ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষা – সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

বাংলা ভাষা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা; যা দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা। মাতৃভাষীর সংখ্যায় বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের চতুর্থ ও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তর ভাষা। বাংলা সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। এ ছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, উড়িষ্যা রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাভাষী মানুষ রয়েছেন। ভারতে হিন্দির পরেই সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা বাংলা। সারা বিশ্বে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ দৈনন্দিন জীবনে ‘বাংলা’ ব্যবহার করেন। বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছর পুরনো। চর্যাপদ বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। অষ্টম শতক থেকে বাংলায় রচিত সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মধ্য দিয়ে অষ্টাদশ শতকের শেষে এসে বাংলা ভাষা বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
বাংলা একটি সমৃদ্ধশালী ভাষা হলেও এ ভাষার পথচলা অতীতে কখনোই মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে মধ্য যুগে এই ভাষা নানাবিধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। যেহেতু এটি আর্য ভাষা তাই অনার্য হিন্দুরা এই ভাষার শিখন, লিখন ও ব্যবহারকে ধর্মবিরোধী মনে করতেন। এমনকি বাংলা ভাষার চর্চাকারীরা ‘রৌঢ়ব’ নামক নরকের অধিবাসী হবেন বলে মনে করা হতো। এ বিষয়ে মধ্যযুগের একশ্রেণির মুসলমানও কম কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন না। তারাও মনে করতেন যেহেতু বাংলা ভাষা আর্যদের ভাষা তাই এই ভাষার চর্চা করা ইসলাম বিরুদ্ধ। এই বিতর্ক যে কতটা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা মধ্যযুগের কবি জৈনুদ্দিনের ‘কেফায়াতুল মুসাল্লিন’ গ্রন্থের ভূমিকা থেকে অনেকটা অনুমান করা যায়। তিনি তার গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন-
‘আরবিতে সকলে ন বুঝে ভালো-মন্দ
তে কারণে দেশী ভাষে রচিলু প্রবন্ধ,
মুসলমানি শাস্ত্র কথা বাঙ্গালা করিলু
বহু পাপ হইল মোর নিশ্চয় জানিলু,
কিন্তু এমন আশা আছে মনান্তরে
বুঝিয়া মোমিন দোয়া করিবে আমারে,
মোমিনের আশীর্বাদে পুণ্য হইবেক
অবশ্য গফুর আল্লাহ পাপ ক্ষেমিবেক’॥
আর এই বিতর্কের তির্যক সমালোচনা করেছিলেন মধ্যযুগের আরেক মুসলিম কাব্য প্রতিভা কবি আব্দুল হাকিম। তিনি তার কবিতায় লিখেছেন, ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। আর এই বিতর্কের মধ্যেই বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশ ঘটেছিল মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের হাত ধরেই।
নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা ও ঔপনিবেশিক শাসন পেরিয়ে বাংলা ভাষা যখন মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে তখনই পাকিস্তানি শাসকচক্র এই ভাষাকে নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ফলে পূর্ব বাংলার মানুষদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় নতুন করে আন্দোলন শুরু করতে হয়েছে। আর এ জন্য বুকের তাজা রক্তও ঢেলে দিতে হয়েছে এ দেশের ছাত্র-জনতাকে। মূলত ভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলার একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলেও এর বীজ বপিত হয়েছিল বহু আগেই। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হলে পাকিস্তান ও ভারত নামক দু’টি স্বাধীন জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটে। পাকিস্তানের ছিল দু’টি অংশ। পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের ব্যবধানে পাকিস্তানের দু’টি অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে পার্থক্য ছিল বিস্তর। ফলে উভয় পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ছিল অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তাই স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই ভৌগোলিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত পাকিস্তান নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত ছিল। আর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। মূলত পূর্ব বাংলার জনমতকে উপেক্ষা করেই ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছিল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সঙ্গত কারণেই পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। আর এর পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে। আর মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বপ্রথম আন্দোলন শুরু করেছিল ইসলামী আদর্শভিত্তিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’। নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। পরে বামপন্থীরাও এই আন্দোলনে যোগ দেন এবং এক সময় তা সর্বাত্মক গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। তারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসভার আয়োজন করে। এ মাসেই ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। যার আহবায়ক ছিলেন তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া। পরের বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পরিষদ সদস্যদের উর্দু বা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস দলের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এ প্রস্তাবে সংশোধনী এনে বাংলাকেও পরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন বিরোধিতা করলে তা বাতিল হয়ে যায়। এ খবর ঢাকায় পৌঁছলে ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন পরিচালনার জন্য শামসুল আলমকে আহবায়ক করে একটি নতুন ‘রাষ্ট্রভাষা পরিষদ’ গঠিত হয়।
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন এবং বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এ সময় সারা পূর্ব পাকিস্তানেই ভাষা আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৫০ সালে আব্দুল মতিনকে আহবায়ক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, প্রদেশের সরকারি কাজকর্মে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে তা প্রদেশের জনগণই ঠিক করবে। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ৩১ জানুয়ারি সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের এক সভা ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। যার আহবায়ক ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা ঠেকানোর জন্যই তদানীন্তন সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। পরদিন সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একাংশে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা হয়। ছাত্ররা পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলের ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে রফিক উদ্দিন আহমদ, আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত শাহাদাত বরণ করেন।
পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ছিল গণবিক্ষোভ ও পুলিশি নির্যাতনের দিন। বিক্ষুব্ধ জনতা নিহতদের গায়েবানা জানাজা আদায় ও শোকমিছিল বের করে। মিছিলের ওপর পুলিশ ও মিলিটারি পুনরায় লাঠি, গুলি ও বেয়োনেট চালায়। এতে শফিউর রহমানসহ কয়েকজন শহীদ হন এবং অনেকে আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন। ছাত্ররা যে স্থানে গুলির আঘাতে নিহত হয় সেখানে ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে এই অস্থায়ী নির্মাণের জায়গায় একটি কংক্রিটের স্থাপনা নির্মিত হয়।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের গণপরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিল পাস করে। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন অব্যাহত ছিল। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনুমোদনের মাধ্যমে এই আন্দোলন তার লক্ষ্য অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬) এক পর্যায়ে এর সদস্য ফরিদপুরের আদেল উদ্দিন আহমদের দেয়া সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
ভাষা আন্দোলনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বহু সংগঠন ও ব্যক্তির অবদান থাকলেও তমদ্দুন মজলিস ও তার প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের তরুণ শিক্ষক আবুল কাসেমের অবদান ছিল অনন্য। তমদ্দুন মজলিস ভাষার দাবিকে আন্দোলনে রূপান্তর করেছিল এই সংগঠনের মাধ্যমে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৬ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি ছাত্রসভা হয়। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত গবেষক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী লেখেন, ছাত্রদের এক বিরাট সভা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই হলো সর্বপ্রথম সাধারণ ছাত্রসভা। (পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্কৃতি আন্দোলন, পৃষ্ঠা-২৯১)
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে গঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। অ্যাডভোকেট গাজীউল হকের ভাষায়, ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রশীদ বিল্ডিং নামে যে বিল্ডিং ছিল সেখানে একটি কক্ষে (তমদ্দুন মজলিসের অফিসে) একটি সভা হয়। প্রতিনিধি স্থানীয় ছাত্র, প্রফেসর ও বুদ্ধিজীবীরা এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। ঐ সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই সর্বপ্রথম সংগ্রাম পরিষদ… পরিষদের আহ্বায়ক নিযুক্ত হন তমুদ্দন মজলিসের অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়া’। (উদ্ধৃতি: ড. সিদ্দিকী, পৃষ্ঠা ২৯৩-২৯৪)।
সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সময় শামসুল হকের নেতৃত্বে পরিচালিত মুসলিম ছাত্রলীগের অল্প কয়েকজন কর্মী উপস্থিত ছিল। (সিদ্দিকী পৃষ্ঠা ৫৪, আবুল কাসেম, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪২) ড. সিদ্দিকী লেখেন, ‘এ সময় ছাত্রলীগের মধ্যে দু’টি উপদলের সৃষ্টি হয়। শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্ব অস্বীকার করে শামসুল হক, আজিজ আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, নঈমুদ্দীন আহমদ প্রমুখ বেরিয়ে এসে পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। এই উপদল ভাষা আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন জানায়। (পৃষ্ঠা ৫২-৫৩, আবুল কাসেম, পৃষ্ঠা ১৭)।
২ মার্চ ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। যাতে ছিল তমদ্দুন মজলিস, পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণআজাদী লীগ, পূর্বপাকিস্তান মুসলিম লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ। আহ্বায়ক হলেন শামসুল আলম। যিনি তমদ্দুন মজলিসের নেতা ছিলেন। ১৫ মার্চ প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসে আট দফা চুক্তি সই করেন। যাতে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করলেন যে, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার বিষয় গণপরিষদে তোলা হবে। এই বৈঠক হয় বর্ধমান হাউজে যেখানে আবুল কাসেম, কামরুদ্দীন আহমদ প্রমুখ ছিলেন। বিকেলে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রাঙ্গণে জনসমাবেশে আবুল কাসেম ও কামরুদ্দীন চুক্তির কথা ঘোষণা করলেন। এইভাবে ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে সাফল্য আসে। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ২১ মার্চ ১৯৪৮ উর্দুর পক্ষে বললেন। এর প্রতিবাদে ২২ মার্চ আবুল কাসেম ও শাহেদ আলী বিবৃতি দেন। (বরাত: দৈনিক আজাদ ২৪ মার্চ ১৯৪৮)।
২৪ মার্চ ১৯৪৮ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এতে ছিলেন আবুল কাসেম, কামরুদ্দীন আহমদ প্রমুখ। ফলাফল অবশ্য হয় শূন্য। তবে মজার ব্যাপার এই যে স্মারকলিপিটি দেয়া হয় তাতে বলা হয়- ‘বাংলা ভাষার শব্দ সম্পদের মধ্যে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ পারসিক ও আরবি ভাষা হইতে গৃহীত’। (যুগান্তর, ২ এপ্রিল ১৯৪৮)।
মহান ভাষা আন্দোলন তমুদ্দন মজলিসের নেতৃত্বে শুরু হলেও একশ্রেণীর বামপন্থী মোটেই স্বীকার করতে চায় না বরং এ জন্য তারা একক কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণে তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ হয় না। অথচ খোদ প্রধানমন্ত্রীও ভাষা আন্দোলনে তমুদ্দন মজলিসের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্বীকার করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ বাংলা একাডেমির বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস এবং আরো কয়েকটি ছাত্রসংগঠন মিলে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। (নয়া দিগন্ত ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। প্রধানমন্ত্রী গত কয়েক বছরের ভাষা দিবসের বাণীতে তমদ্দুন মজলিসের অবদানের কথা বারবার বলেছেন।
অথচ এক শ্রেণীর লেখক তমদ্দুন মজলিসের অবদানকে খাটো করে দেখতে চান। কিন্তু ইতিহাস সে দাবির যথার্থতা স্বীকার করে না। ড. সিদ্দিকীর ভাষায়, কংগ্রেস কর্মীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবে আঁতকে ওঠে। আর কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন জানিয়ে দেয়, এই আন্দোলন সমর্থন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড ড. মোজাফফর আহমদ ভাষার দাবি সংবলিত স্মারকলিপিতে সই করতেও অস্বীকৃতি জানান। (পৃষ্ঠা ৫২, আবুল কাসেমের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ১৭-এর ওপর ভিত্তি করে মন্তব্য)।
মহান ভাষা আন্দোলনে তমুদ্দন মজলিস অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করলেও কোনো কোনো লেখক আবুল কাসেমকে ভাষা আন্দোলনের পুরোধা বলতে চান না। অথচ তার বাসা ১৯ নম্বর আজিমপুর ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রশীদ বিল্ডিংয়ে তমদ্দুন মজলিসের অফিস ছিল ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র। আর আবুল কাসেম শুধু ভাষা আন্দোলনের পুরোধাই ছিলেন না বরং তিনি বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে হাতে-কলমে দেখিয়েছেন যে, মাতৃভাষায়ও উচ্চশিক্ষা সম্ভব।
আমাদের দেশের নেতিবাচক আন্দোলনের খপ্পরে পড়েছে ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন। এমনকি ভাষাসৈনিকদের তালিকা প্রস্তুত করতেও হীনমন্যতার পরিচয় দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সরকারি তালিকায় আবুল কাসেমের নাম সর্বনিম্নে। অধ্যাপক শাহেদ আলীর নামের নিচে তার বেগম চেমন আরার নাম। আর এমন কয়েকজনের নাম খুব উপরে ঠেলে দেয়া হয়েছে, যারা ভাষা আন্দোলনের কোনো কমিটিতেই ছিলেন না। এটা তো ইতিহাস বিকৃতি। (প্রথম আলো, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২)।
প্রতিষ্ঠিত ভাষা গবেষক এম এ বার্নিক ৭৮৩ পৃষ্ঠার জাতীয় পুনর্জাগরণে তমদ্দুন মজলিস নামক বিশাল গবেষণা গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ক্রিয়া ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। তমদ্দুন মজলিস উক্ত আন্দোলনের সূচনা করে। সুতরাং জাতীয় ইতিহাস তমদ্দুন মজলিসের একটি গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান রয়েছে।… বাংলা একাডেমি, ইসলামিক একাডেমি, বাঙলা কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ার পেছনে তমদ্দুন মজলিসের সাংগঠনিক কার্যক্রম লক্ষণীয়।’ বার্নিক নিরপেক্ষভাবে সঠিক কথাটিই লিখেছেন। ইতিহাসকে চেপে রাখা যায় না। তমদ্দুন মজলিস এখনো বেঁচে আছে। তারা দেশ, জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদি নিয়ে তাদের সাধ্যমতো কাজ করে চলেছে। তারা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধশালী দেখতে চায়।
ভাষা আন্দোলনের লড়াইয়ে প্রথম কাতারের একজন ভাষাসৈনিক ছিলেন মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম। তিনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ডাকসুর সাবেক জিএস। সময়ের সাড়া জাগানো ছাত্রনেতা ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে কারা নির্যাতিত হয়েছেন তিনি। তিনি ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। শেখ মুজিব কর্তৃক ’৬৬ সালের ছয় দফা দাবি তৈরিতে অংশ নেয়া ২১ সদস্যের অন্যতম ছিলেন তিনি। পাকিস্তানে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কপ ((COP- Combined Opposition Party), পিডিএম (PDM- Pakistan Democratic Movement), ডাক (DAC- Democratic Action Committee) ইত্যাদি আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য সকল দলের নেতাদের সাথে অংশগ্রহণ করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে সংগ্রাম শুরু হয়, তার সাথে মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম প্রথম থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে তাকে কারাবরণসহ অনেক নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছে। এ দেশের ছাত্র-জনতা যখন বুঝতে পেরেছিল যে, পাক শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে, বাংলা ভাষাকে নির্বাসনে পাঠানোর যে আয়োজন করছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কার্যত অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। এমন এক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিশেষ করে ছাত্ররা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে এই সাহসী বীরপুরুষ প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে শরিক হন। এই দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালিত হয়। হরতাল সফল করতে অধ্যাপক গোলাম আযম ডাকসুর জিএস হিসেবে ছাত্রদের সংগঠিত করেন, বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে পিকেটিংয়ের জন্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নেন। হরতালে পিকেটিংয়ের সময় তাকেসহ ১০-১২ জনকে তেজগাঁও থানা পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ বিক্ষোভের মূলে ছিল প্রধানত ছাত্ররা। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সামনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি পাঠ করেন। যা তার ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণের উল্লেখযোগ্য দলিল। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষয়িষ্ণু ও নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই মহান ভাষা আন্দোলনে অধ্যাপক গোলাম আযমের অবদানের কথা স্বীকার করা হয় না। কিন্তু ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায়নি এবং যাবেও না। ভাষা আন্দোলনের একজন অগ্রসৈনিক হিসেবে মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের নাম ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মহান ভাষা আন্দোলনের সফলতা আমাদের জাতীয় জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন। সঙ্গত কারণেই ১৯৫২ সালের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য বাঙালিদের সেই আত্মত্যাগকে স্মরণ করে দিনটি উদযাপন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। যা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন।
অনেক ত্যাগ ও কোরবানির বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে উচ্চকিত করতে পারলেও এ ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতাও কম নয়। ভাষা আন্দোলনের অর্ধশতাব্দীকাল অনেক আগেই অতিক্রান্ত হলেও বাংলা ভাষার ব্যবহার এখন পর্যন্ত সর্বজনীন করা সম্ভব হয়নি। দেশের উচ্চ আদালতগুলোতে এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় রায় লেখা হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল বিদ্যা, বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ ও আইনশাস্ত্রসহ বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থগুলো আজও বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি বরং এসব আজও ইংরেজি ভাষায় বৃত্তেই আবদ্ধ রয়েছে। তাই বাংলা ভাষার যথাযথ বিকাশ ও ভাষাশহীদদের মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচলন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মূলত মাতৃভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ যতটা সহজ হয়, অন্য ভাষায় তা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাই কবিয়াল রামনিধি গুপ্তের ভাষায় বলতে হয়-
‘নানান দেশের নানান ভাষা
বিনে স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা।
কত নদী সরোবর কি বা ফল চাতকীর
ধারাজল বিনে কি মেটে কি তৃষ্ণা’॥
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply