মহান বিজয় দিবসের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে প্রয়োজন দেশপ্রেম । মোবারক হোসাইন

মহান বিজয় দিবসের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে প্রয়োজন দেশপ্রেম । মোবারক হোসাইন১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। এটি ইতিহাস নির্মাণের দিন, পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হওয়ার দিন, আনন্দ-গৌরব মহিমান্বিত একটি দিন এবং একই সাথে বড় কষ্টের, বেদনার আর মহাত্যাগের একটি দিন। আমাদের মহাত্যাগের অতি কাক্সিক্ষত এই মহান অর্জন একক কোনো দলের, মতের, সম্প্রদায়ের, গোষ্ঠীর, ব্যক্তির নয়; এই বিজয় সমগ্র বাঙালি জাতির। এই মহান অর্জন প্রতিটি বাঙালি সব সময় বুকে ধারণ করে বেঁচে আছে এবং এর কোনে প্রকার বিকৃতি ঘটুক জাতি তা কখনোই প্রত্যাশা করে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবের দিনটি, রক্তস্নাত মহান বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্য-বীর্য আর বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ। বিশ্বমানচিত্রে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড আত্মপ্রকাশ করে গৌরবদীপ্ত এই দিনেই। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জনে আত্মত্যাগকারী শহীদদেরকে। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এই ভূখণ্ডের জনগণ সাহসিকতার সাথে বিভিন্ন সময় দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জুলুম-অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আদর্শহীনতা যেভাবে বাসা বেঁধেছে; তাতে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি আদর্শ ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বিজয়ের মাসে ভাবতে হবে দেশের জনসাধারণের কথা, তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করার কথা, তাদের ভালো-মন্দ, সুবিধা-অসুবিধা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশা, দুঃখ- বেদনা ও বঞ্চনার কথা, সর্বোপরি দেশপ্রেমের কথা ভাবতে হবে। স্বাধীনতা-উত্তর গত সাড়ে ৪ দশকে হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম-নিপীড়ন, গুম-খুন, প্রতিশোধপরায়ণতা, পরশ্রীকাতরতা, দলীয় কোন্দলের নোংরা খেলায় জাতিকে বিভাজনের মতো অসংখ্য ব্যর্থতা বিরাজমান।

বিজয় হোক মানুষের অধিকারের

যারা দেশকে ভালোবাসেন, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে জিইয়ে রাখতে চান; সেই দেশপ্রেমিক মানুষগুলোকে আজ নানাভাবে হয়রানির মাধ্যমে কৌশলে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। নেই সাধারণ মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা; নেই স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। প্রতিদিন গুম, খুন ও ধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটছে। সকল ষড়যন্ত্রের প্রাসাদ ভেঙে দিতে এখনই প্রয়োজন শক্তিশালী সম্মিলিত ঐক্য। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আবার নতুন করে জ্বলে উঠি আর আমাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হোক- এই দেশের জন্য যদি করতে হয়/ আমার এ জীবন দান/ তবু দেব না দেব না লুটাতে ধুলায়/ আমার দেশের সম্মান।

সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য চাই সুস্থ রাজনীতিক সংস্কৃতি

একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সুস্থ রাজনীতির বিকল্প নেই। তবে আজকের বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। সুস্থ রাজনীতি যেন অলীক স্বপ্নের ন্যায়। পরিবারতন্ত্র, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রের কবলে আমাদের রাজনীতি। এ পরিস্থিতির অবসানে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে এ দেশের আপামর জনতা। স্বাধীনতার প্রায় ৫ দশক পূর্ণ হতে চলেছে অথচ আমরা কি একটি কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ; একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সন্ধান পেলাম?

অধরাই রয়ে গেছে আমাদের স্বপ্নকথা। একটি দেশের উন্নয়নে প্রয়োজন সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক। অথচ আমরা কী দেখছি! প্রতিনিয়ত সবখানে দলীয়করণ ও প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। গণতন্ত্র আজ কফিনে মোড়ানো এক মৃত্যুপথযাত্রী। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। ‘উন্নয়নের মহাসড়কে চলছে বাংলাদেশ’ এটি নিছক একটি শ্লোগান। আর এই সব শ্লোগান দিয়ে দেশ পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দেশ পরিবর্তনে প্রয়োজন আদর্শিক ও নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন যোগ্য কাণ্ডারি। পরিবর্তন আসুক আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সুবহে সাদিকের প্রত্যাশা; এই প্রত্যাশা নিয়ে প্রতি রাতে ঘুমিয়ে পড়ে এ দেশের কোটি কোটি জনতা।

একটি দেশ গড়তে যুবশক্তির মূল্যায়ন

একটি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য একদল দুঃসাহসী তরুণদের ভূমিকা অনিবার্য। আজ বড় অবহেলার শিকার আমাদের এই তরুণ বন্ধুরা। যাদের চোখে মুখে আলোর ঝলকানি, দেশপ্রেমের সিম্ফনি এবং হৃদয়ে বাংলাদেশ আঁকা থাকার কথা ছিল, কিন্তু তাদের দু’চোখ জুড়ে আজ হতাশার প্রতিচ্ছবি। বেকার ও শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা আজ দিন দিন বেড়ে চলেছে। ফুরিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মক্ষমতা; মিলছে না কর্মসংস্থানের ঠিকানা। অবহেলায় অনাদরে ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনাময়ী মেধাবী সূর্যতরুণ। ফলে অনেকে নিরুপায় হয়ে বিপথগামী হচ্ছে। অপর দিকে তরুণ বন্ধুদের বিরাট একটি অংশ দেশের কাজে অনুপযোগী, অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে। দেশপ্রেমিক এই সব তরুণকে পিছিয়ে রাখা, দেশের উন্নয়নে কাজে না লাগানোটাও আমাদের উন্নয়নের পথে বড় একটি বাধা। এর জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এই দেশে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি নাগরিক নাগরিক-জীবনের সুযোগসুবিধা ভোগের অধিকার রাখে।

প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা

ভালো বীজ ছাড়া ভালো ফসল পাওয়া যায় না। আদর্শ, সুন্দর ও নৈতিকতাসম্পন্ন জাতি উপহার দিতে প্রয়োজন আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার। আমাদের সন্তানেরা যখন বখে যাচ্ছে তখন আমরা খুব বেশি আফসোস করছি। আসলেই এই আফসোসে কিছু যায় আসে? আফসোসের মাধ্যমে কি আমাদের সন্তানটি নৈতিকবোধসম্পন্ন হয়ে উঠবে? গোড়ায় গণ্ডগোল। আজকে আমরা দেখতে পারছি যে প্রাথমিক থেকে সর্বস্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস। পত্রিকায় নিউজ হয়; লিড নিউজ। আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। এই বুঝি প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু কী দেখতে পাচ্ছি। ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আবারো আহত হয় আমাদের হৃদয় কিন্তু কোনোভাবে এই অপকর্মের বিলুপ্তি সম্ভব হয়ে উঠছে না। একটি মাত্র কারণ আমরা শুরু থেকে শুরু করতে পারছি না। আর সমাজ আলোকিত তো অনেক দূর। এখনই সময় নতুন করে ভাববার। আমাদের দেশ, আমাদের স্বপ্নগুলো যেন অঙ্কুরেই বিনাশ না হয়। প্রিয় সন্তানগুলো যেন গড়ে উঠতে পারে দেশ ও জাতির জন্য। ওরা আগামীর বাংলাদেশ, আমাদের ভবিষ্যৎ। যারা আগামীর বাংলাদেশ গড়তে চায়; একটি দুর্নীতিমুক্ত, সুখী ও সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন যাদের চোখে মুখে তাদেরকে গড়ে তুলতে হবে নৈতিকবোধসম্পন্ন ও আদর্শিক ও দেশপ্রেমী হিসেবে। আর সেই স্বপ্ন পূরণে এখনই প্রয়োজন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার।

আমাদের প্রাপ্তি

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক কিছু সাম্রাজ্যবাদীরা নিয়ে গেলেও আমরা একটি সমৃদ্ধ ভাষা পেয়েছি। যার অবস্থান পৃথিবীতে ষষ্ঠ। লাল-সবুজের এমন একটি পতাকা পেয়েছি যে পতাকাটি পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের পতাকার চেয়ে সুন্দর, যেমন সুন্দর এখানকার চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য। এমন একটি ভূখণ্ড পেয়েছি যে ভূখণ্ডটি এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিধিজুড়ে। পূর্বদিকে সুবিশাল বঙ্গোপসাগর, অন্য তিন দিকে ভারত ও মিয়ানমার দ্বারা বেষ্টিত। এ দেশের হাজারো সম্ভাবনায় ভরা এক সবুজ শ্যামল ভূখণ্ড যার রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম উর্বর মাটি, তার চেয়েও কর্মক্ষম একদল পরিশ্রমী জনগণ। এসব মানুষ সকল সঙ্কটে, সংগ্রামে অকুতোভয়, সাহসে বলীয়ান এবং সঠিক নেতৃত্বের অধীন সবসময়ই পারঙ্গম একটি জাতি। জনগণের এই হাতগুলোকে কর্মীর হাতে পরিণত করে এদেশে যেকোনো মিরাকল ঘটানো সম্ভব। এখনো এদেশের ১৬ কোটি মানুষ কেবলমাত্র জনসংখ্যা নয়, এটিকে সহজেই জনসম্পদে (Human Resource) পরিণত করা যায়। এ জন্য চাই একটি পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা (Perspective Plan), সম্মিলিত প্রয়াস (Collective Efforts) এবং সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় অভেদ্য ঐক্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনুপম বাংলাদেশ।

বিজয়ের প্রকৃত প্রত্যাশা

বিজয় যেহেতু আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে সুতরাং এ দিনটি চিরকালই বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল হয়ে থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট স্বাধীনতার দুটো অর্থ করেছিলেন। প্রথমত, ক্ষুধা থেকে মুক্তি বা স্বাধীনতা। দ্বিতীয়ত, ভীতি থেকে মুক্তি বা স্বাধীনতা। ক্ষুধা থেকে মুক্তির অর্থ মৌলিক মানবিক প্রয়োজনের স্বীকৃতি। পৃথিবীর প্রায় দেশ আজ মানুষের সেই- খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার স্বাধীনতা মোটামুটি নিশ্চিত করেছে। স্বাধীনতার প্রায় ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের জনগণ কি সেই মৌলিক স্বাধীনতা ভোগ করছে? আজও মানুষ ক্ষুধার জন্য প্রাণপাত করছে। এ রকম অসংখ্য খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বড় দিক হলো সব নাগরিকের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানে খাদ্যের সুষম বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য যদি স্বাধীনতার একটি পূর্বশর্ত হয় তাহলে এখন সহজে বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষ কতটা খাদ্যনিরাপত্তা তথা খাদ্যের স্বাধীনতা ভোগ করছে। বিজয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য শর্ত কি পূরণ করতে পেরেছে?

স্বাধীনতার দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে- ভীতিমুক্ত পরিবেশ। ভীতিমুক্ত পরিবেশ হতে হলে ভূখণ্ডটি স্বাধীন হতে হবে। বাংলাদেশ প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশদের দখলে ছিল। ১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশ ব্রিটিশদের দখলমুক্ত হয়। আরো ২৩ বছর পাকিস্তানের দখলে থাকে বাংলাদেশ। এই উভয় দখলদারদের আমলে বাংলাদেশ ভীতিমুক্ত ছিল না। রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন, জেল-জুলুম অব্যাহত ছিল। ৪৭ বছর ধরে আমরা স্বাধীন হয়েছি। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয়- ভীতিমুক্ত পরিবেশ  তা হলে আমরা কি সেই ভীতিমুক্ত পরিবেশে বসবাস করছি?

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক শাসনের বর্ণনা দেখে আমরা বুঝতে পারব যে, বিজয়ের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আমাদের কতটা পূর্ণ হয়েছে আর কতটা পূর্ণ হয়নি। আমাদের গরিব সাধারণ জনগণ এখনো তাদের বেঁচে থাকার পাঁচটি মৌলিক সুবিধা পায়নি। অপর দিকে যদি ভীতিমুক্ত শর্ত দ্বারা আমাদের বিগত শাসন কালগুলোকে বিশ্লেষণ করি তাহলে আমাদের অবশ্যই হতাশ হতে হবে। আমরা দেখব ‘ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে আমাদের স্বাধীনতার পৃথিবী।’ প্রবীণরা বলেন ‘যায় দিন ভালো যায়, আসে দিন খারাপ হয়।’ বিজয় দিবসের সুপ্রভাতে আমাদের প্রার্থনা- ‘আসবে দেশে শুভ দিন, ভীতি শোষণ হবে লীন।’

