ভারত-পাকিস্তানকে শান্তির পথেই হাঁটতে হবে । জালাল উদ্দিন ওমর

ভারত এবং পাকিস্তান উপমহাদেশের দু’টি শক্তিধর দেশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ থেকে দেশ দু’টি স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই সময় থেকেই ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সব সময় একটা দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। সময়ে সময়ে এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়, আবার সময়ে সময়ে এই দ্বন্দ্ব শীতল হয়। দেশ দু’টির মধ্যে অতীতে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে। যাতে অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। তাই দেশ দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হলে উপমহাদেশ জুড়েই একটি উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে এতদঞ্চলের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়ে। ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ার কারণে দেশ দু’টির মধ্যকার দ্বন্দ্বে দুশ্চিন্তা, টেনশন এবং আতঙ্ক বহুগুণে বেড়ে যায়। কারণ যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় এবং সেই যুদ্ধে দেশ দু’টি যদি পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করে তখন ভারত পাকিস্তানের জনপদসমূহ হিরোশিমা, নাগাসাকির মত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। মুহূর্তেই মারা পড়বে কয়েক কোটি মানুষ। আগুনের লেলিহান শিখায় মানব সভ্যতার সবকিছুই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তাই ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্ব মানেই বাড়তি টেনশন, বাড়তি উত্তেজনা এবং বাড়তি আতঙ্ক। তাই একজন শান্তিকামী মানুষ হিসাবে ভারত এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিক এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, আপনারা অনুগ্রহ করে যুদ্ধের পথে না হেঁটে শান্তির পথে হাঁটুন। একে অন্যের প্রতি যুদ্ধের হুমকি না দিয়ে শান্তির কথা বলুন। যুদ্ধের মাঠে খেলতে না নেমে আলোচনার টেবিলে বসুন। প্রত্যেকে যদি অপরকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করে, তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তখন কোন যুদ্ধ সঙ্ঘাত থাকবে না। আর মানবজাতির শান্তির স্বার্থেই এটা দরকার। সুতরাং ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং সূচিত করতে হবে শান্তির সুবাতাস। ভারত পাকিস্তান পরস্পর প্রতিবেশী দেশ। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ থেকে দেশ দু’টি স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই থেকে তাদের মাঝে চির বৈরিতা, চির শত্রুতা। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের সৃষ্টি। আয়তন, জনসংখ্যা এবং সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে ভারত অনেক শক্তিশালী এবং বড় দেশ। অপর দিকে আয়তন, জনসংখ্যা এবং সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তান অনেক ছোট এবং দুর্বল দেশ। কাশ্মির ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ¯œায়ু যুদ্ধ লেগেই আছে। দেশ দু’টি পাল্লা দিয়ে সামরিক শক্তি কেবল বাড়াচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দু’টি দেশই এখন পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়েছে। বহু আগেই দেশ দু’টি পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমার মজুদ বাড়িয়ে চলছে। নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণের জন্য, দু’টি দেশই কিছুদিন পর পর পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। পারমাণবিক অস্ত্রের পাশাপাশি দু’টি দেশই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং নৌবাহিনীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই এসব বাহিনীতে যুক্ত করছে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং সাবমেরিনসহ ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। এভাবে দেশ দুটি অব্যাহতভাবে সামরিক শক্তি কেবল বাড়িয়েই চলেছে। দু’টি দেশই প্রতি বছর তাদের বাজেটের বিরাট একটি অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে। এভাবে দেশ দু’টির মধ্যে চলছে সামরিক শক্তি বাড়ানোর অব্যাহত এক প্রতিযোগিতা। অথচ দেশ দু’টির অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখানে অশিক্ষা, দরিদ্রতা এবং পুষ্টিহীনতার শিকার। এখনো বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে । কাশ্মির ইস্যুই ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মূল কারণ। ভারতের দাবি কাশ্মির ভারতের অংশ। অপরদিকে পাকিস্তানের দাবি কাশ্মির তাদের অংশ। আর এই নিয়ে চলে বাকযুদ্ধ। কাশ্মিরের জনগণ দীর্ঘদিন থেকে ভারতের কাছ থেকে স্বাধীন হবার জন্য লড়ছে। কাশ্মিরি জনগণের এই স্বাধীনতার আন্দোলনকে ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা হিসেবে অভিহিত করেছে এবং কাশ্মিরিদের এই আন্দোলনে সমর্থন দানের জন্য পাকিস্তানকে দোষারোপ করে আসছে। কাশ্মিরিদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য ভারত বরাবরই কঠোর নীতি গ্রহণ করে আসছে। কাশ্মিরে ভারত কয়েক লাখ সেনা মোতায়েন করেছে। অপরদিকে পাকিস্তান ঘোষণা করেছে, তারা কাশ্মিরি জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নৈতিক সমর্থন দিয়ে যাবে। ভারতের দাবি পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে আর পাকিস্তানের দাবি ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। আবার ভারত পাকিস্তান উভয়েই তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে। সীমান্তরেখায় প্রায়ই ভারত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি চলে। আর এতে সৈনিকসহ নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যায়। দুদিন পরে পতাকা বৈঠক হয়, শান্তির প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। নিরাপদ জীবনের আশায় মানুষ বুক বাঁধে। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই ভারত পাকিস্তান আবারো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। আবারো দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশ দু’টির সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনে আবারো বিপর্যয় নেমে আসে। আতঙ্ক, ভয় এবং দুশ্চিন্তা তখন তাদের জীবনকে গ্রাস করে। এভাবে সীমান্ত এলাকার মানুষেরা বছরের পর বছর ধরে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। মূলত ভারত পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের চাকায় বছরের পর বছর ধরে পিষ্ট হচ্ছে কাশ্মির এবং সীমান্ত এলাকার মানুষ। কাশ্মির ইস্যুই যেহেতু ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মূল কারণ, সেহেতু কাশ্মির সমস্যার সমাধানের মধ্যেই ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে। সুতরাং ভারত পাকিস্তানের উচিত দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্ব, সঙ্ঘাত এবং শত্রুতা জিইয়ে না রেখে তাদের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করে চিরদিন শান্তি, সম্প্রীতি এবং বন্ধুত্বের পথে হাঁটা। তার জন্য কাশ্মিরের ভাগ্য কাশ্মিরি জনগণের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। কাশ্মিরি জনগণ ভারতের সাথে থাকবে, নাকি পাকিস্তানের সাথে থাকবে, নাকি নিজেরা আলাদা স্বাধীন দেশ হিসাবে থাকবে, সেটা কাশ্মিরের জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া হোক। এটা কাশ্মিরি জনগণের নিজস্ব ব্যাপার এবং এটা কাশ্মিরি জনগণের ন্যায্য এবং বৈধ অধিকার। জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে মানুষের এই অধিকারের স্বীকৃত দেয়া হয়েছে। সুতরাং কাশ্মিরি জনগণের ভাগ্য কাশ্মিরিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হউক এবং সেখানে গণভোটের আয়োজন করে সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হউক। এভাবে কিন্তু গণভোটের আয়োজন করে পৃথিবীর অনেক ভূখণ্ডের অধিবাসীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছে। উদাহরণ হিসাবে আমি এখানে তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। পূর্ব তিমুরের জনগণ স্বাধীনতার জন্য গণভোটের আয়োজন করেছে এবং সেই গণভোটে পূর্ব তিমুরের জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেই ভোটের ফলাফল অনুসারে পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং বর্তমানে পূর্ব তিমুর একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া এবং পূর্ব তিমুর উভয় ভূখণ্ডে শান্তি ফিরে এসেছে। একইভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে দক্ষিণ সুদানের জনগণ গণভোটের আয়োজন করেছে এবং সেই গণভোটে দক্ষিণ সুদানের জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী দক্ষিণ সুদান, সুদান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং বর্তমানে দক্ষিণ সুদান একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। এর মাধ্যমে এতদঞ্চলে শান্তি ফিরে এসেছে। একইভাবে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার প্রশ্নে স্কটল্যান্ডের জনগণ গণভোট আয়োজন করেছে। স্বাধীনতার প্রশ্নে স্কটল্যান্ডের জনগণ ভোট দিয়েছে। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বেশির ভাগ জনগণ ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার পক্ষে ভোট না দিয়ে ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষেই ভোট দিয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ড আগের মতই ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এই গণভোটের মাধ্যমে স্কটল্যান্ডের জনগণের মধ্যকার অমীমাংসিত একটি বিষয়ের সমাধান হয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ডেও শান্তি ফিরে এসেছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান এবং স্কটল্যান্ডের মত কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়টিও কাশ্মিরের জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া হউক। আর এর মাধ্যমে কাশ্মির বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসবে। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে এ দুটি দেশের মানুষই যে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, এ দ্বন্দ্বের কারণে পুরো উপমহাদেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণেই সার্ক আজ একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে । তবে যে যাই বলুক না কেন, আমার মতে ভারত কখনো পাকিস্তান আক্রমণ করবে না। সুতরাং ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হবে না। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে পাকিস্তান একটি পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশ। আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামরিক বাহিনীর কলেবর সবকিছুতে ভারত অনেক এগিয়ে থাকলেও পাকিস্তানের হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র এসব কিছুকে ব্যালান্স করেছে। অধিকন্তু স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তানের জনগণ যতটা ঐক্যবদ্ধ, ভারতের জনগণ ততটাই বিভক্ত। সামরিক বাহিনীর বাইরে পাকিস্তানের বেসামরিক জনগণের অনেকেই স্বেচ্ছায় দেশ রক্ষায় যুদ্ধ করবে এবং হাসিমুখে জীবন দিবে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকজনের মধ্য হতে স্বেচ্ছায় দেশ রক্ষায় যুদ্ধ করে জীবন দিবে, এ রকম লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। মনে রাখতে হবে শক্তি হচ্ছে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া পরস্পরের চরম শত্রু হলেও আজ পর্যন্ত তারা একে অন্যকে আক্রমণ করেনি এবং তাদের মধ্যে এখনো সরাসরি কোন যুদ্ধ হয়নি। এমনকি ভবিষ্যতেও রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যেও যুদ্ধ হবে না। ভারত এবং চীনের মধ্যেও হবে না। একইভাবে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যেও হবে না। কারণ এরা সবাই পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ দেশ। শক্তির এই সূত্র প্রাণিজগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ জন্য পৃথিবীর কোন পাহাড় জঙ্গলে বাঘ এবং সিংহ একসাথে বসবাস করে না। যেখানে বাঘ আছে, সেখানে সিংহ নাই। আর যেখানে সিংহ আছে, সেখানে বাঘ নেই। আবার বাঘ এবং সিংহকে অন্য প্রাণীরা আক্রমণও করে না। বাঘ-সিংহের শক্তিই তাদের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করেছে। এটাই চিরন্তন সত্য। সুতরাং পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশ হওয়ার কারণে ভারত পাকিস্তান একে অপরকে সমীহ করবে এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে না। পরিশেষে ভারত এবং পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের প্রতি আবারো অনুরোধ, অনুগ্রহ করে দ্বন্দ্বকে বন্ধ করে শান্তির পথে হাঁটুন। আর সদিচ্ছা থাকলে এটা সম্ভব। তাহলে উন্নত হবে মানুষের জীবন এবং তখনই মানুষেরা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। আর জীবনে এটাই দরকার। লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষকভারত এবং পাকিস্তান উপমহাদেশের দু’টি শক্তিধর দেশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ থেকে দেশ দু’টি স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই সময় থেকেই ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সব সময় একটা দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। সময়ে সময়ে এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়, আবার সময়ে সময়ে এই দ্বন্দ্ব শীতল হয়। দেশ দু’টির মধ্যে অতীতে একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে। যাতে অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। তাই দেশ দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হলে উপমহাদেশ জুড়েই একটি উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে এতদঞ্চলের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়ে। ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ার কারণে দেশ দু’টির মধ্যকার দ্বন্দ্বে দুশ্চিন্তা, টেনশন এবং আতঙ্ক বহুগুণে বেড়ে যায়। কারণ যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় এবং সেই যুদ্ধে দেশ দু’টি যদি পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করে তখন ভারত পাকিস্তানের জনপদসমূহ হিরোশিমা, নাগাসাকির মত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। মুহূর্তেই মারা পড়বে কয়েক কোটি মানুষ। আগুনের লেলিহান শিখায় মানব সভ্যতার সবকিছুই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তাই ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্ব মানেই বাড়তি টেনশন, বাড়তি উত্তেজনা এবং বাড়তি আতঙ্ক। তাই একজন শান্তিকামী মানুষ হিসাবে ভারত এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিক এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, আপনারা অনুগ্রহ করে যুদ্ধের পথে না হেঁটে শান্তির পথে হাঁটুন। একে অন্যের প্রতি যুদ্ধের হুমকি না দিয়ে শান্তির কথা বলুন। যুদ্ধের মাঠে খেলতে না নেমে আলোচনার টেবিলে বসুন। প্রত্যেকে যদি অপরকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করে, তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তখন কোন যুদ্ধ সঙ্ঘাত থাকবে না। আর মানবজাতির শান্তির স্বার্থেই এটা দরকার। সুতরাং ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে চিরতরে বন্ধ করতে হবে এবং সূচিত করতে হবে শান্তির সুবাতাস।
ভারত পাকিস্তান পরস্পর প্রতিবেশী দেশ। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ থেকে দেশ দু’টি স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই থেকে তাদের মাঝে চির বৈরিতা, চির শত্রুতা। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের সৃষ্টি। আয়তন, জনসংখ্যা এবং সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে ভারত অনেক শক্তিশালী এবং বড় দেশ। অপর দিকে আয়তন, জনসংখ্যা এবং সামরিক শক্তির বিচারে পাকিস্তান অনেক ছোট এবং দুর্বল দেশ। কাশ্মির ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধ লেগেই আছে। দেশ দু’টি পাল্লা দিয়ে সামরিক শক্তি কেবল বাড়াচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দু’টি দেশই এখন পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয়েছে। বহু আগেই দেশ দু’টি পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমার মজুদ বাড়িয়ে চলছে। নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণের জন্য, দু’টি দেশই কিছুদিন পর পর পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। পারমাণবিক অস্ত্রের পাশাপাশি দু’টি দেশই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং নৌবাহিনীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে এবং প্রতিনিয়তই এসব বাহিনীতে যুক্ত করছে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং সাবমেরিনসহ ভয়ানক সব মারণাস্ত্র। এভাবে দেশ দুটি অব্যাহতভাবে সামরিক শক্তি কেবল বাড়িয়েই চলেছে। দু’টি দেশই প্রতি বছর তাদের বাজেটের বিরাট একটি অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে। এভাবে দেশ দু’টির মধ্যে চলছে সামরিক শক্তি বাড়ানোর অব্যাহত এক প্রতিযোগিতা। অথচ দেশ দু’টির অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখানে অশিক্ষা, দরিদ্রতা এবং পুষ্টিহীনতার শিকার। এখনো বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে ।
কাশ্মির ইস্যুই ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মূল কারণ। ভারতের দাবি কাশ্মির ভারতের অংশ। অপরদিকে পাকিস্তানের দাবি কাশ্মির তাদের অংশ। আর এই নিয়ে চলে বাকযুদ্ধ। কাশ্মিরের জনগণ দীর্ঘদিন থেকে ভারতের কাছ থেকে স্বাধীন হবার জন্য লড়ছে। কাশ্মিরি জনগণের এই স্বাধীনতার আন্দোলনকে ভারত বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা হিসেবে অভিহিত করেছে এবং কাশ্মিরিদের এই আন্দোলনে সমর্থন দানের জন্য পাকিস্তানকে দোষারোপ করে আসছে। কাশ্মিরিদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য ভারত বরাবরই কঠোর নীতি গ্রহণ করে আসছে। কাশ্মিরে ভারত কয়েক লাখ সেনা মোতায়েন করেছে। অপরদিকে পাকিস্তান ঘোষণা করেছে, তারা কাশ্মিরি জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নৈতিক সমর্থন দিয়ে যাবে। ভারতের দাবি পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে আর পাকিস্তানের দাবি ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। আবার ভারত পাকিস্তান উভয়েই তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে। সীমান্তরেখায় প্রায়ই ভারত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি চলে। আর এতে সৈনিকসহ নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যায়। দুদিন পরে পতাকা বৈঠক হয়, শান্তির প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়। নিরাপদ জীবনের আশায় মানুষ বুক বাঁধে। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই ভারত পাকিস্তান আবারো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। আবারো দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশ দু’টির সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনে আবারো বিপর্যয় নেমে আসে। আতঙ্ক, ভয় এবং দুশ্চিন্তা তখন তাদের জীবনকে গ্রাস করে। এভাবে সীমান্ত এলাকার মানুষেরা বছরের পর বছর ধরে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে। মূলত ভারত পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের চাকায় বছরের পর বছর ধরে পিষ্ট হচ্ছে কাশ্মির এবং সীমান্ত এলাকার মানুষ।
কাশ্মির ইস্যুই যেহেতু ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মূল কারণ, সেহেতু কাশ্মির সমস্যার সমাধানের মধ্যেই ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে। সুতরাং ভারত পাকিস্তানের উচিত দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্ব, সঙ্ঘাত এবং শত্রুতা জিইয়ে না রেখে তাদের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করে চিরদিন শান্তি, সম্প্রীতি এবং বন্ধুত্বের পথে হাঁটা। তার জন্য কাশ্মিরের ভাগ্য কাশ্মিরি জনগণের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। কাশ্মিরি জনগণ ভারতের সাথে থাকবে, নাকি পাকিস্তানের সাথে থাকবে, নাকি নিজেরা আলাদা স্বাধীন দেশ হিসাবে থাকবে, সেটা কাশ্মিরের জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া হোক। এটা কাশ্মিরি জনগণের নিজস্ব ব্যাপার এবং এটা কাশ্মিরি জনগণের ন্যায্য এবং বৈধ অধিকার। জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে মানুষের এই অধিকারের স্বীকৃত দেয়া হয়েছে। সুতরাং কাশ্মিরি জনগণের ভাগ্য কাশ্মিরিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হউক এবং সেখানে গণভোটের আয়োজন করে সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হউক। এভাবে কিন্তু গণভোটের আয়োজন করে পৃথিবীর অনেক ভূখণ্ডের অধিবাসীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছে। উদাহরণ হিসাবে আমি এখানে তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি। পূর্ব তিমুরের জনগণ স্বাধীনতার জন্য গণভোটের আয়োজন করেছে এবং সেই গণভোটে পূর্ব তিমুরের জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেই ভোটের ফলাফল অনুসারে পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং বর্তমানে পূর্ব তিমুর একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া এবং পূর্ব তিমুর উভয় ভূখণ্ডে শান্তি ফিরে এসেছে। একইভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে দক্ষিণ সুদানের জনগণ গণভোটের আয়োজন করেছে এবং সেই গণভোটে দক্ষিণ সুদানের জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী দক্ষিণ সুদান, সুদান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং বর্তমানে দক্ষিণ সুদান একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। এর মাধ্যমে এতদঞ্চলে শান্তি ফিরে এসেছে। একইভাবে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতার প্রশ্নে স্কটল্যান্ডের জনগণ গণভোট আয়োজন করেছে। স্বাধীনতার প্রশ্নে স্কটল্যান্ডের জনগণ ভোট দিয়েছে। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বেশির ভাগ জনগণ ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার পক্ষে ভোট না দিয়ে ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষেই ভোট দিয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ড আগের মতই ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এই গণভোটের মাধ্যমে স্কটল্যান্ডের জনগণের মধ্যকার অমীমাংসিত একটি বিষয়ের সমাধান হয়েছে। ফলে স্কটল্যান্ডেও শান্তি ফিরে এসেছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান এবং স্কটল্যান্ডের মত কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়টিও কাশ্মিরের জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া হউক। আর এর মাধ্যমে কাশ্মির বিষয়ে একটি স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসবে। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে এ দুটি দেশের মানুষই যে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, এ দ্বন্দ্বের কারণে পুরো উপমহাদেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণেই সার্ক আজ একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে ।
তবে যে যাই বলুক না কেন, আমার মতে ভারত কখনো পাকিস্তান আক্রমণ করবে না। সুতরাং ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হবে না। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে পাকিস্তান একটি পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশ। আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামরিক বাহিনীর কলেবর সবকিছুতে ভারত অনেক এগিয়ে থাকলেও পাকিস্তানের হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র এসব কিছুকে ব্যালান্স করেছে। অধিকন্তু স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে পাকিস্তানের জনগণ যতটা ঐক্যবদ্ধ, ভারতের জনগণ ততটাই বিভক্ত। সামরিক বাহিনীর বাইরে পাকিস্তানের বেসামরিক জনগণের অনেকেই স্বেচ্ছায় দেশ রক্ষায় যুদ্ধ করবে এবং হাসিমুখে জীবন দিবে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকজনের মধ্য হতে স্বেচ্ছায় দেশ রক্ষায় যুদ্ধ করে জীবন দিবে, এ রকম লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। মনে রাখতে হবে শক্তি হচ্ছে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া পরস্পরের চরম শত্রু হলেও আজ পর্যন্ত তারা একে অন্যকে আক্রমণ করেনি এবং তাদের মধ্যে এখনো সরাসরি কোন যুদ্ধ হয়নি। এমনকি ভবিষ্যতেও রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যেও যুদ্ধ হবে না। ভারত এবং চীনের মধ্যেও হবে না। একইভাবে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যেও হবে না। কারণ এরা সবাই পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ দেশ। শক্তির এই সূত্র প্রাণিজগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ জন্য পৃথিবীর কোন পাহাড় জঙ্গলে বাঘ এবং সিংহ একসাথে বসবাস করে না। যেখানে বাঘ আছে, সেখানে সিংহ নাই। আর যেখানে সিংহ আছে, সেখানে বাঘ নেই। আবার বাঘ এবং সিংহকে অন্য প্রাণীরা আক্রমণও করে না। বাঘ-সিংহের শক্তিই তাদের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করেছে। এটাই চিরন্তন সত্য। সুতরাং পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশ হওয়ার কারণে ভারত পাকিস্তান একে অপরকে সমীহ করবে এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে না। পরিশেষে ভারত এবং পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের প্রতি আবারো অনুরোধ, অনুগ্রহ করে দ্বন্দ্বকে বন্ধ করে শান্তির পথে হাঁটুন। আর সদিচ্ছা থাকলে এটা সম্ভব। তাহলে উন্নত হবে মানুষের জীবন এবং তখনই মানুষেরা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। আর জীবনে এটাই দরকার।

লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

SHARE

Leave a Reply