ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি পুনর্মূল্যায়ন

সিরাজুর রহমান

খালেদা জিয়া ও মনমোহন সিংয়ের বৈঠক

এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে, বিএনপি এবং ১৮ দলের জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারত ও চীন সফরে যাবেন। সবাই জানেন, আগামী নির্বাচন মোটামুটি অবাধ হলেও তিনি আবারো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। বড় প্রতিবেশী ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বাংলাদেশে সবারই কাম্য। অতীতে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেও বেগম জিয়া ভারত সফর করেছেন এবং দুই দেশের সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। আসন্ন সফরেও অবশ্যই সে প্রসঙ্গে আলোচনা হবে। সম্পর্কের খুঁটি মজবুত করার উপায় ও প্রয়োজনীয়তার কথা নিশ্চয়ই বিএনপি নেত্রী দিল্লির নেতাদের বুঝিয়ে বলবেন।
দুর্ভাগ্যবশত বিগত সাড়ে তিন বছরে দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে দু’টি ভিন্ন মাত্রায়। একদিকে দিল্লি শেখ হাসিনার সরকারের পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা পালন করছে, অন্য দিকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিগত ৬৫ বছরে আর কখনো বর্তমানের মতো ভারতবিদ্বেষী ছিল না। এটা পৃথকভাবে দুই দেশের জন্য তো বটেই, সম্মিলিতভাবে দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর। খালেদা জিয়ার সফর যদি কার্যকারণগুলো দূর করে সম্পর্ককে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তাহলে সব পক্ষের জন্যই মঙ্গল হবে।
মূলত পূর্ব বাংলার মানুষের ভোটেই পাকিস্তান সৃষ্টি ও ভারত বিভাগ হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের গণভোটে পাঞ্জাবিরা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়নি, ভোট দিয়েছিল পূর্ব বাংলার মানুষ। একটা ভুল প্রচার চালানো হয়েছিল এবং ভুলটাই ইতিহাসে গাঁথা হয়ে গেছে যে, পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মের কারণে। প্রকৃত প্রস্তাবে অবিভক্ত ভারতের অর্থনৈতিক বঞ্চনা মুসলমান সমাজের পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব ছিল না। তার থেকে উদ্ধার পেতে তাদের একটা প্লাটফরমের প্রয়োজন ছিল। ইসলাম সে প্লাটফরমই তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে পূর্ব বাংলাতেই বঞ্চনা ও শোষণ সবচেয়ে প্রকট ছিল। পাকিস্তানের জন্য তাদের উদগ্রতা সে জন্যই স্বাভাবিক ছিল। ইসলাম যদি একমাত্র এমনকি প্রধান কারণও হতো, তাহলে ভারতীয় সেনা দিয়েও পাকিস্তান ভাঙা সম্ভব হতো না।
বহু তিক্ততা, হানাহানি ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান অখণ্ড ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংস্কৃতির নাড়ির বন্ধন তারা কাটাতে চায়নি। কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত সাংস্কৃতিক রাজধানী। আর প্রায় সব মুসলমান নতুন স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছিল। কিন্তু প্রকাশনাগুলো এবং প্রকাশকেরা সবাই কলকাতায় ছিলেন বলে কবি-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা সেখানেই থেকে গিয়েছিলেন। পড়ার বই ও সাময়িকী, গান শোনার গ্রামোফোন রেকর্ড সবই আসত কলকাতা থেকে। এমনকি সকালে পড়ার পত্রিকাগুলোও আসত ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের ডেকোটা বিমানে কলকাতা থেকে রোজ সকালে। কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের বেশির ভাগই হুড়মুড় করে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন ১৯৫০ সালে। সে বছর ভারতে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও মুসলিম হত্যায় তারা প্রমাদ গুনেছিলেন। তারা বুঝে গিয়েছিলেন যে, ওদেশে আর বেশি দিন থাকা মোটেই নিরাপদ হবে না।

দুই জাতি ও দুই জনতার নাড়ির বন্ধন
পশ্চিমবঙ্গের সাথে এই সাংস্কৃতিক নাড়ির যোগাযোগ তখনকার রাজধানী করাচিতে মূলত পাঞ্জাবি শাসকদের ভীতির কারণ ঘটিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্যে সততা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মর্যাদা দেয়ার পরিবর্তে উপনিবেশ হিসেবে শোষণ করাই ছিল তাদের মতলব। তারা সঠিক বুঝে গিয়েছিল, এই সাংস্কৃতিক সখ্য তাদের চিন্তার স্বাধীনতা দিলে পূর্ব পাকিস্তানিরা বেশি দিন শোষিত হতে রাজি হবে না। এ প্রদেশের মানুষের ধমনীতে দেশপ্রেমের (তাদের ভাষায় তাদের যথেষ্ট দেশপ্রেমী পাকিস্তানি তৈরির লক্ষ্যে) ইনজেকশন দেয়ার জন্য তারা এক দিকে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ও আরবি-ফারসি শব্দ আমদানি করে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের ভাষার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির অভিযান শুরু করে। অন্য দিকে কলকাতা থেকে বই, সাময়িকী, গ্রামোফোন রেকর্ড ইত্যাদি আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সংস্কৃতির ক্ষুধা তাতে বরং তীব্রতর হয়েছিল। কলকাতা থেকে চোরাইপথে বই আসত। লাইথো পদ্ধতিতে ঢাকায় ছেপে সেগুলো ব্যাপক বিক্রি হতো। গ্রামোফোন রেকর্ডও আসত চোরাচালান হয়ে। আমার মনে আছে, সাংবাদিক জীবনের সেই প্রথম অধ্যায়ে একটা খবর ছেপেছিলাম। স্থানীয় ছিঁচকে চোরাচালানিরা ঝাঁকায় করে ইলিশ মাছ নিয়ে যেত সীমান্তের ওপারে। আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিয়ে আসত বই, ম্যাগাজিন আর গ্রামোফোন রেকর্ড। অর্থাৎ পাকিস্তানিদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও অতীতের তিক্ততা ভুলে সম্পর্ক ক্রমে ক্রমে বরং ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল।
একাত্তরে ভারত পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের এবং কয়েক লাখ বাংলাদেশী শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রথমে কূটনৈতিক এবং ডিসেম্বরের গোড়া থেকে সামরিক সাহায্যও দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে বাংলাদেশে ভারতের প্রতি সৌহার্দ্যরে যেন একটা ঢল বয়ে গিয়েছিল। তার বহু কাহিনী আমি শুনেছি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও হয়েছে প্রচুর। কিন্তু কতগুলো কারণে সে ঢল আধমরা স্রোতে পরিণত হতেও দেরি হয়নি। গোড়ায় ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশের বাজার থেকে যাবতীয় পণ্য কিনে ভারতে নিয়ে যায়। ভারতে তখন বিলাসসামগ্রী আমদানি নিষিদ্ধ ছিল, অন্য দিকে পাকিস্তানে সেসব সামগ্রী অবাধে আমদানি হতো। ’৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার রাস্তায় আমি ঢাকার নম্বর প্লেটযুক্ত বেশ কিছু আনকোরা নতুন টয়োটা গাড়ি দেখেছিলাম। পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া এসব গাড়ি ভারতীয় সেনারা নিয়ে যায়।
তারপর দেখা গেল, বাংলাদেশ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়ার কোনো গরজই ভারত দেখাচ্ছে না। নতুন স্বাধীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ বহু বাংলাদেশীর সেটা অসহনীয় মনে হয়েছিল। ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখল করে আছে, এ কারণ দেখিয়ে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। সে স্বীকৃতি দিতে চীন আরো দেরি করেছিল। রক্ষীবাহিনীকে আমদানি করা ভারতীয় সেনা ইউনিফরম ও ভারতীয় সামরিক জিপ ইত্যাদি দেয়া হয়েছিল। সে সবের আলোকচিত্র জাতিসঙ্ঘে পেশ করে চীন দাবি করেছিল যে, বাংলাদেশ তখনো ভারতের সামরিক দখলে আছে। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল, ভারতাশ্রয়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারত সরকারের সাথে সাত দফা চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন যে, স্বাধীন হলেও বাংলাদেশ ভারতের সামরিক সংরক্ষণে থাকবে।
এই হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস
পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় সেনা অপসারণের জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করেন। তিনি বিডিআরকে অক্ষত রাখেন এবং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতিকেও স্বাধীন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান। মুজিবের চাপে ইন্দিরা গান্ধী অবশেষে ভারতীয় সৈন্য সরিয়ে নিতে রাজি হলেও ভারতের একটা প্রভাবশালী মহল মুজিবের স্বাধীন চেতনা এবং দিল্লির সাথে তাজউদ্দীনের স্বাক্ষরিত চুক্তি অমান্য করায় খুশি হতে পারেনি।
মুজিবের মর্মান্তিক হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়, সেটাও ছিল পুরোপুরি আওয়ামী লীগ সরকার। মুজিব সরকারের আটজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী সে সরকারে সদস্য ছিলেন। মোশতাকও মুজিবের নীতির কঠোর অনুসারী ছিলেন বলেই দিল্লি তার সরকারের সাথে সহযোগিতা করেনি। ভারতপন্থী বলে বিবেচিত খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর (১৯৭৫) সামরিক অভ্যুত্থান করায় দিল্লি উৎফুল্ল হয়েছিল। দিল্লির সচিবালয়ের সাউথ ব্লকে (পররাষ্ট্র দফতর) সেদিন মিষ্টান্ন বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বৃহদংশের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলও সেনা সদস্যদের উসকানি দিতে থাকে। ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট একটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। খালেদ মোশাররফ শেষ পর্যন্ত পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেনা সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে আসে এবং হত্যা করে।
অভ্যুত্থানের আগ মুহূর্তে খালেদ মোশাররফ ও তার অনুসারী অফিসাররা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে রেখেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থান ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার পর সিপাহিরা বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের গদিতে বসায়। জিয়া প্রথমে প্রধান সামরিক প্রশাসক ও পরে প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু ভারত কখনোই তার সরকারের সাথে সহযোগিতা করেনি। এমনকি জিয়ার উদ্যোগে দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সমিতি (সার্ক) গঠিত হলেও সার্কের বিকাশে ভারত নানা অছিলায় গড়িমসি করেছে।
এই হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস। মুজিব হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার দুই কন্যা হাসিনা ও রেহানাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেন। পরবর্তী প্রায় ছয় বছর তারা দিল্লিতে পররাষ্ট্র দফতরের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইংয়ের (র) হেফাজতে ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে র-এর কাছ থেকে যে ইতিহাস শিখে এসেছেন সেটা ছিল ভারতের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বিকৃত করা ইতিহাসÑ প্রকৃত ইতিহাস নয়।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে (বিশেষ করে দ্বিতীয়বার) শেখ হাসিনা ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের সম্পাদনার পথ ধরেছেন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি সফরকালে ভারতের সাথে তিনি একপ্রস্থ চুক্তিতে সই করে এসেছেন এটাই আমরা জানি। কিন্তু জাতিকে তো বটেই, জাতীয় সংসদকেও সেসব চুক্তির বিবরণ, এমনকি সংখ্যাও জানতে দেয়া হয়নি। শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে বেরুবাড়ী ছিটমহল ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু ভারত আজো পর্যন্ত তিনবিঘা ছিটমহলটি এবং চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের অন্যান্য এলাকায় ভূমি বিনিময় কার্যকর করেনি। তিস্তা চুক্তির ব্যাপারেও বিলম্বের কারণ হিসেবে ভারত সংসদীয় অনুমোদনের দোহাই দিচ্ছে, বলছে পশ্চিমবঙ্গের সম্মতি ছাড়া সংসদ অনুমতি দিতে পারে না।

সামরিক বিবেচনা
অন্য দিকে শেখ হাসিনার স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর সংখ্যাও বাংলাদেশ সংসদকে জানতে দেয়া হয়নি, সেসব চুক্তি অনুযায়ী হাসিনার সরকার বাংলাদেশের সড়ক, রেল, বাংলাদেশের নদী ও বাংলাদেশের বন্দরগুলোর যদৃচ্ছ ব্যবহার উপহার হিসেবে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার সব আয়োজন পাকা করে ফেলেছেন মনে হয়। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
লক্ষণীয় যে, শেখ হাসিনা ভারতের পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুগ্রহ লাভের বিনিময়ে যা দিচ্ছেন ও দিতে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের মানুষের তাতে সায় নেই। ভারতকে করিডোর দিলে তাদের যে সমূহ ক্ষতি হবে বাংলাদেশের মানুষ তা জানে। বেসামাল করিডোর দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক সীমা পদদলিত করারই শামিল হবে। ত্রিপুরা রাজ্যে অত্যধিক এবং অস্বাভাবিক ভারী যন্ত্রপাতি পাঠাতে তিতাস নদী এবং ১৪টি খালে বাঁধ দিয়ে পরিবেশের যে ক্ষতি করা হয়েছে সেটা পূরণে বহু বছর সময়ের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশে সড়কগুলোর করুণ দশা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সড়ক মেরামতের দাবিতে বুদ্ধিজীবীদের শহীদ মিনারে সভা করতে হয়। মেরামতের অভাবে সেতু ধসে পড়ার খবর মাঝে মধ্যেই পত্রিকায় পড়ি। ভারতের ভারী যানবাহন চলাচল করলে সড়ক ও সেতুগুলোর অবস্থা যে কেমন দাঁড়াবে শুধু কল্পনাই করা যাবে। বাংলাদেশ রেলে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনার খবর দেখছি। কারণ অবশ্যই যথাযোগ্য মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। তার ওপরও ভারতের ভারী যন্ত্রপাতি ও সমরাস্ত্র পরিবহন বাংলাদেশ রেলের সমাধি রচনারই নামান্তর হবে।
বিরাট একটা সামরিক বিবেচনাও আছে এখানে। ভারত যে করিডোর পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তার কারণ মূলত সামরিক। প্রায় পাঁচ দশক ধরে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে (সাত বোন নামে পরিচিত) মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের উন্নয়নের প্রয়োজনে অন্তহীন শোষণে এই রাজ্যগুলোর মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তারা এখন বিচ্ছিন্ন হতে চায়। ভারত তার বিশাল সামরিক শক্তি দিয়েও এ বিদ্রোহ দমন করতে পারেনি। একটা বড় কারণ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সঙ্কীর্ণ সংযোগ পথটি প্রায়ই বিনষ্ট করে দিচ্ছে বলে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো ভারত সরকারের জন্য বিরাট সমস্যা। দিল্লি সরবরাহ পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করে। সমস্যা হচ্ছেÑ এই সরবরাহপথ বন্ধ করে দিতে সাত বোনের মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের ভেতরেও আক্রমণ চালাতে বাধ্য হবে।
হিমালয়ে অরুণাচলের বিস্তীর্ণ এলাকার মালিকানা নিয়ে চীন-ভারত বিরোধ পুরনো। ১৯৬২ সালের নভেম্বরে এখানে দুই দেশের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হলেও বিরোধের মীমাংসা হয়নি। বিগত দুই-তিন বছর ধরে শোনা যাচ্ছে, উভয় দেশই সেখানে সমরশক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষ্যকারেরা বলছেন, নিকট ভবিষ্যতে সেখানে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ অপরিহার্য। ভারতীয় রণকুশলীরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হলেই চীন উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর সাথে মূল ভারতের সঙ্কীর্ণ সংযোগপথ এবং বাগদোগরা বিমানঘাঁটি বিনষ্ট করে দেবে। তেমন অবস্থায় এক দিকে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অন্য দিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সৈন্য ও ভারী সমরাস্ত্র পাঠানো বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ছাড়া বিকল্প পথ নেই। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এবং চীন সমানেই এই সরবরাহপথগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের জন্য সেটা হবে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখড়ের প্রাণ যায়’ গোছের অবস্থা।

এটা সুসম্পর্কের ভিত্তি নয়
বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে চিন্তাশীল মানুষ, এসব কারণেই ভারতকে করিডোরদানের ব্যাপারে খুবই ভীত এবং চিন্তিত। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বহানি সাধারণ মানুষেরও উদ্বেগের কারণ। সরকার তাদের পাশ কাটিয়ে ভারতের সাথে গোপন চুক্তি করছে এবং তাদের ভৌগোলিক এলাকা কার্যত ভারতের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে, এটা তাদের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর।
একটা খুবই কৌতুককর বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে এখানে। পাকিস্তান আমলে ভারত সরকারের সাথে পাকিস্তান সরকারের সম্পর্ক ছিল তিক্ত এবং উত্তেজনার; অন্য দিকে ভারতের জনসাধারণের (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের) সাথে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। বর্তমানে দিল্লির সরকারের সাথে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের গলাগলি সম্পর্ক, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ভারত সরকার কিংবা সে দেশের মানুষকে আর বন্ধু ভাবতে পারছে না। এটা কিছুতেই বন্ধুত্ব, এমনকি সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কেরও ভিত্তি হতে পারে না।
ভারতের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতারা অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় সতর্কতার সাথে কথা বলেন। দিল্লির নেতারা প্রায়ই বাণিজ্যের ভারসাম্য স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো লক্ষণ চোখে পড়ে না। বরং দেখা যায়, আকাশ-পাতাল ব্যবধান ক্রমেই আরো দুস্তর হচ্ছে। একদা ম্যানচেস্টারের কাপড় আর বিলেতি লবণই ছিল ভারতবাসীর অবলম্বন। মহাত্মা গান্ধী বিলেতি কাপড় দিয়ে এবং সমুদ্রের লবণ তুলে যে আন্দোলন শুরু করেন, সেটাই পরে স্বাধীনতার আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভারতও বর্তমানে বাংলাদেশকে উপনিবেশের মতো অবাধ রফতানির বাজারে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়, আমাদের পোশাক নির্মাণ শিল্প যে ধ্বংস হতে বসেছে সেটাও ভারতের চক্রান্তেই হচ্ছে।
বিডিআর যত দিন টিকে ছিল, যদৃচ্ছ বাংলাদেশের সীমান্ত লঙ্ঘন ভারতীয় নাগরিকদের কিংবা বিএসএফের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কোথাও সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে বিডিআর সমুচিত জবাব দিয়েছে। কিন্তু বিডিআরকে ভেঙে দেয়ার পর থেকে সীমান্ত লঙ্ঘন আর সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা বিএসএফের জন্য যেন মৃগয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং থেকে শুরু করে ভারতীয় নেতাদের অনেকে এই অন্যায় হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও দিল্লির নির্দেশ যেন বিএসএফের কাছে পৌঁছায় না। সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে, ভারতের নাগরিকেরা বাংলাদেশী ভূমি দখল করছে, বাংলাদেশীদের ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়। আরো অভিযোগ এই যে, বাধাদানের পরিবর্তে বিএসএফ এসব অবৈধ কাজে মদদ দিয়ে থাকে।
শেখ হাসিনার সরকার দিল্লির পৃষ্ঠপোষকদের বিরক্তি উৎপাদনের ভয়ে এসব ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকছে। অতিমাত্রিক স্পর্শকাতরতার কারণে বিএনপির নেতানেত্রীরাও একটা ভালো-মানুষি নীরবতা অবলম্বন করে আছেন বলে মনে হয়। তাদের এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন যে, এ অবস্থা বন্ধুত্বের পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক নয়। বিষফোঁড়া হলে সেটা ফুটো করে বিষ বের করে দিতে হয়, নইলে সারা দেহ বিষাক্ত হয়ে প্রাণহানি অনিবার্য করে তোলে। বন্ধুত্বের সম্পর্কে কোনো সমস্যা কিংবা ভুল বোঝাবুঝি দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে যথাশীঘ্র তার নিষ্পত্তি করে ফেলা প্রয়োজন।
ভারত সফরের সময় খালেদা জিয়ার উচিত হবে সে দেশের নেতাদের বুঝিয়ে বলা যে, বাংলাদেশ সত্যি সত্যি ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চায় এবং পাশাপাশি সদ্ভাব নিয়ে টিকে থাকতে চায়। কিন্তু সদ্ভাব ও বন্ধুত্ব মরুভূমিতে জন্মায় না। সে জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হয়। সে ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা দিয়ে। আলোচনার মাধ্যমে বিবদমান বিষয়গুলোর মীমাংসা এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিরোধের কারণগুলো দূর করে ফেলা হলে দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
(লন্ডন, ১৮.০৯.১২)
serajurrahman34@gmail.com

SHARE

Leave a Reply