মধ্যম আয়ের দেশ এবং নিম্নমানের মানবিকতা -এইচ এম মুশফিকুর রহমান

cs-mosfikor-1মানবসন্তান জন্মের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট বয়সকাল পর্যন্ত তাকে শিশু বলা হয়। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ঈযরষফ. ধর্মবিশ্বাস ও দেশকালের পাত্রভেদে শিশুবয়সের সীমা নির্ধারণে কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা গেলেও শিশুকালের সূচনা নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই। সভ্য মানুষের দাবিদার হিসেবে আজ আমরা মানবিকতার কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তা ভেবে দেখা দরকার। শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণ কতটা অমানবিক তা বিভিন্ন সংবাদপত্রের পাতায় ফুটে ওঠে। প্রতি তিনজন শিশুর দু’জনই মা-বাবার মারধরের শিকার (প্রথম আলো, ৬ জুলাই)। দেশে (১০ বছর আগের জরিপে) কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৭৪ লাখ, আর সরাসরি শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৩৪ লাখ (সূত্র : ইউনিসেফ ও আইএলও)। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১২ সালে হত্যাকান্ডের শিকার ২০৯ জন শিশু এবং পাঁচজনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ২০১৩ সালে ২১৮ শিশুকে হত্যা করা হয় এবং ১৮ শিশুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ২০১৪ সালে ৩৫০ শিশু হত্যাকান্ডের শিকার হয়; হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৩ শিশুকে। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ১৯১ শিশুকে; ১১ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হয় ২৩০ শিশু; ৬২ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে; ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ১৭ শিশুকে। এ সময়ে অপহৃত হয়েছে ১২৭ জন শিশু; অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ জন শিশুকে। এ পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। আমার-আপনার শিশুরা যখন কোমল শৈশব পার করছে, তখন এরা পড়ে থাকছে নির্যাতন-মৃত্যু আর নানা হুমকির মুখে।
মানুষ অমৃতের সন্তান নয়। ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুনই আদিতম হত্যাকান্ড। হিংস্রতা, জিঘাংসা, অসূয়া আমাদের সহজাত। তা সামলাতে আমরা আইন বানিয়েছি, রাষ্ট্র বানিয়েছি, সংস্কৃতির সাধনা করে আসছি, ধর্ম দিয়ে অধর্ম ঠেকাতে গিয়েছি। ভেবেছি, এগুলোই আমাদের ভেতরের শয়তানকে সামলাবে। সহজাত হিংস্রতাকে নীতি ও শাসনের শিকলে আটকে রাখবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে কেবলই বালি। ৭ জানুয়ারি, ২০১১ সালে এশিয়ার বধ্যভূমিখ্যাত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সংঘটিত হয় ইতিহাসের এক নারকীয় হত্যাকান্ড। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশী শিশু ফেলানী খাতুনকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তার নিথর দেহ কাঁটাতারের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে বিএসএফ লাশ নামিয়ে ভারতের কুচবিহারে নিয়ে যায়। মৃত্যুর ৩০ ঘণ্টা পর ৮ জানুয়ারি ১২টায় বর্ডারগার্ড, পুলিশ প্রশাসন ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফেলানীর লাশ ফুলবাড়ী থানায় তুলে দেয়া হয়। একদিন পর ৯ জানুয়ারি লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তার গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা লাশের ছবি বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেয়। ৬ মার্চ, ২০১৩ সালের এক বিকেলে অপহরণের শিকার হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। শেষ পর্যন্ত অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সে রাতেই তার মৃত্যু। ত্বকীর ঘটনা বিশেষ হলেও মালালার মতো নয়। তা ছাড়া বড় কথা হলো অন্তর্মুখী, স্বল্পবাক, শান্তশিষ্ট, কবিস্বভাবের এই কিশোর সম্ভবত স্বভাবগত কারণে মালালা হতে চায়নি। অবশ্য সে সুযোগও তার ছিল না। কারণ, মালালা প্রাণে বেঁচে গিয়ে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে। কিন্তু ত্বকীর ঘাতকরা ছিল খুবই নিষ্ঠুর। কারও কারও ধারণা, অকারণে কিশোর ত্বকীকে হত্যা করে তার পিতাকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে ক্ষমতাশালী প্রতিপক্ষ। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হয়েও তাই মেধাবী ত্বকী প্রাণ হারাল। ত্বকী হত্যার বর্বরতা সমাজকে ব্যাপকভাবে স্পর্শ করেছিল। নিষ্পাপ এ কিশোরের প্রতি সমবেদনার প্রকাশ ঘটান দেশের একাধিক খ্যাতিমান লেখক। সবাই চেয়েছেন নিরপেক্ষ তদন্ত ও খুনির বিচার এবং যথাযথ শাস্তি।
৮ জুলাই, ২০১৫ বুধবার সিলেট শহরের কুমারগাঁও বাস স্টেশনে চুরির অপবাদে মানুষরূপী হায়েনাদের পৈশাচিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করে রাজন নামে মাত্র ১৩ বছরের এক গরিব শিশু। নির্যাতনকারীরা শিশু রাজনের দুই হাত পেছনে নিয়ে একটি খুঁটির সাথে শক্ত করে বেঁধে স্টিলের রোলার দিয়ে পালা করে পেটাতে থাকে। এক নাগাড়ে ১৬ মিনিট রাজনকে রোলার দিয়ে পেটানো হয়। অর্ধমৃত শিশুটি কাতর হয়ে পানি খেতে চাইলে ‘ঘাম খা’ বলে মাটিতে ফেলে রাখা হয়। পেটানোর সময় রাজনের আর্তচিৎকার এবং নির্যাতনকারীদের অট্টহাসি এলাকার পরিবেশকে কলুষিত করলেও নির্যাতনের প্রতিবাদে নরপশুদের ভয়ে কেউই এগিয়ে আসতে সাহস পায়নি। এক পর্যায়ে নির্যাতনকারীরা তার বাম হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতে এবং মাথা, পেট, পিঠ ও নখে লোহার রড দিয়ে আঘাত করতে থাকে। নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শিশুটি এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে পিছপা হন না কোনো মা-বাবা। নিজের সন্তানের লাশ থানা থেকে নিজেই চিনে নিয়েছিলেন রাজনের মা। হয়তো হত্যার ভিডিওটিও দেখেছেন। সন্তানের অন্তিম মুহূর্তের মরণ আর্তনাদ তিনি মনে রাখবেন, কোনো দিন ভুলবেন না। আমরাও কি ভুলে যেতে পারি? আমরা না পারি সইতে, না পারি কইতে। নিষ্পাপের মৃত্যুর উন্মত্ত মহড়া তবু আমাদের দেখে যেতেই হয়। পেছনে আবহসঙ্গীত হিসেবে বাজে মধ্যম আয়ের মধুর বাঁশি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে অধিকতর উন্নয়ন আর তুমুল অমানবিকতার দিকে। গুলি বা চাপাতি, জবাই, কাটা, ফাঁস, পেটানো, টুকরা টুকরা করা, পেট্রলে পোড়া, সামনে বা পেছনে কোপ, গুম, ক্রসফায়ার, আম, জাম, লিচুতে বিষ, খাবারে ফরমালিনসহ হত্যার কত কত পদ্ধতি আমরা আবিষ্কার করছি। হত্যার এই সব পদ্ধতি যুদ্ধে প্রয়োগ করলে বলে বীর। প্রায়ই যে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়, তাদের পিঠ চাপড়ে দেয়ার লোক অনেক। পিটিয়ে সাপ বা শিয়াল মারার মধ্যেও হিংস্রতা থাকে। সেই হিংস্রতা কখনো যদি মানুষ হত্যার খাতে বয়ে যায়, তখন আমরা চমকে উঠি। কিন্তু দাপটের উচ্চসিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ঘরের লোক, কাজের লোক, রিকশাওয়ালা-শ্রমিকসহ নিচের লোককে আমরা কি আহত করি না? আমি যখন মাস্টার মশাই, তখন বেতের ব্যবহার করি না কি শিশুর গায়ে? কাজের বুয়ার গায়ে আগুনের ছেঁকা দিই না কি, আমি যখন গৃহকর্ত্রী? আমরা চোর বলে শিশু বা ভবঘুরেকে পিটিয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু ব্যাংকচোর, গমচোর, ভোটচোরদের দেই লালগালিচা, সোনার পুত্তলিকা। যাদের অবহেলায় ওয়াসার সুড়ঙ্গে পড়ে জিহাদ নামের শিশুটি মরে গিয়েছিল, তাদের কি যথাযথ শাস্তি হয়েছে? শাস্তি দাবির বেলায়ও আমরা এখন আগে দেখে নিই অপরাধী কোন দলের! রাজনীতি থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত আজ হিংস্রতার বাণ। দেশে বর্তমানে শিশুদের ওপর পাশবিক ও নির্মমভাবে হত্যা এবং নির্যাতন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এটা এখন ‘ব্যাধি’তে পরিণত হয়েছে। শিশুদের পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে হত্যার নতুন নতুন খবর আমাদের হতবিহবল করছে। শিশু রাজন হত্যার ঘা না শুকাতেই শ্রমজীবী রাকিবকে যে কায়দায় মারা হলো তাকে পাশবিক বললেও কম বলা হবে। চাঁদপুরে কবিরাজি চিকিৎসার নামে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে শিশুকন্যা সুমাইয়াকে। বরগুনায় রবিউলকে চুরির দায়ে চোখ উপড়িয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এসব হত্যাকান্ড নতুন নয় বরং শিশু নির্যাতন চলছে সর্বত্র। বাসায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থলে কোথায় নেই শিশু নির্যাতন ও শিশু নিধন?
যে শিশুরা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশিত সম্পদ। যাদের সাথে আমাদের সর্বোত্তম আচরণ করা অপরিহার্য। যারা মাতা-পিতা ও বড়দের নিকট থেকে সর্বদা স্নেহ ও ভালবাসাপূর্ণ আচরণ পাওয়ার অধিকারী। যারা মাতা-পিতার জন্য ¯্রষ্টার পক্ষ থেকে পাওয়া বড় নিয়ামত। ইসলামী জীবনবিধানে যাদের সাথে দরদভরা আচরণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন যার সর্বোত্তম উদাহরণ। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান বিন আলীকে চুম্বন করেন তখন তার নিকট আকরাহ বিন হাবেস তামিমী বসা ছিলো। আকরাহ বলল, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে, তাদের কাউকে আমি চুম্বন করি না।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।’ (সহীহ বুখারী : ৫৯৯৭) ইসলাম শিশুদের প্রতি সর্বাধিক যতœবান হতে এবং তাদের প্রতিটি অধিকারকে নিশ্চিত করতে নির্দেশ প্রদান করেছে। তাদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা পিতা-মাতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রধানতম দায়িত্ব।
মধ্যম আয়ের দেশ বানাতে কথার ফুলঝুরি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাই, ক্রিকেটে বিশ্বসেরা হওয়ার সাধ আমাদের, চেতনায় মেতে উঠে চিৎকার করি আমরা, কিন্তু মধ্যম মানের মানবিকতা অর্জনে কত দেউলিয়া, সেই হুঁশ নেই! মানবিকতার নিম্নস্তরে পৌঁছতে হয়তো আর বেশি সময় লাগবে না। এ এমন এক দেশ, যেখানে ঘটনা ঘটে চলে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া হয় বেছে বেছে। ভিডিও বাস্তবতায় আমরাও হয়েছি এমন আসক্ত, সচিত্র না দেখলে আমরা নড়েচড়ে বসি না। সবেরই কারণ আছে। মানুষের ভেতরের বীভৎস বীরের ছায়াটা যে বেরিয়ে আসছে বেশি করে। কারণ আইন-শাসন-নজরদারি-জবাবদিহি মারাত্মক শিথিল। অনেক ক্ষেত্রে রক্ষকেরাই ভক্ষণের পৈশাচিকতা চালায়। আজ নৈতিকতা বিলীন। বাজার অর্থনীতির তুমুল হাওয়ায় পাতলা মেঘের মতো ছিঁড়ে-ফোড়ে উড়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ। মানুষ এতই আত্মকেন্দ্রিক যে কেউ কাউকে মানেও না, ডাকেও না। আয়ের চাইতেও বেশি বাড়ছে জীবনযন্ত্রণা-অনিশ্চয়তা-ভয়। এসবে অস্থির হয়েই মানুষ বোধবুদ্ধি হারিয়ে বিকারগ্রস্ত হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে মানুষের মাঝে ধর্মীয় ও নৈতিকতার শিক্ষার প্রচার-প্রসার ঘটাতে হবে, মানবিকতাবোধ জাগ্রত করতে হবে, আইনের কঠোর প্রয়োগ লাগবে, বিচারে আস্থা আনতে হবে, পাশাপাশি সমাজের সংহতি ও বন্ধন আরো মজবুত করতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply