মহানবী (সা)-এর জীবনের রাজনৈতিক দিক -গাজী নজরুল ইসলাম

“হে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করো এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নাও। তুমি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করো, যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত ও অপমানিত করো। সকল কল্যাণ ও মঙ্গল তোমার হাতেই নিহিত। নিশ্চয়ই তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সূরা আলে ইমরান : ২৬ )

“হে আল্লাহ! তোমার সিংহাসন (কর্তৃত্ব) সমগ্র আসমান ও পৃথিবীব্যাপী পরিবেষ্টন করে আছে।” (সূরা বাকারা : ২৫৫)

মহাগ্রন্থ আল কোরআনে উল্লিখিত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সূরার দু’টি আয়াতের মধ্যে বিশ্বজাহানের মালিক মহান আল্লাহ পাকের অসীম ক্ষমতা-শক্তি-মহিমা-কুদরত-আসন-অবস্থান ও স্থিতির বর্ণনা করা হয়েছে, যার ব্যাপ্তি সমগ্র আসমান ও জমিনব্যাপী বিস্তৃত। একদিকে তিনি “মালিকাল মুলক”-বিশ্ব জাহানের মালিক, অপরদিকে তাঁর “কুরসি”-আসন সমগ্র আসমান ও জমিনব্যাপী পরিব্যাপ্ত। এর মধ্যে দুনিয়ার তথাকথিত নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের কোনো প্রশ্নই আসে না। দুনিয়ার নেতৃবৃন্দের কর্তৃত্ব কেবল সাময়িকভাবে মহান আল্লাহ পাকই বরাদ্দ করে থাকেন, আবার তা প্রয়োজনে তিনি কেড়েও নিয়ে থাকেন।
সৃষ্টির প্রথম থেকে অদ্যাবধি মহান আল্লাহপাক দুনিয়াতে অনেক দোর্দন্ড-প্রতাপশালী নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটিয়েছেন, জাঁকালো সিংহাসনে আরোহণ করিয়েছেন আবার নিমিষেই তিনি ঐ প্রবল পরাক্রমশালী ক্ষমতা ও সিংহাসনকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। কাউকে ইজ্জত-সম্মান দান করেছেন, আবার কাউকে বেইজ্জতি ও লাঞ্ছিত করেছেন। এ শুধু সৃষ্টির লীলাখেলা নয়- এটা তাঁর প্রতিশ্রুত পরিকল্পনার নিয়ামক পরিণতি।
মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) মহান আল্লাহ পাকের সেই প্রতিশ্রুত পরিপূর্ণ নেতৃত্বের সফল রোল মডেল। মহানবী (সা) দুনিয়াতে এসে তাঁরই জামানার অনেক স্বৈরাচারী জালেম, স্বঘোষিত প্রতিপত্তিশালী ক্ষমতাধর সিংহাসন দখলকারী ভন্ড নেতৃত্বকে হেকমত-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা, কৌশলী পরিকল্পনা এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে অপসারণ করে হক, ইনসাফপূর্ণ শান্তির সমাজ কায়েম করেছেন- যে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা দুনিয়ার ইতিহাসে স্বর্ণযুগের সৃষ্টি করেছিল। ঐ সোনালি সমাজ ও কল্যাণকর রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় তৎকালীন স্বৈরাচারী, খোদাদ্রোহী, জালেম শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণে মহানবী (সা) সে সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা ও বিজ্ঞচিত কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, সেটাই হলো বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ^নবীর জীবনে রাজনীতি।
এখন আমরা মহানবী (সা)-এর জীবনে রাষ্ট্র পরিচালনার কতিপয় রাজনৈতিক দিক আলোচনা করব।
মক্কার কুরাইশদের বিরোধিতায়
মহানবীর (সা) কর্মকৌশল
মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মক্কার লোকদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী, সত্যভাষী, বিশ^স্ত এবং আমানতদার ব্যক্তি। সকলেই তাকে ‘আল আমিন’ এবং ‘আস সাদেক’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। কিন্তু নবুয়তের নেতৃত্ব প্রাপ্তির পর পরই ঐ মক্কার কুরাইশরাই তাঁকে মন্দ লোক, গণক, পাগল, জাদুকর, ক্ষমতালোভী ইত্যাদি বচনে তিরস্কার করতে শুরু করল। কেননা নবুয়ত প্রাপ্তির পর তিনি কুরাইশদের প্রচলতি কুপ্রথা, স্বৈরাচারী নেতৃত্ব¡ এবং জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যায়-অসত্যের প্রতিবাদ করে মক্কার মজলুম জনগণকে নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। সর্বোপরি খোদাহীন জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের একত্ববাদ এবং উলুহিয়াতের মাধ্যমে আখিরাতের জবাবদিহিমূলক জীবনাচার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। মক্কার কায়েমি শক্তিশালী তাগুতি নেতৃত্ব মুহাম্মদ (সা) এর এই নবতর দাওয়াতি কর্মপরিকল্পনাকে তাদের নেতৃত্বে আঘাত মনে করে মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করে এমনকি বিভিন্ন এবং বিচিত্র চক্রান্তের মাধ্যমে এক পর্যায়ে দারুন-নদওয়ার মারণঘাতী ট্রাইব্যুনাল বসিয়ে তাঁকে হত্যা করে দুনিয়ায় নেতৃত্বের স্বাদ মেটাতে চেয়েছিল। মক্কার এবং পার্শবর্তী এলাকাসমূহের বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল, উপদলকে উসকানি নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধে সংঘাতে সৃষ্টি করার অপকৌশল গ্রহণ করেছিল- যা শেষ পর্যন্ত মারাত্মক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছিল। এমনি এক সংঘাত এবং সঙ্কটময় মুহূর্তে মহানবী (সা) নিম্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেন।

মক্কার বাইরে মহানবী (সা) এর
কর্মনীতি সম্প্রসারণ
আরবের এবং পাশর্বর্র্তী এলাকার লোকেরা প্রতি বছর মক্কায় হজব্রত পালন করতে আসত এবং এ উপলক্ষে সেখানে বিরাট মেলা বসত। ঐ মেলায় যোগদানে কারো কোনো বাধা-নিষেধ ছিল না। রাসূল (সা) তার কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঐ সব মেলায় যেমন উকাজ, জুল মাজা, মুজনাহ, প্রভৃতিতে যোগদান করতেন এবং মক্কা নগরীর বাইরে থেকে আসা হজযাত্রীদের কতিপয়ের সাথে মিনা প্রান্তরে তাদের তাঁবুতে কৌশলে সাক্ষাৎ করতেন- যা ছিল তার দাওয়াতি কর্মপরিকল্পনার এক অভিনব কৌশল। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ঐ প্রক্রিয়ায় প্রায় পনেরোটি গোত্র এবং তাদের দলীয় প্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাদের কাছে খোলামেলা হৃদয়গ্রাহী উদাত্ত আহবান জানান এই মর্মে যে, “আপনারা এক আল্লাহকে বিশ্বাস করুন। আমি তাঁর প্রেরিত নবী, আমাকে মেনে নিন। আমাকে সহযোগিতা করুন আমাকে আপনাদের দেশে নিয়ে যান, এবং আমার এ উদ্যোগকে সহায়তা দিন। এতে শুধু আপনাদের পরকালেই নয়, ইহকালেও প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে।” নবী (সা) তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হয়ে এতদূর পর্যন্ত বলেই ফেলতে লাগলেন যে, “আপনারা আমার আহবানে ঐক্যবদ্ধ হলে অতি সত্বর পরাক্রমশালী রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হতে পারবেন। সাফল্য আপনাদের অনিবার্য।” বস্তুত ঐ সময়ে রোম ও পারস্য সা¤্রাজ্য শৌর্য-বীর্যে, শক্তি-সামর্থ্যে তৎকালীন বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত ছিল। এসব ব্যঞ্জনামূলক তত্ত্ব ও তথ্য সংবলিত জয়-বিজয় আর নিশ্চিত সফলতার বক্তৃতায় মেলায় আগত বিভিন্ন গোত্রীয় জনশক্তি এবং তাদের প্রধানগণের চিন্তার রাজ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলো। তারা সবাই বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে মক্কার এক সাহসী, ব্যঞ্জনাদায়ী, উদার-উচ্ছ্বাসপূর্ণ অপূর্ব কথামালায় আহবানকারী যুবক মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি অন্তরে-হৃদয়ে আকৃষ্ট হয়ে উঠতে লাগল, যদিও তৎকালীন মক্কার কুরাইশ নেতা আবু লাহাব গোপনে-সন্তর্পণে ছায়ার মতো মুহাম্মদ (সা)-এর এ-অভিনব দাওয়াতি মিশনের পেছনে অনুসরণ করে তাঁর শ্রোতাদের উদ্দেশে সুযোগ বুঝে বলতে থাকলো, “সাবধান! আপনারা এ পাগলের প্রলাপে কান দেবেন না, অন্যথায় একদা আপনারা সমগ্র কুরাইশদের কোপানলে পড়বেন।” মক্কার কুরাইশদের প্রভাবশালী বড় নেতা আবু লাহাবের এ রকম নির্মম বিরোধিতা আগত মেহমানদের মনে মক্কার ঐ প্রভাবশালী কুরাইশদের আরেক প্রতিভাবান দীপ্তময় যুবক নেতা মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে আরো কৌতূহলী করে তুললো এবং মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে আরো জানবার, বুঝবার এবং গবেষণা করার অদম্য স্পৃহার সৃষ্টি করলো। একদা রাসূল (সা) মিনা থেকে মক্কায় ফেরার পথে আকাবা উপত্যকায় মদিনার কয়েকজন হাজীকে দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মনস্থ করলেন তাদের কাছেও নবুওতের দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। রাসূল (সা)-এর মাতুলালয় ছিল মদিনায়। সেহেতু মদিনাবাসীর সাথে তাঁর মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক আর ইহুদিদের সাথে সহাবস্থান হেতু নবী, পরকাল, পুনরুত্থান ইত্যাদি সম্পর্কে মদিনাবাসীর একটা স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। তখনকার আহলেকিতাবরা বিশ্বাস করত যে, সমগ্র বিশ্বের ‘শান্তিদাতা’ হিসেবে অচিরেই একজন মহা-মানবের আবির্ভাব ঘটবে। মুহাম্মদ (সা)-এর স্বর্গীয় আহবান, তেজস্বী বক্তৃতা, হৃদয়গ্রাহী কথামালার ওজস্বিতা, ভাবগাম্ভীর্র্যতা, হইলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের তাৎপর্যপূর্ণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, সর্বোপরি তৎকালীন বিশ্ব-পরিক্রমায় বিভিন্ন জাতি- গোষ্ঠীর উত্থান-পতন, জয়-পরাজয়ের রোমাঞ্চকর ঘটনা প্রবাহের বর্ণনা হজের মৌসুমে মেলায় আগত আরববাসীর বিশেষ করে মুহাম্মদ (সা)-এর মাতুল সম্পর্কীয় মদিনাবাসীর মনের মুকুরে ভবিষ্যতের সেই প্রতিশ্রুত ‘নবী’ আবির্ভূত হওয়ারই ইঙ্গিত প্রতিবিম্বিত হতে লাগল।

সফল দাওয়াতি প্রক্রিয়ায় আকাবার
প্রথম শপথ (বাইয়াত)
এক পর্যায়ে মদিনা থেকে আগত আকাবায়’ অবস্থানকারী ঐসব হজযাত্রী কোনোরূপ ইতস্তত না করেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মুহাম্মদ (সা)-এর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে এবং মদিনায় ফিরে গিয়ে এই ‘নতুন ইসলাম’ প্রচারে মনোনিবেশ করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়। মদিনায় ফিরে গিয়ে এসব নবদীক্ষিত মুসলমানরা এক বছরের মধ্যে দশ-বারো জন লোককে ইসলামের ছায়াতলে দীক্ষিত করে এবং তাঁরা এতই অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন যে পরবর্তী হজের মৌসুমে পুনরায় ‘আকাবায়’ উপস্থিত হয়ে মহানবী (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে নিজেরা এবং নিজেদের গোত্রসমূহের পক্ষ থেকে এই বলে শপথ ও আনুগত্য প্রকাশ করে যে, ১. তাঁরা এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করবে না, ২. চুরি, ব্যভিচার ও কন্যাসন্তানদের হত্যা করবে না, ৩. জেনেশুনে কারো বিরুদ্ধে কোন অপবাদ রটাবে না এবং ৪. কখনো মুহাম্মদ (সা)-এর আদেশ নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করবে না। এই প্রতিনিধিদল তাদের সাথে একজন শিক্ষক পাঠানোর জন্য অনুরোধ করলে মুহাম্মদ (সা) হযরত উমাইর (রা)-কে মদিনায় পাঠিয়ে দেন এবং তিনি সেখানে গিয়ে ইসলামের পক্ষে জোর প্রচারকার্য চালান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন। তারিখে তারাবিতে বর্ণিত আছে যে, এই পুণ্যবান ব্যক্তির প্রচেষ্টায়-মক্কার হযরত ওমর (রা)-এর মত মদিনায় একজন তেজস্বী ও সাহসী নেতার সন্ধান পান। তিনি কুরআনের কয়েকটি আয়াত শোনা মাত্রই এতই অভিভূত হয়ে পড়েন যে তৎক্ষণাৎ নিজ মহল্লায় ফিরে গিয়ে অনুসারীদের কাছে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, “তোমরা যদি আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পেতে চাও, তাহলে এখনই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নাও, অন্যথায় আমিই হবো তোমাদের সবচাইতে বড় শত্রু।” তার ঐ ঘোষণায় সেদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই গোত্রের সকল জনশক্তি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
আকাবার দ্বিতীয় শপথ
এক বছর পর মদিনায় হযরত উমাইর (রা)-এর হাতে যারা মুসলমান হয়েছিলেন তারা সহ ইতঃপূর্বে দীক্ষিত মুসলমানদের একটি বিরাট কাফেলা হজ উপলক্ষে মিনায় আসেন এবং পূর্ব পরিচিত সেই আকাবা উপত্যকায় তাঁদের প্রিয় নেতা মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন এবং অতি আবেগে উৎসাহে হৃদয় ভরা মন নিয়ে নবী (সা)কে মদিনায় গমনের অনুরোধ জানান এবং তাঁরা সকলেই মিলে একযোগে প্রতিশ্রুতি দেন যে, রাসূল (সা)কে তাঁর মক্কার সাথীদেরসহ যথাযথ মেহমানদারি করবেন এবং এমন নিরাপত্তা বিধান করবেন যেমন তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকেন।
জননেতা মহানবী মুহাম্মদ (সা) উদগ্রীব এবং আকাক্সিক্ষত হৃদয়ে এতদিনে যে পরিকল্পনার চিন্তাটি তাঁর রাজনৈতিক মগজে ধারণ করে আসছিলেন, আজ যেন তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পেলেন। ততদিনে মক্কার কুরাইশদের নিত্য অত্যাচার এবং সাক্ষাৎ-ষড়যন্ত্রে স্বল্পসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী যেভাবে সদাসর্বদা ভীত-তটস্থ হয়ে এক দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল মুহাম্মদ (সা) সহ তাঁর সাথীরা যেন মক্কায় নিজ জন্মভূমিতে আজন্ম নির্যাতিত পরবাসী। এ প্রেক্ষিতে আড়ালে সংগোপনে ইতোমধ্যে তিনি কিছু সাথী কর্মীদের পার্শ^বর্তী নিরাপদ এলাকায় যেমন ইথিওপিয়ায় চলে যেতে অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপর নিজেই তাঁর বাকি সাথীদের নিয়ে প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় যাওয়ার পরিকল্পনা আঁটছিলেন। ঠিক তেমনি এক দোলাচলের ক্রান্তিকালে এবারের হজ মৌসুমে আকাবার সেই ঐতিহাসিক জায়গায় মদিনা থেকে আগত ইসলামে নবদীক্ষিত একদল সাহসী উৎসাহী এবং কর্মচঞ্চল প্রেরণাদায়ী আল্লাহ ও নবী প্রেমিক জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে মদিনায় আতিথ্য গ্রহণের আহবান এলো। ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্ণধার, আল্লাহর জমিনে দ্বীন কায়েমের সফল কান্ডারি, বিশ^ব্যাপী কোরআনি হুকুমত কায়েমের যোগ্য পথিকৃৎ, ভবিষ্যৎ মদিনাসহ আরব রাষ্ট্রে অবিসংবাদিত নেতা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) মদিনাবাসীর ঐ প্রস্তাব আনন্দের সাথে গ্রহণ করলেন এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাজনিত কণ্ঠে বললেন, তোমাদের যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ, এবং তোমাদের সন্ধি-আমাদের সন্ধি। আমি এখন তোমাদের হয়ে গেলাম।”-এটা ছিল বিশ্বের স্মরণকালের ইতিহাসের একটি সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক চুক্তি-যা আকাবার দ্বিতীয় শপথ বাইয়াত নামে খ্যাত। এ চুক্তিটির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিজ্ঞচিত দূরদর্শিতার এবং সুদূরপ্রসারী-এক মহাপরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হলো। সাথে সাথে আরো একটি মোক্ষম বাস্তবতা দৃশ্যমান হলো এই মর্মে যে, ভবিষ্যৎ ইসলামী রাষ্ট্রের নিবেদিতপ্রাণ নাগরিকগণ যেন স্বেচ্ছায় এবং আনন্দে মুহাম্মদ (সা)-এর রাষ্ট্রনায়কত্ব গ্রহণ করে নিলেন।

রাসূল (সা)-এর মদিনায় হিজরত
রাসূল (সা) মদিনায় হিজরত করলেন। হিজরতের পর মহানবী (সা) তাঁর সাথে যাওয়া মক্কার মোহাজের বাহিনী এবং মদিনার অনুগত আনসার বাহিনীর সম্মিলিত উদ্যোগে মদিনায় একটি ছোট নগর রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন করলেন। এই ছোট নগর রাষ্ট্রটি সুচারু রূপে পরিচালনার জন্য তিনি একটি লিখিত সংবিধিবদ্ধ সংবিধান রচনা করলেন। সংবিধানটি “মদিনা সনদ” নামে বিশে^র ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক সাংবিধানিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত এবং সংরক্ষিত আছে। এই ঐতিহাসিক সাংবিধানিক দলিলটি মুহাম্মদ (সা)-এর রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
মদিনা চুক্তির রাজনৈতিক দিক
মদিনায় হিজরত করে আসার পূর্ব থেকেই মহানবী (সা) এর নানামুখী কৌশলী দাওয়াতি প্রক্রিয়ায় মদিনার স্থানীয়দের ভেতর থেকে বড় একটি প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী-ইসলামের সুশীল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে নিজেরা যেমন ধন্য হয়েছিল তেমন তাদের নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সমর্থক গোষ্ঠী দল কিংবা আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ইসলামের সুমহান দাওয়াত গৌঁছানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টায় নিজেদেরকে সর্বক্ষণ নিয়োজিত রেখেছিল। এর ফলে মদিনায় মুসলিম নামীয় একটি সুশৃঙ্খল, আল্লাহমুখী রাসূলকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠী মহানবী (সা)-এর নির্দেশিত পথে চলতে এবং নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। এ ছাড়া ঐ সময়ে মদিনায় কিছু পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীও ছিল, যারা রাসূল (সা) এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত। কিন্তু মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেত না। বরং পরিস্থিতির আলোকে তারা সুযোগ বুঝে রাসূল (সা)-এর ভালোবাসার ভাব দেখাত এবং আনুগত্যের অভিনয় করত। এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই। এক পর্যায়ে মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্র তাকে নেতা বানাবার ব্যাপারে একমত হয়েছিল।
মদিনায় প্রধান তিনটি ইহুদি গোত্রও ছিল। এদের মধ্যে (এক) ‘বনু কাইনুকা’ গোত্রটি ছিল ‘খাজরাজ’ গোত্রের মিত্র। এরা মদিনার ভেতরেই বসবাস করত। (দুই) ‘বনু নজির’ এবং (তিন) ‘বনু কোরাইযা’ গোত্র। শেষোক্ত দু’টি গোত্র ছিল ‘আওস’ গোত্রের মিত্র। এরা মদিনার শহরতলি এলাকায় বসবাস করত। এ ছাড়া মদিনায় কিছু খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীও বসবাস করত। সব মিলে মদিনা নগর রাষ্ট্রের এখন মুসলিম, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং পৌত্তলিক-মুনাফিক জাতিগোষ্ঠীর সক্রিয় অবস্থান পরিলক্ষিত হতে লাগল।
মদিনার ইহুদি-খ্রিষ্টান এবং পৌত্তলিকদের সাথে আবার মক্কার কুরাইশদের ছিল ব্যবসায়িক, বৈবাহিক এবং আত্মিয়তার সম্পর্ক।
মহানবী (সা) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এলেন তখন মক্কার কুরাইশরা প্রমাদ গুনতে লাগল যে, কী করে মুহাম্মদ (সা) কে মদিনায় হেনস্তা করা যায়। তাদের ভাষায়, ‘তাঁর নেতৃত্বের সাধ মিটিয়ে দেয়া যায়, দুনিয়ার বুক থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়া যায়, এমনটি যে কোনো মুহূর্তে মদিনায় অবস্থিত তাদের মিত্রদের সাথে ষড়যন্ত্র করে মদিনা আক্রমণ করে তাদের পূর্ব অভিলাষ চরিতার্থ করা যায়’। মক্কাবাসী কুরাইশদের এমন একটি কূটপরিকল্পনার চিন্তা মাথায় রেখেই মুহাম্মদ (সা) মদিনায় নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রাখা, নবদীক্ষিত মুসলমানদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি মক্কা থেকে ঘড়-বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, সহায়-সম্পদ ছেড়ে নিঃস্ব হয়ে চলে আসা মোহাজেরদের পুনর্বাসন করে মদিনা রাষ্ট্রের যথাযথ মর্যাদাবান নাগরিক হিসেবে অধিষ্ঠিত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন।
এ লক্ষ্যে তিনি একদিকে যেমন মদিনার স্থানীয় শহরতলি এবং পাশর্^বর্তী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়সহ সাধারণ লোকদের বাড়িতে পরিকল্পিত সফর করে, আতিথ্য গ্রহণ করে, কুশল এবং মতবিনিময় করে মদিনার অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে নিজেকে সকলের কাছে একজন আস্থাভাজন প্রতিশ্রুতিশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অপর দিকে মদিনার ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং পৌত্তলিকদের সাথে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা করে একে অপরের বিপদে-আপদে বহিঃশত্রুর আক্রমণে বিশেষ করে কী করে নিজেদের ভূখন্ড মদিনাকে রক্ষা করা যায় এমন এক সার্বজনীন মূল্যবোধ সৃষ্টি করে সকলকে নিয়ে ‘মদিনা চুক্তি’ স্বাক্ষর করতে সফল হয়েছিলেন। এখানে তিনি সময়, পরিবেশ, পারিপাশির্^ক এবং রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এনে কে ইহুদি, কে খ্রিষ্টান আর কে পৌত্তলিক-এ চিন্তা না করে-সবাই মদিনা রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক, মদিনা-সকলের আশ্রয়স্থল-আবাসভূমি এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানেও মহানবী (সা) তার প্রগাঢ় রাজনৈতিক বিচক্ষণতাকে কাজে লাগিয়ে মহা এক রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকা পালনে সার্থক রূপকার হিসেবে নিজেকে পেশ করতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
অবশ্য চুক্তির প্রথম দিকে মদিনার ইহুদিদের মধ্যে বনু কোরায়জা বনুনজির ও বনু কায়নুকা গোত্র অংশগ্রহণ না করলেও মহানবী (সা) এর দূরদর্শী পদক্ষেপে অচিরেই ঐসব গোত্রগুলো মদিনা চুক্তির আওতায় নিজেদেরকে সোপর্দ করেছিল।
ইতিহাস সাক্ষী এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিজয়ী পদক্ষেপই স্বীকৃতি দিলো মুহাম্মদ (সা) একজন আল্লাহর নবী, এই মদিনা সনদই স্বীকৃতি দিল মদিনা এখন একটি মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র, এই মদিনা সনদই স্বীকৃত মুহাম্মদ (সা)ই ঐ মদিনা রাষ্ট্রের যোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান এবং মুহাম্মদ (সা) এর নেতৃত্বেই একদিন বিশ^ভূখন্ডে ইসলাম বিজয়ী ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।

মক্কার কুরাইশদের যাতায়াত পথে বাণিজ্যিক অবরোধ, মহানবী (সা)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার
আরেকটি কৌশলী দৃষ্টান্ত
কোন শত্রুরাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা গোত্রকে কাবু করতে গেলে যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে, তার মধ্যে অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক অবরোধ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মক্কার কুরাইশদের কাবু করার জন্য মহানবী (সা) তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে কুরাইশদের ব্যবসায়িক যাত্রাপথে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যা ছিল কুরাইশদের যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলার চাইতেও অধিক ভয়াবহ। কুরাইশদের তাদের বড় বড় বাণিজ্য-কাফেলা যে পথে সিরিয়া, মিশর, ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলে যাতায়াত করতো, ঐ বাণিজ্যিক রুটগুলো ছিল মদিনার নিকটবর্তী বনি যুমরা, মদলজ, প্রভৃতি গোত্রসমূহের বসবাসের এলাকা সন্নিহিত যা ছিল মদিনা থেকে ‘ইয়ামাবা’ পর্যন্ত বিস্তৃত। ঐ এলাকার গোত্রসমূহ মদিনা চুক্তির আওতায় না এলেও মহানবী (সা) সুকৌশলে তাদের সাথে আলাদা একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন এই মর্মে যে, যদি কেহ তাদের এলাকা আক্রমণ করে তবে মুসলমানরা সর্বতোভাবে তাদের সাহায্য করবে এবং মদিনা আক্রান্ত হলে তারা মুসলমানদের সাহায্য করবে। এই সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকার গোত্রসমূহের সাথে মহানবী (সা) এবং মদিনায় মুসলমানদের একটা সখ্য গড়ে ওঠে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাসূল (সা) এসব এলাকায় কুরাইশদের বাণিজ্য পথে এদের বাণিজ্য কাফেলাকে শাসানোর লক্ষ্যে মাঝে মাঝে মুসলমানদের ছোট ছোট প্রহরী দলÑ প্রেসার গ্রুপ হিসেবে পাঠানো শুরু করলেন এবং কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলায় সাময়িক বাধা কিংবা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করলেন। অবশ্য মুসলিম প্রহরী দল যাতে কাফেলার ওপর লুটতরাজ, খুন-খারাবি না করে সে ব্যাপারে মহানবী (সা) এর কঠোর নির্দেশনা ছিল। উদ্দেশ্য শুধু একটাই যে কুরাইশরা যেন মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত নবগঠিত মদিনা রাষ্ট্রের নাগরিকদের বোকা মনে না করে সকল ক্ষেত্রে পার পেয়ে যেতে না পারে। এমনকি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেকোনো উসকানিমূলক ও উত্ত্যক্তমূলক পদক্ষেপ নিতে না পারে। মুসলমানদের টহলদারির আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল এই যে দূর পথের বাণিজ্যে বার বার অবরোধের মুখে পড়ে ভয়ে-সংশয়ে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় যেন তাদের বাণিজ্য হাত গুটিয়ে লাটে ওঠার উপক্রম হতে পারে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও কোন কোন শক্তিধর দেশ কৌশলগত কারণে অন্য কোন দেশকে চাপে রেখে কিংবা বশে আনার জন্য এমন অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক অবরোধ সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকেন।

বদরের যুদ্ধের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
কুরাইশদের গতিবিধি এবং গোপন পরিকল্পনা জানার জন্য মহানবী (সা) দ্বিতীয় হিজরির রজব মাসে বারোজন সহযোগী সহকারে আবদুল্লাহ বিন হাজারকে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী ‘নাখলা’ নামক স্থানে পাঠালেন। ঘটনাক্রমে কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে ঐ পথ দিয়ে আসছিল। হজরত আবদুল্লাহ (রা) তাদের মোকাবিলা করলে ‘আমর বিন হাযরামী’ নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়। আরো দুই ব্যক্তিকে আটক করে গনিমতের মালামালসহ রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকটে পেশ করেন। মহানবী (সা) এ ঘটনায় বেশ ক্ষুব্ধ হন এবং কাফেলাকে মোকাবিলা করে কাউকে হত্যা করতে বলেননি বলে হজরত আবদুল্লাহ (রা)-কে তাম্বিহ করেন। এ ছাড়া তিনি গনিমতের মাল নিতেও অস্বীকৃতি জানান।
বিষয়টি মক্কায় দুঃসংবাদ আকারে পৌঁছালে কুরাইশরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং প্রতিশোধ নেয়ার অজুহাত খুঁজতে থাকে। এমনি অবস্থায় দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে (ঈসায়ী ৬২৩ সালের ফেব্রুয়ারি/মার্চ) কুরাইশদের একটি মোটাদাগের বাণিজ্য কাফেলা তাদের এক বড় নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে মদিনায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার কাছাকাছি পৌঁছলে বিনা প্ররোচনায় কূটনীতিক আবু সুফিয়ান মক্কায় এই বলে মিথ্যা খবর পাঠায় যে সে এবং তার বাণিজ্য কাফেলা মদিনার মুসলমানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। অতি শিগগিরই মক্কা থেকে সাহায্যের জন্য সকলকে প্রস্তুতি নিয়ে অভিযান আকারে আসা দরকার। মক্কায় এ খবরে হইচই পড়ে গেল এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে সহশ্রাধিক তাগড়া জোয়ানকে নিয়ে গঠিত একটি সুসজ্জিত সেনাদল মক্কা থেকে যাত্রা করে মদিনার উপকণ্ঠে ‘বদর’ নামক প্রান্তরে পৌঁছে গেল। রাসূল (সা) যথাসময়ে এ খবর অবহিত হলেন এবং সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার পর কী প্রস্তুতি নেয়া যায় সে বিষয়ে মুসলমানদের নিয়ে পরামর্শ বৈঠক আহবান করলেন।
মহানবী (সা) ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিষয়ে উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করলেন। তিনি বললেন, “এক দিকে মদিনার উত্তর প্রান্তে রয়েছে বিশাল এক ব্যবসায়ী কাফেলা, অন্যদিকে দক্ষিণ প্রান্তে এসেছে কুরাইশদের সুসজ্জিত সেনা দল। মহান আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছেন। এর যেকোনো একটি তোমরা লাভ করবে। এখন বলো, তোমরা এর কোনটিতে মোকাবিলা করতে চাও।” জবাবে বহু সাহাবী কাফেলার ওপর আক্রমণ চালানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। কিন্তু মহানবী (সা)-এর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। কাফেলা আক্রমণ করলে কিছু সহায়-সম্পদ ও মূল্যবান গনিমতের মালামাল পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু মক্কা থেকে সাজ সজ্জা করে অতি উৎসাহী হয়ে আসা কুরাইশ সৈন্যদের ঔদ্ধত্যকে অবদমিত করা যাবে না, বরং তারা আরো উৎসাহী হয়ে সরাসরি মদিনা আক্রমণ করে বসতে পারে। একদিকে আমরা কাফেলা আক্রমণ করে গনিমতের মালামাল ভাগাভাগিতে ব্যস্ত থাকবো, অপরদিকে কুরাইশরা মদিনা আক্রমণ করে নব প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করে ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে সমূলে বিনষ্ট করে দেবে, এটা কখনোই হতে পারে না। তাই তিনি অন্তরে অন্তরে কুরাইশদের যুদ্ধ অভিযানকে মোকাবিলা করার সংকল্প পোষণ করছিলেন। কিন্তু পরামর্শটি আহূত আনসার-মোহাজির ভাইদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আকারে আসুক-মহানবী (সা) এ কামনাই করছিলেন।
এ লক্ষ্যে তিনি বার বার একই কথার পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন যে, বলো! আমরা বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করবো নাকি কুরাইশদের যুদ্ধাভিযান মোকাবিলা করবো। অবশ্য তিনি আত্মিক মনোবল সৃষ্টির জন্য এ কথাও উচ্চারণ করছিলেন যে, মহান আল্লাহপাক ওয়াদা দিয়েছেন যে এ দু’টির যেকোনো একটি তোমরা লাভ করবে।”
মহানবী (সা)-এর এ বক্তৃতার পর মুহাজিরদের ভেতর থেকে মিকদাদ বিন আমর (রা) নামক জনৈক সাহাবী স্ব-দীপ্তপায়ে দাঁড়িয়ে জলদ গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, “হে আল্লাহর নবী (সা) প্রভু আপনাকে যেদিকে আদেশ দিয়েছেন সেদিকেই চলুন। আমরা আপনার সাথেই আছি। আমরা বনি ইসরাইলিদের মত কখনোই বলতে চাই না যে, যাও! তুমি ও তোমার খোদা যেয়ে লড়াই করো।” রাসূল (সা) প্রশ্নটি পুনরাবৃত্তি করলেন। এরপর হজরত সাদ বিন মায়াজ (রা) দাঁড়িয়ে হযরত মিকদাদ (রা)-এর অনুরূপ একই প্রত্যয় ঘোষণা করলেন। এরপর সকলেই একবাক্যে সিদ্ধান্ত হলো, যে বাণিজ্য কাফেলার পরিবর্তে কুরাইশদের যুদ্ধ কাফেলাকেই মোকাবিলা করা হবে। যেমন সিদ্ধান্ত, তেমন প্রস্তুতি এবং তাৎক্ষণিক বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ। সিদ্ধান্তটি ছিল অতীব কঠিন এবং দুঃসাধ্য। একদিকে সদ্য হিজরত করে আসা রিক্ত-নিঃস্ব, আত্মীয়স্বজন পরিত্যক্ত উদ্বাস্তু মোহাজেরদেরসহ স্থানীয় সর্বস্ব দিয়ে সাহায্যকারী আনসার ভাইদের ভেতর থেকে বাছাই করা মাত্র তিন শতেরও কিছু বেশি নবগঠিত একটি অপরিপক্ব সেনাদল, অপরপক্ষে প্রশিক্ষিত এবং অতি উৎসাহী প্রতিশোধের আগুনে প্রজ্বলিত সহ¯্রাধিক সুসজ্জিত সৈন্যের এক যুদ্ধবাজ বিরাট বাহিনী। তবুও ক্ষুদ্র এবং অদক্ষ হলেও ইসলামের চেতনায় উজ্জীবিত মহানবী (সা)-এর নেতৃত্বে মহান আল্লাহ পাকের জন্য নিবেদিত একটি মুসলিম বাহিনী প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় অটল। ডু অর ডাই। হয় জয় না হয় মৃত্যু। ইসলামের ইতিহাসে কাফেরদের মোকাবিলায় মুসলমানদের প্রথম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূচনা জয়-পরাজয় চরমতম সন্ধিক্ষণ। ইসলাম টিকবে কী টিকবে না তারই চরম পরীক্ষা।
প্রথানুযায়ী যুদ্ধ শুরু হলো। রাসূল (সা) একজন পরিপক্ব সেনানায়ক এবং সমরবিদের প্রজ্ঞা নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে সেনা বিন্যস্ত করলেন। প্রথমে মল্লযুদ্ধ, এরপর চূড়ান্ত আক্রমণ। মুসলিম সেনাদলের অসীম সাহসিকতা দৃঢ় মনোবল সর্বোপরি মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ নির্ভরতা এবং স্বয়ং রাসূল (সা)-এর নেতৃত্ব- বদরের প্রান্তরে বিজয় সূচিত হলো। বিজয় সূচিত হলো বদরের যুদ্ধে মহানবী (সা) রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের।
ওহুদ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, সেনাবিন্যাস এবং মুহাম্মদ (সা)-এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
বদর যুদ্ধে মুসলমানদের জয়লাভ হলো বটে, কিন্তু যুদ্ধের মাধ্যমে তারা যেন ভিমরুলের চাকে ঢিল ছুড়লো। মক্কার কাফেররা পুনঃপ্রতিশোধ স্পৃহায় হন্যে হয়ে উঠলো। তারা দ্রুত মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করল।
মুহাম্মাদ (সা) ও কুরাইশদের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরামর্শ বৈঠকে বসা হলো। অনেকেই মদিনার ভেতরে থেকেই কুরাইশদের মোকাবিলার দৃঢ় প্রস্তাব পেশ করলেন। রাসূল (সা) সবদিক বিবেচনায় মদিনার বাইরে যেয়ে কুরাইশদের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিলেন।

মদিনার বাইরে যেয়ে যুদ্ধ মোকাবিলার
রাজনৈতিক কারণ
এক. রাসূল (সা) প্রথম দিকে মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করার মতামতে একমত হওয়ার চিন্তা করছিলেন, এ প্রস্তাবে কুখ্যাত মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাই সহমত পোষণ করেছিল-এ জন্য নয় যে তার মুহাম্মাদ (সা)-এর মতামত পছন্দ হয়েছে, বরং এজন্য যে মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ হলে মুনাফিকরা যুদ্ধ না করে তামাসা দেখতে পারবে। তাই মুনাফিক উবাইসহ তার দলবল আসলে কী মুসলমানদের সাথে সহযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধে যেতে চায় নাকি মুনাফিকরা চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে পালাতে চায়-তাদের এ চেহারা উন্মোচিত হওয়া দরকার, তা না হলে ভবিষ্যতে মুসলমানরা তাদের ছলনায় আরো গভীর বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। তাই মহানবী (সা) তাঁর-পূর্বের মত প্রত্যাহার করে মদিনার বাইরে যেয়ে যুদ্ধ মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত নিলেন।
দুই. মক্কার কুরাইশরা মদিনা নগরীতে চতুর্মুখী আক্রমণ চালালে সকল দিক প্রতিহত করা কাফেরদের তুলনায় কম সংখ্যক মুসলিম সৈন্যদের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তিন. মদিনায় বসবাসরত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নারী-শিশু, গৃৃহিণী-মহিলারা আক্রান্ত হতে পারে।
চার. মদিনাবাসীদের আশ্রয়স্থল ঘরবাড়ি ধ্বংস হতে পারে।
পাঁচ. মদিনার মুনাফিকরা-ষড়যন্ত্র করে মক্কার কাফেরদের সহযোগিতা করে আত্মঘাতী কাজ করতে পারে।
ছয়. মদিনার ভেতরে থেকে যুদ্ধ করলে কাফেররা মুসলমানদের দুর্বল ভাবতে পারে এই ভেবে যে, ‘কুুরাইশরা সুদূর সেই মক্কা থেকে এতো মাইল পথ অতিক্রম করে বীরত্বের সাথে মদিনার উপকণ্ঠে যুদ্ধ করতে এলো আর মদিনার মুসলমানরা ভয়ে ভীত হয়ে মদিনার দুর্গে কপাট এঁটে ভেতরে অবস্থান করছে- এতে তারা আরো আশকারা পেয়ে যেতে পারে।
সাত. মদিনার বাইরে বের না হলে শত্রুরা মদিনার চার পাশের মুসলমানদের শ্যামল সবুজ শস্যক্ষেত্র ও ফলের বাগান পদদলিত করে ধ্বংস করে দেবে-বিচ্ছিন্ন বাড়িঘর ভেঙে তছনছ করবে,-এটা কোনমতেই হতে পারে না।
আট. জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, কুরাইশরা মক্কায় ফিরে গিয়ে-অপপ্রচার চালাবে এই বলে যে, মুসলমানদের নেতা মুহাম্মাদ (সা) এবার ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পেল না-দুর্গের মধ্যে লুকিয়ে গেছে।
এসব চিন্তা মাথায় রেখেইে মদিনার যুবক সাহাবী এবং যারা বদরে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তাদের কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রবল আকাক্সক্ষা এবং যারা বদরের যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন তাদের উদগ্র কামনাকে প্রাধান্য দিয়ে মহানবী (সা) পূর্বমত প্রত্যাহার করে মদিনার বাইরে যেয়ে যুদ্ধ মোকাবিলার কৌশলী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য বিন্যাস ও যুদ্ধকৌশলে
মহানবীর (সা) বিচক্ষণতা
ওহুদের ময়দানে রাসূল (সা)-এর সেনাবিন্যাসের পরিকল্পনা ছিল সূক্ষ্ম কৌশলী ও সামরিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। যুদ্ধের ময়দানে নবী (সা) মুসলমান সৈন্যদের জন্য একটি উৎকৃষ্ট স্থান নির্বাচন করেছিলেন। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সৈন্যদের কয়েকটি সারিতে বিভক্ত করলেন।
প্রথমত : তীর নিক্ষেপে পারদর্শী এমন পঞ্চাশ জনের একটি সুদক্ষ তীরন্দাজ বাহিনীকে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা) এর নেতৃত্বে এই মর্মে নির্দেশ দেয়া হলো যে, তারা যেন কানাত উপত্যকার (বর্তমানে জাবালে রুমাত) দক্ষিণে অবস্থিত একটি গিরিপথে (সুড়ঙ্গপথে) পাহারায় সর্বক্ষণ নিয়োজিত থাকে, যাতে পেছন দিক থেকে কেহ ঐ সুড়ঙ্গপথে ঢুকে পড়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে না পারে। মুহাম্মাদ (সা) তীরন্দাজ সেনাপতিকে এটাও নির্দেশ দিলেন যে “তোমরা যদি দেখ আমরা বিজয় লাভ করেছি, গনিমতের মালসম্পদ সংগ্রহে ব্যস্ত আছি, কিংবা আমাদের গোশত কোন পাখিতে ঠুকে ঠুকে খাচ্ছে-তবুও তোমরা এ সুড়ঙ্গ গিরিপথ ছাড়বে না- যতক্ষণ না আমি তোমাদের পরবর্তী নির্দেশে ডেকে না পাঠাই।”
এরপর তিনি ওহুদ পাহাড়ের সম্মুখ ভাগে অবস্থান নিয়ে শত্রুদের হামলা থেকে পেছন ও ডানদিক নিরাপদ করলেন। বামদিক থেকে শত্রুরা এসে যে জায়গায় হামলা করতে পারে বলে আশঙ্কা হচ্ছিল। সেই জায়গায় তিনি পূর্বেই সুদক্ষ তীরদাজ বাহিনী মোতায়েন করে নিজ বাহিনীকে নিরাপদ করলেন। পেছনের উঁচু জায়গা বাছাই করে মনস্থির করলেন এই মর্মে যে, প্রয়োজনে সেখানে আশ্রয় নিয়ে হলেও শত্রুপক্ষকে সম্ভ্যব্য আক্রমণ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এরপর মহানবী (সা) বিশিষ্ট সাহাবীদের একটি দলকে সম্মুখভাবে রেখে সামরিক সংখ্যার তাত্ত্বিক শূন্যতাও পূরণ করলেন। যুদ্ধ পরিকল্পনায় সকল কৌশল সম্পন্ন হলো। এবার যুদ্ধের পালা।
প্রতিপক্ষের মধ্য থেকে সহসা যুদ্ধের ময়দানে আস্ফালন করতে করতে নামল আবু আমের নামে এক ভন্ডপীর। তাকে দেখা মাত্রই মুসলমান বাহিনী সমস্বরে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো “ওরে পাপিষ্ঠ-ভন্ড। তোকে আমরা চিনি।” হজরত তালহা (রা) বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে গিয়ে তরবারির এক আঘাতে ঐ পাপিষ্ঠের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিলেন। এরপর ঐ ভন্ডের পুত্র ওসমান পিতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে লম্ফ-ঝম্ফ মেরে ময়দানে এগিয়ে এলে হজরত আলী (রা) এর ধারালো তরবারি তাকে নিমেষেই খতম করে দিল। এ পর্যায়ে যুদ্ধে মুসলমান বাহিনীর মধ্যে এক প্রাণোদ্দীপক জজবা সৃষ্টি হলো। সবাই সুদীপ্ত ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে জাহেলিয়াতের অন্ধকারকে দূরীভূত করে একটি আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের আকাক্সক্ষায় প্রাণপণ লড়াই শুরু করলেন। হজরত হামজা (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবু দুজানা (রা)-এর বীরত্ব ও ব্যঞ্জনাপূর্ণ লড়াই ছিল অতীব দর্শনীয়। শেষ পর্যন্ত জাহেলিয়াতের পৌত্তলিক পূজারিদের পরাজয় ঘটলো। কুরাইশদের গায়ক-বাদক, ভন্ড কবি, উন্মাদনা সৃষ্টিকারী কামুক মহিলারাসহ ছোট-বড় সকল নেতা-নেতৃরা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করল। মুসলমান বাহিনী তাদের নিশ্চিত বিজয় অনুধাবন করে প্রথানুযায়ী শত্রুদের ফেলে যাওয়া রসদ-পত্র, যুদ্ধ সরঞ্জাম , গনিমতের মালামাল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে রণাঙ্গনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়ে গেল। মুসলিম সৈন্যরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনার প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ল। রাসূল (সা) এর কঠোর নির্দেশনায় যারা সেই সুড়ঙ্গ-গিরিপথে সার্বক্ষণিক মোতায়েন ছিল-তারাও সুুড়ঙ্গ পথ ছেড়ে দিয়ে বিজয়ের আনন্দে গনিমতের মালামাল সংগ্রহে পরিব্যাপ্ত হয়ে গেল। এ পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীতে নেতৃত্ব ও নির্দেশনার ‘চেইন অব কমান্ড’ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সুযোগ বুঝে কুরাইশ বাহিনীর সবচেয়ে চৌকস সেনাপতি দুর্ধর্ষ বীর খালেদ বিন ওলিদ রণাঙ্গনের মুসলিম বাহিনীর ঐ রূপ অরাজক পরিস্থিতি আঁচ করে তার অনুগত বাহিনীকে নিয়ে কালবিলম্ব না করে মুসলমানদের সেই ছেড়ে দেয়া সুড়ঙ্গপথ দিয়ে তীর বেগে বিশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর ওপর অতর্কিত ঢুকে পড়ে মুসলিম বাহিনীকে তছনছ করে দিতে লাগল। অবস্থা অনুকূলে দেখে কুরাইশদের পালিয়ে যাওয়া আরো কিছু সৈন্য এসে এই ঝড়ো খালেদ বাহিনীর সাথে যোগ দিল। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের গতি ধারায় এক বেদনাদায়ক পটপরিবর্তন হয়ে গেল। বিস্ময়ের মধ্যে সহসা পরাজয়ের কালো ছায়া মুসলিম বাহিনীর ওপর কালো-কৃষ্ণ মেঘের মত আচ্ছাদিত করে ফেলল। শত্রুরা এ মহাসুযোগে তাদের প্রাণের শত্রু প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর আক্রমণ করে বসল। তিনি দৌড়ে চিৎকার দিয়ে মুসলমান সৈন্যদের ডেকে ডেকে একত্রিত করায় আবেগময়ী আহবান জানালেন। একদা তাঁর চারপাশে মাত্র এগারোজন সাহাবী ঢালের মত আগলে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাতে লাগলেন। শত্রুপক্ষের আব্দুল্লাহ বিন সুমাইয়া সুযোগ বুঝে রাসূল (সা)-কে প্রচন্ড আঘাত করে বসল। তাঁর শিরো¯্রাণ ভেঙে চোয়ালের মধ্যে ঢুকে গেল। তিনি শত্রুর প্রচন্ড আক্রমণে একদা গর্তের মধ্যে পড়ে গেলেন। শরীরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও এ ভয়াবহ মুহূর্তে মুষ্টিমেয় কয়েকজন আল্লাহর রাস্তায় জীবনোৎসর্গকারী নিবেদিত সাহাবী প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে শত্রুর মুহুর্মুহু প্রচন্ড আক্রমণের মুখে প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা)-কে যেভাবে সুরক্ষা দেয়ার আপ্রাণ ব্যবস্থা করলেন-এ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। জীবন-যুদ্ধের এমন সন্ধিক্ষণে পরাক্রমশালী শত্রুর প্রচন্ড আঘাতের মোকাবিলায় পদযুগল স্থিতি রেখে দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে থেকে নিজস্ব অনুসারীদের পুনর্গঠিত করার আবেগময়ী আহবান-এ কেবল মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষেই শোভা পায়। এই কাল-সন্ধিক্ষণে রাসূল (সা) এর মত চেহারাসদৃশ সাহাবী হযরত জময়াব ইবনে উমাইরের শাহাদতে কাফেররা উল্লসিত হয়ে অপপ্রচার দিচ্ছিল যে মুহাম্মাদ (সা) মারা গেছেন। এমন গুজব রটনায় বিক্ষিপ্ত বিচরণরত মুসলমান সৈন্যদের মধ্যে একটা প্রবল হতাশার ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে পড়ল। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীও বলতে থাকলেন, যে প্রাণের প্রাণ রাসূল (সা)-এর নেতৃত্বে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি- সে-ই যদি মারা যান, তবে আর যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েও লাভ কী? অনেকে আবার দৃঢ়সংকল্প করলেন যে, রাসূল (সা) মারা যাওয়ায় বেঁচে থেকে যখন লাভ নেই তখন জীবন বাজি রেখেই পুনঃতলোয়ার চালিয়ে শত্রু নিধন করেই তবে মরব। আসলে ফলাফল তাই-ই হলো। হযরত কা’ব ইবনে মালেক সর্বপ্রথম রাসূল (সা) কে জীবিত দেখে বলতে লাগলেন, “রাসূলের (সা) সাহাবীরা শোন! রাসূল (সা) মরেন নাই। বেঁচে আছেন। তোমরা কে কোথায় ছুটে আস।” হযরত কা’ব ইবনে মালেকের আহবান মুহূর্তের মধ্যে হতাশাগ্রস্ত বিক্ষিপ্ত পদচারণকারী মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে বিদ্যুৎগতির সম্বিত ফিরে এলো। সকলেই ছুটে এসে একত্রিত হলেন এবং এই সুযোগ সাহাবীরা রাসূল (সা) কে ধরে একটি পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেলেন। মুসলিম সেনারা পুনঃসংগঠিত হয়ে সুযোগ-সন্ধানী আবু সুফিয়ানকে পাথর মেরে ধাওয়া করলেন। এবং শত্রু সৈন্যদের ওপর পুনঃপ্রচন্ড আক্রমণ শুরু করলেন। অতি উৎসাহী কাফের সৈন্যরা পুনরায় হতোদ্যম হয়ে যে যেভাবে পারল যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে গেল। মুসলমানদের পুনঃ বিজয়সূচিত হলো। এই বিপর্যয়ের বিজয়ী যুদ্ধে সত্তর জন মুসলিম বীর সেনানী শাহাদাৎ বরণ করেন। চল্লিশজন আহত হন। অপরপক্ষে শত্রু পক্ষের ত্রিশজনকে হত্যা করা সম্ভব হয়।
ওহুদের যুদ্ধে প্রাথমিক পর্যায়ের সফল বিজয়ের পর মাঝপথে চরম বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ হলো- মুহাম্মদ (সা)-এর দূরদর্শী সমর চিন্তার সূক্ষ্ম পরিকল্পনাকে মুসলিম সেনাদের অবহেলার চোখে দেখা। বিশেষ করে পাহাড়ের সুড়ঙ্গপথে যে পঞ্চাশজন তীরন্দাজ বাহিনী মুহাম্মদ (সা) সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থেকে সতর্ক করে নির্দেশ দিয়েছিলেন এই বলে যে তোমরা যদি দেখতে পাও যুদ্ধের ময়দানে আমাদের গোশত পাখিতে ঠুকে ঠুকে খাচ্ছে- তবুও তোমরা ঐ সুড়ঙ্গপথ ছেড়ে দেবে না-সুরক্ষাই রাখবে।” রাসূল (সা)-এর সাহাবীরা এই কঠোর সামরিক নির্দেশনা না মানার কারণেই মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয়। এতে করে মুসলমানরা একটি কঠিন শিক্ষা পেল যে, নেতৃ-আদেশ যেকোন অবস্থায় দৃঢ়ভাবে পালনে ব্যর্থ হলে চরম বিপর্যয় আসতে পারে। এমনকি তা পরাজয় কিংবা ধ্বংসের কারণও হতে পারে।

খন্দকের পরিখা, মহানবী (সা)-এর উচ্চমানের
সমরনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
ওহুদের যুদ্ধের পর মক্কার কুরাইশদের অন্তরের জ্বালা আরো বেড়ে গেল। বদরে তাদের বড় বড় নেতাদের জনমের মত হারিয়ে শোচনীয় পরাজয়, ওহুদের ময়দান থেকে জান বাঁচিয়ে পিছটান-এসব ঘটনা কুরাইশদের আত্মমর্যাদায় দারুণ আঘাত সৃষ্টি করলো। তারা পুনর্বার প্রতিশোধের আগুনে জ¦লতে লাগল। এ মুহূর্তে বনু নজিরের ২০ জন সর্দার ও নেতা মক্কার কুরাইশদের নিকট হাজির হয়ে মদিনার মুসলমানদের পর পর দুটি যুদ্ধে বিজয়, এর মধ্যে অন্যান্য ছোটখাটো অভিযানে সফলতা, উপর্যুপরি তাদের ব্যাপক হারে সংখ্যাবৃদ্ধি এসব কারণে তাদেরও অন্তরজ্বালার কথা বলে জ¦লন্ত ঘিয়ে আগুন ঢেলে দেয়ার ব্যবস্থা করল, তারা পরামর্শ দিল, পুনরায় মদিনা আক্রমণ করতে হবে এবং এতে তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। কুরাইশরা উদ্বুদ্ধ হলো এবং অল্প দিনের মধ্যে দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা দিল। মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান মহানবী মুহাম্মাদ (সা) অত্যন্ত সচেতন এবং দূরদর্শী। যথাসময়ে তিনি তার গোয়েন্দা রিপোর্টের মাধ্যমে সকল বিষয় অবগত হলেন এবং দ্রুত মজলিশে শূরার অধিবেশ আহবান করলেন। হযরত সালমান (রা) পরামর্শ দিলেন। “হে রাসূলুল্লাহ (সা)! পারস্যে আমাদের ঘেরাও হলে আমরা এলাকার চারিদিকে ‘পরিখা’ খনন করতাম।”-এটি ছিল একটি সুচিন্তিত প্রতিরক্ষা প্রস্তাব। মুহাম্মদ (সা) চিন্তা করলেন এবারের যুদ্ধে মক্কায় শত্রু বাহিনীর সংখ্যা-প্রায় মদিনার সকল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার সমান হতে পারে। তারা চারিদিক থেকে মদিনা ঘেরাও করলে মদিনা তছনছ হয়ে যেতে পারে। তিনি কালবিলম্ব না করে হযরত সালমান ফার্সি (রা)-এর ঐ সুচিন্তিত প্রস্তাব সকলের সমন্বিত পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আকারে গ্রহণ করলেন এবং দ্রুত পরিখা খননের কাজে হাত দিলেন। মদিনা শহরের উত্তর দিকে খোলা, অন্য তিন দিকে পাহাড়-পর্বত এবং খেজুর বাগান বেষ্টিত। আল্লাহর রাসূল (সা) তার বিচক্ষণতা দিয়ে মদিনার উত্তর দিকেই পরিখা খননের কাজ দ্রুত শেষ করে ফেললেন সাথে সাথে মক্কার কাফেরদের মোকাবিলায় দশ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী প্রস্তুত করে ফেললেন। যথাসময়ে প্রতিপক্ষ শত্রুবাহিনী মদিনার উপকণ্ঠে উত্তর দিকের খোলা পথ লক্ষ্য করেই অভিযানে অগ্রসর হতে লাগল। নিকটবর্তী এসে তারা দেখল এ এলাকায় বিরাট এক পরিখা (খন্দক) যা ছিল তাদের অজ্ঞাত এবং অনভিজ্ঞতার বিষয়। কুরাইশ সেনারা হকচকিত হয়ে অধিকতর ভাবনা-বিড়ম্বনার মধ্যেই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ল। পক্ষান্তরে পরিখার অপর দিক থেকে মুসলমান সৈন্যরা বৃষ্টির বেগে ইট-পাথর এবং তীর ছুড়ে শত্রুপক্ষকে যারপর নাই ত্রস্ত করে ফেলতে লাগল। এভাবে কতদিনই বা থাকা যাবে- এই ভেবে তারা মদিনা আক্রমণের নেশায় কয়েকজনের একটি গ্রুপ একটি সংকীর্ণ জায়গা দিয়ে পরিখা বা খন্দক অতিক্রম করার চেষ্টা করলে তাদের ঘোড়া পরিখার মত ‘সালায়ার’ মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। তাদের নেতৃত্বে ছিল আমর ইবনে আবদে ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, যাররার ইবনে খাত্তাব প্রমুখ। এ অবস্থা দেখে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে হযরত আলী (রা) কয়েকজন মুসলিম সৈন্য সঙ্গে নিয়ে যে জায়গা দিয়ে শত্রু সৈন্যরা প্রবেশ করেছিল ঐ জায়গা নিয়ন্ত্রণে নিলেন এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ করে দিলেন। এর ফলে আমর ইবনে আবদেউদ্দ মুখোমুখি তর্কযুদ্ধে হজরত আলী (রা) কে চ্যালেঞ্জ করে বসে এবং তার ঘোড়া থেকে নেমে ক্রোধ উদ্দীপক কটুবাক্য বাণ ছুড়ে দেয়। হযরত আলী (রা) সহ্য করার বান্দা নন। তিনি সাথে সাথে শত্রুর ছেড়ে দেয়া ঘোড়ার গর্দানটাকে তরবারির এক আঘাতে দ্বিখন্ডিত করে চ্যালেঞ্জকারীর সামনে বীর বেশে হাজির হন এবং তাকে মুহূর্তের মধ্যে জাহান্নামে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। এ সময় অন্যান্য কাফেররা পালিয়ে জীবন রক্ষা করে। আবু জেহেলের পুত্র ইকরামা ভয়ে বর্শা ফেলে পলায়ন করে। এক পর্যায়ে প্রায় সারা দিনভর উভয়পক্ষ পরিখার দু’পাড় থেকে অবরোধ-প্রতিরোধের যুদ্ধ চালাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিশাল পরিখার কারণে শত্রুদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। পরিখার এ যুদ্ধে মুখোমুখি সংঘাত না হলেও উভয় পক্ষের তীর নিক্ষপণে মুসলমানদের ছয় জন শহীদ হন আর পৌত্তলিক কুরাইশদের দশজন নিহত হন। এর মধ্য একজন তলোয়ারের আঘাতে প্রাণ হারায়।
সমর কৌশলী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর এ অভিনব যুদ্ধ কৌশল ইতিহাসে পরিখার বা খন্দকের যুদ্ধ নামে খ্যাত।

হুদাইবিয়ার সন্ধি রাসূল (সা) এর নবীজীবনের
সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অনুপম দৃষ্টান্ত
ষষ্ঠ হিজরি সনে রাসূল (সা) প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগের দীর্ঘদিন পর খানায়ে কা’বা জিয়ারতে ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে ১৪০০ যাত্রী এবং ৭০টি উট নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। বস্তুত এ অভিযানে কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিল না। কাফেলা মক্কার কাছাকাছি উসফানে পৌঁছলে নবী (সা) এর সাথে বিশর ইবনে সুফিয়ান কা’বীর দেখা হয়। সে বললো, হে রাসূলুল্লাহ (সা)। নিকটেই কুরাইশ বাহিনী সমবেত হয়েছে। তারা আপনার মক্কা যাত্রার কথাশুনে বিরাট উটের বহর নিয়ে আপনার সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা আপনাকে কোনো মতেই মক্কায় প্রবেশ করে কা’বা জিয়ারত করতে দিবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং ইকরামা বিন আবু জেহেলের নেতৃত্বে তারা ‘কুুরাউল গামীম’ উপত্যকা পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে। রাসূল (সা) মেসেজটি পেয়ে ধীরস্থির এবং শান্ত কণ্ঠে প্রতিজ্ঞার স্মরে বললেন, “ধিক কুরাইশদের! জঙ্গি মনোভাব তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে। আমাকে গোটা আরববাসীর সাথে একটু বোঝা পড়ার সুযোগ দিলে ওদের অসুবিধা কোথায়? আরবরা যদি আমাকে পর্যুদস্ত করে তা হলে তাতে কুরাইশদের মনস্কামনাই পূর্ণ হবে। আর যদি আল্লাহ আমাকে আরবদের বিরুদ্ধে জয়যুক্ত করেন তাহলে সবাই ইসলামে আশ্রয় পাবে। যদি তারা ইসলাম কবুল নাও করে তবে তারা আরো অধিক শক্তি নিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে। কুরাইশরা ভেবেছে কী? আল্লাহর কসম। শেষ পর্যন্ত জিহাদ করে যাবো। হয় আল্লাহর এ বিধান জয়যুক্ত হবে। না হয় আমি শেষ হয়ে যাবো।” এরূপ স্থির চিন্তার সংকল্প নিয়ে নব

SHARE

Leave a Reply