মতিউর রহমান মল্লিক অন্য উন্মোচন -আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

[দ্বিতীয় কিস্তি]

যেভাবে শুরু হলো তার

বাগেরহাটে মাদরাসা ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তার প্রতিভা, মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতার স্ফুরণ ঘটতে থাকে। পারিবারিক সূত্রে পাওয়া পথ ধরে তিনিও পালা গান গাইতেন। বিশেষ করে এলাকার মাহফিলগুলোতে গজল গাইতেন। সে সময় যে কোনো ইসলামী গানকে গজল বলা হতো। হামদ, নাতসহ বিভিন্ন ধরনের আদর্শিক গান গাওয়া হতো। মতিউর রহমান মল্লিক প্রচলিত গানগুলো গলা ছেড়ে গাইতেন, এক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
ছাত্র ইসলামী সংগঠনে সম্পৃক্ত হয়ে দায়িত্বশীল হিসেবে এগিয়ে আসার কারণে তাঁর মধ্যে একটি নতুন তাগিদ (টৎমব) জন্ম নিলো। আর সেটি হলো কাজী নজরুল ইসলাম, আব্দুল আলীম, সিরাজুল ইসলামদের গানের পাশাপাশি নতুন নতুন গান রচনা করা। এ কারণে উনার প্রথম দিকের গানগুলোতে ঐসব জনপ্রিয় গানের বিশেষ করে সুরের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

তাঁর গানসমূহ নিয়ে প্রথম সঙ্কলন ‘ঝঙ্কার’। ১৯৭৮ সালে প্রথম প্রকাশিত এই গানের সঙ্কলনটিতে মোট ৫২টি গান স্থান পায়। পরবর্তীতে এর আরো সংস্করণ হয়। এ বইয়ের গানগুলোকে একটু পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে প্রথম দিককার অধিকাংশ গান ছিল হামদ, নাত ও ইসলামী গজল। শেষ দিকে এসে তিনি কিছু সংগঠন ও আন্দোলনমুখী গান রচনা করেন। এ সমস্ত গানকে অন্য বিবেচনায় প্রাক-ঢাকা জীবনের গানও বলা চলে। ঢাকায় আসার আগে এ সমস্ত গান রচিত, সুরারোপিত ও গীত হয়। এ সঙ্কলনের প্রথম গান-
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
নেই কেহ নেই আল্লাহ ছাড়া
এ গানটিতে তিনি পাখির গানে গানে/ হাওয়ার তানে তানে/ ফুলের ঘ্রাণে ঘ্রাণে অলির গুঞ্জরণে/ নদীর কলকলে ঢেউয়ের ছলছলে/ তারার চোখে চোখে/ চাঁদের মুখে মুখে/ আকাশ নীলে নীলে/ মুখর ঝিলে ঝিলে/ ঐ নামের মহিমা…

গান, সুর, নূর, ঝর্ণা ধারার যে চমৎকার উপস্থিতি বর্ণনা করেছেন তা অনন্য সাধারণ। দর্শক শ্রোতা, পাঠকরা এই গানে নতুনের আস্বাদ লাভ করেন। এ সঙ্কলনের দ্বিতীয় গানটি হলো-
“আল্লাহ নামের গান গেয়ে দেখ
কেমন লাগে নামের সুর
ঐ নামে যে যাদু রাখা
ঐ নামে যে শহদ মাখা
পান করে দেখ কী মধুর।”

এ গানের বাণী ও সুরে কাজী নজরুল ইসলামের হামদ-এর অনুরণন শোনা যায়। শ্রোতাবৃন্দ যেন একজন তরুণ নজরুলকেই আবিষ্কার করেন এই গানের মাঝে। তৃতীয় গানটি ‘আল্লাহ নামের তাসবিহ’ শিরোনামে। আল্লাহ নামের মহিমা বর্ণনার পাশাপাশি এ নাম জপলে কি অর্জন হতে পারে তার একটি আনুপূর্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যার সবশেষ প্যারাটি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।
“জপে ও নাম হতে পারি বিপ্লবী বীর
ভয় না করে দিতে পারি নারায়ে তাকবির।
জপে ও নাম হযরত ওমর
হলো শাসক বিশ্বজয়ী
জপে ও নাম হযরত খালিদ
সেপাহসালার দিগি¦জয়ী
জপে ও নাম গড়ব আবার
ইসলামী সেই সমাজ খোদার
আয় ছুটে আয় শেরদিল যারা”
এখান থেকেই মতিউর রহমান মল্লিক সমাজ বদলের আহ্বান শুরু করলেন দীপ্তকণ্ঠে।

এ বইতে সঙ্কলিত পরবর্তী কয়েকটি গানের শিরোনাম হলো-
“মাঠ ভরা ঐ সবুজ দেখে
নীল আকাশের স্বপ্ন এঁকে
যার কথা মনে পড়ে
সে যে আমার পালনেওয়ালা।”

“হাত পেতেছে এই গোনাহগার,
তোমারি দরগায় খোদা, তোমারি দরগায়,
শূন্য হাতে ওগো তুমি,
ফিরাইও না হায় মোরে ফিরাইও না হায়।”

“আমার কণ্ঠে এমন সুধা
দাও ঢেলে দাও হে পরোয়ার
যা পিয়ে এই ঘুমন্ত জাত
ভাঙে যেন রুদ্ধ দ্বার।”
“আজকে আমার প্রাণ-সাগরে
আল্লাহ নামের নূর
উথাল পাথাল ঢেউ তুলেছে,
যেন পাহাড় তুর।”

এসব হামদে বারি তায়ালার পর বেশ কয়েকটি নাতে রাসূল স্থান পায়-
“সবার সেরা সৃষ্টি যেজন
মোহাম্মদ তাঁর নাম
তামাম জাহান দরুদ পড়ে
ছাল্লে আলা ওয়া সাল্লাম।”

“ও কে ঐ কোন সে কবি
ধ্যানের ছবি
হেরার গুহাতে
ওকি সেই প্রশংসিত
সুবাঞ্ছিত রিক্ত ধরাতে।”

“ছাল্লে আলা ছাল্লে আলা
মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ।”

“ইয়া মোহাম্মদ মোস্তফা
সাইয়্যেদুন্নবী
ইয়া শাফিউল মুশাফ্ফা
কামলিওয়ালা আরাবী।”

“ওগো ও কামলিওয়ালা
ইয়া নবী ছাল্লে আলা
তোমারে মনে পড়েছে
তোমারে মনে পড়েছে।”

“বাংলাদেশের প্রান্ত হতে
সালাম জানাই হে রাসূল
আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলায়
তোমার আশিক কুল।”

“এলো কে কাবার ধারে
আঁধার চিরে
চিনিস নাকি রে
ওকে ও মা আমিনার,
কোল জুড়ে চাঁদ
জানিস নাকি রে।”

“সব মানুষের সেরা মানুষ
সব সততার মূল
সেইতো আমার নয়নমণি
সেইতো আমার পান্না চুনি
মোহাম্মদ রাসূল।”

“ও প্রেমের নবী
ও ধ্যানের ছবি
তোমার পানে চেয়ে ব্যাকুল ধরা
ও রবির রবি
ও শ্রেষ্ঠ নবী
তোমার ছোঁয়ায় ভাঙে লৌহকারা।”

“তিনি নন্ তো শুধু আরবের
নন্ কোনো চিহ্নিত সীমানার
নন্ শুধু বিস্তৃত আজমের
তিনি এ দেশের
তিনি সে দেশের
তিনি সকল দেশের
সারা বিশ্বের…..।”

“আয় কে যাবি সঙ্গে আমার
নবীর দেশে আয়
যেথা মরুর ধুলো স্নিগ্ধ হলো
লেগে নবীর পায়….।”

নবীয়ে রাহমাত, বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। হাবীবে খোদা রাসূলে আকরাম সা.-এর জীবন, কর্ম, ভালোবাসা ও তার শেখানো আদর্শকে কেন্দ্র করে যেসব অসাধারণ নাতে রাসূল মল্লিক রচনা করেছেন তা কালের সীমানা অতিক্রম করেও বেঁচে থাকবে। প্রথম গানের সঙ্কলনে হামদ, নাতের পর স্থান পায় আল্লাহর রাহে, জিহাদের পথে উদাত্ত আহবানমূলক তার গানসমূহ। এ যেনো কোনো আহবানমূলক ভাষণের পূর্বে আল্লাহ তায়ালার হামদ রাসূলের ছানা আদায়ের মতো। এ পর্যায়ে যে গানগুলো পাই তা হলো-
“নিপীড়িত মানুষের হাহাকার চিৎকার
প্রতিদিন প্রতিক্ষণ বাড়ছে।
জালিমের কালো থাবা বিষাক্ত লোলুপতা
স্বাধীনতা স্বাধিকার কাড়ছে।”

“সাথে সাথে দৃঢ়তা জনতার
বরাভয় কোরানের বারতার
ঘরে ঘরে জেহাদের ঘাঁটি গড়ো দুর্জয়
হোক যত দুর্যোগ আজকে।”

“চল্ চল্ চল্রে চল্ জিহাদের ময়দানে
চল্ চল্ ছুটে চল্ মুক্তির সন্ধানে।”

“আমাদের গতিবেগ রোখে কে
চুরমার হয়ে যাবে আজকে সে
ঝঞ্ঝা কি যায় বাঁধা
বাঁধা যায় বন্ধনে?”

“কে আছিস বীর আয় ছুটে আয়
খোদার পথে জীবন বিলাই
কারবালার এই প্রান্তরে ফের
বালাকোটের এই মাঠে ফের
তৌহিদেরই নিশান উড়াই।”

“চলো মুজাহিদ চলো চলো
জিহাদের ময়দানে চলো
শহীদের ঈদগাহে চলো
অন্যায় জুলুম বাতিলের ভিত্তি
বজ্রের হুঙ্কারে দলো
চলো চলো।”

“আমরা জেগেছি জাগাব এবার
শত কোটি তাজা প্রাণ
মিলিত ঐক্যে ভেঙে চুরে যাব
জুলুমের জিন্দান।”

“আগুনের ফুলকিরা এসো জড়ো হই
দাবানল জ¦ালবার মন্ত্রে
বজ্রের আক্রোশে আঘাত হানি
মানুষের মনগড়া তন্ত্রে।”

“চলো চলো চলো মুজাহিদ
পথ যে এখনো বাকি
ভোলো ভোলো ব্যথা ভোলো
মুছে ফেল ঐ আঁখি।”

“জেহাদের এই কাফেলা বন্ধু
চিরদিন বেঁচে থাকবে
সত্যের পথে মুক্তির পথে
তোমাকে আমাকে ডাকবে।”

“এই দুর্যোগে এই দুর্ভোগে আজ,
জাগতেই হবে, জাগতেই হবে তোমাকে
জীবনের এই মরু বিয়াবানে
প্রাণ আনতেই হবে, আনতেই হবে তোমাকে।”

“সত্যের নামে সংগ্রামী ছিল
অন্যায় রোধে বিপ্লবী ছিল
কোথা সে মুসলমান, কই সে মুসলমান।”

“মুসলিম আমি সংগ্রামী আমি
আমি চির রণবীর
আল্লাহকে ছাড়া কাউকে মানি না
নারায়ে তাক্বির
নারায়ে তাক্বির।”

“আমাদের সামনে বাধার পাহাড়
সাথে বহে টলমল রক্ত নদী
মঞ্জিল দূরে নয় দুঃসাহসে
কদম কদম পথ চলো যদি।”

“আজ যতো প্রয়োজন গান গজলের
আর যতো প্রয়োজন শিল্পীর
তারও চেয়ে প্রয়োজন সংগ্রামী আর
সিংহ সাহসী কর্মীর।”

“দাও খোদা দাও হেথায় পূর্ণ ইসলামী সমাজ
রাশেদার যুগ দাও ফিরায়ে দাও কোরআনের রাজ।”

ঝংকারের গানগুলোর মধ্য থেকে অধিকাংশ গানের মুখ, কিছু গানের সঞ্চারী উপরে উল্লেখ করা হলো। এ গানগুলোতে মতিউর রহমান মল্লিকের ধারাবাহিকতা, পূর্ণতা ও পর্যায়ক্রমিক আহবান ও আবেদন ফুটে উঠেছে। মফস্বলে বসে যে গানগুলো লিখেছেন, গেয়েছেন সেগুলো মূলত হামদ নাতে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও এরই ফাঁকে ফাঁকে বিপ্লবী কর্মীদের প্রতি সামনে চলার প্রত্যয়দীপ্ত আহবানও রয়েছে।
‘চলো চলো চলো মুজাহিদ, পথ যে এখনো বাকি’ এ গানটির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। মল্লিক তখন বাগেরহাটে থাকেন। রোজ হেঁটে হেঁটে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াতি কাজ করতেন। এ সময় তাঁর অন্যতম একজন সঙ্গী ছিলেন ঐ এলাকার একজন মেধাবী তরুণ। তার নাম মুজাহিদুল ইসলাম। হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়লে, কিংবা ক্ষুধায় কাতর হয়ে গেলে, দ্বীনের পথে দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারীদের ঘৃণা কিংবা প্রত্যাখ্যানে পর্যুদস্ত হলে থেমে যেতে চাইলে নতুন উৎসাহ জাগানোর গান এটি।

দেশের অন্যতম মেধাবী মুখ জনাব মুজাহিদুল ইসলাম তার অসংখ্য সঙ্গীর একজন। এভাবে সঙ্গী সাথী, অদেখা মানুষদের হৃদয়ে দাওয়াত, জিহাদ আর সংগ্রামের অদম্য প্রেরণা সৃষ্টি করেছেন মল্লিক গানে গানে।
এ বইটির সর্বশেষ কয়েকটি গান সংগ্রাম সাধনা লড়াই করে দ্বীনকে বিজয়ী করার এক উন্মুল তাগিদ। এসব গানের কথা ও সুর অনেক গভীরের উচ্চারণ। টলমল রক্ত নদীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি গেয়েছেন বিজয়ের গান। সাফল্যের দিকে আহ্বান করেছেন নির্ভয়তার সাথে।
ঢাকার বুকে এসে তিনি রচনা করেছেন অসাধারণ প্রার্থনা সঙ্গীত-
“দাও খোদা দাও হেথায় পূর্ণ ইসলামী সমাজ
রাশেদার যুগ দাও ফিরিয়ে দাও কোরআনের রাজ।”

কোটি কোটি বঞ্চিত মানুষের বাতিল মতের জিন্দানে লাঞ্ছিত হাওয়া, লাখ শহীদের রক্তে সোনার স্বদেশ রঞ্জিত হওয়া, ছেলেহারা মায়ের বুকে জমাট বাঁধা ব্যথার কথা উল্লেখ করে তিনি মহান রবের কাছে কাতর মিনতি করেছেন-
“আর কত চাও রক্ত খোদা উজাড় এদেশ উজাড় প্রায়
আর কত চাও শহীদ খোদা উজাড় এদেশ উজাড় প্রায়
চাইলে আরো, নাও গো আরো
রক্ত সাগর ভরো ভরো
সকল কিছুর বদলাতে দাও
খোদা তোমার রাজ।”

২০১০ সালে কবি রব্বে কারীমের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। এ গানটি তারও ৩০ বছর আগের। তারপর ২০১০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত আমরা পেরিয়ে এসেছি এক রক্তাক্ত যুগ, হারিয়েছি অসংখ্য তরুণ তাজা প্রাণ, হারিয়েছি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। মতিউর রহমান মল্লিক সেই ৩০ বছর আগেই এই জীবন দেয়ার, গ্রাম থেকে শহর উজাড় করে লড়াই করার দৃশ্য এঁকেছেন। আর সকল কিছুর বিনিময়ে শুধু একটিই বদলা চেয়েছেন যেনো আল্লাহর দুনিয়ায় তারই রাজ কায়েম হয়। এই ছিল আমাদের দরবেশ কবি জিন্দাদিল মুজাহিদের তামান্না। উদ্দেশ্য ছিল এ পর্বেই লেখাটি শেষ করবো। কিন্তু প্রিয় কবির বিশুদ্ধ চিত্ত থেকে উৎসারিত ইসলামী আন্দোলনের অনাগত দিনের কর্মীদের জীবন আলোকিত করার মতো আরো কিছু লেখা নিয়ে শেষ কিস্তি সমাপনের লোভ সামলাতে পারছি না। আল্লাহ যেনো এ কাজটি শেষ করার তৌফিক দেন। আমিন।
[চলবে]

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট,
গবেষক

SHARE

Leave a Reply