মরণফাঁদ গজলডোবা বাঁধ

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

বাংলাদেশের জন্য বড় মরণফাঁদ গজলডোবা বাঁধ। তিস্তা নদীতে গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে ফারাক্কার মত মরণফাঁদ সৃষ্টি বাংলাদেশের প্রতি সম্প্রসারণবাদী আধিপত্যবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতের অন্যায় আচরণের আর এক বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের পানি প্রবাহের সকল উৎসই ভারতে। প্রায় শতকরা ৯৩ ভাগ পানি আসে ভারত থেকে, কেননা ৫৪টি নদীর উৎস হলো ভারতে। ভারত তার দেশ দিয়ে আসা ৫৪টি নদীতে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের সমস্ত অংশকেই মরুভূমি বানাতে চাচ্ছে। ভূগোলের এই নির্যাতনে  বাংলাদেশের মানুষ প্রয়োজনীয় ও ন্যায্য পানির হিস্যা পাচ্ছে না। গজলডোবা বাঁধ ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের পানি লুণ্ঠন ও সম্প্রসারণবাদী রাজনীতির প্রতীক প্রকল্প। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এর কোন সমাধান হচ্ছে না।

তিস্তা নদী
বাংলাদেশর উত্তরাংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী তিস্তা নদী। এই নদী উত্তরে হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ নদীর পূর্ব নাম ছিল দিস্তাং, বর্তমান নাম তিস্তা যার সংস্কৃতকরণ হয়েছে ত্রিস্রোতা। জলপাইগুড়ি থেকে তিনটি স্রোতধারা তিনদিকে প্রবাহিত হয়। দক্ষিণবাহী পূর্বতম স্রোতধারার নাম করতোয়া, মধ্যবর্তী স্রোতধারার নাম আত্রাই এবং পশ্চিমতর স্রোতধারার নাম পুনর্ভবা বা পুনরভবা। ইতিহাসে এমন উল্লেখ দেখা যায় যে বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয় অভিযানকালে (১২০৩ খ্রিস্টাব্দে) করতোয়া গঙ্গার প্রায় তিন গুণ ছিল। উত্তর বঙ্গের নদীগুলো ওদের গতিপথ এবং যোগসূত্র পরিবর্তনের জন্য বিখ্যাত। এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে তিস্তার ভূমিকা সর্বাধিক; ১৭৮৭-এর পূর্বে তিস্তা উত্তর সিকিমের বিভিন্ন হিমবাহ অঞ্চল হতে উদ্ভূত লাচেন চু, লাচুন চু এবং লোনাকচুর সম্মিলিত ধারা রূপে দক্ষিণ দিকে তিস্তা নদী আত্রাই, করতোয়া, পুনর্ভবা নামে প্রবাহিত হয়ে এদের সম্মিলিত পানিধারা মহানন্দার সাথে মিলিত হওয়ার পর হুরসাগর নাম ধারণ করে জাফরগঞ্জ (বর্তমান গোয়ালন্দ) নিকট পদ্মায় পতিত হত। ১৭৮৭ সালের ২৭ আগস্ট তিস্তায় প্রবল বন্যা হয়েছিল। তারপর থেকে তিস্তা গতিপথ পরিবর্তন করে পূর্বদিকস্থ একটি পরিত্যক্ত গতিপথ দিয়ে প্রবাহিত হতে আরম্ভ করার ফলে এটি চিলমারীর দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হল এবং গঙ্গার সঙ্গে কোন সম্পর্ক আর রইল না। আর সাবেক গতিধারা তিনটি করতোয়া, আত্রাই, পুনর্ভবা শীর্ণ স্রোতধারায় পরিণত হয়ে গেল এবং শুষ্ক মৌসুমে গতিপথের অনেক স্থান পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তিস্তা নদী প্রায় ১৭৬ কিলোমিটার লম্বা।
গজলডোবা বাঁধ
গজলডোবা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ বাঁধের কারণে তিস্তা নদীও পদ্মার ভাগ্যই বরণ করে নিতে বসেছে। পদ্মা যেমন কোথাও ধু ধু বালুচর, কোথাও খালে পরিণত হয়েছে, তেমনি তিস্তাও। তিস্তার বুক জুড়ে শুধু বালু আর বালু। তিস্তা এখন দ্রুত মরে যাচ্ছে। তিস্তায় পর্যাপ্ত পানির সংস্থান  নেই। উজান থেকে বেপরোয়া পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানি এমন তলানিতে এসে ঠেকেছে যে, এ পানিতে ক্ষেতে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই আন্তর্জাতিক নদীর উজানে ভারতের পশ্চিবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা নামক স্থানে ভারত একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের তিস্তা বাঁধ এলাকা থেকে ১২০ কিলোমিটার উজানে ভারত এই মরণফাঁদ নির্মাণ করেছে। ২২১ দশমিক ৫৩ মিটার দীর্ঘ ৪৪টি গেট সমেত গজলডোবা বাঁধের রয়েছে ৩টি পর্যায়। প্রথম পর্যায় সেচ প্রকল্প, দ্বিতীয় পর্যায় পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং তৃতীয় পর্যায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সংযোগ খাল খনন করে নৌপথ তৈরি। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে আগেই। ১৯৮৭ সাল থেকে ৪৫টি স্লুইস গেটের মাধ্যমে সেচকার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে এ ব্যারেজের মাধ্যমে জলপাইগুড়ি জেলায় ৬১ হাজার, দার্জিলিং জেলায় ১৭ হাজার, মালদহ জেলায় ৩৮ হাজার, উত্তর দিনাজপুর জেলায় ২ লাখ ৪ হাজার একর জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে।১ গজলডোবা বাঁধের সাহায্যে একটি খালের মাধ্যমে ভারত একতরফাভাবে শুকনো মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ থেকে প্রায় ২ হাজার কিউসেক পানি মহানন্দায় নিয়ে যাচ্ছে।২ আর মহানন্দার পানি যাচ্ছে ভারতে।
এই মুহূর্তে ভারত ব্যারাজের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ করছে। ভারত ব্যারেজ নির্মাণ করে সেচ প্রকল্প ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এক তরফা পানি প্রত্যাহার করায় পানি সঙ্কটে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে তিস্তা।  শুধু তিস্তা কেন, তিস্তার সংযোগ নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। যে স্থান দিয়ে তিস্তা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেই নীলফামারীর ডিমলার পশ্চিম চাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ গ্রামের কালীগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তা বালুচরে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় তিস্তার পানি আশা করা দুরাশা মাত্র। তিস্তার পানি প্রবাহের গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান দিলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করা যাবে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল ১০৩৩ কিউসেক, ২০০০ সালে ৪৫৩০ কিউসেক, ২০০১ সালে ১৪০৬ কিউসেক, ২০০২ সালে ১০০০ কিউসেক, ২০০৩ সালে ১১০০ কিউসেক, ২০০৬ সালে ৯৫০ কিউসেক, ২০০৭ সালে ৫২৫ কিউসেক, ২০০৮ সালে ১৫০০ কিউসেক, ২০০৯ সালে শূন্য কিউসেক। এখন যেটুকু পানি আসছে তা বাঁধ চোয়ানো। পানি বিশেষজ্ঞরা বাঁধ চোয়ানো পানিকে কিউসেকের হিসেবে ধরেন না।৩ তিস্তার পানি এখন সম্পূর্ণ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। তিস্তার পানি সরিয়ে নিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
গজলডোবা বাঁধই শুধু নয়, গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে ভয়াবহ ভাঙন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষ গজলডোবা বাঁধের ভাটিতে সীমান্ত জিরো পয়েন্ট পর্যপ্ত ১ কিলোমিটারের মধ্যে ভারতীয় এলাকার তিস্তা নদীতে অবৈধভাবে সুপরিকল্পিতভাবে ৫টি স্পার নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের উজানে তিস্তা নদীতে গজলডোবাসহ মোট তিনটি বাঁধ দিয়েছে ভারত, আরেকটি বাঁধ দিতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সাথে চুক্তি না থাকলে আন্তর্জাতিক নদীতে বাঁধ নির্মাণ ও নদীর পানি কোন দেশ সরিয়ে নিতে পারে না। ভারতের এ অন্যায়ের প্রতিবাদও করছে না সরকার।৪
একটি আন্তর্জাতিক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর ভারতের বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

গজলডোবা বাঁধের অশুভ প্রভাব
গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে তিস্তার পানি ভারতের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় বাংলাদেশে তিস্তা সেচ প্রকল্প অচল হয়ে পড়েছে। তিস্তা সেচ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান অংশ হচ্ছে তিস্তা বাঁধ। তিস্তা বাঁধ বাংলাদেশের বৃহত্তম বাঁধ। ১৯৯০ সালের ৫ আগস্ট এ বাঁধের উদ্বোধন করা হয়। তিস্তা বাঁধ প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা নেয়া হয় ১৯৪৫ সালে।
১৯৫৯-৬০ সালে এ প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হয়। কিন্তু ১৯৮০ সালে মূল কাজ শুরু হয়। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি এর কাজ শেষ হয়। দেশের উত্তর- পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তর বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরের ১২ জেলার ৩৫টি থানার ৫৪০৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ বাঁধ বিস্তৃত। এই বাঁধের সাথে প্রায় ৭৪৯ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধা পেত। বিভিন্ন সেচ খাল নিষ্কাশন খালের মাধ্যমে এ অঞ্চলে সেচ ও পানি নিষ্কাশন সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অথচ পানিশূন্য তিস্তা এখন ধু ধু বালুচর। তিস্তা বাঁধ এলাকায় তিস্তার করুণ দশা! গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তারা লালমনিরহাটে তিস্তা বাঁধ প্রকল্প ও তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন। এ কমিশনের সফরসঙ্গী স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিস্তায় এখন যে পানি পাওয়া যাচ্ছে তা কোনোভাবেই কিউসেকের হিসাবে আসে না। এটাকে ভারতের দেয়া গজলডোবা বাঁধের চোয়ানো পানি বললেই চলে। তার মতে, তিস্তা বাঁধ প্রকল্পের আওতায় চলতি বোরো মৌসুমে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী পানিপ্রবাহের প্রয়োজন ৪ হাজার কিউসেক। কিন্তু তা পাওয়া না যাওয়ায় সেচকাজে তীব্র পানিসঙ্কট দেখা দিয়েছে।৫
দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের বড় সেচ প্রকল্পট তিস্তা বাঁধ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
গজলডোবা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের ৩টি প্রধান নদী আত্রাই, করতোয়া, পুনর্ভবা শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। তিস্তার দু’টি শাখা নদী বাঙালী ও ঘাঘট ইতোমধ্যেই শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। নীলফামারীর ৩০টি ছোট বড় নদী মরে গেছে। এ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনেশ্বরী,্ চরাল কাটা, শালকী, দেওনাই, মানস, ধাইজান, বুড়িখোড়া, নাউহারা, ধুম, বুড়ি তিস্তাসহ অধিকাংশই আজ মৃত নদী। এ নদীগুলোকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিলো শহর, বন্দর, নগর। এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ নদীগুলোর ছিল অসামান্য অবদান। নদী মরে যাওয়া খাল বিল, হাওর, বাঁওড় শুকিয়ে এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার উজানে বাঁধ নির্মাণ ও একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে এ অঞ্চলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। পানির অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, নৌচলাচল ও ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ ও অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ। হারিয়ে গেছে কয়েক শ’ মৎস্যপ্রজাতি ও দেশীয় পাখি।
নদীকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। গজলডোবা বাঁধের প্রভাবে পানির অভাবে প্রধান নদী তিস্তা শুকিয়ে যাওয়ায় ৬০ হাজারেরও বেশি জেলে পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। শিল্প-বাণিজ্য হুমকির মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এ বাঁধ দিয়ে এক তরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে উত্তরাঞ্চল প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
নেমে গেছে ভূপৃষ্ঠের পানির স্তর। আগে এ অঞ্চলে ৪০-৬০ ফুট গভীর হতে টিউবওয়েল ও অগভীর নলকূপে পানি উঠানো গেলেও বর্তমানে তা ১৬০-২০০ ফুট গভীরে নেমে গেছে। নদী মরে যাওয়ায় ধীরে ধীরে এ অঞ্চল মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ সরাসরি গজলডোবা বাঁধের অশুভ প্রভাবের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ হয়ে উঠছে চরম ভাবাপন্ন। গজলডোবা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ফরণফাঁদ গজলডোবা বাঁধের অশুভ প্রভাবে বিরান হচ্ছে উত্তর- পশ্চিমাঞ্চল।৬ দেখা দিয়েছ মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। গজলডোবা বাঁধ বর্ষায় খুলে দিলেই দু’কূল ছাপিয়ে ফুঁসে ওঠে তিস্তা। আছড়ে পড়ে মানুষের ওপর। বর্ষায় তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে গড়ে লাখো মানুষ।
তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৩৮ বছর ধরে আলোচনা চলছে। ইতিবাচক ফল কিছুই হয়নি। মরণফাঁদ গজলডোবা বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানি ভারত পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিংয়ের একাংশ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ ও বিহার রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমিতে নিয়ে যাচ্ছে। তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে যেন লুকোচুরি খেলা চলছে। অথচ তিস্তার পানিবণ্টন বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারত তার নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়।
বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন, ভারতের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশ ফারাক্কা চুক্তির ন্যায় আবারো ভারতের ফাঁদে পড়তে পারে। তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুটি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলতে হবে। কারণ তিস্তার পানি ভারত সরিয়ে নিচ্ছে। এখন যদি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা বলা হয় তবে বুঝতে হবে এটি ভারতের ফাঁদ, ভারতের কূটকৌশল। ভারতের ফাঁদে পা দেয়া উচিত হবে না। এখনও বিশ্বে নদী আইন, অভিন্ন নদীর পানি একতরফা ব্যবহার না করার আইন বলবৎ আছে। ভারত তা মানছে না বলেই বাংলাদেশ অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র দেশ হলেও এ দেশের ন্যায্য অধিকার ভোগ করে তার বাঁচার অধিকার রয়েছে।
তথ্যসূত্র :
১.    মুনসী আব্দুল মান্নান, তিস্তার পানিবণ্টন : প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ ও  জনগণের প্রত্যাশা (উপসম্পাদকীয়) দৈনিক ইনকিলাব, ২৬ ডিসেম্বর ২০০৯, পৃ., ১১।
২.    সরকার মাজহারুল মান্নান প্রদত্ত তিস্তার নদীর ওপর রিপোর্ট, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৭ আগস্ট ২০০৯, পৃ.১৬।
৩.    মুন্সী আবদুল মান্নান, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১।
৪.    এ বি সিদ্দিক, তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে লুকোচুরি খেলা, সংগ্রাম রিপোর্ট, দৈনিক সংগ্রাম, ২৬ ডিসেম্বর ২০০৯, পৃ. ১।
৫.    সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, তিস্তা এখন ধু ধু বালুচর, দৈনিক ইনকিলাব, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃ. ১৬।
৬.    বাংলাদেশের একটি বিশাল এলাকার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মূল হাতিয়ার তিস্তা নদী গজলডোবা বাঁধের কারণে যে পানিশূন্য করুণ দশায় নিপতিত তা সরজমিনে দেখে এসেছেন ঢাকা সফররত ভারতের যৌথ নদী কমিশনের সদস্য এস পি কাকরান। তিনি সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ এ সফরে এসেছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ভারতীয় প্রতিনিধিদলটি স্বদেশে ফিরে গেছে। প্রতিনিধিদলের কথাবার্তায় যা মনে হয়েছে, গঙ্গার পনি নিয়ে ভারত যে খেলা বাংলাদেশের সাথে খেলেছে, তিস্তার পানি নিয়েও সে খেলার পুনরাবৃত্তি হবে।
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply