ভাসানচরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু শিবির হলো কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে দেশটির সেনা ও চরমপন্থী বৌদ্ধদের চালানো গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের পটভূমিতে সেখান থেকে কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসতে বাধ্য হন এবং তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। এই নিয়ে বর্তমানে কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখে। ঘিঞ্জি পরিবেশে ও পাহাড় ধসের ঝুঁকি নিয়ে গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন সেখানে। নানা অভাব-অনটন ও হতাশা নিয়ে বসবাসরত রোহিঙ্গারা যেকোনো সময় জঙ্গিবাদ কিংবা নানা অপরাধে জড়াতে পারেন এবং বর্ষার মৌসুমে বড় ধরনের পাহাড় ধসের কবলে পড়তে পারেন- এমনই যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে এক লাখকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার গত ৪ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে প্রথম দফায় ১,৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করে। অবশিষ্টদেরও যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পাঠানো হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়।

এর আগে বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২,৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১৩ হাজার একর আয়তনের এবং বঙ্গোপসাগরের বুকে আনুমানিক ২০ বছর আগে জেগে ওঠা ওই দ্বীপে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করে সেখানে এক লাখ মানুষের বসবাসের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে।
জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল ও ফোরটিফাই রাইটসসহ কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এই স্থানান্তরের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মূল দাবি হলো এই ধরনের স্থানান্তরের আগে অবশ্যই জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ওই দ্বীপে একটি সরেজমিন জরিপ চালানো। ওই দ্বীপটি বসবাসের জন্য কতটা নিরাপদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে সেখানকার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, রোহিঙ্গারা সেখানে কতটা স্বস্তিতে থাকতে পারবেন- এসব বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ (feasibility study) চালানোর পরই কেবল সেখানে রোহিঙ্গাদের পাঠানোর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হোক।

এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক মহলের দাবির মধ্যে এটাও ছিল যে পুরো বিষয়টি অবশ্যই স্বেচ্ছা-প্রণোদিত হতে হবে। অর্থাৎ কোনো রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে জোরপূর্বক পাঠানো যাবে না। পাশাপাশি কাউকে প্রলুব্ধ করা বা ফুসলানো যাবে না ভুল তথ্য দিয়ে। এর মানে হলো ভাসানচরের প্রকৃত অবস্থা ও সেখানকার সুবিধা-অসুবিধা রোহিঙ্গাদের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হবে, কোনো ধরনের গোঁজামিলের আশ্রয় নেয়া যাবে না। অতঃপর রোহিঙ্গারাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা সেই দ্বীপে যাবেন কি না।

এসব দাবির অনেকগুলোই বাংলাদেশ মেনে নিলেও মূল যেই দাবি অর্থাৎ জাতিসংঘের অধীনে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি পেশাদার জরিপ চালানো- সেটি অদ্যাবধি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়নি বাংলাদেশ। আর তারই পটভূমিতে বিদেশী কোনো সংস্থা এখন পর্যন্ত এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হয়নি। উল্টো তাদের পক্ষ থেকে বারবার স্থানান্তর প্রক্রিয়া স্থগিত করার জন্য বিবৃতি প্রদান করা হয়।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে- বাংলাদেশ গোটা বহির্বিশ^কে উপেক্ষা করে অনেকটাই একক সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে আসলে কী অর্জন করতে যাচ্ছে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন একাধিকবার তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছেন যে কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশে রোহিঙ্গারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সুতরাং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্যই এই স্থানান্তর। এ ছাড়া কিছু রোহিঙ্গাকে কক্সবাজার থেকে অন্যত্র সরিয়ে সেখানে সেবার মান বাড়ানো গেলে রোহিঙ্গারা স্বস্তিতে থাকবে। অন্যথায় সেখানে জঙ্গিবাদের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য তথা বাংলাদেশের এই অবস্থান কতটা যৌক্তিক? ১২ লাখ রোহিঙ্গা থেকে মাত্র এক লাখ অর্থাৎ বারো ভাগের এক ভাগ লোককে সরিয়ে নিলে তাতে কতটাই বা সেখানকার পরিবেশের উন্নতি ঘটবে? যদি এমন হতো যে অন্তত ৪ থেকে ৫ লাখ লোককে কক্সবাজার থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে, তাহলে যৌক্তিকভাবে এটা মেনে নেয়া যেতো যে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গাদাগাদি পরিবেশে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সুতরাং এক লাখ লোককে সরিয়ে সেখানে মানুষের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলা যাবে, এটা খুবই দুর্বল যুক্তি।

যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে, ক্যাম্পের জনসংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে মিয়ানমারের একগুঁয়েমির কারণে, সেখানে রোহিঙ্গাদেরকে নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইনে পাঠানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারের সেদিকেই মূল নজর দেয়া দরকার। কিন্তু সরকার কেন নিজের জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর নিয়ে যাচ্ছে তা এক বিরাট রহস্য। অনেকেরই আশঙ্কা এই স্থানান্তরের ফলে প্রকারান্তরে বহুল আকাক্সিক্ষত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক দাতব্য সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন-এর এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের ৩১শে মে পর্যন্ত বিগত প্রায় তিন বছরে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ৭৫,৯৭১টি শিশু জন্মগ্রহণ করে যা কক্সবাজার ক্যাম্পে অবস্থানরত মোট রোহিঙ্গার প্রায় ৯ শতাংশ। এ ছাড়া অপরাপর বিভিন্ন জরিপে আরো দেখা যায় যে বিগত তিন বছরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হয়।
যেখানে ইতোমধ্যেই মিয়ানমার সরকার দেশটিতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পর্যন্ত ১৯৮২ সালের একটি বিতর্কিত নাগরিক আইনের দোহাই দিয়ে অবৈধ বহিরাগত বাঙালি তথা বাংলাদেশী বলে আখ্যায়িত করছে, সেখানে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্ম নেয়া শিশুদের মিয়ানমার সরকার তার দেশের নাগরিক বলে মেনে নেবে এমনটি বোধ হয় কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে না।

মিয়ানমারের সরকারি তথ্যের বরাতে ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বর্তমানে মিয়ানমারে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এদের মধ্যে আবার ১ লাখ ২০ জনকে মিয়ানমার সরকার দেশটির সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত আইডিপি (Internally Displaced People-IDP) ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণরূপে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এসব ক্যাম্পকে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কারাগারের (Open Prison) সাথে তুলনা করেছেন। শিক্ষা থেকে শুরু করে সব ধরনের মৌলিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই সব ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারীদেরও নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। বিগত ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর দেশটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। এমনকি সাধারণ রোহিঙ্গাদেরও ভোটাধিকার পর্যন্ত প্রয়োগ করতে দেয়া হয়নি।

আর এমনই পটভূমিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নাগরিক হিসেবে মিয়ানমার সরকার যে সহজে গ্রহণ করবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত ২০১৯ সালে অন্তত দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবিষয়ক আলোচনা ভেস্তে যায়। মিয়ানমার সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল কয়েক দফায় কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সব বৈঠক কোন ফল ছাড়াই শেষ হয়। কারণ প্রত্যাবাসনের আগে নাগরিকত্ব ফেরত দেয়া ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ তাদেরকে তাদের মূল ভূখণ্ডে পুনর্বাসিত করার মতো রোহিঙ্গাদের অত্যন্ত যৌক্তিক দাবিও কিছুতেই মানতে রাজি হয়নি মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিরা।

সব কিছু মিলিয়ে এ কথা নির্ধিদ্বায় বলা যায় যে, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইনে প্রত্যাবাসন করা বাংলাদেশের জন্য অতি সহজ নয়। আর ক্যাম্পে নতুন করে জন্ম নেয়া শিশুদের বিষয় তো আরো জটিল।
আর এ অবস্থায় বাংলাদেশের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত বহির্বিশ্ব কে সাথে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কাজ শুরু করা। সম্ভাব্য সব উপায়ে মিয়ানমারের ওপর কঠিন কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। কিন্তু সেটা না করে উল্টো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি- গবেষণা ছাড়াই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে বাংলাদেশ সরকার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার এই স্থানান্তরকেই প্রত্যাবাসনের পথে এক ধাপ অগ্রগতি বলে দাবি করছে।

কিন্তু ভাসানচরের এসব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার যদি বলে এরা আদৌ মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এরা, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে? অপরদিকে, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও যেখানে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিরোধিতা করছে সেখানে বাংলাদেশ কেন নিজ খরচে এবং সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিতে চায় এটা বোধগম্য নয়। দ্বীপে পাঠানো ওই রোহিঙ্গাদের খাওয়া-পরাসহ সকল খরচও বাংলাদেশকে বহন করতে হবে। অর্থাৎ দেশের মানুষের বিপুল অর্থ সরকার রোহিঙ্গাদের ভরণ পোষণে খরচ করছে।

যদিও কেউ এমনটা প্রত্যাশা করে না, তবুও বাস্তবতার নিরিখে বলতে হয়, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে কখনো কোনো ধরনের অসন্তুষ্টি দেখা দিলে তার একক দায়ভার বাংলাদেশ সরকারকেই বহন করতে হবে। শুধু তাই নয়, সেখানে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলেও তার জন্যে বাংলাদেশকেই দায়ী করা হবে। সব মিলিয়ে আগে থেকেই যে ৩০৬ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরে কয়েক মাস ধরে আছেন তাদেরসহ পরবর্তীতে পাঠানো ১,৬৪২ জনকে অতি দ্রুত কক্সবাজার ক্যাম্পে ফেরত আনা উচিত এবং এখন থেকে বাংলাদেশের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সু চির নেতৃত্বে থাকা মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের সাথে অতি দ্রুত সংলাপে বসা এবং একই সাথে মিয়ানমারকে প্রচণ্ড কূটনৈতিক চাপে রাখা যাতে দেশটি তার রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত নিতে বাধ্য হন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সন্ত্রাসবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে কোনো একক সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোর মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে বাংলাদেশকে অতি দ্রুত সরে আসা উচিত।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply