ভারত ও আওয়ামী লীগের ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষের কারণ

আবদুল্লাহ আল হাসান সাকীব
আওয়ামী লীগের ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষের কারণ অনুধাবন করতে হলে আওয়ামী লীগের জন্ম, জন্মদাতা এবং জন্মদানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে পর্যালোচনা করতে হবে। এ বিষয়ে স্যার উইনস্টন চার্চিলের অমর উক্তির (“ঞযব খড়হমবৎ ুড়ঁ পধহ ষড়ড়শ নধপশ, ঃযব ভধৎঃযবৎ ুড়ঁ পধহ ষড়ড়শ ধযবধফ” অর্থাৎ ‘যত দূরবর্তী অতীত ইতিহাস তুমি জানবেÑ তত দূরতম ভবিষ্যৎ তুমি দেখবে’) প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় থেকে শুরু করে ১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়, টিপু সুলতানের পরাজয়, দিল্লি পতন, ১৮৫৮ সালের সিপাহি বিপ্লবে মুসলমানদের চূড়ান্ত পতন এবং ১৮৭০ পরবর্তী মুসলমানদের উত্থানপ্রক্রিয়া, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ১৯৭১ সালের পাকিস্তান ভাঙা এবং ’৭১ পরবর্তী পুনরায় মুসলিম শাসনের পতনের ধারাবাহিকতা, কারণ ও উপাদানসমূহ বিশ্লেষণ করলে আওয়ামী লীগের জন্মদাতা ও পালনকর্তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য দিবালোকের মত সুস্পষ্ট হবে।
৭১১ সাল থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন মুসলিম শাসনের সময় ভারতবর্ষের জনগণ এক জাতির ন্যায় বসবাস করেছিল। কেননা মুসলিম শাসনামলে ধর্মের কারণে, বর্ণের কারণে, সম্প্রদায়ের কারণে কখনো প্রতিপক্ষ অত্যাচারিত হয়নি। উক্ত আমলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারও কোনো নজির নেই। এতদসত্ত্বেও ভারতের বর্ণহিন্দুরা মনের দিক থেকে কখনো মুসলিম শাসন মেনে নেয়নি। মুসলমানদের উদারতার সুযোগ নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় প্রথমে শক্তি সঞ্চয় করে এবং পরবর্তীতে ভারতবর্ষ থেকে মুসলিম শাসন উৎখাত করতে ইউরোপীয়দেরকে এদেশের শাসন ক্ষমতায় বসায়। দীর্ঘ ১৯০ বছর এই ইঙ্গ-হিন্দু চক্র মুসলমানদেরকে ভারতবর্ষ থেকে নিশ্চিহ্ন করার যাবতীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। এসময়ে মুসলমানদেরকে ভারতবর্ষের জমির মালিকানা থেকে, সরকারি চাকরি থেকে, সেনাবাহিনী থেকে উচ্ছেদ করে ভূমিদাসে পরিণত করে। এতদ্সত্ত্বেও কিছু দূরদর্শী মুসলিম ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ১৯৪৭ সালে বিশাল ভারতবর্ষের একটি ক্ষুদ্র অংশে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডেও যাতে মুসলমানরা ক্ষমতাসীন থাকতে না পারে সে লক্ষ্যে ইঙ্গ-হিন্দু শক্তি ৪৭ পরবর্তী সময়ে পুনরায় চক্রান্ত শুরু করে। এই চক্রান্তের শুরুতেই পাকিস্তানের ইসলামী ঐক্যকে দুর্বল ও ধ্বংস করার লক্ষ্যে প্রথমে মুসলিম ছাত্রলীগ অতঃপর আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাদের সাথে যোগ করা হয় সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট কমিউনিস্ট পার্টিসমূহ এবং অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠায় সঙ্কল্পবদ্ধ পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসকে। এভাবেই প্রথমে পাকিস্তানের মুসলমানদেরকে দ্বিধাবিভক্ত করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতঃপর বাংলাদেশী মুসলমানদেরকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য বাঙালি/বাংলাদেশী, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, ধর্মভিত্তিক-ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণীর সৃষ্টি করা হয়। ইতঃপূর্বে অর্থাৎ ১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালে ভারতের উগ্রহিন্দুরা মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালাত বর্তমান বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ভারতন্থীরা ধর্মভিত্তিক ও ধর্মীয় ভাবাপন্ন মুসলমানদের ওপর একই প্রকার অত্যাচার-নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করেছে। হিন্দু শাসনে ভারতের মুসলমানরা যেরূপ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকারÑ বাংলার মুসলমানরাও আওয়ামী শাসনে একইরূপ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে আওয়ামী লীগ কি মুসলমানদের দল নয়? তার উত্তর হচ্ছে এই যে, যে দল সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস’ মুছে দিতে পারে সে দল গায়ের জোরে বা আরবি নামের কারণে মুসলমান থাকে কিভাবে? আল্লাহর উপর আস্থা বা ঈমান না থাকলে কেউ মুসলমান হয় না, তার অকাট্য প্রমাণ হলোÑ আরবি নামধারী আবু জেহেল, আবু লাহাব ও আবু তালেব মুসলমান ছিল না। তদুপরি যে দলটি মুসলমানদের চেয়ে অমুসলমানদেরকে বেশি আপন মনে করে, সে দলের শীর্ষ পরিবারটি মুসলমানদেরকে বাদ দিয়ে ইহুদি-খ্রিষ্টান-হিন্দুদের সাথে আত্মীয়তা করে, যে দলের সেক্রেটারি জেনারেল নামের পূর্বে সৈয়দ রেখে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়Ñ ‘আমি হিন্দুও না মুসলমানও না’ এবং যে দলটি মন্দির-গির্জা-প্যাগোডাকে নিরাপদ মনে করে এবং কেবলমাত্র মসজিদকে ঘিরে রাখে র‌্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা দিয়ে। সে দলটি কোন স্তরের মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে তা বোকা লোকটিও বুঝতে পারে। এ দলটির সাথে অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী এবং মুসলিম শাসন উৎখাতে প্রয়াসী, বর্ণহিন্দুদের জন্মগত সম্পর্কের ব্যাপারে অসংখ্য তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তন্মধ্যে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে প্রদত্ত কয়েকটি তথ্য নিম্নরূপÑ
১.     ২০১২ সালের নভেম্বরে বেগম খালেদা জিয়ার ভারত সফরকে ব্যর্থ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করার জন্য দিল্লি থেকে দ্বিতীয়বার বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়Ñ ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের জন্মগত সম্পর্ক, এর পরেই অন্যদের প্রসঙ্গ’। (সূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, তাংÑ০৩-১১-১২)
২.     ২০০৭ সালের এপ্রিলে রায়রেরিলির এক জনসভায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘আমার পরিবারই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে।’ (সূত্র : ঞযব ওহফরধ উড়পঃৎরহব, গ.ই.ও গঁংযর, ঢ়ধমব-ওওও)
৩.     পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিবুর রহমান বিরোধী রাজনীতিতে একটি অবস্থান তৈরি করার জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার জ্যোতি সেন গুপ্তের সান্নিধ্যে আসেন, যিনি মনোরঞ্জন ধরসহ কতিপয় কংগ্রেস নেতার সঙ্গে মুজিবের পরিচয় করিয়ে দেন। মুজিব তাদের সাথে মিলে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় কংগ্রেসের লক্ষ্য হাসিলে কাজ করার ব্যাপারে একমত হন।
(সূত্র : জ্যোতি সেন গুপ্ত, হিস্ট্রি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট অব বাংলাদেশ, ১৯৪৭-৭৩ : সাম ইনভলভমেন্ট)
৪.     ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাত্মক প্রচারপত্র উদ্ধার করা হয়। নারায়ণগঞ্জের মিছিলে জয়হিন্দ এবং যুক্তবাংলা চাই স্লোগান দেয়া হয়। নবগঠিত আওয়ামী লীগের নেতা (এমএলএ) যিনি হিন্দু মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর সাথে পাট ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁর (ওসমান আলীর) বাসগৃহ থেকে ধ্বংসাত্মক লিফলেট উদ্ধার করা হয় এবং একই স্থান থেকে ভারতীয় হিন্দু যুবকদের গ্রেফতার করা হয়। একই রূপ ভারতীয় হিন্দু যুবক গ্রেফতার হয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং আরো কিছু স্থানে। (সূত্র : ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বি আল হেলাল, পৃ: ৪৪৯-৫০)
৫.     ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল কাজটি সম্পাদন করে কমিউনিস্ট পার্টি। প্রকাশ্য রাজনীতিতে কার্যত নিষিদ্ধ এই পার্টি যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। বামধারার ছাত্র ইউনিয়ন, গণতন্ত্রী দল ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কর্মরত বামরাই এতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তৎকালে হিন্দুস্থানে কমিউনিস্টদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলেও দিল্লি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্টদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করত শুধুমাত্র পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য। কমিউনিস্ট নেতৃত্বের মূল কাঠামোয় হিন্দু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে ভারতীয় সাহায্য তাদের জন্য অবারিত ছিল। (সূত্র : মোহাম্মদ হান্নান, বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ-২৫)
৬.     শেরেবাংলা একে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিরোধী ছিলেন। ছাত্ররা এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করে তাঁর বাসভবন ঘেরাও করে রাখে। শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের চাপে রাজি হলে তাঁকে ছাত্ররা কাঁধে নিয়ে উল্লাস করতে করতে ফিরে আসে। (প্রাগুক্ত পৃ: ২৫)
দেশপ্রেমিক ইসলামী শক্তি ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত করলেও পরবর্তীতে এর নিয়ন্ত্রণ এসে যায় কমিউনিস্টদের হাতে। ’৫২ সালের পর তারা রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথমত, তারা মুসলিম জনমানসকে ইসলামী সংস্কৃতি থেকে তথাকথিত বাঙালি (হিন্দু) সংস্কৃতি অভিমুখে নিয়ে যায় স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার স্থাপন করে এবং হিন্দুয়ানি কায়দায় বিভিন্ন দিবস পালন করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে মুসলিম ঐক্যকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। এভাবে তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আদর্শিক চেতনা থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।
৭.     স্বাধীন হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা আজকের নয়, পঞ্চাশের দশকেই হয়েছিল এর ব্লু প্রিন্ট। ‘বঙ্গভূমি ও বঙ্গসেনা’ পুস্তিকায় ডা. কালিদাস বৈদ্য নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ১৯৬২ সালে তারা তিনজন যুবক কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে যান এবং ‘সংখ্যালঘুদের মুক্তির জন্য ব্যাপক কর্মতৎপরতা চালান।’ গোপনে স্বাধীনতা ও তার সঙ্গে স্বতন্ত্র বাসভূমির কথাও প্রচার করেন। ঐ তিন যুবক হলোÑ কালিদাস বৈদ্য, চিত্তররঞ্জন ছুতার ও নীরদ মজুমদার। … কালিদাস বৈদ্য ও চিত্ত ছুতার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে বহুকাল ভারতের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। … মুজিব সরকারের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য চিত্ত সুতারকে ভারত সরকার চিরকাল ব্যবহার করেছে। এখনো ভারত সরকারের তরফে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন চিত্তবাবু। (সূত্র : একশ’ বছরের রাজনীতি : আবুল আসাদ)
৮.     পাকিস্তানের জন্মের প্রায় শুরু থেকে ভারতের স্টেটম্যান পত্রিকার ঢাকা অফিসে দায়িত্বপালনকারী ভারতীয় সাংবাদিক জ্যোতিসেন গুপ্ত স্বীকার করেছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানসহ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বহু মহলের সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ছিল। (সূত্র : বাংলাদেশ মারাত্মক অপপ্রচারণা ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার, এমটি হোসেন, পৃ-৯৮)
৯.    ’৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাই সেদিন এক কাতারে শামিল হয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে। তবে একটি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল রহস্যময়। এ দলটি ভারতকে ধিক্কার দিতে একবারও মুখ খোলেনি। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা সাময়িকীতে এর প্রমাণ মিলবে। … সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দিয়েছিল তা হলো তৎকালীন গভর্নর মোনেম খাঁ যুদ্ধকালীন ঘটনা বলতে গিয়ে বৈঠকে বলেছেন, যুদ্ধ চলাকালে পূর্বপাকিস্তান যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন তখন শেখ মুজিব মোনেম খানকে প্রস্তাব দিয়েছিলেনÑ তিনি যদি এই সুযোগে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তবে তাঁর দল সর্বতোভাবে তাঁকে সমর্থন দেবে। আর এটা শুধু নৈতিক বা আনুষ্ঠানিক সমর্থনই হবে না, হবে সর্বাত্মক সমর্থন। যুদ্ধাবস্থায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এই ভেবে জনাব খান বিষয়টি চেপে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তিনি বিষয়টি পিন্ডিকে জানিয়েছিলেন। (সূত্র : স্মৃতির পাতা থেকে, পিএ নাজির পৃ: ২১৪-২১৫)
১০.    ’৭০-এর নির্বাচনী জনসভায় মুজিব যেসব কথা বলেছিলেন, ঘটনাপ্রবাহ সেভাবে এগোচ্ছিল না। ১৯৭০ সালে এলএফও ঘোষণার পর মুজিবকে তার ইনার ক্যাবিনেটের সসদ্যদের উদ্দেশে স্পষ্ট বলতে শোনা গেছে, আমার আসল লক্ষ্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচনের পর আমি এলএফও ছিঁড়ে ফেলব। কে তখন আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে? এ ব্যাপারে বাইরের সূত্র থেকে সাহায্য আসবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনিÑ সম্ভবত ভারত থেকে। (সূত্র : ঞযব ষধংঃ ফধুং ড়ভ টহরঃবফ চধশরংঃধহ, এ.ড. ঈযড়ফিযঁৎু, অনুবাদ : ইফতেখার আমিন, পৃ: ৮৯)
১১.    ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ ওহফরধহ ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ ফবভবহংব ংঃঁফরবং-এর পরিচালক এক সিম্পোজিয়ামে বলেন, ভারতকে আজ এই সত্য অনুধাবন করতে হবে যে, পাকিস্তান ভেঙে গেলে আমাদের স্বার্থ উদ্ধার হবে। এ সুযোগ আর কখনো না-ও আসতে পারে। তাতে আরো বলা হয়Ñ বাংলাদেশের এই সঙ্কট তার এক নম্বর শত্রু পাকিস্তানকে বিনাশ করার জন্য শতাব্দীর সুযোগ এনে দিয়েছে। (প্রাগুক্ত-পৃ-১৭০)
১২.    ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রাজ্য সভায় বলেন, অনেক কারণে এ বিষয়ে (পাকিস্তান ভাঙার ব্যাপারে) আমরা আগ্রহী। প্রথমত একজন সদস্য যেমন বলেছেন, শ্রী মুজিবুর রহমান আমাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের পক্ষে। … প্রতিবেশী বড় একটি দেশের সরকার প্রধান বলেছেন, ‘যেহেতু বিদ্রোহী নেতা ভারতের স্বপ্ন পূরণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, সেহেতু ভারত পার্শ্ববর্তী একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আগ্রহী হতে বাধ্য। (প্রাগুক্ত-পৃ-১৭০)
১৩.    কংগ্রেস ও ভারত সরকার আন্তরিকভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা মেনে নেয়নি এবং এর প্রতিষ্ঠার পরও এর অবসান ঘটিয়ে অখণ্ড ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য প্রকাশ্যভাবে বহুবার ঘোষণা করেছে এবং এর জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ১৯৪৯ সাল থেকেই ভারত সরকার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গঠন করার জন্য বাংলাদেশ সেল গঠন করেছিল। দায়িত্বে ছিলেন ড. ত্রিগুনা সেন। (দেখুন, বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র)
১৪.    ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ঢাকায় আগমন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে (বর্তমান মেডিক্যাল কলেজের সম্মুখস্থ খেলার মাঠ) বক্তৃতা দেয়ার কথা। এ উপলক্ষে ড. মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রারের অফিসে (বর্তমান জগন্নাথ হলের অংশ বিশেষ) রাত্রিকালে ঢাকা শহর ছাত্রনেতাদের এক সভা আহ্বান করা হয়। আমি ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজের (বর্তমান কাজী নজরুল ইসলাম কলেজ) ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঐ সভায় যোগদান করি। শেখ মুজিবুর রহমানও ঢাকা কলেজের ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ঐ সভায় উপস্থিত হন। … ঐ সভাতেই তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের বিমাতাসুলভ মনোভাবের উল্লেখ করেন এবং লিয়াকত আলী খানকে সংবর্ধনা দানের বিরোধিতা করেন। অবশ্য সে সভায় এ কথা তখন তেমন সমর্থন লাভ করেনি। সভা শেষ হয় রাত ১২টার পর। তখন শেখ সাহেব ও আমি হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরি। উনি তখন আরমানিটোলার এক বাসায় থাকতেন। আমি থাকতাম আহসান মঞ্জিল সংলগ্ন ছাত্রাবাসে। সারাটি পথ তিনি আমাকে পাকিস্তানিদের শোষণ ও পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনার কথা বলতে থাকেন এবং পাকিস্তান থেকে আমাদের পৃথক হয়ে যাওয়াই উচিতÑ এ কথা বলেন। (সূত্র : ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সমকালীন মুসলিম সমাজ, মোহাম্মদ হাসন, বইয়ের ভূমিকার লেখক ড. মোহর আলী পৃ-১২)
উপরোক্ত তথ্য উপাত্ত অবলোকন করে যে কোনো সাধারণ জ্ঞানের মানুষও বুঝতে পারবে যে, আধিপত্যবাদী ও বর্ণবাদী ভারতীয় নেতৃবৃন্দের অখণ্ড ভারত গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্যই ভারত ১৯৪৭ সাল থেকেই তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিসমূহ, পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস সদস্যবৃন্দ এবং মুসলিম লীগের ক্ষমতালোভী নেতৃবৃন্দের মদদ দেয়া শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় নিয়মতান্ত্রিক ভাষা আন্দোলন বিপথগামী হয়ে রক্তাক্ত পরিণতি লাভ করে। এই রক্তপাতের পর মুসলিম সংস্কৃতিকে বিপথগামী ও হিন্দু সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার ও হিন্দু সংস্কৃতির আদলে ভাষা দিবস চালু করা হয়। যা পর্যায়ক্রমে মূর্তিপূজা, প্রতিকৃতি পূজা, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলনে পর্যবসিত হয়। যে মুসলিম ঐক্য সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির শতসহস্র চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে উপমহাদেশে মুসলমানদেরকে পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড দান করেছিল সে মুসলিম ঐক্যকে বিনষ্ট করার জন্য ৪৭ পরবর্তীতে মিথ্যাচার ও ভাষা আন্দোলনকে ব্যবহার করে মুসলিম ছাত্রলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম শক্তিকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। পর্যায়ক্রমে অদূরদর্শী ও ক্ষমতালোভী শেখ মুজিবুর রহমানকে ব্যবহার করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে চূড়ান্তভাবে দুইভাগ করা হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়Ñ ১৯৭১ সালের পর থেকে মুসলিমবিদ্বেষী ইহুদি-খ্রিষ্টান চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে আলাদা করে পাকিস্তানকে ৪ টুকরো এবং বাংলাদেশকে জুমল্যান্ড, বঙ্গভূমি ও বাংলাদেশ এরূপ তিন টুকরো করার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
বর্তমান পাকিস্তানে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে ভারত সৃষ্ট পিপিপি, সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট বামপন্থী দলসমূহ, টিটিপি, মোহাজের কওমি পার্টি, বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট, ধর্ম ব্যবসায়ী ভণ্ডপীর-ফকির, কবর পূজারী, মাজার পূজারী, পীর পূজারী ও বেদআতিগণ। বর্তমান বাংলাদেশে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে ভারত সৃষ্ট আওয়ামী লীগ, সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট বামপন্থী দলসমূহ, শান্তিবাহিনী, বঙ্গসেনা, ধর্মব্যবসায়ী ভণ্ডপীর, ফকির, কবরপূজারী পীর পূজারী ও বেদআতিগণ। ১৯৪৭ পূর্বকালের ভারতের এবং বর্তমান ভারতে মুসলমানরা হিন্দুদের যে সকল অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছিল এবং হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে ও ঈমানদার দেশপ্রেমিক মুসলমানরা ভারত সৃষ্ট আওয়ামী জোট কর্তৃক একই প্রকার অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। হিন্দুস্থানের হিন্দুরা যেভাবে বিগত ২৫০ বছর যাবৎ মুসলমানদেরকে ধর্মপালনে বাধা দিয়েছে, ধর্ম ও নীতির কারণে জুলুম নিপীড়ন করেছে বর্তমান বাংলাদেশেও দেশপ্রেমিক ইসলামী শক্তিসমূহ একই রূপ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রভুকে খুশি করার জন্য এরা প্রভুর চেয়ে আরো বেশি হিংস্রতার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে ভারত সৃষ্ট দল ও গোষ্ঠীসমূহ বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে বর্ণহিন্দু মানস ধারণ করে মুসলিম ও ইসলাম বিদ্বেষের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।
এতদ্সংক্রান্ত তথ্যাবলি উল্লেখের পূর্বে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হচ্ছে। বিষয়গুলো হলোÑ অখণ্ড ভারত তত্ত্ব বা ঞযব ওহফরধ উড়পঃৎরহব, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আদর্শিক ভিত্তি ও কারণ এবং পাকিস্তান ভাঙার কৌশলের ধারাবাহিকতা।

SHARE

Leave a Reply