মহাজোটের (!) তত্ত্বাবধায়ক ভীতি

রাফিউল ইসলাম
সাবেক প্রধান বিচারপতি জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকবে কি থাকবে না, এ ব্যাপারে প্রথমে হ্যাঁ ও পরে না বলে বিভ্রান্তিকর রায় দিয়ে পুরো জাতিকে একটা অগ্নিগহ্বরে ফেলে দিয়ে গেছেন। এখন অহরহ হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন, গাড়ি ভাঙ্চুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস, মরিচের গুঁড়ার ¯েপ্র, লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, পরিশেষে গুলি এরপর মিছিলকারী ও সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। শুধু খবর পাওয়া যাচ্ছে তাই না, আমাদের সামনেই ঘটতে দেখছি। পুলিশ আহত ও নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি দলের ক্যাডাররাও বসে নেই। তারাও পুলিশের পাশাপাশি তাদের শক্তি প্রদর্শন করে চলেছে। বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিমূলক রায় দিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি পরিবার-পরিজন নিয়ে সুন্দর সময় কাটাচ্ছেন আর বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের কর্মীরা।
দেশ যখন মোটামুটি শান্তির পথে এগোচ্ছিল, রাজনৈতিক বাতাস যখন ভালোর দিকে। রাজনীতিবিদেরা যখন আবার হাঁটি হাঁটি পা পা করে গণতন্ত্রের পথে চলা শুরু করেছিল, ঠিক তখনই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার আরো দুইবার থাকতে পারার রায় বাতিল করে দিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সারা দেশ ও জাতিকে আগুনের কুণ্ডলীর মধ্যে ফেলে দিয়ে গেলেন। আমরা না থাকলাম বাঙালি আর না থাকলাম বাংলাদেশী। আমরা যেন হয়ে গেলাম একে অপরের শত্রু। কিন্তু কেন? এই রায়ে কার কতটুকু লাভ হলো? কেউ তার অঙ্ক মেলাতে পারছে না।
এক দল বলছে, দেশে আর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আসতে দেয়া হবে না। কারণ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তা বাতিল হয়ে গেছে। আর অন্য দল ও আমজনতার দাবি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবশ্যই হতে হবে, অন্যথায় বিরোধী দল আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। এমনকি নির্বাচন হতেও দেবে না। বিশ্বের সব গণতন্ত্রচর্চাকারী দেশও একদলীয় ও একতরফা নির্বাচন মেনে নেবে না বলে আকার ইঙ্গিতে জানিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জ্ঞানীজন মনে করেন নির্দলীয় ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার খুবই জরুরি। বিকল্পধারার সভাপতি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বি. চৌধুরী বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক দিন, সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, না হলে রাজনীতি ছেড়ে দেবো।’
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল, সর্বজনশ্রদ্ধেয় আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিকুল হক আগাগোড়াই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলে আসছেন। সংবিধান-লেখক ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশের আরো বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব যারা দেশের জন্য ভাবেন তাদের কোনো কথাই সরকারি দল গ্রাহ্য করছে না বরং তাচ্ছিল্যের সাথে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের পর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করতে একশ্রেণীর মানুষ অপেক্ষায় থাকে।’ কী দুর্ভাগ্য দেশের জনগণের! দেশটা যেন একটা দলের, একটা গোত্রের, একটা পরিবারের বা একজন ব্যক্তির।
একসময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করার জন্য এই সরকারি দলই আন্দোলন করেছিল। তারাও রাজপথ দখল করে জ্বালাও পোড়াও, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কম করেনি। এখন সব ভুলে গেছে। তারাই এখন বলছে ‘কোনো সভ্য দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই।’ মিথ্যাচার আর কাকে বলে। এই তো মাত্র কিছু দিন আগেই পাকিস্তানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আওয়ামী লীগ যখন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির জন্য আন্দোলন করেছিল তখন বাংলাদেশ কী ছিল? সভ্য না অসভ্য?
প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন, জনগণ ক্ষমতার উৎস। সম্প্রতি একটি দৈনিকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির ওপর জরিপ চালানো হয়। সেই জরিপে ৯০ ভাগ লোক এর পক্ষে মত প্রকাশ করে। এই রায়কে প্রধানমন্ত্রী তাচ্ছিল্যের সাথের প্রত্যাখ্যান করেন। এই রায় যদি তার পক্ষে হতো তবেও কি তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন? না করতেন না।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগের এতো ভয় কেন? নির্বাচন যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন, ফলাফল নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত কর্মকাণ্ডের ওপর। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন কেন? কেউ ভাবেন, এই পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য। আবার কেউ ভেবে থাকতে পারেন, এই ব্যবস্থায় নির্ঘাত হেরে যেতে হবে। আবার কেউ ভেবে থাকেন, এই ব্যবস্থায় বিজয় সুনিশ্চিত। দেশের সাধারণ মানুষ কী চায়? সে কথা আমাদের মাথায় কেন নেই?
নির্বাচনে হারজিত আছেই। সবাই জিতবে, তা হবে কেমন করে? কেউ হারবে আর কেউ জিতবে। হারজিত রাজনীতিবিদদের হাতে না। হারজিত জনগণের হাতে। সরকারি দলের মতে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার হচ্ছে অনির্বাচিত সরকার। অনির্বাচিত ব্যক্তি দিয়ে গঠিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন আর তারাই তো পরিচালনা করবে জাতীয় নির্বাচন। তারাও তো অনির্বাচিত ব্যক্তি। অনির্বাচিত গুটি কয়েক লোক যদি একটি সুষ্ঠু (?) নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে তাহলে অনির্বাচিত ব্যক্তি সমন্বয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বাধা কোথায়? আসলে জুজুর ভয়টা অন্যখানে।
সংসদে অনির্বাচিত সদস্য রয়েছেন, একজন তো স্পিকারই হলে গেলেন। মন্ত্রিসভায় আছেন অনির্বাচিত মন্ত্রী এবং মন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন উপদেষ্টামণ্ডলী, কই তাতে তো আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
পাকিস্তানে ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন আগের দুইবারে একবারও মেয়াদ শেষ করতে না পারা নওয়াজ শরীফ। এ ক্ষেত্রে চরম ভরাডুবির শিকার পিপিপিকে (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) ভাগ্যবান বলা চলে। খুব ভালো কিছু করতে না পারলেও নিজেদের ক্ষমতার ৫ বছর পূরণ করতে পারাও পাকিস্তানের মতো দেশে কম কথা নয়।
পিপিপি এভাবে স্পট থেকে হারিয়ে যাবে তা দলটির নেতারা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি। তবে হারের বিষয়টি তারা টের পেয়েছিল। সম্ভবত এজন্য আগেই দলের চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে দেশ থেকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে পিপিপি। মাঝে বেনজির ভুট্টোর রক্তের বিনিময়ে এক মেয়াদের জন্য হলেও প্রেসিডেন্ট পদ ও রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন মিস্টার টেনপার্সেন্ট খ্যাত আসিফ আলী জারদারি।
নির্বাচন পরবর্তী পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থা একেবারে মিলে যাচ্ছে। নির্বাচনে তাদের শাসক দলের প্রাপ্ত আসন ও আমাদের শাসকদলগুলোর প্রাপ্ত আসন কাছাকাছি। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ও ২০০৮ সালে বিএনপির অবস্থা দ্রষ্টব্য। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে পাকিস্তানে নির্বাচনে হেরে কেউ স্থুল কারচুপির অভিযোগ তোলেননি। বীরত্বের সঙ্গে পরাজয় মেনে নিয়েছেন ইমরান খান। যেমনটি আমাদের দেশে ভাবা যায় না।
অনেক অমিল থাকলেও কেন যেন পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের অনেক কিছু মিলে যায়। আমরা বিভিন্ন অভিযোগ এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দিয়েছি। সেটাই গ্রহণ করে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার মতো নির্বাচন করে নিয়েছে পাকিস্তান। নিজেদের দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করেনি বিচারপতি মির হাজার খান খোসোর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আদালতের আদেশেও সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও দুর্নীতির মামলা পুনরুজ্জীবিত করেনি। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তাদের কাজ কেবল সরকারের রুটিন ওয়ার্ক ও একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করে দেয়া। এদিক থেকে পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার চূড়ান্ত সফল ও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ার রেকর্ডের পাশাপাশি এ নির্বাচন যথেষ্ট অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষকেরা দাবি করেছেন। এরই মধ্যে নেপালও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। ফলে একে এখন আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ধরে নেয়া যায়। ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশ এটা গ্রহণ করবে বলেও আশা করা যায়। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গৌরবের।
সলে আমাদের মতো অবিশ্বাসের গণতন্ত্রের দেশগুলোতে নির্বাচিত সরকারের আওতায় আরেকটি জাতীয় নির্বাচন কতটুকু নিরপেক্ষ হবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বিশ্বাসের অভাবের কারণেই কিন্তু আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব। এখনও সেই অবিশ্বাস দূর হয়নি। তাছাড়া পার্লামেন্ট না ভেঙ্গে কিভাবে আরেকটি পার্লামেন্ট নির্বাচন হবে এটাও পরিষ্কার নয়। ফলে সাধারণ মানুষ চায় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন হোক।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট (তাদের ভাষায় মহাজোট) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় নির্বাচন করতে রাজি হচ্ছে না। তারা নিজেদের প্রতি কি প্রচণ্ড ভীত। জনগণের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে? বিডিআর বিদ্রোহ, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, আলেম সমাজের ওপর হামলার কারণে নিজেদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে। আওয়ামী লীগ কি ২০০১ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি দেখে তত্ত্বাবধায়কের প্রতি ভীত হয়ে পড়েছে? দলটি বুঝতে পারছে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতাদের তারা যেভাবে জেলে পুরছে তেমন পরিস্থিতি তাদের জন্যও অপেক্ষা করছে। এ জন্যই যেকোনোভাবে ক্ষমতা আকড়ে থাকার জন্য নিজেদের অধীনেই নির্বাচন করতে চায়? বর্তমানে তাদের জনসমর্থনের যা অবস্থা তাতে এমন আশঙ্কা সত্য হতেই পারে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় নির্বাচনে যেতে চাইবে না আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল, এটাই স্বাভাবিক।
তবে কথায় কথায় যে দলটি বলে থাকে ‘জনগণই শক্তির উৎস’ তাদেরকে অবশ্যই সেই জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে নিরপেক্ষ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় নির্বাচন আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

SHARE

Leave a Reply