মহান আল্লাহর আইন ও সাম্প্রতিক বিশ্ব

ড. আ. ছ. ম. তরীকুল ইসলাম

মহান আল্লাহই হচ্ছেন মানুষের স্রষ্টা। মাখলুক হিসেবে মানুষের রয়েছে অসংখ্য দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা। তন্মধ্যে অন্যতম সীমবদ্ধতা হচ্ছে, তার জ্ঞানের কমতি। মহান আল্লাহর বাণীতে এই বাস্তবতাই ঘোষিত হয়েছে। ‘এবং তোমাদেরকে সামান্যই জ্ঞান দেয়া হয়েছে।’ (আল কুরআনুল কারীম ১৭:৮৫) স্বতঃসিদ্ধ এই কথাটির প্রমাণ পাওয়া যায়, মানবজাতির জ্ঞানের পরিধি মাপের মাধ্যমে। অতীতের কিছু কিছু বিষয় তারা মনে রাখতে পারে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। বর্তমান সম্পর্কে তার ধারণা খুবই সীমিত। তার এই সীমিত জ্ঞান দিয়ে সর্বকালের সর্বযুগের উপযোগী সর্বজনীন আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। সে জন্য মানবরচিত আইন মূলত : হয় অসম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যশীল, সর্বকালের অনুপযুক্ত। উক্ত আইন মানুষের জন্য সাময়িক মঙ্গলজনক হলেও অদূর ভবিষ্যতে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে উদ্ভাবিত হলো সমাজতন্ত্র। ক’দিন যেতে না যেতেই, তা যে মানবতার মুক্তির জন্য ব্যর্থ, সেই কথাটি প্রমাণিত হলো। এ কারণেই মানুষের জন্য সর্বময় জ্ঞানী, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যিনি সম্যক জ্ঞান রাখেন, সে বিজ্ঞ অভিজ্ঞ মহান শক্তিধরের পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটা সর্বজনীন আইন প্রণয়নই ছিল বাস্তবতার অনিবার্য দাবি। মহামহিম রাব্বুল আলামিন তাই মানবতার সার্বিক কল্যাণের জন্য কালোত্তীর্ণ এক চূড়ান্ত আইন প্রণয়ন করলেন, যার বাস্তব রূপই হচ্ছে, মহাগ্রন্থ আল কুরআন। অবশেষে এটাকে তিনি তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য পরিপূর্ণতা দান করেলেন । মহান আল্লাহ এই আইনের ধরন, প্রকৃতি, সফলতা; বিশেষ করে মানবসমাজে এর প্রয়োগ না থাকার কারণে সমগ্র পৃথিবীতে যে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা, অনাচার, অশান্তি, হিংসা বিদ্বেষ, হানহানি সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতি দিকনির্দেশই হচ্ছে, এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য।
আইন প্রণয়নের অধিকার
ইসলামী আইন সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য। ভৌগোলিক সীমারেখা, বর্ণ, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতির পার্থক্য চুরমার করে কিয়ামত পর্যন্ত যে মানুষই পৃথিবীতে আসবে তাদের সকলের জন্যই এ আইন উপযুক্ত। বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন এই আইন বিশ্বনিখিলের রব মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকেই প্রণয়ন হচ্ছে যুক্তিযুক্ত। এই আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র আধিপত্য শুধু তার জন্যই নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়, সেই জন্য আইন প্রণয়নের এই গুরু দায়িত্বটি মহান আল্লাহই এককভাবে গ্রহণ করেছেন। এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সে মহান সত্তা ব্যতীত অন্য কারো কোনো অধিকার রাখা হয়নি। ঘোষিত হয়েছে ‘কর্তৃত্ব তো আল্লাহরই, তিনি সত্য বিবৃত করেন এবং ফয়সালাকারীদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ। (আল কুরআনুল কারীম ০৬:৫৭)
অন্যত্র বলা হয়েছে “বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি অন্য কারো ইবাদত না করতে নির্দেশ দিয়েছেন।” (আল কুরআনুল কারীম ১২:৪০)
বর্ণিত হয়েছে ‘শুরায়হ বনি হানি তার পিতা হানি হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রতিনিধি হয়ে গেলেন তখন তারা হানিকে আবু হাকাম (বিধানদাতা কুনিয়াতে অভিষিক্ত করছিলেন, এই সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন আল্লাহই বিধানদাতা, আর বিধান তাঁর থেকেই; সুতরাং কেন তোমাকে বিধানদাতা বলা হয়?’ (আল মুসতাদরাক আলাসাহিহযিন, ১খ. পৃ; ৭৫)
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ ব্যতীত যে অন্য কারো কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়, তার স্পষ্ট প্রমাণও রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে। তিনি এক সময় বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ কর্তৃক হালালকৃত কিছুকে হারাম করে নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ কেন ছাড় দিলেন না। প্রতিবাদ করে আয়াত অবতীর্ণ করলেন এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক স্ত্রীর ঘরে উম্মি ইবরাহিমের সাথে মিলিত হলে তার উক্ত স্ত্রী তাকে বললেন, হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মি ইবরাহিমকে নিজের জন্য হারাম ঘোষণা করলেন। তার উক্ত স্ত্রী তাকে বললেন, হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি কিভাবে আপনার ওপর যা হালাল ছিল তা হারাম করছেন? তখন তিনি তার সম্মুখে তার সাথে মিলিত না হওয়ার জন্য শপথ করলেন। তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অবতীর্ণ করলেন।
হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা বৈধ করেছেন তুমি তা কেন নিষিদ্ধ করেছ? তুমি তোমার স্ত্রীর সন্তুষ্টি চাচ্ছ্। তাফসিরুত তাবারী, ১২খ. পৃ: ১৪৭)
সুতরাং আল্লাহই হচ্ছেন একমাত্র অধিকারী। এতে সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্তনের কোন কিছুই ইসলামে স্বীকৃত নয়। তবে কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়েও আইন প্রণয়নের গুরু দায়িত্ব পালন করেছন।
আল্লাহর আইনের উৎস
মূলত আল্লাহর আইনের উৎস হচ্ছে দু’টি। একটি হচ্ছে অহি মাতলু, অর্থাৎ ঐ অহি যা মহান আল্লাহর ভাষায়ই কুরআন হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে অহি গায়রি মাতলু অর্থাৎ যা আল্লাহর নিদর্শেনা হবে তা আল্লাহর ভাষায় অবতীর্ণ না হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় না হয়ে তার সিদ্ধান্তের ও কর্মকা-ের আকারে উপস্থাপিত হয়েছে। এটির নাম হচ্ছে সুন্নাতুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সুতরাং মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও অকাট্য সুন্নাহ দু’টিই আল্লাহর আইন হিসেবে গণ্য। এই বাস্তব তাই ফুটে উঠেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায়, তিনি বলেনÑ
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে গেলাম, যতক্ষণ তোমরা এ দু’টিকে আঁকড়ে থাকবে ততক্ষণ তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। (মুয়াত্তা মালিক, মিসর তা. বি. ২য় খ-, পৃ: ৮৯৯)
ইসলামের মানদণ্ডে আল্লাহর আইন
ইসলামের মূল আদর্শ হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করা। আল্লাহর আইন মানা মূলত তার ইবাদতেই মৌলিক ইবাদাত যেমন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা শিরক, তেমনি আল্লাহর আইন বাদে অন্য আইন মানাও শিরক।
একইভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর আইন উপেক্ষা করে ধর্মযাজকদের প্রণীত আইন মানাকে ধর্মযাজকদের ইবাদাত নামে উল্লেখ করেছন। বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সূরা তাওবার ৩১ নং আয়াত তেলাওয়াত করছিলেনÑ আদ্দী ইবন হাতিম বললেন, আমরাতো তাদের ইবাদত করি না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা কি হারাম আর তিনি যা হারাম করেছেন তা কি হালাল করে না? তিনি বললেন, অবশ্যই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বললেন এটাই তাদের ইবাদত।’
উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে নবী (আ) বর্ণনা করেছন যে, নিশ্চয়ই এখানে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা এবং তাদের নিকট দুয়া করাকে ইবাদত গণ্য করা হয়নি: বরং হালালকে হালাল ও হারামকে হারাম করাকেই তাদের ইবাদত করা বলে গণ্য করা হয়েছে। সুতরাং ইবাদত যেমন একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য নিবেদন বৈধ হয়, তেমনি আল্লাহ ব্যতীত অন্য প্রণীত আইন মান্য করা ও প্রয়োগ করার মাধ্যমে তাদের ইবাদত করাও বৈধ নয়। এ কারণেই আল্লাহর আইন যাদের প্রয়োগ করার সুযোগ থাকার পরও প্রয়োগ করে না, তাদেরকে কুরআনের ভাষায় কাফির, জালিম বলা হয়েছে।
সুতরাং আল্লাহ প্রণীত আইনকে উপেক্ষা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ বলে বিবেচিত।
আল্লাহর প্রণীত আইনের শাসনকে লঙ্ঘন আল্লাহদ্রোহী তাগুতের আইন মানারই শামিল। আর তাগুতের আইন মান্য হচ্ছে, গুমরাহি চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার নামান্তর।
ঈমান আনার পর এই অবান্তর কাজকে আল কুরআনে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করা হয়েছে।
এ আয়াতে মুসলমান হিসেবে দাবিদার হয়েও মানবরচিত আইন যারা প্রয়োগ করে তাদেরকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ার দেয়া হয়েছে। ইমাম ইবন তায়মিয়্যাহ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
‘যারা পরিপূর্ণ কিতাবের ওপর ঈমান আনার দাবি করে তবে কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে বিচার ফয়সালা করে না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোন বড় আল্লাহদ্রোহীর নিয়মনীতির আলোকে বিচার ফয়সালা করে আল্লাহ তাদেরকে এখানে তিরস্কার করেছেন। মজামু ফাতা, ইবন তায়ামিয়্যাহ, (১২ খ; পৃ: ৩৩৯-৩৪০)
আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো বিধান দ্বারা বিচার ফয়সালা না করে শুধুমাত্র তারই বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করা আল্লাহরই ইবাদত করাই নামান্তর।
সুতরাং আল্লাহ প্রণীত আইন প্রয়োগ ইবাদত হিসেবেই গণ্য। মানবপ্রণীত আইন প্রয়োগ কঠোর অপরাধ বলে বিবেচিত শিরকের নামান্তর। এমনকি মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহর আইন প্রয়োগ হলে তার নিকট আত্মসমর্পণ না করলে ঈমান না থাকার হুঁশিয়ারি বাণীও উচ্চারিত হয়েছে।
সুতরাং আল্লাহ আইনের প্রয়োগ ও আল্লাহর আইনের ফয়সালা অকুণ্ঠ মেনে নেয়াই হচ্ছে ঈমানের অংশবিশেষ। মুমিন থাকতে হলে এর বিরোধিতা কখনো সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর আব্দুল আজীজ আলি আবদুল লতিফ বলেন, ঈমানের জন্য যেহেতু মহান আল্লাহর বিধিবিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করা অনিবার্য শর্ত, সেহেতু আল্লাহদ্রোহী ও জাহিলী বিধিবিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা ঈমানের পরিপন্থী।
আল্লামা সা’আদী এ প্রসঙ্গে আরো বলেন যে, ঈমানের দাবিই হচ্ছে, আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্য ও আল্লাহর বিধিবিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করা, সুতরাং সে নিজে মুমিন হওয়ার দাবি করে আবার আল্লাহদ্রোহী বিধিবিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালাকে অগ্রাধিকার দেয়, সে মূলত মিথ্যুক।
এমনকি আল্লাহর আইন প্রয়োগ না করাকে সরাসরি কুফরী বলা হয়েছে। এই কারণে আল্লাহর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব কঠোর ছিলেন। এ বিষয়ে তার নির্দেশ হচ্ছেÑ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিকটের ওপর বর্তাক বা দূরের ওপর বর্তাক, আল্লাহ নির্ধারিত সাজা কার্যকর করা আল্লাহর ব্যাপারে কোনো তিরস্কারকারীকে মূল্যায়ন করো না।’ (ইবন মাজাহ, ২খ, পৃ: ৮৩)
আল্লাহর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আপসহীন। তাকে বিশেষ ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন প্রয়োগ না করার জন্য তার একান্ত প্রিয়পাত্র উসামাহ ইবন যায়িদ সুপারিশ করলে, তিনি শক্ত ভাষায় তার প্রতিবাদ করে বলেন, ‘তুমি আল্লাহর সাজা কার্যকর না করার ব্যাপারে সুপারিশ করছ? এর পর তিনি দাঁড়ালেন ও খুৎবাহ দিলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তীরা এই জন্য ধ্বংস হয়েছে যখন তাদের সন্তানরা চুরি করত তারা তাদেরকে ক্ষমা করে দিত আর দুর্বলরা যখন চুরি করত তাদের ওপর সাজা কার্যকর করত। আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা যদি চুরি করত আমি তার হাত কেটে দিতাম। (বুখারী, ৩ খ, পৃ; ১২৮২)
অন্য একটি হাদীসে আল্লাহর আইন প্রয়োগের আরো গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছেÑ
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একটি জনপদে সাজা কার্যকর করা সেই জনপদের অধিবাসীর জন্য সেখানে চল্লিশ দিন বৃষ্টি হওয়ার চেয়ে উত্তম।’ (ইবন মাজা, ২খ, পৃ; ৮৩)
সুতরাং মহান আল্লাহ প্রণীত আইনের প্রয়োগ কোনক্রমে ও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এমনকি মহাগ্রন্থ আল কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মহান আল্লাহ প্রণীত আইনের প্রয়োগ।
আল্লাহর আইন প্রয়োগের অপরিহার্যতা আরো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এর অনিবার্য শিক্ষাটি হচ্ছে, মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রতি যার সামান্যতমও ঈমান রয়েছে, আল্লাহর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার অবহেলা করা কোনক্রমেই বাঞ্ছনীয় নয়।
মহান আল্লাহর আইনের ব্যাপ্তি
মহান আল্লাহ প্রণীত আইন যেমন বিশ্বজনীন তেমনি মানবজীবনে এর ব্যাপ্তিও অসীম।
মানবজীবনের যতগুলো দিক রয়েছে তার প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে এই আইনের বিস্তৃৃতি।
এই আইন শুধু ব্যক্তিজীবনের ধার্মিক দিককে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় না। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিচার, শিক্ষা, শ্রম, অর্থÑ মোট কথা মানবজীবনের সার্বিক দিন এই আইনের অন্তর্ভুক্ত। সেই জন্য সালাত আদায় করা, জাকাত প্রদান করা প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহ প্রণীত আইন প্রযোজ্য তেমনি বৈবাহিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন, বিচারকার্য সম্পাদন, রাষ্ট্র পরিচালনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রণীত আইন প্রয়োগকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এই ব্যাপকতার স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় মহান রাব্বুল আলামিনের বাণীতে।
কোন বিশেষ বিষয়ে নয় বরং যে কোনো বিষয়েই তোমাদের মতবিরোধ হোক না। কেন, তার মীমাংসার জন্য আল্লাহ প্রণীত আইনই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। সুতরাং বিশেষ কোন বিষয় নয় বরং সকল বিষয়কে কেন্দ্র করেই আল্লাহর আইন আবর্তিত হয়েছে।
অন্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকল বিষয় আল্লাহ কর্তৃক নাজিলকৃত আইন প্রয়োগের স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কোন বিশেষ দিকে আইন প্রয়োগের কথা বলা হয়নি। বরং সাধারণভাবে সকল ক্ষেত্রেই তা প্রয়োগের নির্দেশ এসেছে। সুতরাং আল্লাহর আইনের পরিসর অসীম। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। আরো ইরশাদ হচ্ছে,
আমি এই কিতাবে কোন কিছু লিখতে ছাড়িনি। (আল কুলআনুল কারীম ০৬:৩৮)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল কুরআন তথা আল্লাহর আইনের ব্যাপকতা সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে,
‘আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, এই কুরআনে আল্লাহ আমাদের জন্য প্রতিটি বিদ্যা এবং প্রতিটি বিষয় বর্ণনা করেছেন। মুজাহিদ (রহ) বলেন, প্রতিটি হালাল ও হারাম। সুতরাং আল্লাহর আইনকে সংকুচিত করার কোন সুযোগ নেই।
সে জন্য বাস্তবতার নিরিখে, নিরপেক্ষভাবে ইসলামী আইন ও ইসলামী অনুশাসনের ব্যাপকতা নিয়ে সন্দেহ সংশয়ের কোন সুযোগ নেই। ইসলামী আইনের বিরুদ্ধে যারা এরূপ সীমাবদ্ধতার অভিযোগ ওঠায়, তারা মূলত হয় না বুঝে, অন্যথায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই এই মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়। তারা বলে থাকে, ইসলাম আধ্যাত্মিকতারই নাম। শুধু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়েই এর ব্যাপ্তি। সমাজজীবনে ও অন্য কোথাও এর পদচারণা নেই। মানব আত্মার সংশোধনই এর একমাত্র কাজ। ইসলামের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক নিয়মনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, শ্রমনীতি, শিল্পনীতি, ব্যবসানীতি, কৃষিনীতি, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে যারা ন্যূনতম খোঁজখবর রাখে, ইসলামের দুশমনদের পূর্বোল্লেখিত ধারণা যে কত বড় ডাহা মিথ্যা, তা সহজেই বুঝা যায়। সুতরাং আল্লাহর আইন সীমাহীন ও বিস্তৃত।
মহান আল্লাহ আইন প্রয়োগের দায়-দায়িত্ব: প্রতিটি মুসলমানই তার ব্যক্তিগত জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট আল্লাহর আইনকে নিজেই প্রয়োগ করতে বাধ্য। এ ছাড়া অন্যান্য যারাই যে পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের সেই পর্যায়ে আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। যিনি পরিবারের কর্তা তাকে পরিবার সংক্রান্ত আল্লাহর আইন, যিনি বিচারক তাকে বিচারসংশ্লিষ্ট আল্লাহ আইন, যিনি সেনাপতি, তাকে যুদ্ধ সম্পর্কিত, যিনি রাষ্ট্রনায়ক, তাকে রাষ্ট্রবিষয়ক; মোটকথা যিনি যে ময়দানের দায়িত্বে তাকে তার ক্ষেত্রেই আল্লাহর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। তাকে তার নিজস্ব দায়িত্বের গ-িতে আল্লাহর আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা সম্পর্কে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পষ্ট উক্তি হচ্ছে, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল, তোদের দায়িত্বে দেয়া সব বিষয়ে তোমাদেরকে জবাবদিহিতা করা হবে।’ (সহীহ মুসলিম, বায়রূত, তাবি, ৩খ, পৃ. ১৪৫৯)
এই হাদিসটিতে সাধারণ জবাবদিহিতার কথা বলা থাকলেও ইসলামে আল্লাহর আইন প্রয়োগ যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেহেতু এদিকটিও এ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়। সেই জন্য কোন বিশেষ দিককে উল্লেখ না করেই, যে কোন বিষয়ের কেউ আল্লাহর আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হলে, আল কুরআনে তাদের ব্যাপারে কঠোর ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে। তাদেরকে কাফির, জালিম ও ফাসিক বলে শক্ত ভাষায় গালি দেয়া হয়েছে। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানই তার অবস্থানে থেকেই আল্লাহর আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য। এক্ষেত্রে কোন ছাড় দেয়া হয়নি। সে জন্য যে সমস্ত মুসলমান সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর আইন প্রয়োগ করেন না, কুরআনের ভাষায় তাদের অবস্থান কোথায়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তাদেরইে ওপর বর্তায়। প্রতিটি মুসলমানের দ্বীনের অনিবার্য এই অংশ সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।
সমালোচনার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর আইন
ইসলামের শত্রুদের ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগে অন্তত নেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে আল্লাহর আইন প্রয়োগ নিয়ে তাদের ছোটখাটো অভিযোগ থাকলেও বিচারের ক্ষেত্রে আল্লাহর আইন তথা দণ্ডবিধি প্রয়োগ নিয়ে ইসলাম ঐ সব শত্রুপক্ষের বিদ্বানদের কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে আসছে। এর বাইরে আরো দণ্ডবিধি থাকলেও আল কুরআনে ছয় প্রকারের অপরাধের দণ্ডবিধির উল্লেখ হয়েছে। অবৈধ মানুষ হত্যা, ডাকাত, অপবাদ, ব্যভিচার, চুরি ও বিদ্রোহী। মানবাধিকারের দোহাই তুলে ইসলামী এই সব দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে তাদের সমালোচনার ভাষাকে সংক্ষেপে করেছেন ড. আল আশকার। তা হচ্ছেÑ
‘ইসলামের দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ করে বলেন, যে, এই বিধান হচ্ছে নির্মম যা যুগের সাথে বেমানান। বিধিবিধানে অপরাধির মানসিক দিক বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। পক্ষান্তরে ইসলামের দণ্ডবিধি অপরাধীকে বেত্রাঘাত করে অথবা হাত কেটে তা মানসিক দিক চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
তাদের এই অভিযোগ কল্পনাপ্রসূত, বাস্তবতাবর্জিত, পক্ষপাতদুষ্ট। মূলত আল্লাহ প্রণীত এই সব দণ্ডবিধি প্রয়োগের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলা, সকলের জানমাল, ইজ্জত আব্রুকে হেফাজতের ব্যবস্থা করা, অপরাধ হ্রাস করা এ প্রসঙ্গে ডক্টর হাম্মদ বলেন,
নিশ্চয়ই ইসলামের দণ্ডবিধির প্রয়োগ অপরাধকে হ্রাসের ক্ষেত্রে এমনকি চিরতরে বিলুপ্তির ক্ষেত্রে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করে যা দ্বারা সমাজে মানুষের সাচ্ছন্দ্য জীবন যাপনের পরিপূর্ণ উপযোগী হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহিলি যুগের জাহিল মানুষগুলোকে ইসলামের এই আইন প্রয়োগে সর্বকালের সর্বশেষ সুসভ্য মানুষের পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইসলামবিদ্বেষীরা মানবাধিকারের ছদ্মাবরণে হত্যাকারী, চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসীকে লঘু শাস্তির আবদার, মূলত যারা বিশ্ববাসীকে অপরাধীদের কাছে জিম্মি বানানোর পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে তাদের বৈধ মানবাধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। এই পর্যন্ত আল্লাহ প্রণীত কোন একটি আইন প্রয়োগও আধুনিক যুগে অসম্ভব বলে প্রমাণিত হয়নি বরং যেখানে যতটুকু এই আইনের প্রয়োগ রয়েছে, সে ভূখ- তত উচ্ছৃঙ্খলমুক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে বা হচ্ছে। মানব ও জীবন জগৎ বাদে নিখিল বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় আল্লাহর আইন প্রয়োগ বলবৎ থাকায়, সেখানে কোন বিশৃঙ্খলা নেই। সুতরাং দুশমনদের অসাড় অভিযোগ ভিত্তিহীন। বাস্তব কথা হচ্ছে, এ পৃথিবীকে সুশৃঙ্খল করে গড়ে তুলতে হলে, এই পৃথিবীর স্রষ্টা আল্লাহর আইন প্রয়োগের কোন বিকল্প নেই।
সাম্প্রতিক বিশ্বে মহান আল্লাহর আইন
বর্তমান বিশ্বে মুসলমান রাষ্ট্রের সংখ্যা সাতান্নটি। এসব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীই হচ্ছে মুসলমান। এগুলোর শাসক গোষ্ঠীও মুসলমান। একমাত্র কুরআনই মুসলমানের জীবনব্যবস্থা। সেই প্রেক্ষাপটে এই সব মুসলমান রাষ্ট্রে আল কুরআন তথা আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বিশ্বের কোন একটি রাষ্ট্রেই পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর আইনের সিংহ ভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যান্য অধিকাংশ মুসলিম দেশের পারিবারিক ও অন্যান্য সামান্য কিছু আইন ছাড়া অন্য কোনো আল্লাহর আইন কার্যকর নেই। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে, আমাদের দেশ বাংলাদেশে। এখানে শুধুমাত্র কিছু পারিবারিক আইন ছাড়া আল্লাহর অন্য কোন আইন বলবৎ নেই। এখানে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি সুদভিত্তিক। বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হয় ব্রিটিশ আইনে। পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম দেশের অবস্থা বাংলাদেশের মতোই। আর অমুসলিম দেশেতো আল্লাহর আইন পরিপূর্ণভাবে উপেক্ষিত। সুতরাং বলা যায়, বিশ্বনিখিলের মালিক মহান আল্লাহর বিশ্ব আইন আধুনিক বিশ্বে তেমন একটা কার্যকর নেই।
মানবরচিত আইনের ব্যর্থতার চিত্র
অন্য আইন মানবরচিত। মানুষের সার্বিক সীমাবদ্ধতা সর্বজন স্বীকৃত। সে জন্য মানবরচিত আইন কখনো সর্বজনীন হতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই এই আইনে অসংখ্য ত্রুটি থেকে যায়। স্থান, কাল, পত্র ভেদে এর প্রয়োগও অসম্ভব হয়ে পড়ে। আজ নতুন আইন প্রণয়ন করলে কিছুদিন পরে তা পরিবর্তনের দাবি ওঠে। মোট কথা, এই আইন বসবাসযোগ্য কোন সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে যে সক্ষম নয়, বর্তমানের বিশ্বচিত্র তার বাস্তব নমুনা। এর যৎ সামান্য উদাহরণ হচ্ছেÑ
ক. বিগত ২০ বছরে ব্রিটেন আমেরিকায় প্রতি ছয় জনে একজন করে জারজ ছিল। বর্তমানে কোথাও তা অর্ধেক কোথাও বা অর্ধেকের বেশি।
খ. আমেরিকার ঋবফবৎধষ ইঁৎবধঁ ড়ভ ওহাবংঃরহধঃরড়হ (ঋইও) এর তথ্য অনুযায়ী মধ্যবিত্ত মার্কিন পরিবারে ৪ থেকে ১৩ বছর বয়সের যত শিশুকন্যা রয়েছে, তার ২৫%ই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ দ্বারা শ্লীলতাহানির শিকার। কানাডার ৫৪% মহিলা বলেছে, তারা ১৬ বছর বয়সে পদার্পণের পূবেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৫১% মহিলা ধর্ষিত হয়েছে অথবা ধর্ষণের জন্য তাদেরকে আক্রমণ করা হয়েছে। সবচেয়ে নিরাপত্তার শহর টরেন্টো এর ৯৮% মহিলা কোন না কোনভোবে যৌন ভোগান্তির শিকার।
গ. বিশ্বে প্রতি বছরে ৮ কোটি মহিলা অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ করে। ২ কোটি মহিলা ঝঁকিপূর্ণ গর্ভপাত ঘটাতে বাধ্য হয়।
ঘ. প্রতি বছর এক লাখ মার্কিনি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে মারা যা। সেখানের ৩০% লোক সমকামী।
ঙ. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) এক কোটি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) পাঁচ কোটি ৫০ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে খরচ হয় আট হাজার কোটি ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক লক্ষ এগার হাজার ছয়শত নিরানব্বই কোটি ১৪ লক্ষ ৬৩ হাজার ৩৪ ডলার। আমেরিকা এই যুদ্ধে প্রতিদিন খরচ করত পঁচিশ কোটি ডলার।
বিশ্বে ৬০ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। ৮০ কোটি মানুষ নিরক্ষর। ১৫০ কোটি মানুষ চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত। এই সময়ে প্রতি মিনিটে পৃথিবীর সামরিক ব্যয় ২০ কোটি ডলার।
চ. পুঁজিবাদী আমেরিকার ২৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১৫% অর্থাৎ প্রায় কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ১৯৯৫ তে আমেরিকার ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ছিল তিন কোটি। ১৯৯২ সালে তাদের গৃহহীনদের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ, যা ২০০৭ সালে দাঁড়াবে এক কোটি ৯০ লক্ষে। ২০ লাখ আমেরিকান লেখাপড়া শিক্ষার আগেই স্কুল ত্যাগ করে থাকে।
জ. সারা বিশ্বের বিদ্যালয়বিমুখ কায়িক শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ২৪ কোটি ৬০ লাখ।
ঝ. নগ্নছবি তোলা সংগঠক স্পেন্সার স্টুনিক ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪০ হাজার নারীর নগ্নছবি তুলেছে।
ঞ. ভাগ্যাহত অবহেলিত দরিদ্র অধিবসাীদের প্রতি অমানবিক আচরণের জের দরে সভ্যতার দাবিদার মানবাধিকারের প্রবক্তা ফ্রান্সের প্রায় তিনশত শহরে তিন মাস ধরে দাঙ্গা ও সহিংসতা সংঘটিত হয়। দেশটি পরিণত হলো হামলা, আগুন, ভাঙচুর ও দাঙ্গার নগরীতে। জ্যাক শিরক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান সময়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি অভিবাসীদের উত্তরসূরিদেরকে অভিহিত করলেন ‘জঞ্জালতুল্য নিকৃষ্ট মানুষ’ হিসেবে ব্যর্থতার এই তালিকা দৈর্ঘ্য করার ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে আমরা সেদিকে না গিয়ে স্পষ্ট করে বলতে চাই, বিশ্বের এই চিত্র মূলত মানবরচিত আইনের ব্যর্থতার জাজ্জ্বল্য নমুনা। এই অবস্থা মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে নিয়ে এসেছে। মানুষকে মানুষের স্তর উন্নীত হতে হলে, এই পরিস্থিতির অবসান অনিবার্য।
উপসংহার
আল্লাহর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে, এর সুফলতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার অভাব। সমগ্র পৃথিবীতে এমন কোন রাষ্ট্র নেই, সেখানে অনায়াসে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই আইন প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। এই আইন প্রয়োগ করলে তার ইতিবাচক প্রভাবের কোন বাস্তব মডেল বিশ্ববাসীর সম্মুখে না থাকায় ইসলামের দুশমনরা এর বিরুদ্ধে যথা ইচ্ছে বিষোদগার করে যাচ্ছে। তারা মিথ্যাচারের মাধ্যমে অন্য ধর্মাবলম্বীতো বটেই, এমনকি অনেক মুসলমানকেও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। যার অনিবার্য পরিণতিতে এই আইন প্রয়োগের মধ্যে তারা সবাই পশ্চাদপদতা, বর্বরতা ও জুলুমের উপস্থিতি আবিষ্কার করেছে। বাস্তবে অবস্থাটি তা নয়। বরং আসল কথা হচ্ছে, শুধুমাত্র এই আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই মানুষের বাস উপযোগী একটা সুন্দর পৃথিবীর কল্পনা করাও যে অবান্তর, এই শাশ্বত সত্যটি বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরাই হচ্ছে সময়ের দাবি। এ আইন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থ, বিচার; এক কথায় মানবজীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় যুগোপযোগী। এ আইনকে তারা গুটি কতক অপরাধীর জন্য দৃশ্যত অকল্যাণ ধরে নিলেও এ আইন মূলত বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর ইহলৌকিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম এই বাস্তবতা সকলের সম্মুখে উন্মোচন আজ অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। সে জন্য লেখালেখি, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, বক্তৃতা, বিবৃতি আলোচনা সভা, গোলটেবিল বৈঠক প্রভৃতির মাধ্যমে এই আইন সম্পর্কে মানুষদের ভ্রান্তি উন্মোচন করে স্বচ্ছ ধারণা দানের এক জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের জন্য অপরিহার্য।

SHARE

Leave a Reply