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা, উন্নয়ন, শান্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সূচকে স্বাধীনতার ৪৭টি বছরে আমাদের অর্জনকে আজ মূল্যায়নের সময় এসেছে। কারণ ৪৭টি বছর কিন্তু কম সময় নয়। আর এই ৪৭টি বছরে আমাদের অর্জনকে যদি আজ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করি তাহলে দেখা যাবে আমাদের অর্জন খুব বেশি প্রত্যাশিত নয়। অর্থাৎ প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যেতে পারিনি। আমাদের আরো এগিয়ে যাবার দরকার ছিল এবং আমরা সেটা পারতাম। দেশের সকল মানুষ এখনো শিক্ষিত হয়নি। সকল মানুষ এখনো বিদ্যুৎসুবিধা পায়নি, পায়নি চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা। দুর্নীতিতে আমাদের অবস্থান বরাবরই উপরের দিকে। সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি স্থায়ী আসন গেড়েছে। দেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোতে এখন খেলাপি ঋণের পাহাড়। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই ঋণের টাকা ফেরত না দেয়া একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটিরও বেশি, যা আমাদের অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং সেক্টরকে বিপদগ্রস্ত করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো ভালো করতে হবে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মানুষ খুন হচ্ছে, না হয় গুম হচ্ছে। নারী নির্যাতন এবং ইভটিজিং বেড়েই চলেছে। ভোটাধিকার নিয়ে এখনো মানুষ উদ্বিগ্ন। জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট এবং জাতি আজ বিভক্ত। ঐক্যের পরিবর্তে সর্বত্রই আজ অনৈক্যের সুর। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশসমূহ জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে আজ সর্বদা উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং শান্তির পথে অগ্রসরমান। আজ থেকে ৪৭ বছর আগে যেসব দেশের অবস্থান ছিল আমাদেরই কাতারে, সময়কে যথাযথ এবং পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে তারা আজ এগিয়ে গেছে অনেক দূর। দরিদ্রতা, অশিক্ষা আর হতাশাকে জয় করে তারা আজ উন্নত, শিক্ষিত এবং ধনী রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথে তারা সর্বদা অগ্রসরমান। সুতরাং এসব দেশের মতো  আমাদেরকেও আজ এগিয়ে যেতে হবে।

সমস্যার কথা বলে আমাদের বসে থাকলে চলবে না। আমাদের চারপাশে আজ যেসব সমস্যা, তা দেখে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। অতীতের যা কিছু ভুল এবং অন্যায়, তাকে চিরতরে বিদায় করে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির জন্য সর্বদা প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। ঘনত্বের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ এই দেশেই বসবাস করে। এ জনগণকে আজ সম্পদে পরিণত করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়ার জন্য জনশক্তি আমদানি করে। আর আমরা আমাদের জনগণকে বিদেশে রপ্তানি করি। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষ বিদেশে কর্মরত আছে। তাদের পাঠানো অর্থে সচল আমাদের অর্থনীতির চাকা এবং সচল আমাদের উন্নয়নের চাকা। সুতরাং জনসংখ্যা রপ্তানির এই খাতকে আজ গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশের বাজারে আমাদের জনগণ যেন অধিক হারে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখানে যেন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে, তার জন্য সরকারকে কাজ করতে হবে। এদেশেই আমরা জন্মেছি, এদেশেই আমরা বসবাস করব এবং এদেশকেই আমাদের গড়তে হবে। তাই নিজেদের কল্যাণের স্বার্থেই আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই এবং দেশের উন্নতির জন্য কাজ করি। আমরাই ঐক্যবদ্ধ সাহসী বীর বাঙালি। আর আমরা যদি অতীতের সব হিংসা-হানাহানি, দলাদলি ভুলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিজয়ের চেতনাকে বুকে ধারণ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন করে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি, তবেই আমাদের পক্ষে সত্যিকার একটি সুখী-সমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশ গড়া মোটেও কঠিন হবে না বলে আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি।

মনে রাখতে হবে ঐক্যেই শক্তি, ঐক্যেই শান্তি। ঐক্যবদ্ধ জাতি মানেই ঐক্যবদ্ধ শক্তি। অপর দিকে অনৈক্য মানে বিভক্তি, যা একটি জাতিকে দিন দিন কেবল দুর্বল করে। সবদিকে কেবল ক্ষতি বয়ে আনে। সুতরাং শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের স্থায়িত্ব ও বিকাশের স্বার্থে আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। আসুন মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করি, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিই এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করি। আসুন উন্নয়নের সাথে সাথে সুশাসন নিশ্চিত করি। আসুন জনগণের মাঝ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ এবং হানাহানি দূর করি। গড়ে তুলি সাম্য, সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আলোকিত একটি সমাজ। তাহলেই কেবলমাত্র আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্থবহ হবে।

বিজয়ের প্রত্যাশা ও আমাদের করণীয়

আমাদের মহান বিজয়ের প্রত্যাশা ছিল- ক) পরাধীনতা ও শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। খ) মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও কর্মসংস্থান প্রভৃতি নিশ্চিত করে সমাজের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। গ) সকল নাগরিকের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঘ) ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করা। ঙ) আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।

বিজয়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের যেসব করণীয় পালন করা উচিত- ক) জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করে তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। খ) দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির সংঘবদ্ধ প্রয়াস ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে আন্তরিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। গ) দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ঘ) বিজয়ের আদর্শ, লক্ষ্য ও চেতনা সমাজ এবং জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ঙ) রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। চ) সকলক্ষেত্রে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ছ) সকলকে দেশপ্রেম, সততা ও নিষ্ঠার সাথে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। জ) শিশুদেরকে সুনাগরিক ও দেশপ্রেমের শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। ঝ) গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সকলকে সক্রিয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। ঞ) অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ইত্যাদি সম্পর্কিত যাবতীয় ব্যবস্থা ও সুযোগকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সকলের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। ট) ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে হবে। ঠ) সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। ড) প্রত্যেক নাগরিককে রাষ্ট্রের দেয়া অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হবে। ঢ) সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সততার সাথে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে। ণ) প্রত্যেককে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। ত) দেশ ও জাতির কল্যাণে সকলকে সর্বদা দলমতের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। থ) দেশের ও জনগণের চাহিদা মোতাবেক সর্বদা গণমুখী ভূমিকা পালন করতে হবে। দ) রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।  দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বিজয়ের প্রত্যাশায় সকলকে সততা ও দেশপ্রেমের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা কাঙ্ক্ষিত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

এদেশে একটি বহুল প্রচলিত শ্লোগান রয়েছে-“ব্যক্তির চেয়ে দল বড়/দলের চেয়ে দেশ বড়।” কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রায়োগিক বিবেচনায় কাজ হচ্ছে ঠিক উল্টো। এখানে অধিকাংশ মানুষের প্রবণতা বলছে দেশের চেয়ে দল বড়/দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। এর প্রধান কারণ আমাদের দুর্নীতিপ্রবণতা। আমরা সবাই বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার। দেশ-জাতি-দল যেদিকেই যাক না কেন, আমার স্বার্থটা ষোল আনা চাই।

এই দুর্নীতি ও স্বার্থপরতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া ৪৭ বছর আগে অর্জিত আমাদের বিজয়কে অর্থবহ করা কিংবা টিকিয়ে রাখা আদৌ সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে ভাবার জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি দল, দলের নেতা ও কর্মীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই। রাজনীতিতে নাকি শেষ কথা বলতে কিছু নেই। তবে দেশপ্রমের ক্ষেত্রে শেষ কথা আছে। দেশপ্রেম ১০০-তে ১০০ পেয়ে প্রমাণ করতে হয়। ৯০ পেলেও A+ পাওয়া যায় না। আজ বাংলাদেশে প্রয়োজন ১০০-তে ১০০ পাওয়া খাঁটি, নির্ভেজাল, দুর্নীতিমুক্ত ও প্রমাণিত দেশপ্রেমিকের। আসুন আমরা সবাই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই।

সুতরাং, সকল শ্রেণীর পেশার মানুষের প্রাণপণ দাবি এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজকের বাংলাদেশ। আজ গর্বে বুক ফুলিয়ে, শিরদাঁড়া উঁচু করে উদ্বেলিত কণ্ঠে আওয়াজ তোলার কথা ছিল। অথচ আজ এক বুক বেদনায় আহত হৃদয়। এই দেশ নিয়ে আমাদের কতই না স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নগুলো কি ফানুস হয়ে উড়ে যাবে দূর নীলিমার ঐ আকাশে। মেঘের ভাঁজে কি আড়াল হয়ে যাবে প্রত্যাশার সূর্য!

১৬ কোটি মানুষকে যদি জাগাতে পারি, ঘুণেধরা সমাজের সকল অনাচার যদি শুধরে নিতে পারি, নৈতিক শিক্ষার বলে বলীয়ান করতে পারি, তাহলে আমরাই হবো আমাদের তুলনা। বিভেদের দেয়াল চৌচির করে ভ্রাতৃত্বের সৌধ নির্মাণের মাধ্যমে একটি কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের প্রত্যাশায় আমরা শপথ নিই নতুন করে।

লেখক : সম্পাদক, মাসক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply