মধু -উম্মে নাজিয়াহ

মধু আল্লাহ পাকের বিস্ময়কর সৃষ্টির একটি। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ঐড়হবু রং সড়হবু ধহফ সড়হবু রং যড়হবু। সত্যিই তাই, যুগ যুগ ধরে মধু একটি অতি মূল্যবান দ্রব্য হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ। যার শুধু অর্থনৈতিক মূল্যই নয়, রয়েছে খাদ্য, ঔষধ এবং ভেষজ গুণাবলি। শিশু জন্মের পর তার মুখে মধু তুলে দেয়া হয়। সমাজে কারো কণ্ঠস্বর কর্কশ হলে আমরা বলে থাকি জন্মের সময় হয়ত তার মুখে মধু দেয়া হয়নি। মধু এমন একটি প্রাকৃতিক খাদ্য, যা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়।
মধু সম্পর্র্কে পবিত্র আল কুরআনুল কারিম এবং হাদিস শরিফে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। সূরা নাহলের (নাহল অর্থ মৌমাছি) ৬৮-৬৯ নম্বর আয়াতে মধু সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে : “আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ দিলেন পাহাড়ে ও গাছে এবং তারা যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে নিবাস বানাও। অতঃপর সর্বপ্রকার ফল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানি নির্গত হয়, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” ইবনে মাজাহ শরিফের হাদিসে আছে, নবী (সা) বলেছেন, মধু হলো সকল রোগের ঔষধ এবং আল কুরআন পাঠ মনের সকল রোগ দূর করে। কাজেই আমি তোমাদের জন্য দু’টি রোগপ্রতিষেধক রেখে গেলামÑ তা হলো আল কুরআন এবং মধু।
প্রাচীনকাল থেকেই মধু ব্যাপকভাবে সমাদৃত। প্রাচীন সভ্যতায় ইতিহাসে মধুর ব্যবহার সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যাদি পাওয়া যায়। এগুলো কাদামাটির ফলকে লিখিত ছিল। এ ধরনের একটি লেখা এরূপ : ‘‘আমার প্রাণপ্রিয় বরযাত্রীগণ, ওহে আমার হৃদয়েশ্বর, তোমার সৌন্দর্য মধুর মতো মিষ্ট।” প্রাচীন ব্যাবিলনবাসীরা মধু ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করতো। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ সালের পূর্বের প্রাচীন ব্যাবিলনের সামিবিয়ান ভাষায় এসব দলিল পাওয়া যায়। ৫০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনে মধু ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হজরত ঈসা (আ) জন্মের পর রোমের রাজা শিশু নবীর জন্য যে সকল উপহার পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিলো মধু, সুগন্ধি পবিত্র পানি এবং পোশাক।
সংস্কৃত সাহিত্যে মধুর ব্যবহারের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ সালে ভারতবর্ষে আট প্রকার মধুর ব্যবহারের কথা জানা যায়। প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত পন্ডিত অ্যারিস্টোটল তার ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে (৩৪০-৩৪২ খ্রিষ্টপূর্ব) মৌমাছির ওপর পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য প্রদান করেছেন।
আমাদের অতি পরিচিত মৌমাছি একটি সামাজিক পতঙ্গ। এরা স্থায়ী চাক তৈরি করে বসবাস করে। প্রতিটি চাকে একটি রানী মৌমাছি থাকে, আর থাকে পুরুষ এবং নারী শ্রমিক মৌমাছি। শ্রমিক মৌমাছিরাই সব কাজ করে থাকে। এরা একই চাকে তিন পুরুষ মিলেমিশে বসবাস করে। পৃথিবীতে ২০,০০০ প্রজাতির মৌমাছি রয়েছেÑ এর মধ্যে এপিস সেরেনা, এপিস মেলিফেরা, এপিস ভরসাটা (জংলী মৌমাছি) এবং এপিস ফ্লোরিয়া (খুদে মৌমাছি) বেশি দেখা যায়। এপিস মেলিফেরা ইউরোপিয়ান মৌমাছি যা গৃহপালিত হিসেবে চাষ করা যায়। বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৫,০০০-২০,০০০ মৌচাষি রয়েছেন, যারা বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করে থাকেন। এক একটি মৌমাছি মধুর জন্য তার চাক থেকে ২-৩ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করে থাকে। রানী মৌমাছি একধরনের হরমোন নিঃসরণ করে, তার গন্ধ অনুসরণ করে মৌমাছিরা তাদের চাক চিনতে পারে। মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে মধুবিন্দু এবং মৌমাছির পায়ে অবস্থিত পরাগবাক্সে পরাগ রেণু সংগ্রহ করে রাখে। মৌমাছি প্রথমে ফুলের মধু খেয়ে ফেলে, পরে তা মৌমাছির পাকস্থলীতে এনজাইমের সাহায্যে পরিবর্তিত হয়ে আমাদের ব্যবহৃত মধু আকারে ওদের মুখে ফিরে আসে। মৌমাছিরা ঐ মধু চাকে রেখে তা ডানা দিয়ে বাতাস করতে থাকে এবং আর্দ্রতার পরিমাণ যখন ১২%-এ আসে তখন প্রাকৃতিক মোম দিয়ে প্রকোষ্ঠগুলো সিল করে দেয়, যাতে বাইরের ধুলা-বালি, রোগ জীবাণু মধুতে প্রবেশ করে নষ্ট না করতে পারে। এটিই হলো প্রাকৃতিক পাকা মধু। চাষিদের উৎপাদিত মধু অনেক সময় পাকা থাকে না, তখন সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগ অথবা কোনো রাসায়নিক মেশালে মধুর গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং মধু কেনার সময় এই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক পাউন্ড মধু সংগ্রহ করতে একটি কর্মী মৌমাছির ১ লক্ষ ২০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে ক্লান্ত মাছিটির পাখা ছিঁড়ে যায় এবং হার্ট ফেল করে মারা যায়। কোটি কোটি মৌমাছি তাদের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের জন্য মধু সংগ্রহ করে থাকে।
পৃথিবীতে হাজার রকমের ফুল এবং শস্যজাতীয় উদ্ভিদ থেকে মধু পাওয়া যায়। আমাদের দেশে সরিষা, কালোজিরা, লিচু, ধনিয়া, সূর্যমুখী, শসা, স্কোয়াশ, তাল, খেজুর, পিঁয়াজ, তামাক প্রভৃতি ফুল থেকে পর্যাপ্ত মধু পাওয়া যায়। আপাতদৃষ্টিতে আমরা বুঝে থাকি মৌমাছি মধু উৎপন্ন করে থাকে, কিন্তু বাস্তবে মৌমাছি মধু ছাড়াও আরও পাঁচ ধরনের অতিমূল্যবান দ্রব্য উৎপন্ন করে থাকে।
প্রোপলিজ : ত্বকের কোনো ক্ষত সারাতে প্রোপলিজ উপকারী। এ ছাড়া এটি জেনিটাল হারপিস এবং ঠান্ডা সারায়। দাঁতের অপারেশনের পর প্রোপলিজ ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে এবং ক্ষতের বিরুদ্ধে কাজ করে।
রয়্যাল জেলি : এটি টিউমার ব্যাকটেরিয়ার ওপর কাজ করে, এই জেলিতে ক্ষত সারানোর উপাদান রয়েছে। যাদের মৌসুমি অ্যালার্জি রয়েছে রয়েল জেলি তাদের ভালো কাজ দেয়। এ ছাড়া এটি ত্বকের সুরক্ষা দেয়, মেনোপোজের পরের মহিলাদের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে, হাড়ের রোগ যেমন ওস্টি ও পোরোসিস ভালো করে, ক্ষত সারায় এবং বন্ধ্যত্ব দূর করে।
মোম : প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত এই মোম প্রসাধনীতে প্রচুর ব্যবহৃত হয়। প্রাকৃতিক এই মোম খাওয়াও সম্ভব, এতে কোনো ক্ষতি নেই। কৃত্রিম মোম প্রাকৃতিক এই মোম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
পোলেন : মৌমাছি ফুল থেকে সংগ্রহ করে এটি ভিটামিন, মিনারেলস, কার্বোহাইড্রেট, লিপিড এবং প্রোটিনের মিশ্রণ। পোলেন শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং পেটের রোগের জন্য উপকারী। পোলেন এবং মধু মিশিয়ে মৌমাছিরা কেক তৈরি করে থাকে যাকে পোলেন কেক বলে। পোলেন প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
বি-ভেনম: মৌমাছির বিষ অতি মূল্যবান। আমরা জানি সাপের বিষ থেকে কত দামি জীবনরক্ষাকারী ঔষধ প্রস্তুত করা হয়। সে রকম মৌমাছির বিষ থেকে মূল্যবান ঔষধ প্রস্তুত সম্ভব। মৌমাছির হুলে (ংঃরহম) বি-ভেনম পাওয়া যায়। রিউমাটয়েড আর্থরাইটিসে নার্ভের ব্যথা কমায়, অ্যালার্জির উপকার হয়। এ ছাড়া মাংসপেশির ফোলা কমায়।
ছয় ধরনের বস্তু তৈরি করা ছাড়াও মধু বিভিন্ন উদ্ভিদের পরাগায়ণও করে থাকে। পরাগায়ণ অতি গুরুত্বপূর্ণ। পরাগায়ণ ব্যতীত পৃথিবীতে কোনো ফল, শস্য উৎপাদিত হতে পারে না। সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি মৌমাছি করছে। সরিষা, পিঁয়াজ ও লিচুসহ সকল ফসলে মৌচাষ করলে ১৫-২০% ফসল বৃদ্ধি পায়। যদি মৌমাছির পরাগায়ণের মূল্য হিসাবে আনা যায় তাহলে দেখা যাবে মৌমাছি আমাদের জন্য কোটি কোটি টাকার উপকার করছে।
মধুতে গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ, ডেক্সট্রিন, প্রোটিন, এসিড, লৌহ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়ামসহ আরো শতাধিক উপাদান পাওয়া যায়। শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সের মানুষের জন্য মধু উপকারী। মধু রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে।
গবেষণায় মধুর বিভিন্ন ধরনের গুণাবলির তথ্য জানা গেছে। মধু গ্রাম পজিটিভ এবং গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। কিন্তু মধু উত্তপ্ত করলে, সরাসরি সূর্যের আলোতে রাখলে অথবা মধুর সাথে টকজাতীয় বস্তু যোগ করলে এই গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। যে কোনো খাবারে মধু যোগ করে রান্না করার রেওয়াজ আছে। আমাদের ধারণা এতে মধুর পুষ্টিমান অক্ষুণœ থাকে। কিন্তু আসলে এতে এনজাইম নষ্ট হয়ে যায়। মধুর যে ঘনত্ব¡ আছে যা পুড়ে যাওয়া নিরাময়ে একটি মহৌষধ। মধুর প্রলেপ ত্বকের কোষের কোনো ক্ষতি করে না বরং ত্বককে মসৃণ করে। শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যালার্জি, রক্তশূন্যতা, যেকোনো ধরনের হজমের গোলমাল, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, হার্টের সমস্যায় মধু ভালো কাজ করে। নিয়মিত মধু খেলে ডায়াবেটিসের ঝুুঁকিও কমে যায়। এক কথায় মধু মহৌষধী। রাশিয়া এবং ইংল্যান্ডে সার্জিক্যাল ড্রেসিং এ দেহের বাইরের ক্ষতে এবং পোড়া রোগীর ক্ষেত্রে মধু দিয়ে ড্রেসিং করা হয়। সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি প্রয়োগ করলে ত্বকে যে ধরনের পরিবর্তন হয় মধুও সেই কাজ করতে পারে। জিহ্বা বা মুখে ঘা হলে রাতে ঘুমানোর আগে মধুর প্রলেপ দিলে ক্ষতস্থান সেরে যাবে। আমাশয় এবং টাইফয়েডে মধু খুবই কার্যকরী। রূপ চর্চাতেও মধু অতুলনীয়। প্রাচীন মিসরীয় রমণীরা রূপচর্চায় মধু ব্যবহার করতেন। রোম এবং পারস্যের মহিলারা বহু শতাব্দী থেকেই মধু ব্যবহার করতেন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় হেনরির স্ত্রী মার্গারেট, ইংল্যান্ডের রাজকুমারী অ্যান রূপচর্চায় মধু ব্যবহার করতেন। ভারতীয়রাও নিয়মিত মধু ব্যবহার করে। ফ্রান্স, জার্মানি এবং জাপানে মধু মিশ্রিত চুলের কন্ডিশনার শ্যাম্পু, সাবান, পেস্ট এবং প্রসাধনী সামগ্রী বহুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
মধু এক কথায় অসাধারণ। মধুর তুলনা মধুই। মধুকে কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা চলে না। অদ্বিতীয়, অতুলনীয় মধুর সঠিক আহরণ এবং নিয়মিত খাওয়ার মাধ্যমে রয়েছে সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা।

SHARE