মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন অনিবার্য

সোলায়মান আহসান#

Rajnityযেখানে ভূতের ভয় থাকে, মনের ভেতর থেকে তা তাড়াতে জোরে জোরে একাকী গান গাওয়া হয়। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতাদের জোর গলায় ‘২০১৯ এর আগে নির্বাচন নয়’ বলার ধরনটা সে রকম মনে হচ্ছে। ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর এবং ‘শূন্য হাতে’ ফিরে স্মার্টলি বলাÑ পরদেশের স্বীকৃতি মিলেছে, নাহলে চুক্তি-টুক্তি স্বীকৃতি পাওয়া যাচ্ছে কিভাবে? তবে এসব দিয়ে প্রমাণ মিলে বিগত ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে স্বস্তিতে নেই তারা। প্রধানমন্ত্রী খুনি দলের সঙ্গে সংলাপের প্রশ্নে যতোটা অনড়, নির্বাচন সম্পর্কে তেমন নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করতে দেখা যায় না।
বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, মিডিয়াগুলোর অধিকাংশের মূল খুঁজতে গেলে দেখা যায় দু-একটি হাতেগোনা ছাড়া সবগুলিই আওয়ামী লীগ এবং প্রতিবেশী একটি দেশের স্বার্থ রক্ষায় গাঁটছড়া বাঁধা। এর কারণ, একটি পত্রিকা কিংবা একটি মিডিয়া (ইলেকট্রনিক) প্রতিষ্ঠা করা বিপুল অর্থলগ্নির বিষয়। আবার বিজনেস হিসেবে মিডিয়া ব্যবসা খুব একটা লাভজনক নয়। যদি না বক্র পথে হাত না বাড়ায়।
তাই পত্রপত্রিকা প্রকাশ বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠার পেছনে নানা ধরনের উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। সেই কারণে বিপুল অর্থের জোগানদাতা সেই উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে মিডিয়াকর্মীকে কাজে লাগায়। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশের দু-একটা বাদে অধিকাংশ মিডয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন ব্যতীত বেশি কিছু স্বীকৃতি দিতে পারেনি। বামপন্থী, নব্য, আওয়ামী জোট চিহ্নিত সাংবাদিকগণও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ বলেননি। সরকার ‘অবৈধ’ না ‘বৈধ’ এমন বিতর্ক রাজনৈতিক মহলে অহরহ আছেই।
একটু বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখতে চাই বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার উপযোগিতা কতটুকু।
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর একটি অযুত সম্ভাবনার দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। ৯ মাসের নাতিদীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি হয়, সংক্ষিপ্ততম সময়ের মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত একটি দেশের স্বাধীনতা। অনেক আশা অনেক সাধ অনেক সম্ভাবনার হাতছানি দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি পেলো স্বাধীনতা, দেশ, পতাকা। অথচ সবচেয়ে বড় যে পাওয়া ছিলো জনগণের শাসন ‘গণতন্ত্র’ তা আজো তিমিরিই রয়ে গেল। এখনও ১০টি জাতীয় সংসদের নির্বাচন আমাদের দিতে পারেনি জগণের শাসনব্যবস্থা। ১৯৯১ থেকে যদি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা ধরা হয়, তবে ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি স্বল্পকালের সংসদ বাদে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ও নবম, এই চারটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে। আর কেয়ারটেকার সরকারের বিধান সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তিনবার। এসব নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা থাকলেও সংসদের মেয়াদ পূর্ণ করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়া লাগেনি। কারণ ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোটদান কার্যক্রম একেবারে অবরুদ্ধ ছিল না। তাছাড়া প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচন বয়কটের ঘটনাও ঘটেনি। ১৯৮৬ এর ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় সংসদের আয়ু পায় কুড়ি মাস। ১৯৮৮ সালে ৩ মার্চের চতুর্থ সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। জাসদ (রব) নেতা আ স ম আব্দুর রব কর্তৃক প্যাডসর্বস্ব ৭৬ দলীয় মোর্চাকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়ে চতুর্থ সংসদকে টেনে নেয়া সম্ভব হয়েছিল ২ বছর ৯ মাস আর ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের মেয়াদ তো সর্বজনবিদিত। মাত্র ১৫ দিন। অবশ্য এ সংসদ গঠিত হয়েছিল সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন নির্বাচনকালীন অরাজনৈতিক সরকার কেয়ারটেকার সরকার বিধান পাসের জন্যই।
বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র বর্তমান কালে এসে ক্রান্তিকালের মধ্যে পড়েছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং মিডিয়ার আওতা সম্প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে সরকার পরিচালনায় জগণের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে বিচার ব্ুিদ্ধর বিকাশের কালে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ তে দেশের ১০ম সংসদ নির্বাচনের নামে যা অনুষ্ঠিত হলো তা একটি বড় ধাক্কা। এ ধাক্কা জনগণ মেনে নিতে চাচ্ছে না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের হাতে গণতন্ত্র কতটুকু নিরাপদ এখন তা স্পষ্ট প্রশ্নের মধ্যে পড়েছে। শুধু গণতন্ত্র কেন মানুষের জান মাল ধর্মীয় স্বাধীনতাও বিপন্ন এমন আশঙ্কা জনমনে দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্যতম প্রকাশ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ইতিহাস খুব উজ্জ্বল নয়। স্বাধীনতার পরপর সব দল নিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করে নতুন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান সামরিক সরকার ইয়াহিয়ার হাতে অনুষ্ঠিত ১৯৭০ এর নির্বাচনী ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সরকার গঠিত হওয়া বিশ্লেষকদের মতে একটি ভুল পদক্ষেপ। তা-ও না হয় বৃহত্তর স্বার্থে যুদ্ধবিধ্বস্তদের মানুষ মেনে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর? তারপর আওয়ামী লীগের দুঃশাসন আর গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের ধারা মানুষ কিভাবে মানবে? আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে কতটুকু বিশ্বাস করে তা ১৯৭৩ (৭ মার্চ) এর প্রথম জাতীয় সংসদের নির্বাচনেই প্রমাণ দিলো। তখনও স্বাধীনতাযুুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা এবং শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতি সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে পরাজয়ের কোন সম্ভাবনাই ছিলো না। কিন্তু সেই অনিবার্য বিজয়ের নির্বাচনকেও হাস্যকর নির্বাচনে পরিণত করলো ৩০০ আসনের ২৯টি আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে যার মধ্যে ১১টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিজয়ী এভাবেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হওয়ার কালো অধ্যায়ের সূচনা হলো। বিশিষ্ট সাংবাদিক দিলিপ গাইনের বর্ণনানুসারে প্রথম সংসদীয় পদ্ধতির নির্বাচনেই ১৯৭৩ সালে ভোট কারচুপির নজির ব্যাপক প্রকৃতি লাভ করেছিল। ১৯৭৫ এ (১৫ আগস্ট) এসে শেখ মুজিবের সেনা বিদ্রোহের মুখে মৃত্যুবরণ জাতি হিসেবে আমাদের এক চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। কারণ এতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা গণতন্ত্রের শকটটি একেবারে ভেঙে খান খান হয়ে পড়ল। যদিও ১৯৭২ থেকে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি শাসন, চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল গঠন, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্র অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে প্রকাশনা সীমিতকরণ। রক্ষীবাহিনীর বেপরোয়া হয়ে ওঠা। বিশেষত দেশপ্রেমিক নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম, গণতন্ত্রের সুবাতাস প্রবাহে অনেকটাই আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। দমবন্ধ হবার উপক্রম হতেই মানুষও চাইছিল পরিত্রাণের পরিবর্তনের।
হারানো গণতন্ত্র আবার এ দেশে ফিরে এলো সেনাশাসক জেনারেল (শহীদ জিয়াউর রহমানের) হাত দিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দু’টি বিষয়ের জন্য এই সেনাপ্রধানকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। এক, ১৯৭১ এ দিগভ্রান্ত জনগণকে স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা (আমি মেজর জিয়া বলছি…) আর দুই, ১৯৭৫ এর পর বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
১৯৭৯ (১৮ ফেব্রুয়ারি) যে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের নির্বাচন সত্যিকার অর্থে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রাকে প্রশস্ত করেছিল। সেই সুস্থ ধারা যদি টিকে থাকতো, ১৯৮১ (৩০ মে) তে জিয়ার দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনা সংঘটিত না হলে, জাতি হিসেবে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাওয়া ত্বরান্বিত হতো। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ এর নির্বাচনে ২০৭ আসনে বিএনপি নির্বাচিত অপর ৯৩টি আসনে ১৬ স্বতন্ত্র বাদে ছোট বড় ১১টি দল সংসদে ঠাঁই পেয়েছিল। এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত মুসলিম লীগও। জামায়াতে ইসলামী (পরিবর্তিত নাম ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লিগ) ২০টি আসন লাভ করে প্রমাণ করে তাদের জনভিত্তি। অপর দিকে বাকশালে বিলুপ্ত আওয়ামী লীগও স্বনামে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে প্রত্যবর্তন করে। কিন্তু জাতি হিসেবে দুর্ভাগ্য ১৯৮২ তে (২৪ মার্চ) দেশ আবারও সামরিক শাসনের অধীনের যায়। জেনারেল এরশাদ এক পর্যায়ে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। অথচ দেশে এর আগে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে কাস্টিং ভোটের ৬৫ ভাগ পেয়ে জাস্টিস আবদুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট হয়ে যান। গণতান্ত্রিক ধারার ওপর এলো তৃতীয়বারের মতো আঘাত। জেনারেল এরশাদ দেশে সামরিক শাসন জারি করে সকল ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে যান রাতারাতি এরপর ১৯৮২ থেকে ’৯১ পর্যন্ত দেশের ইতিহাস গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম-আন্দোলনের ইতিহাস নুর হোসেন, ডা: মিলন, দেলওয়ার বসুনিয়া প্রমুখ শহীদের রক্তে এদেশের মানুষ শ্বৈরসরকার জেনারেল এরশাদের কবল থেকে রক্ষা পায়। বিচারপতি ও প্রশাসক শাহাবুদ্দীন আহমদের দক্ষ প্রশাসনের অধীনে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৯১ এর (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। জামায়াত ১৮ আসন নিয়ে বিএনপিকে সমথর্ন দিয়েছিল সরকার গঠনে। ধারণা করা হয়েছিল এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আন্দোলনের মাধ্যম অর্জিত গণতন্ত্রের শকটটি বুঝিবা গতিশীল থাকবে। আর কোনোদিন এদেশ পেছনের দিকে যাবে না। গণতন্ত্রের সুস্থ পরিবেশে দেশে উন্নয়ন অগ্রগতির ধারা বজায় থাকবে। সুশাসনের দ্বারা নাগরিকজীবন স্বস্তি এবং সুখময় হবে। সর্বোপরি একটি দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে সকল ধরনের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ হবে।
‘বিএনপিকে একদিনের জন্যও শান্তিতে শাসন করতেও দেয়া হবে না’Ñ এমন ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয়ে যায় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অসন্তোষ। অথচ ’৯১-এর নির্বাচনী ফলাফল একটি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাকে পুনরায় শক্তিশালী করেছিল। যেভাবে ১৯৭৯ থেকে আমরা দেখেছি ছোট বড় অনেক দল সংসদে আসন লাভ করতে। তেমনি ৯১তে বিএনপি-১৪০ পেলেও বাকি ১৬০ আসনের আওয়ামী লীগ ৮৮টি, ছোট বড় ১১টি দল সংসদে বাকি আসনগুলো লাভ করে। জামায়াত ১৮ আসন পেয়ে সংসদে শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করে।
