মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর মানবতাবোধ -ইকবাল কবীর মোহন

গোটা বিশ্বে মানবাধিকার নিয়ে চলছে এখন নানা জল্পনা-কল্পনা। আধুনিক মানুষের কেউ কেউ দাবি করছেন, বর্তমান দুনিয়া শিক্ষা, সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাফল্যের চরম শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে এ কথা বলা হয়তো সঠিক যে, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান দুনিয়া শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান ও বিজ্ঞানে ঈর্ষনীয় অগ্রগতি ও সফলতা লাভ করেছে। সভ্য ও সুশীল বলে দাবিদার এ সভ্যতার মানুষের একাংশ আবার কতটা নীচ ও বর্বর হতে পারে তাও কিন্তু আমরা অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করছি। সাম্প্রতিককালের ঘটনাপ্রবাহ একটু গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করলে আমরা ব্যথিত না হয়ে পারি না। একদিকে চলছে মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের অবিশ্রান্ত প্রয়াস, আর তার পাশাপাশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে মানবতা দলনের ভয়ানক চিত্র। মানবিক মূল্যবোধ ও মানবতাকে ধ্বংস করার পশ্চিমা পরিকল্পনা ও মারণাস্ত্রের ঝলকানি আমাদের সকল সুকোমল ভাবনা-চিন্তা ও সফলতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। মানুষের মৌলিক অধিকারের নামে সারাক্ষণ যারা বক্তৃতার খই ফুটাচ্ছে সেই পশ্চিমা শক্তি যখন গায়ের জোরে অন্যের দেশ ও সম্পদ দখলের প্রয়াস চালাচ্ছে তখন প্রশ্ন জাগে আমরা এ কোন মানবতার কথা বলছি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শান্তির পতাকা উড়িয়ে পশ্চিমের দেশগুলো যখন আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, লেবানন, বসনিয়া, কাশ্মির ও ইরাকসহ দুনিয়ার বিভিন্ন জনপদে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, লুণ্ঠন চালায়, চালায় ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ, তখন প্রশ্ন জাগে এরা কোন মানবতা ও গণতন্ত্রের কথা বলছে। সভ্যতার মুখোশধারী এই তথাকথিত দেশগুলো হচ্ছে আমেরিকা, ইসরাইল, ভারত ও ইউরোপভুক্ত দেশসমূহ। মানবতা ও সভ্যতার কথার আড়ালে তারা চালাচ্ছে অসভ্য আচরণ। বসনিয়ায় চার লাখ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা, ফিলিস্তিনে ৫০ বছর ধরে অবিরামভাবে অগণিত মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়া, কাশ্মির, চেচনিয়া, আলজেরিয়া ও অন্যান্য অনেক দেশে নিরপরাধ মুসলিম শিশু-মহিলা ও অসহায়-নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা ও শোষণ আধুনিক সভ্যতার এক দুর্ভাগ্যজনক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সর্বত্র আজ প্রশ্ন উঠেছে সভ্যতা ও মানবাধিকার নিয়ে। পশ্চিমাদের এই বক্তৃতাসর্বস্ব মানবাধিকারের নাটক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চিন্তাশীল মানুষকে আজ ভাবিয়ে তুলছে। সত্যিকথা বলতে কী, প্রকৃত মানবাধিকার এখন কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই। ফলে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আজ হাঁফিয়ে উঠেছে। তারা বর্তমান সভ্যতার পশুত্ব ও বর্বরতা থেকে মুক্তি পেতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছে। কিন্তু শান্তির পথ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন ধর্মমত, আদর্শ কিংবা মতবাদ মানুষকে স্থিতি ও স্বস্তির পথ দেখাতে পারছে না।
অথচ ইসলামের নবী, মানবতার পরম বন্ধু হজরত মুহাম্মদ (সা) দুনিয়ার মানুষের জন্য পেশ করেছিলেন মানবতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর ঐশী পথ একটি বর্বর, অজ্ঞ, হানাহানিতে লিপ্ত সমাজকে কিভাবে আলোর পথে পরিচালিত করেছিল তা সবারই জানা। তিনি মানবতা ও সুস্থ মানসিকতার এমন এক সমাজ কায়েম করেছিলেন, যা দুনিয়ার কোনো সময়ে মানুষ কখনও দেখেনি। মহানবী (সা)-এর মানবতাবোধ ছিল আল্লাহর দেয়া উত্তম আদর্শসমৃদ্ধ। ইসলামপূর্ব আরবে মানুষ্যত্ব ও মানবতা বলতে কিছুই ছিল না। মানুষে মানুষে মারামারি, হানাহানি ও যুদ্ধকলহ সেই সমাজের স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। সত্যিকথা বলতে কী, মহানবী (সা) আনীত ইসলাম সেই সমাজের ঘৃণিত ও বর্বর মানুষকে মানবতার উৎকর্ষে আলোকিত করেছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর বিরল মানবতাবোধ ও উদারতা দিয়ে একটি অসভ্য ও পশু সমাজকে সুখ-শান্তি, সাম্য ও ন্যায়পরায়ণতার মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে সফল হয়েছিলেন। তাঁর মানবতাবোধ যে কত সুউচ্চ ছিল তা অবলোকন করে এখনও অবিশ্বাসীরা হতবাক হয়ে যায়। আমরা জানি, তিনি জীবনে বহু কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, অত্যাচারিত ও অপমানিত হয়েছেন। তবুও তিনি কাউকে কোনো কটু কথা বলেননি। তাঁর চরম শত্রুকে হাতের কাছে পেয়েও তিনি তাকে হাসিমুখে ক্ষমা করে দিয়েছেন। মক্কার কুরাইশদের দ্বারা অত্যাচারিত ও অপমানিত হয়ে মহানবী (সা) এক সময় মদিনায় হিজরত করেন। অথচ তিনি যখন মক্কা বিজয় করলেন তখন পলায়নরত শত্রুদের ওপর তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি, বরং তাদের নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেন। মানবতার নবী সেদিন ঘোষণা করলেন, ‘আজকের দিনে তোমাদের কারো বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই।’ মানুষের মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে মহানবী (সা) আরো বললেন, ‘মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সে, যে মানুষের উপকার করে। আমাদের প্রিয় নবী (সা) মানুষ ও মানুষের কল্যাণ নিয়ে যে কতটা আন্তরিক ও পেরেশান ছিলেন তা তাঁর কিশোর বয়সেও লক্ষ্য করা যায়। আরবের রক্তাক্ত ও খুনঝরা সমাজের অধঃগতি মহানবী (সা)-এর মনকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। তাই মানুষের মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি গঠন করেন হিলফুল ফুজুল সংগঠন। ৫৯৫ সালে গঠিত এই সংগঠনের মূল কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ: ১. সবাই মিলে দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। ২. অত্যাচারীর হাত থেকে নিরীহ ও মজলুম মানুষকে রক্ষা করা ও জালিমদের দমন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। ৩. দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে যথাসম্ভব সহায়তা করা। ৪. বিদেশী লোকদের জাল-মাল ও মান-সম্মান রক্ষার চেষ্টা করা।
মহানবী (সা)-এর এই কর্মসূচি দুনিয়ার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। আজকের সভ্য দুনিয়ায় মানবতার কল্যাণ ও মানবাধিকারের বিকাশের জন্য বহু সংস্থা, এমনকি জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনও নিরন্তর কাজ করছে। প্রায়শই আমরা এসব সংস্থা বা সংগঠনের পক্ষে পক্ষপাতমূলক এবং একপেশে আচরণের অভিযোগ লক্ষ করি। অভিযোগ রয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সবসময় শক্তির পক্ষে কাজ করে এবং বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা ছাড়া মানবতাকে আর কিছুই এই সংস্থা বা ফোরাম দিতে পারেনি। অথচ আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা) যে মানবিক তৎপরতা প্রদর্শন করেছেন তার সামান্যতম আজ কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বর্তমানে মানুষরূপী হায়েনারা দুনিয়ার দেশে দেশে অকাতরে মানুষ খুন করছে। আধুনিক মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর জন্য মানুষকে তার শিকারে পরিণত করছে। বিভিন্ন দেশ দখলের সময় মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে এরা মানুষকে ধরে পশুর মতো খুন করছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এরা নিরপরাধ শিশু-মহিলা ও পুরুষ যুদ্ধবন্দীদের পর্যন্ত নির্বিচারে হত্যা করছে। অথবা হাত-পা চোখ বেঁধে খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখছে, কিংবা লোহার ছোট খাঁচায় বন্দী করে অনাহারে দিনের পর দিন ফেলে রাখা হচ্ছে। এ ধরনের আচরণ আমরা লক্ষ্য করেছি বসনিয়ায়, প্রতিদিন লক্ষ্য করছি ফিলিস্তিনে। আফগানিস্তান, কাশ্মির ও ইরাকেও আমরা একই চিত্র দেখতে পেয়েছি। মুসলিম দুনিয়ার যেখানেই খ্রিষ্টান-ইহুদি লবির আগ্রাসন ও জবরদখল দেখা যায় সেখানেই মানবতা ও মানবিকতার চরম লঙ্ঘন লক্ষ্য করা যায়। এদের পশুশক্তি গোটা দুনিয়ার মানবিকতা ও সততাকে পিষে মারছে।
অথচ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা) সামরিক অভিযানকালে নারী ও শিশুসহ যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচরণের যে নজির স্থাপন করেছেন আজকের দুনিয়ায় তা সত্যিই বিরল। তিনি বলেছেন, ‘বন্দীদের সাথে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করো।’ ইসলামের প্রথম জিহাদ বিজয়ের পর যেসব কাফের সেনা যুদ্ধবন্দী হয়েছিল তাদের প্রতি মহানবী (সা) ও তাঁর সাহাবীরা যে অসাধারণ আচরণ করেছিলেন তা দুনিয়ার ইতিহাসে আর কোথাও দেখা যায়নি। সাহাবারা যুদ্ধ শেষ করে যখন মদিনায় ফিরে যাচ্ছিলেন তখন তাঁরা পায়ে হেঁটে গেলেন আর বন্দীদের উটের পিঠে আরোহণ করিয়ে নিয়ে গেলেন। তাঁরা বন্দীদের রুটি খেতে দিলেন আর নিজেরা খেলেন শুকনো খেজুর। মক্কা বিজয়ের পর মুসলিম শত্রু কাফেরদের জন্য মহানবী (সা) যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন তার কথা বলতে গিয়ে আধুনিক দুনিয়ার খ্যাতনামা ঐতিহাসিক গিবন বলেছেন,  In the long history of the world there is no instance of magnanimity and forgiveness which can approach those of Mohammad when all his enemies lay at his feet and he forgave them one and all.. ‘অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা) তাঁর কাছে পদানত শত্রুকে ক্ষমা করে দিয়ে যে ঔদার্য ও ক্ষমাশীলতার বিরল আদর্শ স্থাপন করেছিলেন জগতের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তার কোনো নজির নেই।’ মানবতা তথা মানুষের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মহানবী (সা)-এর আরো একটি পদক্ষেপ হলো ছোট-বড় ভেদাভেদ সৃষ্টির মতো অমানবিকতার সকল প্রাচীর ভেঙে ফেলা এবং মানুষের মানুষে বিভেদ নয়, সমানাধিকারের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।
তখনকার আরব সমাজে মানুষকে মানুষের দাস হয়ে থাকতে হতো। দাসদের না ছিল কোন অধিকার, না ছিল কোন স্বাধীনতা। মনিবের ইচ্ছের ওপরই তাকে বেঁচে থাকতে হতো। এই জঘন্য ও মানবতাবিরোধী প্রথাকে মুহাম্মদ (সা) উচ্ছেদ করে দাসদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। অমানবিক এই দাসপ্রথাকে বাতিল করার প্রক্রিয়া হিসেবে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘তোমাদের ভাইয়েরাই তো তোমাদের দাস। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাই যার অধীনে দাস হিসেবে তার একটি ভাই আছে তার উচিত সে যা খাবে, তাকেও তা খেতে দেবে এবং সে যা পরিধান করবে, তাকেও তাই পরতে দেবে।’
শুধু কি তাই? মহানবী (সা) দাসদের মর্যাদাকে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আরো বললেন, ‘যোগ্যতার বলে কোন দাস যদি নেতৃত্ব পায় তবে তাকেই তোমরা মান্য করবে।’ দাস বা অধীনস্থদের ওপর কোন প্রকার জুলুমকে মহানবী (সা) একটি ঘৃণিত কাজ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কারা নিকৃষ্ট বলে দেবো? যারা একাকী খায়, দাসদের বেত মারে এবং কাউকেও কিছু দেয় না।’ তা ছাড়া তিনি এক ঘোষণার মাধ্যমে দাসদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করাকে আখেরাতে ক্ষতির কারণ বলে বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা) বলেছেন, ‘যে দাসদের সাথে দুর্ব্যবহার করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ আজকের দুনিয়ায় কোথায় আছে এই মানবতাবোধ, এই ভ্রাতৃত্ববোধ? মহানবী (সা)-এর কাছে সব মানুষই ছিল সমান। তাঁর কাছে আপন-পর বলে কেউ ছিল না। তাইতো তিনি বলেছেন, ‘সকল মুসলিম একে অপরের ভাই।’ আর এই ভাই ভাই সম্পর্কের কথা আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলাও মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সুন্দরভাবে ঘোষণা করেছেন এভাবে, ‘অবশ্যই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন কর, যাতে তোমরা রহমত পেতে পার।’ মহানবী (সা) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে সকল মানুষের সমান মর্যাদা ঘোষণা করে বৈষম্যের মূলোৎপাটন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একমাত্র খোদাভীতি ছাড়া অনারবদের ওপর আরবদের আর আরবদের ওপর অনারবদের কোনো প্রাধান্য নেই।’
শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সমতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলেই ইসলামের নবী ক্ষান্ত হননি। সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকারও সংরক্ষণ করেছেন। তিনি উদাত্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘অমুসলিমদের জান ও মাল এবং আমাদের জান ও মাল এক ও অভিন্ন। তিনি আরো বলেছেন, ‘যে মুসলমান অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সামান্য জুলুম করবে, তার বিরুদ্ধে আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করব। যে নবী সাম্য ও মৈত্রীর এমন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, সেই নবীর উম্মত হিসেবে পরিচিত মুসলমানরা আজ অমুসলিম বিশ্বের সর্বত্র চরম বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার। অথচ মুসলমানদের মধ্যে যারা মহানবী (সা)-এর আদর্শের অনুসরণ করে চলছে তারা কোথাও অমুসলিম মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করছে বলে নজির নেই। এ কারণে মহানবী (সা)-এর সাম্য ও মৈত্রীর অনুপম আদর্শ অমুসলিম মনীষীদেরও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। George Barnardshaw , If a man like Mohammad were to assume the dictatorship of this modern world, he could solve the problem in a way that would ultimately bring its much needed peace and happiness.. অর্থাৎ মুহাম্মদের মতো কোনো ব্যক্তি যদি আধুনিক জগতের একনায়কত্ব গ্রহণ করতেন তা হলে এমন এক উপায়ে তিনি এর সমস্যা সমাধানে সফল হতেন যা পৃথিবীতে নিয়ে আসত বহু আকাক্সিক্ষত সুখ ও শান্তি।’
আজকের দুনিয়ায় অমানবিকতার অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থে অসহায় মানুষ ও নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন পরিচালনা করা এবং দুর্বল জাতিগুলোর ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আমেরিকাসহ পশ্চিমা জাতিগুলো তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য হাজার হাজার অসহায় মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না। তারা মানুষের অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও দুর্বলতার সুযোগকে পুঁজি করে অনেক দেশের সম্পদ ও মাটি পর্যন্ত দখল করে নিতে পিছপা হয় না। অতি সাম্প্রতিককালে ইরাকের তেলসম্পদ কব্জা করার জন্য আমেরিকা সে দেশের নিরস্ত্র ও নিরপরাধ অসংখ্য মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে এবং সকল রীতিনীতি ও আইনকে অমান্য করে দেশটি দখল করে নিয়েছে। এর আগে তারা দীর্ঘ অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে দেশটির প্রায় পনেরো লাখ নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্ষমতাদর্পী হায়েনারা মানবতা, মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা মুখে উচ্চারণ করলেও মূলত নিজেদের স্বার্থে মানবতা লঙ্ঘনের যাবতীয় অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ মহানবী (সা) অসহায়, দুর্বল ও পীড়িত মানুষের অধিকার ছাড়া অন্য কিছুই কল্পনা করতে পারেননি। তিনি তাদের প্রতি সর্বদা ছিলেন সদয় ও মহানুভব। তাইতো মহানবী (সা) এ বিষয়ে কী সুন্দর কথাই না বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি সদয় হও, তা হলে ঊর্ধ্বলোকের প্রভুও তোমাদের প্রতি সদয় হবেন।’
আজকের দুনিয়ায় আর্ত-পীড়িত ও অসহায় মানুষের প্রতি মানবতাবোধের যে অভাব তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। মানবতাবোধের সাথে ন্যায়বিচার ও সাম্য-মৈত্রীর গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ন্যায়নীতি না থাকলে সেখানে মানবতাবোধের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। এই ন্যায়বিচারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন মহানবী (সা)। তাঁর ন্যায়বোধ শত্রুদের কাছে আজও বিস্ময়ের ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত হতো। মহানবী (সা) তাঁর জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও নীতিবোধকে নিশ্চিত করে গেছেন। ফলে তিনি এমন এক সুন্দর মানবসমাজ উপহার দিতে পেরেছিলেন, যা এর পর দুনিয়ার মানুষ আর প্রত্যক্ষ করতে পারেনি।
বর্তমান বিশ্বে অমানবিকতার আরেক শিকার আজকের মহিলারা। দুনিয়ার তথাকথিত সভ্য জাতির শাসকরা নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকার নিয়ে খুব চিৎকার করে থাকেন। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, তারাই নারীদের ইজ্জত-সম্মান ও মর্যাদাকে এমনভাবে খাটো করছেন যে, এর ফলে নারীরা এখন সর্বত্র পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। নারী স্বাধীনতার নামে নারীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে পশ্চিমাজগৎ। নারীরা না পাচ্ছেন মায়ের মতো পবিত্র মর্যাদা, না পাচ্ছেন বোনের মতো ভালোবাসা। বিশেষ করে পাশ্চাত্যজগতে নারীরা চরম দুর্দশার শিকার। তখনকার আরব সমাজেও এমনই এক কঠিন অবস্থা বিরাজ করছিল। সেই সময় নারীদের কোনো অধিকার ছিল না। তখন মেয়েদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো। তাদেরকে দাস-দাসীর চেয়েও ছোট করে দেখা হতো। মহানবী (সা) নারীদের এই দুর্গতি থেকে টেনে এনে অনেক বড় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পুরুষদের মতো তাদেরও অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। নারী-পুরুষের অধিকারের ব্যাপারে মহান আল্লাহতাআলা আল-কুরআনে সূরা তাওবার ৭১ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘মুমিন নর ও নারী একে অপরের বন্ধু।’ নারী ও পুরুষের সমানাধিকার সম্পর্কে কুরআনে সূরা তাওবার ৭২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন মুমিন নর ও নারীকে জান্নাতের।’ মহানবী (সা) তাঁর জীবনে সর্বদাই নারীদের অধিকার নিশ্চিত করে গেছেন এবং তাদের অধিকারের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। মহানবী (সা) মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সংরক্ষণে যে সমতাপূর্ণ বিধান রেখে গেছেন তা আজও দুনিয়ার মানুষকে হতবাক করে। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবতাবোধ ও ন্যায়পূর্ণ আচরণ অবিশ্বাসী মনীষীদেরকেও আকৃষ্ট না করে পারেনি। তারা ইসলামের বিরোধিতা করেছেন ঠিকই, কিন্তু মহানবীর (সা) আদর্শের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। অমুসলিম মনীষীরা অকপটে স্বীকার করেছেন মহানবী (সা) ও তাঁর আদর্শের শ্রেষ্ঠত্বের কথা। ফরাসি মনীষী আলফ্রেড দ্য লামার্টিন মহানবী (সা) সম্পর্কে বলেছেন, Philosopher, orator, apostle, legislator, warrior, conqurer of ideas, restorer or rational dogmas, of a cult without images, the founder of twenty terrestirial empires and of one spiritual empire that is Mohammad. As regards all standards by which human greatness may be measured, we may well ask, is there any man greater than he?  অর্থাৎ দার্শনিক, বাগ্মী, ধর্মপ্রবর্তক, আইনপ্রণেতা, মতবাদ বিজয়ী, ধর্মমতের এবং প্রতিমাবিহীন ও উপাসনা পদ্ধতির পুনঃস্থাপক, বিশটি পার্থিব সাম্রাজ্যের এবং একটি ধর্ম-সাম্রাজ্যের সংস্থাপক কর্তা মুহাম্মদ।
যে সমস্ত মাপকাঠির আলোকে মানবীয় মহত্ত্ব পরিমাপ করা হয় সেগুলোর প্রত্যেকটির দ্বারা মহানবী (সা)-কে বিবেচনা করা হলে আমরা এ কথা সহজেই জিজ্ঞাসা করতে পারি, কোনো মানুষ কি তাঁর অপেক্ষা মহত্তর ছিল? আজকের জরাজীর্ণ পৃথিবীতে যে অশান্তি, অনাচার, অসাম্য, বিভেদ, হিংসা, হানাহানি, অরাজকতা ও খুনাখুনি চলছে তা থেকে মানবতাকে বাঁচাতে হলে এবং দুনিয়ার বুকে মানবিকতার বিজয় নিশান উড়াতে হলে নবী মুহাম্মদ (সা) প্রবর্তিত আদর্শ অনুসরণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। পুঁজিবাদী, সমাজবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদসহ পশ্চিমা যাবতীয় মানবরচিত আদর্শ আজ মানুষকে পশুর পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। ক্রমেই আমাদের এই জগৎ ও সভ্যতা মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। দুুনিয়াব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে হিড়িক শুরু হয়েছে তার মোকাবেলা করার মতো কোনো সমন্বিত আদর্শ কারো কাছেই যে নেই তা এখন সত্য ও বাস্তব প্রমাণিত হয়েছে। ফলে গোটা দুনিয়ার মানুষের কাছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামের বাণী ও আদর্শ আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিয়েছে। পশ্চিমাজগৎ এবং খোদ আমেরিকা ও ইউরোপের মানুষ ইসলাম ও কুরআনের সংস্পর্শে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। আর এই স্রোতধারাকে স্তব্ধ করার জন্যই শুরু হয়েছে দমন, পীড়ন ও আগ্রাসন। ইসলাম ও মুসলমানদের নিঃশেষ করে ফেলার লক্ষ্যে চলছে ক্রুসেড। আর এ জন্য তারা বেছে নিয়েছে অনৈতিকতা ও অমানবিকতার হিংস্র পথ। যদিও তাদের এই অমানবিকতা ও অসত্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে গোটা বিশ্বের মানুষ। আশা করা যায়, নিকট ভবিষ্যতে এই অমানবিকতার পরাজয় ঘটবে এবং বিজয় হবে মানবিকতার। আর মানবিকতার জয় মানেই ইসলামের জয়। তবে এই বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে মুসলমানদের আরো বেশি সাহসিকতা ও সহিষ্ণুতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই মহানবী (সা) প্রদর্শিত সুমহান আদর্শকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। মহান আল্লাহ মুসলিম মিল্লাতকে এই সহজ বাস্তবতা বোঝার এবং সে অনুযায়ী পথ চলার তৌফিক দিন।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও ব্যাংকার

SHARE