মজবুত সংগঠন গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন কর্মপদ্ধতির যথার্থ অনুসরণ

মু. সাজ্জাদ হোসাইন

1আল্লাহর এই জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অসংখ্য বাধা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে করে শিবির এ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আজ শুধু দেশেরই নয় দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ছাত্রসংগঠন এবং গোটা মুসলিম মিল্লাতের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাম আজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয় Campus, কলেজ Campus-ই নয় বড় বড় শহর, নগর, জনপদ ও গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবির বাতিল শক্তির নিকট এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। মজলুম অসহায় মানুষের আগামী দিনের আশ্রয়স্থল হিসেবে নিজেকে তৈরি করে শিবির তার জন্য রাখা নামেরই সত্যতা ঘোষণা করছে। শিবিরকে নিয়ে আজ শুধু দেশেই নয় আন্তর্জাতিক মহলগুলোও চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের এ অবস্থান এক লহমায় তৈরি হয়নি। এটি সম্ভব হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির যে একটি সুন্দর কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে তার বদৌলতে। এ কর্মপদ্ধতিই অনুসরণ করে ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধানগুলো। আর এ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে অসংখ্য ভাই শাহাদাত বরণ করেছেন, আহত ও পঙ্গু হয়েছেন হাজার হাজার। ইসলামী ছাত্রশিবিরের এ অনন্য কর্মপদ্ধতি শিবিরকে এ পর্যায়ে নিয়ে এলেও দুঃখজনকভাবে সত্য যে আমরা এর উল্লেখযোগ্য অংশ যথার্থভাবে অনুসরণ করতে সক্ষম হচ্ছি না। যদি পরিপূর্ণভাবে সংগঠনের সকল পর্যায়ে আমরা আমাদের এ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি তাহলে ইসলামী ছাত্রশিবির তার বর্তমান অবস্থার কয়েকগুণ শক্তিশালী হয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
সঠিকভাবে কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা না গেলে বিভিন্ন শাখায় এবং বিভিন্ন স্তরে নানাবিধ জটিলতা তৈরি হয়, তখন অনুসরণ করতে যতটুকু কষ্ট হওয়ার কথা ছিল বরং তা সমাধান করতে তার চেয়ে বেশি বেগ পেতে হবে।
কর্মপদ্ধতি মানে কর্মকৌশল, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় বা Working strategy বা working procedure: Oxford Dictionary-তে strategy অর্থ বলা হয়েছে- A plan of action intended to accomplish a specific goal.
আর procedure সম্পর্কে বলা হয়েছে-
1.    A particular method for performing a task.
2.    A series of small tasks or steps taken to accomplish an end.
3.    (Uncountable) The set of established forms or methods of an organized body for accomplishing a certain task or tasks.
4.    The steps taken in an action or other legal proceeding.
উপরের সংজ্ঞাগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকরী পরিকল্পনাই হচ্ছে কর্মপদ্ধতি। আমাদের এ কর্মপদ্ধতি এক দিনে রচিত হয়নি কিংবা কোন একক ব্যক্তির উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত বই এটি নয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংগ্রামমুখর পথ চলাই এর জন্মস্থান। আমরা কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে যেয়ে যে সকল জায়গায় দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করব ।
কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে যেয়ে যে সকল জায়গায় আমাদের দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় সে ব্যাপারে আমরা কী করতে পারি তার সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা :
১.
কর্মপদ্ধতির ভূমিকার ৩ নং প্যারায় কর্মশক্তি, জনশক্তি এবং জনসমর্থনের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, চিন্তাশক্তি আন্দোলনের পেছনে জনসমর্থনের ফলপ্রসূ এবং কার্যকর খাতে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। অথচ আমরা যদি আমাদের সংগঠনের সকল পর্যায়ের বা স্তরে দৃষ্টিপাত করি কিংবা নিরপেক্ষ মনমগজ নিয়ে চিন্তÍা করি তাহলে দেখতে পাবো যে আমাদের বিশাল একটা সংখ্যক জনশক্তি কাজের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। আবার যারা কাজ করছে তারাই রাতদিন পরিশ্রম করছে। এখানে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে যারা পিছিয়ে আছে তাদেরকে কাজের আওতায় আনা যায় এবং জনশক্তির ঝোঁক-প্রবণতা, দক্ষতা অনুযায়ী কাজে লাগানোও আমাদের কর্তব্য।
২.
আমাদের কর্মপদ্ধতিকে বারবার অধ্যয়ন, সেটি পর্যালোচনা করা, সকল জনশক্তিকে সেটি অধ্যয়ন করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ এবং অভিজ্ঞ ও পুরাতন দায়িত্বশীলদের অভিজ্ঞতার আলোকে কর্মপদ্ধতিকে বুঝতে হবে এবং স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করতে হবে। একজন অভিজ্ঞ দায়িত্বশীলের কর্মপদ্ধতি অধ্যয়ন এবং একজন সাধারণ ছাত্রের কর্মপদ্ধতি অধ্যয়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। একজন সাধারণ কর্মী যদি কর্মপদ্ধতি বার বার অধ্যয়ন করে কিংবা কোন প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের আগে কর্মপদ্ধতিতে সে ব্যাপারে কী বলা আছে সেটি অনুসরণ করে তাহলে তার কাজও হবে সুচারু এবং সংগঠনও হবে মজবুত।
৩.
প্রথম দফায় টার্গেটকৃত ছাত্রের গুণাবলির ব্যাপারে যে ৫ ধরনের ছাত্রের কথা বলা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা তাদের টার্গেটের আওতায় আনতে ব্যর্থ হচ্ছি। ওমর কিংবা আবুল হাকামের মতো লোকদের আজ সংগঠনের বড় বেশি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যেগুলো আমাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দায়িত্বশীলদের এই বিষয়ে Seriousness এর অভাব অনেক সময় এই মানের ছাত্রদের সংগঠনের বলয়ে নিয়ে আসতে আমরা হীনমন্যতায় ভোগী। তবে আমাদের সংগঠনের জন্য এই মানের ছাত্রদের বড় বেশি প্রয়োজন। তাদের মধ্যেই আগামী দিনের ওমর, আবু বকর, হামজা, তারিক, খালিদ রয়েছেন। তাই আমাদেরকে এই পয়েন্টে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে টার্গেট সেট করার সময় উপযুক্ত দায়িত্বশীল দেয়ার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে।
৪.
আমাদের দুর্বলতা রয়েছে ক্রমধারা অবলম্বন ও ক্রমান্বয়ে কর্মী পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে। এই প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে কিংবা দুর্বলতা রেখে আমরা যখন মানোন্নয়ন করি অথবা সংগঠনের বলয়ে নিয়ে আসি তখন আমাদের সংগঠনের মজবুতি নষ্ট হয়। একটু সময়সাপেক্ষ হলেও আমাদের সব ধাপ মেনটেইন করা উচিত। এই প্রক্রিয়া দু’টি যথার্থভাবে না মেনে সংগঠন পরিচালনা করলে সংগঠন হয়তো অনেক বড় হবে কিন্তু তার মজবুতি নষ্ট হবে। এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নষ্ট হবে। অনেক ক্ষেত্রে ইসলামী সংগঠনের মূল বৈশিষ্ট্যও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এ জন্য সংগঠনের বলয়ে নতুন ছাত্রদেরকে নিয়ে আসা এবং তাদের মানোন্নয়নের প্রক্রিয়াটি হবে নিরবচ্ছিন্ন, ধারাবাহিক, ধীরস্থির এবং পর্যবেক্ষণের আওতায়। এ ক্ষেত্রে খুব বেশি তাড়াহুড়া করা কিংবা খুব বেশি শিথিলতা প্রদর্শন অগ্রহণযোগ্য। মধ্যমপন্থা অবলম্বনই শ্রেয়।
৫.
আমাদের দাওয়াতি মূলক কাজে ব্যক্তিগত দাওয়াতি কাজে সকলে অংশগ্রহণ এখনও আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। পারিনি আমরা সকলে দাওয়াতি চরিত্র অর্জন করতে। ব্যক্তিগত দাওয়াতের মাধ্যমে সমর্থক বৃদ্ধির হার আমাদের সবসময়ই কম, অথচ দাওয়াতের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে ফলপ্রসূ। দাওয়াতি গ্রুপ প্রেরণের বিষয়টি আমাদের কাছে অপরিচিতই মনে হয়, এটি কর্মপদ্ধতিতে রাখা হয়েছে দুর্বল এলাকাগুলোকে টার্গেট করে। তার পাশাপাশি দাওয়াতি দশক এবং দাওয়াতি সপ্তাহ পালন করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সংগঠন থেকে যে নির্দেশনা (সার্কুলার) যায় তার যথার্থ অনুসরণ আমরা শতকরা কত ভাগ করি এ বিষয়টি আমাদের সকলের ভেবে দেখতে হবে। কর্মপদ্ধতিকে অনুসরণ করে এবং আমাদের  কেন্দ্র্র থেকে যে সার্কুলার দেয়া হয় আমরা যদি সংগঠনের সকল স্তরে তার প্রয়োগ করতে পারতাম তাহলে নিশ্চিতভাবে আমাদের এ সংগঠনটি তৃণমূল পর্যায়ে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ত।
৬.
মোহররমা যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই একটা জড়তার মধ্যে থাকি নিজের মা, বোন এবং আরো অন্যান্য নিকটাত্মীয় মোহাররম ব্যক্তিদের মধ্যে যদি আমরা দাওয়াতি কাজ করতাম দীর্ঘ সময় নিয়ে তা হলে আজকে আমাদের সংগঠনের কলেবর এবং গণসম্পৃক্ততা বেড়ে যেত বহুগুণে। এ কাজটি আমাদের সংগঠনের জন্য একটা গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে রিপোর্ট সর্বস্ব। এই কাজটি যদি আমরা বাড়াতে পারি আমাদের সংগঠনের বহুমাত্রিক সম্প্রসারণ এবং মজবুতি অর্জিত হতো। প্রতিটি গৃহ হতো দ্বীন বিজয়ের দুর্জয় কাফেলা।
৭.
দ্বিতীয় দফায় এসে কর্মীর যে ৮টি কাজের কথা বলা হয়েছে সে ৮টি কাজ আমাদের কতজন জনশক্তি করে এর একটা সঠিক পর্যালোচনা আমাদের স্ব স্ব দায়িত্ব থেকে করা উচিত। কারণ আজকের কর্মীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ তারা আমাদের স্বপ্ন। তারাই আমাদের আগামী দিনের সংগঠন। কাজেই তাদের এ কাজ বাস্তবে যথাযথ অনুসরণ করানোর মাধ্যমেই আগামী দিনে সংগঠনের মজবুতি নিহিত রয়েছে। তারা তাদের কাজগুলো সুচারুরূপে করলেই আগামী দিনের মানসম্মত দায়িত্বশীল আমরা পেয়ে যাবো।
সদস্যদের ব্যাপারে ১নং পয়েন্টে যা বলা হয়েছে যে, সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করা। এটি এত সহজ বিষয় নয়। আমরা যারা সদস্য তারা সকলেই কি আমাদের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে গ্রহণ করতে পেরেছি? প্রশ্নটির জবাব হয়তো পরিপূর্ণভাবে পজেটিভ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমি সদস্য হিসেবে আমার সকল কর্মকাণ্ড শুধু সংগঠনকে কেন্দ্র করে আবর্তন করতে পেরেছি কি না? সেটিও আমাকে ভেবে দেখতে হবে, করতে হবে গভীর পর্যালোচনা।
৬ নং পয়েন্টে শিবিরের লক্ষ্য ও কর্মসূচির বিপরীত কোনো সংস্থার সাথে সম্পর্ক না রাখার বিষয়টিও লঙ্ঘিত হয়ে যায় দুনিয়ার চাপে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হয় চরমভাবে। এর পরের প্যারায় সদস্যদের ঐতিহ্যগত নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তা যদি আমরা মেনে চলতে পারি, আমার বিশ্বাস সদস্যরা প্রত্যেকে হতে পারবেন সোনালি যুগের মানুষের মতো।
৮.
বৈঠক পরিকল্পনার নিয়মগুলো যদি আমরা যথাযথভাবে অনুসরণ করি তা হলে তা আমাদের সংগঠনের মজবুতিকে নিয়ে যাবে এক অনন্য উচ্চতায়। অনেক ক্ষেত্রেই বৈঠক পরিচালনায় আমাদের রেওয়াজ রীতি যথার্থভাবে অনুসরণের ক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতির অনুসরণ কম হওয়ায় নানান জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং আশানুরূপ ফল আমরা লাভ করতে সক্ষম হই না।
৯.
কর্মী যোগাযোগ একটি সংগঠনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ। কর্মীদেরকে যদি একটি ইটের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে যোগাযোগ হলো এর গাঁথুনি। দীর্ঘদিন একই শাখায় কাজ করার পরও একই সাথে থাকার পরও আমরা একজন আরেকজনের কাছে অজানাই  থেকে যাচ্ছি। অপ্রিয় হলেও সত্য যে আমাদের সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কর্মী যোগাযোগ উল্লেখযোগ্য হারে কম এবং যোগাযোগের পন্থা কর্মপদ্ধতিতে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে যদি প্রত্যেক কর্মী তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ করেন তাহলে আমাদের সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক হবে সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো এবং একজন কর্মী হবে আরেক জন কর্মীর প্রাণের আত্মীয় এবং ভাই। আর আমাদের সংগঠন হবে মজবুত এবং দুভেদ্য দুর্গ।
১০.
দ্বিতীয় দফার শেষের দিকে Reporting এর কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের বিভিন্ন স্তরে রিপোর্ট বোঝা এবং সেটি সঠিকভাবে তৈরি এবং উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গ্যাপ রয়েছে। অনেক কাজ করার পরও রিপোর্টে সঠিক চিত্র না আসা এবং কোথায় কোথায় দুর্বলতা তা চিহ্নিত করতে না পারা নিঃসন্দেহে একটি বড় দুর্বলতা। রিপোর্ট নিয়মিত তৈরি করা সংগঠনের হক এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুঃখজনকভাবে কোন কোন শাখায় বিভিন্ন স্তরে প্রতি মাসে Reporting হতে দেখা যায় না।
১১.
প্রশিক্ষণপদ্ধতি আমাদের সংগঠনের প্রাণ। কারণ যথার্থ প্রশিক্ষণপদ্ধতির অভাব থাকলে মানসম্মত জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সংগঠনের সকল স্তরে এবং সকল স্থানে প্রশিক্ষণপদ্ধতি একইরূপ না হলে জনশক্তির মানের তারতম্য তৈরি হবে। আর এটি মজবুত সংগঠনের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। তৃতীয় দফায় প্রশিক্ষণপদ্ধতিতে ইসলামী সাহিত্য পাঠ ও বিতরণের ক্ষেত্রে যা বলা হয়েছে বই বিতরণের আগে বইটি নিজে পড়া এবং বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কর্মীর সাথে আলোচনা করা এবং তার প্রশ্ন থাকলে তার জবাব দেয়া এ বিষয়ে আমাদের অনেকাংশে দুর্বলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতির অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। এতে আমাদের কর্মীবাহিনী জ্ঞানগত দিকে নিজেকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে।
১২.
তৃতীয় দফায় পাঠচক্র, আলোচনাচক্র এবং সামষ্টিক অধ্যয়নের নিয়ম আমাদের পালন করতে হবে সুচারুরূপে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের কোন কোন মৌলিক বিষয় অনুসরণের ব্যত্যয় ঘটে। এ ক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতির পূর্ণ অনুসরণ আবশ্যক। আলোচনা চক্রের সদস্যদের তালিকা থাকলেও দেখা যায় এক চক্রে যিনি এসেছেন পরের চক্রে তিনি আসেননি। আবার দেখা যায় আলোচনা চক্র পরিচালনায় প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল অনুসরণ করা হয় না।
১৩.
শিক্ষা শিবিরের আলোচনায় একসঙ্গে থাকা নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে। আজকে একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা শিবিরগুলো শ্রেণিকক্ষের ক্লাসের মতো হয়ে গেছে। কিন্তু শিক্ষাশিবিরে শুধু আলোচনা শোনাই নয় আরও অনেক বিষয় আছে যা একত্রে ৩ দিন, ৫ দিন, ১০ দিন থাকলে শেখা যায়। শিক্ষাশিবিরের সামগ্রিক পরিবেশও আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। শিক্ষাশিবিরের মাধ্যমে জনশক্তির সামষ্টিক আচরণ পরীক্ষা করা যায়। একটি প্রতিকূল পরিবেশের কারণে আমরা আমাদের জনশক্তিকে আজ তা দিতে সক্ষম হচ্ছি না। যেখানে যেখানে সুযোগ আছে সেখানে তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
১৪.
শিক্ষা বৈঠকে ৩ নং, ৫ নং, ৯ নং এবং ১০ নং পয়েন্টের অনুসরণ আমাদের অনেক সময়ই দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়।
১৫.
কর্মপদ্ধতির মধ্যে প্রশিক্ষণ দফাটি যেমন প্রাণ তেমনি প্রশিক্ষণ দফার প্রাণ হচ্ছে শব্বেদারি বা নৈশ ইবাদত। এর মাধ্যমে আমরা আন্দোলনের জন্য উন্নতমানের কর্মী তৈরি করতে পারি। বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশে বেশ কয়েক বছর ধরে শব্বেদারির পূর্ণাঙ্গরূপ দেয়া আমাদের জন্য কঠিন। এতে করে নৈতিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে আমাদের সীমাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে। এর সম্পূরক হিসেবে আমাদেরকে আমাদের মেস, বাসা এবং হোস্টেলগুলোতে শব্বেদারির পরিবেশ তৈরি করে তা নিয়মিত চালু রাখতে হবে। বেশ কয়েক বছর আগেও একজন কর্মী যখন সারা রাত শব্বেদারি করে ফজরের সালাত জামায়তে আদায় করে মসজিদ থেকে বের হতো তখন সে ফিরে আসত এক নতুন উদ্যম আর ঈমানী প্রশান্তি নিয়ে।
১৬.
ব্যক্তিগত রিপোর্ট সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে আমাদের সংগঠনের সকল স্তরে কমবেশি দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের রিপোর্ট মাঝে মাঝে গ্যাপ করা, একসাথে কয়েকদিনের রিপোর্ট রাখা। রিপোর্টের সব ঘর ভারসাম্যপূর্ণ না হওয়া, দায়িত্বশীলদের রিপোর্টে স্বাক্ষর না থাকা কিংবা দায়িত্বশীলকে নিজ উদ্যোগে রিপোর্ট না দেখানো ইত্যাদি নানা ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। অথচ কর্মপদ্ধতি সঠিকভাবে মেনে চললে এবং নিয়মিত রিপোর্ট সংরক্ষণ করলে একজন কর্মী হয়ে উঠবে আগামী দিনের সোনালি মানুষ। আর জাতি খুঁজে পাবে তার কাক্সিক্ষত নেতৃত্ব।
১৭.
এহতেসাব : সংগঠনকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য এহতেসাবের কোনো বিকল্প নেই। যখনই এহতেসাবের দরজা বন্ধ হয়ে যায় তখনই গিবতের চর্চা শুরু হয়। অনেক শাখায় বিভিন্ন স্তরে এহতেসাবের প্রোগ্রাম রাখতে অনেককে বিব্রতবোধ করতে দেখা যায়। এটা অনাকাক্সিক্ষত। কোথাও কোথাও দেখা যায় মাসের পর মাস সভাপতি কিংবা সেক্রেটারির ব্যাপারে কোন এহতেসাব নেই। এটি অস্বাভাবিক। শিবির মানুষের সংগঠন। আমরা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। কাজেই কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে সাথে সাথেই সময়ক্ষেপণ না করে ব্যক্তিগত অথবা সামষ্টিক এহতেসাবের আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং এ ব্যাপারে কর্মপদ্ধতির অনুসরণ করতে হবে পূর্ণাঙ্গভাবে।
১৮.
আত্মসমালোচনা : রিপোর্ট বইয়ের সর্বশেষ ঘরে আত্মসমালোচনার পয়েন্টটি থাকলেও কর্মপদ্ধতির আলোকে আমরা কতটুকু আত্মসমালোচনা করতে পারি সেটিও মনে হয় আমাদের আত্মসমালোচনা করে দেখতে হবে। আমরা অনেকে শুধুমাত্র রিপোর্ট লেখার সময়ই এক মুহূর্ত ভেবেই আত্মসমালোচনার কাজটি সম্পন্ন করি কি না সেটি ভেবে দেখতে হবে। আমাদের নিজের জীবনকে ধারাবাহিক উন্নতির সোপানে নিতে হলে কর্মপদ্ধতির আলোকে আত্মসমালোচনার বিকল্প নেই। আর এর মাধ্যমে ব্যক্তি উন্নয়ন করে সাংগঠনিক মজবুতি আসবে।
১৯.
ক্যারিয়ার তৈরি : আমরা অনেকেই আমাদের অ্যাকাডেমিক অধ্যয়ন এবং সাংগঠনিক কাজের মধ্যে ভারসাম্য করতে পারি না। সাংগঠনিক কাজ করতে যেয়ে  রেজাল্ট খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে শুধু পড়াশোানা নিয়েই ব্যস্ত, সাংগঠনিক কাজের ব্যাপারে উদাসীন। উভয় কাজের মাধ্যমেই ময়দানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ জন্য কষ্ট হলেও ভারসাম্য নিয়ে আসতে হবে।
২০.
জ্ঞানার্জন : পঞ্চম দফা এ পয়েন্টে আমাদের সামষ্টিক দুর্বলতা যথেষ্ট। সাথী কিংবা সদস্য হওয়ার পর আমাদের আর কোনো পড়াশোনা নেই। আমাদের অনেকেরই চিন্তায় না থাকলেও কাজে কর্মে এটি প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। ইসলামী সাহিত্য ও অন্যান্য সাহিত্য আমাদের অধ্যয়নের পরিমাণ সামষ্টিকভাবেই কম।  নেতৃত্ব দিতে হলে জ্ঞানের  কোন বিকল্প নেই।
পরিশেষ : এই কর্মপদ্ধতির বাইরেও অনেক সাংগঠনিক ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে যাকে আমরা অলিখিত কর্মপদ্ধতি বলতে পারি। যেমন আমরা কিভাবে শুভাকাক্সক্ষী যোগাযোগ করব? কিভাবে আমি আমার সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করব? আমি কোন কথাটি কোথায় কিভাবে বলব? আদৌ বলব কি না? না চুপ থাকব? আমি এই প্রশ্নটি করব কী করব না? আমি এখানে বসব কী বসব না? আমি এখন ছুটি চাইব কী চাইব না? স্তরভেদে আমার জনশক্তি কিংবা দায়িত্বশীলের আচরণ কী হবে? বর্তমান পরিবেশে আমি কোন কাজটি করব আবার কোন কাজটি করব না? উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবেলায় আমার করণীয় কী? এই সময়ে সংগঠনের কোন কাজটি গুরুত্ব পাবেÑ ইত্যাদি নানান বিষয় যেগুলো আমাদের কর্মপদ্ধতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই, সেই বিষয়গুলো অভিজ্ঞ দায়িত্বশীলদের সংস্পর্শে থেকে থেকে শিখতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে কর্মপদ্ধতির যথার্থ অনুসরণ করে সাংগঠনিক মজবুতি অর্জন করার তৌফিক দান করুন।
লেখক : প্রকাশনা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply