মহান আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত -মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক

বিশ্বজাহানে বিরাজমান সবকিছুতেই রয়েছে সৃজনশীলতা ও হিকমাহ। রাত-দিনের আবর্তন ও মৌসুমের পরিবর্তন আল্লাহ তায়ালার কুদরতের অন্যতম নিদর্শন। প্রত্যেক মৌসুম বা কালের পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে বান্দাদের পরীক্ষা করা। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে নানাবিধ আপদ-বিপদ ও মুসিবত দিয়ে বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন। সব রকম বিপদ-আপদে হিফাজত থাকার কলাকৌশল, দোয়া, জিকির-আজকার কুরআন ও হাদীসে এসেছে। ঝড়-বৃষ্টি, মেঘের গর্জন, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টির অনিষ্ট থেকে হিফাজত থাকারও রয়েছে মাসনুন দোয়া। সমসাময়িক এ জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় নি¤েœ তুলে ধরা হলো।

অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির দোয়া
যখন কোনো এলাকায় খরা ও অনাবৃষ্টি চলতে থাকে তখন মহান আল্লাহর নিকট বৃষ্টির জন্য ফরিয়াদ করা এবং অতিবৃষ্টি হতে থাকলে বৃষ্টি বন্ধের দোয়া করা রাসূল সা.-এর সুন্নাত। যেমন, সহীহ হাদীসে এসেছে, আনাস রা. বলেন, একদা জুমার দিন রাসূলুল্লাহ সা. খুতবা দেয়াবস্থায় জনৈক সাহাবী মসজিদে প্রবেশ করে বললেন, হে রাসূল! আমাদের ধন-সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জীবজন্তু মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, পথ-ঘাট রুদ্ধ হয়ে গেছে, আল্লাহ তায়ালার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করুন। তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সা. দু’হাত সম্প্রসারিত করে দোয়া করলেন, “আল্লাহুম্মা আগিছনা, আল্লাহুম্মা আগিছনা, আল্লাহুম্মা আগিছনা’’ হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করো! হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করো! হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করো! আনাস রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! তখন আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘের ছোঁয়াও ছিল না, রাসূলুল্লাহ সা. এর দোয়ার পর দিগন্তে মেঘের উদ্ভাস হয়, কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো আকাশ ছেয়ে ফেলে, অতঃপর মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়। আনাস রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! পরবর্তী ছয় দিন যাবৎ আমরা সূর্য দেখিনি। সপ্তাহান্তে পরবর্তী জুমায় পুনরায় ওই ব্যক্তি যখন মসজিদে প্রবেশ করে তখন রাসূলুল্লাহ সা. খুতবারত অবস্থায়, ওই ব্যক্তি বললেন, হে রাসূল! ধন-সম্পদ সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পানিতে পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, আল্লাহ তায়ালার কাছে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার প্রার্থনা করুন। আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. দু’হাত উঁচিয়ে দোয়া করলেন, ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা। আল্লাহুম্মা আলাইকা বিল আকাম ওয়াজজিরাব ওয়া বুতুনিল আওদিয়া ওয়া মানাবিতিশ শাজার’। অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাদের থেকে ফিরিয়ে নাও, আমাদের ওপর দিয়ো না। হে আল্লাহ! আমাদের ধনসম্পদ সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পানিতে পথ-ঘাট রুদ্ধ হয়ে গেছে, আমাদের ওপর থেকে আশপাশের অঞ্চলে সরিয়ে দাও, পাহাড়-মরু, খাল-বিল ও বনাঞ্চলের দিকে সরিয়ে নাও! বর্ণনাকারী বলেন, তখনই বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, অতঃপর আমরা নামাজান্তে রোদের মধ্যে বের হই। (বুখারী-৮৯১, ৯৬৮, ৯৭০, ৩৩৮৯, ৫৭৪২, ৫৯৮২, মুসলিম-২১১৫, ২১১৬)

বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হলে যে দোয়া পড়তে হয়
রহমতের বারিধারা শুরু হলে সুন্নত হলো সেসময় বেশি বেশি মাসনুন দোয়া পড়া। হাদীসে এসেছে, আয়িশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বৃষ্টি হতে দেখলে বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা ছাইয়্যিবান নাফিআ’। অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি আমাদের উপকারী ও স্বচ্ছ বৃষ্টি দান করো। (এমন বৃষ্টি আমাদের ওপর বর্ষণ করুন যাতে ঢল, ধস বা আজাবের মতো কোনো অকল্যাণ নিহিত নেই) (বুখারী-৯৮৫, ইবন হিব্বান-১০০৬, মুসনাদে আহমাদ-২৪১৪৪, ২৫৫৭০, ২৫৮৬৪)।
অপর হাদীসে এসেছে, ইবন সামুরাহ রা. সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বৃষ্টির সময় এ দোয়া পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা দ’ই ফি আরদিনা বারকাতাহা ওয়া যিনাতাহা ওয়া সাকানাহা’ ওয়ার যুকনা ওয়া আংতা খইরুর রযিকিন’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি আমাদের জমিনে এর বরকত, স্বচ্ছতা ও উপকার দান করো এবং আমাদের রিযিক দান করুন, তুমিই তো উত্তম রিযিকদানকারী।’ (মু’জামুল কবীর-৬৯২৮)

ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও তুফানের সময় মাসনুন দোয়া
আয়িশা রা. বলেন, যখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হতো এবং ঝড়ো বাতাস বইতো, তখন রাসূলুল্লাহ সা. এর চেহারায় পেরেশানির ভাব ফুটে উঠত। এ অবস্থায় এদিক-সেদিক পায়চারি করতে থাকতেন এবং এ দোয়া পড়তে থাকতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা-ফিহা ওয়া খাইরা মা-উরসিলাত বিহি, ওয়া আঊজু বিকা মিন শার্রিহা-ওয়া শার্রি মা-ফিহা-ওয়া শার্রি মা-উরসিলাত বিহি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এর কল্যাণ, এর মধ্যকার কল্যাণ ও যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে, তার কল্যাণসমূহ প্রার্থনা করছি এবং আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি এর অকল্যাণ হতে, এর মধ্যকার অকল্যাণ হতে এবং যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে, তার অকল্যাণসমূহ হতে। অতঃপর যখন বৃষ্টি হতো, তখন তিনি শান্ত হতেন।’ আয়িশা রা. আরো বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে লোকজন মেঘ দেখলে বৃষ্টির আশায় আনন্দিত হয়, আর আপনি এতে পেরেশান হয়ে থাকেন!’ রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘আমি এ ভেবে শঙ্কিত হই যে তা আমার উম্মতের ওপর আজাব হিসেবে পতিত হয় কি না, কেননা পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর এ পদ্ধতিতে আজাব পতিত হয়েছিল।’ (মুসলিম-২১২২, তিরমিযী-৩৪৪৯)

বৃষ্টি চলাকালে দোয়া কবুল হয়
বৃষ্টি চলমান সময়ে দোয়া কবুল হয়। তাই এ সময় বেশি বেশি দোয়া করা সুন্নাত। সাহল বিন সাদ রা. বলেন, ‘দুই সময়ের দোয়া ফেরত দেয়া হয় না কিংবা (তিনি বলেছেন), খুব কমই ফেরত দেয়া হয়- আজানের সময় দোয়া এবং রণাঙ্গনে শত্রুর মুখোমুখি হওয়াকালের দোয়া। অন্য বর্ণনা মতে, বৃষ্টির সময়ের দোয়া। (আবু দাউদ-২৫৪২)

মেঘের গর্জন, শিলাবৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময়
আব্দুল্লাহ ইবন যুবাইর রা. হতে বর্ণিত, অপর বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তারা যখন মেঘের গর্জন শুনতেন তখন কথা বলা বন্ধ করে দিতেন এবং কুরআন মাজিদের সূরা রা’দের ১৩ নং আয়াত ‘সুবহানাল্লাজি ইয়ুসাব্বিহুর র‘অদু বিহামদিহি ওয়াল মালাঈকাতু মিন খি’ফাতিহি’ অর্থাৎ পাক-পবিত্র সেই মহান সত্তা, তাঁর প্রশংসা পাঠ করে বজ্র এবং সব ফিরিশতা, ভয়ে তিলাওয়াত করতেন। (আল আদাবুল মুফরাদ-৭২৩)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বজ্রপাতের শব্দ শুনলেই পড়তেন, ‘সুবহানাল্লাজি ইয়ুসাব্বিহুর র‘অদু বিহামদিহি ওয়াল মালাঈকাতু মিন খি’ফাতিহি’।
(আল আদাবুল মুফরাদ-৭২৪, বাইহাক্বী-৬২৬৩)
তাফসীরে ইবন কাছীরে আরো বর্ণিত হয়েছে, ইমাম আওজায়ী (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বজ্রের শব্দ শুনে ‘সুবহানাল্লাহি বিহামদিহি’ পড়ে, তার ওপর বজ্রপাত হয় না।’ (মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা-২৯২১৩, তাফসীরে ইবন কাছীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃ: ৪৪১)
আবু হুরায়রা রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেন, আমার বান্দারা যদি আমার বিধান যথাযথ মেনে চলত, তবে আমি তাদেরকে রাতের বেলায় বৃষ্টি দিতাম আর সকাল বেলায় সূর্য (আলো) দিতাম এবং কখনও তাদেরকে বজ্রপাতের আওয়াজ শুনাতাম না।’ (মুসনাদু আহমদ-৮৭০৮, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম নিশাপুরী-৩৩৩১)
আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. বলেন, “রাসূলুল্লাহ সা. যখন মেঘের গর্জন বা বিদ্যুতের চমক ও বজ্রের আওয়াজ শুনতেন, তখন সঙ্গে সঙ্গেই এ দোয়া পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা লা-তাক্বতুলনা বিগজাবিকা ওয়া লা-তুহলিকনা বি আজা-বিকা ওয়া আ’-ফিনা-কবলা জা-লিকা।’ অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! তোমার ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তোমার গজব দিয়ে আমাদের মেরে ফেলো না, তোমার আযাব দিয়ে আমাদের ধ্বংস করো না বরং এর আগেই আমাদেরকে ক্ষমা ও নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে নিয়ো।”
(মুসনাদু আহমাদ-৫৭৬৩, তিরমিজী-৩৪৫০)

বৃষ্টির বর্ষণ শেষ হলে
যায়িদ ইবন খালিদ আল জুহানি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. হুদাইবিয়ার রাতে বৃষ্টির পর আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষে তিনি লোকজনের মুখোমুখি হলেন। তিনি বললেন, তোমরা কি জানো তোমাদের রব কী বলেছেন? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বলেছেন, আমার বান্দাদের কেউ আমার প্রতি ঈমান নিয়ে আর কেউ কেউ বেঈমান হয়ে প্রভাতে উপনীত হয়েছে। যে বলেছে, বিফাদলিল্লাহি ওয়া রহমাতিহি তথা আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় আমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি। ফলে সে আমার প্রতি ঈমান আর তারকারাজির প্রতি কুফরি দেখিয়েছে। আর যে বলেছে, অমুক অমুক তারকারাজির কারণে, সে আমার প্রতি অস্বীকারকারী এবং তারকারাজির প্রতি ঈমানদার।’
(বুখারী-৮১০, ৯৯১, ৩৯১৬, ৭০৬৪, মুসলিম-২৪০)

বৃষ্টির পানি স্পর্শ করা
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা নামে রহমতের ধারা হয়ে। তাই সুন্নাত হলো বৃষ্টির ছোঁয়া পেতে বস্ত্রাংশ মেলে ধরা। আনাস রা. বলেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ সা. এর সঙ্গে থাকাকালে একবার বৃষ্টি নামল। রাসূলুল্লাহ সা. তখন তাঁর পরিধেয় বস্ত্র প্রসারিত করলেন, যাতে পানি তাকে স্পর্শ করতে পারে। আমরা বললাম, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি বললেন, কারণ তা তার রবের কাছ থেকে মাত্রই এসেছে।’ (মুসলিম-২১২০)

বৃষ্টিকে গজব না বলা ও দোষারোপ না করা
প্রবল ঝড় বৃষ্টি শুরু হলেই অনেকে বলে থাকে যে, আল্লাহর গজব শুরু হয়েছে। কিংবা অমুক ব্যক্তির কারণে দেশে বা অঞ্চলে গজব নাযিল হয়েছে, এসব না বলা। অতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি হলে মানুষ মারাত্মক ধরনের গালাগালি ও বাজে মন্তব্য করে থাকে। হাদীসে এসেছে, মানুষ যদি এমন কোনো কিছুকে গালি দেয়, যেগুলো গালি পাওয়ার উপযুক্ত নয়, সেগুলোকে গালি দিলে, সে গালি নিজের দিকে ফিরে আসে। অতএব বৃষ্টি, তুফান ও ঘূর্ণিঝড়কে গালি দেয়া যাবে না। সহীহ হাদীসে এসেছে, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, তোমরা ঝড়-বৃষ্টি-বাতাসকে গালি দিয়ো না। কেননা এসব আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে রহমত ও আজাব নিয়ে আসে। বরং তোমরা এর থেকে কল্যাণ কামনা করো এবং অকল্যাণ হতে পানাহ চাও।
(ইবনে মাজাহ-৩৭২৭, তিরমিযী-২২৫২)

হাদীস পরিপন্থী আমল থেকে বিরত থাকা
বৃষ্টির সময় আমাদের সমাজে বেশ কিছু হাদীস পরিপন্থী আমল বা কাজ প্রচলিত রয়েছে। সেসব কাজ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। যেমন, আমাদের সমাজে অতি বৃষ্টির সময় আযান দেয়ার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি থেকে বাঁচা বা রক্ষার উদ্দেশ্যে আযান দেয়ার কোনো আমলের বর্ণনা কোনো সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয় সুতরাং এসব হাদীস পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত থাকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।

বেশি বেশি তাওবা ইস্তিগফার করা
কোনো জাতি যদি ঈমান, তাকওয়া এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার পথ অনুসরণ করে তাহলে তা শুধু আখিরাতের জন্যই কল্যাণকর হয় না, দুনিয়াতেও তার ওপর আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও নিয়ামত বর্ষিত হতে থাকে। সূরা মায়িদাতে বলা হয়েছে, “আহলে কিতাব যদি তাদের কাছে তাদের রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত তাওরাত, ইনজিল, ও অন্যান্য আসমানি কিতাবের বিধানাবলি মেনে চলতো তাহলে তাদের জন্য ওপর থেকেও রিযিক বর্ষিত হতো এবং পায়ের নিচ থেকেও বের হতো। তাদের মধ্যে কিছু লোক সত্যপন্থী হলেও অধিকাংশ খারাপ প্রকৃতির।”
(সূরা মায়িদা : ৬৬)
অন্যত্র এসেছে: “জনপদসমূহের অধিবাসীরা যদি ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অনুসরণ করতো তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও যমিনের বরকতের দরজাসমূহ খুলে দিতাম। কাজেই তারা যে অসৎ কাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্য আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি।” (সূরা আরাফ : ৯৬)
জলে স্থলে যেসব প্রাকৃতি দুর্যোগ ও বিপদ-মুসিবত আপতিত হয়, সেসব আমাদের অপরাধের দরুন। আমরা মহান আল্লাহর হুকুমের নাফরমানি করার জন্যই আমরা বিপদ-মুসিবতে পড়ি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় দেখা দেয়, যার ফলে তাদেরকে তাদের কিছু কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করানো যায়, হয়তো তারা সেসব হতে ফিরে এসে বিরত হবে।” (সূরা রুম : ৪১)
বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর অনুকম্পা ও অনুগ্রহ পাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা দরকার। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, হুদ (আ) তাঁর কওমের লোকদের বললেন: “হে আমার কওমের লোকেরা, তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো, তার দিকে ফিরে যাও। তিনি তোমাদের ওপর আসমান থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি ও ক্ষমতা আরো বাড়িয়ে দেবেন। অপরাধীদের মতো মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।” (সূরা হুদ : ৫২)
সূরা হুদে আরো বলা হয়েছে: “আর তোমরা যদি তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকে ফিরে আস তাহলে তিনি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবনোপকরণ দান করবেন।” (সূরা হুদ : ৩)
তাফসীরে এসেছে, কুরআন মাজিদের এ নির্দেশনা অনুসারে কাজ করতে গিয়ে একবার দুর্ভিক্ষের সময় উমর রা. বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বের হলেন এবং শুধু ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করেই শেষ করলেন। সকলেই বললো, “হে আমিরুল মু’মিনীন আপনি তো আদৌ বৃষ্টির দোয়া করলেন না। তিনি বললেন, আমি আসমানের ঐ সব দরজায় করাঘাত করেছি সেখান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। একথা বলেই তিনি সূরা নূহের ১০-১২ নং আয়াতগুলো তাদের শুনালেন। (তাফসীরে ইবন জারীর, ২৩ খণ্ড, পৃ: ৬৩৩, তাফসীরে ইবন কাসীর, ৮ম খণ্ড, পৃ: ২৩২)
অনুরূপ একবার এক ব্যক্তি হাসান বসরী (রহ.)-এর মজলিসে অনাবৃষ্টির অভিযোগ করলে তিনি বললেন: আসতাগফিরুল্লাহ বলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অপর এক ব্যক্তি দারিদ্র্যের অভিযোগ করলো। তৃতীয় এক ব্যক্তি বললো: আমার কোন ছেলেমেয়ে নেই। চতুর্থ এক ব্যক্তি বললো: আমার ফসলের মাঠে ফলন খুব কম হচ্ছে। তিনি সবাইকে একই জবাব দিলেন। অর্থাৎ আসতাগফিরুল্লাহ তথা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। লোকেরা বললো: কি ব্যাপার যে, আপনি প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগের একই প্রতিকার বলে দিচ্ছেন। তখন তিনি সূরা নূহের ১০-১২ নং আয়াতগুলো পাঠ করে শুনালেন।
(তাফসীরে কাশশাফ, ৭ম খণ্ড, পৃ: ১৪৬)
নবী সা. প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবা ইস্তিগফার করতেন। হাদীসে আছে, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে ৭০ বারের অধিক “আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি” বলে মাফ চাই।
(বুখারী-৫৯৪৮, ইবন হিব্বান-৯২৫)
অন্য বর্ণনায় প্রতিদিন ১০০ বারের অধিক তাওবা ইস্তিগফার করতেন। আবু বুরদা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আমি প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে ১০০ বারের অধিক ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে মাফ চাই।
(মুসলিম-৭০৩৩, তিরমিযী-৩২৫৯)
অথচ মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. এর পূর্বের ও পরের সকল অপরাধ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমার আগে ও পরের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেন। তোমার ওপর তাঁর অনুগ্রহ ও অনুদানও পুরোপুরি দিবেন এবং সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেন।”
(সূরা ফাতহ : ২)
মুয়াজ ইবন জাবাল রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞেস করা হলো আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন, তোমার জিহবা আল্লাহ যিকরে রত থাকবে, এমতাবস্থায় তুমি ইন্তিকাল করবে। (শুয়াবুল ঈমান-৫১৬, ইবন হিব্বান-৮১৮)
ঝড়-বৃষ্টির সাথে বজ্রপাতের প্রচণ্ড গর্জন এবং আলোর ঝলকানি আল্লাহ তায়ালার মহাশক্তি ও কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। এসব মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ সতর্কবাণী। তিনি চাইলে এ বজ্রপাতের মাধ্যমে তাঁর অবাধ্য সীমালংঘনকারী বান্দাদেরকে শাস্তি প্রদান করতে পারেন। কোথাও না কোথাও বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে। আবার একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। যা মানুষের জন্য তাদের অবাধ্যতার দৃশ্যমান সতর্কবাণী। কুরআনের বিধান পালন এবং প্রিয়নবী সা. এর শেখানো তাসবিহ ও দোয়া পাঠে বজ্রপাতের দুর্যোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মেঘের গর্জন, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ভয়াবহ শাস্তি থেকে মুক্ত থাকতে আল্লাহ তায়ালার বিধান পুরোপুরি মেনে চলা জরুরি। অধুনা গোটা বিশ্ব করোনা নামক মহামারীতে বিপর্যস্ত। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ গোটা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে তুলছে। এ সকল দুর্যোগের অনিষ্ট ও অকল্যাণের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমরা সর্বদা মহান রবের নিকট সোপর্দ হই। ফরিয়াদ করি, তিনি আমাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন যাতে আমরা আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত বিধি-বিধান মুতাবিক চলতে পারি এবং স্বচ্ছন্দে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারি। মহান আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, বিরামপুর বিজুল দারুল হুদা কামিল মাদরাসা, দিনাজপুর

SHARE

Leave a Reply