মহানবী (সা)-এর অর্থনৈতিক দর্শন ও মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মহানবী (সা) প্রতিষ্ঠিত মদিনার ইসলামী রাষ্ট্র এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। মদিনার এই ইসলামী রাষ্ট্রটি ছিল মানবজাতির ইতিহাসের সর্বোত্তম জনকল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। মদিনা রাষ্ট্রের প্রশাসন ছিল স্বতন্ত্র ও সুসংহত এক সিস্টেম। এ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো রচিত হয় মহানবী (সা)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত ইসলামী সমাজের প্রকৃতি, কর্মসূচি, ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে। এ প্রশাসনের কাঠামো একদিনে গড়ে ওঠেনি। মহানবী (সা) পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের বিকাশমান পর্যায়ে প্রশাসনিক কাঠামো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত কর্মকর্তা সাহাবী (রা) গণ-জনবিচ্ছিন্ন বা দায়িত্বানুভূতিহীন বিশেষ সুবিধাভোগী কোনো গোষ্ঠী ছিলেন না। তাঁরা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দায়িত্বশীলতার ((Accountability) এক অত্যুজ্জ্বল নজির স্থাপন করেছিলেন। ফলে মদিনা রাষ্ট্রের প্রশাসনে নাগরিকদের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতার নীতি প্রবর্তিত হয়েছিল। তাঁরা একাধারে দায়ী (Accountable) ছিলেন-
১.    আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে (To Allah) জবাবদিহিতা।
২.    মহানবী (সা)-এর কাছে (to prophet (sm)  জবাবদিহিতা।
৩.    ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে (to hierarchy) জবাবদিহিতা।
৪.    নিজের বিবেকের কাছের ((to self)) জবাবদিহিতা।
ইসলামে জবাবদিহিতার চারটি পর্যায়ে রয়েছে। মহানবী (সা) প্রবর্তিত মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থায় সরকারি কর্মকর্তাদেরকে তাদের কাজের জন্য চার ভাবে জবাবদিহি করার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ইসলাম সবাইকেই জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসে।
এ চতুর্বিধ জবাবদিহিতার কারণ হচ্ছে ইসলামের দৃষ্টিতে কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব, শাসনক্ষমতা একটি আমানত। মদিনা রাষ্ট্রের প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তারা আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতির পাশাপাশি জনগণের কাছেও জবাবদিহির ব্যাপারে ছিলেন সতর্ক।
মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসন ছিল সবচাইতে সুসংহত এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সক্রিয় অংশীদার। মদিনা রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়, ব্যবসায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পরিদর্শন, বাস্তবায়নÑ এসবই ছিল অর্থপ্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ। মহানবী (সা) বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে অর্থপ্রশাসনকে নাগরিকদের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্থাপন, শিক্ষা ও সভ্যতার সম্প্রসারণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মহানবী (সা) প্রতিষ্ঠিত প্রশাসন ও এর সাথে জড়িত সুযোগ্য সাহাবীগণ দক্ষতা, সততা, দূরদর্শিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ঐকান্তিকতা ও জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে শৃঙ্খলা ও কঠোরতার মাধ্যমে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যে বিস্ময়কর প্রতিভার স্পষ্ট ও স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেছেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে এবং প্রশাসনিক ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে তা অনন্য অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে চিরদিন অম্লান থাকবে। তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা, কার্যক্রম ও দৃষ্টান্ত আজকের ইসলামী উম্মাহর গর্বের বিষয় অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় মডেল।
মহানবীর অর্থনৈতিক দর্শন ও অর্থপ্রশাসনের বৈশিষ্ট্য
Characteristics of Economic Philolsophy and Financial Adrninistration of Prophet (SM)
মহানবী (সা) মদিনা রাষ্ট্রে এমন একটি অর্থপ্রশাসন কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা ছিল কুরআনের শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত। এ প্রশাসনের ভিত্তি ছিল তাওহিদ ও রবুবিয়াত, খিলাফত, রিসালাত এবং আখিরাত ও জবাবদিহিতার অনুভূতি। আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার অনুভূতিই মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে যাবতীয় অন্যায়, জুলুম, শোষণ তথা আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত রেখেছিল এবং আল্লাহর বিধানের অনুগত বানিয়ে দিয়েছিল।
২. মদিনা রাষ্ট্রে অর্থপ্রশাসনের যে দর্শন ছিল তার মৌলিক দিক হলো, এ জগতের যাবতীয় সম্পদের পূর্ণ মালিকানা হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। মানুষ সেসব সম্পদের আমানতদার তত্ত্বাবধায়ক। অন্য কথায় মালসম্পদের আসল মালিক আল্লাহ, মানুষ তাঁরই খলিফা হিসেবে এ মাল সম্পদের আমানতদার, অসি (Trustee)। মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর নির্দেশিত পথে এ সম্পদের উপার্জন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের দায়-দায়িত্ব পালন করে। সম্পদের ওপর শর্তসাপেক্ষে মানুষের মালিকানার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
প্রথমত, এ সম্পদরাজি কতিপয় ব্যক্তির জন্য নয় বরং সকল মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত, ব্যয়িত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ধন-সম্পদ উপার্জন করতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত বৈধ পথ ও উপায়ে। ভিন্ন পথে করা হলে তাতে খিলাফতের শর্ত লঙ্ঘিত হবে।
তৃতীয়ত, বৈধ পথে অর্জিত সম্পদের আমানতের শর্ত-নির্ধারিত উদ্দেশ্যে অর্থাৎ শুধু নিজ স্বার্থ, নিজ পরিবার পরিজনই নয়, সমাজের অন্য সবার কল্যাণেও ব্যবহার করতে হবে।
চতুর্থত, স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে আল্লাহপ্রদত্ত এ সম্পদ ধ্বংস ও অপচয় করা যাবে না। অর্থনীতির ক্ষেত্রে এ আচরণকে কুরআনে ফাসাদ বা বিপর্যয় এবং অনাচার সৃষ্টির সাথে তুলনা করে এর বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে।
৩. তাওহিদ, রিসালাত, খিলাফত ও আখিরাতের ভিত্তির ওপর মদিনা রাষ্ট্রের যে অর্থপ্রশাসন সংগঠিত হয়েছিল তার লক্ষ্য ছিল : ১. সকল নাগরিকের ইহকালীন কল্যাণ নিশ্চিত করা, ২. সুবিচার প্রতিষ্ঠা, ৩. ক্ষতি, বিপর্যয় ও জুলুমের সকল পথ বন্ধ করা, ৪. রাষ্ট্রে বসবাসকারী সর্বস্তরের জনগণের মৌলিক প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণ করা, ৫. আয় ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, ৬. ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে সামাজিক স্থায়িত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা, ৭. আল্লাহর সৃষ্টিকুলের প্রতি অনুকম্পা এবং সকল সৃষ্টি ও মানুষের জন্য নির্মল ও সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলা।
৪. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসনের ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার আদল ও ইহসান। তা ছিল জাহিলিয়াতের যুগের সব অন্যায়, অত্যাচার ও বে-ইনসাফি থেকে মুক্ত। আদল মানে সুবিচার, ন্যায়বিচার। দু’টি স্বতন্ত্র সত্যের সমন্বয়ে আদল গঠিত। ১. মানুষের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও সাদৃশ্য প্রতিষ্ঠিা করা ২. প্রত্যেককে যথাযথভাবে তার অধিকার প্রদান করা। কোনো পক্ষপাতিত্ব না করা যার যা প্রাপ্য তাকে তা দেয়ার নাম আদল। প্রকৃতপক্ষে আদলের দাবি হচ্ছে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য। প্রত্যেক নাগরিককে তার নৈতিক, সম্পর্কগত, অর্থনৈতিক, আইনগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারপূর্ণ ঈমানদারির সাথে যথাযথভাবে প্রদান করা। ন্যায়বিচারের অন্য অর্থ সমাজ থেকে অন্যায় ও জুলুমের উচ্ছেদ এবং সবল প্রতিরোধ। ইসলামী শরিয়ার ব্যত্যয় জুলুমকেই ডেকে আনে। জুলুমের সময়োচিত প্রতিরোধ ও উচ্ছেদ না হলে দুর্বল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রতারিত, নিগৃহীত, বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্যই মহানবী (সা) এর অর্থপ্রশাসনে এর প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। আদল বা সুবিচারের স্বার্থে আইনের তাৎক্ষণিক ও যথাযথ প্রয়োগ মদিনা রাষ্ট্রে সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। একই সাথে ইহসান বা কল্যাণের প্রসঙ্গটি মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসনে গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়েছিল। ইহসান মানে সুন্দর ব্যবস্থার হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ, অপরকে তার অধিকারের চেয়ে বেশি দেয়া এবং নিজের অধিকারের চেয়ে কম পেয়েও সন্তুষ্ট থাকা। ইহসান আদলের চেয়ে বেশি কিছু। কোনো সমাজ কেবল আদলের নীতির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, যেখানে সমাজের প্রত্যেক সদস্য হরহামেশা মেপে মেপে নিজের অধিকার নির্ণয় ও আদায় করে; আর অপরের অধিকার কতটা রয়েছে তা খতিয়ে নির্ধারণ করে এবং কেবল ততটুকুই দিয়ে দেয়। এ ধরনের একটি সমাজে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘটবে না বটে কিন্তু সামগ্রিকভাবে সে সমাজে প্রেম ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, মাহাত্ম্য, উদারতা, ত্যাগ ও কোরবানি, নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতা এবং অপরের কল্যাণ কামনার মত মহত্তম বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। অথচ এ গুণগুলো তথা ইহসান হচ্ছে ব্যক্তিজীবনে সজীবতা ও মাধুর্য সৃষ্টির এবং সমাজজীবনে সৌন্দর্য ও সুষমা বিকাশের উপাদান। ইহসানের সাথে আর্থসামাজিক সুবিচার এবং কার্যক্রমের যে আদেশ আল্লাহ দিয়েছেন এ জন্যই তা বাস্তবায়নকে মদিনা রাষ্ট্র ফরজ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। মদিনার অর্থনীতিতে কড়া নজর রাখা হতো যাতে আদল ও ইনসাফ কায়েম থাকে এবং কোনো জুলুম হতে না পারে।
৫. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসনের লক্ষ্য ছিল সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার। যাবতীয় বস্তুগত ও মানবীয় সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ও দক্ষতাপূর্ণ ব্যবহার মদিনা রাষ্ট্রে নিশ্চিত করা হয়েছিল। মানবকল্যাণের লক্ষ্য হাসিলের জন্যই মহানবী (সা) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সসীম সম্পদের দক্ষতাপূর্ণ বরাদ্দ ও ব্যবহার করেছিলেন। মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সম্পদ ও সেবাপ্রাপ্তি এবং ত্যাগ উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে বলেই মনে করা হতো। সম্পদের ব্যবহার ও ভোগ শুধুমাত্র ইহজাগতিক সুখের জন্য নয়। এর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে পরকালীন কল্যাণও নিশ্চিত করতে হবে।
৬. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বঞ্চিতদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানো ও তাদের মানবিক মর্যাদার যথাযথ প্রতিষ্ঠা। মদিনা রাষ্ট্রে ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বৈধ পন্থায় উপার্জিত ধন-সম্পদে অন্যদেরও অধিকার রয়েছে। বিশেষত আত্মীয়স্বজন এবং সমাজে যারা মন্দভাগ্য তাদের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া প্রতিটি বিত্তবান নাগরিকের ঈমানি দায়িত্ব। কুরআনের আদর্শ অনুসারে নাগরিকগণ নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পর যাদের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকত তারা দরিদ্র আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের বঞ্চিত ভাগ্যাহত লোকদের ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে তা বাধ্যতামূলকভাবে ব্যয় করত। সমাজের বিত্তহীন ও অভাবগ্রস্ত নাগরিকদের প্রয়োজন পূরণ ও কল্যাণ সাধনের জন্য দেয় কুরআনিক নির্দেশনা মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
৭. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসন যে অর্থব্যবস্থা কায়েম করছিল তাতে প্রত্যেকের স্বাধীনভাবে পেশা নির্বাচন করে জীবিকা অর্জন করার অধিকার ছিল। অন্যথায় জীবিকা অর্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। এ পৃথিবীতে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, অফুরন্ত সম্পদ ভাণ্ডার রয়েছে তা খুঁজে বের করে যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করা যায়। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিক স্বাধীনভাবে ব্যবসায়, চাষাবাদ, কৃষি, পশুপালন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পেশায় নিয়োজিত ছিলেন উৎপাদন কার্য চলত স্বাধীনভাবে। উৎপাদন কর্মকাণ্ডে সাহাবীরা নিজেরাও অংশগ্রহণ করতেন এবং প্রয়োজনবোধে মজুরও নিয়োগ করতেন। এক কথায় মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসন ইসলামী শিক্ষার আওতাধীন এক স্বাধীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এতে বেকার এবং অভাবগ্রস্তদের কর্মসংস্থান অথবা ভাতার ব্যবস্থা ছিল।
৮. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থনীতি স্বাধীন অর্থনীতি হলেও তা অবাধ ছিল না। কারণ ইসলামী অর্থনীতিতে উৎপাদন, উপার্জন, ব্যয়, ভোগ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই ব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণারোপ করা হয়েছে। ইসলাম অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিরঙ্কুশ স্বাধীনতাকে স্বীকার করে না। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির ওপর আইনের নিয়ন্ত্রণ পর্যাপ্ত। ফলে সুবিচার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা এতে নিশ্চিত।
৯. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ছিলেন রাষ্ট্রীয় বায়তুলমালের রক্ষক। তারা ভক্ষক ছিলেন না। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই দারিদ্র্যক্লিষ্ট ছিলেন। বায়তুলমাল থেকে একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন ধারাণোপযোগী সমতুল্য অর্থই তারা পেতেন। কোনো অবস্থাতেই তারা বেশি অর্থ নিতে রাজি হতেন না। অর্থপ্রশাসনের কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিগণ যাতে আড়ন্বরহীন জীবনযাপন করেন মহানবী (সা) সেদিকে কড়া নজর রাখতেন। প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকগণ যাতে আরামপ্রিয় না হয়ে পড়ে সে জন্য আরাম-আয়েশের উপাদানগুলোর ওপর ইসলামের নৈতিক চারিত্রিক বিধিনিষেধারোপ করা হয় এবং সহজ, সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপনের ওপর সকলকে উৎসাহিত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলামী রাষ্ট্র এর রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক অধিকারকে সমান চোখে দেখে।
১০. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল নাগরিকের কল্যাণ সাধন করা। মদিনা রাষ্ট্র্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে কোনো প্রকার জুলুম ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ সংখ্যালঘুরা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের আমানত।
১১. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি আল কুরআন হচ্ছে এমন এক ঐশী গ্রন্থ যেখানে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব তথা সরকারি আয়ের খাতসমূহ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের খাত সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। সম্পদ ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত করার জন্য বিভিন্ন মেকানিজমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়, বৈষম্য কমে, সামাজিক বৈষম্য নির্মূল হয় এবং শ্রেণীসংঘাতের অবসান ঘটে। ইসলামী অর্থনীতিতে উৎপাদন ও আয়ের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ সম্পৃক্ত থাকে। ইসলামের নিষিদ্ধ উৎপাদন ও আয় হারাম বলে গণ্য হয়। একদিকে ইসরাফ ও তাবজির সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, অন্য দিকে ইহতিকার বা মজুদদারি সম্পর্কে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইসলামের মিরাজি আইন বা উত্তরাধিকার আইন (Law of inheritance in Islam) আয় ও সম্পদ বণ্টনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। বস্তুত মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসন কুরআনের এসব নির্দেশকেই বাস্তবায়িত করেছে।
১২. মদিনা রাষ্ট্রে সুদহীন অর্থনীতি চালু করা হয়েছিল। কুরআন মজিদে দ্ব্যর্থহীনভাবে সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহানবী (সা)-এর অর্থনীতিতে সুদের লেনদেন সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা হয়। কুরআন সুদকে নিষিদ্ধ করেই থামেনি, সুদের কারবারিদের প্রতি যুদ্ধ জিহাদ ঘোষণা করা হয়েছে। মদিনার ব্যবসায়ীরা নিজের অর্থে ব্যবসায় করতেন অথবা অন্যের নিকট থেকে লাভ-লোকসানে অংশীদার হওয়ার ভিত্তিতে বিনিয়োগ গ্রহণ করে ব্যবসার জন্য প্রয়োজনাতিরিক্ত মূলধনের ব্যবস্থা করতেন। লাভের অংশ বিনিয়োগকারীকে দিয়ে দিতেন। শরিকানার ভিত্তিতেও ব্যবসায় করা হতো। শরিকানা ব্যবসায়ে হয় দু’জনের পুঁজিই খাটানো হতো অথবা একজনের পুঁজি, অন্যজনের শ্রম সংযুক্ত হতো এবং নির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী লাভ-লোকসান ভাগ করা হতো ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিনাসুদে একজন অন্যজনের নিকট হতে কর্জ (ঋণ) (profit free loan) গ্রহণ করতেন। মদিনার অর্থনীতিতে আধুনিক ধরনের ব্যাংক কায়েম ছিল না। এ কারণে আধুনিক অর্থনীতিতে সুদের যেসব খারাপ প্রভাব রয়েছে তা মদিনার ইসলামী অর্থনীতিতে দেখা দেয়নি। মদিনার অর্থ-প্রশাসন সুদের মত সব ধরনের শোষণের উপায় উপকরণকে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামী অর্থনীতিতে শোষণের হাতিয়ারের কোনো স্থান নেই। ইসলামী অর্থনীতিতে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে আয় ও উৎপাদনের পথ ও প্রক্রিয়া হবে হালাল, হারাম পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ। এ জন্য মদিনার অর্থনীতিতে ঘুষ, জুয়া, লটারি, বাজি, ধোঁকা, প্রতারণা, ফটকা কারবার বা ফটকাবাজারি, বখরাবাজি, ওজন ও পরিমাপে কম দেয়া, মালে ভেজাল মেশানো, ভেজালপণ্য বিক্রিকরণ জবরদখল, লুণ্ঠন, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, আত্মসাৎ, খেয়ানত, ধাপ্পাবাজি, চোরাচালান, মজুদদারি, খোলোবাজারি, মুনাফাখোরি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়প্রীতি- এসবের কোনো সুযোগ ছিল না।
১৩. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃত্তি (Economic Growth) সাধন। হাতের কাছে যে সম্পদ রয়েছে, তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি, সম্পদের বিস্তার ঘটান হয়। একই সাথে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হয়।
১৪. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-ব্যবস্থায় ধনবানদের সম্পদ পবিত্রকরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এ পবিত্রকরণের মাধ্যমে সম্পদের আবর্তন সৃষ্টি হয়। ধনীদের হাত থেকে সম্পদ নেমে আসে গরিবদের নিকট। ইসলামে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ধনবানদের সম্পদ শুধুমাত্র ধনবানদের নয়, এর ওপর দরিদ্রদের হক রয়েছে। কুরআন বলছে : ‘‘আল্লাহ রাহে ব্যয় কর এবং স্বহস্তে তোমরা ধ্বংসের পথ উন্মক্ত করো না এবং তাদের ধনসম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে। আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। এটা তাদের জন্য উত্তম যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসন আল্লাহর এসব নির্দেশকে বাস্তবে রূপায়িত করেছিল।
১৫. মদিনা রাষ্ট্রের অর্থ-প্রশাসনের আওতায় অমুসলিমদের ওপর করারোপ বস্তুত তাদের প্রতি কর্তব্যবোধেরই পরিচায়ক। মুসলিম নাগরিকদের মত অমুসলিমদেরও জান ও মালের হিফাজত রাষ্ট্রের কর্তব্য। কাজেই মুসলিমদের জন্য জাকাত অত্যাবশ্যক ধরে অমুসলিমদের জিজিয়া থেকে অব্যাহতি দেয়া ন্যায় ও ইনসাফের পরিপন্থী।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ব্যাংকার

SHARE

Leave a Reply