‘ভাষা’র ব্যবহার প্রসঙ্গে শাহ আব্দুল হান্নানের চিন্তাধারা -সরদার আবদুর রহমান

বহুমুখী চিন্তার অধিকারী শাহ্ আব্দুল হান্নান কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। তিনি যেমন ছিলেন ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও সামাজিক কল্যাণের দিশারি, আরো ছিলেন সাংস্কৃতিক জগতেরও একজন কাণ্ডারি। এতেই ছিলেন না সীমাবদ্ধ। ব্যক্তি ও সামাজিক মানুষের চিন্তার জগতের খোরাক ও পথনির্দেশনাও দিতে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও কলাম রচনা করে সেই দায়িত্ব তিনি পালন করে গেছেন।
তাঁর লেখার কলম ছিল বিস্তৃত। একাধারে অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ দেখা যায়। এই নিবন্ধে তাঁর ভাষাকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনার একটি পর্যালোচনা করার প্রয়াস থাকবে। এতে তিনি একাধারে প্রধান প্রধান ভাষার ব্যবহার, বিকৃতি, ইসলামি দৃষ্টিকোণ, ভাষাকেন্দ্রিক সাহিত্যের বিকাশ, অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা, সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে যে চিন্তাধারা তুলে ধরেন- তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হবে।

ভাষা যেহেতু মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার প্রধান বাহন সেহেতু এর ব্যবহার এবং এর আবর্তন-বিবর্তনের বিষয়টি শাহ্ আব্দুল হান্নানের নজর এড়ায়নি। তিনি মনে করতেন, ভাষা মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, তার আবেগকে উদ্বেলিত করে, উদ্বেগকে আন্দোলিত করে এবং নিজেকে সর্বতোভাবে প্রকাশের জন্য এই ভাষাই হয়ে উঠে প্রধানতম বাহন। শুধু বাংলা ভাষা নয়, পৃথিবীর তাবত মানুষের ভাষা প্রসঙ্গেই তিনি কথা বলেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে ‘মর্যাদার দিক দিয়ে সকল ভাষা সমান’ কারণ ভাষা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালারই সৃষ্টি। এমন একটি বিশ্বাস ধারণ করে এ প্রসঙ্গে তিনি একটি প্রবন্ধে প্রশ্নের আকারে বলেন, মাতৃভাষা কী? কোনটা? এটা কি সেই ভাষা যেটা একজন মানুষের নিজ এলাকায় বলা হয় যেটা সে সব সময় তার মায়ের কোলে বসে শুনেছে? নাকি যেটা সে স্কুলে পড়েছে? অথবা যেটা কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা, যদি সেটা একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হয়ে থাকে? কোনটা মাতৃভাষা এই প্রশ্নটি থেকেই যায়। যা-ই হোক না কেন, মূল কথা হলো সবাই মাতৃভাষাকে ভালোবাসে। তিনি ভাষাবিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিকোণ নিয়ে আলোচনা করেন। ভাষাকে ‘মানব-ঐক্যে’র মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরতে চান। তিনি তাঁর একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, “মাতৃভাষাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও যদি ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখি তাহলে স্বীকার করতেই হবে মূলত যদি তার গভীরে যাওয়া যায়- সব ভাষা কেউ একা সৃষ্টি করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা সূরা রোমে নিজেই বলেছেন, ‘তিনিই সকল রঙের ¯্রষ্টা এবং সকল ভাষার ¯্রষ্টা।’ এই অর্থটাকে ঠিক শাব্দিক অর্থে নেয়া যাবে না। এটারও একটা তাত্ত্বিক দিক আছে। আমাদের চোখের সামনেই আমরা দেখছি মানুষের হাতে ভাষা গড়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও আল্লাহ বলছেন, তিনিই সকল ভাষার ¯্রষ্টা। এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো মানব ঐক্যের প্রতিষ্ঠা করা। সকলে মূলত সমান এবং এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। কোন্দল, সংঘাত করা উচিত নয়। সংঘর্ষ করা উচিত নয়। তেমনিভাবে তিনি যখন বলেন, সকল ভাষা আমি সৃষ্টি করেছি। তার মানে হলো, এটাও মানব ঐক্যের পক্ষেই কথা। ইসলাম সব সময় মানব ঐক্য চায় আর ভাষাকেও আল্লাহ তায়ালা মানুষের ঐক্যের বিপরীত একটি শক্তি হিসেবে এবং একটি বিপরীত উপাদান হিসেবে দাঁড় করাতে চান না। ….যে, যা-ই কিছু মানুষ সৃষ্টি করুক না কেন, তার পিছনে রয়েছে মূল ¯্রষ্টা যিনি আমাদের সৃষ্টির ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি অতি নীরবে ভাষা তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। যা-ই হোক, মূল কথা হলো, ভাষা মানব ঐক্যের প্রতীক এবং আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা এই যে, সকল ভাষাই তাঁর সৃষ্টি।”১
তাঁর মতে, সব ভাষাই সম্মানের যোগ্য। কোনো ভাষাকেই অসম্মান ও নিন্দা করা উচিত নয়। ছোট করে দেখা উচিত নয়। এজন্য কাউকে অপবাদ দেয়াও উচিত নয়। তারপরও বাস্তব কারণে স্বীকার না করে পারা যায় না যে, ভাষার মধ্যে অবশ্যই উৎকর্ষের দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। সকল ভাষাই সমানভাবে উৎকর্ষ অর্জন করেনি। এটা অস্বীকার করা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে শাহ আব্দুল হান্নান ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, “আল্লাহ তায়ালা বলছেন, সকল মানুষ সমান, কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতে তাদের মধ্যে পার্থক্য হয়। তেমনি কাছাকাছি কথা বলা যায়, সকল ভাষা সমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন্ ভাষা কতটুকু আল্লাহর বাণীকে ধারণ করেছে, কোন্ ভাষা কতটুকু ইসলামের বাহক হয়েছে, বাহন হয়েছে- এই মানদণ্ডে তো ভাষাকে অবশ্যই শ্রেণীকরণ করা যায়। যদি দেখা যায়, ইসলামের দৃষ্টিতে একটি ভাষা ইসলামী মূল্যবোধকে, ইসলামী আদর্শকে, ইসলামী চেতনাকে, ইসলামী ধ্যান-ধারণাকে অধিক ধারণ করেছে এবং অন্য ভাষা সেই তুলনায় কম করেছে তাহলে সেখানে একটা শ্রেণীকরণ করা যায়। এর ভিত্তিতেও ভাষার মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে এবং সেটা করা কোনো অসঙ্গত বা অপরাধ হবে না। অবশ্য একথাও বলতে হয়, এই যে শ্রেণীকরণ তারও মূল ভিত্তি হলো, সে ভাষায় যারা কথা বলে বা লেখে তারাই অর্থাৎ যে ভাষার লোক ইসলামকে যত বেশি ধারণ করলো এবং ইসলামের বিষয়গুলোকে (Material) যত বেশি তারা আত্মস্থ করে নিলো বা আত্মস্থ করে নতুন (Original) লেখা লিখলো এবং এর ফলে সে ভাষা যদি অন্য ভাষার তুলনায় অধিক ইসলামাইজড হয়ে যায় তাহলে সেটা সেই লোকদেরই কৃতিত্ব বলে গণ্য হবে।”২

শাহ হান্নান এ প্রসঙ্গে আরবীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে তুলে ধরেছেন। আর এটি ঘটেছে এই ভাষায় পবিত্র আল-কুরআন হওয়ার কারণে। এ বিষয়ে তিনি যুক্তি দিয়ে বলেছেন, “আরবী ভাষা এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ (যার ভিত্তিতে মানবজাতিকে গড়ে তোলার তাঁর পরিকল্পনা) কুরআন সেই ভাষাতেই পাঠান। এদিক থেকে চিরকালের জন্য (Forever) আরবী একটি গুরুত্ব পেয়ে যায়। কারণ কুরআন সর্বশেষ গ্রন্থ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. সর্বশেষ নবী। এটাই আমাদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। এটাই আমাদের ঈমান অর্থাৎ মুসলিমদের ঈমান। সেই দিক থেকে এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে আরবী ভাষার একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আমরা এটাও অস্বীকার করতে পারি না। সর্বস্বীকৃত ব্যাপার যে, আরবী ভাষা একটি অতি উন্নত মানের ভাষাও। আরবী ভাষা ইসলামকে ধারণ করেছে। আরবী ভাষার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামের প্রায় কয়েক শতাব্দীতে, ইসলামের শুরুতে পাঁচ-ছয় শ’ বছরে এটা হয়েছে। আবার আধুনিককালে আরবী ভাষায় নতুন করে ইসলামী সাহিত্য ব্যাপকভাবে সৃষ্টি হচ্ছে।”৩

তিনি এরপরই ইংরেজি ভাষার গুরুত্বের কথা স্বীকার করেন। কেননা এটি প্রায় বিশ্বভাষার মর্যাদা পেয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তাঁর মতে, “তেমনিভাবে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, গত অন্তত এক শ’ বছর ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে বেশি ইসলামের কাজ হয়েছে। যদি বিশ্বব্যাপী ইসলামের কাজ দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে সবচেয়ে বেশি (গত এক শ’ বছরে) কাজ হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। সেদিক থেকে ইংরেজি ভাষাও ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় পরিণত হয়েছে। এখন যে কোনো ইসলামী পণ্ডিত ইংরেজিতে লিখতে চাইলে তার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তাঁর কথা পৌঁছাতে পারেন। তারপর তাঁর লেখাটা ইংরেজি থেকে অনূদিত হয়ে অন্যান্য ভাষায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। অবশ্য যিনি ইংরেজিতে লিখতে পারেন না তিনি তার নিজের ভাষায় এটা লিখতে পারেন এবং তারপর তা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই দিক থেকে আরবীর সাথে সাথে ইংরেজিও গুরুত্ব লাভ করেছে। কারণ ইংরেজি এখন বিশ্বভাষা হয়েছে, এটা ইতিহাসের একটা বাস্তব সত্য। এই বিশ্বভাষা আমরা ফ্রেঞ্চকে বা রাশিয়ানকে বলতে পারবো না কিংবা চাইনিজকে বলতে পারবো না, এমনকি বোধ হয় আরবীকেও বলতে পারবো না। বিশ্বভাষা যে ইংরেজি হয়েছে সেই ভাষাতেও ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। এই দিক থেকে ইংরেজি ভাষা ইসলামের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”৪

শাহ আব্দুল হান্নান ফার্সি ভাষাকেও বিশেষ মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন। তাঁর অভিমত, “এক হিসেবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, অতীতে আরো কয়েকটি ভাষায় ইসলামের ভালো কাজ হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ফার্সি ভাষা। এটা মূলত ইরানের ভাষা। এটা আরো কোনো কোনো এলাকার ভাষাও। ফার্সি এককালে ভারতের রাষ্ট্র ভাষাও ছিল। সম্পূর্ণ ভারত উপমহাদেশে; বার্মা থেকে আরম্ভ করে একেবারে কাবুল পর্যন্ত যে রাষ্ট্র ছিল ভারতবর্ষের অধীনে, দিল্লির কর্তৃত্বে- তার রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সি। আর ইরানের তো ছিলই। এই ভাষাতেও অনেক কাজ হয়। প্রথমদিকে ইসলামের মধ্যযুগে কাজ হয়। আবার দেড় শ’ বছর-দু’শ বছর আগের যে সময়টা (মোগল আমলে) তখনও ফার্সি ভাষায় অনেক কাজ হয়। ইরানের নতুন উত্থানের পর, ইরানের বিপ্লবের পর ফার্সি ভাষায় অনেক কাজ হচ্ছে।”৫

অন্য কয়েকটি ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, “তেমনিভাবে তুর্কি ভাষা, যেটা তুর্কি সালতানাতের ভাষা ছিল, তুর্কি খিলাফতের ভাষা ছিল। সেই ভাষাও প্রায় ছয়-সাত শ’ বছর একটা বড় ভাষা ছিল, রাষ্ট্রভাষা ছিল। একেবারে রুমানিয়া থেকে আরম্ভ করে মধ্য ইউরোপের গোটা এলাকার এটা রাষ্ট্র ভাষায় পরিণত হয়েছিল। অসংখ্য ইসলামী পণ্ডিত এই এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন, তারা তুর্কি ভাষাতে কাজ করেন।”৬

উপমহাদেশে উর্দু ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম- একথা স্বীকার করতেই হবে। যদিও এটি সেই অর্থে খুব প্রাচীন একটা ভাষা নয়। কিন্তু অল্প সময়েই এটি ভারতজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শাহ আব্দুল হান্নান এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞানগর্ভ অভিমত উল্লেখ করে বলেন, “আমরা জানি উর্দু কোনো একটি এলাকার ভাষা নয়। মোগল আমলে এটার উৎপত্তি হয়। বিভিন্ন এলাকার লোক থেকে যারা সেনাবাহিনীতে যোগদান করে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ (Interaction)-এর মাধ্যমে এই নতুন ভাষার উদ্ভব হয়। এর নাম হয় ‘উর্দু’। উর্দু ভাষাতেও- আমাদের স্বীকার করতে হবে, দেড়শ’ দুশ’ বছরের এই উপমহাদেশে (Sub-continent) সবচেয়ে বেশি কাজ হয়, ইসলামী বই-পুস্তক রচিত হয়। উর্দু ভাষাও শক্তিশালী। উর্দু ভাষা বলতে গেলে সারা ভারতের সব এলাকার কিছু না কিছু লোক বোঝে। যারা ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলে যায় তারা ইংরেজির পরে যে ভাষা জানে সেটা হলো উর্দু। উর্দু ভাষায় যারা সাহিত্য রচনা করেছেন পরবর্তীকালে তাদের বইগুলো অনূদিত হয়ে যায় অন্য ভাষায়। যেমন উর্দুতে ইসলামী সাহিত্য ও তাফসীর। উর্দু ভাষায় রচিত তিনটি খ্যাতনামা তাফসীর আমাদের দেশে অনূদিত হয়ে গেছে। একটি হলো, বায়ানুল কুরআন- রচয়িতা আল্লামা আশরাফ আলী খান থানভী। তেমনিভাবে মাওলানা মওদূদীর তাফহীমুল কুরআন এবং মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফীর মারেফুল কুরআন। এছাড়াও আরো অসংখ্য সাহিত্য যা মূলত উর্দুতে রচনা করা হয়েছে সেগুলো বাংলায় অনূদিত হয়েছে। অন্যান্য ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এদিক থেকে উর্দু ভাষাও ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”৭

বাংলা ভাষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে

বাংলাদেশের গণমানুষের ভাষা বাংলা প্রসঙ্গে শাহ আব্দুল হান্নান তাঁর নিজস্ব অভিমত প্রকাশ করতে ভুলেননি। তিনি বাংলা ভাষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে বিশেষ আলোচনা করেন। তিনি তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, “ইদানীংকালে, বিশেষ করে গত পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে বাংলা ভাষায় ব্যাপক ইসলামী সাহিত্য রচিত হচ্ছে। যতটুকু আমি জানি বাংলা ভাষার উত্থানে (প্রাকৃত ও অপভ্রংশ হয়ে যে বাংলা আসলো) সে বাংলা ভাষার শুরুতেও সুলতানদের একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। পরবর্তীকালে আমরা যতটুকু জানি, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের কারণে ও অন্যান্য কিছু উদ্যোগের ফলে এটা জনগণের ভাষা থেকে একটু সরে যাচ্ছিল। পরে আবার বাংলা ভাষায়, বিশেষ করে মুসলিমদের নব জাগরণের কারণে মুসলিম শিক্ষা যখন বৃদ্ধি পায় (বিশ শতকের শুরুর দিকে) বাংলাদেশে মুসলমানদের শিক্ষা যখন আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে তখন থেকে ইসলামের ওপর অধিক হারে লেখা শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম পঞ্চাশ বছরে ইসলামী সাহিত্য ব্যাপকভাবে রচিত হয়েছে এ কথা আমি বলবো না। কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে বেশ কাজ হয়েছে। আমরা যদি ১৯৫১ সালকে একটি মাইলফলক ধরি তাহলে দেখবো একাত্তরের পরে দুই হাজার সাল পর্যন্ত যে সময়- এ সময়ে অসংখ্য সাহিত্য ইসলামের জন্য লিখিত হয়েছে। এর মধ্যে একটা বিখ্যাত তাফসীরও আছে, মাওলানা আকরাম খাঁর। এ সময় বাংলায় যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে মাওলানা আকরাম খাঁ ছাড়াও অনেকেই আছেন। এঁদের আগেও অনেকেই কিছু কিছু তো লিখেছেনই। পরবর্তীতে বলা যায় মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামের ওপরে অনেক বই লিখেছেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সাহেব লিখেছেন। এছাড়াও আরো অনেকে লিখেছেন। কাজেই যে কথা আমরা বলতে চাচ্ছি। সেটা হলো বাংলা ভাষায় ইসলামের কাজ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।”৮

ভাষার চরিত্র বদলানো প্রসঙ্গে

ভাষার চরিত্র বদলানোর বিষয়েও বিশেষ সতর্কতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, “ভাষার একটা স্বাভাবিক বিকাশ আছে। এই বিকাশ আল্লাহ তায়ালাই করান এবং সেইভাবেই ভাষার বিকাশ হওয়া উচিত। এতে কোনো জোরজবরদস্তি খাটে না। পরিকল্পনার মাধ্যমে ভাষাকে বদলে ফেলা- এটা সঙ্গত নয়। সেটা যদি আবার জনগণের ইচ্ছা-আকাক্ষার বিপরীত হয় তাহলে সেটা আরো অনুচিত। অবশ্য একটি পরিবর্তন আছে যা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে আমি মনে করি। যেমন আমরা দেখছি বাংলাভাষী জনগণের মধ্যে যখন শতকরা ৭০-৭৫ জন মুসলিম (দুই বাংলা মিলে) তখন সেখানে কতকগুলো পরিবর্তন স্বাভাবিক ছিল। যেমন বাংলা ভাষা আসলেই যেভাবে ডেভেলপ করলো সেখানে ‘ঈশ্বর’ শব্দ ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে মুসলমানরা সেখানে ঈশ্বরের পরিবর্তে ‘খোদা’ শব্দ নিয়ে এলেন। এরপর ‘আল্লাহ’ নিয়ে আসলেন। এই ধরনের পরিবর্তন যদি পরিকল্পিতভাবে হয় তাহলে সেটাও সঙ্গত। কারণ একটা জাতির বেশির ভাগ লোকের মূল চিন্তাধারার, মূল ধারার বিপরীত শব্দ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে, এটা হতে পারে না। এটা হয়ও না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, অমুসলিম জনগণ ‘ঈশ্বর’ শব্দ ব্যবহার করবে না। অমুসলিম জনগণ ঈশ্বর শব্দই ব্যবহার করবে। কিন্তু মুসলিম জনগণ তার বিশ্বাসের কারণেই সেখানে ঈশ্বর থেকে সরে এসে খোদা এবং পরবর্তীকালে আল্লাহ শব্দ নিয়ে এসেছে। একই ভাষার মধ্যেই কিছুটা ভিন্ন ধারা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন ধারা, তা অসঙ্গত নয়। অস্বাভাবিকও নয়। তেমনি এক সময় এই সব শব্দ পূজা-উপাসনায় ছিল। তার পরিবর্তে মুসলিম জনগণ, লেখকগণ ক্রমে ক্রমে নামায নিয়ে এলেন, সালাত নিয়ে এলেন। উপবাসের পরিবর্তে রোযা নিয়ে এলেন, সিয়াম নিয়ে এলেন। এই ধরনের পরিবর্তনগুলো যা তারা তাদের মূল ধর্মগ্রন্থের মধ্য থেকে নিয়ে আসলেন তা স্বাভাবিক। তেমনিভাবে রসূল শব্দ নিয়ে এসেছেন বাণীবাহক বা দূতের পরিবর্তে। এই ধরনের পরিবর্তনগুলো বা শিরকপরিহারকারী শব্দসমূহ সঙ্গত। যেমন পূজার বেদি। এখন বেদি শব্দটা পূজার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যদি মুসলিম লেখকগণ বেদি শব্দ পরিহার করেন বা পূজার সঙ্গে জড়িত শব্দগুলো পরিবর্তন করেন তাহলে সেটা তো সঙ্গত। কিন্তু এমন ধরনের পরিবর্তন যেটা আরোপিত, যার কোনো সত্যিকার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, সেটা করা ঠিক হবে বলে আমি মনে করি না।”৯

শাহ আব্দুল হান্নান দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, “মনে রাখা দরকার, আরোপিত কিছুই মঙ্গলজনক হয় না। কিন্তু আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এটা আরোপ করা হয়েছে দুইভাবে। মুসলিম লেখকদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে নানা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এবং ব্যক্তিগত জীবনে কিছু তিক্ততার কারণে। কিংবা নিজেদের পড়াশুনার কারণে ইসলাম সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না- এই ধরনের লেখকরা ইসলাম বিরোধী, তৌহিদ বিরোধী শব্দ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এইটুকু হলো আরোপিত ব্যাপার। আবার, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার সাথে আমাদের বাংলা ভাষার পার্থক্যের কারণেও এমন কিছু শব্দ এসেছে, এ অঞ্চলের জন্য যা আরোপিত। কেউ যদি এই দুই এলাকার ভাষা গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন তিনি এই পার্থক্য ধরতে পারবেন।”১০

ভাষা আন্দোলনের মূল্যায়ন

শাহ্ আব্দুল হান্নান তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের একটি মূল্যায়ন করেছেন। তিনি এ বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেন। একটি প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, “আমাদের ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হলো। ভাষা ও সাহিত্যে আমাদের অর্জনকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমার যতটুকু পড়াশুনা তার আলোকে আমি দেখতে পাই, বাংলাভাষা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এটা এমনি করে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফররুখ এবং এর পরে অন্যান্য কবি সাহিত্যিক যারা এলেন- তাঁদের চেষ্টা ও সাধনার ফলেই এই ভাষা একটি শক্তিশালী রূপ গ্রহণ করে। এই ভাষার একটি বড় সুবিধা হলো বিদেশি শব্দভাণ্ডার থেকে সে অবলীলায় শব্দ গ্রহণ করলো। একদিকে সংস্কৃত অন্যদিকে আরবী এবং ফার্সি থেকে ব্যাপকভাবে শব্দ গ্রহণ এবং পরবর্তীকালে যেহেতু ইংরেজরা দুশো বছর এদেশ শাসন করে সেখান থেকে বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দও ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে। ফলে দেখা যায়, বিশ্বের যে কয়টি ভাষার শব্দভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ তার মধ্যে বাংলা একটি। যদিও এই বিষয়টি অবশ্যই গবেষণার দাবিদার।”১১

তিনি মনে করেন, “… খুবই শক্তিশালী একটি ভাষা আমরা পেয়েছি, যেটা গত এক দেড়শ বছরে অভাবিত উন্নতি করেছে। বিশেষ করে গত পঞ্চাশ বছরে এই ভাষা আরো ব্যাপকতর সমৃদ্ধ হয়েছে। ইংরেজি শব্দের প্রবেশ এই সময় ব্যাপকতা লাভ করেছে। বিজ্ঞানের প্রয়োজনে এবং অন্যান্য কারণে বিশ্বের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অগ্রসর হয়েছে এই ভাষা। …বাংলাভাষা যে শিক্ষার মাধ্যম হয়ে গেল আপটু ইউনিভার্সিটি লেবেল- তার ফলে আরো অসংখ্য ইংরেজি শব্দ বিজ্ঞানের প্রয়োজনে আমরা গ্রহণ করে ফেললাম। এই ডেভেলপমেন্টটা হলো গত বিশ ত্রিশ বছরে।”১২

বাংলা সাহিত্যের অর্জন প্রসঙ্গে

বাংলা সাহিত্যে আমাদের অর্জন প্রসঙ্গেও দৃষ্টিপাত করেছেন শাহ আব্দুল হান্নান। একটি প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভাষার মাধ্যমে আমরা সবই প্রকাশ করতে সক্ষম- এরকম একটা অস্ত্র আমাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও সে তুলনায় আমাদের সাহিত্যের অর্জন ব্যাপক- এটা বলতে আমার দ্বিধা আছে। আজ আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, চিন্তার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু লিখেছি, পলিটিক্যাল সায়েন্স কিংবা অর্থনীতির উপর কতটুকু লিখেছি, দর্শন বা অন্যান্য বিজ্ঞানে এবং সমাজবিজ্ঞানের ওপর কতটুকু লিখেছি? বাস্তবে দেখা যাবে খুব কমই লিখেছি। কিছু টেক্সট বইয়ের অনুবাদ ছাড়া সত্যিকার অর্থে মূল কাজ আমরা যাকে বলি, তা বাংলা সাহিত্যে করিনি। তেমনিভাবে উপন্যাস, গল্পের কথা বললেও বলব আমাদের অর্জন খুব বেশি নয়। নিশ্চয় বাংলায় অনেক পপুলার উপন্যাস লেখা হয়েছে। যেমন ছোট ছোট উপন্যাস যাকে নভেল বলা যায়- যখন একজন লেখক লেখেন তখন হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু সাহিত্যের বিচার এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাষার সমৃদ্ধির তুলনায় সাহিত্যের দরবারে আমাদের অর্জন এখনো সেই পরিমাণ নয়। এরপর যদি কবিতা প্রসঙ্গে বলি তাহলে একথা ঠিক যে, আমাদের কবির সংখ্যা অনেক। অসংখ্য কবি আছেন, তার মধ্যে কেউ কেউ উল্লেখযোগ্য কবি হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু তবু বলা যায়, বাংলাভাষা একটি শক্তিশালী ভাষায় পরিণত হলেও আমরা সামগ্রিকভাবে একটি শক্তিশালী সাহিত্য তৈরি করতে পেরেছি- এমন কথা বলতে পারি না। তবে আমাদের সুযোগ রয়েছে। এই ভাষাকে ব্যবহার করে আমরা একটা শক্তিশালী সাহিত্য তৈরি করতে পারি। উপন্যাসের ক্ষেত্রে, গল্পের ক্ষেত্রে, আর কবিতার ক্ষেত্রে তো পারিই। সর্বোপরি একটা জাতিকে রিপ্রেজেন্ট (জবঢ়ৎবংবহঃ) করার জন্য মূল যে চিন্তা (ঞযড়ঁমযঃ) তার ক্ষেত্রেও। এর জন্য যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, বিশ্ব সাহিত্যকে জানা (বিশ্বের যে দর্শন-সেটা রাজনৈতিক হোক বা অর্থনৈতিক হোক কিংবা সমাজ বা সভ্যতা সংক্রান্ত থিওরিই হোক) সে সম্পর্কে গভীর পড়াশুনা করা। তাহলেই আমাদের সাহিত্য শক্তিশালী হবে।”১৩

অনুবাদ সাহিত্য প্রসঙ্গে

ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটাতে অনুবাদকর্মের সবিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ বিষয়টিও চোখ এড়িয়ে যায়নি শাহ আব্দুল হান্নানের। তিনি আমাদের এই অনুবাদ সাহিত্যের প্রতিও আলোকপাত করেন। একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন, “বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতিতে অনুবাদ সাহিত্য একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। অনুবাদ ক্ষেত্রে যে কাজ হয়েছে, বিশেষ করে বেশকিছু বিশ্বখ্যাত তাফসীর এরই মধ্যে অনূদিত হয়েছে। মাওলানা মওদূদীর তাফসীর তাফহীমুল কুরআন অনুবাদ হয়েছে। সাইয়েদ কুতুবের তাফসীর ফি জিলালিল কুরআন অনুবাদ হয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীর ও মুফতি শফীর তাফসীর মারেফুল কুরআনসহ অন্য আরো কিছু উল্লেখযোগ্য তাফসীর অনুবাদ হয়েছে। অনুবাদ বাদে এই সময় বাংলায় মূল তাফসীরও লেখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মাওলানা আকরাম খাঁর তাফসীরসহ আরো বেশ কিছু তাফসীরের কথা বলা যায়। প্রসঙ্গত এক্ষেত্রে গিরীশচন্দ্র সেনের নামও এসে যায়। তাফসীরের পর সিহাসিত্তাসহ উল্লেখযোগ্য হাদীস গ্রন্থের অনুবাদের কথা উল্লেখ করা যায়। এছাড়া বেশ কিছু ইসলামী বইয়ের অনুবাদও হয়েছে। তবে হাদীস গ্রন্থগুলোর অনুবাদ হলেও হাদীস গ্রন্থের টিকা (Commentry) সমূহের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হয়নি। এখন পর্যন্ত বোখারী, মুসলিমের যে সমস্ত কমেন্টারি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রয়েছে সেগুলোর পুরোপুরি অনুবাদ হয়নি। এ কথা অবশ্য বলা ভালো যে, আজকে কমেন্টারি অনুবাদ করতে গেলে নতুন করে টীকা যোগ করার (Annotation) প্রয়োজন হবে। কেননা তৎকালীন ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা ছিল, পরিস্থিতি আলাদা ছিল, যেটা তাদের টীকা মতামতে প্রবেশ করেছে। সেদিক থেকে আজকে তার অনুবাদ করতে গেলে তার অ্যানোটেশন লাগবে। তার নতুন করে নোট দিতে হবে। ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে ইমাম গাজ্জালীর কিছু অনুবাদ হলেও ইবনে খালদুন, আল কিন্দি, আল ফারাবী, ইবনুল আরাবী- এঁদের বইয়ের তেমন অনুবাদ হয়নি। আধুনিক লেখকদের মধ্যে ড. ইউসুফ আল কারদাভীর কিছু বইয়ের অনুবাদ হয়েছে। অনুবাদ হয়েছে মাওলানা মওদূদী, ড. মরিস বুকাইলি, আল্লামা আসাদ, সাইয়দ কুতুব, মোহাম্মদ কুতুবের বইয়ের। অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে ড. ত্ব-হা হোসাইন, ড. নাজীব কিলানী, নসীম হিজাযীর বইয়ের অনুবাদ হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামের উপর বাংলা ভাষায় কয়েক হাজার বই লেখা হয়েছে। এর মধ্যে মাওলানা আকরাম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, মাওলানা আবদুর রহীম সাহেবের মত চিন্তাবিদদের লেখাগুলো মানসম্পন্ন হলেও অন্যান্য অধিকাংশ লেখাই নিম্নমানের। এই গুলোকে নোটবুক বলে গণ্য করতে হবে।”১৪

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় মুসলিম দেশ। প্রথম ইন্দোনেশিয়া, দ্বিতীয় পাকিস্তান, তৃতীয় বাংলাদেশ, বর্তমানে। একসময় বাংলাদেশ দ্বিতীয় ছিল। আজ সেই দেশের ইসলামী সাহিত্য লেখার এবং অনুবাদের এই অবস্থা। ড. কারদাভী, ড. আব্দুল হামিদ আবু সুলেমান, ড. তাহা জাবির আল আলিওয়ালি, মোহাম্মদ আল গাজ্জালী, ড. খুরশীদ আহমদ, ড. ওমর চাপরার লেখার সাথে তুলনামূলক বিচার করলে আমাদের অবস্থান বুঝা যাবে। তখনই আমরা আমাদের ভাষার মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণীয় ও প্রসারিত করতে ভূমিকা রাখতে পারবো।”১৫

ভাষার আন্তর্জাতিকীকরণ

ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়ার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। এই বিষয়টিও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, “একটি ভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি করার দুটি পদ্ধতি থাকে। একটি ভাষা যদি নিজেই আরেকটি দেশের ভাষায় পরিণত হয়, একেবারে স্থানীয় ভাষা হয়ে যায়। আর একটি হলো, কোনো ভাষা যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয়। যেমন আরবীর ক্ষেত্রে কোরাইশদের ভাষা মধ্যপ্রাচ্যের পুরা অঞ্চলের ভাষা হয়ে গেছে। সেটা একটা পথ। অথবা আমরা যেমন দেখি ইংরেজি বিশ্বের প্রায় একশ’টি দেশের রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। আমরা এখনো দেখি ভারত ও পাকিস্তানের অফিসের ভাষা ইংরেজি। কিন্তু আমরা বাংলা ভাষাকে আমাদের অফিসিয়াল ভাষা করতে পেরেছি। যাই হোক, এই ক্ষেত্রে বাংলাভাষা অন্য একটি এলাকা দখল করে ফেলবে সে সম্ভাবনা নেই। কাজেই, বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করার পদ্ধতি একটাই, সেটা হলো অনুবাদ। আমাদের যা কিছু ভালো কাজ হয়েছে সেগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার। বিশেষ করে গল্প, কবিতা, ও উপন্যাস তথা সৃজনশীল সাহিত্য। গল্প, উপন্যাস, কবিতা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আবেগকে উদ্বোধিত করে। সুতরাং আমাদের ভালো গল্পগুলোর অনুবাদ হওয়া দরকার। গল্পের সাথে সাথে শক্তিশালী উপন্যাসগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার। পাওয়ারফুল কবিতাগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার। সেই সাথে যদি জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা কোনো অরিজিনাল কাজ করে থাকি- যদিও আমি দেখছি না- সেগুলো অনুবাদ হওয়া দরকার। এর জন্য রাষ্ট্রের এবং সরকারের একটা দায়িত্ব আছে। সাহিত্যিকদেরও একটা দায়িত্ব আছে, এই জন্য সংগঠন থাকা দরকার। বাংলা একাডেমি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মার্কেটিং (Marketing), অনুবাদ (Translation), প্রচার (Campaign) ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আর অনুবাদ শুধু ইংরেজিতে নয় অন্য ভাষাতেও হতে হবে। ইংরেজিতে করলে সুবিধা হলো অন্যভাষায় রূপান্তর করা সহজ হয়। আমাদের দেশে ইংরেজি জানা লোক অনেক আছে। কিন্তু জার্মান জানা লোক অতো নেই। অন্যান্য ভাষা জানা লোক ধরতে গেলে নেই-ই। সুতরাং অনুবাদ ইংরেজিতে করলে এবং মার্কেট হয়ে গেলে সেখান থেকে অটোমেটিক অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হয়ে যাবে। আর একটা পদ্ধতি হতে পারে, কয়েকটি বিশেষ ভাষায়, যেগুলোতে বিশ্বের বিরাট এক অংশ কথা বলে, যেমন চাইনিজ। কিছু চাইনিজ জানা লোক আমাদের আছে অথবা রাশিয়ায় পড়াশুনা করা রুশ জানা লোক আমাদের কিছু আছে। তাদের মাধ্যমে যদি আমরা অনুবাদ করি তাহলে সেটা একটা পদ্ধতি হতে পারে। সেটা করা উচিতও বলে আমি মনে করি। তেমনি ফ্রেঞ্চ জানা কিছু লোক আমাদের থাকতে পারে। তাদের মাধ্যমেও সেই ভাষায় আমরা সরাসরি অনুবাদ করতে পারি। তবে ইংরেজি করলে ইংরেজি থেকে অন্যান্য ভাষায় পুনরায় অনুবাদের সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের ভাষাও শিক্ষা দেয়া হয়। সবচেয়ে ভালো হবে যদি সরকার বাংলা একাডেমি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভিতর একটা করে অনুবাদ ব্যুরো খুলে ফেলে। আলাদা নতুন কোন সংগঠন করতে গেলে নানান ধরনের সমস্যা চলে আসে। তাদের একটা উইং (Wing) খুলে ফেলা বর্তমান কাঠামোর (Existing structure) মধ্যে সহজ হবে।”১৬

উপসংহার

শাহ আব্দুল হান্নানের চিন্তাধারায় আমরা ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গটি উদ্ভাসিত দেখতে পেলাম উপরোক্ত আলোচনায়। ভাষা ও সাহিত্যকে জীবিত রাখা এবং একে সার্থকভাবে কাজে লাগানোর উপায়-পদ্ধতি তিনি অত্যন্ত সহজ করে তুলে ধরেন এই আলোচনায়। কী বিস্ময়কর চিন্তার অধিকারী ছিলেন তিনি! মানবজীবনের ব্যবহারিক প্রায় প্রতিটি দিকের প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল। পরবর্তী প্রজন্মের দায়িত্ব হবে তাঁর এই দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সুযোগকে কাজে লাগানো।

তথ্যনির্দেশ
১. বাংলা সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা (সাহিত্য সংকলন), সম্পাদক আবদুল মান্নান তালিব, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা, জানুয়ারি ২০০৮।
২. প্রাগুক্ত।
৩. প্রাগুক্ত।
৪. প্রাগুক্ত।
৫. প্রাগুক্ত।
৬. প্রাগুক্ত।
৭. প্রাগুক্ত।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. প্রাগুক্ত।
১০. ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মারক (১৯৫২-২০০২), সম্পাদক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম, ঢাকা সাহিত্য-সংস্কৃতি কেন্দ্র, জুলাই ২০০২।
১১. প্রাগুক্ত।
১২. প্রাগুক্ত।
১৩. প্রাগুক্ত।
১৪. প্রাগুক্ত।
১৫. প্রাগুক্ত।
১৬. প্রাগুক্ত।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গ্রন্থকার

SHARE

Leave a Reply