মহাবিস্ফোরণ ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য -তালহা ইবনে আলাউদ্দিন

এক.
“কি বললি, বিগ ব্যাঙ? নারে ভাই আমি এসব ব্যাঙ-ট্যাঙয়ের সাথে নেই। ক্লাস টেনে পড়ার সময় একবার ব্যাঙ দিয়ে ব্যবহারিক করতে হয়েছিল। তারপর দুই দিন ভাত পর্যন্ত খেতে পারিনি।” খানিকটা বিরক্তির সুরে বললো ফাহাদ।
“আরে এই ব্যাঙ সেই ব্যাঙ না। এইটা হলো বিগ ব্যাঙ। বুঝলি না- বইয়ের বিগ ব্যাঙ?” ফাহাদকে খানিকটা বোঝানোর চেষ্টা করলো মাযহার।
“ব্যাঙ বড় হোক আর ছোট  হোক, এসব ফাউল জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণ নেই।”
“আরে বেকুব, এইটা প্রাণী ব্যাঙ না, মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে গ্রহণযোগ্য থিউরির নাম বিগ ব্যাঙ।” ফাহাদকে মৃদু ধমকের সুরে বলল মাযহার।
“ওহ, তাই বল…” খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে উঠলো ফাহাদ।
বন্ধু ফাহাদের মতো বিগ ব্যাঙ বোঝাতে গিয়ে আরও কত মানুষকে এই রকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যাই হোক, বিজ্ঞানের অনেক ফর্মুলা, অনেক মতাদর্শ এমনকি নানান রকম গবেষণাও পরিচালিত হয়ে আসছে এই বিগ ব্যাঙ থিওরির ওপর ভিত্তি করে। কত বিজ্ঞানী তাদের জীবন পার করে দিচ্ছেন এই বিগ ব্যাঙয়ের ওপর চিন্তা করতে করতে। শুধুমাত্র এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্যই না, পৃথিবী তথা মহাবিশ্ব কিভাবে ধ্বংস হবে তাও বলে দিচ্ছে এই বিগ ব্যাঙ। কিন্তু আফসোস আমরা কি কখনো চিন্তা করি এসব বিষয় নিয়ে? বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সমসাময়িক বিষয়ের ওপর অভিজ্ঞ পন্ডিত হতে বলছি না, কিন্তু বিজ্ঞানের A,B,C,D-এর ওপর ধারণা থাকতে হবে। নিজেদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন বিজ্ঞানের সঠিক স্বরূপ মানুষের কাছে তুলে ধরে বিজ্ঞানের ব্যাপারে মানুষের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করতে পারি এবং সৃষ্টি জগতের নিদর্শনসমূহ যথাযথভাবে তুলে ধরে মহান ¯্রষ্টা আল্লাহর প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারি।
যাহোক, এখন আমরা আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে আসি। এমনভাবে বিগ ব্যাঙ থিউরি বোঝাতে চেষ্টা করবো যাতে করে যারা বিজ্ঞানের ছাত্র না তারাও যেন খুব ভালোভাবে বুঝতে পারেন। প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করবো বিগ ব্যাঙ কী?
একদিন স্যার ক্লাসে বিগ ব্যাঙ পড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ স্যার বলেন,
“এই নাজিম দাঁড়াও।”
আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম। আমি চিন্তা করলাম স্যার কি যে জিজ্ঞাসা করেন আল্লাহই জানেন। সবচেয়ে ভয়ে থাকার কারণ আমি আগের দিনের ক্লাস মিস করেছি। স্যার বলতে শুরু করলেন,
“তুমি না কুরআন-হাদিস বেশি চর্চা কর। তাহলে তোমার তো বিগ ব্যাঙ ভালো বোঝার কথা। তুমি কি এই বিষয়ে কিছু বলতে পারবে? কোন কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে বিগ ব্যাঙ দাঁড়িয়ে আছে?”
আমি তো টাস্কি খাওয়ার মত অবস্থা। স্যার বলেন কী? আমি কুরআন অনেক পড়েছি। কিন্তু কোথাও তো মনে হয়নি কুরআনের আয়াতের মধ্যে বিগ ব্যাঙ থিউরি লুকায়িত আছে! তাই আমি বললাম,
“না স্যার, আমি জানি না।”ga1
“তাহলে তুমি জানটা কী! কুরআন কি তাহলে না বুঝেই পড়?”
সেদিন আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি কুরআন ও বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবো। স্যার তো আসলেই ঠিকই বলেছেন। আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে আছি এই জন্যই যে আমাদের কুরআনে কি লেখা আছে তা আমরা ঠিক মত না জেনেই শুধু তোতা পাখির মতো আওড়িয়ে যাচ্ছি। তারপর স্যার যা বললেন তার সারসংক্ষেপ এরকম, “মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থে দুইটা কনসেপ্ট আছে। পুরো বিশ্বব্রহ্মান্ড অতীতে একত্রিত ছিল, সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবী, নভোমন্ডল তৈরি হয় এবং বিশ্বজগৎ ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আর হাবল টেলেস্কোপ আবিষ্কার হবার পর প্রথম লক্ষ্য করা হয় যে গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর যেহেতু তারা প্রতি মুহূর্তেই দূরে সরে যাচ্ছে, তাহলে বোঝা যায় অতীতে কোনো এক সময় তারা আরও কাছাকাছি ছিল এবং আরও অতীতে একত্র ছিল।”
স্যারের বর্ণনা অনুযায়ী এই হলো বিখ্যাত বিগ ব্যাঙ থিওরির অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।
এই গল্পটা আমি এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম। গল্পটা শোনার পর কুরআন ও বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার তৃষ্ণা আমাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

দুই.
আসুন এবার আমরা আরও বিস্তারিতভাবে জেনে নিই আসলেই বিগ ব্যাঙ কী। ‘বিগ’ মানে সবাই জানি ‘বড়’ বা ‘বিশাল’, আর ইংরেজিতে ‘ব্যাঙ’ মানে বোঝায় ‘ঠুং ঠুং শব্দ’, ‘আঘাত’ বা ‘ঠং আওয়াজ’। একবারে বলতে পারি ‘বিগ ব্যাঙ’ মানে ‘বড় আঘাত’। আরও একটু ভালোভাবে বললে একে মহা বিস্ফোরণও বলা যেতে পারে। বিগ ব্যাঙ তত্ত্ব বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রদত্ত একটি  বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। এই তত্ত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কোন ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে একটি বিশেষ মুহূর্তে মহাবিশ্বের উদ্ভব। এ তত্ত্ব বলে, আজ থেকে প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বা ১৪০০ কোটি বছর পূর্বে এই মহাবিশ্ব একটি অতি ঘন এবং উত্তপ্ত অবস্থা থেকে মহা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। মহা বিস্ফোরণ শব্দটি স্থূল অর্থে প্রাচীনতম একটি বিন্দুর অতি শক্তিশালী বিস্ফোরণকেই বোঝায়।
১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী জর্জ লেমিটর (Georges Lemaître) এই তত্ত্ব প্রথম প্রকাশ করেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে জর্জ লেমিটর এ তত্ত্ব প্রকাশ করলেও এই তত্ত্বকে বিস্তৃত করেন জর্জ গ্যামো। এখন লেমিটরের মতে সৃষ্টির আদিতে মহাবিশ্বের সকল বস্তু আন্তঃআকর্ষণে পুঞ্জীভূত হয় এবং একটি বৃহৎ পরমাণুতে পরিণত হয়। এই পরমাণুটি পরে বিস্ফোরিত হয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়। এই মতবাদকে সমর্থন ও ব্যাখ্যা করেন এডুইন হাবল Edwin Hubble)। হাবল পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণ পান যে মহাকাশের গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে ক্রমান্বয়ে নির্দিষ্ট গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁর মতে, আদিতে মহাবিস্ফোরণের ফলে গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর দূরে সরে যাওয়ার আচরণ বিগ ব্যাঙ তত্ত্বকেই সমর্থন করে।
এইভাবে বিস্ফোরণের ফলে যে বিকিরণের (radiation) সৃষ্টি হওয়ার কথা, তার অস্তিত্ব প্রথম দিকে প্রমাণ করা যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। ১৯৬৪ সালে Arno Penzias Ges Robert Wilson নামক দু’জন বিজ্ঞানী বিকিরণের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। ফলে বিগ ব্যাঙয়ের ধারণা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মহাবিশ্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এই তত্ত্বকেই সত্য বলে বিবেচনা করা হয়।
আদিতে মহাকাশের বস্তুপুঞ্জ বিক্ষিপ্তাকারে ছড়ানো ছিল। অবশ্য এই আদি বস্তুপুঞ্জ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর বিন্যাস কিরূপ ছিল, তার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দিতে পারেননি। বিগ ব্যাঙ তত্ত্ব অনুসারে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে এই সকল বিক্ষিপ্ত বস্তুগুলো আন্তঃআকর্ষণের কারণে পরস্পরের কাছে আসতে থাকে এবং ধীরে ধীরে একটি ডিমের আকার ধারণ করে। বিজ্ঞানীরা একে নামকরণ করেছেন মহাপরমাণু (Supper Atom)। উল্লেখ্য, এই সময় কোন স্থান ও কালের অস্তিত্ব ছিল না। অসীম ঘনত্বের এই মহাপরমাণুর  ভেতরে বস্তুপুঞ্জের ঘন সন্নিবেশের ফলে এর তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল- যে কোন পরিমাপ স্কেলের বিচারে ১০১৮ ডিগ্রি তথা ১ এর পরে ১৮টি শূন্য দিলে যে সংখ্যা দাঁড়ায় তত ডিগ্রি। বিগ ব্যাঙয়ের পরের ১ সেকেন্ডে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তা কালানুক্রমে নিচে তুলে ধরা হলো :
০ থেকে ১০-৪৩ সেকেন্ড (অর্থাৎ ১ এর পরে ৪৩টি শূন্য দিলে যে সংখ্যা হয়, এক সেকেন্ডের ততভাগের এক ভাগ): কোয়ান্টাম সূত্রানুসারে বিগব্যাঙয়ের ১০-৪৩ সেকেন্ডের (এই সময়কে প্লাঙ্ক-অন্তঃযুগ (Planck Epoch) বলা হয়)  ভেতর চারটি প্রাকৃতিক বলের (Force) সমন্বয় ঘটেছিল। এই বলগুলো হলো- সবল নিউক্লীয় বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল, বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল ও মহাকর্ষীয় বল। সবগুলো মিলে একটি অতি বৃহৎ বলের (Super Force) সৃষ্টি হয়েছিল।
প্ল্যাঙ্ক-অন্তঃযুগ থেকে ১০-৩৫ সেকেন্ড : প্ল্যাঙ্কের সময় অতিবাহিত হওয়ার কিছু পরে মহাকর্ষীয় বল, অন্য তিনটি বল থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল। ফলে মাধ্যাকর্ষণজনিত শক্তির কারণে, মহাপিন্ডটি সর্বোচ্চ সঙ্কোচন মাত্রায় পৌঁছেছিল। তখন ঘনত্বের বিচারে মহাপরমাণুর প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে বস্তু ছিল ৫দ্ধ১০+৯৩ গ্রাম। এই সময় এর তাপমাত্রা ছিল ১০৩২ কেলভিন। ১০-৩৫ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে এই তাপমাত্রা এসে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১০২৭ কেলভিন। এই সময় কোয়ার্ক ও লেপ্টন কণার সৃষ্টি হয়েছিল। একই সাথে তৈরি হয়েছিল কিছু বস্তু (Particles) এবং প্রতিবস্তুসমূহ (Antiparticles)। পরে বস্তু ও তার প্রতিবস্তুর মধ্যে সংঘর্ষ হলে উভয় ধরনের বস্তুগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে শুধু কোয়ার্ক ও লেপ্টন রয়ে যায়।
১০-৩৫ থেকে ১০-১০ সেকেন্ড: পরবর্তী ১০-১০ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা নেমে আসে ১০১৬ কেলভিনে। এই তাপমাত্রা পরে আরও কমে গেলে দুর্বল নিউক্লীয় বল ও বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল পৃথক হয়ে যায়। এই সময় কোয়ার্কসমূহ সবল বলের প্রভাবে আবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি করে ফোটন, প্রোটন এবং নিউট্রন।
১ সেকেন্ড পরে : ১ সেকেন্ড পরে তাপমাত্রা নেমে আসে ১০১০ কেলভিনে। এটা ছিল সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার ১০০ গুণ বেশি, কিন্তু হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা যেরূপ উচ্চ থাকে সেরূপ ছিল। কিন্তু এই তাপমাত্রায় পরমাণু সৃষ্টি অসম্ভব ছিল।
ধারণা করা হয় বিগ ব্যাঙ-এর ৩ সেকেন্ড থেকে ১০০,০০০ (এক লক্ষ) বছরের মধ্যে সৃষ্ট কণাগুলো শীতল হয়ে উঠে। এই অবস্থায় বস্তুপুঞ্জে বিরাজমান ইলেক্ট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন মিলিত হয়ে তৈরি হয় হাইড্রোজন ও হিলিয়াম পরমাণু। এ ছাড়া এই দু’টি পদার্থের সাথে ছিল প্রচুর ইলেক্ট্রন প্লাজমা। সব মিলিয়ে এই কণিকায় বিপুল বস্তুকণার সমাবেশ ঘটেছিল। এই সময় এই সকল কণিকাও ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ক্রমে ক্রমে এগুলো শীতল হতে থাকলো এবং এদের ভেতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে- কাছাকাছি চলে এসেছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ বস্তুপুঞ্জ পৃথক পৃথক দল গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। এই পৃথক দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পত্তন ঘটেছিল গ্যালাক্সির (Galaxy)। আমাদের সৌরজগৎও এরূপ একটি গ্যালাক্সির ভেতরে অবস্থান করছে। এই গ্যালাক্সির নাম মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা (MilKz Way)।
রাতের আকাশে যখন তাকাই তখন মনে হয় মহাবিশ্ব কত না সুন্দর আর কতই না বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে এর মাঝে। এই মহাবিশ্বের সব কিছু সুন্দর কিন্তু এর সৌন্দর্য আরও বেশি উপলব্ধি করা যাবে যদি এর  ভেতর সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন খোঁজা হয়।

তিন.
বিগ ব্যাঙ তত্ত্ব বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব- ‘আজ থেকে প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বা ১৪০০ কোটি বছর আগে এই মহাবিশ্বের সমস্ত কিছু একসাথে লাগানো অবস্থায় ছিল বা সমগ্র মহাবিশ্ব একটি সুপ্রাচীন বিন্দু অবস্থায় ছিল কিংবা এই মহাবিশ্ব একটি অতি ঘন এবং উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল। এই অতি ঘন এবং উত্তপ্ত সুপ্রাচীন বিন্দুটির শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয় যার ফলে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। শক্তিশালী বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট কণাগুলো ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বজগৎ ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে।’
আসুন খুঁজে দেখি এ ব্যাপারে কুরআন কী বলে। সূরা আম্বিয়ার ত্রিশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেন,
“যারা কুফরি করে তারা কি ভেবে দেখে না যে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম।” (সূরা আম্বিয়া : ৩০)
এই আয়াতের প্রথম অংশের মূলে (ÑóÊúÞðÇ) ও (ÝóÊóÞúäóÇ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে? “রত্ক” মানে হচ্ছে একত্র হওয়া, একসাথে থাকা, একজন অন্যজনের সাথে জুড়ে থাকা। আর “ফাত্ক” মানে ফেড়ে ফেলা, ছিঁড়ে ফেলা, আলাদা করা। বাহ্যত এ শব্দগুলো থেকে যে কথা বোঝা যায় তা হচ্ছে এই যে, আজ থেকে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর পূর্বে এই মহাবিশ্বের সমস্ত কিছু একসাথে লাগানো অবস্থায় ছিল বা বিশ্ব-জাহান প্রথমে একটি পিন্ডের (mass) আকারে ছিল।
আয়াতের বাকি অংশে বলা হয়েছে “অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম।” মানে পরবর্তীকালে তাকে পৃথক পৃথক অংশে বিভক্ত করে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্র, ছায়াপথ নীহারিকা ইত্যাদি স্বতন্ত্র জগতে পরিণত করা হয়েছে?
শুধুমাত্র এই একটি আয়াত দিয়েই আল্লাহ্ কী সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য। সেই রহস্য নিয়ে আমরা যুগ যুগ ধরে গবেষণা করে যাচ্ছি। না জানি আরও এমন কত কিছু কুরআনের মধ্যে লুকিয়ে আছে যেটা আধুনিক সভ্যতা বিনির্মাণে কারিগরি ভূমিকা রাখতে পারে।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, বিগ ব্যাঙ থিউরির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে “শক্তিশালী বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট কণাগুলো ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বজগৎ ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে।” এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটিকেও কুরআন খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছে।
১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে জ্যোতির্বিদ এডুইন হাবল (Edwin Hubble) পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রমাণ পান মে মহাকাশের গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে ক্রমান্বয়ে নির্দিষ্ট গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁর মতে, আদিতে মহাবিস্ফোরণের ফলে গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টি হয়েছিল এবং এগুলোর দূরে সরে যাওয়ার আচরণ বিগ- ব্যাঙকেই সমর্থন করে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এখন  বৈজ্ঞানিক সত্য। কুরআন মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে একই কথা বলেছে। আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা বলেন :
“আমি নিজ ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী”। (সূরা জারিয়াত-৪৭)
আরবি শব্দ (áóãõæÓöÚõæäó) এর বিশুদ্ধ অনুবাদ হলো : ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী এবং সম্প্রসারণকারী উভয়টিই হতে পারে।
প্রথম অর্থ অনুসারে এ বাণীর অর্থ হয় আমি কারো সাহায্যে এ আসমান সৃষ্টি করিনি, বরং নিজের ক্ষমতায় সৃষ্টি করেছি আর তা করা আমার সাধ্যের বাইরে ছিল না। তা সত্ত্বেও তোমাদের মন-মগজে এ ধারণা কী করে এলো যে, আমি পুনরায় তোমাদের সৃষ্টি করতে পারবো না?
দ্বিতীয় অর্থ অনুসারে একথার অর্থ দাঁড়ায় এ বিশাল বিশ্ব-জাহানকে একবার সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হইনি, বরং ক্রমাগত তার সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছি এবং তার মধ্যে প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টির নতুন নতুন বিস্ময়কর দিক প্রকাশ পাচ্ছে? এরূপ মহাপরাক্রমশালী সৃষ্টিকারী সত্তার পক্ষে পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতাকে তোমরা অসম্ভব মনে করে নিয়েছ কেন? এটা মহাবিশ্বের ব্যাপক সম্প্রসারণশীলতার প্রতি ইঙ্গিতবাহী।
প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ স্টিফেন হকিং তার A Brief History of time বইতে লিখেছেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সম্পর্কিত আবিষ্কার বিংশ শতাব্দীর মহান বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। মানুষ কর্তৃক টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পূর্বে কুরআন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে।
কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, আরবরা যেহেতু জ্যোতির্বিদ্যায় অগ্রসর ছিল, সেহেতু কুরআনে জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত সত্যের উল্লেখ আশ্চর্যের বিষয় নয়। জ্যোতির্বিদ্যায় আরবদের অগ্রসরতার প্রতি তাদের স্বীকৃতি সত্য বটে। কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যায় আরবদের অগ্রসরতার কয়েক শতাব্দী আগে কুরআন নাজিল হয়েছিল। অধিকন্তু আরবরা তাদের বৈজ্ঞানিক শৌর্যবীর্যের সময়ে ও উল্লিখিত বিগ ব্যাঙ-এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু জানত না। জ্যোতির্বিদ্যার অগ্রগতির কারণে কুরআনে বর্ণিত  বৈজ্ঞানিক সত্যগুলোতে আরবদের কোন অবদান ছিল না। বরং বিপরীতটাই সত্য। আর তা হলো, তারা জ্যোতির্বিদ্যায় এ জন্য অগ্রগতি অর্জন করেছে যে, কুরআনে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে আলোচনা স্থান পেয়েছে।
আলোচনা এখানেই শেষ না। আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের হা-মীম আস সাজদাহ’র ১১ নাম্বার আয়াতের মাধ্যমে আরও কিছু বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছেন। হা-মীম আস সাজদাহ’র ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেন :
“তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেছেন যা সেই সময় কেবল ধোঁয়া ছিল? তিনি আসমান ও জমিনকে বললেন : ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তোমরা অস্তিত্ব ধারণ করো? উভয়ে বললো : আমরা অনুগতদের মতই অস্তিত্ব গ্রহণ করলাম?”
এখানে বিশেষ করে দু’টি বিষয় ফুটে উঠেছে।
এক. এখানে আসমান অর্থ সমগ্র বিশ্ব জাহান, পরবর্তী আয়াতাংশ থেকে তা সুস্পষ্ট  বোঝা যায়। অন্য কথায় আসমানের দিকে মনোনিবেশ করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ বিশ্ব জাহান সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করলেন।
দুই. বিশ্ব জাহানকে আকৃতি দানের পূর্বে মানে মহাবিস্ফোরণের ফলে আকৃতিহীন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ধূলির মত মহাশূন্যে বস্তুগুলো প্রাথমিক অবস্থায় ছড়ানো ছিল। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ১৫০০-১০০০ কোটি বছরের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর বিন্যাস হয়েছিল বটে কিন্তু সুবিন্যস্ত ছিল না। কিন্তু ৫০০ কোটি বছরের মধ্যে যখন সূর্য, পৃথিবী ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল, তখন মহাকাশেও তেমনি প্রক্রিয়া চলছিল। এই পর্যায়ে কিছু কিছু নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকলেও তাদের অধিকাংশই তখন গ্যাসীয় অবস্থাতেই ছিল। কুরআনের মতে- মহাকাশের এই পরিবর্তনের সূচনা করলেন আল্লাহ। এবং কুরআনের মতে- আল্লাহ এই ধূম্রকুঞ্জের দিকে নজর দিলেন। অর্থাৎ ধূম্রকুঞ্জকে বিভিন্ন মহাকাশীয় অবজেক্টে পরিণত করলেন। ধোঁয়া বলতে বস্তুর এই প্রাথমিক অবস্থাকে  বোঝানো হয়েছে। বর্তমান যুগের বিজ্ঞানীগণ এ জিনিসকেই নীহারিকা বলে ব্যাখ্যা করেন। বিশ্বজাহান সৃষ্টির প্রারম্ভিক পর্যায় সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারণাও হচ্ছে, যে বস্তু থেকে বিশ্বজাহান সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টির আগে তা এই ধোঁয়া অথবা নীহারিকার আকারে ছড়ানো ছিল।
তিন. মহাবিস্ফোরণের ফলে যে বিপুল বস্তুকণার সমাবেশ ঘটেছিল সেই সকল কণিকাও ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। ক্রমে ক্রমে এগুলো শীতল হতে থাকলো এবং এদের ভেতরের আন্তঃআকর্ষণের কারণে- কাছাকাছি চলে এসেছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ বস্তুপুঞ্জ পৃথক পৃথক সু-শৃঙ্খল দল গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। এই পৃথক দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পত্তন ঘটেছিল সৌরজগৎ (Solar system) ও গ্যালাক্সির ((Galaxy))। এই সু-শৃঙ্খল করার প্রক্রিয়া সম্পর্কেই আল্লাহ্ বলেছেন :
“তিনি আসমান ও জমিনকে বললেন : ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক তোমরা অস্তিত্ব ধারণ করো। উভয়ে বললো : আমরা অনুগতদের মতোই অস্তিত্ব গ্রহণ করলাম।”
মহানবী মোহাম্মদ সা. এর আগে এ বিষয়টি কারো জানা ছিল না। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এ জ্ঞানের উৎস কী?

চার.
লেখা শেষ করে খুব কাছের শ্রদ্ধেয় সাদেক ভাই দেখালাম। সাধারণত আমার প্রতিটি লেখাতেই একই কাজ করি। আসলে সাদেক ভাইয়ের অনুপ্রেরণাতেই লেখালেখি শুরু করি। তাই ওনাকে না দেখিয়ে শান্তি পাই না। উনি লেখাটি দেখে আমাকে বেশ কিছু উপদেশ দিলেন। যেগুলো আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উনি বললেন,
“দেখ, আমাদের কী করা দরকার ছিল আর আমরা কী করছি? কোন একজন বিজ্ঞানী কোন কিছু আবিষ্কার করলেই আমরা চিৎকার করে বলতে থাকি ১৪০০ বছর আগে কুরআন এই কথাই বলেছে। বিজ্ঞান ও কুরআন যে পরস্পর বিপরীতধর্মী কোনো বিষয় না সেটা বুঝানোর জন্য এইটা অবশ্যই দরকার আছে। এইটা বলা অবশ্যই আবশ্যক যে বিজ্ঞানের যেসব তত্ত্ব আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য সেসব বিষয়ে কুরআনও একই কথা বলেছে। কিন্তু কুরআন কি কখনো বলেছে অন্যরা আবিষ্কার করবে আর তোমরা তার সাথে মিলিয়ে দেখবে ঠিক আছে কি না? আসলে কুরআনের মূল দাবি এটা নয়।”
আমি তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
“তাহলে আমাদের আসলে কী করা দরকার?”
একটু থেমে তিনি বাকি কথা যা বললেন তা অনেকটাই এরকম,
সূরা আলে ইমরানের ১৯১ থেকে ১৯৪ আয়াতে আল্লাহ্ সুস্পষ্টভাবে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন আসলে আমাদের কী করতে হবে। যেখানে আল্লাহ্ ঘোষণা দিয়েছেন,
“যেসব বুদ্ধিমান লোক উঠতে, বসতে ও শয়নে সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠনাকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন।”
অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই যদি সে আল্লাহর প্রতি গাফিল না হয় এবং বিশ্বজাহানের নিদর্শনসমূহ বিবেক-বুদ্ধিহীন দৃষ্টিতে না দেখে গভীর নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে দেখে ও সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে প্রতিটি নিদর্শনের সাহায্যে অতি সহজে যথার্থ ও চূড়ান্ত সত্যের দ্বারে পৌঁছুতে পারে। কুরআনের পরতে পরতে এসব নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। অন্যদের দিকে না তাকিয়ে থেকে এসব নিদর্শন দেখে আমরা বিজ্ঞানের বহু আজানা রহস্য বের করে ফেলতে পারি। মানবকল্যাণের জন্য আবিষ্কার করতে পারি আইনস্টাইন বা নিউটনের মতো তত্ত্ব।

তথ্যসূত্র :
১.    বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান : মরিস বুখাইল।
২.    তাফহিমুল কুরআন।
৩.    http://www.alislam.org/library/ books/revelation/part_4_section_5.html

লেখক : সহকারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply