মতিউর রহমান মল্লিকের কবিতা আন্দোলন-সংগ্রামের ফলশ্রুতি । নঈম আহমেদ

‘এখনো মানুষ মরে পথের পরে
এখনো আসেনি সুখ ঘরে ঘরে
কি করে তাহলে তুমি নেবে বিশ্রাম
কি করে তাহলে ছেড়ে দিবে সংগ্রাম’

‘আন্দোলন সে তো জীবনের অন্য নাম/ জীবন মানেই সংগ্রাম’
– কবি মতিউর রহমান মল্লিক (১৯৫৪-২০১১)

মতিউর রহমান মল্লিকের কবিতা আন্দোলন-সংগ্রামের ফলশ্রুতিআজীবন জীবনের আন্দোলন-সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। মানবমুক্তির জন্য ছিলেন সংগ্রামী ও বিপ্লবী কবি ও গীতিকার। ঐতিহ্যবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারার তিনি সবচেয়ে মৌলিক ও শক্তিমান ব্যক্তিত্ব। প্রমত, একজন খাঁটি কবি হিসেবে বাংলাদেশের কবিতায় নিজ সাহিত্যগুণে জায়গা করে নেন। ‘আবর্তিত তৃণলতা’ (১৯৮৭) প্রকাশের পর তাঁর কবিত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় সহজে। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থসমূহে কবির বিকাশ সম্পনড়ব হয় পরিপূর্ণভাবে। আশির দশকে একজন মুক্তিকামী কবি হিসেবে তাঁর স্থান অত্যন্ত উজ্জ্বল। দ্বিতীয়ত, নজরুলের ইসলামী গানের ধারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একদম ক্ষীণ হয়ে যায়। এই ধারাকে সমৃদ্ধ ও বেগবান করার ক্ষেত্রে মল্লিকের অবদান অসামান্য। প্রায় তিন হাজার গানের রচয়িতা ও সুরকার রূপে বাংলা গানের জগতে তাঁর দান অসাধারণ। সমগ্র দেশে তরুণ যুবাদের মাঝে তাঁর গানের আবেদন প্রবল ও সুদূরপ্রসারী। তৃতীয়ত, সংগঠক হিসেবে মল্লিকের জুড়ি নেই। ঢাকাসহ সারা দেশে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন সৃষ্টি করে তাকে একটা আন্দোলনের রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা প্রধান। ঢাকাসহ সারা দেশে তিনি প্রায় প্রতিটি জেলায় সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে তোলেন, যেখানে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা হবে। মতিউর রহমান মল্লিক বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাদী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব রূপে আবির্ভূত হয়ে আজো প্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন। কবি সার্বক্ষণিক বিরাজমান সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মীদের কাজে ও চেতনায়।
মানুষের জীবন সময়ের বিবর্তনের পরিণতি। মানুষের বিকাশকালে আবর্তে সীমাহীন বাধা বিপত্তি পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়েছে। এক একটা যুগ পার হতে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবনের জীবিকা ব্যবস্থা, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা গড়ে উঠেছে। সভ্যতা নির্মাণ করতে মানুষকে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। এখানে শক্তিমান ও ধনিক শ্রেণির সাথে দুর্বল ও বিত্তহীন মানুষের লড়াই ইতিহাসে বড় জায়গা জুড়ে আছে। আর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ সৃষ্টিতে যুগে যুগে মহাপুরুষদের আন্দোলন করতে হয়েছে নিরন্তর।
ভারতীয় উপমহাদেশে যুগে যুগে নানান জাতি এসেছে, শাসন- শোষণ করেছে, সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে। জনগণ অধিকাংশ সময় নিপীড়িত হয়েছে। বিশেষভাবে বাংলায় পাল, সেন, তুর্কি, পাঠান, সুলতানি, মোগল, নবাবী, ওলন্দাজ-ফরাসি-ইংরেজযুগ পেরিয়ে দেড় হাজার বছর পর ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। সেই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ব- বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্গত হয়। এই স্বাধীনতার ফলে মাত্র তেইশ বছরে গণমানুষ মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা, ব্যাপক উন্নতিঅগ্রগতি ভোগ করে। তবে ভাষাকেন্দ্রিক সঙ্কট, স্বাধিকার আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতা সংগ্রামপূর্ব-পকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়।
স্বাধীনতার পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক মতবাদ জনগণের মতামতের ও চাওয়া-পাওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর হয়। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পালাবদলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কিছুটা পরিবর্তন এলেও মৌলিক বদল ঘটেনি। অনির্বাচিত ও নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র জাতির কাঁধে ভর করে শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে। ফলে যেকোনো সংবেদনশীল কবি অসন্তোষ ও সঙ্কট অনুভব করতে থাকে। জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় আশির দশকে প্রতিবাদী কবিদের মতো কবি মতিউর রহমান মল্লিকও আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কবির কলম হয়ে ওঠে অক্ষরের অস্ত্র।
‘আজ আর পরাজয় চাই না মূলত
দুঃখভেদী সশস্ত্র অন্তরাল থেকে
অনন্তর অশ্বারোহণ চাইছি।
ঘরের চৌকাঠ, সীমানার দাম্ভিক দেয়াল,
রামধনু পাতানো খেলা- সব, সকল কিছুই
অতিক্রম করতে চাইছি;
পরাজিত পদাবলী আমার দরকার নেই।
ঘাড়বাঁকা এই আমি শাসাচ্ছি সময়;
জানি না এভাবে উদ্ধার হয় কিনা,-জানি না
এভাবে কখনো।’
[‘সবুজ বেয়াড়া এক’, আবর্তিত তৃণলতা]
এই কবিতা যখন কবি লিখছেন তখন দেশে স্বৈরতন্ত্র জেঁকে বসেছে; মানুষের স্বাধীনতা, বাক্স্বাধীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে শাসনকার্য চালাচ্ছে। সেই সময় কবি বহমান সময়ের বিপরীতে উজান ধারায় চলেছেন এবং প্রতিপক্ষকে শাসন করেছেন।
‘পথের ধুলোয় ধূসরিত হলো সমস্ত অবয়ব,
পীড়িত-মলিন হলো যে শরীর, হলো বিক্ষত সব,
অন্তর জুড়ে বয়ে গেল যত বেদনার উৎসব
হলুদ খবরে ভরে গেল মন, চিঁড়ে গেল অনুভব!
… তবুও আমার মনজিলে যাওয়া চাই :
যেখানে পূর্ণ ইনসানিয়াত বিকাশের রাহা পায়;
যেখানে মানুষ পূর্ণ হিসাব-নিকাশের রাহা পায়।
খোদার রহম-ঋদ্ধ সেই সে মনজিল পাওয়া চাই,
আল কোরানের দীপ্ত দৃপ্ত মনজিল পাওয়া চাই,
সকল বর্ণ-জাত ও জাতির তীর্থ-তৃপ্ত মনজিল পাওয়া চাই
যত দূরে থাক তবু যে আমার মনজিলে যাওয়া চাই।’
[‘মনজিল কত দূরে, অনবরত বৃক্ষের গান]
কবি স্বদেশের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে পরবর্তী কালে সমগ্র মানুষের মুক্তি কামনা করেছেন। এই মুক্তির ঠিকানা পাওয়ার জন্য কবি ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। কবি ইহকালীন ও পারলৌকিক মুক্তির পূর্ণতা চেয়েছেন। কবির মতে দুনিয়া ও আখেরাতে উভয় জগতের মুক্তিই পূর্ণ ও প্রকৃত মুক্তি। এই মুক্তি কবি চেয়েছেন ইসলামের মাধ্যমে। এ-পথেই মানুষের কাঙ্ক্ষিত সপরতা ও পূর্ণতা। স্বদেশ থেকে কবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিপীড়িত মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
‘তুমি যতই তর্জনী উঁচু করে কথা বলোনা কেন
বদর-ওহুদ এবং এক-একটি খন্দককে শেষাবধি
কি করে অস্বীকার করবে?
… কেননা বসনিয়া হার্জেগোভিনা অথবা এক
আলীয়া ইজেদ বেগোভিচ এখন
এক-একটি অপ্রতিরোধ্য বিজয়ের নাম
আর অপ্রতিরোধ্য বিজয় মানেই সানস্কি মোস্ট
এবং ট্রানোভারই নিপীড়িত মুসলমানেরা।’
[‘সানস্কি মোস্ট ও মুসলমানেরা’, অনবরত বৃক্ষের গান]

অথবা

‘ফিলিস্তিনিদের দুই হাতে পাথর
পর্বতের মতো পাথর
ফিলিস্তিনিদের মাথায় রুমাল
প্রত্যয়ের মতো রুমাল
যেন একেক জন গাজী সালাহউদ্দীন আইউবী
জেরুসালেমের প্রতিটি উঠোন থেকে
তাড়িয়ে দেবে
ইহুদ বারাকের মতো বীভৎস অভিশাপ
… ঠিক এভাবেই ফিলিস্তিন এবং জেরুসালেম
এখন আমার স্বদেশের মতো বাংলাদেশ
এবং জেহাদের মতো অনবরত উত্তাপ।’
[‘অশেষ ফিলিস্তিনীরা’, তোমার ভাষায় তীক্ষ্ণ ছোরা]
কবি মতিউর রহমান মল্লিক বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের প্রতি অবিচার, অন্যায়, নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছেন। বিশেষভাবে বসনিয়া, কাশ্মির, ফিলিস্তিন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের সমস্ত অত্যাচারিত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আওয়াজ তুলেছেন। বদর ও ওহুদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অনুপ্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছেন।
‘লাশের পাহাড়- ঢেকে যায় পথ জনপদ ভরে যায়
কী যে বীভৎস দৃশ্য এখন শহরে নগরে গাঁয়
হু-হু করে বাড়ে পণ্যের দাম জীবনের দাম কমে
সন্ধি করেছে প্রকাশ্যে ঐ মিথ্যাবাদী ও যমে
শুধু পশু কেন সেই বিতাড়িত শয়তান তড়পায়
মানবিকতার সকল দুয়ারে তালা দেয় ফেরাউন
অথবা দখল করেছে স্বদেশ পুরনো সেই শকুন
তবুও আকাশে ঈদের নতুন চাঁদ আলো নিয়ে আসে
সব আঁধারের বিরুদ্ধে শুধু বিজয়ের আশ্বাসে।’
[‘আকাশে নতুন চাঁদ’, চিত্রল প্রজাপতি]

অথবা

‘বখতিয়ারের ঘোড়ার শব্দ ঐ
লোকালয়ে যেনো অবিকল শোনা যায়
তাই কি আমিও দুই কান পেতে রই
সতেরো সওয়ার কবে আসে দরজায়
তুমি কি এখন স্বপড়ব বিভোর কেউ
মুক্তপক্ষ কোনো বিহঙ্গ শ্লোক
রঙধনু চোখে ছুঁয়ে যাওয়াতো ঢেউ
তুমি কি এখন জাগরিত কোনো লোক
তবে তুমি ছুটে চলো বেগে আরো বেগে
বন্যার মতো দুরন্ত দুর্বার
চলোতা কবীর জোরে আরো হেঁকে
পড়ে থাক পিছে পচা লাশ মুর্দার।’
[‘তুমি কি এখন’, নিষণ্ন পাখির নীড়ে]

মতিউর রহমান মল্লিকের কবিতা আন্দোলন-সংগ্রামের ফলশ্রুতি
কবি মতিউর রহমান মল্লিক
সাহিত্যান্দোলনের পথ ও পাথেয় নির্মাণ করেন আন্দোলন-সংগ্রামের পথে। সাহিত্যকে শুধুসাহিত্য হিসেবে বিবেচনা না করে মানবতার মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি দেখেছেন

কবি সমকালীন রাজনৈতিক শক্তির দুঃশাসনকে মানববিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন। মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা, সমাজ-সংস্কৃতি, ধন-সম্পদ সবকিছু তছনছ করে দেয় ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক অশুভ শক্তি। এই অশুভ শক্তির অত্যাচার দেশের মানুষ নিপীড়িত ও অত্যাচারিত হয়েছে সীমাহীন। স্বাধীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে মাটি রক্তাক্ত হতে থাকে। অন্য দিকে ক্ষমতার স্বার্থে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে দেশের স্বার্থ বিলিয়ে দিয়েছে। কবি এমনসব অনাচারের প্রতিবাদ করেছেন। উজ্জীবনের উচ্চারণ করেছেন। সাথে সাথে এই আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন গানে :
‘এই দুর্যোগে এই দুর্ভোগে আজ
জাগতেই হবে জাগতেই হবে তোমাকে
জীবনের এই মরু বিয়াবানে
প্রাণ আনতেই হবে, আনতেই হবে তোমাকে।’
এইভাবে কবি মতিউর রহমান মল্লিক সাহিত্যান্দোলনের পথ ও পাথেয় নির্মাণ করেন আন্দোলন-সংগ্রামের পথে। সাহিত্যকে শুধুসাহিত্য হিসেবে বিবেচনা না করে মানবতার মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি দেখেছেন। মানবতাবাদী এই কবি বাংলাদেশকে কেন্দ্রে রেখে সমগ্র বিশ্বের মানুষের মুক্তির আকুতি জানিয়েছেন এবং কর্তৃত্ববাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের বিনাশ কামনা করেছেন। কবির মতে গণজাগরণের মাধ্যমেই কেবল সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

লেখক : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply