ভোটের দিন শেষ

আলফাজ আনাম#

Votভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের দিন শেষ। এখন ভোটাররা ভোট দেয়ার আগে প্রার্থী নির্বাচিত হবে। ভোটের একটি আয়োজন হবে শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য। আগে থেকে নির্ধারিত বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকেরা উৎসব করবেন। কিছু ভোটার অবশ্য ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন। টেলিভিশন ক্যামেরায় দেখানো হবে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হচ্ছে। রাতে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দেবে কত শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে। এরশাদের স্বৈরশাসনামলে এভাবে নির্বাচন হয়েছিল। বাংলাদেশ এখন আবার ভোটের রাজনীতির সেই সময়ে ফিরে গেছে। গত ২৮ এপ্রিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এভাবে ভোট হয়েছে। এরশাদ আমলে ভোট বর্জনের ঘোষণা আসেনি। এবার দুপুর ১২টার মধ্যে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে।
৫ জানুয়ারির বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে অভিনব গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে, সেই গণতন্ত্রের রূপ কেমন হবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গেল। নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করে। ভোটের আগে থেকে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় যাতে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীদের কোনো এজেন্ট ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারে। এর পরও যেসব এজেন্ট দুঃসাহস দেখিয়েছেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ মিলে বের করে দেয়। অনেককে পিটিয়ে তক্তা বানানো হয়। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ছিল আরো খারাপ। ফলে ঢাকার আগে চট্টগ্রামে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন সাবেক মেয়র ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলম।
সকাল ৯টার পর থেকে শুরু হয় ভোট দেয়ার মহোৎসব। সরকার সমর্থক কয়েকটি গণমাধ্যম সকাল থেকে প্রচার শুরু করে উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ ভোট দিচ্ছে। হ্যাঁ, সত্যিই ভোটকেন্দ্রগুলোতে উৎসব ছিল। কিন্তু সেই উৎসব ছিল আওয়ামী উৎসব। ভোটকেন্দ্রের চার পাশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ আর বস্তিবাসী কিছু তরুণ আনিসুল হকের দেয়াল ঘড়ি আর সাঈদ খোকনের ইলিশ মাছ প্রতীকের ব্যাজ বুকে লাগিয়ে ভোটকেন্দ্রের চার দিকে ঘোরাফেরা করতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ভোটারেরা ছিলেন শঙ্কিত।
নির্বাচন কেমন হবে তা সাধারণ মানুষের অনুমানের বাইরে ছিল এমন নয়। নির্বাচন কমিশন যে দিন সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সে দিন স্পষ্ট হয়ে যায় নির্বাচন কমিশন একটি দলীয় নির্বাচনের পথে হাঁটছে। তারপরও জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ঢাকার মানুষ আশা করেছিল শেষ পর্যন্ত হয়তো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। কিন্তু ভোট শুরু হওয়ার পরই তাদের মোহভঙ্গ হয়ে যায়। বাড়ি থেকে বের হয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে বোঝা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, ভোটকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে অন্যদের হাতে। মানুষের বুঝতে বাকি থাকে না যে, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কেন সেনাবাহিনীকে সেনানিবাসের ভেতরে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে ভোটকেন্দ্রগুলো শান্ত মনে হলেও ভেতরে চলে নীরবে সিল মারার কাজ।
বেলা সাড়ে ১১টায় প্রেস ক্লাবে দেখা হয় সংরক্ষিত নারী আসন ১৫ প্রার্থী রাশিদা আক্তার রানীর। ভোটকেন্দ্র ছেড়ে প্রেস ক্লাবে কেনÑ প্রশ্ন করতেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। বললেন, সাক্ষী নিয়ে এসেছি। লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা ১২ বছরের কিশোর। নাম ইব্রাহিম খলিল। মিরহাজারি বাগ কেন্দ্রে এই কিশোর ৩১টি ভোট দিয়েছে। হাতে অমোছনীয় কালি লাগানো। কেন ভোট দিলে জিজ্ঞেস করলেই বলল, এলাকার বড়ভাইরা ভোট দিতে বলেছে। আমি দিয়েছি। আপা আমাকে এখানে ডেকে এনেছেন। সহজ-সরল এই কিশোর জানেই না সে একটি অপরাধ করেছে। রাশিদা আক্তার রানী ৪৮, ৫০ ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। তার মার্কা কেটলি। তার অভিযোগ সকালে সব কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। ফলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাশিদা আক্তার বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর অনেক আগেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছিলেন আবু জুবায়ের। তার প্রতীক করাত। তিনি ভোট শুরু হওয়ার পরপরই ভোটকেন্দ্রে যান। ভোট দিতে গিয়ে তো তাজ্জব। নিজে প্রার্থী। কিন্তু ভোট আগেই দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু লাভ কী ভোট তো দেয়াই হয়েছে। ভোট যে কতটা দ্রুতগতিতে পড়েছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল মিরপুর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উপশহর স্কুলে। বেলা ১১টায় প্রিজাইডিং অফিসার জানিয়েছেন ভোট দেয়া শেষ হয়েছে। কারণ স্পষ্ট, যত ভোটার তত ভোট পড়েছে। নতুন করে আর ভোট নেয়ার সুযোগ নেই। একই অবস্থা বংশালের সুরিটোলা স্কুলের ভোটকেন্দ্রে। সকালে ভোট হয়ে গেছে। কিন্তু নাছোড়বান্দা ভোটাররা ভোট দেয়ার জন্য হইচই শুরু করেন। ফলে প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ স্থগিতের কথা জানান। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষ। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ। তার গাড়ি লক্ষ্য করে একজন জুতো ছুড়ে মারেন। পরে এই ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।
ভোট দিতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। তাকে গালাগালি করা হয়। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘মনে হলো এত দিনের শিক্ষাদান ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নিকৃষ্ট, ঘৃণ্য, জঘন্য এমন নির্বাচন আয়োজিত হতে এর আগে দেখিনি। এটাকে নির্বাচন বলা যায় না। গায়ের জোরে ব্যালট বাক্সে ভোট ঢুকিয়ে দেয়াÑ এটাই ছিল আসল কথা।’
নির্বাচনে শুধু ভোটার আর প্রার্থী নন, সাংবাদিকদেরও নিয়ন্ত্রণে রাখেন নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ। আগেই নির্দেশ জারি করা হয় ভোটকেন্দ্রের ভেতরের ছবি টেলিভিশনে দেখানো যাবে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে কমিশন এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কারণ টেলিভিশনগুলো ৫ জানুয়ারির নির্বাচন লাইভ প্রচারের কারণে মানুষ দেখেছে কত ভাগ লোক ভোট দিয়েছে আর কিভাবে সিল মারা হচ্ছে। এবার নির্বাচন কমিশন সে ঝুঁকি নেয়নি। এ কারণে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে টেলিভিশন সম্প্রচার ছিল নিষিদ্ধ। এর পরও যেসব এলাকায় সাংবাদিকেরা সাহস করে খবর নেয়া বা ছবি তোলার চেষ্টা করেছেন, তাদের তাড়া করা হয়েছে।
নির্বাচনে অনিয়ম, জালিয়াতি আর কেন্দ্র দখলের এই মহোৎসব বিদেশীদের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত গিয়েছিলেন একটি ভোটকেন্দ্র দেখতে। সেখানে তিনি নির্বাচন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল। দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। বার্নিকাট ওই কেন্দ্রে ৪০ মিনিট অবস্থান করে পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় ২৫ মিনিটে মাত্র চারজন ভোট প্রদান করেন। ওই সময়ে পুরুষ বুথে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্ট ছাড়া অন্য কোনো এজেন্ট ছিল না।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একদলীয় শাসনের পথ আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। বিদেশী রাষ্ট্রদূত আর সুশীলসমাজের নেতারা আশা করেছিলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো লিবারেল স্পেস পাবে। অর্থাৎ সহনশীল ও উদার রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসবে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকে প্রধানমন্ত্রী আরো কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন, হামলা আর মামলা আরো বাড়বে। সিটি করপোরেশন নির্বাচন যেভাবে পুলিশ ক্ষমতাসীনদের জিতিয়ে দিতে সাহায্য করেছে, তাতে পুলিশের সাথে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় ক্যাডারদের সম্পর্ক আরো বাড়বে। ফলে নিপীড়নের মাত্রাও বাড়তে থাকবে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেকবার প্রমান হলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল। ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন কেমন হবে তা-ও দেশবাসী দেখতে পেল। এই নির্বাচনের পর ভবিষ্যতে আর কেউ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচনে যাবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘমেয়াদে তার ভোটাধিকার হারিয়েছে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
স্বীকার করতেই হবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করতে ক্ষমতাসীন দল, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ছিল চমৎকার। গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজাতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে এই কমিশন যে অসামান্য ভূমিকা রাখছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা আরো সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশে ভোটের সাথে যদি নাগরিকের অধিকারের সম্পর্ক থাকে সেই অধিকার হরণের জন্য এই নির্বাচন কমিশনের নাম ইতিহাসে অন্যভাবে উচ্চারিত হবে।

SHARE

Leave a Reply