এরপর শুরু হয় আওয়ামী লীগের সংসদ বর্জন কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি প্রবর্তনের দাবিতে ১৭৭ দিনের হরতাল ব্যর্থ মানবিক অভ্যুত্থান এবং কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল। ১৯৯৬তে তথা আওয়ালী লীগ-১৪৬ আসন পেয়ে জাপাকে (৩২) সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ভুলে গেল তাদের অতীতের ইতিহাস। নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে লুটপাট এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো যার প্রেক্ষিতে ২০০১-এ (১ অক্টোবর) অষ্টম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট (১৯৩) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আরোহণ করে। জনগণ আওয়ামী লীগের বিগত সময়ের দুঃশাসনের জবাব দেয়ায় মাত্র ৬২ আসনে সংসদে জয়ী করে। এবারও জামায়াতে ইসলামী ১৭ আসন পেয়ে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থা ধরে রাখে। কিন্তু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। ২০০১-২০০৬ কাল পর্বে বিভিন্ন পুরনো রোগের সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন বিষফোঁড়া- জঙ্গিবাদ। প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর উপদ্রব বহু আগেই দৃশ্যমান। বোমা মেরে প্রতিহিংসার জঘন্য চিত্রকলা এ সময় বেশ স্পষ্টতর হতে থাকে। দাড়ি-টুপিওয়ালা কিছু মূলধারা বিচ্যুত ব্যক্তি বোমা মেরে সব উড়িয়ে দেয়ার হুঙ্কার ছুড়লো। শুধু হুঙ্কার ছুড়েই শান্ত হলো না, তারা বিচারালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর বোমা মেরে নিকৃষ্ট প্রতিহিংসার নজির স্থাপন করলো। ধরা হলো এদের নেতাদের এবং সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো, যাতে ভবিষ্যতে অন্যরা এ পথে পা না বাড়ায়।
এখানে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশ একমাত্র দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ছাড়া তিন দিক ভারতের সীমানা দ্বারা পরিবেষ্টিত। কাজেই বাংলাদেশের একটা মাদক বোতলও (ফেনসিডিল) আসে ওপার থেকে। বাংলাদেশের অপরাধীরা ওপার অভয়ারণ্য ভাবে। তাই জঙ্গিদের ব্যবহৃত বিস্ফোরক নাশকতামূলক সরঞ্জাম আমদানি করতে বারো শ’ মাইল দূর পাকিস্তান যাওয়া সম্ভব নয় এবং তারা তা করে না।
যা হোক ২০০৬ এর ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার তান্ডবের মধ্য দিয়ে রাজপথে বনি আদমকে সাপ মারার নৃশংস চিত্রকলা ইতিহাসের পাতায় সেঁটে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে বিদায় ঘটে। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এখানে থেমে যায়নি। অবশেষে অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার (তিন উদ্দীনের শাসন) প্রতিষ্ঠিত হয় দুই বছরের জন্য।
এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সকল বেআইনি সংবিধান কাজের বৈধতা দেয়ার অঙ্গীকার করে নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ (২৪০) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ক্ষমতায় আসীন হয়। বিএনপির মতো দল মাত্র ৩০, জাপা-২৭ জামায়াত-০২ এবং স্বতন্ত্র-০১ আসন লাভ করে। এ নির্বাচন ছিলো বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এমন এক উপহার যা গ্রহণ না করা যেমন, গ্রহণ করাও তেমনি বিপদ। সেই জনগণের সঙ্গে গণতন্ত্র-গণতন্ত্র লুকোচুরি খেলা আজো চলছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সেই লুকোচুরি খেলায় জনগণই অনুপস্থিত। আজ বলা হয় খেলার এক পক্ষ যদি অনুপস্থিত থাকে তবে কী হবে? দেশ শাসনের জন্য সরকার গঠনপ্রক্রিয়া কোনো খেলা নয়। তা ছাড়া খেলার নিয়ম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোন কারণে খেলা অনুষ্ঠিত না হলে তারও নিয়ম আছে। খেলা সংক্ষিপ্ত হবে অন্য দিন হবে, যৌথভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে ইত্যাদি এখানে যে জনগণকে নিয়ে খেলা তাদের অনুপস্থিত থাকতে দেখা গেল সর্ববৃহৎ দল বিএনপি সকল বাম-ডান ইসলামপন্থী দলসমূহ নির্বাচন বর্জন করলো। নির্বাচন হলো না। ১৫৪ আসনের বাকি ১৪৭ আসনে তেমন কোনো ভোটার (৫ ভাগের কম) উপস্থিত হলো না, নির্বাচন বুথে মানুষের পরিবর্তে গরু ছাগল এবং কুকুরকে অলস শুয়ে থাকতে দেখা গেলো, সেটা কিভাবে ৫ বছর শাসন চালানোর মতো নির্বাচনী ম্যান্ডেট হতে পারে? অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মুখে বারবার উচ্চারিত হয়Ñ সংবিধান রক্ষার জন্য এ নির্বাচন। কেউ কেউ বলেন এ নির্বাচন যাক এরপর ১১তম সংসদের নির্বাচন নিয়ে কথা হবে।
এসব ইতিহাস দেশের মানুষের কাছে অবিদিত এমন নয়। তারা বলছেন দেশের জনগণ এবং বিদেশীরা মেনে নিয়েছেন। আসলে জনগণ হতভম্ব। বিদেশীরা বিহ্বল। কথা বলে অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর। যেসব কারণে সব দলের অংশগ্রহণে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আশু মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রয়োজনÑ
এক. যদি অতীতের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো ১৯৪৭-এ আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছিলাম তা সাড়ে ২৩ বছরের মাথায় ১৯৭১-এ আরেকটি স্বাধীনতার প্রয়োজন পড়েছিল। এর মূল কারণ দু’টি। ৪৭-এর পর পাকিস্তানে যে শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় ছিলেন তারা জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন পাকিস্তান জন্মের উদ্দেশ্য হিসেবে তা তারা রক্ষা করেননি। অর্থাৎ নেতারা বলেছিলেনÑ ‘পাকিস্তানকা মতলব কিয়া- লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ পাকিস্তানের লক্ষ্য কী- লাইলাহা ইল্লাল্লাহ্। নেতারা নানা ছলেবলে কৌশলে মূল এই উদ্দেশ্য থেকে সরে যায়। তাছাড়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখে পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ইতিহাসের ধারাবাহিকতার বিপরীত পথে চলেছে।
শাসিতের মনে বিভেদ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। যে ঐক্য সৃষ্টি করতে পারতো মহান ইসলামী আদর্শ সেই বিষয়টিই তারা উপেক্ষা করেছে। যে কারণে প্রদেশগুলোর মধ্যে মানসিক এবং বৈষয়িক বিভেদ পার্থক্য দিন দিন বেড়েছে। দ্বিতীয় কারণ পাঞ্জাব, বেলুচ, সিন্দু ও সীমান্ত দেশ এই চার প্রদেশ সমন্বয়ে এক ইউনিট ঘোষণা করে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থানকে অনৈতিকভাবে সমান করা। যার ফলে অবিভক্ত ভারতে উপেক্ষিত পূর্ব বাংলা (১৯১১ বঙ্গভঙ্গ রদ) ইত্যাদি দিক থেকে ৪৭-এরপর একই অবস্থায় থেকে যায়। যেখানে উচিত ছিলো পিছিয়ে থাকা পূর্ব পাকিস্তানকে সবধরনের সুযোগ দিয়ে এগিয়ে নেয়া তার পরিবর্তে করা হলো বঞ্চিত। বাঙালিরা অনুপযুক্ত মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বঞ্চিত করা হলো সেনাবাহিনী, প্রশাসন, ব্যাংক, ব্যবসায়, শিল্প প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রাপ্য অধিকার থেকে।
১৫ বছরেও একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের দিতে ব্যর্থ হওয়া গণতন্ত্রের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে দেয়নি। অপর দিকে একই সময় স্বাধীনতা পাওয়া ভারতে গণতন্ত্র কোনো না কোনোভাবে বিকশিত হওয়ায় অন্তত জনগণ সরকার গঠনে অংশগ্রহণ করতে পারছে। গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকার কারণে আন্তঃকোন্দল, বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন, দারিদ্র্য, অসম উন্নয়ন ইত্যাদি সমস্যাকে ছাপিয়ে দিন দিন উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভারত এবং তারা বিশাল মানচিত্র একত্রিত থাকতে পেরেছে। গণতন্ত্রহীনতা উন্নয়নের বিকল্প না, এটা প্রমাণিত হয়েছে লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর ইত্যাদি দেশের নিকট অতীতের ঘটনা প্রবাহ থেকে।
দুই. বাংলাদেশের জনগণ একশতভাগ শিক্ষিত নয়। কিন্তু একশত ভাগ রাজনীতি সচেতন। বাংলাদেশের জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে দেশের জন্য কখন কী করা উচিত। ৭০-এর নির্বাচনের পর মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা প্রদানের তৎকালীন পাক-শাসকগোষ্ঠী এবং ভুট্টোর কারসাজি বুঝতে পেরে এবং কালুরঘাট বেতার থেকে ঘোষিত স্বাধীনতার জন্য লড়াই। সময়ের দাবি হিসেবে মেনে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। সেদিনের ঐ ঘোষণাকে অনেক শিক্ষিত বুদ্ধিমান, বুদ্ধিজীবীরাও ছেলেখেলা ভেবেছিলো, সুশিক্ষিত রণনিপুণ যুদ্ধবাজ লক্ষ পাক আর্মির সঙ্গে কিসের যুদ্ধ ঘোষণা? কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রচন্ড সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেদিন। অল্প সময়ের মধ্যে জনযুদ্ধে রূপ নেয়। পাক আর্মি অস্ত্রবল, রণ-কৌশল দিয়ে টিকতে পারেনি। সাধারণ মানুষের সাহসিকতা ও ঐক্যবলের কাছে। এটাই স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল থিম, আর সব কিছুই সহায়ক।
সেদিন কেন পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে বাঙলা ছাড়! বলে হুঙ্কার ছুড়ে দিলো বাঙালিরা। গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জনের জন্যই। আমাদের দেশ আমরা শাসন করব। আমরা আমাদের ভাগ্য নির্মাণ করবো। যে কারণেই তিন বছর কিছু দিবার পারব না। শেখ মুজিবের এই আবেদন বাঙালি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এখানে বাঙালিরা খেলো ধোঁকা। ধোঁকাবাজির রাজনীতি চলল। গণতন্ত্র নিয়ে ছলচাতুরী। একবার বলা হলো সমাজতন্ত্র হবে রাষ্ট্রীয় নীতির মৌল আদর্শ। আরেকবার বলা হলো গণতন্ত্রই হবে বাংলাদেশের সরকার গঠনের মৌল কাঠামো। বলা হলো রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম এভাবে ছলচাতুরীর রাজনীতি চলতে চলতে আজ মানুষের সামনে ভোটাধিকারও ছিনতাই হয়ে গেছে। জনগণ কিন্তু সেই ১৯৪৭ এর জনগণ থেকে আরও অগ্রসর ৭১-এর পরবর্তী জনগণ থেকে ২০১৪ এর জনগণ নিশ্চয়ই আরও অগ্রসর। জনগণের চোখের সামনে ৪০টির মতো ইলেকট্রনিকস মিডিয়া। শত শত পত্র-পত্রিকা রেডিও খোলা। জনগণের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। দেশ বিদেশের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ অনেক বিস্তৃত ইন্টারনেট কম্পিউটার ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণ আরও (বিষষ রহভড়ৎসবফ) জনগণকে তাই ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো সহজ নয়। ভোটের অধিকার কেড়ে গণতন্ত্রের বিজয় বলে বগল বাজালে নৃত্যগানে মতোয়ারা করে ভুলিয়ে দিতে চাইলেই পারা যাবে না মনে হয়। চাই একটি গ্রহণযেগ্যা মধ্যবর্তী নির্বাচন। কেন দরকার? এ জন্য, দেশের জনগণ চায়। জনগণ চায় ভোট কেন্দ্র্রে গিয়ে ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে স্বাধীনতাকে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের শাসক নির্বাচন করতে। জনগণ চায়, সকল দলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে সঙ্ঘাত হানাহানি ব্যতিরেকে স্বচ্ছপদ্ধতির ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার অধিকারের একটি শুভ দিন। জনগণের ইচ্ছার কাছে স্বৈর মানসিকতা পরাজিত হতে বাধ্য। যদি আমরা (শাসকরা) দেশের মানুষের কল্যাণ চাইÑ সর্বোপরি আমরা মানচিত্রকে অক্ষুণœ রাখতে চাই তবেÑ জনগণের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করতে হবে, এটা সময়ের দাবি। উপেক্ষ করলে সমূহ বিপর্যয়ের জন্য দায় নিতে হবে তাদের- যারা জন আকাক্সক্ষার মূল্য দেবে না।

লেখক : কবি ও সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply