ভাষা আন্দোলন থেকে আমাদের স্বাধীনতা । ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ভাষা আন্দোলন থেকে আমাদের স্বাধীনতাপাখির কিচিরমিচির, নদীর কলতান, বাতাসের শনশন শব্দ, পশুদের স্বকীয় শব্দের ডাক- সবকিছুই স্বতন্ত্র দ্যোতনায় পরিচালিত। প্রত্যেকটি শব্দেরই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেকটি শব্দই আলাদা আলাদা অর্থবোধক চিন্তা প্রকাশ করে থাকে। বুঝার অক্ষমতার কারণে আমরা এগুলোকে আলাদা অর্থবোধক বিষয় হিসেবে উপস্থাপনে ব্যর্থ হই। মূলত এসব শব্দই ভাষা; যা ভাব প্রকাশের বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মানবসমাজেরও ভাব প্রকাশের প্রধানতম মাধ্যম ভাষা। যারা কথা বলতে পারে তাদের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যমই মুখের ভাষা। আর যারা মূক-বধির বা বাকপ্রতিবন্ধী তারা ভাব প্রকাশ করে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। তাই বলা যায়, ভাষা মানুষের মস্তিষ্কজাত একটি মানসিক ক্ষমতা যা ধ্বনিভিত্তিক বা লৈখিক রূপে বাকসংকেতে রূপায়িত হয়ে একই সমাজের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। পৃথিবীতে মোট ভাষার সংখ্যা সঠিকভাবে বলা সম্ভব না হলেও জাতিসংঘের একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে পৃথিবীতে প্রায় ৭০০০ বা তারও বেশি ভাষা আছে। এর মধ্যে বিশ্বের সর্বাধিক প্রচারিত ভাষা ১১টি। এগুলো হচ্ছে চাইনিজ, ইংরেজি, হিন্দি-উর্দু, স্প্যানিশ, আরবি, পর্তুগিজ, রাশিয়ান, বাংলা, জাপানি, জার্মান ও ফরাসি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বে এতো ভাষা থাকতেও হাতেগোনা এ কয়েকটি ভাষাতেই কথা বলেন পৃথিবীর প্রায় ৯৬ ভাগ মানুষ। ভাষাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে জটিল বা কঠিন ভাষা হিসেবে চীনের ম্যান্ডারিন ভাষা এবং আফগানিস্তানের পশতু ভাষার স্থান সবার আগে। সবচেয়ে বেশি ভাষা ব্যবহৃত হয় দু’টি দেশে। একটি পাপুয়া নিউ গিনি, যেখানে ৮৫০টিরও বেশি ভাষা রয়েছে। অপরটি ইন্দোনেশিয়া, যেখানে ৬৭০টি ভাষা লোকমুখে ফেরে।

ভাষার আন্তঃযোগাযোগ
ভাষার বৈশিষ্ট্য ও বিবিধ ভিন্নতা সত্ত্বেও সব ভাষার শব্দ ও বাক্যগঠনের সূত্রগুলো প্রায় একই ধরনের। সব ভাষাতেই বৈয়াকরণিক ক্যাটেগরি যেমন বিশেষ্য-বিশেষণ ক্রিয়া ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়। সব ভাষাতেই পুং বা স্ত্রী ইত্যাদি বিশ্বজনীন অর্থগত বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। সব ভাষাতেই না-বাচকতা, প্রশ্ন করা, আদেশ দেয়া, অতীত বা ভবিষ্যৎ নির্দেশ করা ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। মানুষের ভাষায় ভাষায় যে পার্থক্য, তার কোন জৈবিক কারণ নেই। যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানবশিশু পৃথিবীর যেকোনো ভৌগোলিক, সামাজিক, জাতিগত বা অর্থনৈতিক পরিবেশে যেকোনো ভাষা শিখতে সক্ষম। সব ভাষাই সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ভাষাও মানুষের মতোই গতিময়। কখনো ব্যাপক শব্দসম্ভার নিয়ে এগিয়ে যায়। আবার কখনো হারিয়ে ফেলে তার ঐতিহ্য। এভাবে প্রতিনিয়ত ভাষা ও ভাষায় শব্দের ব্যবহার পাল্টে যাচ্ছে। অনেক ভাষা অস্তিত্ব রক্ষায় অন্যের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে খর্ব হচ্ছে ভাষার স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। গবেষকদের মতে, প্রতি ১৫ দিনের মধ্যে একটি করে ভাষা পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাচ্ছে। আবার অনেক ভাষারই জন্ম হচ্ছে নতুন করে। এ জন্ম-মৃত্যুর সাথে অন্যভাষার সংশ্লিষ্টতা একটি অপরিহার্য বিষয়। অনেকগুলো ভাষা আছে যেগুলো একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষই ব্যবহার করতেন। বাস্ক, উস্কারা এ রকম অনেক ভাষাই ব্যবহারের অভাবে শেষ হয়ে গেছে।

ভাষা আন্দোলন থেকে আমাদের স্বাধীনতাআমাদের বাংলাভাষা
বাংলাভাষা দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা। এ অঞ্চলটিকে ঘিরেই বর্তমানে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ নামক আমাদের প্রিয় জন্মভূমিটি প্রতিষ্ঠিত। এ ছাড়াও ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গও এ অংশের স্মৃতিবহন করে। সেইসাথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়। এ ভাষার লিপিরূপ বাংলালিপি। এসব অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই বাংলা ভাষা প্রচলিত হওয়ায় এ ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। এ ভাষাভাষীর লোকসংখ্যা এখন চল্লিশ কোটির কাছাকাছি। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং ভারতের জাতীয় স্তোত্র এ ভাষাতেই রচিত। বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা ও সরকারি ভাষা বাংলা। এ ছাড়াও ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা বাংলা। এ ছাড়াও ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান ভাষা বাংলা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলাভাষা ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচি শহরে দ্বিতীয় সরকারি ভাষারূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাব্বাহ ঐ রাষ্ট্রে উপস্থিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ৫,৩০০ বাংলাদেশী সৈনিকদের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান করেছেন। তবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত বাংলাভাষার মধ্যে ব্যবহার, উচ্চারণ ও ধ্বনিতত্ত্বের সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে বাংলা ও তার বিভিন্ন উপভাষা বাংলাদেশের প্রধান ভাষা এবং ভারতে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। বাংলাভাষা আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশে এ ভাষার সমৃদ্ধি অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৫১-৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত বাংলাভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছিল।
বাংলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিকাশমান ভাষা হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলা ব্যাকরণ রচনার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভাওয়াল জমিদারিতে কর্মরত অবস্থায় পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্য আসসুম্পসাঁও সর্বপ্রথম ‘ভোকাবোলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা, এ পোর্তুগুয়েজ ডিভিডিডো এম দুয়াস পার্তেস’ নামক বাংলাভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদ ‘অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ গ্রন্থ নামক একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে ‘গ্রামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্’ নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন। তারপর থেকে আর থেমে এ নেই এ পথ চলার। আজ হাজারও ব্যাকরণের ভাষা আমাদের বাংলাভাষা। গানের ভাষা প্রাণের আমাদের বাংলাভাষা।

ভাষা আন্দোলন থেকে আমাদের স্বাধীনতাআমাদের ভাষা আন্দোলন ও গৌরবের স্বীকৃতি
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ ভাষা আন্দোনের মধ্যেই নিহিত ছিল এ কথা সর্বজনবিদিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মাঝে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে ভাষা সমস্যাটিও অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ফাগুনের এ মিষ্টি রোদেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শাণিত হয়েছিল অধিকার আদায়ের সংঘবদ্ধ শ্লোগান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একগুঁয়েমি আচরণের সমুচিত জবাব দিতেই রাজপথ শিমুল-পলাশের রঙে রঞ্জিত করেছে, ঢেলে দিয়েছে বুকের তাজা খুন। শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ অসংখ্য জীবন্তশহীদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আমাদের স্বকীয়তা ফিরে পেতে সক্ষম হয়েছিলাম। এ ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়, আমাদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ। আমরাই ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার গৌরব অর্জন করেছি। এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলাভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ সালে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইরকমভাবে বাংলাভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়। তবে ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার নজির বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন অঞ্চলের মানুষের নেই। মাতৃভাষার জন্য তাঁদের জীবনদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারির এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
জন্মগতভাবে মায়ের কোল থেকে যে ভাষা শেখা হয় তার মায়াই আলাদা। একান্ত আপনজনকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করার সুযোগ এ ভাষা থেকেই পেয়েছি। এ ভাষার লালনে সুলতানি ও মোগল আমলের মুসলিম শাসকদেরও রয়েছে অনন্য পৃষ্ঠপোষকতার গৌরব। কোন দুষ্টুচক্রের কথায় আমরা আমাদের এ ঐতিহ্যকে হারাতে দিতে পারি না। তাইতো আমাদের ফুঁসে ওঠা, আমাদের আন্দোলন, আমাদের রক্তঢালার প্রতিযোগিতা। উনিশশ বায়ান্ন সালে আমরা বিজয়ী হয়েছি। তখনও প্রমাণিত হয়েছে, জোর করে কোন মতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা মানুষ স্বকীয় আদর্শ নিয়েই বেঁচে থাকতে পছন্দ করে এবং তা করেই ছাড়ে। বায়ান্ন থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের যে অধিকার আমরা আদায় করেছি, নিজের ভাষাচর্চার যে স্বাধীনতা পেয়েছি সে পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চাই আজীবন। ধাপে ধাপে সমৃদ্ধ করতে চাই আমাদের প্রিয় বাংলাভাষাকে।
বায়ান্ন থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের যে অধিকার আমরা আদায় করেছি, নিজের ভাষাচর্চার যে স্বাধীনতা পেয়েছি সে পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চাই আজীবন। ধাপে ধাপে সমৃদ্ধ করতে চাই আমাদের প্রিয় বাংলাভাষাকে। কিন্তু আগ্রাসী হায়েনারা আমাদের এ পথচলা কখনো মসৃণ হতে দেয়নি। বিদেশী ভাষাগুলো নানা কৌশলে আমাদের ওপর চেপে বসেছে। ইংরেজি এখন দুনিয়ার চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জকে জয় করতেই হবে, তবে আমার মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়। কেউ কেউ আরবি ভাষাকেও বাংলাভাষার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুঁড়ে দিয়ে এক্ষেত্রে ইসলামচর্চাকে দোষারূপ করে থাকেন। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, ইসলামকে জানা শোনার জন্য আরবি ভাষাচর্চা প্রয়োজন হলেও বাংলাভাষায় ইসলামীজ্ঞান চর্চার যে সুযোগ আছে সেটাকে যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাভাষা বরং অনেকাংশে উৎকর্ষতার শীর্ষে পৌঁছতে সহায়ক হবে বৈকি। ইসলামের নানামুখী গবেষণা বাংলাভাষায় হলে ভাষার সম্প্রসারণ ও সমৃদ্ধি অনেক সহজ হবে। তবে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে হিন্দিসংস্কৃতির মাধ্যমে যে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক হিংস্র থাবা আমাদের ওপর পড়েছে তা থেকে উদ্ধারের কোন বিকল্প নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এ থাবায় পঙ্গু হয়েছে বলা যায়। সেখানকার শিশুরা এখন আর বাংলাভাষা বলতেই পারে না বলা চলে। শিক্ষিত শ্রেণি থেকে মুদি দোকানদাররা পর্যন্ত সে জালেই বন্দি। হয়তো হিন্দি নতুবা ইংরেজি। বাংলাভাষার জন্য এখন সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করতে পারে একমাত্র বাংলাদেশই। তাই আগামীতে বাংলাদেশকেই বাংলাভাষার সমৃদ্ধি ও সাম্প্রসারণে শুধু নয় বাংলাভাষার রক্ষার জন্যও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য চাই মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা; নিজেদের স্বকীয়তা এবং প্রকৃতভাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

আমাদের স্বপ্ন-স্বাধীনতা
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। ইতিহাসের নতুন সূর্য উদয়ের বছর এটি। হাজারো উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় কেটেছে গোটা বছর। জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর। প্রত্যেকটি সেক্টরে যোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে চলে মুক্তিসংগ্রাম। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মতো অনেক সাহসী প্রাণের গর্জনে কেঁপে ওঠে পাকবাহিনীর অন্তর। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় জেলে চাষি মুটে মাঝি থেকে শুরু করে দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষেরাও নেমে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মুক্তির লাল সূর্য, স্বপ্নের স্বাধীনতা, আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা।
বাংলাদেশ আমাদের হৃদয়ের ভূখণ্ড, ভালোবাসার ঠিকানা। অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এ প্রিয় জন্মভূমিকে আমরা মুক্ত করেছি ব্রিটিশের কবল থেকে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও আমাদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছরের ইতিহাসে অনেক চড়াই উতরাইয়ের মাঝেও অন্তত অর্ধেক সময় শিশুগণতন্ত্রের সাহচার্য পেয়েছি। কিন্তু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক ধারার বিলুপ্তি ঘটিয়ে কাক্সিক্ষত পদযাত্রা শুরু হয়েও আবারো প্রায় কুড়ি বছর পরে সেই গণতন্ত্র আবারো হুমকির সম্মুখীন হবে এটা অন্তত জনগণ মেনে নিতে পারছে না।
বর্তমান সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের একক দাবিদার সংগঠন। অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে জাতিকে মুক্ত করে অর্থনৈতিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং স্বকীয় বিশ্বাস আর সংস্কৃতির আদলে দেশ পরিচালনা করাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। আমাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীতে পশ্চিম পাকিস্তানের সিল মেরে আমাদের কাছেই বিক্রি করা হতো বেশি দামে; শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে দেশের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছিল; এ সকল অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি চেয়েছিলাম। আর তার ফলেই এতো রক্তপাত, এতো ধ্বংসযজ্ঞ। জাতির বীর সন্তানদের বেহেসেবি ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনদেশে আমরা কী দেখলাম? দেখলাম মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক নির্বিচারে মুক্তিযোদ্ধা হত্যা। সেক্টর কমান্ডারের মতো বড় বড় দায়িত্ব পালন করেও তিনি স্বাধীন দেশে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাল কাটাচ্ছেন। এমন চিত্র তো আমরা দেখতে চাইনি?!
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের এ ঋণ স্বীকার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরই তারা বাংলাদেশের শান্তি বিঘিœত করার প্রয়াসে স্বাধীন শিশুরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে পানির অভাবে শুকিয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় সময়ে পানিতে ডুবিয়ে মারার জন্য সর্বনাশা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে। সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলসহ বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা এবং মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো দেশপ্রেমিক কিছু নিঃস্বার্থ মানুষ সেই লুটপাট ও শোষণ এবং ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুললেও সেদিন বন্ধুত্বের কৃতজ্ঞতায় শাসকশ্রেণী এর ভয়াবহতা নিয়ে হৈ হুল্লোড় না করে বরং অনেকাংশে নীরব থেকে ছিল বলেই আজ দেশ যেমন অর্থনীতিতে অন্তরসারশূন্য তেমনি পদ্মানদীর তীরবর্তী দীর্ঘ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত। পানির হিসসা নিয়ে হাজারো চুক্তি ও চেঁচামেচি করলেও তা পদ্মার বালির পাহাড় অতিক্রম করে না। আজ স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরে সেই প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রটি মেঘনার উজানে ফারাক্কার মতো টিপাই মুখে বাঁধ নির্মাণের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে। ফারাক্কা যেমন উত্তর বাংলাকে মরুভূমি করেছে, টিপাই মুখে বাঁধের প্রভাবে পুরো পূর্ববাংলাও মরুভূমি হয়ে পড়বে। তখন আমাদের আর কিছুই থাকবে না।
পরিশেষে বলা যায়, দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করলাম স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলো আমাদের বিজয়। আর থাকলো না কোন পাকিস্তানি দলনপীড়ন, থাকলো না কোন হানাদার, থাকলো না কোন হিংস্র দানব। বাংলাদেশের সমস্ত মানুষ আমরা হয়ে গেলাম ভাই ভাই। আমরা স্বপ্ন দেখতে থাকলাম ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন জীবন যাপনের। কিন্তু ঠুনকো ও ক্ষুদ্র স্বার্থসংঘাত যেন আমাদের পিছু ছাড়েনি। স্বাধীন সোনার বাংলাদেশে আবারো বিদেশী আধিপত্য ও ষড়যন্ত্রে ছায়া আবর্তিত হতে থাকলো। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আবারো শুরু হলো বিভাজন; রাজনৈতিক সংঘাত আর দ্বিধাবিভক্তি। অথচ আমরাতো সবাই একই দেশের মানুষ। কেন এ বিভাজন? তাই আমরা কোন বিভাজন চাই না। বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য আমাদের স্বদেশ জুড়ে। টিভি খুললেই ভিনদেশী চ্যানেলের আধিপত্য। বিনোদন মানেই ভিন্ন ভাষার গান-নাটক-সিনেমা। সংস্কৃতি মানেই অবিশ্বাসী ঘরানার মডেল। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে যে ভাষাগত-সাংস্কৃতিক কালোথাবা আমাদের ওপর পড়েছে তা উদ্ধারের কোন বিকল্প নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এ থাবায় অনেকাংশেই পঙ্গু হয়ে গেছে। সেখানকার শিশুরা এখন আর বাংলাভাষা বলতেই পারে না বলা চলে। বাংলাভাষার জন্য এখন সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করতে পারে একমাত্র বাংলাদেশই। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে ডোরেমন, মটুপাতলু আর সিবার মতো হাজারো আগ্রাসন চলছে তাতে শিশুরা যেমন বাংলার চেয়ে হিন্দিতেই বেশি পারদর্শী হয়ে পড়েছে তেমনি হিন্দি গান ও সিনেমার কবলে বাংলাদেশের যুবসমাজও আটকে গেছে বলা চলে। হিন্দি ও পশ্চিম বাংলার সিরিয়ালে নারীদের মনমস্তিষ্ক আটকে যাওয়ার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কাছে ঐতিহ্যের কোন শিক্ষা পাচ্ছে না। স্বাধীনতা মানেই তো দেশের কল্যাণে নিজের কল্যাণ খোঁজা। স্বাধীনতা মানেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি। স্বাধীনতা মানেই বিশ্বাসের পতাকা হাতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে সামনে এগিয়ে চলা। স্বাধীনতা মানেই তো আমার স্বদেশ আমার জীবন। স্বাধীনতা মানেই আমার সবুজ স্বপ্নের বিনির্মাণ। ছেলেহারা মায়ের মতো আজো আমরা দৃপ্ত শপথে সে পথেই চেয়ে আছি। তবে এ জন্য চাই মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা; নিজেদের স্বকীয়তা এবং প্রকৃতভাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমরা একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ চাই। যেখানে আমার সন্তান থাকবে দুধে ভাতে, আমাদের সন্তানরা পাবে সোনালি স্বপ্নের ভোর। নিশ্চিত হবে আমাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। প্রতিষ্ঠিত থাকবে আমাদের বিশ্বাস, বজায় থাকবে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা।
লেখক : কবি ও গবেষক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply