরিশ দশকেই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের রোমান্টিক স্বপ্নকল্পনা এবং জাগরণমূলক ধারার অনুপ্রেরণায় কাব্য রচনা করেন শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫২), আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৬), সুফিয়া কামাল (১৯১১-৯৯), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), বেনজীর আহমদ (১৮৮৩-১৯৮৩), মহীউদ্দিন (১৯০৬-৭৫), মঈনুদ্দীন (১৯০১-৮১) প্রমুখ। এ-দশকে অন্য একটি কাব্যধারা লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিক পটভূমিতে নির্মিত; এই ধারার ¯্রষ্টারা হলেন জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৬), বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬-৭৯), রওশন ইজদানী (১৯১৭-৬৭) প্রমুখ। এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবি জসীমউদ্দীন। তিরিশের দশকে লোকজীবন-সংস্কৃতি আশ্রিত কবিতার শূন্যতা তিনি শিল্প সফলতার সাথে পূরণ কারেন।া এ কারণে জসীমউদ্দীনের হাতে লৌকিক জীবন ও উপকরণ আধুনিক শিল্প-প্রকরণ ও রুচিতে বিন্যস্ত হয়ে প্রকাশিত হওয়া মাত্রই তা গৃহীত ও স্বীকৃত হতে সময় লাগেনি। রবীন্দ্রকাব্য দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, বিদ্রোহ না করেও জসীমউদ্দীন নতুন ও নিজস্ব কাব্যধারা সৃষ্টি করেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক পর্যন্ত, বহুদিনের স্থবিরতার পর পৃথিবীর কাব্য আন্দোলনের আধুনিকতম বিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলাতে এত দ্রুত বাংলা কবিতাকে অগ্রসর হতে হয়েছে যে, বিশেষ কোনো বৎধ এ ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ পায়নি। বিবর্তনের এক স্তর পার হয়ে অস্বাভাবিক দ্রুততায় লাফিয়ে গেছে অন্য স্তরে এবং প্রায় কবিই এ গতিকে ত্বরান্বিত করার কাজে নিজেদের অগ্রসরমানতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সঞ্চরণী পল্লবশীলতা দিয়ে সাহায্য করেছেন।ার বাংলা কাব্যের বিবর্তনে বহুদিনের দায় এত দ্রুত পালটে নেয়া সম্ভব হয়েছে আন্তর্জাতিক কাব্য বিবর্তনের ফলশ্রুতি এবং এ সম্পর্কে কবিদের সজাগতা, গ্রহণশীলতা ও সক্রিয়তার গুণেই। এ ক্ষেত্রে চল্লিশ দশকের কবিদের ভূমিকা অগ্রণী। এই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি হলেন আহসান হাবীব (১৯১৭-৮৫), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪), আবুল হোসেন (জ. ১৯২২) ও সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২)।

বাংলা কবিতার বিবর্তনের ধারায় সমাজনির্ভর সুরের কবি আহসান হাবীব। যুগের সঙ্কট, স্ববিরোধিতা, আশা, আস্থা আর বিদীর্ণ হতাশা তাঁর কবিতায় চিত্রিত। তাঁর কবিদৃষ্টি অনেকটা চধংংরাব ও নৈর্ব্যক্তিক। তবে পরিচ্ছন্নতাবাদী এই কবি কাব্যচর্চার পরিণতির দিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা, জীবনের সনাতনী মূল্যবোধ এবং প্রকৃতি ঘেঁষা জীবনায়নের মধ্যে নিজেকে মেলে ধরেছেন। অন্যদিকে ফররুখ আহমদের মজ্জাগত বিষয় হলো ঐতিহ্যবোধ। আরব্য উপন্যাস, ইরান ও আরবের সংস্কৃতি ও পুরাকথা এবং কুরআনে উল্লিখিত কাহিনীর ঐতিহ্য একদিকে এবং অন্যদিকে মুসলিম অভ্যুত্থান যুগের ব্যক্তিত্ব ও ভাবধারার ঐতিহ্য তাঁর কাব্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আধুনিক কবিতার উত্তরণে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো কাব্যভাষা ও আঙ্গিকের স্বাতন্ত্র্যে ও উৎকর্ষে। নজরুল-পরবর্তী যুগের লক্ষণ-সম্পন্ন একটি বিকশিত কাব্যভাষার রূপ তাঁর কবিতায় লক্ষণীয়। এ ভাষা শিল্পসজাগ এবং তন্ময়তায় উদ্বুদ্ধ ও পরিণত। বোধ, স্বপ্ন, কল্পনা ও রুচির এক পরম মিলন ঘটেছে তাঁর এই কাব্যভাষার ধ্বনি উদ্ভাবনার সঙ্গে।ারর চল্লিশের আর একজন কবি আবুল হোসেন প্রধানত মধ্যবিত্ত মনের রূপকার। মধ্যবিত্ত স্বভাব ও জীবনকে প্রকাশ করার দিকেই তাঁর প্রবণতা। এ ক্ষেত্রে তিনি কোথাও নিশ্চিত বক্তব্যে উচ্চকিত, আবার কোথাও নির্লিপ্ত ব্যঙ্গে নিষ্করুণ। আহসান হাবীব যেখানে সমাজবোধে উদ্বুদ্ধ, আবুল হোসেন সেখানে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বোধে (Individualism) স্থিত। তাছাড়া তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো নানাদিক থেকেই সমসাময়িক রুচি ও বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। এই দশকের মননধর্মী ও অভিজাত মানসের কবি সৈয়দ আলী আহসান। নৈর্ব্যক্তিকতায় বিশ্বাসী এই কবির সজ্ঞানতা ও মূল্যবোধ নিজস্ব প্রকরণে প্রকাশিত, কোনো পরম্পরায় নির্দেশিত ও বাধা নয়। বৈদগ্ধ্যের অবারিত উৎসে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে বলেই ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, ইতিহাস, সমকাল- সকল কিছুই তাঁর কাছে স্বচ্ছন্দ উপাদানে পরিণত হয়ে উঠেছে। আর তাঁর চেতনায় সামাজিক সত্যের প্রতি আনুগত্য থাকলেও, প্রথাবদ্ধ উপযোগিতামূলক উপস্থাপনার প্রতি আদৌ প্রশ্রয় নেই। অন্যপক্ষে কবিতা ও শিল্প ধারণা তাঁর কাছে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এ প্রশ্নে আঙ্গিকের দাবি তাঁর কাছে মৌলিক ও মুখ্য।াররর প্রকৃতপক্ষে চল্লিশের দশকের কাব্যপ্রবাহ সৃষ্টিতে এইসব কবির সৃজনীশক্তি ও শিল্পসুষমার পরিচয় আধুনিক বাংলা কাব্যের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।
চল্লিশের অন্যান্য কবিদের মধ্যে মতিউল ইসলাম (১৯১৪-৮৪), তালিম হোসেন (১৯১৮-৯৯), সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫), সৈয়দ নুরুদ্দিন (১৯২৩-৮১), আবদুল গনি হাজারী (১৯২১-১৯৭৫), সানাউল হক (১৯২৪-৯২) ও হাবীবুর রহমান অন্যতম।
এইভাবে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা সম্পন্ন হয় ভারতের ঔপনিবেশিক কালক্রমের সঙ্গে। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও শিক্ষার ধারাবাহিক তরঙ্গের সমান্তরালে। ভারত স্বাধীন হয়ে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্ম এই অগ্রযাত্রাকে আরো বেশি বিকশিত ও গতিশীল করে।

তথ্যসূত্র

i এ.বি. মহিউদ্দীন মাহমুদ, বাংলাদেশের ইতিহাস, পৃ. ৪৮৫-৪৯১।
ii অতুল চন্দ্র রায়, ভারতের ইতিহাস, পৃ. ৫১৮-৫২১।
iii আবদুল মান্নান সৈয়দ, “ভূমিকা”, ফররুখ আহমদ রচনাবলী ১, পৃ. পাঁচ।
iv ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর প্রধান ব্যক্তিরা হলেন কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল হুসেন, আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩) ও মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-৫৬)। এই সংগঠনের মুখপত্র ‘শিখা’।
দ্র. খোন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য সমাজ: সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫), পৃ. ২১-১০০।
v হাসান হাফিজুর রহমান, আধুনিক কবি ও কবিতা (পু. মু.; ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩), পৃ. ৩১৭-৩১৯।
vi হাসান হাফিজুর রহমান, আধুনিক কবি ও কবিতা, পৃ. ২২৩-৩৮।
vii তদেব।
viii তদেব, পৃ. ২২৪-২৬০।

SHARE

Leave a Reply